রংধনু

লেখক :- অনির্বাণ আহমেদ

২২ অক্টোবার ২০০৯, ব্রিটেনে বিবিসির অফিসের সামনে হাজারো যুবকের বিক্ষোভ পুলিশের সাথে সংঘর্ষ। কড়া পুলিশি পাহাড়ায় “বিবিসি কোশ্চেন টাইম” অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলো ‘নিক গ্রাফিন’। যিনি মনে করেন কালো চামড়ার মানুষদের ব্রিটেনে বসবাস করার কোন অধিকার নেই। সেইদিন সেই অনুষ্ঠানে নিজের অবস্থান আরো দৃড়ভাবে প্রকাশ করলেন বিএনপি “ব্রিটিশ ন্যাশন্যালিস্ট পার্টি” এর এই নেতা।অনেকে এটাকে নিউ-নাৎসিজম বলে আখ্যায়িত করছে। নিক গ্রাফিনের ভাষ্যমতে, হাজার বছর ধরে ইংল্যান্ড নামক এই দ্বীপটাতে শুধু কোকেশিয়ান শ্বেতাঙ্গরাই বসবাস করে আসছে। কৃষ্ণাঙ্গরা বানরের মতো দেখতে, তাদের কোন অধিকার নাই ইংল্যান্ডে থাকার। ইংল্যান্ডকে শতভাগ শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রীষ্টান ধর্মালম্বিদের রাষ্ট্র করাটাই তাদের লক্ষ্য।আরো অবাক করা তথ্য হচ্ছে ব্রিটেনের মতো উদার নৈতিক একটা দেশে তাদের জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে।

প্রায় সব যুগেই বর্ণবাদীতা, উগ্রবাদিতা,উগ্রজাতীয়তা বাদ, ধর্মান্ধতা ছিলো। এখনো সেটা আছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে প্রাচুর্য্যের যুগে বাস করছি আমরা। বিজ্ঞানের জয়উল্লাস চারিদিকে প্রযুক্তির ছোয়ায় তরতর করে সভ্যতার শিখড়ে উঠছি। আমরা নাকি সভ্য হয়েছি! ভাবতেও ভয় লাগে পৃথিবী এখনো কত সংকীর্ণ, কিছু মানুষ এখনো বৈচিত্র্যতাকে এতবেশি বেশি ঘৃণা করে একবারে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, এমনকি বিজ্ঞাণীরাও।
হিটলার মনে করতো সে আদি নর্ডিকদের বংশধর,তার গায়ে বয়ে চলেছে নর্ডিকের রক্তের স্রোত। তায় জার্মান ছাড়া অন্য সকলেই নিচু তাদেরকে হত্যা করে জার্মানকে বিশুদ্ধ নর্ডিকে রুপান্তর করতে হবে। এই নর্ডিক জাতীয়তাবাদ এতটাই তীব্র ছিলো তার ভয়বহতা সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই।যে বিজ্ঞান এতদিন মানুষের কল্যানে ব্যাবহার হতো তাও বিভীষিকাময় হয়ে উঠলো দ্বিতীয়বিশ্ব যুদ্ধের সময়। হিটলারের বিজ্ঞানী “জোসেফ মেঙ্গেল” বিজ্ঞানের ইতিহাসের জঘন্যতম অধ্যায় রচনা করলো।হাজার হাজার ইহুদী শিশুদের ধরে এনে তাদের ওপর চালালো জঘন্য এক্সপেরিমেন্ট। শুধুমাত্র তারা ইহুদী বলে।
আজকে আধুনিক গাইনকোলজির কল্যাণে লক্ষ লক্ষ নারী জীবন ফিরে পাচ্ছে, রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু জানেন কি আজকের এই আধুনিক গাইনকোলজি কাদের আত্নত্যাগের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছে? সেই সকল কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, তরুণী যাদেরকে গিনিপিগ করে আধুনিক গাইনকোলজির জনক “জেমস ম্যারিয়ন সিমস” এদের দেহকে ব্যাবচ্ছেদ করে এক্সপেরিমেন্ট করতেন। তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের মানুষ মনে করতেন না।অনেক সময় অ্যানাসথেসিয়া না দিয়েই এক্সপেরিমেন্ট করতেন। এদের ব্যাথা পাওয়ার অনুভূতির কোন মূল্য ছিলো। কারণ তারা কৃষ্ণাঙ্গ,তারা মানুষ না।ভবতে পারেন কতটা নিষ্ঠুর।
এই একাবিংশ শতাব্দীতে এসেও কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন কৃষ্ণাঙ্গরা শেতাঙ্গদের চাইতে কম বুদ্ধীমান তার এই নাকি এই বিষয়ে জেনেটিক ব্যাখ্যাও দাড় করিয়েছেন।এর মধ্যে অন্যতম হলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী “জেমস ডি. ওয়াটসন” ডিএনএর ডাবল হেলিক্স কাঠামো বর্ণনা করার জন্য ১৯৬২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি তার অবস্থানে এখনো দৃঢ় আছেন শেতাঙ্গদের চাইতে কৃষ্ণাঙ্গ রা কম বুদ্ধিমান।

আমি শ্বেতাঙ্গ,আমি অন্য সকলের চাইতে উঁচু মর্যাদার। তুমি কৃষ্ণাঙ্গ তুমি আলাদা, তোমার জিন আলাদা, তুমি কম বুদ্ধি সম্পন্ন।তুমি হিজড়া তুমি স্বাভাবিক মানুষন নও কারণ তোমার বায়োলজিক্যাল ত্রুটি আছে,তুমি সমকামী তোমার মেন্টাল সমস্যা আছে তুমি অসুস্থ। আধুনিক সময়ে কিছু মানুষ বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে ব্যায়োলজিক্যাল ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাইছে এগুলো স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক।
বায়োলজিক্যাল দৃষ্টি কোন থেকে সোসিয়োলজিকে ব্যাখ্যাকে একেবারেই প্রত্যাখান করেছে সোসিয়োবায়োলজিস্টরা।
আমি সমকামি আমি বৃহন্নলা আমি মেয়েলী আমার এই সকল আচরণের পিছনে বিজ্ঞান কি বলছে সেটার গুরুত্ব আমার কাছে মোটেও নেই অন্তত আমার অধিকারের প্রশ্নে। বিজ্ঞান গবেষণা সম্পূর্ণরুপে বিজ্ঞান কেন্দ্রিক। অনেক সময় এলজিবিটি কমিউনিটি বিরধীরা বলে থাকে বিজ্ঞান জানিয়েছে এগুলো ডিসঅর্ডার অসুস্থতা,জিনগত সমস্যা,হরমোনের প্রবলেম তাই এরকম আচরণ করছে।
আমি সমকামী হয়েছি এর পিছনে জিন দায়ী, আমি হিজড়া তারমানে মায়ের গর্ভে কিছুএকটা উল্টাপাল্টা ঘটেছে, আমি ছেলে হয়ে তথাকথিত মেয়েদের মতো আচরণ করি বিজ্ঞান বলে এটি হরমনাল ইমব্যালান্স। এই ঘটনা গুলোকে অস্বাভাবিক বা ডিসঅর্ডার বলার মাপকাঠি বিজ্ঞান কোথা থেকে পাচ্ছে? যখন কিনা এসকল উদাহরণ তার শারিরীক সমস্যা না ঘটাচ্ছে?

আমি সমকামি,বৃহন্নলা,কিংবা মেয়েলী এগুলো যতটা না জৈবিক তার থেকে অনেকবেশি এটা আমার রাজনৈতিক অবস্থান, এটা আমার চয়েজ। আমার পার্টনার ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে এই সিদ্ধান্ত আমার। আমার ডিএনএর লুকিয়ে থাকা প্যাটার্ণ দিয়ে আমাকে অস্বাভাবিক ঘোষণা করার অধিকার আপনাদের নেই।

সবশেষে বলতে চাই সমকামীদের অধিকার একটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয় এটাকে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করে অধিকারের পক্ষে বলার কিছু নেই। বায়োলজিক্যাল গবেষণা অবশ্যই মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।তবে সামাজিক সমস্যায় বায়োলজির ব্যাখ্যা না আনাই ভালো।
আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীতে এমন একটা সময় আসবে সবধরনের বৈচিত্রময় মানুষেরা একই সাথে বসবাস করবে। আজ যারা বর্ণান্ধতার জেরে পৃথিবীতে একাধিক রং দেখতে পায় না, তারাও একদিন রংধনুকে ভালোবাসবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.