সন্ধি ও একটি প্রেমের গল্প

লেখকঃ নীল মেঘ

১। আজকে রাহুলের জন্মদিন।
ক্যালেন্ডারের পাতায় এই দিনটিকে এতদিন লালকালিতে গোলচিহ্নিত করে রেখেছিল পিয়া।আজ এসেছে সেই দিনটি জীবিত হয়ে ধরা দিবার ক্ষণ।
শিডিউল খাতায় আগে থেকেই আজকের দিনটি ফাঁকা রেখেছে পিয়া,হাতে কোন কাজ রাখেনি।কাজের লোকদেরও আজকের জন্য ছুটি দিয়ে নিজের মত করে ঘর সাজিয়েছে,রান্নাবান্না সব নিজেই করেছে।

আজকে রাহুলকে সে তার ভেতরের এতদিনের লালিত সব কথা বলবে আর ওকে কথাগুলো বলতে এরকম পরিবেশেরই দরকার।যেখানে সে আর রাহুল ছাড়া আর কেউ থাকবেনা।

সন্ধ্যা ৬টা বাজে।
রাহুল আসতে আরও ঘণ্টা-খানিক সময় বাকি আছে।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে পিয়া নিজেকে দেখছে।আজকে তার কোথায় থাকার কথা আর সে আছে কোথায়!

ছোটবেলায় বাবা মারা যাবার পর চাচারা সবকিছু নিজেদের নামে করে তাদের মা-মেয়েকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
পিয়াকে নিয়ে তার মা সালমা তখন উঠেন একমাত্র আশ্রয় ভাইয়ের বাসায়।সেখানে আসার ছয়মাসের মাথায় মামা মাকে অন্যজায়গায় বিয়ে দিয়ে দেন।অভিমানে দুঃখে সেদিন কলপারে অনেক কেঁদেছিল পিয়া,বাবার মৃত্যুতেও এতোটা কাঁদেনি।তার সব অভিমান ছিল মায়ের উপর,মা কেন কোন প্রতিবাদ করেননি।
মায়ের নতুন সংসারে পিয়ার জায়গা না হলেও মামীর সংসারে বাঁধা ঝি হিসেবে তার জায়গা অনায়াসেই হয়ে গেল।মামার ছেলেমেয়েরা কিন্ডারগার্টেনে গেলেও মামীর নিষেধ সত্বেও মামার অসীম দয়ায় তার নাম উঠল সরকারী পাঠশালায় খাতায়।স্কুল থেকে আসার পরেই শুরু হত মামীর নিপীড়ন।মামীর জমানো সারাদিনের কাজ স্কুল থেকে এসে সারতে হত,তাতে একটু এদিক সেদিক হলে মামীর চড়থাপ্পড়তো আছেই।এরই মধ্যে একদিন মামা সবাইকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন,সেই থেকে মায়ের সাথেও যোগাযোগ বন্ধ।

এরকম করে অনেক কাঠখড় পেরিয়ে পিয়া যখন ভার্সিটিতে পা রাখল তখনই মামা মামীর প্ররোচনায় তার অফিসের বসের সাথে পিয়ার বিয়ে ঠিক করলেন।
পিয়া যখন এ বিয়েতে ঘোর আপত্তি জানালো তখন মামী বললেন,যদি বিয়ে না করিস তাইলে এ বাড়ি থেকে চলে যা।তারপর কদিন এ বান্ধবীর বাসায় কদিন ও বান্ধবীর বাসায় করে করে একসময় ভার্সিটির হোস্টেলে সীট পেল সে।টিউশনি আর বন্ধুদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে করে কোনমতে পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছিল।এরমধ্যে একদিন এক বন্ধু তার মাথায় মডেলিংয়ের ভূত ঢুকিয়ে দিল।

তারপর থেকে শুরু হল ছবি নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থায় ধর্না দেয়া।
কিন্তু সবাই মেধা দেখার আগে গোপন কক্ষে নিয়ে শরীর দেখতেই বেশি আগ্রহী ছিল।
একসময় পিয়া যখন ঠিক করল যে করেই হোক লক্ষে তাকে পৌঁছাতেই হবে।সেজন্য শরীরকে যদি লক্ষে পৌঁছাবার মই হিসেবে ব্যবহার করতে হয় করবে।সেভাবেই নিজেকে তৈরি করে একদিন সে রাহুলের অফিসে গেল।
পিয়াকে অবাক করে দিয়ে রাহুল ওদের নতুন প্রোডাক্টের মডেল হিসেবে ওকে সিলেক্ট করল কোনরকম শরীরের বিনিময় ছাড়াই।
তারপর থেকে পিয়াকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
প্রথম বিজ্ঞাপনটা হিট হওয়ায় এরপর তার কাছে একের পর এক ভাল ভাল বিজ্ঞাপনের অফার আসতে শুরু করে।

আজ সে দেশের একজন নামকরা মডেল।সম্প্রতি সে বড় বাজেটের একটি চলচ্চিত্রের কাজও শেষ করেছে যেটা এখন মুক্তির অপেক্ষায়।
আর এই সব কিছু হয়েছে একমাত্র রাহুলের জন্য।রাহুল যদি তাকে প্রথম সুযোগটা না দিত তাহলে হয়ত সে আজ এত দূর আসতে পারত না।
সেই থেকে কাজের সুবাধে রাহুলের সাথে টুকটাক আলাপ দেখা সাক্ষাত।একসময় সেই টুকটাক আলাপ দেখা সাক্ষাত রূপ নিল বন্ধুত্বে।তারপর সময় পেলেই দুজনের একসাথে ঘুরে বেড়ানো,আড্ডা দেয়া।
রাহুলের সাথে সময় কাটিয়ে তাকে আরো কাছ থেকে দেখে তার সততা,ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে ছোটবেলা থেকে ভালবাসায় অবহেলিত মেয়েটির তার প্রেমে পড়তে সময় লাগেনি।
সেই থেকে রাহুলের জন্য ভালবাসা নিজের মধ্যে গোপন রেখে আসছে পিয়া যেটার গোপনীয়তার সমাপ্তি আজ হতে চলছে।

২।

রাহুল শহরে থাকলেও তার মা রহিমা খাতুন গ্রামের বাড়িতেই থাকেন।
অনেক চেষ্টা করেও ছেলে যখন মাকে শহরে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবার জন্য রাজী করতে পারেনি তখন দুজন কাজের মানুষ রেখে দিয়েছে যাদের মধ্যে একটা মেয়েকে বলে দিয়েছে সবসময় যেন মায়ের সাথে-সাথেই থাকে।
রহিমা খাতুনের কথা একটাই,আগে বিয়ে কর।বিয়ে না করলে সারাদিন তুই অফিসে থাকবি আর আমি একা একা চাকরবাকরদের সাথে ওই বদ্ধ ঘরে থাকব সেটা কখনও আমি পারবনা।
আজকে ছেলের জন্মদিন।
এই দিনটি ছেলে সারাদিন মায়ের সাথে কাটায়।
ছেলের সব পছন্দের খাবার তিনি নিজের হাতে বানিয়ে রেখেছেন।
রহিমা খাতুন ঘরে বসে বসে ছেলের কথা ভাবছেন।রাহুলের সমবয়সী প্রায় সবাই বিয়ে করে এখন দিব্যি সংসার করছে আর তার ছেলের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে অথচ কোনভাবেই ছেলেকে বিয়ে করাতে রাজী করতে পারছেন না।এটা নিয়ে রহিমা খাতুনের চিন্তার অন্ত নাই,বলতে গেলে এটাই তার এখন একমাত্র চিন্তা।
এদিকে গ্রামের লোকেরাও আড়ালে আবডালে নানা কথা বলছে যেগুলো শুনলেই মন খারাপ হয়ে যায়।এবার যে করেই হোক ওকে বিয়ে করতে রাজী করাতে হবে।তাছাড়া তার নিজেরও অনেক বয়স হয়েছে,এই বয়সে কোন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা না চান নাতিনাতনির সাথে হেসে-খেলে দিন পার করতে।

উঠোনে গাড়ির হর্ন শুনে রহিমা খাতুন বারান্দায় এসে দেখেন ছেলে চলে এসেছে।
-কেমন আছো মা?
-ভাল আছি বাবা,তুই কেমন আছিস?
-আমি আমার মায়ের কাছে এসে কি খারাপ থাকতে পারি।
-মুখচোখ শুকিয়ে কি অবস্থা হইছে তোর,ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করিসনা না?
-মা আগের চেয়ে আমার ওজন দুই কেজি বাড়ছে আর তুমি বলছ শুকিয়ে গেছি!
-তোদের ওসব মেশিন ভুলভাল বলে বুঝলি।
-হাহাহা…

গ্রামে শহর থেকে কেউ আসলে পারা-প্রতিবেশীরা সবাই দেখতে আসে।
রাহুল গ্রামে আসার সময় শহরের কোন না কোন খাবার নিয়ে আসে যেটা গ্রামে পাওয়া যায়না।এই যেমন এবার পুরান ঢাকার বাকড়খানি নিয়ে এসেছে।যারা দেখতে আসে তাদেরকে রাহুলের আনা খাবার পরিবেশন করা হয়।খাবারের জন্য কিংবা হতে পারে রাহুলকে ভালবাসার জন্য সে আসার পর পাড়া প্রতিবেশীর ঢল যেন একটু বেশিই নামে।
প্রতিবেশীরা প্রায় সবাই এসে এসে দেখে গেছেন।
বারান্দায় মায়ের সাথে বসে রাহুল গল্প করে করে পিঠা খাচ্ছে।
রহিমা খাতুন ছেলেকে বিয়ের কথা বলতে যাবেন এমন সময় পাশের বাড়ির কাকী এলেন।
-ভাল সময় এসেছেন কাকী,নিন পিঠা খান।বলল রাহুল
কাকী একটা পিঠা নিয়ে বললেন,তা কদিন থাকছ এবার?
-বিকেলেই ফিরব কাকী,অনেক কাজ রেখে এসেছি।
-তা এবার বিয়ে-টিয়ে কর,এভাবে মাকে আর কতদিন একা রাখবে।
সুযোগ পেয়ে রহিমা খাতুন এবার মুখ খুললেন,সে কথাই তো ওরে বলতে যাচ্ছিলাম।
রাহুল মনেমনে ভাবছে এই শুরু হল।একজনেরটা শুনার প্রস্তুতি নিয়ে আসছি এখন বোনাস হিসেবে দুইজনেরটা শুনতে হচ্ছে।

কাকী আবার বলা শুরু বললেন,সেজন্যই বলি ছেলেদের শহরে না পাঠানোই ভাল।ওখানে হাতের কাছেই সবকিছু পেয়ে যায় বিয়ের আর কি দরকার।
কাকী যে এরকম একটা খারাপ ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলবেন রাহুল কল্পনাও করেনি।মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে মার মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেছে।
রাহুল একটু থেমে বলল,তা কাকী রিপন ভাই কেমন আছেন?ভাবি বাচ্চা ভাল তো?
-আছে বাবা ভাল,মেয়েটা তো এবার স্কুলে ভর্তি হল।
-ও তাই,কি নাম ওর?
-টুনি।
-আচ্ছা কাকী গতবার যে এসে শুনছিলাম রিপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে আপনাদের কাজের মেয়ে চেয়ারম্যানের কাছে কি সব নালিশ করছিল,সেটা নিয়ে তো সালিশও হয়েছিল গ্রামে।তা কাকী সেই ঝামেলা কি মিটছে?
কাকী মনে হয় বুঝতেই পারেননি রাহুল এরকম একটা তীর ছুঁড়বে তার দিকে।রাহুলের কথা উনি শুনেনই নি এরকম ভাব করে ‘আমি গেলাম ভাবী,অনেক কাজ ফেলে এসেছি’ বলেই উঠে গেলেন।

কাকী যাবার পর রহিমা খাতুন বললেন,এভাবে আর কতজনের মুখ বন্ধ করবি?তুই তো চলে যাবি কিন্তু গ্রামের লোকদের বাঁকা বাঁকা কথা আমাকেই শুনতেই হবে।
-মা ওদের কথায় কান না দিলেই হয়।
-কান না দিলেও কথা কানে আসতে সময় লাগেনা।তোর দোহাই লাগে এবার একটা বিয়ে কর।আর তোর যদি কোন পছন্দের মেয়ে থেকে থাকে তবে তাকেই বিয়ে কর।সেই মেয়ে বোবাকালা,কানাখোঁড়া যাই হোক আমি কোন আপত্তি করবনা।
-মা আজকালকার মেয়েগুলাকে তুমি জানো না,ওরা বিয়ের পরপরই স্বামীকে আলাদা করে ফেলতে চায়।আমি তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাই না।
-ওহ তাইলে আমার জন্যই তুই বিয়ে করছিস না।আমি মরে গেলে করবি?
-মা এসব কি বলছ?
-আমি ঠিকই বলছি।তুই যদি বিয়ে না করিস তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি,আমি মরে গিয়েও যদি আমার ছেলেকে সংসারী করতে পারি তাহলে মরণই ভাল।
কথাবার্তা যে এরকম একটা দিকে মোড় নিবে রাহুল চিন্তাও করেনি।আকস্মিক মায়ের এরকম কথায় তার মুখে কোন কথাও ফুটল না।
আসার সময় মাকে বলে আসল তাকে কিছুদিন সময় দিতে সে বিয়ে করবে।রহিমা খাতুন যে ছেলের কথায় খুব একটা আশ্বস্ত হলেন সেটা তার মেঘে ঢাকা মুখ দেখে বুঝা গেল না।

৩।

অনেকদিন পর পিয়া আজ শাড়ি পরেছে।খোলা চুলে কমলা রঙয়ের তাঁতের শাড়িতে দেখে তাকে একেবারে আটপৌরে গৃহিণী মনে হচ্ছে।অপরিচিত কেউ দেখলে বুঝবেই না সে দেশের সব ছেলেদের বুকের কাঁপন তোলা মডেলকন্যা পিয়া আহমেদ।
বেল বাজছে।
পিয়া দরজা খুলে দেখল রাহুল এসেছে।
-শুভ জন্মদিন রাহুল।
-থ্যাঙ্কস,বাহ তোমাকে তো বেশ গিন্নী গিন্নী লাগছে।শুধু একটা জিনিসের অভাব চোখে পড়ছে।
-কি?
-কপালের টিপ।
-তুমি বস,আমি এক্ষুনি সেই অভাব পূরণ করে আসছি।
-হা হা হা।

রাহুল বসে বসে ভাবছে পিয়াকে আজ তার সব কথা খুলে বলবে।এই শহরে একমাত্র পিয়াই তার এমন বন্ধু যাকে নির্ভয়ে সব খুলে বলা যায়।নিজের মধ্যে নিজেকে পোষে রাখতে সে আর পারছেনা।
তার মনে হচ্ছে সে ক্লান্ত বিধ্বস্ত কোন পথিক যে তপ্ত মরুর বুকে ছায়া নাই জেনেও মিথ্যে আশায় আছে সামনে হয়ত কোন ছায়াবৃক্ষ তার পত্র-পল্লব মেলে আছে।
-এই নাও তোমার চা।এখন দেখ সম্পূর্ণা লাগছে কি না?
-পিয়া বস,তোমাকে আজ আমার একান্ত কিছু কথা বলতে চাই।এমন কিছু যেটা শুনে হয়ত তুমি আমাকে আর বন্ধু ভাবতে নাও পারো।
পিয়া ভাবছিল রাহুলকে সে আজ তার ভালবাসার কথা বলবে কিন্তু এখন রাহুলের কথা শুনে মনে হল তার আগে রাহুলই তাকে প্রপোজ করে ফেলবে।চাপা উত্তেজনা নিয়ে পিয়া বলল,বল কি বলবে।

-কি করে যে শুরু করি বুঝতে পারছিনা।
-উফফ রাহুল এত ভণিতা না করে বলে ফেল তো।
-না এখন না,ডিনারের সময় বলব।আমি শুনেছি খাবারের সময় অনেক কঠিন কথাও সহজে বলা যায়।
-আমি বুঝতেছিনা কি এমন কথা যেটা বলতে তুমি এত নার্ভাস ফিল করছ।(মুখে একথা বললেও পিয়া মনে মনে হাসছে,সে তো জানে রাহুল কি বলবে)
-আছে,একটু পরেই বলছি।

খাবার টেবিলে আয়োজন দেখে রাহুল অবাক হয়ে বলল,এতসব রান্না তুমি জানো?
-তুমি কি মনে করছ মডেলরা শরীর প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছু জানেনা!
-ছিঃ পিয়া,আমি এটা মিন করে বলিনি।
-ধুর আমি তো ঠাট্টা করে বলছি।এখন বল তোমার প্রস্তুতি কেমন?
-কিসের প্রস্তুতি?
-এরই মধ্যে ভুলে গেলা?এতক্ষণ যে আমাকে কি বলবে বলবে বলে বলছনা সেটার প্রস্তুতি।
-অনেকদিন ধরেই মা বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছেন,এতদিন এটা-সেটা বলে মাকে দমিয়ে রাখলেও আজ সেটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে।তারপর সে মায়ের কথা,পাড়ার লোকের কথা সব পিয়াকে খুলে বলল।
-এতে সমস্যাটা কোথায়?এটা বলতে এতটা ঘামছ কেন?মনে হচ্ছে তুমি কোন খুন করে এসে আমাকে বলছ।
একটা মেয়েকে বিয়ে করার সকল যোগ্যতাই তোমার আছে আর আন্টিও অযৌক্তিক কিছু বলেন নি।যে কোন মা-ই চাইবেন তার সন্তান বিয়ে করে সংসারী হোক আর তুমি তো তার একমাত্র ছেলে।
-সমস্যা অন্যজায়গায়।
-কোথায়?
-পিয়া আমি সমকামী।

আকস্মিক রাহুলের কথাটা শুনে পিয়া একেবারে থমকে যায়।তার মনে হচ্ছে কি শুনতে সে কি শুনছে কিন্তু তার কান বলছে সে ঠিকই শুনছে।
তাছাড়া এলজিবিটি নামে একটা গ্রুপ যে আছে সে সম্পর্কে সে মিডিয়া জগতে এসে অনেক আগেই জেনেছে।কিছু কিছু মেল মডেলকে প্রোডিউসার ডিরেক্টররা যে অন্যভাবে ইউজ করে সেটাও সে জানে কিন্তু তাই বলে যাকে সে মন দিয়ে বসে আছে তার মুখ থেকে এরকম কথা শুনা তার কাছে একেবারেই অকল্পনীয়।
-তুমি ঠাট্টা করছ না তো রাহুল?
-না আমি সিরিয়াসলি বলছি,পিয়া আমি একজন সমকামী পুরুষ।আমি একান্তভাবে কোন মেয়েকে না ছেলেকে অনুভব করি।কোন মেয়েকে বিয়ে করে না আমি সুখী হতে পারব,না তাকে সুখী করতে পারব।

ডিনারের পর তাদের আর তেমন কথা হলনা।
রাহুল যাবার পর পিয়ার মনে হল জন্মদিনের গিফটটাই তো দেয়া হয়নি।
পিয়া কিছুতেই রাহুলের কথাটি মন থেকে মুছতে পারছেনা।বারবার কানে সেই কথাটি বাজছে ‘পিয়া আমি সমকামী’।কিন্তু কি আশ্চর্য সে রাহুলকে তারপরও ঘৃণা কিংবা খারাপ ভাবতে পারছেনা।তার বারবার মনে হচ্ছে রাহুল তার জন্য অনেক করছে,সে যদি তার জন্য কিছু করতে পারত!
শেষরাতে পিয়া একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যদিও রাহুলকে বলবে এটা সে নিজের স্বার্থেই করছে।

পরদিন বিকেলে সে রাহুলকে ফোন করে বলল যে করেই হোক মিরপুর সাড়ে এগারোর সিগ্রী রেস্টুরেন্টে আসতে।
যাবার সময় রাহুলের জন্য কেনা জন্মদিনের উপহার তার প্রিয় নীল রঙয়ের পাঞ্জাবীটা সাথে নিয়ে নিল।
পিয়া যাবার কিছুক্ষণ পরেই রাহুল চলে এল।
-সরি লেট হয়ে গেল,কখন এসেছ?
-বেশিক্ষণ হয়নি,কেমন আছো?
-ভাল,কি ব্যাপার রাহুল তোমাকে আজকে অনেক ফ্রেশ দেখাচ্ছে!
-কাল তোমাকে কথাটি বলার পর থেকেই নিজেকে অনেক হালকা লাগছে,সেজন্যই হয়ত এমন দেখাচ্ছে।
-আচ্ছা তুমি কি কাউকে পছন্দ কর মানে ভালোবাসো?
-হ্যাঁ।
-কিইইই?এটাও এতদিন আমার কাছে গোপন রেখেছ?
কে সে?নাম বল,নইলে কিন্তু তোমার সাথে আর কথা নেই।
-ওর নাম রাজিন,দোহাতে থাকে।আগামী মাসে সে দেশে আসছে।
-তাইলে তো খুব খুশির কথা।যাই হোক এখন আসল কথা বলি,আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
-মানে???তোমার মাথা ঠিক আছে তো?সবকিছু জেনেও তুমি এরকম একটা কথা কি করে বললে?
-আমার কথাটা আগে শুনো,তারপর চিল্লাচিল্লি কর।
-আচ্ছা বল।
-তুমিতো জানো আমার প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে যাচ্ছে?
-হ্যাঁ,তো কি হইছে?
-আমি চাই আমার প্রথম ছবি হিট করুক এবং সেটার জন্য আমাকে ছবি মুক্তির আগে আগে বিনোদন পাতা থেকে পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদ হতে হবে।তার জন্য বিয়ের চেয়ে উপযুক্ত আর কিছুই হতে পারেনা,আমিতো আর বলিউড নায়িকাদের মত এতটা সাহসী না যে নিজের সেক্স স্ক্যান্ডাল বাজারে ছাড়ব।
-কিন্তু তাই বলে বিয়ের মত এত বড় একটা বিষয় নিয়া এভাবে ছেলেখেলা করবে?
-আরে মিডিয়াতে একের অধিক বিয়ে না করলে তারকা খ্যাতি পাওয়া যায়না আর তোমাকে বিয়ে করা আমার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।
-কিন্তু আমিতো তোমাকে কখনও স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারবনা।
-লোক দেখানো বিয়েতে আমি সেটা চাইও না তোমার কাছে।তুমি এখন যেমন আমার বন্ধু আছো পরেও তা থাকবে আর আমরাতো এমনিতেই আলাদা ঘরে থাকব তাই রাজিন দেশে আসলে আমাদের সাথেই একই ফ্ল্যাটে থাকতে পারবে।তারপর সুযোগ বুঝে একদিন ডিভোর্সটাও সেরে নেব,ততদিনে মাকেও একটা বুঝ দেয়া যাবে।
-আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না পিয়া।
-তোমার মাথায় কিছু ঢুকাতে হবে না,এখন এই পাঞ্জাবীটা নাও।তোমার জন্মদিনের উপহার।
-থ্যাংকস।
-এখন আমাকে উঠতে হবে,এখান থেকে শুটিং স্পটে যেতে হবে।

গাড়ীতে গান বাজছে,”চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে;নিয়ো না,নিয়ো না সরায়ে”…
পিয়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না।দুচোখ দিয়ে ঝরঝর ধারায় বরিষ ধারা বয়ে চলল।
গাড়ী থেকে নামার আগে নিজেকে ঠিকঠাক করে নিল।
কে বলবে হাস্যজ্জ্বল এই মেয়েটি একটু আগেই তার জীবনের প্রথম ভালবাসাকে বিসর্জন দিয়ে এসেছে।

*********
(গল্পটি ‘ফ্যাশন’ সিনেমার ছোট একটি চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.