Calf Love

লেখকঃ নবাগত দূত

১.
একটু সরে বসো, আর সোজা হয়ে বসে মুভি দেখ প্লিজ!!! সিনেপ্লেক্সের লোকারণ্য সিনেমা হলে যথাসম্ভব নিচু গলায় কথা গুলো বললো রাজন্য।
ও হয়ত যুক্তিসংগত কথাই খুব স্বাভাবিক ভাবে বলেছে তবুও প্রণয়ের মন খারাপ হয়ে চোখে পানি এসে গেলো!!!

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই রাজন্য আবার খুব আস্তে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, প্লিজ প্রণয় সামনে তাকাও। আমরা মুভি দেখতে এসেছি আর তুমি আমার দিকেই ঘুরে আছো…

প্রণয় সামনের দিকে ঘুরে স্ক্রিনে চোখ রাখল ঠিকই তবে রাজন্যের দিকে আরেকটু চেপে ওর কাঁধে মাথা রাখতে চাইলো…

এবার রাজন্য বেশ রাগি গলায় তবে নিচু আওয়াজে বললো, প্লিজ…তুমি মাঝে মাঝে এমন কর কেন? আমরা একটা পাবলিক প্লেসে আছি এখানে এভাবে……পিছনের মানুষজন দেখলে কি বলবে? আজকাল এসব বুঝেনা কে?

প্রণয় কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে বললো,আমিকি তোমাকে ছুঁতেও পরবো না? আর চারিদিকে তাকিয়ে দেখো কত মানুষ একজনের কাঁধে আরেকজন মাথা রেখেই মুভি দেখছে।

রাজন্য এবার অধৈর্য হয়ে বললো, তুমি যাদের উদাহরণ দিচ্ছো তারা সবাই নরমাল কাপল, তারা পাবলিক প্লেসে এমন আচরণ করতেই পারে……ইটয সিম্পল…

তাহলে আমরা কি এবনরমাল?
আর কোন কথা না বলে প্রণয় সোজা হয়ে হলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

২.
মুভি দেখে বাসায় ফেরার পথে রিক্সায় প্রণয় গম্ভীর হয়েই রইল আর রাজন্য ভাবতে থাকলো ছেলেটা এমন কেন? কোন কালেই ওকে বুঝে উঠতে পারলাম না। অনেক ভাগ্য থাকলে এমন বয়ফ্রেন্ড পায় মানুষ,এই জগতে প্রণয়ের মত মানসিকতার গুনি একজনকে নিজের করে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার,অনেক গুন ছেলেটার তবুও মাঝে মাঝে ওর আচরণে হতভম্ব হতে হয়। একটু বেশিই আল্লাহাদি। হঠাৎ হঠাৎ এমন এক একটা কাণ্ড করবে!!! ও যে স্থান কাল পাত্র বুঝে না,তাও না…
এই যেমন গত পরশু সন্ধ্যের সময় রিক্সায় বসে বলল ওর কপালে চুমু খেতে, কি আশ্চর্য!! মাঝে সাঁঝেই ও পাবলিক প্লেসে জোর করে আমায় আদর করতে যায়। সেদিনও দাড়িওয়ালা মুরুব্বি গোছের এক ভদ্রলোক আমাদের ঐরকম আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেললো। ভাগ্যিস চলন্ত রিক্সায় ছিলাম।

প্রণয়ের খেয়ালি স্বভাবের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘাড় ঘুরিয়ে প্রণয়ের দিকে তাকালো রাজন্য। দেখলো চলন্ত রিক্সায় হালকা বাতাসে চুল গুলো উড়ছে ওর, নাকটা লাল হয়ে আছে, রাগলে ওর নাক লাল হয়ে যায়। চোখ দুইটা ভেজা ভেজা, কি যে সুন্দর লাগছে ওকে!!!
চলন্ত রিক্সায় প্রেমিকের সাথে চলার সময় সবারই প্রেমিক মন আদ্র হয়ে যায়। উপরে উপরে প্রণয়ের এমন নিষ্পাপ রূপ হঠাৎ করেই রাজন্যের সব বিরক্তি দূর করে দিল। রাজন্য মনেমনে নিজের উপর এখন রাগ করতে লাগলো,ধুর এত কড়া করে কথাগুলো না বললেও পারতাম!!

রাজন্য প্রণয়ের একটা হাত শক্ত করে ধরে ওর কোলে তুলে নিলো। ঠিক তখনই প্রণয়ের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জল……
তখন রাজন্য প্রণয়ের মন ভালো করার জন্যই হোক কিংবা ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যেই হোক গুনগুন শুরু করে গাইতে শুরু করলো-

“আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো জানো না
যখন তোমাকে পাবো না…”

৩.
এই আমার হাতটা ধরে রাস্তাটা পার করে দাওতো !!!
প্রণয় আজকেও আবার?? প্লীজ বাবু এটা না করলে হয় না? রাস্তায় কত মানুষ?
হোক মানুষ, তুমি যদি আমায় হাত ধরে পার করে না দাও তাহলে আমি চোখ বন্ধ করে রাস্তা পার হব। খুব সাধারণ ভাবেই কথাগুলো বলল প্রণয়।

রাজন্য ভালো করেই জানে এখন ওকে হাত ধরে রাস্তা পার না করলে ও সত্যি সত্যিই তাই করবে,তাই কোন উপায় না দেখে ওকে হাত ধরে রাস্তার ওপাড়ে নিয়ে গেলো রাজন্য……
ঐ পাড়ে গিয়ে প্রণয় বলল,এখন চলো আমরা কাঁচের বোতলের মিরিন্ডা খাবো……
রাজন্য কোন কথা বলল না কেবল চুপ করেই রইল। একরাশ বিরক্তি আর রাগে ওর মনটা বিষিয়ে আছে…………

প্রণয় জিজ্ঞেস করলো,আচ্ছা তুমি বিয়ে করবে কবে?

জানি না!

আনুমানিক কবে?

বড় ভাইয়ের বিয়েটা আগে হয়ে নিক তাছাড়া মাত্রইতো জব শুরু করলাম আর একটু গুছিয়ে নেই তারপর।

তার মানে ধরো ২ বছর, আর বেবি হতে হতে আরো ৩ বছর,তাই না?

উফফ…প্রণয় এগুলো কি ধরণের কথা? এগুলো শুনতে একদমই ভালো লাগছে না এখন।

প্রণয় রাজন্যর বিরক্তি-রাগ’কে পাত্তা না দিয়ে অনর্গল বলতে থাকলো,আমার মাথায় অনেক সুন্দর সুন্দর নাম আছে। জানো নামগুলো কীসের? তোমার বাচ্চাকাচ্চা’র নাম….আচ্ছা না থাক,তাহলে তোমার বউ বেচারির অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হয়ে যাবে তাছাড়া তারও তো একটা শখ আছে।

আচ্ছা তুমি কিছুক্ষণ একটু চুপ থাকবে প্লিজ? কি সব আবোলতাবোল বলছো? তুমি নিজে জানো?

প্রণয় খুব স্বাভাবিক ভাবে হাঁসিমুখে বললো,আমি মোটেও আবোলতাবোল বলছি না, তুমি তো বিয়ে করবেই তাই না? আর করাও উচিৎ যেহেতু মেয়েদের প্রতিও তোমার আকর্ষণ আছে। তাছাড়া সমাজ সংস্কার বলেও একটা বিষয় আছে, তোমার মত লক্ষ্মী ছেলের অবশ্যই ঘরসংসার করা উচিৎ…হা হা হা!!!

এতে এতো হাসির কি হলো? আর প্লিজ এখন তোমার এসব পাগল পাগল কথা শুনতে একদমই ভালো লাগছে না। মাথাটাও ধরেছে ভীষণ। চলো আজ উঠি।

যেতে তো হবেই। আচ্ছা যাওয়ার আগে লাস্ট একটা পাগল পাগল আবদার করি?? এই এদিকে তাকাও না!!

হুম, কি বলবা তাড়াতাড়ি বলো।

আচ্ছা তুমি তোমার কল্যাণপুরের মেস ছেড়ে উত্তরায় একটা বাসা ভাড়া নেওনা প্লিজ! আমিও বাসায় আম্মু-আব্বুকে বলে ম্যানেজ করে ফেলবো, বলবো প্রতিদিন এতদূরে জার্নি করে জ্যাম ঠেলে ক্লাস করতে অনেক কষ্ট হয়। আমি উত্তরায় এক ফ্রেন্ডের সাথে থাকবো……আরে এতো আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছো কেন? মুখাখানা ওভাবে হাঁড়ির মত করে রেখেছ কেন?…আচ্ছা থাক থাক লাগবে না ওসব…আমিতো জাস্ট ফান করলাম। ধুরর্…আসলেই আমি আজ কি ভাবছি আর কি বলছি নিজেই বুঝতে পারছি না। চলো আজ উঠি,সেই’ই বরং ভালো!!

৪.
হিসাব নিকাশ করে দেখা গেলো গত প্রায় ৩দিন ধরে প্রণয় কথা বলছে না রাজন্যর সাথে, এই প্রথম এত দীর্ঘ সময় ধরে কথা না বলে থাকতে হচ্ছে ওদের… প্রণয় অবশ্য চাচ্ছে রাজন্যই ওকে প্রথম ফোন করুক, ওর রাগ ভাঙ্গাক। তবে ও জানে রাজন্য কখনোই এমন করবে না। ও মোটেও এতোটা রোম্যান্টিক না। অন্যদের প্রেমিক হলে হয়তো বাসার নিচে অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য দাঁড়ায়ে থাকতো কিন্তু রাজন্য হলো একেবারেই যা তা মার্কা প্রেমিক! ও হয়তো ইন্টারনেট থেকে ঠিকই পড়ছে “অভিমান ভাঙ্গানোর ১০টি সহজ উপায়” কিন্তু সেগুলো শুধু পড়েই খালাস। কোনদিনও এপ্লাই করবে বলে মনে হয় না। ও আসলে এমন টাইপেরই না।

প্রণয়ের আবারো মন খারাপ হয়, ওর ভয়ানক খারাপ লাগে!একগাদা মন খারাপ নিয়ে কফি বানাতে যায়…হঠাৎ প্রণয়ের মোবাইলে এস.এম.এস এর রিংটোন বেজে ওঠে,ওপেন করে দেখে, না রাজন্য কিছু লিখে নাই। কমিক ফেয়ার নামক একটা ইভেন্ট থেকে ইনভাইটেশনের এস.এম.এস এসেছে। প্রণয়ের খুব ইচ্ছে রাজন্যকে নিয়ে সেও এরকম কোন কমিক ফেয়ারে যাবে। ওর হাত ধরে ঘুরবে। কিন্তু প্রণয় বেশ ভালো করেই জানে সেটা কখনোই পূরণ হবার নয়। তাই রাজন্য কে নিয়ে কমিক ফেয়ারে ঘুরছে এমন কল্পনা করতে করতেই কফির পানি নামাতে রান্নাঘরে চলে গেলো প্রণয় ।

৫.
একটা অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরে দরজা খুলে ভেতোরে ঢুকতেই বুকটা ধক করে উঠলো আনোয়ারা বেগমের । ঘরভর্তি ধোঁয়া আর গ্যাসের উৎকট গন্ধ। চুলা জ্বালাতে গিয়ে প্রণয়ের SLE(Systematic Lupus Erythematosus নামক একটা রোগ)এর অ্যাটাক হলো নাতো আবার? অঘটন কিছু ঘটলো নাতো? আতংকে আনোয়ারা বেগম চোখমুখ শুকিয়ে আসতে লাগলো। তিনি মনেমনে বলতে লাগলেন, কতবার প্রণয়কে সাবধান করে দিয়েছি একাএকা যেন চুলার ধাঁরে কাছে না যায়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তিনি তড়িঘড়ি করে রান্নঘরের দিকেই আগে গেলেন। গিয়ে দেখলেন চুলা আসলেই দাউদাউ করে জ্বলছে, কি অলুক্ষণে কাজ!
জলদি চুলাটা নিভিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে সামনে তাকিয়েই দরজা ধরে ধপাস করে বসে পড়লেন তিনি… মুখ দিয়ে ফেনার সাথে রক্ত বের হয়ে ভেসে গেছে মেঝে। আনোয়ারা বেগমের গলা যেন কেউ চেপে ধরে রাখছে। তার গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছে না,সে শুধু দেখে প্রণয়ের ডান হাতটা কিছুটা নড়ে উঠলো আর অস্পষ্টভাবে বলল “মা আমি কফির সাথে ২৭টা ঘুমের ওষুধ ………”

৬.
রাজন্য’র হাসপাতালের বাইরে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করতে ভালো লাগে না । অফিস করতেও ওর ভালো লাগে না । ঘুমের বড়ি ৭টা নাকি ২৭টা এখন এতে কিছু যায় আসে না… কারণ প্রণয়ের জ্ঞান ফিরে নাই গত ৩দিনেও। রাজন্য এই প্রথম একটা চিঠি লিখেছে প্রণয়কে দেবে বলে। আর চিঠিটা সে নিজেই পড়ে শোনাবে প্রণয়কে। এই চিঠিটা পড়লে রাজন্যর প্রতি প্রণয়ের যে আর কোন রাগ-অভিমান থাকবে না সেটাও রাজন্য বেশ ভালো করেই জানে । কিন্তু ছেলেটার যে জ্ঞানই ফিরছে না…জ্ঞান ফিরলেই পড়ে শোনাবে। প্রণয়কে ওর লাইফের সব দুঃস্বপ্ন ভুলিয়ে দিতে হবে এই চিঠিটা পড়ে । কিন্তু কখন ওর জ্ঞান ফিরবে…
রাজন্য শুধুই অপেক্ষা করে যায়…

৫.

প্রিয় বাবু,
এত কেন অভিমান তোমার? এত কেন কাঁদো? এভাবে কাঁদতে থাকলে তোমার যেসব বন্ধুরা আমার আর তোমার বিষয়টা জানে তারা তো বিচ্ছিরি জোকস করবে যে তুমি আমার সাথে না একটা পেঁয়াজের সাথে প্রেম করছো ।

তিন দিন ধরে একটা মানুষ আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে না বলে ভাবছো আমি আনন্দে আছি খুব। নাহ, মোটেও না। কারণ আমি যে এইদিকে প্রস্তুতি নিচ্ছি সারাজীবন ঐ ঘ্যান ঘ্যানানি শুনতে । আমি তোমাকে এখনো বলিনি, না? যে আমি খুব ভালো একটা চাকরি পেয়েছি,যে কয়দিন, হোক তা আমার বিয়ের আগপর্যন্ত। দুই কামরার সুন্দর একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি উত্তরায়। আমি জানি আমার সাথে থাকার জন্য তুমি তোমার বাসায় যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলবা পড়ালেখার দোহাই দিয়ে। তারপর হবে আমাদের সংসার,কিছুদিনের জন্য হলেও তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী চলবে আমাদের দুজনের সংসার। আমার অফিস আর উত্তরার বাসার পথে জ্যাম ঠেলে ফিরতে কিন্তু অনেক দেরি হবে, আর আমার দেরি করে ঘরে ফেরা নিয়েও তোমার ভীষণ অভিমান থাকবে জানি, তাই আগেভাগেই বলে রাখি তখন কিন্তু এত বড় চিঠি লিখতে পারবো না,হুম। আচ্ছা বাবু তুমি কি আমার জন্য রাত ৩টার দিকে কফি বানাবা? আর আমার জামাকাপড় তুমিই তো ধুয়ে দিবা তাই না?
আমার আসলে এত কিছু লাগবে না জানো। তুমি এখন যেভাবে আমাকে ভালোবাসো শুধু এইভাবেই ভালোবাসতে থাকো । আমি তোমাকে কতখানি পছন্দ করি তা বলবো না। শুধু বলি আমার বিয়ের পরে আমার বাচ্চাকাচ্চার নাম কিন্তু তুমিই রেখো, তোমায় কতটা ভালোবাসি পছন্দ করি তা বোঝার জন্য এই লাইনটাই কি এনাফ নয়, প্রণয়? আর এভাবে বড় বড় চোখ করে ভালবাসা নিয়ে সেইদিনও তাকায় থাইকো লক্ষ্মী ছেলে। প্রমিজ করো আর এমন অভিমান করবে না।

ইতি
তোমার বিড়াল
…………………………………..

“প্রণয়ের সমাধির পাঁশে দাঁড়িয়ে রাজন্য চিঠিটা পড়া শেষ করে বুক পকেটে সযত্নে রেখে দিলো। আগামী বছর ঠিক এই দিনেই… জীবিত অবস্থায় পড়ে শোনাতে না পারা চিঠিটা এভাবেই প্রণয়কে আবারো পড়ে শোনাবে রাজন্য। আর শুনিয়ে যাবে অজস্রদিন…!!!!

*সমাপ্ত*

[বিঃদ্রঃ “Calf Love” একটা Idioms যার বাংলা অর্থ “বাছুর প্রেম”। আর গভীর অর্থে অতি-আবেগিয় কিংবা ভীষণ আহ্লাদিত প্রেম]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.