আমার অভিজ্ঞতাঃ RYLP15

আমার সম্পর্কে নিজের একটা অভিযোগ হল অনেক বেশি ভাবুক স্বভাব এর আমি। কোন একটা বিষয় নিয়ে এতো বেশি চিন্তা করে ফেলি যে পরে আর সেটা বাস্তবে রূপ দেয়ার সাহস আর করা হয়ে উঠে না। কিন্তু আসলে মূল কথা হল আমি খানিকটা ভিতু চরিত্রের মানুষ। নিজেকে ভিতু পরিচয় দিয়ে কি কেউ আর লেখার শুরুটা করতে চায় বলেন!

যাই হোক এবার একটু বীরত্বের কথা বলে নেই, কিছুদিন আগে একটু সাহস জোগাড় করে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছিলাম রূপবান আয়োজিত ‘Youth Leadership Program 2015’ তে। বরাবর এর মতো এবারো সেই দুশ্চিন্তার ডালপালা মনের ভিতর নানা প্রশ্ন তৈরি করছিলো, যাবো কি না? কি ধরনের প্রোগ্রাম? কতো মানুষ এর সামনে আবার কথা বলতে হবে? এসব প্রশ্ন যখন মগজে বারবার খোঁচা দিচ্ছিল, তখন একটা পর্যায়ে সিধান্ত নিয়েই নিলাম যে কিছু শিখি আর নাই বা শিখি, আমি যাবো এবং সকলের সামনে আমার চিন্তা গুলো তুলে ধরবো। দুদিন ব্যাপী একটি কর্মশালা ছিল এটি। প্রথম দিন অর্থাৎ ২৭ ফেব্রুয়ারী গিয়ে উপস্থিত হলাম প্রোগ্রামের নির্ধারিত ভেনুতে। রুমে ঢুকবার আগে অসম্ভব রকমের উত্তেজনা কাজ করছিলো আমার মাঝে, যেন আজ বিরাট কিছু করে ফেলবো! কিন্তু দুঃখের বিষয় হলও এতগুলো মানুষ একসাথে দেখবার পর আমার সাহসের আধার ক্রমশ ফুরিয়ে এলো।

যাই হোক, অপেক্ষার পালা শেষ হতেই আমাদের প্রথম প্রশিক্ষক মাহবুব তনয় Ice Breaking  সেশনটি শুরু করলেন। আমার মতো যারা একটু সংকোচ, দ্বিধা বা ভয় নিয়ে অপেক্ষা করছিলো তাদের ভিতরকার বরফকে গলিয়ে একটু উদ্যমী করে তোলাই ছিল এই সেশন এর মূল উদ্দেশ্য। দুটো ভিন্ন ধরনের মজার খেলার মাধ্যমে সেশনটি পরিচালনা করেছিলেন মাহবুব তনয় এবং বলতে গেলে এটিই অনেকাংশে আমাকে পরিবেশ এর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। ঠিক এর পরের সেশনটি থেকে শুরু হল মূল আলোচনা পর্ব এবং প্রথম বিষয় বস্তু ছিল ‘সিধান্ত গ্রহণ’। এম কে আরেফ পরিচালিত এই সেশনটি নিয়ে আমার অনেক বেশি আগ্রহ ছিল কারণ আমার ধারণা ছিল এই সেশনটির পর থেকে সিধান্ত গ্রহণে আর কোন ধরনের সমস্যা হবে না আমার! কিন্তু আলোচনা শেষে বুঝতে পারলাম যে আমি এক হাত বেশি চিন্তা করে বসে আছি, আসলে কোন কার্যক্রম শুরু করবার আগে কি কি বিষয় নিয়ে ভাবলে বা আলোচনা করলে আমরা একটা লক্ষে পৌছতে পারবো তা আমাদের কাছে তুলে ধরাই এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিলও। আরো একটু বিস্তারিত আলোচনা করলে ব্যাপারগুলো আরো পরিস্কার হয়ে উঠত আমাদের কাছে। তবুও সব মিলিয়ে এম কে আরেফ এর সাবলীল উপস্থাপনা খারাপ লাগেনি।

নিরাপদ যৌন আচরণ নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক সময় অনেক সংকোচ এবং প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় আমার । ‘প্লে সেফ’ সেশনটি আমাকে অনেকটাই সহযোগিতা করেছিলো এই সংকোচগুলো কাটিয়ে উঠতে । আগে এসব বিষয় নিয়ে সামান্য অসচেতন থাকলেও এখন একবার হলেও এই চিন্তাটি আমার মাথার মধ্যে কাজ করবে যে সামনে এগুতে হলে শারীরিক সুস্থতা বিষয়টা আমাদের জন্য কতোটা প্রয়োজনীয়।

ছবি আঁকার মাধ্যমে তুলে ধরো নিজেকে এই শ্লোগান নিয়ে শুরু হয়েছিল আমাদের পরবর্তী কর্মশালা ‘Art express’। একে তো ছবি আঁকতে হবে তার উপর আবার এতোগুলো মানুষের সামনে সেটা তুলে ধরতে হবে। Ice breaking সেশনে নিজের ভিতরকার বরফ যতটা গলাতে পেরেছিলাম সেটা আবারও জমাট বাঁধতে শুরু করলো এবং তার কারন এতগুলো মানুষ এর সামনে কথা বলতে হবে। কিন্তু যখন কথা বলতে শুরু করলাম তখন দেখলাম ব্যাপারটা  নিয়ে আমি যে পরিমান চিন্তিত হয়েছিলাম আসলে সেরকম কিছু না। নিজের চিন্তা গুলো অন্যদের কাছে তুলে ধরার মাঝে যে অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করে তা আজ প্রথমবার বুঝতে পারলাম। শিল্পী আলী আসগার এর ভিন্নধর্মী উপস্থাপনায় ‘Art express’ সেশনটি আমার জন্য একটা অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

প্রথম দিনের শেষ সেশনটি ছিলও ‘Fashion and grooming”। নিজেকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপনের জন্য বেশ কিছু টিপস পেয়ে গেলাম ডিজাইনার রেজওয়ান ইসলাম এবং জোতি রহমান এর কাছে। কিছু ভালো অভিজ্ঞতা পুঁজি করে দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে মনে হচ্ছিলো কিছুটা হলেও নিজের ভিতরে একটু সাহস যোগাতে পেরেছি আজ।

প্রথম দিন যতোটা ভয় আর চিন্তা কাজ করেছিল দ্বিতীয় দিনে ঠিক ততোটাই আনন্দ আর শেখার আগ্রহ নিয়ে চলে গেলাম ‘Youth Leadership Program’ এ। দিনের শুরুটা হয়েছিলো চমৎকারভাবে, ‘Gender and sexuality’ সেশন টির মধ্যে দিয়ে। সূচি করিম এর হাস্যরস পূর্ণ উপস্থাপনা এবং বন্ধুসুলুভ আচরণ আরও একবার আমার আমিকে সকলের সামনে তুলে ধরার জন্য আমাকে অনুপ্রানিত করলো। অনেক জটিল বিষয় বস্তু যে অনেক সহজ করে বুঝানো যায় এবং সামনে এগিয়ে নিজেকে মনের ভাব অন্যকে বলার মাঝে যে এক মানসিক প্রশান্তি কাজ করে তা আবারো আমি অনেক ভালো করে বুঝতে পারলাম।

এরপর একে একে হয়ে গেলো লিডারশীপকে কেন্দ্র করে আমাদের পরবর্তী সেশন গুলি। ব্যারিস্টার সারা হোসেন এর কাছ থেকে জানতে পারলাম আইনের কিছু প্রেক্ষাপট এবং আমাদের সমাজে এসবের প্রভাব। তেমনি শিরিন হক এর নিজ অভিজ্ঞতা আমাকে অনেক ভাবিয়ে তুললো যে একজন যোদ্ধা হিসেবে মাঠে নামতে হলে সাহস এর সাথে সাথে আরও অনেক বিষয় আছে যা আমাদের মাথায় রেখে চলতে হবে। এছাড়া অনেক আলোচনার বিষয় ছিলও যেখানে আমাদের সমাজ নিয়ে আমাদের চিন্তা চেতনা নিজেদের মনের মতো করে তুলে ধরতে পেরেছিলাম। সব মিলিয়ে এক ঘেয়েমি জিনিসটা বলতে ছিলই না। এবং আমি এর পুরো কৃতিত্ব দিতে চাই আয়োজকদের কাঁধে কারন তাঁরা সুন্দর ভাবে গুছিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করতে পেরেছিল বলেই সবার এরকম সাবলীল অংশগ্রহন সক্ষম হয়েছিল।

শুরুটা করেছিলাম নিজেকে নিয়ে এক হালি অভিযোগ দিয়ে কিন্তু শেষে এসে বলতে চাই শুধু একটুখানি সাহস আর অনুপ্রেরনা প্রয়োজন এই দুর্বল দিকগুলিকে নিজের প্রতিরক্ষার ঢালে রূপ দেবার জন্য। ধন্যবাদ রুপবান তোমাকে, এই অনুপ্রেরনার জন্য। ধন্যবাদ রুপবান তোমাকে, নিজেকে সাহসী রূপে সবার সামনে তুলে ধরার একটি সুযোগ করে দেবার জন্য। আমি বিশ্বাস করি এই সাহস আর অনুপ্রেরনাগুলি একদিন বিশাল এক  রংধনু গড়ে তুলবে যাতে সূর্যের আলো মিশিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলোকে আমি দূর করতে পারবো এবং অন্যদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাবার জন্য লড়াই এর স্বপ্ন দেখাতে পারবো। আমি যা চিন্তা করবো তা আমার কাজ এর মাধ্যমে মানুষ এর কাছে তুলে ধরবো এবং তাদের পাশে থাকবো একজন বন্ধু হয়ে ঠিক যেমনটা তুমি থেকেছিলে আমার পাশে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.