নিউক্লিয়ার ফিজিক্স / পারমানবিক কেন্দ্রকবিদ্যা

লেখক :- অনির্বাণ অহদেম

‘নিউক্লিয়ার ফিজিক্স’ বা পারমানবিক কেন্দ্রকবিদ্যা সূচনাটা হয়েছিলো পরমানুর ইলেক্ট্রন আবিষ্কারের সাথে সাথেই। তবে পদার্থবিদ্যার অন্যতম শাখা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় দুইটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের পথ ধরে। প্রথমটি হচ্ছে ‘তেজষ্ক্রিয় পদার্থ’ বা ইউরেনিয়াম, রেডিয়াম ইত্যাদি পদার্থ আবিষ্কার।

আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিজ্ঞানী রাদাফোর্ডের পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস আবিষ্কার।

বিজ্ঞানী হেনরী বেকেরেল ১৮৯৬ সালে সর্বপ্রথম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ করেন যে, ইউরোনিয়াম থেকে আপনাআপনি একপ্রকার রহস্যজনক কণা এবং রশ্মি নির্গত হচ্ছে। কিন্তু এধরনের কণা এবং রশ্মির নির্গত হওয়ার কোন ব্যাখ্যা বেকেরেল দিতে পারলেন না। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরী এবং বিজ্ঞানী মদাম কুরী থোরিয়ামের ভিতর থেকে একই রকম গুণ আবিষ্কার করেন। এই বৈশিষ্ট্যের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিঞ্জানীরা দেখলেন যে, ইউরোনিয়ামের এবং আরও কয়েকটি ধাতু থেকে আলফা, বিটা, এবং গামা নামে এই তিন ধরনের তেজষ্ক্রিয় রশ্মি বের হয়।এবং এই তিন ধরনের রশ্মি পরমানুর কেন্দ্র থেকেই নির্গত হচ্ছে।
বিঞ্জানীরা রাসয়নিক পরীক্ষা দ্বারা দেখতে পান সক্ষম হলেন যখন ইউরেনিয়া বা রেডিয়াম থেকে আলফা রশ্মি বের হয় তখন সেই ধাতুর রাসয়নিক স্থান মেন্ডেলিভ বর্ণিত পর্যায় সারণির দুটো ঘর করে বামে সরে যায়। অর্থাৎ ধাতুর পারমানবিক সংখ্যা দুই একক কমে যায়। ৯২ পারমানবিক সংখ্যা বিশিষ্ট ইউরেনিয়াম আলফা কণা বিচ্ছুরণ করে থোরিয়ামে (যার পারমানবিক সংখ্যা ৯০) পরিণত হয়।
বিটা রশ্মি বা ইলেক্ট্রন কণা যখন বের হয় তখন ধাতুর পারমানবিক সংখ্যা এক একক বেড়ে যায় এবং তার রাসয়নিক ব্যাবহার সেই অনুযায়ী বদলে যায়।তবে গামা রশ্মি বের হওয়ার সময় ধাতুর কোনও রাসয়নিক পরিবর্তন ঘটে না।

দ্বিতীয় গবেষণা বা বিজ্ঞানী রাদাফোর্ডের পারমানবিক গঠন পরীক্ষা। রাদারফোর্ড দেখালেন যে,মোটামুটি পরমাণু পৃষ্ঠ খুবই ফাঁকা পরমানুর কেন্দ্র ধনাত্নক বৈদ্যুতিক আধান আছে এবং আলফা কণা এই পরমানবিক কেন্দ্রের খুব কাছে এলে বৈদ্যুতিক শক্তির ফলে পূর্বপথ থেকে সরে গিয়ে বেঁকে যায়।রাদারফের্ড পরমানুর কেন্দ্রের পরিসর ও বৈদ্যুতিক আধানও নির্ধারণ করলেন। এই পরীক্ষার ফলে পরমাণুর গঠন স্পষ্ট হলো। পরমানুর ভিতর একটি কেন্দ্র রয়েছে। এর ওজন হল মোটামুটি পরমানুর ওজনের সমান এবং ধনাত্নক বৈদ্যুতিক আধান বিশিষ্ট।এই আধানের সংখ্যা এর পারমানবিক সংখ্যার সমান।
তেজষ্ক্রিয় রশ্মি পারমানবিক কেন্দ্র থেকে নির্গত হয়, বাইরের ইলেক্ট্রনের গতির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের আর একটি বড় তথ্য হল নিউট্রন আবিষ্কার। প্রথমে বিজ্ঞানীদের ধারনা হয়েছিল যে পরমানু, প্রোটন এবং ইলেক্ট্রনের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেল যে, মোটামুটি প্রোটন অথবা হাইড্রোজেন পরমানুর কেন্দ্রের ন্যায় আর এক ধরনের কেন্দ্রক আছে যার আনুমানিক ওজন প্রোটনের সমান হবে অথচ বৈদ্যুতিক আধান কিছু থাকবে না।

পারমানবিক কেন্দ্র দুই প্রকার :- ১)তেজষ্ক্রিয় ২) অতেজষ্ক্রিয়
যদি কোন কেন্দ্র তেজষ্ক্রিয় হয় তাহলে তা কিছু শক্তি বের করে দিয়ে স্থায়ী অর্থাৎ অতেজষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায়। এই শক্তি বের করে দেওয়ার সঙ্গে বিটা রশ্মি,আলফা রশ্মি ও গামা রশ্মি বের করে হয়ে যায় শক্তির বাহক হিসাবে।

এবার আসা যাক নিউক্লীয় বিক্রিয়া সম্পর্কে। নিক্লীয় বিক্রয়া দুই ধরনের। ১) নিউক্লিয়ার ফিউশন বা কেন্দ্রক বিভাজন ২) নিউক্লিয়া ফিশন বা কেন্দ্রক সংযোজন।

নিউক্লয়ার ফিউশন বা কেন্দ্রক বিভাজন:- প্রত্যেক মৌলের পরমানুর নিক্লিয়াস নিউট্রন ও প্রোটন দ্বারা গঠিত। কোন উপায়ে এই প্রোটন এবং নিউট্রন সংখ্যার পরিবর্তন ঘটাতে পারলে কেন্দ্রের রুপান্তর ঘটে।
১৯৩৫ সালে রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এনরিকো ফার্মি এবং তাঁর সহকর্মীবৃন্দ নিউট্রন দ্বারা পর্যায় সারণি ভুক্ত প্রায় সকল প্রকার মৌলের কেন্দ্রের রুপান্তর ঘটাতে সক্ষম হন।
তারা যখন পর্যায় সারণির শেষ সীমান্তে অবস্থিত সর্বাপেক্ষা ভারি মৌল ইউরনিয়ামের (পারমানবিক সংখ্যা ৯২) কেন্দ্রকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করলেন তখন কয়েকটি নতুন তেজষ্ক্রিয় আইসোটপের সন্ধান পেলেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী মাদাম কুরির কন্যা ইবনে জোলিও কুরি ও তাঁর সহকর্মী সাভিকু দেখলেন যে, নতুন তৈরি পরমানুগুলো ইউরোনিয়াম অপেক্ষা অনেক পরিমাণে লঘুতর মৌল ল্যানথানামের (পরমানবিক সংখ্যা ৫৭) পরমানুর সমরসায়নধর্মী।ঠটিক এই সময়ে জর্মান রাসয়নিক অটোহ্যান এবং তার সহকর্মী ট্রান্সম্যান দেখালেন যে, অনেক ক্ষেত্রে নিউট্রনের বর্ষনের ফলে ইউরোনিয়াম থেকে বেরিয়াম পাওয়া যায়। বেরিয়ামের পারমানবিক সংখ্যা ৫৬।

এটা থেকেই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, নিউট্রন আহত হলে ইউরোনিয়াম কেন্দ্রক ভেঙে দুই খন্ড হয়ে যায়। প্রতিটি খন্ড প্রায় সমভর বিশিষ্ট। যেমন ল্যানথাম (পারমানবিক সংখ্যা ৫৭) ও ক্লোরিন (পারমানবিক সংখ্যা ৫৫) বা বেরিয়াম (পারমানবিক সংখ্যা ৫৬) ও ক্রিপ্টন (পারমানবিক সংখ্যা ৩৬)। এই নতুন ধরনের কেন্দ্রক রুপান্তরের নাম হল কেন্দ্রক বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশন।
এ ধরনের রুপান্তরের ফলে প্রচন্ড পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। ইউরোনিয়াম কেন্দ্রকের ভর, বিভাজনের ফলে উদ্ভুত দুটো কেন্দ্রকের ভরের সমষ্টি অপেক্ষা বেশি এবং এ দুই ভরের পার্থক্যই আইনস্টাইনের সূত্র অনুসারে শক্তিতে রুপান্তরিত হয়। প্রতিটি ইউরেনিয়াম কেন্দ্রের বিভাজনের ফলে প্রায় ২০ কোটি ইলেক্ট্রন ভোল্ট শক্তি নির্গত হয়। এই শক্তি যে, কোনও রাসয়নিক পরিবর্তনের ফলে পাওয়া যায় শক্তির দশ লক্ষগুণ বা আরও বেশি। অর্থাৎ এক গ্রাম কয়লা পোড়ালে যে পরিমাণ রাসয়নিক শক্তি পাওয়া যায় এক গ্রাম ইউরোনিয়াম কেন্দ্রক বিভাজনের ফলে তার দশ লাখ গুণ বা আরও বেশি শক্তি পাওয়া যাবে। এজন্যই কেন্দ্রক বিভাজনের দ্বারা অতি অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন করা যেতে পারে।

নিউক্লিয়ার ফিশন বা কেন্দ্রক সংযোজন:- দুটো পরমাণু একত্র হয়ে একটি নতুন পরমাণু কেন্দ্রকের সৃষ্টি হওয়াকে সংযোজন প্রক্রিয়া আসলে নানা প্রকার বিক্রিয়ার অন্যতম। অল্পভর সংখ্যাযুক্ত কেন্দ্রকগুলোকে হাইড্রোজেন এবং ডিউটেরিয়াম কেন্দ্রক দ্বারা আঘাত করার সময় আবিষ্কৃত হয়।
সল্পভর বা লঘু পরমাণুকেন্দ্রক সংযোজনে নতুন কেন্দ্রকের সৃষ্টি হলে প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। লঘুকেন্দ্রক সংযোজনে যে নতুন কেন্দ্রকের উৎপত্তি হয় তার ভর আলাদা আলাদা ভাবে পূর্ববর্তী কেন্দ্রক সমূহের ভরের সমসষ্টি অপেক্ষা কম।
ভর এবং শক্তির সমতুল্যতার কারনে কেন্দ্রক সংযোজনের প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট নতুন কেন্দ্রকের ভর যদি সংযোজিত কেন্দ্রকগুলোর আলাদা আলাদা ভরের সমষ্টি অপেক্ষা কম হয় তাহলে ভর পার্থক্যের সমতুল্য শক্তি নির্গত হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.