ফুলটির নাম শিমুল

লেখকঃ নীল মেঘ

আজকে স্কুলে যাওয়াটা মহাবিপদের কারণ হবে।’দ্যা কাউ’ শেখা হয়নি আমার।দ্যা কাউ হচ্ছে গরুর ইংরেজী রচনা।তিনদিন আগে বিষ্ণু স্যার পড়া দিয়েছিলেন দ্যা কাউ পুরোটা মুখস্থ করে উনাকে বলতে।আজ সেই তিনদিনের শেষ দিন।বিষ্ণু স্যার এমন চীজ যে মুখে যা বলেন তাই করেন।আমাদের ক্লাসে মোট ৫২জন ছাত্র,ক্লাসে যদি সবাই উপস্থিত থাকে তাইলে বিষ্ণু স্যার সবাইকে পড়া ধরবেন।
মাকে গিয়ে বললাম,পেট ব্যথা করছে।
মা বললেন,শুয়ে থাক।আমাকে বিরক্ত করিস না।
মার কথা শুনে খুশি মনে বিছানায় এসে শুইতেই মেঝদা এসে বলল,কি রে শুয়ে আছিস যে,স্কুলে যাবি না?
বললাম,আমার পেট ব্যথা করছে।মা বলছে শুয়ে থাকতে।
মেঝদা কিছু না বলে চলে গেল।
মেঝদা এত সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্র না।কিছু না বলে চলে যাওয়াটা মোটেও সুবিধার মনে হল না।
বড়দা প্রতিবার ঢাকায় যাবার সময় মেঝদাকে বলে যায় সবকিছুর খেয়াল রাখতে আর মেঝদার ‘সবকিছু’র দৃষ্টি এসে স্থির হয় আমার উপর।
কিছুক্ষণ পর মেঝদা হাতে করে ট্যাবলেট একটা নিয়ে হাজির।
-নে এটা খেয়ে শুয়ে থাক।তবে খবরদার যদি সত্যিকারের ব্যথা না হয় তাহলে কিন্তু এটা খাওয়ার সাথেসাথে রিএকশন হয়ে যাবে।
-রিএকশন হলে কি হবে?
-রিএকশন হলে এটা খেয়ে মারাও যেতে পারিস।
মেঝদার কথা শুনেই ভয়ে আত্মা বের হবার উপক্রম।মেঝদাকে বললাম,একবার বাথরুম করে আসি।তাইলে হয়ত ব্যথা সেরে যাবে।
কমোডে বসে মেঝদাকে ইচ্ছামত অভিশাপ দিলাম যাতে মেঝদার কঠিন কোন অসুখ হয় আর আমার উপর খবরদারী করতে না পারে।বের হয়ে মেঝদাকে বললাম,ব্যথা সেরে গেছে।
-তাইলে রেডি হয়ে স্কুলে যা।
স্কুলে গিয়ে দেখি শাহিন,দীপক,রঞ্জন ওরা কেউ আসেনি।আমি গিয়ে প্রথম যে কাজ করলাম সেটা হচ্ছে,ব্যাগ থেকে তিনটা বই বের করে বই রাখার বেঞ্চে পাশাপাশি বিছিয়ে রাখলাম।এটার মানে হচ্ছে আমার পাশের তিন সীট বুকড।আমাদের মধ্যে যে আগে আসবে সে এই কাজটি করবে।আজকে আমি আগে আসছি তাই আমি একাজটি করেছি।
প্রতিটা ক্লাসেই তিন ক্যাটাগরির ছাত্র থাকে।
প্রথম,দ্বিতীয় এবং তৃতীয়।
প্রথম ক্যাটাগরির ছাত্র সামনের সারির দুই বেঞ্চে বসবে।এদের রোল নাম্বার এক থেকে ছয়ের ভেতর থাকবে।এরা ক্লাসে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ছেলেদের সাথে কথা বললেও তৃতীয় ক্যাটাগরির ছেলেদের সাথে ভুলেও কথা বলবেনা তবে টিফিন পিরিয়ডে এদের কারো কারো নিয়মকানুন বদলে যায়।তখন এরা তৃতীয় ক্যাটাগরির ছেলের সাথেও যেচে যেচে কথা বলবে যদি তার হাতে লোভনীয় কোন খাবার থাকে।
প্রথম ক্যাটাগরির পরেই বসবে দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ছাত্ররা।এদের রোল নাম্বার থাকবে সাত থেকে বিশের মধ্যে।এরা সবসময় ক্লাসের পড়া না পারলেও ছাত্র হিসেবে এরা একেবারে খারাপ না।
বাকি রইলো তৃতীয় ক্যাটাগরির কথা।এরা স্কুলে আসেই মার খাওয়ার জন্য।এদের মধ্যে দু-তিনজন আছে মহা বিপদজনক।এরা যেমন মার খায় তেমন মার দেয়ও।প্রথম ক্যাটাগরির ছাত্ররা বেশিরভাগ সময় এদের হামলার শিকার হয়।কোন এক বিচিত্র কারণে এরা প্রথম ক্যাটাগরির ছাত্রদের দুচোখে দেখতে পারেনা।এদের আত্মসম্মানবোধ হয় প্রবল।এরা স্যার ছাড়া কারো অনুমতির ধার ধারে না।স্যারের অনুপস্থিতিতে সবাই ক্লাসের বাইরে যেতে হলে ক্লাস ক্যাপ্টেনকে বলে গেলেও এরা বলবেনা।এই না বলার কথা যদি ক্লাস ক্যাপ্টেন স্যারকে বলে তবে সেটার জন্য বাড়ি যাওয়ার পথে তার আহত হবার সম্ভাবনা নিশ্চিত।সেজন্য এদের নামে কেউ নালিশও করেনা।
যথারীতি প্রথম ক্যাটাগরি ছাড়া বাকি দুই ক্যাটাগরির ছাত্ররা বিষ্ণু স্যারের কাছে মার খেলাম পড়া না পারার কারণে।
ওহ বলতে ভুলে গেছি,আমি হচ্ছি দ্বিতীয় ক্যাটাগরির ছাত্র।
আজকে একা একা বাড়ি ফিরতে হবে।মারের ভয়ে ওরা তিনজন আসেনি।
সপ্তাহে দুইদিন দীপক এবং রঞ্জনের এক পিরিয়ড আগে ছুটি হয়ে যায় কারণ শেষ পিরিয়ড থাকে ইসলাম ধর্ম শিক্ষার।ক্লাসে হিন্দু মাত্র দুজন বলে ওদের দুজনের জন্য আলাদা ক্লাস নেয়া হয়না।
সপ্তাহের সেই দুইদিন আমাদের খুবই আফসোস হয় কেন আমরা হিন্দু হলাম না।হিন্দু হলে এক পিরিয়ড আগে ছুটি হয়ে যেত।

আমাদের সময় খুব ভাল যাচ্ছে।
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের স্কুল থেকে বিভাগীয় স্টেডিয়াম থেকে কুচকাওয়াজের জন্য স্কাউট দল যাবে।আমাদের স্কুলের নিয়ম হচ্ছে ক্লাস এইটের আগে স্কাউটে নাম লেখানো যাবে না।আমরা এবার ক্লাস এইটে থাকার দরুন স্কাউটে আমরা নতুন আর তাই প্র্যাকটিসে আমাদের আগ্রহই বেশি।যেখানে ক্লাস নাইন টেনকে ধরেবেধে প্র্যাকটিসে আনতে হয়।
আমাদের সময় ভাল যাবার আরেকটি কারণ হচ্ছে নতুন বছরে জাতীয় নির্বাচন হবে।
লাস্ট বেঞ্চের ছাত্র জহির,যাকে ক্লাস সিক্স থেকে আমরা ক্লাস এইটে দেখে আসছি।ষণ্ডামিতে তার সুনাম শুধু আমাদের ক্লাসেই নয়,পুরো স্কুলজুড়ে।নির্বাচনের জন্য সেই জহিরের সাথে ইদানীং আমাদের খুব ভাল খাতির হয়েছে।সে আমাদেরকে বিভিন্ন দলের মিছিলে নিয়ে যায়।আওয়ামী লীগ,বিএনপি সব দলের নির্বাচনী মিছিলেই আমরা যাই এবং এর জন্য প্রতি মিছিলে আমরা ৫০টাকা করে পাই।
আমি ঠিক করেছি টাকা জমিয়ে আগামী রথ-মেলা থেকে একটা শালিক পাখি কিনব।ওকে কথা বলা শিখাব।ময়না পাখি কিনলে ভাল হত কিন্তু ময়না পাখির দাম অনেক বলে শালিক পাখি কেনা।

আমাদের বাৎসরিক পরীক্ষা শেষ।
স্কুলে এখন শুধু আসা স্কাউট প্র্যাকটিসের জন্য।
সেদিন করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি হঠাৎ শুনি ক্লাস টেনের ছাত্র রায়হান বলতেছে,’ওই জানিস,বাচ্চু স্যার গে।সেদিন রুবেলকে…’
বাকিটুকু আর শুনতে পারিনি,আমাকে দেখেই ‘ওই যা এখান থেকে’ বলে তাড়িয়ে দিল।
বাচ্চু স্যার হচ্ছেন আমাদের স্কাউট প্রশিক্ষক।কিন্তু বাচ্চু স্যার গে এটা আবার কি?এটা কি শিয়া সুন্নি এরকম কোন গোত্রের নাম?যদি তাই হয় তবে এটা এত গোপনভাবে বলার দরকার কি?নাকি এটা নাস্তিকতার মত গোপন রাখার মত কিছু?
মেঝদাকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে তবে এক্ষেত্রে যদি মেঝদা শব্দটার অর্থ না জানে তাইলে উল্টো আমাকে ঝাড়ি দেবে।বলবে,পড়াশোনার খবর নাই শুধু আতাংফাতাং প্রশ্ন।
হঠাৎ খেয়াল হল,আরে এত ভাবছি কেন!
এটা নিশ্চয় ইংরেজী শব্দ।আমার কাছে তো অক্সফোর্ড ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি আছেই।

পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় মেঝদার খবরদারী থেকে কিছুদিনের জন্য রেহাই পাওয়া গেছে।
নতুন ক্লাস শুরু না হওয়া পর্যন্ত আমার কাজ হচ্ছে সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়ানো আর খিদে লাগলে বাড়ি এসে কোনমতে চারটা গিলে আবার বেড়িয়ে পড়া।
সেদিন সকালে দেখি মেঝদা সেজেগুজে বেরুচ্ছে।
আমি জানি মেঝদা কোথায় যাচ্ছে।মেঝদা শায়লা আপুর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে।শায়লা আপু কলেজে ঢুকবে তারপর মেঝদা সেখান থেকে আসবে।আবার কলেজ ছুটির সময় কলেজের সামনে হাজির হবে।
শায়লা আপুর কাছে যাওয়ার সময় মেঝদা খুব হাসিখুশি থাকে।যে শব্দের অর্থ জানেনা সেটা জিজ্ঞেস করলেও রাগ করেনা।
মেঝদাকে দেখেই বললাম,মেঝদা তোমাকে আজ খুব ‘গে’ লাগছে।
শব্দটা শেখার পর থেকেই অপেক্ষায় ছিলাম মেঝদাকে কখন এটা শুনাব যাতে মেঝদাও বুঝতে পারে আমিও কম না।আজ সেই সুযোগ পেয়ে সেটা হাতছাড়া করলাম না।নতুন শেখা শব্দটার এমন যুতসই প্রয়োগ করতে আমি যারপরনাই খুশি হয়ে মেঝদার দিকে তাকিয়ে দেখি মেঝদা অপলক আমার দিকে চেয়ে আছে।হঠাৎ কিছু বুঝবার আগেই ঠাশ করে আমার গালে একটা চড় বসিয়ে হনহন করে চলে গেল।
আমি ব্যাথাময় গালে হাত দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে ঝাপসা চোখে মেঝদার চলে যাওয়া পথে তাকিয়ে আছি।
আমি কি এমন খারাপ কথা বললাম যার জন্য মেঝদা এমন ঠাশচড় আমার গালে বসিয়ে দেবে।
এইতো টেবিলে ডিকশনারি পড়ে আছে।
পাতা উল্টিয়ে আবার দেখে নিলাম ‘গে’ শব্দের মানে হচ্ছে ‘প্রানচঞ্চচল,চপল,হাসিখুশি,প্রফুল্ল’।
কাউকে প্রফুল্ল লাগলে সেটা বলা কি অন্যায়?
বড় হয়েছে বলে কি সে মাথা কিনে নিছে!

নতুন বছর শুরু হয়েছে,সাথে আমাদের নতুন ক্লাসও।
এইসময় একটা উৎসব উৎসব আমেজ থাকে স্কুলে।কিন্তু আমার জানি কি হইছে।সবকিছু অচেনা লাগছে।কারো সাথে কথা বলতে বিরক্ত লাগে।সবচেয়ে আজব লাগছে যেটা সেটা হচ্ছে,আমি আমার এতদিনের চেনা শরীরটাকে চিনতে পারছিনা।
বাসায় যেতে ইচ্ছে করেনা।সারাদিন একাএকা হাঁটতে ভাল লাগে আমার।আমি হাতকাটা গেঞ্জি পরিনা এজন্য যে,কেউ যদি আমার বগলের নিচের চুলের কথা জিজ্ঞেস করে বলে ‘এগুলো কি’ তখন আমি কি জবাব দেব।আমি নিজেই জানিনা আমার শরীরে এসব কি হচ্ছে!
কারো সাথে কথা বলার সময় আমার লজ্জা লাগে,এই বুঝি সে জিজ্ঞেস করবে ‘তোমার তো দেখি গোঁফ গজিয়ে গেছে’।
পাড়ার সেলুনে যাই।চুল কাটাই কিন্তু সেলুনের লোকটাকে ‘আমার গোঁফগুলা ছেঁটে দিন’ বলতে লজ্জা লাগে।মনে হয় কে জানি এসে দেখে ফেলবে।
আয়নার সামনে যেতে ইচ্ছে করেনা।গেলেই ব্রণ উঠা বিশ্রী মুখ দেখতে হবে।মা কড়া করে বলে দিছে এগুলোতে যেন হাত না দেই।হাত দিলে নাকি এগুলো আরো বাড়বে।
মাকে বলতে বড় ইচ্ছে করে আমার অন্য সমস্যাগুলোর কথা।কিন্তু বলতে পারিনা,মনের মধ্যে কোথায় যেন বাধে।
জহিরের অন্যায়গুলাও এখন সহ্য হয়না।এটা নিয়ে জহিরের সাথে প্রায়ই হাতাহাতি লেগে যায়।

আমার ১৪তম জন্মদিনে বড়দা আমাকে খুব সুন্দর একটা ছোট্ট টেবিল ঘড়ি দিলেন আর সাথে র্যাপিং পেপারে মোড়ানো একটা বাক্স।বাক্স খুলে দেখি ভেতরে শেভিং কিট সেট।দেখে আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিল।তাহলে কি বড়দাও জেনে গেছে আমার জামার ভেতরে কি হচ্ছে সেসব?
কি লজ্জা!কি লজ্জা!

সেদিন রাস্তায় বড়দার ছোটবেলার বন্ধু আনিস ভাইর সাথে দেখা।আমাকে দেখে বললেন,কিরে তোর মতলব কি বলত?
আমি বললাম,আমার আবার কিসের মতলব?
তিনি বললেন,দাড়িগোঁফের মায়া ছাড়তে পারছিস না দেখি।এগুলারে এত মায়া করার দরকার নেই,একবার ফেললেও আবার চলে আসবে।
তার কথা শুনে লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলাম।কিন্তু আনিস ভাইর সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নাই।
তারপর আনিস ভাই আমাকে বললেন,আয় আমার সাথে।
তিনি আমাকে রঙিন গ্লাসে ঢাকা একটা সেলুনে নিয়ে গেলেন,যেটার বাইরে থেকে ভেতর দেখা যায়না।সেলুনের একজন কর্মচারীকে কিসব বলে বললেন,যা চেয়ারে গিয়ে বস।আমি টাকা দিয়ে যাচ্ছি,এখান থেকে সোজা বাড়ি চলে যাবি।
ওই লোকটা তখন আমার নাকের নিচের গোঁফের রেখা মিলিয়ে দিল।শরীরের অন্যান্য জায়গার বিষয়েও আমাকে বলল কিভাবে কি করতে হবে।সেদিন আনিস ভাইয়ের জন্য কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠছিল।
তার দুইদিন পরের ঘটনা।
ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম।
আমি আনিস ভাইয়ের হাত ধরে রাস্তায় হাঁটছি।হঠাৎ সেই রাস্তাটা আমার রুমের খাট হয়ে গেল।আনিস ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছেন।ঘুমের মধ্যেও আমি অনুভব করছি আমার সারা শরীরে অন্যরকম এক সুখের অনুভূতি।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে ধরমরিয়ে উঠে দেখি আমার পেন্টের ভেতর আঠালো পানিতে ভিজে আছে।
এসব কি হচ্ছে?
এ আবার কোন অসুখ?
ভয়ে সে রাতে আমি আর ঘুমাতে পারিনি।

পরিশিষ্ট
আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
বড়দা বিয়ে করে ঢাকায় থাকেন।আমিও বড়দার সাথে থেকে পড়াশোনা করছি আর ছুটিতে বাড়ি আসি।
মেঝদা বাড়িতেই থাকে।বাজারে দোকান দিয়েছে সে।মেঝদার সাথে আমার সম্পর্ক এখন অনেকটা বন্ধুর মত।শায়লা আপুর বিয়ে হয়েছে অনেকদিন।এরপর মেঝদা আরো দুইটা প্রেম করেছেন কিন্তু মেঝদার কপালটাই খারাপ।যে মেয়ের সাথেই প্রেম করে,সে মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায় তবে এটার জন্য মেঝদাকে খুব একটা চিন্তিত মনে হয় না।মেঝদা নতুন উদ্যমে আবার প্রেম শুরু করে।
মা বলছেন সামনের বছর মেঝদার বিয়ে দিয়ে দিবেন।মেঝদাও তাই এবছর তার শেষ প্রেম করে ফেলছে কারণ সামনের বছর মা যে মেয়ে ঠিক করবেন তাকেই সে বিয়ে করবে।
বয়ঃসন্ধি-কালীন সময়ের কথা যখন মনে হয় তখন ভাবি কি দুঃসময়ই না পার করছিলাম তখন নিজেকে নিয়ে,নিজের চাওয়াকে নিয়ে।
দীপকরা সেসময় মেয়েদের নিয়ে কুৎসিত কথা বললেও আমি বলতে পারতাম না।
কেন বলতে পারতাম না তখন সেটা ছিল আমার কাছে অজানা।
আমার তখন কেন আনিস ভাইর আশেপাশে শুধু থাকতে ইচ্ছে করে বুঝতাম না।
মেয়েদের নিয়ে আমার বন্ধুরা যেরকম ভাবে,আমার কেন সেরকম ভাবনা আসেনা সেটাও জানতাম না।
নিজেকে নিজে কত প্রশ্ন করেছি কোন উত্তর পাইনি।তবে আমি তখন বুঝতে পারছিলাম এসব খুব গোপন ব্যাপার।এটা শুধু আমার ভেতরেই রাখতে হবে।বন্ধুরা যখন নায়িকা পপির উঁচু বুক নিয়ে কথা বলে তখন আমার আনিস ভাইয়ের সমতল বুকের কথা মনে পড়লেও সেটা বলা যাবেনা।
প্রকৃতিই হয়ত এই বোধটুকু আমার ভেতরে জাগিয়ে দিয়েছিল।আমাকে বলছিল,তুমি এই পৃথিবীর অন্য সবার মত না।তোমার একান্ত চাওয়াগুলো,শারীরিক আকাঙ্ক্ষা এগুলো তোমার ভেতরেই রাখতে হবে।বাইরের জগতকে এটা জানানোর কোন অধিকার তোমার নেই।
আমার খুব ইচ্ছা করে মেঝদার মত এতগুলো না হোক,অন্তত একটা প্রেম করি যেটার কথা আমি সবাইকে বলতে পারব।
আমার হিংসে হয় মোড়ের দোকানের সেই ছেলেগুলাকে যারা লাল ওড়না পরা কোন মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখলে গলা ফাটিয়ে ‘ও লাল দোপাট্টাওয়ালি,তেরি নাম তো বাতা’ গান গায় কিংবা শিষ বাজিয়ে ‘চুমকি চলেছে একা পথে’র সুর তুলে।
আমি মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকাই না,পার্কে কিংবা রেস্টুরেন্টে কেউ কখনো আমাকে কোন মেয়ের সাথে দেখেনি এসব বলে যখন বাবারা তাদের ছেলেদের আমার মত হতে বলেন তখন আমি বুঝতে পারি সেই ছেলেরা আমাকে হিংসা করে।
তারা যদি তখন একটাবার আমার মনের চিৎকার শুনত!
আমার মন তখন চিৎকার করে বলে,আমি তোমাদের মত হতে চাই।
তোমাদের মত স্বাভাবিক একজন,যে তার ভাল লাগার কথা বুক ফাটিয়ে সবাইকে বলতে পারবে।
কিন্তু আমি জানি আমি কখনো তাদের মত হতে পারব না।
আমি গন্ধবিহিন এমন এক ফুল যার রঙ গোলাপের মত লাল হলেও সমাজে তার কোন দাম নেই।
আমি জানি,রমণীর খোঁপায় আমার ঠাই কখনো হবে না।না ঘরের ফুলদানীতে হবে,না প্রেমিকের হাতে।আমার ঠাই হবে পথিকের পায়ের নিচে।
তারপরও বোকা মন স্বপ্ন দেখে।
স্বপ্ন দেখে সাধারণের মাঝে সেই অসাধারণ মানুষটার।যে মানুষ কাঁটা বিছানো পথ পেরিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে বেগুনী ঘাসফুলের কাছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.