সেপারেশন

লেখকঃ একলা পথিক

~ কেমন আছো সিমু?

_ এইতো আছি আর কি…!

~ আমি কেমন আছি জানতে চাইলে না যে…?

_ জানার ইচ্ছে শেষ হয়ে গেছে।

~ কারণটা জানতে পারি…?

_ কিছু কারণ না হয় অজানাই থাক।

~ ওহহ…হুমম! আচ্ছা…মাইশা কোঁথায়? ওকে দেখছি না যে…?

_ মাইশাকে মায়ের কাছে রেখে এসেছি।

~ মাইশাকে কতদিন হলো দেখি না…ওকে ও নাহয় একটু সাথে করে নিয়ে আসতে!

_ প্রয়োজন মনে করিনি।

~ তুমি এভাবে কাটাকাটা কথা বলছো কেন সিমু? মনে হচ্ছে আমরা একজন আরেকজনের কত অচেনা!

_ দেখো রাসেল…আমি এখানে তোমার সাথে গালগল্প করতে আসিনি। তাই রসিয়ে রসিয়ে কথা বলারও কিছু নেই।

~ এতোটা কঠিন হচ্ছ কেন? একটু ইজি হও অন্তত। প্লিজ…

_ আমি পুরোপুরি’ই ইজি…।

~ কই? তোমাকে দেখে তো ভীষণ অস্থির আর উত্তেজিত মনে হচ্ছে…।

_ আচ্ছা আমাকে নিয়ে গবেষণা বাদ দাও…আমি একদম ঠিক আছি…আর এইযে দ্যাখো…আমি সব পেপার রেডি করে নিয়ে এসেছি…আমার নির্ধারিত অংশে আমি সাইন’ও করে রেখেছি…এইবার তুমি সাইন করে দিলেই আমি এখান থেকে চলে যেতে পারি।

~ কীসের পেপার? কীসের সাইন?

_ কীসের আবার…আমাদের সেপারেশনের!

~ মানে কি? তুমি এসব কি বলছো সিমু…তোমার মাথা ঠিক আছে তো?

_ রাসেল প্লিজ…অন্তত এখানে কোনপ্রকার সিন ক্রিয়েট করো না…এমন তো নয় যে সেপারেশনের বিষয়টা তুমি এখনি নতুন শুনলে…এর আগে ফোনেও হাজারবার তোমাকে বলেছি যে আমরা আর একসাথে থাকছি না…আমি ডিভোর্স নিতে চাচ্ছি…তুমি কি চাও,না চাও…সেটা নিয়ে আমার কোন হেডেক নাই…আমার সাফ কথা…আমি সেপারেশন চাইছি…ব্যস।

~ ওহহ…সিমু…বি প্র্যাকটিক্যাল…বিলিভ মি…তোমার ফোনের কথাকে আমি ওভাবে সিরিয়াসলি ধরি নি…তাছাড়া আমি ভাবিও নি যে তুমি বিষয়টাকে এতোটা কঠোরভাবে নিয়েছো…অফিসিয়াল একটা ঝামেলায় আঁটকে গেছিলাম তাই মাইশার বার্থ’ডে পার্টির রাতে ফিরতে একটু বেশি লেট হয়ে গেছিলো…আর এই সামান্য রাগে তুমি মাত্র কয়েকদিনের মাথায় এতো বড় একটা ডিসিশন নিয়ে ফেললে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি রাগের মাথায় অভিমান করে ওসব বলছো!

_ রাসেল…তুমি বেশ ভালো করেই জানো আমি ওতো বোকা মেয়ে নই যে এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এতোটা দূরে যেতে পারি…সেপারেশনের মত মস্ত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারি…হ্যাঁ ওমন ঘটনাও ঘটতে পারে…তবে ওগুলো সিনেমা-নাটকে সম্ভব,বাস্তবে নয়…একটা মেয়ে কতোটা গভীর উপলব্ধির পরে এমন ভয়ানক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে সে জ্ঞান তোমার নাই,কখনো হবেও না।

~ তাহলে আমি কি এমন অন্যায় করলাম? আমার দোষটা কোঁথায়? যার জন্য তুমি…

_ আচ্ছা রাসেল…তুমি কি ‘সায়মন হাসান’এর ফ্রেন্ড ‘অপূর্ব চৌধুরী’কে চেনো?? আগামীকাল অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে যার সাথে সায়মন হাসানের সেক্স করার কথা রয়েছে?

~ এসবের মানে কি সিমু…?কীসব আবোলতাবোল বকছো?

_ কি হল ‘সায়মন’ সাহেব এভাবে চমকে গেলেন যে…চোখমুখ শুঁকিয়ে গেলো কেনো আপনার?

~ মানে কি…!!

_ মিস্টার রাসেল…আপনাকে আচমকা ‘সায়মন’ নামে সম্বোধন করলাম বলে এভাবে লজ্জাবতী লতার মত নিজেকে গুঁটিয়ে নিলেন কেন?…হিংস্র বাঘের কবলে পড়া হরিণ শাবকের মত ভঁয়ে ইতিউতি করছেন কেন?…পিকচার তো অ্যাভি বাকি হ্যায়!এখন জানতে চাইবেন না ‘অপূর্ব চৌধুরী’টা কে??

~ তার মানে…! তুমি’ই…?

_ হ্যাঁ…তুমি ঠিকই ধরেছো রাসেল…আমিই ঐ ছদ্মবেশী ‘অপূর্ব চৌধুরী’…ঠিক যেমন রাসেল আহমেদের অন্তরালে তুমিই সেই ‘সায়মন হাসান’।

~ ওহহহ মাই গড…সিমু তুমি!

_ কি হল রাসেল? ওভাবে মাথা নিচু করে রইলে যে…ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে তাই না?…স্ত্রীর কাছে আজ ফাঁস হয়ে গেলো তুমি একটা “গে”…বউয়ের কাছে আজ তোমার চারিত্রিক সার্টিফিকেট উন্মোচিত হল তুমি একটা গে…তোমার প্রত্যয়ন পত্র প্রকাশিত হল,প্রমাণিত হলো তুমি একজন সমকামী…হা হা হা…

~ প্লিজ সিমু ওভাবে বল না…প্লিজ…

_ জানো রাসেল…আমারও লেগেছিল…ভীষণ লজ্জা লেগেছিল…ঘেন্নায় নিজের শরীরে নিজেরই থুঃথুঃ ফেলতে ইচ্ছে করছিল…যেদিন আমি প্রথম আবিস্কার করেছিলাম আমার স্বামী একজন গে…একজন গে’র সাথে আমি সংসার করছি…চাইলে রাগে অভিমানে নিজেকে শেষ করে দিতে পারতাম…কিন্তু পারিনি শুধু মাইশা’র কথা ভেবে।

~ আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি…সিমু আমার আর কিছুই বলার নেই…তুমি তো সবই জেনে গেছো…!

_ “সরি সিমু আমার আর কিছুই বলার নেই”…বাহ! কত সহজে কথাটা বলে ফেললে রাসেল…এই সামান্য ‘সরি’ শব্দটা বললেই সাত খুন মাফ?…কিন্তু তুমি কি আমার দিকটা একবারও ভাবছো…আমি তো অশরীরী নই,আমি একটা মানুষ…আমার প্রতিটি শিরা উপশিরা দিয়ে কি ঝড় বইয়ে যাচ্ছে তা কি তুমি শুনতে পাচ্ছো…বোঝার চেষ্টা করছো?

~ হয়তোবা পারছি…

_ পারছো না…এতোটুকুও পারছো না…পারলে এই ঠুনকো একটা শব্দ ‘সরি’ বলেই পার পেয়ে যেতে চাইতে না…জানো,মা-বাবার উপর ভরসা করে সুবোধ বালিকার মত এক কথাতেই তোমার সাথে বিয়েতে রাজি হয়ে যাই…আর কয়েকটা মেয়ের মত আমিও ভবিষ্যৎ নিয়ে সুখস্বপ্ন বুনতে শুরু করি…তোমার মনে আছে রাসেল আমাদের বাসর রাতের কথা? আমি ঘোমটা মাথায় লাজুক বসে আছি…তুমি ঘোমটা তুলে আমায় দেখবে বলে…আমায় স্পর্শ করবে বলে সেকি উত্তেজনা আমার ভেতোরে…কিন্তু তুমি এসে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লে…আমার দিকে ফিরেও তাকালে না…সেদিন আমি বিস্মিত হলেও মনেমনে হেসেছিলাম এই ভেবে,যে তুমি হয়তো আমার দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছো না কিংবা লজ্জায় তোমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বেরুচ্ছে না…কিন্তু পরে দেখা গেলো কাহিনী পুরোই ভিন্ন…রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছে আর একই বিছানায় তোমার আর আমার দূরত্বও যেন ক্রমে ক্রমেই বাড়ছে…প্রথমে ভাবতাম কোন কারণে তোমার হয়তো আমাকে পছন্দ হয়নি…অতঃপর আমি প্রাণপণে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তোমার মন জয় করার যুদ্ধে…কিন্তু আমি যতই তোমার কাছে ঘেঁষি তুমি ততই যেন আরও বেশি করে পালিয়ে বেড়ানোর রাস্তা খুঁজো…অবশেষে লাজ-শরমের মাথা খেয়ে যেদিন তোমার কাছে আমি কৈফিয়ত চাইলাম সেদিন তুমি কি বলেছিলে?…বলেছিলে,যৌনসংক্রান্ত তোমার শারীরিক কিছু সমস্যা আছে…তাই কোন এক অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তুমি এভাবে আমার থেকে দূরেদূরে আছো…কোত্থেকে আনা একগাদা প্রেসক্রিপশন…মেডিসিন’স লিস্ট…মেডিক্যাল টেস্ট রিপোর্টও দেখিয়ে বলেছিলে কোন এক বিদেশী ডাক্তারের অধীনে তুমি চিকিৎসাধীন…নব পরিণীতা একটা মেয়ের জন্য এটা যে কত বড় হৃদয়বিদারক ঘটনা সেটা আমি সেদিন বুঝলেও তোমাকে বুঝতে দেই নি…নীরবে সব সয়ে নিয়েছিলাম…কোন বাৎচিত না করে সেদিন তোমার সব কথা বিশ্বাস করেছিলাম…আশায় বুক বেঁধে ছিলাম হয়তো তুমি একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে…আমরা সংসার করবো।

~ আচ্ছা সিমু এখন এসব না বললে হয় না?…

_ না হয়না…আজই এর একটা এসপার ওসপার হবে…আচ্ছা রাসেল তুমি কি জানো তুমি কত ভালো একজন অভিনেতা? তুমি জানো না..কিন্তু আমি ঠিকই জানি…তুমি এতোই ভালো অভিনেতা যে ঐসব মিথ্যা বানোয়াট মেডিক্যাল রিপোর্ট…টেস্ট…প্রেসক্রিপশন কোনকিছুই আমি অবিশ্বাস করতে পারিনি… তোমার সহজসরল মুখাবয়ব,ব্যক্তিত্ব আর কোমল অভিব্যক্তি কখনোই এতোটুকু ধরতে দেয় নি যে একই ছাঁদের নিচে থেকে তুমি রোজরোজ আমাকে ঠকিয়ে চলেছো…প্রতারিত করছো…কিন্তু কথায় বলে না… চোরের দশদিন গেরস্থের একদিন…বেশ কিছুদিন আগে তোমার অফিস ফেরত ময়লা জামাকাপড় পরিষ্কার করতে গিয়ে তোমার প্যান্টের পকেটে কনডমের প্যাকেট দেখে আমার ভেতোরে কিছুটা সন্দেহ জমে… তাছাড়া ইদানীং দেখি তুমি সবসময় মোবাইলেই পড়ে থাকো…ফেসবুকিং করো…চ্যাটিং করো…মিটিমিটি হাসো…একাএকা কথা বল…আগে অফিস শেষে বাসায় আসলে অন্তত মোবাইল কম্পিউটার থেকে দূরে থাকতে…হঠাৎ তোমার এমন পরিবর্তন দেখে ভাবলাম হয়তো কোন মেয়ের সাথে তোমার এফেয়ার চলছে…তাই সেদিন থেকেই অনেকটা স্পাইয়ের মত তোমার পিছু লাগা শুরু করলাম…অনেক ঘেঁটে দেখলাম কোন মেয়ের সাথেও তোমার সম্পর্ক নাই…তাই নিজেকে কিছুটা সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে ঐ কনডমের প্যাকেটটা হয়তো ডাক্তারের পরামর্শেই কোন জরুরী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লেগেছিলো…কিন্তু সব মিথ্যে পরিণত হতে খুব বেশি সময় নেয় নি…একদিন তুমি বেখেয়ালেই মোবাইল’টা বিছানার উপরে রেখে ওয়াশরুমে গেলে আর আমি বিছানা গোছাতে গিয়ে আচমকা দেখলাম তোমার মোবাইলে ফেসবুক লগ ইন করা…আর মোবাইলের স্ক্রিনে নগ্ন-অর্ধনগ্ন ছেলেদের ছবি ভাসছে…এমন উদ্ভট ছবি দেখে আমি কিছুটা তাজ্জব বনে গেলাম…কৌতূহলবশে তোমার মোবাইলটা ধরে ফেসবুকের প্রোফাইল অপশনে ক্লিক করতেই দেখি তোমার আইডি নাম রাসেল আহমদের পরিবর্তে ‘সায়মন হাসান’ নামে দেয়া আছে…নিজের রিয়েল আইডি রেখে অন্য ফেইক নামে ফেসবুক আইডি খুলেছো কেন…বিষয়টা আমার কাছে কেমন জেনো বেশ গোলমেলে ঠেকলো!…কিছু বুঝে উঠার আগেই তুমি ওয়াশরুম থেকে যখন বেরিয়ে আসলে আমি চটজলদি মোবাইলটা রেখে সরে আসি…তারপর থেকে আমি আবডালে অগোচরে তোমায় নজরে রাখতে লাগলাম…কিন্তু সবসময়ই দেখলাম তুমি ঐ ফেইক নামেই ফেসবুক ইউজ করছো…তারপর একদিন আমিও তোমার অজান্তে ফেসবুকে বসে ঘাঁটাঘাঁটি করে সায়মন হাসান নামের তোমার ফেইক আইডি’টার সন্ধান পেলাম…আর তোমার সাথে কন্টাক্ট করার জন্য ‘অপূর্ব চৌধুরী’ নামে আমি নিজেও একটা ফেইক একাউন্ট খুললাম…আর বাকি ইতিহাস তো এখন তোমার সামনেই…।

~ থামো সিমু…প্লিজ থামো আমি আর শুনতে পারছি না…।

_ কেন শুনতে পারছো না রাসেল?…আজ তোমাকে সব শুনতে হবে…সবকিছু… জানো রাসেল, শুধু তোমার জন্য আমি আমার নারীত্বকে বিসর্জন দিয়েছি…মাতৃত্বকে বলিদান করেছি…একজন নারীর মাঝেও আমি অপূর্ণ এক নারী…অতৃপ্ত এক নারীসত্তা আমাকে প্রতিনিয়ত তিলেতিলে মারছে…কুরেকুরে খাচ্ছে… এতোকিছুর পরেও…তোমার অক্ষমতার কথা জেনেও…তোমার অসহায়ত্বের কথা ভেবেও তোমাকে ছেড়ে যাই নি…তোমাকে ত্যাগ করিনি…মনটাকে কংক্রিট দিয়ে গাঁথলাম…শক্ত করলাম…ভেবেছিলাম এক জীবনে সবার সব আশা পূরণ হয় না…আমারও না হয় নাই বা হল…তাই ছোট্ট ঐ ছাঁদের তলায় ডেবিট-ক্রেডিটের হিসেব না কষে তোমায় আমায় মিলে গড়তে চেয়েছিলাম আমার অপূর্ণতার সংসার…আর তাই নীরস সংসারে কিছুটা রং মেশাতে একটা অরফানেজ থেকে দত্তক নিয়ে আসলাম পরীর মতন ছোট্ট মাইশা’কে…ভেবেছিলাম ওকে নিয়েই হেসেখেলে এক নিঃশ্বাসে লাইফটা পার করে দেবো…মাত্রই তো কয়টা দিন বাঁচবো…কিন্তু শেষমেশ আমি কি পেলাম…অংকের সমীকরণ এতোটা জটিল হবে ভাবতে পেরেছিলাম কি? তুমিও কখনো ভেবেছিলে কি…?

~ আমায় মাফ করে দাও সিমু…আমার ভুল হয়ে গেছে…চরম অন্যায় করেছি আমি…।

_ অজ্ঞাতে ভুল করলে সেটার মাফ চাওয়া যায়…কিন্তু জেনেশুনে করলে সেটার ক্ষমাভিক্ষা হয় না রাসেল…আর সবকিছুকে কেন শুধু ভুল বলেই চালিয়ে দিতে চাইছো? তুমি কি নিজ ইচ্ছায় কিছুই করো নি?

~ হ্যাঁ আজ আমি অস্বীকার করবো না…আমি যা করেছি নিজ ইচ্ছাতেই করেছি…।

_ তার মানে তোমার কথায় এটাই স্পষ্ট…তুমি আমাকে শুধু সামাজিকতার খাতিরেই বিয়ে করেছো… সমাজে নিজেকে একজন সামাজিক জীব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই বিয়ে করেছো…আর আমি হলাম এই সমাজে তোমাকে সামাজিক জীব হিসেবে দাড় করানোর ‘সার্টিফিকেট’ মাত্র,এই তো…? কিন্তু আমি কেন রাসেল? আমাকেই কেন তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করলে…আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করিনি…তাহলে…??

~ ভুল হয়ে গেছে সিমু…আমাকে ক্ষমা করা যায় না…?

_ ক্ষমা?এই একা আমি আর কত সইবো…এতকিছুর পরেও বলছো…তোমায় ক্ষমা করতে…নাহ… দুঃখিত…আমি কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলে বসিনি…এমন কি আমি কোন মহামানবীও নই…আর কিছুকিছু ভুলের জন্য কিছু মানুষের শাস্তি পাওয়াই উচিৎ…।

~ প্লিজ সিমু একটু উদার হউ…একটু ভেবে দেখো…!

_ আমি সব ভেবেই সেপারেশন ফর্ম রেডি করে নিয়ে এসেছি…আর কোন অপশন আমার হাতে নেই…সরি…।

~ প্রমিজ করছি আমি একদম ঠিক হয়ে যাবো…প্লিজ এমন ডিসিশন নিও না!

_ রাসেল তুমি কি জানো যে, তুমি একইসাথে ভীতু এবং কাপুরুষ…ভয়ংকর রকমের ভীতু ও কাপুরুষ… ফ্যামিলি,সোসাইটি আর লোকলজ্জার ভঁয়ে…তুমি না পেরেছো নিজের ভেতোরে লালিত সত্তার সাহসিক বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে…না পেরেছো কঠোর কোন সিদ্ধান্ত সজ্ঞানে নিতে…তাই তোমার মুখে এসব প্রমিজ অনুনয় বিনয় মানায় না…ভীষণ মেকি লাগে।

~ অন্তত একটা সুযোগ দিয়ে দেখো…!

_ নাহ রাসেল…নো এনি চান্স…তুমি ভালো থাকো তোমার মত করে…দ্রুত সেপারেশনের ফর্মটাতে সাইন করে দাও…আমাকে উঠতে হবে।

~ প্লিজ…সিমু…আমি সেপারেশন চাই না…তুমিও সেপারেশন নিও না…নিও না…প্লিজ…।

…………………………………………………………

‘_আরে অ্যাই…রাসেল…তুমি এসব কি বলে চিৎকার করছো? সিমু তুমি সেপারেশন নিও না প্লিজ…হা হা হা…আজকাল ঘুমের ঘোরে কীসব আজেবাজে স্বপ্ন দেখো বলতো?…আমি আবার সেপারেশন নিতে চাইলাম কখন? আজব তো…হা হা হা…’

সিমুর মৃদু ধাক্কায় রাসেলের ঘুম ভাঙলো…শোয়া থেকে ধপ করে উঠে বসলো…ঘেমেনেয়ে একাকার… হার্টবিট অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে…শ্বাসপ্রশ্বাস জোরে জোরে বইছে…হাত পা থরথর করে কাঁপছে…চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলো ফ্লোরে বসে মাইশা কীসব হিজিবিজি আঁকিবুঁকি করছে আর একের পর এক বইয়ের পাতা ছিঁড়ছে…ওদিকে সিমু ঘর গোছাচ্ছে আর ঘুম ঘোরে রাসেলের আবোলতাবোল বকা নিয়ে খুনসুটি করছে…রাসেল দ্রুত আশপাশ ফিরে বিছানা বালিশের আড়ালে এলোপাথাড়ি তার মোবাইলটা খুঁজতে ব্যস্ত হলো…মোবাইলটা হাতের নাগালে পেতেই দেখলো সেটা এখনো সুইচড অফ মুডেই আছে…জলদি মোবাইলটার সুইচড অন করে ফেসবুকে ঢুঁকে ফ্রেন্ডলিস্ট চেক করে দেখলো…সেখানে অপূর্ব চৌধুরী নামে কোন ফ্রেন্ড নেই…অস্থিরচিত্তে জলদি বিছানা ছেড়ে উঠেই এক দৌড়ে ওয়ারড্রবের কাছে গেলো…একের পর এক ড্রয়ার খুলে কতগুলো কাপড়ের ভাঁজ ভেঙ্গে একদম নীচ থেকে অবশেষে গতকাল অফিসে পরিহিত প্যান্ট’টা খুঁজে পেলো…সিমুর অগোচরেই প্যান্টের পকেট থেকে কনডমের প্যাকেট’টা নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো…অতপর স্বস্তি এবং এতক্ষণ পরেই কেবল রাসেল স্বাভাবিক ভাব অনুভূত হল…নিজেকে চিমটি কেটে দেখলো…সত্যি সত্যিই সে ঠিক আছে নাকি এখনো ঘোরের মধ্যেই আছে…সবকিছুই ঠিকঠাক…তার মানে একটু আগে সে যা দেখেছে সেটা পুরোটাই ভয়ংকর একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়…কিছুই ঘটেনি…সবকিছুই আগের মতই…যা ঘটেছে সব দুঃস্বপ্নেই…সেপারেশন’টা তাহলে দুঃস্বপ্নেই হয়েছিল…বাস্তবে নয়। শেষমেশ রাসেল হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো…ভাবখানা এমন যেন বুক থেকে ইয়া বড় এক পাঁথর নামলো…মুচকি হাঁসি হেঁসে মাইশা’র পাঁশে গিয়ে বসলো…ওরা দুজনে মিলে টম এন্ড জেরি খেলা শুরু করলো আর অদূরে বসে সিমু ওদের দুজনের ছেলেমানুষি উপভোগ করতে লাগলো।

শত আনন্দের মাঝেও রাসেলের অবচেতন মনে একটা প্রশ্ন’ই বারবার উকি দিচ্ছিলো…এ মিথ্যে অভিনয় দিয়ে আর কতদিন চলবে?

*সমাপ্ত*

[বিঃদ্রঃ ‘সেপারেশন’ বাস্তবতা বিবর্জিত একটা কাল্পনিক গল্প মাত্র।]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.