বসন্ত এসে গেছে

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি


আইটেম দিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে দেখলাম বাইরে ঝলমলে রোদ।মন টা ভাল হয়ে গেলো। সিঁড়ি দিয়ে নামছি। একটা মেসেজ এসেছে মোবাইলে টের পেলাম। যা ভেবেছিলাম তাই। চন্দনের মেসেজ। চন্দন আমার চ্যাট ফ্রেন্ড। একটা সমকামী চ্যাট সাইটে তার সাথে আমার পরিচয়। হ্যাঁ আমরা ২ জনই সম-প্রেমী । আমি পড়ি ঢাকার একটা মেডিকেল কলেজে। আর চন্দন গাজীপুরের একটা মেডিকেল কলেজে।আমরা দুই জনই প্রথম বর্ষে ছাত্র।চন্দন ভারতীয়।কলকাতার বাঙালি।সে মেডিকেল শিক্ষার জন্য বাংলাদেশে এসেছে পড়তে।আগামীকাল আমাদের প্রথম দেখা করার কথা। দেখা করা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েই মেসেজ পাঠিয়েছে সে। রাতে ফোন দিয়ে সব ঠিক করবো এটা জানিয়ে মেসেজ পাঠালাম। আমার ছেলেটা কে খুব ভাল লাগে।তার জ্ঞান , কথা বলা, স্মার্টনেস , ব্যক্তিত্ব সব।দেখা করার পর না আবার প্রেমে পরে যাই।

সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেলো। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। আজ বসন্তের প্রথম দিন।কিন্তু শীত পুরোপুরি চলে যায় নাই এখনো।জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি কুয়াশায় চারিদিক ঢাকা।আজকেই চন্দনের সাথে দেখা হবে। এক তো পহেলা ফাল্গুন তার উপর শুক্রবার।ছুটি। চন্দন কে নিয়ে আজকে সারা দিন ঘুরবো। আমি গোসল করে ফ্রেশ হলাম। বাসন্তী রঙের একটা পাঞ্জাবি আছে। সেটা পরলাম।চন্দনের জন্য অপেক্ষা করবো শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। বাসা থেকে বের হবার আগে একটা ফোন দিলাম চন্দন কে। সে বের হয়েছে কিনা জানার জন্য। চন্দন বাসে।আসছে। আমি আর দেরি করলাম না। বের হয়ে গেলাম। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় খেয়াল করলাম বাড়ির কাছের কৃষ্ণচূড়া , রাধাচূড়া গাছে ফুল ফুটেছে। আসলেই বসন্ত এসেছে।

আজিজ সুপার মার্কেটে দাঁড়াতে উৎসবের ছোঁয়া দেখতে পেলাম এখানেও। মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরেছে আর গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে সেজেছে। আর ছেলেরা পাঞ্জাবী পরেছে। তাদের মাঝে অনেকেরই পাঞ্জাবীর রঙ বাসন্তী। আমি অপেক্ষা করছি চন্দনের জন্য। আরও নাকি ৫ মিনিট লাগবে। অপেক্ষা করতে আমার খুব বিরক্ত লাগে।অপেক্ষার মুহূর্ত গুলো যেন কাটতেই চায় না। আবার বেশ উত্তেজনাও লাগছে।প্রথম দেখা হবে চন্দনের সাথে। যদিও ছবি দেখেছি, ফোনে কথা হয়েছে অনেকবার। তারপরও সামনাসামনি দেখার অনুভূতি অন্যরকম।আচ্ছা আমাকে পছন্দ করবে তো ? সামনাসামনি কোন ক্ষুত পেলে তখন? কিংবা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পছন্দ না হলে? না এমন নিশ্চয়ই হবে না। এতো দিনের বন্ধুত্ব । আমি ওর উপর এইটুকু ভরসা রাখি। ৫ মিনিট কেটে গিয়েছে বেশ অনেকক্ষণ আগেই। ভাবছি ফোন দিবো। কিন্তু ফোন দেয়া লাগলো না। ওই তো চন্দন আসছে। পরনে একটা নীল শার্ট।

চন্দন দেখতে একদম ঠিক ছবির মতই। ওর যে আমাকে ভাল লেগেছে তা বুঝতে পেরেছি। আমারও ওকে ভাল লেগেছে। আমি বক বক করছি প্রচুর। প্রথম পরিচয়ে এত কথা আমি কক্ষনো বলি না। হাঁটছি জাদুঘরের পাশের রাস্তা দিয়ে। যাবো চারুকলা। চন্দন চারিদিকের উৎসবের রঙ দেখে মন খারাপ করে ফেলেছে। কারন সে পাঞ্জাবী পরে নাই।তার নাকি কোন পাঞ্জাবীই নাই। আমি বললাম
– চল আজিজ থেকে একটা পাঞ্জাবী কিনে ফেলি
– ওখানে পাওয়া যাবে?
– অবশ্যই
– অনেক দাম না তো ? ১২০০ -১৫০০ এর মাঝে হবে তো?
– স্বচ্ছন্দে
আমরা আবার ফিরে চললাম আজিজে। চন্দন খুব উৎসাহিত। পুরো একতলা দোতালা ঘুরে একটা সবুজ রঙের পাঞ্জাবী কেনা হল। সে নাকি বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবী পরবে না। পাঞ্জাবি পরে যখন সে বের হল তখন তাকে অসম্ভব কিউট লাগছে। আমি তো এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছি।আবার চললাম চারুকলায়।

আমরা যখন চারুকলায় ঢুকলাম তখন ২ জন ছেলে এসে আমাদের গালে আলপনা এঁকে দিতে চাইলো। আমি না করছিলাম । কিন্তু চন্দনের উৎসাহে আমিও গালে আলপনা আঁকলাম। ভাবলাম সাজাই না একটু নিজেকে উৎসবের রঙে। চারুকলার বকুলতলায় বসন্ত কে বরণ করার জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। সকাল ৭ টা থেকেই বসন্ত উদযাপন পরিষৎ এর উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমরা ঢুকতেই শুনলাম রবীন্দ্র সঙ্গীত হচ্ছে । আহা আজি এ বসন্তে…………।
আমরা ২ জনই গান শুনছি। এরপর আরও ২ টা গান আর নৃত্য হল। লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছে পুরো চারুকলা চত্বর।চারুকলা থেকে বের হয়ে দেখলাম ফুটপাতে কাঁচের চুড়ি বিক্রি করছে এক মহিলা। দেখলাম চন্দন এক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে চুড়ির দিকে। আমি বললাম
– কিনবে চুড়ি ?
– উহু
– তাহলে?
– কিছু না। চল মুভ করি।
আমার একটু অবাকই লাগলো ব্যাপার টা।

টিএসসি চত্বরে মানুষ গিজ গিজ করছে। আমি চন্দন কে বললাম বসন্ত উৎসবের ইতিহাস
– বাংলায় বসন্ত উৎসব এখন প্রাণের উৎসবে পরিণত হলেও এর শুরুর একটা ঐতিহ্যময় ইতিহাস আছে, যা হয়তো অনেকের অজানা। মোগল সম্রাট আকবর প্রথম বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন ১৫৮৫ সালে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে ১৪টি উৎসবের প্রবর্তন করেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বসন্ত উৎসব। তখন অবশ্য ঋতুর নাম এবং উৎসবের ধরনটা এখনকার মতো ছিল না। কিন্তু অন্য ঋতুর চেয়ে এই ঋতুকে পালন করা হত আলাদাভাবে
এদিকে সরওয়ারদি উদ্যানে চর্কি আর ফুচকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথমে ফুচকা খেলাম। তারপর চরলাম চর্কি তে। আমার হাত চেপে ধরে রইলো চর্কি তে চড়ার সময়। আমার ভাল লাগছিল তার হাতের স্পর্শ।

আজকে শুক্রবার। বইমেলা সকাল থেকেই খোলা। বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বইমেলায় ঢুকলাম। চন্দন তো বইর পোকা। অসংখ্য বই সে পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশী লেখক দের বই খুব একটা পড়ে নাই। তাকে বাংলাদেশী লেখক দের বই পছন্দ করে দিবো আমি। বই মেলায় বেশ ভিড়।কারণ আজকে পহেলা ফাল্গুন এবং তার উপর শুক্রবার।
বেশ কিছু বই কিনলও চন্দন।।অবশ্য আমি কিনি নাই কোন বই ।আমি শুধু বই পছন্দ করতে সাহায্য করেছি। আমি আরেকদিন এসে কিনবো। হুমায়ুন আহমেদ , জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, নাজিমুদ্দিন, ইমদাদুল হক মিলন এর বই কিনলও চন্দন।বই মেলায় ঘুরে ঘুরে ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত আমরা। চন্দন বলল সে বাঙালি খাবার খাবে। গেলাম এলিফ্যান্ট রোডের একটা রেস্টুরেন্টে। অর্ডার দিলাম ৪ ধরণের ভর্তা , ইলিশ মাছ ভাজা , মুরগীর ঝাল ফ্রাই আর ডাল। ভর্তা খেতে গিয়ে চন্দন বলল
– জানো কতদিন পর ভর্তা খাচ্ছি। আমার মা প্রতিদিন…।
– প্রতিদিন কি?
– কিছু না।
ও থেমে গেলো। আর কিছুই বলছে না। আমিও আর কথা বাড়ালাম না।কেউ কিছু বলতে না চাইলে সেই প্রসঙ্গে কথা না বলাই উচিৎ। খাওয়া শেষ হল। আমার প্ল্যান হল সিনেমা দেখা। চন্দনও এক কথায় রাজি। সিনেপ্লেক্সে আয়নাবাজি চলছে। চন্দন এর আগে কক্ষনোই বাংলাদেশি ফিল্ম দেখে নাই। পপকরন আর ওয়েজেস নিয়ে হলে বসলাম। সিনেমা হলের আলো আধারিতে চন্দন আমার হাত ধরে ছিল। একসময় চন্দন হাত ছাড়লে আমি ধরলাম তার হাত।হাতের স্পর্শেই যেন একজন আরেকজন কে অনুভব করছি। আয়নাবাজি দেখে মুগ্ধ আমরা।চন্দন তো বলেই ফেললো এত ভাল বাংলা সিনেমা সে খুব বেশি দেখে নাই। সিনেমা হল থেকে বের হয়ে দেখি প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রবীন্দ্র সরোবর , ধানমন্ডি লেক।

রবীন্দ্র সরোবরের মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠান চলছে। গান গাইছে এক দল শিল্পী। মানুষের তিল ধারণের জায়গা নাই। আমরা বেশ কিছুদূর হেঁটে একটা নির্জন জায়গা পেলাম। সেখানেই বসলাম।২ জনের হাতে ২ টা হাওয়াই মিঠাই। হটাত চন্দন আমার হাত ধরে বলল
– ধন্যবাদ নিলয় আজকের এত সুন্দর একটা দিনের জন্য। বাংলাদেশে আসার পর এই দিন টা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। আমি কোনদিন ভুলবো না আজকের কথা।
– আমারও অসম্ভব ভাল লেগেছে তোমার সাথে ঘুরতে। আজকে বসন্ত বরণ আমার জন্য স্পেশাল হয়ে থাকবে। আচ্ছা তুমি ভারতে কক্ষনো এইভাবে বসন্ত বরণ করেছো?
– এত জাঁকজমক না হলেও করেছি। কিন্তু আর কক্ষনোই করা হবে না।
– কেন ?
– কারন আমি সুদীর্ঘ ৬ বছর মানে মেডিকেল পড়া প্লাস ইন্টার্নশিপ শেষ না হলে আর দেশে যাবো না। ততদিনে আমার বন্ধুরা কে কোথায় চলে যাবে। যোগাযোগ ই হয়তো আর থাকবে না।
– বল কি? কেন? এতো দিন পরিবারের বাইরে কেন? ছুটি তে বাড়ি যাবে না?
– নাহ।একটা কাহিনী আছে। আমার জীবনের কাহিনী। শুনবে?
– অবশ্যই
তারপর চন্দন এমন একটা ঘটনা বলল যে আমার চোখেও পানি এসে গেলো ।
চন্দনের ঘটনাটা এমন
চন্দন কলকাতায় বড় হয়েছে। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা গিয়েছেন ।এর পর থেকে মামার বাসায় থাকছে।উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্ট করে কলকাতার একটি কলেজে ফারমাসি তে ভর্তি হয়েছিলো সে।তখনই চন্দনের মা বেলি চন্দন কে একটি ল্যাপটপ উপহার দেন।পড়া শোনা করতে হলে আজকাল ইন্টারনেট ছাড়া গতি নেই। নেট কানেকশনও দেয়া হল। সেই থেকে চন্দন ফেসবুকে প্রোফাইল খুললও।জানতে পারলো বিশাল সমকামী জগতের কথা।জীবন টা তার কাছে অনেক রঙিন মনে হতে লাগলো । এতদিন সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতো । ভেবেছিল জীবনে হয়ত আর কখনো তার মত আরেক জন মানুষের দেখা হবে না। কিন্তু ফেসবুকে প্রোফাইল খুলতেই কয়েকদিনের মাঝে সে সমকামী অনেক ছেলে কে খুঁজে পেলো । ফেসবুকে নতুন নতুন বন্ধু জুটলও ।সবাই সমকামী।পুরনো বন্ধু দের চেয়ে নতুন সমকামী বন্ধুদের সাথেই সে বেশি সময় কাটাতে লাগলো । তাদের সাথে প্রায়ই দেখা করতো ,আড্ডা দিতো সে। এমন কি ২ জনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত হয়ে গেল।
সমস্যা হলও যখন তার মামাতো বোন দীঘি তার পুরো প্রোফাইল আর ফ্রেন্ড লিস্ট দেখে ফেললো । চন্দন ল্যাপটপে ফেসবুক এ সাইন ইন অবস্থায় রেখে বের হয়ে গিয়েছিল। এমন সে প্রায়ই করে। কখনো সমস্যা হয় নাই। কিন্তু দীঘি যে তার প্রোফাইল দেখে ফেলবে তা কে জানতো।দীঘির ল্যাপটপ চলছিলো না। কিন্তু একটা খুব দরকারি কাজ ছিল।তাই সে চন্দনের ল্যাপটপ টা ধার নিতে এসেছিল।এদিকে ফেস বুক খোলা। ২ টা ছেলে একে অপরকে চুমু খাচ্ছে এমন একটি ছবি তার প্রোফাইল পিকচার। উত্তেজনায় দীঘি পুরো প্রোফাইল দেখলও যেখানে অসংখ্য সমকামী পোস্ট আর ছবি রয়েছে। ফ্রেন্ডলিস্ট এর প্রায় সবাই এমন। দীঘির আর বুঝতে বাকি রইলো না যে চন্দন সমকামী ।দীঘি চন্দন কে নিজের আপন ছোটো ভাইর মতই অনেক আদর করে। কিন্তু সে ভেবে দেখলও এই অবস্থা চলতে দিলে চন্দন বখে যাবে। ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। আজ যদি সে এই কথা গুলো বেলি কে না বলে তাহলে ভবিষ্যতে চন্দনের কোন ক্ষতি হলে সে নিজে কে কোন দিন ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু কিভাবে বলবে এই কথা গুলো বেলি কে?
মধ্য দুপুর বেলি খাটে শুয়ে একা বই পড়ছেন । হটাত দীঘি ঘরে ঢুকলও
-পিশি
-কিছু বলবি?
-তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
-বল
দীঘি ইতস্তত করছে।
-কি ব্যাপার বল
-পিশি আজকাল চন্দন কে ভাল মত দেখেছো ? মানে ও ঠিকঠাক আছে তো ?
-কেন বল তো?
-আমার মনে হয় চন্দন আজকাল কার সাথে মিশেছে তা তোমার জানা দরকার
বেলি খুব অবাক হয়ে বললেন
-কেন তুই কি কিছু জানিস? মানে খারাপ কারো সাথে মিশছে ?
-একটা জিনিস দেখবে চল
দীঘি ল্যাপটপ টা সামনে এনে চন্দনের সব ছবি , পোস্ট দেখালও। ছবি গুলো দেখে ভয়ে শিউড়ে উঠলেন বেলি।
বেলি কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। অবশেষে তার ভাই মানে দীঘির বাবা গোবিন্দ কে সব কিছু বলবেন বলে ঠিক করলেন।
গোবিন্দ খুব রগচটা মানুষ আর খুবই রক্ষণশীল। তিনি পুরো ব্যাপারটা শুনলেন।কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলেন না। এদিকে বেলিও খুব ভেঙ্গে পরলেন। তার ছেলে হয়ে চন্দন এত বড় অন্যায় করছে!।না এই ছেলের মুখ তিনি আর দেখবেন না। পুরো ব্যাপার টা গোবিন্দর উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে দোর দিলেন। আর গোবিন্দ আগে থেকেই চন্দন কে ঠিক পছন্দ করতেন না। অপছন্দের মানুষের উপর রাগ আরও বেশি উঠে।তিনি কাঠের স্কেল নিয়ে গেলেন চন্দনের ঘরে। আজ চন্দন কে তিনি মেরেই ফেলবেন।
চন্দন কিছুই জানতো না। কিন্তু হটাত মামার মারমুখী আচরণ দেখে চন্দন তাজ্জব বনে গেলো । গোবিন্দ কিছু জানারও চেষ্টা করলেন না। প্রথমে ল্যাপটপ টা মেঝে তে ফেলে ভাঙলেন তারপর স্কেল দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন চন্দন কে। সাথে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ। কিছুক্ষণের মাঝেই চন্দন বুঝতে পারলো কেন তাকে মারছেন গোবিন্দ । কিন্তু সে মাফ তো চাইলো না। বরং স্কেলের আঘাত একদম চুপ করে সহ্য করতে লাগলো। এই আচরণ গোবিন্দ কে আরও বেশি খেপিয়ে তুলল । স্কেল ভাঙার পর থামলেন গোবিন্দ ।চন্দনের শার্ট ছিঁড়ে গেলো । পিঠে দাগ বসে গিয়েছে। গোবিন্দর ছোট ভাই সুব্রত শুধু দেখলেন। তার কষ্ট লাগছিল।এত মার না দিলেও চলতো। কিন্তু ভাই এর মুখের উপর কথা বলার সাহস তার নাই।
এদিকে চন্দনের অপমানে চোখে পানি এসে গিয়েছে। মা বাবার হাতে মার খাওয়া যায়। কিন্তু আত্মীয় মারলে তা অনেক অপমানের।
রাতে মিটিং এ বসলেন সবাই। এর সমাধান কি? একেক জন একেক কথা বলে। শেষে সুব্রত প্রস্তাব দিল
– চন্দন কে এখান থেকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে হবে। এখানকার সমকামী বন্ধু দের সংস্পর্শ থেকে দূরে কোথাও।আমার তো ব্যবসার জন্য বাংলাদেশে যেতে হয়। ওখানকার পরিবেশ অনেক ভাল। আমার মতে ওখানে কোন একটা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে দেই। চন্দন ওখানে ভাল থাকবে। শুধরবে ।
বেলি বললেন
-তোমরা ওরে যেখানে খুশি পাঠাও। আমার ওর মুখ দেখতেও ইচ্ছে করে না।যেদিন ডাক্তার হবে সেদিন যেন আমার সাথে কথা বলে। এর আগে না।
গোবিন্দরও প্রস্তাব পছন্দ হল। কিন্তু তারা একবারও চন্দন কে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলেন না। ভর্তির সমস্ত প্রক্রিয়া হয়ে গেল। চন্দন জানতে পারলো একদম শেষ মুহূর্তে।তার সমস্ত বন্ধু বান্ধব ছেড়ে চলে যেতে হবে। আর মেডিকেল পড়ার কোন ইচ্ছাই তার নেই। সব চেয়ে কষ্ট লাগছে এটা ভেবে মায়ের সাথে কবে দেখা হবে। মা নাকি বলেছেন ডাক্তার না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি তে না আসতে। তার মানে দীর্ঘ ৬ বছর। তার তো বাবা নেই। কোন ভাই বোন নাই। মামা দের কে সে আপন মনেই করে না। মা তার সব। আর মা তার উপর রাগ করে আছে। দুঃখে কষ্টে চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু না কাঁদলে হবে না। তার সারভাইভ করতে হবে। চোখের পানি মানুষ কে দুর্বল করে শুধু। একদিক থেকে ভালই বাংলাদেশে চলে গেলে। এই দমবন্ধ করা পরিবেশে আর থাকতে হবে না। মামা দের মত এই সকল জানোয়ারের কাছে থাকতে হবে না।একটু বুক ভরে শ্বাস নেয়া যাবে।
বিদায় বেলা বেলি দেখা পর্যন্ত করলেন না। সুব্রত গেলেন চন্দনের সাথে।তারপর ৬ মাস হয়ে গেল বাংলাদেশে। কোন ছুটিতে সে কলকাতা যায় না।বেলি তার সাথে ফোনেও কথা বলেন না। যা কথা বলার সুব্রত বলেন।
পুরো ঘটনা শুনে আমার কি বলা উচিৎ বুঝতে পারছি না।এর কি কোন সান্ত্বনা হয়।আমার মা একদিন আমার সাথে কথা না বললে আমার পৃথিবী অন্ধকার মনে হয়।সেখানে ৬ মাস চন্দনের মা চন্দনের সাথে কথা বলে না। ৬ বছর সে বাড়ি যাবে না। কিভাবে কি?
চন্দন হটাত খুব আবেগ আপ্লুত হয়ে বলল
– জানো আজকে কাচের চুড়ি দেখে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। মা কাচের চুড়ি পরতে ভালবাসে।আবার দুপুরে রেস্টুরেন্টে ভর্তা দেখে মায়ের কথা মনে পড়লো। মা খুব ভাল ভর্তা বানাতে পারে। প্রতিদিন লাঞ্চে ভর্তা থাকতোই
ঝর ঝর করে কেঁদে দিল চন্দন। আমি তার কাঁধে হাত দিয়ে বসে রইলাম। কাঁদুক মন হাল্কা হবে।
– জানো এই কথা গুলো কাউকে বলতে পারি না। তোমাকে বলার পর মনটা হাল্কা হল। আমি জানি না তুমি আমাকে আপন ভাবো কিনা। কিন্তু কেন জানি তোমাকে খুব কাছের মানুষ মনে হচ্ছে।
– আমারও তোমাকে খুব আপন মনে হয় চন্দন।তোমাকে কাঁদতে দেখে আমারও কষ্ট লেগেছে।
এরপরও আমরা অনেকক্ষণ বসে থাকলাম লেকের ধারে। তেমন কোন কথা হল না। কিন্তু নীরবতাই যেন একটা ভাষা। আমরা একে অপর কে অনুভব করতে লাগলাম ।রাত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ওঠা উচিৎ। কারন চন্দন অনেক দূরে যাবে। সেই গাজীপুর এ। চন্দনের সাথে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত গেলাম। বাসে উঠিয়ে দিলাম। মনে হল খুব আপনজন কেউ চলে যাচ্ছে। বাস যখন চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে তখনও দেখলাম চন্দন জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আস্তে আস্তে আমার দৃষ্টি সীমা থেকে বাস চলে গেলো।


বাড়ি ফিরে কোন ভাবেই চন্দন কে ভুলতে পারছি না। আসলে চন্দনের সাথে পরিচয় তো অনেক আগেই থেকেই। তখন থেকে আমি চন্দন কে অনেক পছন্দ করি। আজ দেখা হল। এখন মনে হচ্ছে আমি চন্দনের প্রেমে পড়ে গিয়েছি। আমার মনে হচ্ছে এই কথা চন্দন কে বলা উচিৎ। আর কালকে ভ্যালেন্টাইন ডে। প্রপোজ করার জন্য উত্তম দিন। কিন্তু চন্দন যদি একসেপ্ট না করে? না ঝুঁকি নিবো। কালকে আমি সোজা । ওর কলেজে যাবো সেখানেই প্রপোজ করবো। ঘুম আসছে না। রাতও শেষ হচ্ছে না। এত দীর্ঘ কেন আজকের রাত টা।উত্তেজনায় ছটফট করছি আমি। মাঝে মাঝে ভয় লাগছে। চন্দন যদি আমাকে রিজেক্ট করে। নাহ আমি চন্দনের চোখেও আমার জন্য মুগ্ধতা দেখেছি।

সকালে উঠে ফ্রেশ হলাম। একটা কালো শার্ট পরলাম। এই শার্টে আমাকে খুব মানায়। গাজীপুর যাবো। চন্দনের মেডিকেল কলেজে। যাওয়ার আগে একটা গিফট কিনলাম। ব্যাগের মধ্যে ভরে নিলাম গিফট।বাসে উঠে বসে আছি। রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। গাড়ি চলে না। আমারও অধৈর্য লাগছে। কখন পৌঁছবো ? অবশেষে ২ ঘণ্টা পর পৌঁছলাম।গিয়ে ফোন দিলাম চন্দন কে। চন্দনের গলা আজকে অনেক প্রাণ চঞ্চল , খুশি খুশি লাগছে।
– হ্যালো নিলয় তোমাকেই ফোন দিতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই তুমি ফোন দিলে।
– কেন?
– একটা খুশির খবর আছে
– আমার একটা সারপ্রাইজ আছে
– কি সারপ্রাইজ?
– আগে তুমি খুশির খবর বল
– না আগে তুমি সারপ্রাইজ দাও
– আমি তোমার কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আছি
– ওয়াও রিয়েলি সারপ্রাইজিং। আমি আসছি
– তোমার খুশির খবর?
– এসে বলছি
৫ মিনিটের মাঝে চন্দন গেটে আসলো। আজকে তাকে খুব খুশি লাগছে। আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলও
– তুমি ভাবতেও পারবে না আজকে আমি কতটা খুশি ।চল আমার রুমে যাই।ওখানেই নিরিবিলি।
আমি আর চন্দন রুমে বসে কথা বলছি।
– জানো মা গতকালকে ফোন করেছিল।অনেক কান্না করলো। বলল বাড়ি ফিরে যেতে। গোবিন্দ মামা খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি । আমাকে দেখতে চান। তিনি নাকি ফিরে যেতে বলেছেন। তিনি ভুল করেছেন নাকি। এখন থেকে আমাকে আর এখানে পড়া লাগবে না। আমি কলকাতাতেই পড়বো। আই এম সো হ্যাপি।কালকের বাসেই কোলকাতা যাচ্ছি।
আমি পুরোপুরি নিভে গেলাম। আসলে এই অবস্থায় প্রপোজ করার কোন মানে হয় না। সে তো কোলকাতাতেই ফিরে যাবে। চন্দনের খুশি দেখে আমারও খুশি হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমার কেন জানি খুব কষ্ট লাগছে।
– কি তুমি খুশি হও নাই?
– না অনেক খুশি হয়েছি
বাকিটা সময় আমি তেমন কথা বলতে পারলাম না। হু হা করলাম শুধু। বেশিক্ষণ থাকলাম না। এক ঘণ্টা পর চলে আসলাম।
১০
আজকে চন্দন চলে যাচ্ছে। আমার মন খুব খারাপ। একবারও চন্দনের খোঁজ নেয়া হয় নাই। অথচ খোঁজ নেয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে গেলে ও বুঝে যাবে আমার মন খারাপ। আমি আর খুশি হওয়ার অভিনয় করতে পারবো না। মোবাইল বাজছে। যা ভেবেছিলাম। চন্দন। ধরবো না ভাবলাম একবার। তারপরও কি ভেবে ধরলাম।
– হ্যালো
– নিলয় আমি বাস স্ট্যান্ডে । তুমি একটু আসতে পারবা?
– আমার তো একটু কাজ আছে।
– প্লিজ
এরপর আর অনুরধ ফেলতে পারলাম না।
বাস স্ট্যান্ডে এসে দেখি নিলয় বাস কাউন্টারের সোফায় বসে মোবাইল টিপছে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো। হাতে একটা ব্যাগ। আরে গিফট রাখা ব্যাগটা। আমি ভুলে ফেলে রেখে এসেছিলাম ওর ঘরে। আমি তো বেমালুম ভুলে গিয়েছি।তাহলে এই ব্যাগ দেয়ার জন্যই আমাকে ডেকে এনেছে। চন্দন আমার সামনে এসে দাঁড়ালো
– তুমি ব্যাগ ফেলে রেখে গিয়েছিলে আমার ঘরে
– থ্যাঙ্ক ইউ।আচ্ছা আমি যাই । আমার খুব জরুরি একটা কাজ আছে। হ্যাভ আ সেফ জার্নি। ভাল থেকো
– আরে দাড়াও দাড়াও। কোথায় যাও? তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে।
– কি?
– ব্যাগের ভিতর কি?
– আছে কিছু কাগজ পত্র ,বই।
– আমি দেখেছি ভিতরে কি আছে। মিথ্যা বলছো কেন?
– একটা টেডি বিয়ার আছে।তো ?
– টেডি বিয়ারটার হাতে প্রেস করলে কি বলে?
আমি চুপ।ধরা পরে গিয়েছি। টেডি বিয়ারের হাতে প্রেস করলে তা আই লাভ ইউ বলে
– তুমি আমার জন্য এটা এনেছো ? তাই না?জানো কালকে আমি তোমার মুখ দেখেই বুঝেছি তুমি আমাকে ভালবাসো। আর টেডি বিয়ারটা আমাকে ভ্যালেন্টাইন ডের গিফট হিসেবে আমাকে দিতে চেয়েছিলে। কিন্তু দিলে না কেন?
– তুমি তো চলেই যাবে। তুমি তো আমাকে ভালবাসো না।
– মোটেই না। আমি এখানেই পড়াশোনা করবো। এখন মায়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।
– কিন্তু তখন তো বললে
– সে তো তোমার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। আমি তো সিউর ছিলাম না তুমি আমাকে ভালোবাসো
– এখন?
– আমি জানি তুমি আমাকে অসম্ভব ভালোবাসো। এত ভালবাসা ছেড়ে আমি কই যাবো ?
আমার চোখে পানি এসে গিয়েছে। পরম খুশির মুহূর্তে আমার চোখে পানি আসে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.