স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের গল্প

লেখকঃ নৃ আভাষ

আজানের শব্দে প্রচন্ড অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল। প্রশাব চেপেছে খুব, তলপেট ফেটে যাবার জোগাড়। তবু ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলাম। উঠা যাবে না, বাথরুমে যেতে গেলেই আব্বা টের পেয়ে যাবে। সে নাছোড়বান্দা। খপ করে ধরে ফেলবে। বলবে-
-উঠছিস যখন তখন চল বাজান নামাজটা পড়ে আসি।
কাঁথাটা মুখের উপর টেনে প্রশাবটা অগ্রাহ্য করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। হঠাৎ মাথার উপর একটা করকরে হাত টের পেলাম। স্নেহমাখা কন্ঠে কেউ একজন বলছে-
– উঠো বাবা, চল নামাজটা পড়ে আসি। তারপর সারাদিন ঘুমাইয়ো।
রাগে গায়ে আগুন ধরে গেলো। প্রতিদিন এক জ্বালা আর সহ্য হয় না। দাঁতে দাঁত চেপে শুয়ে রইলাম, কঠিন কিছু কথা মুখে এসে গিয়েছিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রন করলাম।দিনের শুরুতেই রাগারাগি করে আব্বার মন খারাপ করিয়ে দেয়ার কোন মানে হয়না।
-আব্বা আমার, চলো। আজ নামাজ পড়ে তোমার দাদীর কবর জেয়ারাত করবো। তুমি না গেলে কষ্ট পাবে। স্বপ্নে দেখলাম, তোমারে খুব দেখতে চাইলো। আমারে ডেকে বলল- “বাবা মানিক, তোর পোলাডারে কতদিন দেখিনাই। কতবড় হইছে, কেমন হইছে কিছুই জানিনা। একবার তো আমার কাছে ওরে নিয়াও আইতে পারস নাকি? ওর লিগা আমার পরান পুড়ে।” বলতে বলতে আব্বার কন্ঠ ভারী হয়ে এলো। টপ করে এক ফোটা পানি পড়লো আমার কপালে। আমি উঠে বসলাম। অদ্ভুত! কেউ নেই!

সবই তো ঠিক আছে, আজানও তো দিচ্ছে! আসসালাতু খইরুমমিনার নাওম।। আমি কপালে হাত দিলাম, কপাল ভেজা। হাতের পানি জ্বিভে ছোঁয়ালাম, লবনাক্ত। আজও রাতে জ্বর এসেছিল। লাইট জ্বালালাম, ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো।

খুব সাবধানে দরজা খুলে আব্বার ঘরে উঁকি দিলাম। আব্বা কেমন অসহায়ের মত ঘুমাচ্ছেন। আজান তো শেষ, নামাজ পড়তে ডাকবো কিনা ভাবছি। তখন আচমকা সব মনে পড়ে গেল। একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। যত দ্রুত সম্ভব রুম থেকে বের হয়ে এলাম। নিজের ঘরে এসে এক চুমুকে শেষ করলাম গ্লাসের সবটুকু পানি।

তেইশে মার্চ! আমার পঁচিশ বছর জীবনের সবচেয়ে জঘন্যতম দিন। সেই দিন থেকে আব্বা আমার সাথে কথা বলে না। আমিও লজ্জায় সামনে পড়ি না তার। হয়তো তাকে সব ব্যাখ্যা করতে পারতাম, নিজের হয়ে ওকালতি করতে পারতাম, কিন্তু কখনো ইচ্ছে করে নি। তাছাড়া কি প্রমাণ করবো? আমি নির্দোষ? তাতে লাভ কি? প্রমাণ করলেই কি সব আগের মত হয়ে যাবে? আব্বা কি আবারো আগের মত করেই আমাকে ভালোবাসবে, আদর করবে? জেনেই তো গেছে আমি গে! এখন চাইলেই কি সব আগের মত করে পাওয়া সম্ভব!

যে ঘটনার জন্য আব্বা জেনে গেছে আমি গে সেই ঘটনার বা সেই অপরাধের কি ব্যাখ্যা করবো। কি বলবো? আব্বা, এটা কোন অসুখ না, আমার রক্তেরো সমস্যা না,আমি পৃথিবীর সেই ১০ ভাগ মানুষের একজন যারা সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়! আমি সমকামী! বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে সমকামিতা স্বাভাবিক বিষয়! আমার ছেলেদের দেখলে কাম জাগে।আর ওই ছেলেটার সাথে যা হইছে তাও স্বাভাবিক। এসব বলবো? এসবও কি বলা সম্ভব?

একদিন সবাই কি যেনো একটা অনুষ্ঠান দেখছিলাম টিভিতে। হঠাৎ কনডমের একটা এ্যাড দিলো। ছোট ভাইটা খটখট করে হেসে বললো, -আম্মু দেখো, বেলুনেরও এ্যাড দিচ্ছে! হি হি। আব্বার চোখ লাল হয়ে গেল, রিমোর্টটা আছার দিয়ে ভেঙে ফেলে ওরে কসিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। ও কিছু বুঝতেই পারলোনা, আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ পর কেঁদে দিলো। তারপর থেকে আব্বার সাথে বড় জোর একসাথে খবর দেখতাম। আর সেই বাবার সামনে কি করে নিজের সাফাই গাইবো। নিজের সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কথা বলবো!

রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। জীবনের সব থেকে খারাপ সময় যাচ্ছে, ধৈর্য ধরতে হবে, আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন। বিপদ মুক্তির দোয়া পরতে পরতে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ইয়া সাফিয়াল আমরাজ, ইয়া হালাল মুসকিলাত…..
ঘুম এলো না বরং একরাশ বিষন্নতা এসে চেপে বসলো,অন্ধকার আরো ঘন মনে হতে লাগলো ।এমন লাগছে যেন আঠালো অন্ধকার গুলো লিকলিক করে আমার গা বেয়ে উঠছে। আমি ছটফট করতে লাগলাম। কি করবো আমি? এত কিছুর পরও নির্লজ্জের মত বেঁচে থাকবো? ঘৃনা নিয়ে বেঁচে থেকে কি হবে? নিজের জন্মদাতার ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব? সবকিছুর উর্দ্ধে বেঁচে থাকাটাই কি সব কিছু, এটাই কি সার্থকতা? সেই হিসেবে পৃথিবীর সার্থক প্রানী হতো কচ্ছপ। আমিতো কচ্ছপ না।

অস্থিরতা বাড়তে লাগল। আমি বাবার মুখোমুখি আর কখনোই দাঁড়াতে পারব না। বাবা কখনো আর গভীর স্নেহে আমার পিঠে হাত রাখবে না। ঈদের সকালে নতুন পাঞ্জাবী গায়ে চড়িয়ে আর কখনো বাবার সাথে ঈদগাহে যাওয়া হবে না। বাবা কখনো আর আমাকে নিয়ে গর্ব করবে না। আমরা আর কখনো এক টেবিলে বসে খাবো না। গ্রীষ্মে পুকুরের জল শুকিয়ে এলেও বাবা ছেলে একসাথে মিলে আর কখনো মাছ ধরতে যাওয়া হবে না। চারদিকে অসংখ্যা ‘না’ তীর্যক ফলার মত ঝুলতে থাকলো। অস্থিরতা বেড়ে চরমে উঠলো, হৃদপৃন্ডটা হাতুড়ি পেটার মত শব্দ করতে লাগল। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বসে সিগারেট জ্বালালাম। তারপর হঠাৎ করেই সিদ্ধান্তটা নিলাম। অতঃপর আশ্চর্য এক শান্তি ছড়িয়ে গেল। হৃদপৃন্ডটা শান্ত হয়ে এলো। আমি খুব ধীরে সুস্থে সিগারেটটা শেষ করলাম। তারপর খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্ধকার কেটে উঠে দাড়ালাম।


ওয়ারড্রব এর কাছে গিয়ে একগোছা দড়ি বের করলাম। নীল নাইলনের শক্ত দড়ি। আচ্ছা নীল কি আমার প্রিয় রঙ নাকি অপ্রিয়? ঠিক মনে করতে পারছি না। কে যেন বলেছিল বেদনার রঙ নীল, কি হাস্যকর! যেই উজবুক বলেছিল সে জানেই না নীল হল আসলে যন্ত্রনা মুক্তির রঙ। আমি কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত দড়িটার দিকে চেয়ে থাকলাম, কী গভীর তীব্র নীল! বিষের রঙও নাকি নীল। বিষ’ও তো মানুষকে মুক্তি দেয়। অথচ নীলকে মহিমান্বিত না করে সবাই একে বেদনা জাগানিয়ার অপবাদ দিয়ে দিয়েছে। কোন মানে হয়?

অন্ধকার হাতরে চেয়ারটা খাটের উপর উঠালাম। ফ্যানটাতে কি ধুলা জমেছে! হাতটাই নোংরা হয়ে গেলো।আহ কি সব ভাবছি! এইতো আর মাত্র কয়েকটা মুহুর্ত, তারপরই আমি উঠে যাবো সব ধুলা ময়লার উর্দ্ধে। আনন্দ বেদনা, যন্ত্রনার উর্দ্ধে। এইতো নীল দড়িটা দুলে দুলে ডাকছে। নীল মুক্তি আমাকে ডাকছে। এক পৈশাচিক আনন্দে চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। অনেকদিন পর হালকা লাগছে।

মায়ের মুখটা ভেসে এলো। মা, ……যাই। আব্বাকে প্রতিরাতে মনে করে রুটি বানায় দিও। কি যে অলস তুমি মা, প্রতিদন অফিস যাওয়ার আগে অবশ্যই খেয়ে বের হবা। খালিপেটে সারাদিন ঘুরো, ভাল্লাগেনা। আর হ্যা মা, মাগো তোমার এই অযোগ্য পুত্রকে ক্ষমা করো। জানি এই কথা তুমি শুনতে পাবে না তবু বলে যাই ‘মা তোমার সন্তান কোন অপরাধ করেনি। সমকামীতা কোন অপরাধ না মা।
মা……মারে ……..

শেষবারের জন্য চিৎকার। কেউ শুনলো না।চোখ বন্ধ করে পা থেকে চেয়ার টা লাথি দিয়ে সরিয়ে দিলাম।

শরীরটা এত ভারী লাগছে কেনো! রক্ত চলাচল কি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? আমি হাত পা ছোড়ার চেষ্টা করছি, সব পাথরের মত ভারী।নিশ্বাস নিতে পারছি না। মা ….ওমা….আমি বাঁচবো, সবকিছু তুচ্ছ করে আমি আরেকবার বাঁচতে চাই, আমি আরেকবার তোমার কোলে মাথা রাখতে চাই, আরেকবার তোমার আঁচলের গন্ধ গায়ে মেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চাই।

আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এরকম কতক্ষন চলবে আরো? বুক ফেটে যাচ্ছে। আমাকে বাঁচতে হবে, যে করেই হোক। আমি হাত পা নড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি, পারছি না। আমি অতলে তলিয়ে যাচ্ছি, আমার ব্যথাবোধ কমে আসছে, আমি ক্রমশই একটা গভীর অতল ঘোলা কুয়াশায় ডুবে যাচ্ছি। আমার প্রচন্ড শীত লাগছে। আমি তীব্র ভয়ে আচ্ছন্ন হলাম। হঠাৎ স্বপ্ন দৃশ্যের মত দেখলাম কেউ এক বরফ শীতল হাত প্রসারিত করে আমার দিকে ভেসে আসছে। তার কোমল হাত আমার মাথা স্পর্শ করলো, একবার দুবার। অতঃপর মৃদু ঝাকুনির মত দিলো। তার কাঁচের চুড়ি টুংটাং করে বাজতে লাগলো, এই শব্দ আমার পরিচিত, অতি পরিচিত। দুর থেকে, অনেক দুর থেকে এক মধুর ধ্বনি ভেসে আসলো-
-প্লাবন,কি হইছে বাবা, কি হইছে? এভাবে ডাকছিলি কেন?
আমি লাফ দিয়ে উঠলাম, বুঝতে সময় লাগলো আমি স্বপ্ন দেখছিলাম।
-এত ঘেমেছিস কেনো? আবার দুঃস্বপ্ন দেখছিস?
আমি বাকরুদ্ধ, এখনো স্বপ্নের রেশ কাটে নি। খুব ক্লান্ত লাগছে। ক্লান্ত কন্ঠেই টেনে টেনে বললাম –
-হ্যা মা, দুঃস্বপ্ন দেখেছি, ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেছি। মা তুমি কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে থাকো।
মা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থাকলো। তারপর পরম মমতায় আঁচল দিয়ে আমার ঘামে ভিজে যাওয়া পিঠ মুছে দিতে লাগল।
আমার সকল ভয় দুর হলো। আমি মায়ের কোলে পরম নির্ভরতায় মুখ গুজলাম।
___________________________________________________________________
আমি জানি আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না।একজন খুনী, দাগী আসামী, ধর্ষকও জীবনের কোন একটা সময় প্রায়শ্চিত্য করার সুযোগ পায়। আত্মহত্যা সেই সুযোগ কেড়ে নেয়।

আর আমি আত্মহত্যা করবো কেনো! আমি জানি আমি কি। আমিতো কোন অপরাধ করিনি। হ্যা আমি গে, তো! সমকামী হওয়া কোন অপরাধ নয়। আমি বিশ্বাস করি লিঙ্গ ভেদে ভালোবাসাটা মানুষের সৃষ্টি। ভালোবাসার কোন লিঙ্গ নেই, আর পাঁচজন স্বাভাবিক মানুষের মতই আমি একজন স্বাভাবিক মানুষ। সবার মতই আমারো নিজেকে প্রচন্ড ভালোবাসার ক্ষমতা আছে।
আবার একদিন সব আগের মত হয়ে যাবে, অবশ্যই হবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি মাদার-নেচার কাউকেই ঠকায় না, এখন শুধু অপেক্ষা। একদিন ভোরে সব ঠিক হয়ে যাবে, আব্বা আবার মাথায় হাত রেখে বলবে-
“বাজান আমার, আজান দিছে চলো নামজ পড়ে আসি।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.