ভয়

লেখক :-  রোমাঞ্চ

ঘটনাটি অদ্ভুত এবং সত্য ঘটনা। এই ঘটনার সাথে তিনজন মানুষ প্রত্যক্ষদর্শী। ২০০৯ সালের নভেম্বরের ঘটনা।। আমি তখন রাজধানী ঢাকার বাংলামটর ইস্কাটনের সাপ্তাহিক ২০০০ এর গলিতে একটি বাসায় উঠেছি। পাশাপাশি দুটো ঘর, একটি টিনের চালওয়ালা আর একটি ছাদওয়ালা। বাড়ীওয়ালা ছাদওয়ালা ঘরটি ভাড়া দেয়নি। তালা বদ্ধ থাকে। তবে ছাদে যাওয়ার সিড়ি ছিলো। ওটা খোলা থাকে। বিকেলে অন্য সবাই ঐ ছাদে যেতো, তবে রাতে যেতাম আমি। আমার বিকেলে অফিসের কাজ থাকায় ফিরতে রাত হত, তাই রাতেই যেতাম।
ওখানে যাওয়ার প্রায় কয়েক দিনের মধ্যেই আমার বাড়ির ছাদে উঠার অভ্যাস হয়ে গেল। একদিন মধ্য রাতে হঠাৎ করেই একটা ছেলেকে দেখলাম। ছাদের এক কোনে। প্রথমে ভয় পেলাম। একেতো অন্ধকার রাত। আশে পাশের সব আলো নিভে গেছে। দুরের কোনো আলো আছে।
রাত তখন প্রায় ১টা বাজে। কিছুটা কৌতুহল বসত পরিচিত হলাম। জানালো পাশের একটি বাসায় থাকে, কিন্তু কোন বাসায় থাকে, তা বললো না। ছেলেটির নাম বলল সৌরভ। ছেলেটি আমাকে জানাল সৌরভ নামের অর্থ হচ্ছে সুবাস। ফাজলামী করে বললো, চোখ বন্ধ করে বললো, যে সুমিষ্ট ঘ্রাণ পাবে, তাই আমি। ছেলেটি দেখতে মায়াবী চেহারার আর মাঝারি গড়নের। ২০ বছর আগে, ওরা এই জমি বিক্রি করে দিয়েছে নতুন বাড়ীওয়ালার কাছে। তারপরও ওরা থেকে গেছে পাশের একটি বাড়ীতে । তারপরও ও আসে পুরনো বাড়ীর মায়ায়।
মানে ওরাই এই বাড়ীর মালিক ছিলো। ওরা এ বাড়ী ছাড়েনি কেনো জিজ্ঞাসা করতেই, ও আনমনা হয়ে গেলো। বললো, পরে বলবো। তারমানে এই এলাকায় ওরা বেশ পুরনো । হঠাত করেই ও যা বললো, তাতে আমি হতবাক…
: আচ্ছা, আপনার নাম নাহ..রোমাঞ্চ ?
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম…..
: তুমি আমার নাম কিভাবে জানলে? আমিতো এখানে নতুন এসেছি।
সে আমাকে বলল, আমাকে সে প্রথম দিনই দেখেছে।
এই বলে সে হাসতে শুরু করল। ঐ রাতে তার সাথে ১টা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত আমার কথা হল।
এই ভাবে প্রতি রাতেই ছাদের একটা যায়গায় আমরা কথা বলতাম। একদিন রাতে ছেলেটি আমার কাছ থেকে আমার ফোন নাম্বার নিল আর আমাকে একটা গিফট দিল। গিফটা অসম্ভব সুন্দর ছিল আর সেটা ছিল মাটির কারুকাজ। দেখতে অনেকটা অদ্ভুত। চারুকলায় গেলে এমন কিছু মাটির কারুকাজ করা কাজ থাকে যার অর্থ খুঁজতে বেশ ভাবতে হয়, ঠিক তেমনই এই শো পিচটা। তবে ঘরের মত দেখতে অনেকটা । ছাদের ওপর একজন দাড়িয়ে আছে কোন একজন। দৃষ্টি তার মাটিতে। এত সুন্দর একটা শো পিছ পেয়ে আমার খুবই খুশি লাগলো। সৌরভ আমাকে বলল, এটা খুব যত্ন করে রেখে দিতে আর বাসার কাউকেই না জানাতে।
আমি কাউকে না জানিয়ে সেটাকে আমার রুমের ওয়ারড্রফে রেখে দিলাম। কিন্তু এরপর থেকেই সব ঝামেলার শুরু হল। একসময় আমি ওর সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ হতে থাকলাম। এবং আমি প্রায় সারা রাতই ওর সাথে ফোনে কথা বলতে থাকি, ও ছাদে যখন আসতো না । তবে রাত ৪টা পর্যন্ত। এর পর থেকেই ফোন অফ । ও বললো, বাসার সবাই জেনে যাবে তাই দিনে ফোন অফ থাকে। কথা বলতাম আর কথা বলতে বলতে একসময় আমরা ছাদে চলে যেতাম দেখা করার জন্য। কিন্তু আমি কখনও ভাবতাম না যে ও কিভাবে ছাদে আসত। কারণ সিড়িটা আমার দরজার পাশেই। কিন্তু ওদের বাড়ীটা অন্য পাশে, দেয়াল দেয়া। জিজ্ঞাসা করতেই মুচকি হাসতো। এভাবে প্রায় একমাস চলে গেল।
একদিন আমার এক খালাতো ভাই ও আমার মা বাড়ী থেকে আসলো। কয়েক দিন যেতে না যেতেই হঠাৎ একদিন আমার ঐ ছোটভাই কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে আসল। আর কি জানি বলতে চাইল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু ও কিছুই বলতে পারল না। আমি আমার রুমে গিয়ে দেখলাম কেমন যেন একটা আশ্চর্য গন্ধ ছড়িয়ে আছে। গন্ধটা আমার খুব পরিচিত মনে হল, কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। গন্ধটা খুব হালকা কিন্তু অনেক দূর চলে যাওয়ার মত একটা গন্ধ। এরপর ঘরের কোনায় তাকিয়ে আমি দেখলাম যে, সুন্দর যে শো পিছ টা ছিল সেটা ভেঙ্গে পরে আছে। আর আমি একটা ভয়ংকর বিষয় লক্ষ করলাম, মাটির সেই শো পিছটার ভেতরে গায়ে খুব শুক্ষ ভাবে ছোট করে কিছু লেখা আর কিছু প্রতীক খোদাই করা ছিল। আমি আমার মা কে গিফটের লেখা ও প্রতীক গুলির কথা খুলে বললাম। আর কে দিয়েছে সেটা ও বললাম। মা অবাক হলেন। আর রাগ করলেন আমার উপর। তিনি সেগুলো দেখতে চাইলেন আর দেখে অবাকও হলেন। কারণ তিনি স্থাপত্য বিদ্যার ওপর পড়াশুনা করেছেন। ঐদিকে সৌরভ, আজকে ফোন ধরছিল না। আমি ছাদে উঠে সৌরভকে ফোন দিলাম। কিন্তু খুব আশ্চর্য জনকভাবে এই প্রথম ওর নাম্বারটা রাতে বন্ধ পেলাম।
পরদিন মা একজন প্রতিবেশী বাড়ীওয়ালী কে ডেকে নিয়ে আসলেন। আর তিনি এসে সব রহস্যের জট খুলে দিলেন। তিনি লেখা আর প্রতীকগুলি দেখে সবকিছু বুঝতে পারলেন।
ঘটনাটি ভয়াবহ । সৌরভ আমার উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেছিল ওই ছোট্ট উপহারটির মাধ্যমে। আমার ঐ ভাই খেলতে গিয়ে ওটা ভেঙ্গে ফেলায় সে আমার ভাইয়ের ওপর প্রচণ্ড খেপে গিয়েছিলো। তারপর এমন কিছু ঘটেছিলো, তা আমার ভাই দেখে খুব ভয় পেয়েছিলো।
এরপর আমার মা আমাকে যেটা বলল, সেটা শুনে আমি একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মা বলল, এই ঘরটিতে কোনো ভাড়াটিয়াই টিকতে পারেনা। কারণ এটা একটি কবর স্থানের ওপর তুলেছে নতুন বাড়ীওয়ালারা। না, পাশের ঐ ছাদওয়ালা ঘরটায়। পুরনো বাড়ীওয়ালা কোথায় চলে গেছে, তাও কেউ বলতে পারছেনা। তবে পাশের এক বাড়ীওয়ালা জানালো, একটি ছেলে ভালোবাসতো, কাউকে, না পেয়ে সুইসাইড করেছিলো । তার কবর এই ঘর দুটোর নিচেই দিয়েছিলো। পরে নতুন বাড়ীওয়ালা বেশী লাভের আশায় ছাদওয়ালা ঘরটা তোলার পর পাশে এই টিনের চালওয়ালা ঘরটা উঠিয়েছিলো। তবে ছাদওয়ালা পাকা বাড়ীটা এখন খালিই পরে থাকে।
আমি বিশ্বাস করতে পারিনি, তাই আমি দৌড় দিয়ে ঐ ছাদওয়ালা ঘরের দরজায় যাই। আর সেখানে গিয়ে দেখি দরজায় তালা ঝুলছে। তাহলে কি আমি এতদিন ওটা দেখতে পাইনি? আমি এতদিন কিসের ঘোরের মধ্যেছিলাম আমি জানিনা। আমার ভাই এই যাত্রায় বেঁচে গেল। তারপরআমি আর কোনদিন ঐ নাম্বার খোলা পাইনি। পরে আমি কাস্টমার কেয়ারে যাই এবং অনেক কষ্ট করে জানতে পারি যে,এই নাম্বারে আসলেকোন user নেই ।
তবে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে লাগলো প্রতি রাতে। ঠিক চারটার সময়, কে যেনো হেটে চলে যেতো আমার টিনের চালের ওপর থেকে। টিনের ওপর হাটলে যে পায়ের চাপ পরে তা ঘরের নিচ থেকে দেখতাম টিনের ওপর। দৌড়ে বাইরে এসে, কাউকে দেখতে পেতাম না। রহস্য টা এখনো মনে গেথে আছে।
তার পরের মাসেই ঘর ছাড়লাম। কিন্তু রহস্যটা এখনো মন থেকে যায়নি। এখনো এক একটি নাম্বার থেকে ফোন পাই। এই নাম্বার গুলোর কোথাকার কোড, তাও বুঝতে পারিনা। তবে ফোন এলেই ভয় পাই। ভয় যায়নি এত বছর পরে…
বি:দ্র: কারো যদি বাড়ীটা দেখার আগ্রহ থাকে, আমাকে ইনবক্স করবেন। কারণ এটা সত্য ঘটনা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.