স্বপ্নের সারথি

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

১।

লোকটা একবার আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। তারপর মুখ তুলে দু’বার তাকাল। একবার ডানে আবার ডান থেকে বামে। কেউ তাদের দিকে হা করে সিনেমার লোভনীয় দৃশ্য দেখার মত তাকিয়ে নেই নিশ্চিত হয়ে এবার সামনে তাকাল। একজোড়া রাগান্বিত চোখের কাছে পরাজিত হয়ে সে পুনরায় ঠোঁট ব্যবহারে মনস্থির করল। অঘটনটা এবার ঘটল! বউয়ের ভয়ে ডিসপসিবল কফির গ্লাস চুমকাতেই ঠোঁট পুড়িয়ে ‘ওহ’ করে উঠল। মহিলা পাতলা শাড়ি হটিয়ে উলঙ্গ কোমড়ে হাত ঠেকিয়ে বলল,
“কফিটা পর্যন্ত ঠিক মত খেতে পার নাহ!?”
জনসম্মুখে বউয়ের মুখে আত্মসম্মান বিকিয়ে বেচারা এবার অসহায়ের মত নিচে তাকাল। ফ্লাইট মিস হওয়া; না বউয়ের ধমকের তাড়ায়, বাম পায়ে সিধানো বুটের ফিতায় গিট দিতে ভুলে গেছে। নিচে তাকিয়ে ভদ্রলোক এবার আরো বেশী ভয় পেল। মহিলা নীরিহ স্বামীর মুণ্ড ভাঙার জন্য তখনো সামনে দাঁড়ানো। জুতার ফিতা মহিলার চোখে পড়ার কথা নয়, জাঁদরেল বউদের সুক্ষ জিনিষ চোখে পড়ে না। এই মহিলা তেমন। দারুন বেখেয়ালি। আমি তাদের হাত তিনেক দূরে বসে অনেক কিছুই খেয়াল করছিলাম। মহিলার কপালের টিপ বাম চোখের ভ্রু ঘেষা। ভদ্রলোকের বুটের ফিতে খোলা, তাদের সমবয়সী ছেলে দুটোর একজনের শার্টের বোতাম উপর নীচ অন্যজনের হাফ প্যান্টের জিপার খোলা।

২।

জিপার খোলা প্যান্ট নিয়ে স্কুলে একবার আমারও হয়েছিল কেলেংকারী অবস্থা!
তখন সিক্সে পড়তাম। জিপার খোলা ছিল বললে ভুল হবে, আমার জিপারই ছিল না। ফেরীওয়ালা থেকে কম দামে কেনা প্যান্টের জিপার বেশিদিন টিকে না। আমারও টেকেনি। মা ঘরোয়া দর্জি হয়ে সেলাই করে দিলেন জিপারের জাগয়া। আমার দস্যিপনার অত্যাচারে কখন সেই সেলাই খুলে সদরঘাট হলো টেরই পেলাম না। প্রথম টেরটা পেল সাবিনা। মিনিটের মধ্যেই সে ক্লাসের অন্যদের টের পাওয়াতেও সময় নিল না একদম! কথা পাচারকারী সাংবাদিক হিসাবে ক্লাসে তার যথেষ্ট সুনাম। মনিটরের জিপার খোলা; কথাটা সবার কানে পৌঁছে যায় অংকের স্যার ক্লাসে ঢুকার আগেই। আমি ডাষ্টার দিয়ে ব্ল্যাক বোর্ড পরিস্কার করছিলাম। অনেকের চোখ তখন আমার প্যান্টের দিকে। তাদের হাসির আগা-মাথা কিচ্ছু বুঝলাম না! রেজা সামনে এসে,

“ঐ তোর তো শশুরবাড়ী দেখা যাইতেছে ”
বলেই হি,হি করে উঠল। আরে! আমি’তো ইচ্ছাকৃত জিপার খুলে জিনিষটাকে বাতাস খাওয়াচ্ছিলাম না! তবু সবাই কেন কমেডি সিরিজ দেখার মত হাসছে? মেজাজটা খারাপ করে রেজার নাকের উপর চালিয়ে দিলাম ঘুষি। নাকের উপর মারলেও পড়ল দাঁতে। মুহুর্তেই মুখ থেকে ছিটকে পড়ল রক্ত। ঐ রক্তাক্ত দাঁত দিয়েই সে কামড়ে ধরল আমার ডান হাতের কব্জি। যাকে বলে এক্কেবারে কচ্ছপ কামড়। কামড়াকামড়ির অসভ্য এক অভ্যাস ছিল তার। আমরা কামড় থেকে ‘কা’ কেটে নামের সাথে জুড়ে ডাকতাম কা-রেজা। অংকের স্যার এসেও মুক্তি দিতে পারল না আমার হাত। ঝুলে রয়েছে তো রয়েছেই। যেন ছেলেটা আমার হাতেই খুঁজে পেয়েছে অমৃত। টপ-টপ করে আমার চোখ বেয়ে পানি ঝরতে লাগল। কাঁদছিলাম কি জন্য বুঝতে পারলাম না, কামড়ের ব্যথায়; না আমার স্কুল দফতরি বাবা জিপারওলা প্যান্ট কেনার অসমর্থ্য ছিল বলে? সেদিন কাঁদোকাঁদো হয়ে বলেছিলাম, ‘আমার একটাই প্যান্ট গত দেড় বছর ধরে। বাবার কাছে পয়সা চেয়েছিলাম। বল্লেন, দু’বেলা খাওয়ারই জুটে নাহ! আবার নতুন প্যান্ট!’

রাব্বানি স্যার পুরো বেত রেজার পিঠে উড়িয়ে দিলেন। কামড়ের ব্যথা ভুলে গেলাম ন্যায় বিচার পেয়ে। নিজের ছেলে হলেও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে শাস্তিটাই দিলেন। রেজা সেই ক্লাস সিক্সে থাকতেই ছিল বখাটেপনার এক কাঠি উপরে। সেই ছেলে মারের প্রতিশোধ নেবে না; তা কি হয়? তারপরদিনই ফুটবল খেলার মাঠে ঝাল মিটিয়ে নিল। খেলার ছলে বল মেরে দিল আমার সেই সদরঘাটের শশুরবাড়ীর উপর! এত জোরে বল মারল যে আমি নাক ধরে মূর্ছা গেলাম। ভাবলাম, শশুরবাড়ীটা বোধহয় অকেজোই হয়ে গেল। এজন্মে সত্যিসত্যি শশুরবাড়ী যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল এই হতচ্ছাড়া বল!

৩।

বলটা জোরে এসে আমার গায়ে লাগল!
ছোটবেলার শশুরবাড়ীর পথ আগলে ধরা বলের কথা ভাবতে গিয়ে কোলের উপর দেখি আস্ত একটা বল। আশ্চর্য! আমি কোন খেলার মাঠের গ্যালারীতে নয়; বসে আছি দেশে যাওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ান এয়ারপোর্টে। মরার বল আসলো কোত্থেকে? মনে পড়ল, সেই নীরিহ ভদ্রলোকের ছেলেদের হাতে বলটা দেখেছিলাম। শার্টের বোতাম উপর-নিচ ছেলেটা এসে বল চাইল। ইচ্ছে করছিল কানের নীচে একটা বসিয়ে দেই! এই নিয়ে বলটা তিনবার পড়ল গায়ে। বেখেয়ালি মহিলাটা শুধু স্বামী শাসন করতে শিখেছে; বাচ্চাদের ভদ্রতা শেখায়নি! দশ-বার বছরের ছেলে আমাকে আবার তোতলিয়ে বলে ‘আং-কে-ল বলটা দাও না’ ফাজিল ছেলে! আংকেল ডাকবি কেন, আমি কি বুড়ো? সাথে আবার আপনি নয় ডাইরেক্ট তুমি! যা হবার হবে, সিদ্ধান্ত নিলাম বল দিব না। তার জাঁদরেল মা এলেও না। জিপার খোলা ছেলেটা এসে বিনীত ভংগীতে বল চাইতেই সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে দিয়ে দিলাম। ছেলেটা কথা বলার সময় ভ্রু কাঁপে, টিকালো নাক, কপালে বুদ্ধির ছাপ, বিনীত ভংগীতে বল চাইলেও কন্ঠে ছিল ঝাঁঝালো মানহানির অভিমান। তাকে দেখে মনে পড়ল একজনের ছেলেবেলার অবয়ব। বোধহয় তার প্রতি সম্মান জানাতেই বল ফিরিয়ে দেয়া। তবে বল দিয়েছি তো কি হয়েছে? নীরিহ ভদ্রলোক পরিবারের উপর ক্ষোভের স্পষ্ট ছাপ মুখে নিয়েই প্লেনে বসলাম। কিন্তু আমার ভাগ্য এত ভালো যে ঐ পরিবারটিই আমার আঠার ঘন্টার প্রতিবেশী!

৪।

প্রতিবেশীরাসহ স্কুলের সব বন্ধুবান্ধবই আমাকে দেখতে আসল কেবল রেজা ছাড়া। খৈ মাটি খেয়ে গলা ফুলে কলা গাছ। বেশ ক’দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল চক পাউডারের আইস্ক্রিম খেয়ে। ক্লাস সিক্সের রেষারেষি নাইনে এসেও ভুলেনি রেজা। আমিও একটা আস্ত গরীব গাধা! তখন অব্ধি বড়লোক ছেলেপুলের শখের খাওয়ার আমার পেটে পড়েনি বিধায় বুঝতে পারিনি কাপ আইস্ক্রিমের ভিতরটা কেমন হয়? বিচ্ছুটা আমার শত্রু জেনেও তাকে বিশ্বাস করে বসলাম। অবশ্য, বিশ্বাস করার পিছনে যথেষ্ট যুক্তিও ছিল। ছেলে বদ হলেও বাবা ভালো মানুষ। আমাকে অনেক আদর করতেন। সে আদর ক্লাসের ফাস্ট বয় হিসাবে নাকি বাবা স্যারের বাল্যবন্ধু বলে; এই হিসাব কখনো খতিয়ে দেখিনি। শুধু হিসাব কষতাম, ক্লাসমেটরা পকেট থেকে দুই টাকার কচকচে নোট ভাঙিয়ে এটা-সেটা কিনে খাওয়ার। আমি তখন ফুটো পকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম মাঠের এক কোনে। মাঝে মাঝে রাব্বানি স্যার বেত বগলে চেপে কাছে এসে নিজের পকেট ঝাঁকিয়ে খুচরো পয়সা কিংবা এক টাকার নোট হাতে গুঁজে দিতেন। ক্ষুধার্ত চোখে শ্রদ্ধায় ঝুকে আসত মাথা। আর রেজা সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে দিল। এই কাপ আইস্ক্রিমটা বাবার নাম করেই খাইয়েছে। সেইদিনও রাব্বানি স্যার আরেক দফা বেত উড়ালেন। আমার জন্য মার খাওয়া মানে রেজাকে হিংস্র করে তোলা। স্কুল থেকে ফেরার পথে গাছের মগ ঢালে বসে ভুতের নাম করে ঢিল ছুড়া, সুযোগ পেলে কামড়ে দেয়া, খেলার মাঠে ইচ্ছে করে বল মারা, আর প্রায় ভোরে দরজার সামনে মা মানুষের পায়খানা পেতেন!

রাগ আর ক্ষোভ আমার সহ্য শক্তি অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। এখন শুধু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার অপেক্ষা। স্কুল বেঞ্চে পেরেক মেরে, শালার পাছায় ছয় ইঞ্চি পেরেক যদি না ঢুকিয়েছি…। শুধু পেরেক না, শালার প্রিয় খাবার কাপ আইস্ক্রিমে ঢালবো তেলাপোকার বিষ! হারামি মরলে বড় পীর বাবার মাজার জিয়ারত করবো বলে শপথও করেছিলাম।

আফসোস, এইসবের কিচ্ছু করা হয়নি। এক সন্ধ্যায় রাব্বানি স্যার রেজাকে নিয়ে এলেন হাসপাতালে। তাকে মাপ চাইতে হবে এ সাব্যস্ত তিনি নিজেই করলেন। রেজা মাথা নুয়ে সরি বলল। স্যার ধমকিয়ে বল্লেন, ‘সরি নয় হাত জোড় করে মাপ চাও!’ মাথার কাছে বসা বাবা বললেন, ‘থাক না বাচ্চা মানুষ সরি’তো বলেছে’ কথাটা বলে সমর্থনের জন্য আমার দিকে তাকালেন। বাবা ও তার বন্ধুর সম্মান রক্ষার্থে বল্লাম, ‘থাক আর মাপ চাইতে হবে না’। সরি কবুল করলেও তার পাছায় পেরেক আর বিষ খাইয়ে মারার সিদ্ধান্তে তখনো অটুট। স্যারের কথায় খুশি হয়ে মাথা ঝুকে থাকা বদমাইশটার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। অপলক দৃষ্টিটা যেন খুব বেশী’ই সোজাসুজি ছিল। এই প্রথমবার তার চোখে ক্রোধের পরিবর্তে অনুশোচনা দেখলাম। সেই চাউনি যেন উত্তাল নদী নয়; দীঘির জলের মত শান্ত। আমার জানি কি হল, ঐ মুহুর্তেই তার উপর এতদিনের জমানো রাগ, ক্ষোভ সব তুলার মত গেল উড়ে।

৫।

উড়ে এসে কোলে জুড়ে বসলো বাচ্চা দু’টো।
-আংকেল বেলুনটা ফুুঁলিয়ে দাও না।
‘পারব না তোদের দজ্জাল মাকে গিয়ে বল’! বলতে গিয়েও কথাটা বললাম না। ছেলেবেলার কথা ভাবতে ভাবতে বাচ্চাদের উপর থেকেও রাগ পড়ে গেল। বেলুন ফুলিয়ে দিতেই বাচ্চারা জড়াজড়ি করে সিটে গিয়ে বসল। একটু আগের চুল ছেঁড়াছেঁড়ি এখন বন্ধুত্বে রুপ নিয়েছে। ঠিক আমার আর রেজার মত।

হাসপাতাল থেকে ফিরে রেজাকে জানে মারার কসম ভুলে গেলাম। যে রেজা জন্মশত্রু; এখন সে’ই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ক্লাসে পাশাপাশি বসা শুরু করলাম। বেশিরভাগ রাত্তিতেই পড়াশুনার নাম করে তাদের বাড়িতে থেকে যেতাম। পড়াশুনার হত ছাইপাঁশ, চলত শুধু আড্ডা। এস,এস,সি পরীক্ষার আগে আগে রেজার ভিতর এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। বন্ধুদের কানাঘুষায় এক যুক্তিতে সবাই সহমত হলাম শালা নিশ্চয় কারো প্রেমে পড়েছে। একদিন ধরলাম চেপে, ‘ঐ হারামি, মাইয়াটা কে রে’? রেজা আমার দিকে কিছুক্ষন শব্দহীন তাকিয়ে নিচুস্বরে প্রথমে বলল, ‘কেউ না’। পরে বলে, “এতদিন গাছের সাথে থেকে শাখা-প্রশাখা কিচ্ছু’কি চিন্তে পেরেছিস, যে এখন ঢোল পিটিয়ে পরগাছা খুজছিস। আগে তো গাছকে চিনতে শেখ পরে নাহয়…”! মুখে আঙুল ঠেকিয়ে ভাবতে লাগলাম, কোন সে পরগাছা? চিন্তা করলাম, ক্লাসের সাংবাদিক সাবিনা নয় তো? রেজার কাছে সংবাদিকের নাম পাড়তেই মুখ ভেংচিয়ে উড়িয়ে দিল। শেষমেশ তার চাচাতবোন সুমনার উপর নজর দিলাম। মেয়েটা যথেষ্ট মাত্রায় সুন্দরী। প্রথম দেখাতে যে কেউ ক্রাশ খাবার মতন। আমিও খেয়েছিলাম বটে কিন্তু রেজার কাছে তার বিবরণ শুনে চক্ষু চড়ক গাছে উঠেছিল!

সুমনা ছোটবেলার বিছানায় প্রস্রাবের অভ্যাস ক্লাস এইটে উঠেও ছাড়তে পারেনি। এত বড় দামড়ি মেয়ে নাকি এখনো বিছানায় মুতে ভাসিয়ে দেয়! শেষমেশ দেখা যাবে বাসর ঘরে জামাইকে কাম-রসে না ভিজিয়ে এক কলসি মুতে গোসল করিয়ে দিয়েছে! ছ্যাঃ। রেজা তার কথা শুনে রিতিমতো ক্ষেপে গেল, জীবন গেলেও সে মুতনেওয়ালীর জামাই হবে না। আমরা আবার চিন্তায় পড়লাম! তাহলে কে সে? হাবিব উল্ল্যাহ বলল, ‘আরে ভাই কার লগে প্রেম করে এইটা জানা আমগো ইম্পরট্যান্ট না। মোদ্দাকথা, বন্ধু প্রেমে পড়ছে এখন পার্টি চাই’ রেজা আমতা আমতা করে বলল, ‘আরে মামা, যারে ভালোবাসি আগে সে তার ভালোবাসা দিয়ে আমাকে দাবী করুক, পরে না হয় খাওয়ার-দাওয়ার’

৬।

-খাওয়ার’তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ভাই!
এয়ার হোস্টেস কখন খাওয়ার দিয়ে গেল টের পেলাম না। পাশে বসা নিরীহ ভদ্রলোকের কথায় সম্ভিত পেয়ে বল্লাম,
-ইট’স ওকে।

বউ ন্যাওটা পাব্লিকগুলো খুবই বিরক্তিকর! বউয়ের সাথে ভয়ে কথা না বলতে পেরে যার তার সাথে গেজাতে চায়। এই যেমন খাওয়ার ঠান্ডা হচ্ছে, এ খবর আমার কানে ঢেলে নীরিহ ভদ্রলোক খোশগল্পের অনুমতিপত্র কিনে নিয়েছে!

-ভাইয়ের কি বিয়ে হয়ে গেছে?
-না
-কইরা ফালান, না করলে পস্তাইবেন।
-আপনি যে হারে পস্তাচ্ছেন; তারচেয়ে না করে পস্তানোটাই ভালো নয় কি?
-বিয়ে এমন একটা জিনিষ মানুষ করলেও পস্তায় না করলেও পস্তায়! এয়ারপোর্টে বোধহয় এক ঝলক দেখ্যাই আমার গিন্নি সম্পর্কে অনুমান করছেন, বাসায় এর চেয়ে ঢের বেশী। এই যে বলা নাই, কথা নাই হঠাত প্লেন চেপে বসলাম স্বাদে-স্বাদে? নারে ভাই, বাধ্য হইয়া যাইতেছি! আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে সে জান গেলেও একদিনের নোটিশে দেশে যাবে না। অথচ কাল রাতে তার বোনের নাকি হঠাত বিয়ে হয়ে যায়। এই জন্য একদিনের নোটিশে দেশে যাওয়া। ছেলের বাপ অসুস্থ। চোখ বুঝার আগে পুত্রবধু দেখে মরবার চায়। এইবার বুঝেন ঠ্যালা! তুমি বুইড়া হইচ যাইবা চইল্লা। তা যাও! তোমার বউ দেখনের সখে আমার পুটকি আর পকেটের বারটা বাজাবে ক্যান? আর আমার শ্যালিকাও বলি হরি, এক্কেবারে মার্কামারা…

ওরে বাপ রে বাপ! মানুষ এত কথা কি করে বলে? মনযোগ দিয়ে তাকে শুনছি এই ভাব মুখে ফুটিয়ে আমি ভাবছি বিয়ে কি আদৌ কপালে আছে?

যদিও বিয়ে নিয়ে এখনো তেমন কিছু ভাবিনি । তবে একজনের জন্য এই ভিনদেশে সাজিয়েছি ছোট্ট একটা সংসার। তার পছন্দ মত দেয়ালে লাল আর বেগুনি রং ছিটিয়েছি। তার আবদার, একটা খোলামেলা বেড় রুম। পাশে থাকবে বড় একটা বারান্দা, এক কোনে দু’টো ইজি চেয়ার। এটাচড বাথরুমে সাঁতার কাটার মত বার্থটব। বল্লাম, বার্থটবে সাঁতার কাটা যায়? সে বলে, ‘যায় কিনা জানি না তবে আমার চাই’ আর দক্ষিনের জানালায় রক্তজবার রং নিয়ে দোল খাওয়া পর্দা। পাগল একটা!

-ভাই বল্লেন না তো?
-কি বলব?
-কবে নাগাদ করছেন বিয়ে?

৭।

-বিয়ে খাওয়াচ্ছিস কবে?
-মামা গাছে কাঠাল গোঁফে তেল ডলিস না’তো! খাইছস এখন শোকর কর।

সেইদিন বন্ধুরা মিলে রেজার প্রেম উপলক্ষে পেট পূজা করেছিলাম ঠিকই তবে বিয়েথা এখন অব্ধি খাওয়া হয়নি। বন্ধু প্রেমে পড়লে নাকি অন্য বন্ধুদের থেকে চোখ লুকিয়ে বেড়ায়। রেজার মাঝে ওসবের কিচ্ছু দেখলাম নাহ। বড়জোর আগের চেয়ে সে আমাকে বেশী ঘেষে চলত। আর সে চাইত আমার সম্পুর্ন সময় স্বার্থপরের মত নিজের দখলে।

প্রায় সকালে বাড়ীতে ভাত থাকত না, খালি পেটে কলেজ যেতাম। চেহারা দেখে রেজা কি ভাবে যেন বুঝতো। জোর করে বন রুটি আর চা খাইয়ে দিত। লজ্জা আর কৃতজ্ঞতায় চোখ পানিতে ভাসত। পুরো কলেজ জীবনের দুইবছর রেজার দেয়া জামাকাপড় পরেই কাটিয়েছি। মাঝে মাঝে বড্ড খারাপ লাগত। রেজা বলত, “তোর যখন অনেক টাকা হবে তখন সুদ সমেত সব ফেরত দিবি; আপাতক তুই’কে দিয়ে দে!” তার ভাবমাধুর্য কথার মানে বুঝতাম না। বুঝতো আশেপাশের মানুষজন। সকাল-বিকাল কানাঘুষা চলত আমাদের নিয়ে। মানিক জোড়, মায়ের পেটের দোস্ত, জামাই বউ! কেউ কেউ এও বলত, আমি রেজাকে ভাঙিয়ে খাচ্ছি। শুনলে খুব রাগ হত। কয়েকদিন রেজাকে এড়িয়ে চলতে চাইতাম, কিন্তু পারতাম না। কাক পক্ষি ডাকার আগে বাড়ীতে এসে উপস্থিত হত। এসেই ছোটবেলার মত সেই গুঁতোগুঁতি! যে অব্ধি আমি না হাসি; পিছু ছাড়ত না। খুব বেশী রাগ করলে, কাঁধে উঠিয়ে সোজা পুকুরে নিয়ে ফেলত।

এই পুকুর ঘাটেই আমাদের আড্ডা চলত। আকাশে থালার মত চাঁদ দেখলে রেজার মাথায় ভুত চাপত। মধ্যরাতে সাঁতার কাটবে। তাও নেংটা হয়ে! সাথে আমাকেও নামতে হবে। এত গালাগাল দিয়েও মুক্তি পেতামনা। না নামলে জামা-কাপড় সুদ্ধ সোজা পুকুরে! পরে আমিও অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম রেজার পাগলামিতে। কত রাত নেংটু হয়ে রেজার সাথে সাঁতার কেটেছি, নিশাচর প্রানীর মত রাত জেগে রাস্তায় রাস্তায় হেটেছি তার হিসাব আমাদের পায়ে মাড়ানো ঘাস গুলোই জানে। তবে আমাদের সাথে অন্য বন্ধুরা থাকলে রেজা ওসব করত না। তাই সে সবসময় চাইত আমাদের সাথে কেউ না চলুক। রেজার পাগলামি দেখে ভাবতাম, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সম্পর্ক বোধহয় এমনই হয়। তাকে বোঝাতাম, পেট চালানোর জন্য সারাজীবন এখানে তো আর পড়ে থাকতে পারব না, যখন তুই এক জায়গায় আমি অন্য জায়গায় থাকব তখন কার সাথে পাগলামি করবি? সে অধিকারের সুরে বলত, তোকে দূরে যেতে দিলে তবে তো?

তার মাস ক’য়েক পরেই রেজা আর শৈশব দু’ই ফেলে চলে এলাম অস্ট্রেলিয়ায়। স্বপ্নেও ভাবিনি আমার মত ছাপোষা গরীবের সন্তান পড়বে অস্ট্রেলিয়ার মত দেশে! সেই স্বপ্নের নাটাই হাতে ধরিয়ে দিলেন রাব্বানি স্যার। আমাদের দুইজনের জন্যই আব্বাস মেমোরিয়াল বৃত্তি ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছিলেন। হলো শুধু আমারটা। রেজা আর পরিবার ছেড়ে থাকতে হবে কিছুটা খারাপও লাগছিল বটে। কিন্তু আমার চেয়েও বেশী লাগছিল রেজার। সে সরাসরি বলে দিয়েছে, হয় দুইজনেই যাব নয় কেউ না। এ’নিয়ে রিতিমতো কথা বন্ধ করে দিল! দেশে থাকা অবস্থায় শেষবার কথা হল এয়ারপোর্টে এসে। অসচ্ছল পরিবারের কথা চিন্তা করে হাওয়াই জাহাজ চেপে জীবন বানাবার প্রবল স্বপ্নে বীভোর আমি, রেজাকে একপ্রকার অবহেলার চোখেই দেখেছিলাম ক’দিন। কিন্তু সব রঙিন পর্দা চোখ থেকে হটতে লাগল বিমানে উঠার ঠিক আগ মুহুর্তে।

মনে হচ্ছিল সবচেয়ে প্রিয় জিনিষটাই খুইয়ে যাচ্ছি বিদেশ বীভুইয়ে। চোখের সামনে ভাসতে লাগল, আজকের অবস্থানে দাঁড়ানোর পিছনে রেজার অবদান, আমাদের আড্ডা দেয়ার পুকুর ঘাট, চাঁদের আলোয় নেংটা গোসলের স্থিরচিত্র, আর সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছিল রেজার জন্য। যে তার হাজারো গুরুত্বপুর্ন সময়ের বিনিময়ে চেয়েছিল শুধু আমার খানিকটা সময়। আমাকে নিয়ে তার যত অভিমান, শুধু আমাতে মজে থাকার যুদ্ধ। ভাবতে পারছিলাম না আমি কার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পায়ে মাড়াতে চলছি। বাবা আর রাব্বানি স্যারের সামনেই রেজাকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে পিষিয়ে ফেলতে চাইলাম। আমার চোখ ভেঙে নেমে এল রাজ্যের কান্না। রাগ হচ্ছিল নিজের উপর, রেজা আকারে ইঙ্গিতে কত্তবার নিজেকে ধরা দিয়েছিল; আর আমি এত কাছে থেকে বুঝতে পারলাম নাহ! যদি রেজাতে আসক্ত না’ই হতাম তবে কেন মেয়েদের ভালো লাগত না! আমার কান্নার শব্দ আর রেজার দু’ই মিলিয়ে এয়ারপোর্টে বাজল বিচ্ছেদের ঘনঘটা! আমার কাঁপানো কান্না রেজাকে বোধহয় ভালোবাসা পাওয়ার নিশ্চয়তা এনে দিয়েছিল। সে কানের কাছে মুখ নিয়ে শান্ত ভাবে বলল,
“তুই কি ভেবেছিলি, আমার চোখে যমুনা বাধিয়ে নিজের তরী ভাসিয়ে পালাবি? সেই সুযোগ দিচ্ছি না আর, এখন থেকে এক তরীতেই ভাসব, আর যমুনা ডিঙিয়ে কূলে ভিড়ার অপেক্ষা করব”
বল্লাম, এক বাদরের কামড় খাওয়ার জন্য সেই অপেক্ষার অবসান করব। কথা দিচ্ছি। এখন যাই?

৮।

-যাই তাহলে? অস্ট্রেলিয়ায় ফিরলে হয়তো দেখাও হয়ে যেতে পারে।

এয়ারপোর্টে নেমে নিরীহ ভদ্রলোক বিদায় নিয়ে শশুরবাড়ীর পাঠানো গাড়ী চেপে বসলেন। আমাকে রিসিভ করতে কেউ আসেনি। আমি আসব তা কেউ জানে না, এমনকি রেজাও না। রেজার স্পন্সরশীপ পেয়েই হুট করে দেশে আসার সিদ্ধান্ত। রেজার কাগজপত্র সব রেডি। আমিসহ ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান এ্যম্বাসিতে দাঁড়ালেই রেজার ভিসা আর ঠেকায় কে? আমার এতদিনের স্বপ্ন এই সত্যি হল বলে। বলছিলাম না, ছোট্ট ছিমছাম গোছানো একটা ঘর সাজিয়েছি। গত পাঁচ বছর রেজাকে একটিবারের জন্যও দেখিনি। ঐ স্কাইপে-টেস্কাইপে দেখে কি আর মন ভরে? ফোনে কিংবা মোবাইলে কথা বলার সময় রেজাকে শুধু একটিবার স্পর্শের ব্যাকুলতার কি কষ্ট, তা কেবল আমার ঘরের চার দেয়ালেই জানে। রেজার কামড়ের জন্য যে আমি অতিষ্ঠ, সে আমি একটিবার তার দাঁতের ছোঁয়ার জন্য উম্মাদের মত অপেক্ষা করেছি। এইবার হাত কেন; শরীরের সব কাপড় বেকসুর খালাস করে সপে দিব তার দাঁতের কাছে। নে শালা যত পারিস কামড়া, তোর বিষাক্ত দাঁতের কামড়ে-কামড়ে বিষিয়ে দে আমার যত অতৃপ্ত বাসনা।

শুনেছি দেশীয় সমকামি ভালোবাসার প্রধান প্রতিবন্দক বিয়ে। রেজা আর আমি এসব চিন্তামুক্ত। অস্ট্রেলিয়ার সমকামি বিয়ে বৈধ, আমি এখন সে দেশের নাগরিক। আর রইল রেজার কথা, তাও সমস্যা না। রাব্বানি স্যারের সাথে কথা হয়েছে, চট-জলদি ছেলের বিয়েতে ঘোর আপত্তি তার। অস্ট্রেলিয়ায় এসে এম,বি,এ টা শেষ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক তার বাদে নাহয়…। অস্ট্রেলিয়ায় আসা মানে আমাদের নিজস্ব কামড়াকামড়ির ছোট্ট একটা সংসার। আলাদা করা কার বাপের সাধ্যি? অবশিষ্ট জীবনটা শুধু আমাদের দু’জনার।

বাড়ীতে ঢুকার মুখেই চাচীর কাছে খারাপ খবর শুনলাম। রাব্বানি স্যার ক’দিন ধরে অসুস্থ। কালরাতে অবস্থা অনেক খারাপ ছিল, বাবা সবাইকে নিয়ে ওবাড়ীতে। পরিবারকে সারপ্রাইজ দেয়া মুখের হাসি মলিন হয়ে এল। স্যারের জন্য খারাপ লাগছে, সাথে রেজা! ব্যাগ নামিয়ে ওবাড়ীর দিকে হাঁটা ধরলাম। রেজার উপর মেজাজ খারাপ হল, শালা আমাকে একবারও জানাল নাহ! অবশ্য, গত তিন- চারদিন আমিই যোগাযোগ করতে পারিনি।

হাঁটছি সেই পরিচিত রাস্তা ধরে। সামনে আমাদের স্কুল, বাম দিকে বুজে যাওয়া পুকুর ঘাট। ওদিকে তাকিয়ে মনে মনে বল্লাম, স্যার সুস্থ হলে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে আমাদের শৈশব কাটানো স্থান গুলো আবার মাড়াবো। তখন রেজা ছিল শুধুই বন্ধু আর এখন….।

রেজাদের বাড়ীর পরিবেশ থমথমে। তবে গলা ফাটানো বিলাপ নেই দেখে কিছুটা স্বস্তি। স্যার নিশ্চয় এখনো বেঁচে আছেন। ঘরে ঢুকতেই বাবাকে দেখলাম মুখ ভারী করে চোখে কান্না চেপে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে যতটা অবাক হবার কথা ছিল তা হলেন না। হয়তো বন্ধুর অসুস্থতা ছেলের আগমনের চেয়ে বেশি সারপ্রাইজড করেছে। তারপরও জড়িয়ে ধরলেন। বাবা দরজার দিকে মুখ করে, আমি তাকালাম ভিতরের দিকে, যেখানে আমার উদাসী কামড়-কুমার বিষন্ন মুখে বাবার পাশে বসা। উস্কখুস্ক চুল, মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, কপালে চিন্তার ছাপ, টিকালো নাকের উপর রাতজাগা ব্রণ। ইচ্ছে করছে বাবার কাছথেকে নিজেকে মুক্ত করে ব্রনটা গেলে দিয়ে আসি। কামড়কুমারের ফর্সা চেহারায় ব্রণটা বড্ড বেমানান দেখাচ্ছে। এলোমেল্যো চুল গুলো খামছি মেরে ধরে মাথাটা আমার বুকে লেপ্টে রাখি। নির্ঘুম কামড়কুমার নিশ্চন্তে কিচ্ছুক্ষন ঘুমিয়ে নিক। চিন্তার সুতো কাটে ছোটবোনের চিতকারে। বাবাকে হটিয়ে সে বুকে ঝাপ দিল।

স্যারের বিছানার তিন পাশে থাকা আত্মীয়স্বজন সবার চোখ এখন আমার উপর। বোনকে ছেড়ে রেজার দিকে পা বাড়াবো, ঠিক সেই মুহুর্তে ঘোমটা টেনে সুমনা রেজার কাঁধে হাত রাখে! সে হাত যেন অধিকারের ভারে নেতানো। সুমনার পাশে দাঁড়ানো সেই অস্ট্রেলিয়ান নীরিহ ভদ্রলোক পরিবার!!!

আমি ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা আমাকে ফিসফিসিয়ে বল্লেন, তোর স্যারের পাশে গিয়ে বস? আমি নির্বাক হয়ে বাবার দিকে তাকাই। বাবার চোখে পানি কিন্তু আমি কাঁদতে পারছিলাম না। আসলে কি জন্য কাঁদব বুঝতে পারলাম না, পিতৃতুল্য স্যারের জন্য; নাকি আমার স্বপ্নরাজ্য চুরমার করে অধিকারের যে হাত রেজার কাধে উঠেছে তার জন্য? রেজা ঘুমহীন চোখে কান্না নিয়ে কি; কান্না চেপে একটু বেশি’ই সোজাসুজি তাকাল আমার দিকে। তার শান্ত চাউনিতে স্পষ্টই দেখলাম, অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের গোছানো ছোট্ট সংসারটি সন্ন্যাসী হওয়ার ভয়, দেয়ালের গায়ে তার পছন্দের লাল রং কালো হওয়ার বীভৎসতা, ড্রিপ ফ্রিজে রাখা রেজার পছন্দের কাপ আইস্ক্রিম গুলো ডাস্টবিনে যাওয়ার আর্তনাদ।

আমি তখনো আমার স্বপ্নের সারথির অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে….

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.