সত্য হলেও গল্প

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

স্বপ্ন দেখছিলাম। দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভাঙতেই মনে হল চোখ দুটি ভেজা। বিছানা ছেড়ে উঠে পানি খেলাম। পানি খেতেই ভেতরটা শান্ত হয়ে গেল। স্বপ্নটা ভুলে গেছি। ঘুম ভাঙতেই স্বপ্নটা কেমন উবে গেল। পাশের রুম থেকে ভাইয়া ভাবির কথা শোনা যাচ্ছে। তারা মনে হয় ঘুমায়নি। মোবাইলটা হাতে নিতেই খেয়াল করলাম রাত দেড়টা। নয়টার দিকে আমি শুয়ে ছিলাম।
আর ঘুম আসবে না। এখন সারা রাত জেগে কাটাতে হবে। আগে এমন হত না। এমনটা হয়েছে গত দুদিন হল। গত দুরাত ও একি দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। দুঃস্বপ্নটা মনে নেই। তবে স্বপ্নে আমি খুব কাঁদছিলাম, এটা মনে আছে।আমার উঠার শব্দ শুনে ভাবি পাশের রুম থেকে বের হয়ে এল। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।ভাবিকে দেখে ভেতরটা শান্ত হয়ে এল। কেমন যেন একটা ভয় মনে বাসা বেঁধে ছিল।এটা দূর হয়ে গেল। ভাবি মাথার চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল
-মুহিব,তোমাকে তোমার ভাইয়া ডাকছে।
বলেই ভাবি চলে গেল রান্না ঘরের দিকে। আমি ভাইয়ার রুমের দিকে পা বাড়ালাম।ভাইয়া খাচ্ছিল।আমাকে দেখে খাবার টেবিল থেকে উঠে ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে টাকাগুলো টেবিলে রাখতে রাখতে বলল
-সকালে বাজারে যাবি। আর তুর পছন্দমত বাজার করে আনবি। এখব যা আছে তা দিয়ে খেয়ে নে।
আমি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।উত্তর দিলাম না। কোন প্রশ্ন না করে চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম রাতে আমি খেয়েছি কি না। হঠাৎ মনে পড়লো রাতে আমি খায়নি। দুপুরে ও অল্প একটু মুখে দিয়ে চলে গিয়েছিলাম।ভাবি হয়তো ভাইয়াকে বলেছে যে আমি রান্নার জন্য খায়নি।

হাত একদম খালি। তাই কথা না বাড়িয়ে টাকাগুলো নিয়ে ভাইয়ার পাশেই খেতে বসে গেলাম। খেতে খেতে ভাইয়া জিজ্ঞেস করছিল রেজাল্ট কবে দিবে। আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক্সাম আর রেজাল্ট উভয় অনিশ্চিত। তাই উত্তর দিতে পারিনি।
আমার নাম মুহিব। গণিতে অনার্স লাস্ট ইয়ারের এক্সাম দিয়ে আপাতত অবসর।অবসর বলতে ঠিক অবসর না, একটা থিয়েটারের সাথে যুক্ত আছি। অভিনয়টা আজকাল নেশা হয়ে গেছে। তবে আমাদের এই ছোট শহরে অভিনয়ের ঠিক ততটা কদর নেই। তা নিয়ে আমাদের কোন আক্ষেপ ও নেই। থিয়েটার প্রধান জাবের ভাইয়া প্রায় একটা কথা বলেন
-অভিনয় দিয়ে যারা পেট চালাতে চায়, তাদের পেট হয়তো চলে যাবে কিন্তু অভিনয়টা বেশি দিন চলে না।
কথাটা,আর কেউ মানে কি না, তা জানি না। তবে আমি বেশ রকম মানি। শুধু তা নয়, জাবের ভাইয়ার প্রতিটা কথা আমি মানি। ওনি যদি বলেন, আমাকে একশো একটা নীল পদ্ম এনে ওনাকে পূজা করতে আমি তা ও করবো।
আমার বাবার স্মৃতি মনে নেই। মায়ের কথা স্পষ্ট মনে আছে। শেষের দিকে, মা যখন খুব অসুস্থ্য তখন আমি ক্লাস এইটের বৃত্তি পরিক্ষা দিচ্ছিলাম।পরিক্ষার ২য় দিন ই মা মারা গেলেন। আমি আর পরিক্ষা দেইনি। ভাইয়া তখন সবে ইন্টারমিডিয়েট পড়তো। গত দুবছর আগে ভাইয়া বিয়ে করে শহরে চলে এল।আমি মাঝে মধ্যে ভাইয়ার সাথে থাকি আবার মাঝে মধ্যে আপা দুলা ভাইয়ের সাথে। যাক সেই সব কথা। জীবনের সব কিছু সর্বদা নিজের ইচ্ছে মত যে চলবে তা কিন্তু নয়। জীবনের রূপ,রঙ আর স্বাদ প্রতিক্ষণে ক্ষণে বদলায়। সেই বদলে যাওয়া হয়তো চোখে পড়ে, হয়তো না।

জাবের ভাইয়ের বয়স ত্রিশ হবে। একটা বেসরকারি ফার্মে জব করেন। সারা সপ্তাহ টানা পরিশ্রম করতে হয়।শুক্র,শনি এই দুই দিন থাকে থিয়েটারের রিহার্সেল। সবাই সময় মত না এলে ও ওনি ঠিক ই এসে হাজির। আমি সব সময় চেষ্টা করি আগেভাগে এসে ওনাকে চমকে দিতে। কিন্তু প্রতিবার ই ব্যর্থ হয়। ওনার মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার গুণ যেটা তা হল আন্তরিকতা। ওনি সবার সাথেই আন্তরিক।রিহার্সেলে কেউ ভুল করলে ওনি হাসিহাসি মুখে বুঝিয়ে দেন, দেরিতে আসলে হাসি মুখে রাগ দেখান।
লোকটাকে আমি ভালবাসি। প্রচণ্ড রকম ভালবাসি। ওনি যখন আমার সামনে এসে দাঁড়ান তখন আমার ভেতরটাই কেমন কাঁপন ধরে যায়। ইচ্ছে করে তাকে জড়িয়ে ধরি।বুকে বুক মিলিয়ে বলি, আমি তাকে ভালবাসি।কিন্তু সব কথা মনে আসলে ও মুখে আসাটা খুব কঠিন।
আমরা আগামী বিশ তারিখ যে নাটকটা করবো তার নাম পদচিহ্ন। একটা ইংরেজি নাটকের বাংলা সংস্করণ। স্ক্রিপ্ট আর নির্দেশনা জাবের ভাইয়ার। আমি নাটকের নায়কের ছোট ভাই। নায়ক কিশোর দাদা আর নায়িকা ঝুমা। ঝুমাটা অভিনয় খুব ভাল পারে। কিশোর দাদার অভিনয় তেমন ভাল হচ্ছে না আজকাল। কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ঝুমা আর কিশোর দাদার মধ্যে চলছে। চলছে মানে, তারা প্রেম করছে। দে আর ইন রিলেশনশিপ। অবশ্য জাবের ভাইয়া বলেছেন এসব কথা নিয়ে যেন আর কেউ আলোচনা না করেন।আর কেউ না করুক, নিশো ঠিক ই করে। নিশো কুমিল্লার ছেলে। ওর স্বভাব ই হচ্ছে তিল কে তাল করার। কাচা তাল নয়, পাকা তাল।
জাবের ভাইয়া কয়েকদিন যাবত দাড়ি কাটছেন না।যার ফলে ওনাকে দেখতে আরো সুন্দর লাগছে।গতকাল ওনি একা একা বসে কী যেন ভাবছিলেন। আমি দূর থেকে দেখছিলাম। ওনার সুন্দর চেহারাটা আমার হৃদয়ে সুনামির তান্ডব শুরু করে দিচ্ছিল।আমার চোখ পানিতে ভরে উঠলো ওনাকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রনায়। কেন, এমন হয়? কেন, আমি তাকে যেভাবে চাই ওনি সেইভাবে চান না? কেন ইশ্বর।
সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন ভাবি। হাতে বাজারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে লম্বা লিস্ট দিয়ে দিল বাজার করতে।লিস্ট দেখে আমার মাথায় বাজ পড়লো। এত বাজার করতে করতে তো আমার সারাদিন লেগে যাবে। আজ শনিবার, দুইটা থেকে রিহার্সেল। আজকেই আমাদের শেষ রিহার্সেল। আগামী পরশু দিন, মঞ্চস্থ করতে হবে। আমি ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাওয়ার পথে জাবের ভাইয়ার সাথে দেখা। বাসা থেকে বের হতেই দেখি রিকসায় আমার স্বপ্নপুরুষ বসে আছে। আমাকে দেখেই এক গাল হেসে ডেকে বলল
-উঠে আয় মুহিব। এক সাথে যাই।
আমি রিকসায় উঠে গেলাম। রিকসায় উঠেই বুকটায় ধকধক করে কাঁপন হতে লাগলো। এই যে আমার পাশে লোকটা বসে আছে। একেবারে গাঁ ঘেষে। আমার ইচ্ছে করছিল, তার হাতটা ধরে বসে থাকতে।জাবের ভাইয়া কী জানি প্রশ্ন করছিলো। আমি অন্য মনস্কা হয়ে তার কথা ভাবছিলাম। খেয়াল করিনি দেখে আবার প্রশ্ন করলো,
-তুর, কী হয়ছে? আজকাল কেমন চুপচাপ থাকিস।
-কার?
-তুর
-না তো, কিছুই হয়নি।
-কিছু না হলেই ভাল।
তিনি অন্য দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। আমি তার দিকে দৃষ্টিবদ্ধ করে চেয়ে রইলাম। ভেতরে কে যেন বারবার বলছিল, তার গালে চুমু খা। যা হওয়ার হবে। আমি সাহস পায়নি।

লোকে অরণ্য হওয়া রাস্তা। ছি, এসব কী ভাবছি আমি।
দুজনে মিলে বাজার করলাম। ফেরার পথে একসাথে এলাম কিন্তু তেমন কোন কথা হয়নি। যাওয়ার আগে কেবল দুইটাই মুক্তাঙ্গনে থাকার কথা বলল। সে যাওয়ার পর, আমার ভেতরে শুরু হল দহন। গোসল করে ধপাস করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে রইলাম।আমার সামনে জাবেরকে পাওয়ার কোন পথ খোলা নেই।বাসা থেকে নিশ্চয় জাবের কে বিয়ের কথা বলা হচ্ছে। অতি শিগ্রী সে বিয়ে করে ফেলবে। আমার হৃদয়ে যেখানে তাকে বসিয়ে রেখেছিলাম সেখান থেকে রক্ত ক্ষরণ শুরু হবে। ভালবাসাটা গল্প,গল্প ই রয়ে যাবে। কারন আমার কোন দিন সাহস হবে না তাকে আমার মনের কথা বলার। ভালবাসি তা মুখ দিয়ে বের করতে পারবো বলে মনে হয় না।শত রাত, শত দিন এইভাবেই এক ভয়ানক যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

দুইটাই রিহার্সেলে গিয়ে দেখি সবাই কেমন মনমরা হয়ে বসে আছে। সবার মাথায় হাত। জাবের ভাইয়া একটু দূরে দু পা ছড়িয়ে উদাস হয়ে ফ্লোরে বসে আছেন। ঝুমা,নিশো,টগর,কাসফিহা আর বাকিরা সবাই যে যার মত বসে । নেই এর মধ্যে নেই কেবল কিশোর দা। মনটা কু ডাক ডেকে উঠলো। কোন ঝামেলা হয়নি তো?
হ্যা,ঝামেলা ই হয়েছে। কিশোর দার প্রেম প্রস্তাব ঝুমা প্রত্যাখ্যান করায় ওনি নাটক করবেন না বলে সোজা কলকাতা চলে গেছেন। ওনি ছিলেন নাটকের মূল চরিত্র। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। জাবের ভাইয়ার চোখসহ আমাদের সবার চোখে অন্ধকার। এই প্রথম আমাদের সব টিকেট বিক্রি হয়েছিল। আর এই প্রথম এত বড় নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল। কাল বাদে পড়শু অনুষ্ঠান। কী হবে ভাবতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। জাবের ভাইয়ার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
আমি বসে ছিলাম ঝুমার সাথে। কিশোর দাদাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ, জাবের ভাইয়ার গলা শোনা গেল।
-আস তোমরা, রিহার্সেল শুরু করি।
নিশো প্রশ্ন করলো
-কিন্তু ভাইয়া, নায়ক।
-নায়ক পেয়েছি।
আমরা সবাই ছুটে গেলাম ভাইয়ার দিকে। টগর বলল
-নায়ক কে তাহলে?
আমাকে অবাক করে দিয়ে জাবের ভাইয়া বলল
-মুহিব নায়ক হবে আর আনোয়ার হবে ছোট ভাই।
আমি ভয় ভয় চোখে প্রশ্ন করলাম
-কিন্তু, ভাইয়া আমি তো পারবো না।
-পারবে বলেই তুকে দিয়েছি। কারো কোন আপত্তি আছে?
সবাই একমত ছিল। আমার ও উপায় নেই।প্রথমবারের মত মূল চরিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছি। বারবার ভুল করছিলাম।সবাই ধরে ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছে। ভরসা কেবল ঝুমা,হয়তো ওর ভাল অভিনয়ে আমার খারাপ অভিনয় ঢাকা পড়ে যাবে।
রেহার্সেলে গন্ডগোলের আরেকটা কারন ছিল। আমাকে ধরে ধরে বুঝাতে গিয়ে জাবের ভাইয়া যখন বুঝাতে আসতো তখন আমার দম বন্ধ হয়ে যেত,কলিজায় কাঁপন উঠতো। হাতের প্রতিটি ছোঁয়ায়,তার নিশ্বাসের শব্দে, তার দেহের ঘ্রাণে আমি সব গুলিয়ে দিতাম।
অনুষ্ঠানের দিন সবার মনে ভয়। লোকে লোকারণ্য মুক্তাঙ্গন। এত মানুষ আসবে ভাবিনি। আনন্দে জাবের ভাইয়ার চোখে পানি আসার উপক্রম। ইশ্বরের কৃপায় সবাই ঠিকঠাক অভিনয় করতে পারলেই হল। মান থাকে। নাহলে এতগুলো লোকের আগমন অহেতুকে পরিণত হবে।

নাটক শুরু হল। দম বন্ধ করে সবাই সবার সবচেয়ে ভালটা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। দেড় ঘন্টার মঞ্চে সবাই দারুন করেছিল। আমরা যে খুব ভাল অভিনয় করেছিলাম তার প্রমাণ পেয়েছি লোকের হাততালি আর হর্ষধবনিতে।
ড্রেসাপ রুমে আমরা সবাই। জাবের ভাইয়া আসলো। এসোই পাগলের মত আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি একটা কথা ও বলতে পারিনি। এত ভালবাসা নিয়ে এই প্রথম কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরলো। সবাই প্রসংসায় পঞ্চমুখ। আমি লজ্জায় লাল নীল হচ্ছিলাম।জাবের ভাইয়া আনন্দে ওয়াদা করে বলল
-চা, তুই কি চাইবি। তুই যা চাইবি আজ তাই পাবি।
আমি সাত পাঁচ না ভেবে বললাম
-যা চাইবো, সব ই পাবো?
-চেয়ে ই দেখ না।
-আজ নয়, আরেকদিন।
-কোন দিন?
-যে দিন সময় হবে।
আমি বের হয়ে এলাম। জাবের ভাইকে খেয়াল করলাম বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ধেৎ, এত বড় একটা আনন্দের দিনে তার মন খারাপ করে দেওয়া উচিত হয়নি।
এর দু একদিন পরে, রাত প্রায় শেষ। আমি ফোনের শব্দে জেগে উঠলাম।ওপাশ থেকে পুরুষালী ভরাট কন্ঠ। বুঝায় যাচ্ছে সারা রাত ঘুমায়নি। হ্যালো করার সাথে সাথেই সে বলল
-তুই কি আমাকে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছিস নাকি?
-কে আপনি?
-তুর জাবের ভাইয়া
জাবের ভাইয়া! এত রাতে! আমার গলা শুকিয়ে গেল?কোনভাবে বললাম
-জাবের ভাইয়া?কী বলছো এসব?
-তুই বাসা থেকে বের হয়ে এখন সোজা তিন রাস্তার মোড়ে আয়। কথা আছে।
-ভোর হোক।
-ভোর হয়ে যাবে। দ্রুত চলে আয়।
আমি উঠে টি শার্টটা পড়ে বের হয়ে তিন রাস্তার মুড়ে যেতেই দেখি সে দাঁড়িয়ে। নিরব রাস্তা, ভোরের আলো সবে ফোটতে শুরু করেছে, পাখিদের কিচিরমিচির, নির্ঘুমে তার চোখ ফোলে লাল হয়ে আছে। আমাকে দেখেই মৃত একটা মুচকি হাসি দিল। বাঃ কি চমৎকার দেব পুরুষ। ইচ্ছে করছিল ছোটে গিয়ে তাকিয়ে জড়িয়ে ধরি।
কাছে গেলাম কাঁপা কাঁপা পায়ে। তার কাছে যেতেই সে আমার হাত ধরে টেনে পাশে একটা টুলে বসাতে বসাতে বলল
-সারা রাত ধরে ভেবে ও পাচ্ছি না কী করবো। তুই একটা সাজেশন দে তো।
আমি অবাক হয়ে তাকে আগে দেখে নিলাম। আহাঃ,আমার রাজপুত্রের এই করুণ দশা সারা রাত ভেবে ভেবে। এত রূপ তার,এত সৌন্দর্য। আমার হৃদয় যে তার হাতটা ধরার জন্য কাঁপতেছে। ইশ্বর,এত ভাল তাকে আমি কেন বাসি?
উত্তর দিলাম
-কী হয়ছে তোমার? এত উদভ্রান্তের মত ব্যবহার কেন আজ?
-বাসা থেকে বিয়ের জন্য প্রেসার দিচ্ছে। মেয়ে দেখা ফাইনাল। আমি হ্যা বললেই হ্যা।বুঝতে পারতেছি না কী করবো। তুই বল।
কথাটা আমার কানে মৃতের প্রতিধ্বনি হয়ে বাজলো। মনে হল ঘূর্ণীয়মান পৃথিবীতে আমি একা হয়ে গেছি। জড়তায়, আড়ষ্টতায় আমার ভেতরটা শীতের মৃত উদ্ভিদের মত হয়ে গেল। আমি মুখে সুখের ছায়া এনে বললাম
-করে ফেলেন।
বলেই হাঁটা ধরলাম।বসে থাকার শক্তি আমার ছিল না।পা কাঁপতে লাগলো। পিছনে তাকানোর ইচ্ছে ছিল, মনটাকে আটকে রাখলাম।পেয়ে হারানোর সুখ আছে কিন্তু না পেয়ে হারিয়ে যাওয়ার দুঃখের ভারটা নিয়ে এক পা ও এগুতে পারছি না। আজ ভোরটা আমার কাছে রাত্রি হয়ে ধরা দিয়েছে।

বাসায় ফিরে আর কিছু ভাল লাগছিল না। আপাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলাম আমি আসছি। ভাবিকে দু একটা কথা বলেই গ্রামের পথ ধরলাম।সে বিয়ে করুক, সুখি হোক। আমি ভাল থাকি আমার ভালবাসায়। পেতে ই যে হবে তা নয়, হারানোর ও সুখ আছে। দেখি না, সেই সুখটা খোঁজে পাই কি না। চোখে পানিতে ভরে উঠলো। কাঁদার উৎসটা এত বিশাল ছিল যে, কান্না শুরু করলে থামানো যেতো না।

তাই, নিজেকে সামলে আপার বাসায় গিয়ে উঠলাম।
বিকেলে গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা। ভেতরে তখন বিরহের সুনামি। এক সপ্তাহ হল আপার বাসায়। সারাক্ষণ ভেতর থেকে জাবের নামের যে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা অন্তরে রক্তক্ষরণ শুরু করেছে। পুকুর পাড়ে বসে হাসগুলোর সাঁতার কাটা দেখছিলাম।হঠাৎ,আপা পাশে এসে দাঁড়ালো।আচমকা গম্ভীর কন্ঠে বলল
-তুর সাথে কে জানি দেখা করতে এসেছে। আয় তো।
আমি কথা না বলে আপাকে অনুসরণ করলাম।
বাড়ির ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেলাম জাবের ভাইয়া বসে আছে। ভেতরটা কেমন করে উঠলো। সে এসেছে? কেন আসলো? বিয়ের দাওয়াত দিতে নিশ্চয়।চোখ পানিতে ভরে উঠলো। এত বড় শাস্তিটা সে আমাকে না দিলে ও পারতো। আমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখ মুখ শুকনো। মুখটা কালো হয়ে আছে, চোখের নিচে কালো দাগ, দাড়ি বেড়ে গেছে, মাথার চুল বেমানান বেড়ে গেছে। শরীর পাতলা হয়ে গেছে।হঠাৎ এই করুণ অবস্থা কেন তার? সে কি ভাল নেই? আমাকে দেখে হাসার চেষ্টা করলো। সেই হাসিটা যে মৃত তা স্পষ্ট ছিল। আমি কাছে গিয়ে, মিথ্যা ভাল থাকার ভান করে বললাম
-আরে জাবের ভাইয়া যে, বিয়ের দাওয়াত দিতে এসেছো নিশ্চয়।তা কেমন আছো?
সে উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল
-বাহিরে কোথাও চলতো। কথা আছে।
-আসো। বাহিরে ই যাই।
আমি আর সে গ্রামের পুর্ব দিকে গেলাম।জায়গাটা নিরিবিলি,চারদিকে শিমুল তুলা গাছ, বসন্ত কালের হালকা মৃদ বাতাস, আর গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির। আমি আর সে হাঁটছি। দুজনেই নিরব। কথা বলল সে
-ঐদিন হুট করে চলে এলি। একবার খবর ও নিলি না কেমন আছি।কেন মুহিব?
আমি অভিমান স্বরে উত্তর দিলাম
-আমি কেন খবর নিব? আর কোন খবর নিব, কবে বিয়ে করছো সেই খবর?
সে আহত কন্ঠে উত্তর দিল
-আমি বিয়ে করছি না।
আমি ফিরে তাকালাম। তার চোখ ছলছলে। এক্ষণি কেঁদে দিবে এই অবস্থা।মৃদ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম?
-কেন?
-তুই জানিস না?
-আমি কেন জানবো?
আমার উত্তর শুনে সে আহত হয়ে চেয়ে রইলো। আমার চোখে তার চোখ আটকে। দুজনের চোখেই সমুদ্র সমামন জল ছলছল করতেছিল। হঠাৎ সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল
-আমি তুকে ছাড়া থাকতে পারি না, মুহিব।
আমি জিজ্ঞেস করলাম
-কেন?
-তুই বুঝিস না?
-না
সে কিছুক্ষণ এইভাবে ই জড়িয়ে ধরে একপর্যায়ে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল
-আমি তুকে ভালবাসি মুহিব।

কথাটা আমার কানে মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্রের মত লাগলো। মনে হল এই বসন্তে, এই সুন্দর কোমল সকালে, এই পাখি ডাকা ভোরে, লাল শিমুল বাগানে, কোকিলের শব্দে আমার ভালবাসার কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আমি চিৎকার করে গলা ছেড়ে বললাম,
-সত্য তুমি আমায় ভালবাস? আমাকে ছাড়া আর কাউকে তোমার জীবনে আসতে দিবে না? সত্য?
সে আমার কপালে, ঠোটে, গালে, গলায় চুমু খেয়ে বলল
-গত এক বছর ধরেই তো তুকে ভালবাসি। তুই বুঝিসনি।
আমি আবেগে তার ঠোটে চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চাদের মত কেঁদে দিলাম।
আজ এই বসন্ত আমাকে আমার ভালবাসা পেয়ে দিয়েছি।এত ফুল,এত পাখির গান,এত আগুন লাগা মৃদ বায়ু আর এই প্রকৃতি যেন আমাদের মিলনের জন্য ই প্রস্তুতি নিচ্ছিল।আমি আজ সুখি। এত সুখি যে ইচ্ছে করছিল এইভাবেই তাকে জড়িয়ে ধরে বাকি জীবন বেঁচে থাকি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.