রাইকিশোরী

লেখকঃ প্রিন্স বাপ্পী

সে অনেকদিন অাগের কথা। তখন মুক্তাগাছায় রাজা অনিল অাচার্যের শাসনামল।রাজা বুড়ো হয়েছেন তাই তিনি মনোস্থির করলের তার কিছু হওয়ার অাগেই তার পুত্রকে সিংহাসনে বসাবেন।যেই ভাবা সেই কাজ।

খুব ঘটা করেই সম্পন্ন করলেন কুমার কিশোর অাচার্যের রাজ্যাভিষেক। দেবী চন্দ্রার সামনে ১০১ টা পাঠা বলির মাধ্যমে ও মহাভোজের অায়োজন শেষ করে কুমার কিশোরের রাজ্যাভিষেক শেষ করলেন।
এখন অার তিনি কুমার কিশোর না,এখন তিনি রাজা কিশোর অাচার্য।

তিনি অত্যন্ত দয়ালু,গরীব প্রজার জন্য তার মন কাঁদে। তার কাছে কেউ কোনো সাহায্য চাইতে এলে তিনি তাদের কখনো খালি হাতে ফিরান না।তিনি মন উজার করে দেন।
তার মন অত্যন্ত কোমল,কিন্তু অন্যায়ের কাছে তিনি কঠোরের তাইতেও কঠোর।
দেবী চন্দ্রা যেন তাকে নিজ হাতে অাপন মহিমা দিয়ে তাকে সৃষ্টি করেছেন।
যেমন তার গায়ের রঙ তেমনি তার অাপরূপ মুখশ্রী। তার বয়স ২৩।তার সুঠাম দেহ সকল রমনীদের ই নজর কাড়ে। তার গালে খোচা খোচা দাড়িতে তাকে অারো কামাক্ত লাগে।তিনি যখন খালি গায়ে ধূতি পরে হাতে লাল কাপড় পেঁচিয়ে লোমস বুক বের করে বহ্মপুত্র নদের ঘাটে স্নানে যান তখন সকলেই তার দিকে অপার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। অপরূপ রূপে সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায়। তার সুঠাম দেহের লোমশ বুক সকলের কামবাসনা জাগিয়ে তুলে।
তিনি মায়ের সান্নিধ্য লাভের জন্য প্রতি বাংলা মাসের প্রথম শনিবার ও শেষ শনিবারে অষ্টপ্রহরব্যাপী দেবী চন্দ্রার যজ্ঞানুষ্ঠান করেন।অার চৈত্র মাসে সে যজ্ঞ চলে ৭ দিন ব্যাপী।

দূর থেকে রাজা কিশোর কে সে দেখেছে কিন্তু কাছে গিয়ে দেখার সাহস হয় নি ওর।ওর স্বপ্নের পুরুষকে একবার কাছে থেকে দেখার জন্য বাবার কাছে বায়না ধরেছে : সে রাজবাড়ি দেখবে।
এই বায়না নিয়েই বাবার কাছে অার্জি করে ১৭ বছরের ছেলে রাই।
: বলো না বাবা অামাকে রাজবাড়ি দেখাবে।অামি কখনো রাজবাড়ির ভেতরে দেখি নি।বাইরে থেকেই যা দেখেছি।

এমন অার্জিতে বাবা রামমোহন একটু হচকিয়ে গেলেন।ছেলেকে খুশি দেখার জন্য বললেন
:অাচ্ছা বাবা,এবার চৈত্র মাসের যজ্ঞে তোকে সাথে করেই নিয়ে যাবো রাজবাড়িতে।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান রাইমোহন। সবাই ভালোবেসে রাই বলেই ডাকে।রাই এবার মুক্তাগাছা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেনীতে পড়ে।
রাইয়ের যখন বয়স ৪ বছর তখন তার মা চলে যায় না ফেরার দেশে।
কোলে পিঠে করে তার বাবা ও তার পিসি দেবী গৌরীবালা রাণী বড় করে তুলেন রাইকে।রাইয়ের মা মারা যাওয়ায় তার পিসি গৌরীবালা অার বিয়ে করে নি ভাইয়ের কষ্ট হবে বলে।সারাটা জীবন দেবী চন্দ্রার পূজা করে অার ভাইয়ের সংসারে কাটিয়ে দিলেন।রাইয়ের বাবার চোখে একরাশ স্বপ্ন যে রাই বড় হয়ে ডাক্তার হবে। গ্রামের দুঃখী মানুষদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবে। বিনা চিকিৎসায় রাইয়ের মায়ের মতো কাউকে মরতে দিবেন না। গরীব-দুঃখীর পাশে দাঁড়াবে তার রাই।
এই স্বপ্ন নিয়েই দিনকে দিন পার করে দেন রামমোহন।

রামমোহন এর মিষ্টির দোকান। তার মিষ্টি ছাড়া বার মাসের তের পার্বন জমেই না এই মুক্তাগাছার লোকদের।তার মিষ্টি এই এলাকার সেরা মিষ্টি। রাজবাড়ির মন্দিরে প্রতিদিন তিনি নিজ হাতে মিষ্টি দিয়ে অাসেন।এভাবেই তাদের দিন কাটতে ছিলো।

চৈত্র মাসের প্রথম দিক। দহ্মিনা বাতাস বইছে। গাছে গাছে অামের মুকুল। ফুলে ফুলে ভরে গেছে বৃহ্ম ।
নদে জল কমতে শুরু করেছে। চারদিকে উৎসবের সাজ সাজ রব।অার ২ দিন পরেই দেবী চন্দ্রার ৭ দিন ব্যাপী মহাযজ্ঞানুষ্ঠান। দেবী চন্দ্রাকে বরনের মধ্য দিয়েই এই যজ্ঞ শুরু হবে। রাইয়ের মনেও অানন্দের বান বইছে। সে এই প্রথম রাজ বাড়িতে যাবে।তার ভালবাসার মানুষ টিকে দুচোখ ভরে দেখতে পারবে। দেখতে পারবে সে তার ভালবাসার পুরুষটিকে।সে যানে, যে সে বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সে যানে তার ভালোবাসা কখনো পরিণতি পাবে না।তবুও সে মনে প্রানে রাজা কিশোরকে ভালবাসে।সে প্রতিদিন প্রভাতে ঘুম থেকে উঠে স্নান শেষে কিশোরের নামে দেবী চন্দ্রার কাছে পূজা দেয়। মনে মনে দেবীর কাছে বলে যেন কিশোর ভালো থাকে।
রাই তার মনে মনে কিশোরকে নিয়ে স্বপ্নের বিশাল পৃথিবী গড়ে তুলেছে।সে পৃথিবীতে বাস করে শধু রাই অার কিশোর অাচার্য।

অাস্তে অাস্তে যজ্ঞও চলে অাসতে থাকে। মনে মনে ঠিক করে সেও রাজপোশাক পরে রাজবাড়িতে যাবে। তাই তার বাবার সাথে নাসিরাবাদ (বর্তমানে ময়মনসিংহ) গিয়ে শেরওয়ানি,ধূতি অার নাগরাই কিনে অানে। রাই মনোস্থির করে দেবী চন্দ্রার যজ্ঞে ১০১ টা নীল পদ্ম অন্জলী দেবে।তারপর কিশোর অাচার্যর মুখ দর্শন করবে।

সকাল থেকেই রামমোহনের শরীরটা ভালো না। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগায় জ্বর জ্বর ভাব হচ্ছে।সন্ধ্যায় একেবারে জাঁকিয়েই জ্বর অাসে।

:কতোবার বললাম রোদ থাকতেই গোছল করো।তা না শুনে তুমি সেই সন্ধ্যাতেই গোছল করলে।অার এখন জ্বর বাঁধিয়ে ফেললে।

রামমোহন কথা বলে না চুপ করে থাকে অার মিটি মিটি হাসে।

:কাল রাজবাড়িতে যেতে হবে মিষ্টি নিয়ে সে কথা কি তোমার মনে অাছে??

এসব কথা বললে বলতে রাই বাবার মাথায় পানি ঢালতে থাকে।
কুনাল জেঠার দেওয়া জরিবটি এনে বাবাকে খাওয়ায়।

এদিকে অনেক কাজ পরে অাছে।সে মিষ্টির হাড়িগুলো অালতা দিয়ে সাজিয়ে রাখে। রেশমী সূতা দিয়ে হাড়ির মুখগুলো বেঁধে দিয়ে ঘুমোতে যায়।

কাল থেকেই অন্য রাজ্যের রাজা-রাজকুমার, অাত্নীয়-স্বজন, নিমন্ত্রিত অতিথিরা অাসতে শুরু করেন।যজ্ঞে সব প্রজার জন্য রাজদরবার খোলা।

খুব প্রভাতে বসন্তের কোকিল এর ডাকে রাইয়ের ঘুম ভেঙে যায়।
সে চন্দন অার গোলাপজল নিয়ে নদীতে যায় গোছল করতে।
অাজকের সকাল টা রাই এর কাছে খুব সুন্দর লাগতেছিলো।পাখির ডাক, ফুলের গন্ধ,হিমেল বাতাস সব মিলিয়ে সকালটা অন্য রকম সুন্দর লাগছে।সে নদীর ঘাটে বসে নদীর কলকাকলি শুনছে।গোছল শেষে সে দীঘি হতে ১০১ টা নীল পদ্ম তুলে নিল।তারপর বাড়িতে চলে এলো।রাই এর মন অানচান করছে কিশোর এর জন্য।সে সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারে নি। কখন সকাল হবে এই ভেবে ভেবে রাত পার করেছে।কখন কিশোরকে চোখের দেখা দেখবে। এসব ভাবতে ভাবতে বেলা বয়ে চললো।জানালা দিয়ে সূর্যের অালো মেঝেতে পড়লো।

[অাচ্ছা পাঠকবৃন্দ, ভালবাসা বুঝি এমন ই হয় ? শয়নে, স্বপনে কি শধু তাকেই দেখা যায়??তার জন্যই কি শধু মন অানচান করে??তাকে বুঝি কাছে পেতে মনে চায়? তার কথা শুনতে মন চায়?? ]

: রাই!কোথাই তুই?

বাবার ডাকে রাই এর হুস ফিরে অাসে।

:বাবা এই তো অামি।

রাই বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।জ্বর একটু কমেছে।

:বাবা যাও স্নান শেষ করে খাবার খেয়ে তৈরি হয়ে নাও।একটু পর রাজবাড়িতে যেতে হবে মিষ্টি নিয়ে।

পিসি নিজ হাতে ভাতিজা কে সাজিয়ে দিলেন।রাইকে চেনাই যাচ্ছিলো না যে, সে ময়ড়ার ছেলে। রাইকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে রাজপুত্র।

:পিসি অামাদের সাথে চলো না রাজবাড়িতে।অাজ ওই খানে অনেক মজা হবে।

:নারে বাবা।বাড়িতে অনেক কাজ। অার তোর নামে উপোস অাছি । যেন তোর স্বপ্ন সত্যি হয়। তোর চাওয়া পাওয়া যেন মা চন্দ্রা পূর্ন করে। এই বলে পিসি দেবী চন্দ্রার জয়ধ্বনি দিতে থাকে।

রাই পিসিকে জড়িয়ে ধরে, অানন্দে দুজনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। পিসিকে রাই সব বলেছে যে, সে রাজা কিশোর অাচার্যকে ভালোবাসে।পিসি জানে রাইয়ের সমমনার কথা।

:কিরে গৌরী তোদের হলো?অার কত দেরী হবে রাই কে সাজাতে? এদিকে বেলা যে বাড়তে থাকলো।

:এই তো দাদা হয়েছে।
এই বলেই পিসি রাই এর কপালে চুমু দিল।রাই অার রামমোহন মিষ্টি অার পদ্ম নিয়ে চললো রাজ বাড়ির দিকে।

রাজবাড়ির সিংহদ্বার দিয়ে তারা রাজবাড়িতে প্রবেশ করলো। মিষ্টি গুলো রাজমাতার কাছে দিয়ে তারা দেবী চন্দ্রার মন্দিরে প্রবেশ করতে যাবে তখনি পেছন থেকে রাজমাতা বললো

:রামমোহন। তোমার সাথে ছেলেটা কে?
:মা,ও অামার ছেলে। রাজবাড়ি দেখার ইচ্ছা ছিলো তাই নিয়ে এসেছি।
:অাহা! কি সুন্দর রূপ।কত গল্প শুনেছি তোমার বাবার মুখে।তোমার নাম কি বাছা?
:অামার নাম রাইমোহন। সবাই রাই বলেই ডাকে।

এই বলে সে রাজমাতাকে প্রনাম করে।

:বেঁচে থাকো বাবা।

এই কথা বলে রাজমাতা রাই এর গলায় মুক্তার মালা পরিয়ে দিলেন।

:এমন সুন্দর রূপ অার এমন সুন্দর সাজে কি মালা ছারা হয়।

রামমোহন বলে,
: মা অামি একটু অসুস্থ।রাইকে অাপনার কাছে রেখে গেলাম। অামি এবার যজ্ঞে থাকতে পারবো না। ওকে একটু রাজবাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাবেন।

: অাচ্ছা ঠিক অাছে রাম।তুমি নিশ্চিন্তে চলে যাও। রাই অামার সাথেই থাকবে অার অামার হাতে হাতে পূজার কাজ করে দিবে। তাই না রাই?

রাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।রামমোহন মন্দিরে মাকে প্রনাম জানিয়ে বাড়িতে চলে গেলো।রাই মাকে বরনের ডালা সাজিয়ে দিলো।রাজমাতাকে সে দিদু বলে ডাকে। দিদুর সাথে বরন ডালা নিয়ে রাই মন্দিরে প্রবেশ করে। মন্দিরে কোথায় কি লাগবে দিদু তা ঠিকঠাক করতে থাকে। এদিকে রায়ের চোখ একজনকেই খুজে চলেছে,,,,,,,

যজ্ঞের যোগার সব তৈরি মাকে বরনের মধ্য দিয়ে যজ্ঞ শুরু হবে। যজ্ঞের তিথী শুরু হয়েছে। চারদিকে শঙ্খ অার উলুধ্বনিতে মুখরিত হতে লাগলো। পুরোহিত গন মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন। দিদু ধান,দূর্বা,মিষ্টি দিয়ে মাকে বরন করে নিলেন। এসবের মধ্যে থেকে রাই কিশোরের কথা একপ্রকার ভুলেই গোলো। কিশোর অাচার্য অন্জলি দিতে মায়ের সামনে অাসলেন। হঠাৎ করেই রাই তাকে দেখে হচকিয়ে গেলো।সে বিশ্বাস করতেই পারতেছিলোনা যে কিশোর তার সামনে।কিশোরের রূপে মুগ্ধ হয়ে রাই অপার দৃষ্টিতে কিশোরের দিকে তাকিয়ে ছিলো। রাইয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরতে লাগলো।কী অপরূপ তার চাহনী,কথা বলার ধরন।যেন হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শঙ্খধ্বনি কানে অাসতেই রাই হুস ফিরে পায়। চোখের পানি মুছে সে একটা শঙ্খ নিয়ে বাজাতে থাকে।
কিশোরের অন্জলি দেওয়া শেষ হলে দিদু রাইকে অন্জলি দিতে বলে। সে ১০১ টা নীল পদ্ম দিয়ে দেবী চন্দ্রার অন্জলি দিতে দিতে গান গায়।

কিশোর রাইকে দেখে চমকে যায়। এই কি সে? যাকে সে নদীর ঘাটে স্নান করতে গিয়ে দেখেছিলো সবার ভিড়ে।কতই না খুজেছে তাকে কিন্তু পায় নি।কিন্তু সেদিন এর ছেলেটা অার অাজকের ছেলেটার মাঝে অনেক তফাৎ দেখতে পান। সেদিন এর ছেলে টা হয়তো কোনো প্রজার ছেলে হবে কিন্তু অাজ যাকে দেখতেছি সে তো কোন রাজকুমার হবে। একই দেখতে দুজন এ কিভাবে সম্ভব?
রাইকে প্রথম দেখেই সে ভালোবেসে ছিলো। কিন্তু তার তো নাম যানে না কিশোর। কোথায় থাকে তাও যানে না। ওকে কি অার কখনো খুজে পাবে কিশোর? এসব ভাবতে ভাবতে সে তার কহ্মে চলে গেলো।হঠাৎ দিদুনের গলা শোনা গেল।
:কিশোর দেখ কাকে নিয়ে এসেছি!
:কে দিদুন? কাকে নিয়ে এসেছো তুমি?
:অামাদের রামমোহনের ছেলে রাইকে। ওর ইচ্ছা রাজবাড়ি ঘুরে দেখার। তুই একটু ওকে ঘুরে নিয়ে দেখা। অামার তো সময় নাই। যজ্ঞের অায়োজন করতে হবে যে। রামমোহনের মুখে কতো শুনেছি ওর কথা কিন্তু চোখে দেখি নি। কী লহ্মীমন্তর ছেলে। অাহা!
:অাচ্ছা দিদুন তুমি ওকে রেখে যাও অামি ওকে ঘুরিয়ে নিয়ে দেখাবো।
:কিরে রাই লজ্জা পাচ্ছিছ কেনো? অায় ভেতরে অায়। অামি চল্লামরে। তোরা কথা বল।

দিদুন চলে যেতেই রাই ভেতরে অাসলো। একি এ যে সেই রাজপুত্র যাকে সে অন্জলির সময় দেখেছে । কিন্তু অাবার দিদু বললো যে এই রামমোহন কাকার ছেলে। তাহলে একেই কি সেদিন স্নানে দেখেছিল সে। এসব ভাবতে থাকে কিশোর।
রাই একটু লজ্জা পাচ্ছিলো। মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে অাছে। কিশোর দৌঁড়ে এসে রাই এর দুকাঁধে তার দুই হাত রাখলো। রাই কিশোরের স্পর্শ পেয়ে কিশোরের দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। কিশোরও রাইয়ের দুচোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে।সেদিন নদীর ঘাটে রাইকে দেখার পর কতইনা রাইকে খুঁজেছে সে। কিন্তু কোথাও পায় নি। অাজ সে সামনে দাঁড়িয়ে। দুজন দুজনকে প্রান ভরে দেখছিলো।

জানিনা,ওদের দুজনের শুভদৃষ্টিতে সেদিন অাকাশ হতে পুষ্পবৃষ্টি হয়েছিলো কিনা।জানিনা সেদিন দেবালয় হতে দেবতারা অাশির্বাদ করে ছিলো কি না? জানি সেদিন রাইকিশোরের চোখ দিয়ে অানন্দঅশ্রু ঝড়েছিলো।
এই অদ্ভুত ভালবাসার সাহ্মী হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি।

:দিদুন অামি চলে যাই। অনেক রাত হয়েছে।

:একি বলছিছ রাই?অাজ রাজবাড়িতেই থেকে যা। অনুষ্ঠান তো সবে শুরু হলো।অারো ৬ দিন বাকি।

:দিদুন তাতে কি হয়েছে অামি প্রতিদিন অাসবো। এরমাঝে অারেক দিন এসে থেকেও যাব।অাসলে অাজ বাবার শরীরটা ভালো নেই।

:অাচ্ছা ঠিক অাছে।কাল সকাল সকাল চলে অাসবি।

:অাচ্ছা দিদুন।

:অার হ্যাঁ!অাসার সময় তোর বাবার হাতের তৈরি চমচম অানতে ভূলিস না।চমচম অামার দাদু ভাইয়ের খুব প্রিয়।

:অাচ্ছা দিদুন।

:অার এতো রাতে একা কীভাবে যাবি? অামি কিশোরকে বলে দিচ্ছি তোকে রেখে অাসুক।

:না দিদুন রাজাবাবুর কষ্ট করতে হবে না।সারাদিনের খাটা খাটনিতে উনি খুব ক্লান্ত। অামি একাই যেতে পারবো।

:তা বললে হবে না অামি কিশোরকে ডেকে দিচ্ছি।

রাই অার না করতে পারলো না।কিশোরের সাথে রাইকে বিদায় দিলেন।দুজনে চাঁদনী রাতে নীর্জন রাস্তায় যাচ্ছে।কিন্তু কেউ কোনো কথা বলছে না। সব নিরবতা ভেঙে কিশোর ই প্রথম শুরু করলো।

:কি হয়েছে রাই তুমি কথা বলছো না কেনো?

:নাহ কিছু না।

:তোমারকি অামাকে পছন্দ হয় নি?

:একি বলছেন? অাপনি হলেন দেবতাতূল্য।অামি হলাম ময়রার ঘরের ছেলে। অাপনার অার অামার সম্পর্ক মিলবে না।তেলে জলে কখনো মিশে না।

:অামি তোমার জন্য রাজত্ব ছারতে পারি। তোমার ভালবেসে জীবন দিতে পারি।অামি যে তোমাকে ভালবাসি। তোমায় সেদিন নদীর ঘাটে দেখার পর অামি তোমায় কত খুঁজেছি কিন্তু পাই নি।অামি সেদিনের পর থেকে রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারি নি।
রাজা হয়ে নয়, একটি প্রেমিক হয়ে অামি তোমাকে ভালবাসতে চাই।তুমি কি পারবে না অামাকে ভালবাসতে?

রাই কিছু বলে না। রাই কিশোরের চোখ জলে কানাই কানাই পূর্ণ। রাই কিশোরকে জড়িয়ে ধরে। চিৎকারp দিয়ে বলে কিশোর অামিও তোমায় ভালবাসি, ভালবাসি। এই প্রথম দুজন দুজন কে অালিঙ্গন করলো।
কিশোর রাই এর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলো।রাইয়ের নরম হাতের স্পর্শে কিশোরের দেহ শিহরিত হলো।কিশোর রাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।এ যে অন্যরকম অনুভূতি। তা বলে বুঝানো যাবে না।এই মধুমিলনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে অার লিখতে পারছি না।

ভালই চলছিল দিন।এভাবে কেটেও গেল ৩ বছর। রাইকিশোরের প্রেমলীলাও চলছিলো চুপিচুপি। কিন্তু ওই যে, ভালবাসার পথে বাধা অাসবেই। সে অার বলার কি অাছে।বাধা না অাসলে তো অার ভালবাসা খাঁটি হয় না :)।
রাজ্যে হঠাৎ করে দেখা দিল খরা। খরায় নদী নালা খাল বিল পুকুর হ্মেত খোলা সব শুকিয়ে গেল। চার দিকে জলের জন্য হা হা কার। কোথাও এক ফোটা জলের দেখা নাই। রামমোহনের গরু গুলোও পানির অভাবে মারা যায়। তার সংসারেও নেমে অাসে দূর্ভিহ্ম।এই গরুই ছিল তার সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন। গরুর দুধ দিয়ে মিষ্টি বানিয়ে তা বিক্রি করে রামমোহনের সংসার চলতো।
কিন্তু এখন তো অার সংসার চলে না।রামমোহন কাজের জন্য এদিক সেদিক খুঁজাখুঁজি শরু করলেন। কিন্তু কোথাও কাজ পেলেন না।কারণ সবার ই এমন অবস্থা।
রামমোহন মনোস্থির করলেন পরিবার নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। কিন্তু কোথায় যাবেন? রাজ্যের সব জায়গাতেই তো এমন অবস্থা।

রাজ্যের এই অবস্থায় কিশোর অাচার্য রাজকোষ খুলে দিলেন কিন্তু তাও কিছুই হচ্ছে না। রাজকোষেও অর্থের সংকট দেখা দিল।

অনেকদিন হলো রাই এর সাথে কিশোরের দেখা হয় না। কেউ কারো খোঁজ যানে না। কিশোর অার অপেহ্মা করতে পারছে না।কারণ অপেহ্মায় ভালবাসার অাকাঙ্খা অারো বারে। কিশোর ছদ্মবেশে রাইয়ের খোঁজে রাই এর বাড়ির দিকে চললো। কিন্তু বাড়িতে এসে দেখা গেলো বাড়িতে তালা দেওয়া। কারো সারাশব্দ না পেয়ে অন্যবাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রাইরা চলে গেছে অন্য কোথাও।
কিশোরের মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়লো। কোথায় খুঁজবে রাইকে।কিশোর মনে মনে খুব ভেঙ্গে পড়লো।

রাজকাজে তার মন বসসে না। অন্য রাজ্য থেকে জলের ব্যবস্থা করে কোনো মতে জলের অভার পূরন করছে রাজ্যের মানুষ।অানেক লোক অান্যত্র চলে যাচ্ছে।

একদিকে রাজ্যের এই অবস্থা অার অন্য দিকে রাইয়ের ও খোঁজ মিলছে না।কিশোর কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না।সে দুচোখে অন্ধকার দেখছে।কিশোরের এমন অসহায় অবস্থায় বাইরের শত্রুরা তার রাজ্যে অাক্রমন করে।এতে কিশোরেরা জিতলেও অনেক হ্ময়হ্মতি হয়ে যায়।কিশোরের রাজত্ব টিকিয়ে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।কিশোরের যা অর্থ ছিলো তা দিয়ে রাজ্যে বড় বড় দীঘি খনন করে দিল। এতে খরা থেকে কিছুটা হলেও রহ্মা পাওয়া গেল।কিশোরের মনের এমন সংকাটাপন্ন অবস্থায় রাজ্যভার তার ছোটভাই কমল অাচার্যকে দিয়ে সে নীর্বাসনে যেতে চাইলো রাইয়ের খোঁজে।

কিশোর রাতে ঘুমের মধ্যে দেবী চন্দ্রার স্বপ্নাদেশ পেল

:কিশোর! তুই অামার পরমভক্ত। তোর উপাসনায় অামি সন্তুষ্ট। বল তুই কি বর চাস?

:মা! মাগো! তুমি এই অধম পূজারী কে দেখা দিলে।না মা অামার কিছু চাই না, তুমি শধু অামার রাইকে দেখাও।

:ঠিক অাছে তাই হবে। এই নে মায়া অায়না। এই অায়নাতে তুই যাকে দেখতে চাইবি তুই তাকেই দেখতে পারবি।

এই বলে দেবী চন্দ্রা মিলিয়ে যায়।কিশোরের ঘুম ভেঙে যায়।দেখে সকাল হয়ে গেছে। সে দেখে বিছানায় একটা অায়না পড়ে অাছে।কিশোর অায়নাতে রাইকে দেখতে চায়।
সে।অায়নাতে চোখ রাখতেই দেখে রাই এর ফুটফুটে সুন্দর চোখ।রাইকে দেখে কিশোরের মুখ অানন্দে ঝলমলিয়ে উঠে।কিশোর সাথে সাথেই বেড়িয়ে পড়ে রাইয়ের খোঁজে।মায়া অায়নার সাহায্যে সে পৌঁছে যায় রাইয়ের কাছে। কিশোরকে দেখে রাই একটু হচকিয়ে যায়। কিশোর রাইকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।

:তুমি অামাকে ফেলে এভাবে চলে এলে কেনো?

:রাজ্যে থাকতে কষ্ট হচ্ছিলো অার বাবার মিষ্টির দোকান টাও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সংসার চলছিলো না। তাই বাবা কাজ খুজতে এখানে এসেছে।

:তুমি যানো অামি তোমায় কত খুঁজেছি কিন্তু পাই নি। তোমার বাড়িতে গিয়ে দেখি তালা ঝুলানো। দেবী চন্দ্রার সাহায্যে অাবার তোমায় খুঁজে পেলাম।

:কিন্তু তুমি যানলে কীভাবে যে অামি এখানে?

:সে অনেক কথা পরে বলবো।

রাই কিশোরকে জড়িয়ে ধরে।এভাবেই কেটে যায় অনেক সময়

কিশোর রাইয়ের বাড়ির পাশেই একটা ঘর ভাড়া নেয়।কিশোর ছদ্মবেশে থাকে কারন যদি কেউ তাকে চিনতে না পারে। এভাবেই কেটে যায় অনেক দিন। কিশোর মায়া অায়নার সাহায্যে জানতে পারে যে রাজ্যের অবস্থা ভালো হয়ে গেছে। তখন কিশোর রাইকে রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। রাই তার বাবাকে বুঝিয়ে রাজ্যে চলে অাসে। কিশোর রাইকে ৪ টা গরু কিনে দেয় বাবাকে দেওয়ার জন্য, যেন তার বাবা অাবার মিষ্টির দোকান খুলতে পারে। রাই নিতে চাচ্ছিলো না কিন্তু কিশোর নাছোড়বান্দা সে দিয়েই ছারবে। অাবশেষে রাই নিতে বাধ্য হলো। এখন অার কিশোর রাজা না। কিশোর অার রাই এর এখন অবাধ মেলামেশা। কোনো ঝামেলা নাই। কোনো বাধা নাই। নদীর ঘাটে গাছের নিচে বসে কিশোর বাঁশি বাজায় অার রাই কিশোরের বুকে শুয়ে বাঁশির সুর শুনে। কখনো কাশবনে দুজনে লুকোচুরি খেলে।কখনোবা ঘাসের উপর শুয়ে দুজন ভেসে যায় প্রেম সাগরে।বিকালে নদীতে কিশোর নৌকা চালায় অার রাই কিশোরের বুকে শুয়ে শুয়ে অাকাশপানে চেয়ে থাকে অার ভাবে এমন জীবন যদি অাকাশের মতো বিশাল হতো তবে কতই না ভালো হতো,

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.