অসময়ের সময়

রাহাত ইসলাম জুবায়ের

টানা ঘুম শেষ করে এইমাত্র জাগলাম। রাত একটা বাজে। শুয়ে পড়ে ছিলাম সন্ধার খানিক বাদেই। দেহে ক্লান্তি পেয়ে বসায় হাত ঘড়িটাও খুলতে ভুলে গেছি। ঘরের বাতি বন্ধ। অন্ধকার ঘরে হাত ঘড়ি আমাকে সময় জানিয়ে দিয়েছে। খাট ছেড়ে উঠে দাড়ালাম। জানালা দুটো বন্ধ । খুলে দিলাম। বাইরে জোছনারা লহর খেলছিলো। মুক্ত বাতায়ন পেয়ে ই জোছনার স্রোত ঘরে এসে ঠেকলো। নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগছিল । সারা বাড়ির সবাই সপ্নের দেশে। আমি একাই জেগে আছি। এটাই আমার জেগে উঠার সময় । জানালার কাছ ঘেষে দাড়াতেই আমার শান্ত চোখজোড়া চাদের রুপ দেখার বায়না করে। অপলক চাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। মুগ্ধ হতে প্রকৃতি আমাকে উসকে দেয়। আমি আর চাদ দুজন দুজন কে দেখি। আমি বরাবর ই পাগলাটে। চাদ কে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে “এই গভীর নিশুথি বেলায় আমি চাদের অপরূপ রুপের একা দর্শক । এতে কি প্রকৃতির রুপের অবমূল্যায়ন হচ্ছে? হয়তো হচ্ছে আবার হয়তো হচ্ছে না।

নিজেকে একজন সুশৃঙ্খল পাগল ভাবতে আমার ভালোই লাগে। মাঝেমধ্যে মনে হয় পাগল রাই প্রকৃত সুখী। একজন মানুষ যখন তার নিজের ভাবনা অনুযায়ী নিজের জগত সাজায় তখন থেকেই তার সামনে সুখের আনাগোনা শুরু হয়। আসলে ভাবনার খাতাটা সবসময় ই সীমাহীন রাখতে হয়। এবং চিন্তা করার খেত্রে কোনও নিয়ম মানা উচিত নয়। প্রতিটি মানুষ এর চিন্তার স্বাধীনতা আছে। অধিকার আছে নিজের মতো করে ভাবার। আমি সিলেবাস এর বাইরের ই কেউ হব হয়তো। বাইরে চাদের আলো আর বাতাসের আমোদ করা দেখছি। শুনছি পাতার মরমর ধ্বনি।

কদিন আগেও দিন রাত গুলোকে পানসে মনে হতো। এখন আমি খুব ভালো আছি। সন্ধ্যায় ঘুমোচ্ছি মাঝ রাতে জাগছি। সবার জাগার বেলায় আমার ঘুম। এখন সবাই ঘুম আমি জেগে। একটা সময় খুব পানচুয়াল ছিলাম ঘড়ির কাটার সাথে দৌড়ানো টা অভ্যাস এ দাড়িয়ে গেছিলো। সময় এর সাথে চলতে গিয়ে নিজেকে প্রায় বন্দি মনে হতো। এজন্য ই সবার সময় এ আমার অসময় আর সবার অসময়ে ই আমার সময়। এইসব সময় অসময়ের মাঝেই আমার অসময়ের সময়। গুণীজন বলেছেন “ভালোবাসা নিশিরাতে ডাক দিয়ে যায়।” তাইতো আমি জেগে থাকি হয়তো কারো অপেক্ষায় নয়তো নয়। বাতাসের মাঝে আমি অদৃশ্য আহ্বান টের পাই। আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

দরজা খুলে বাইরে এলাম। কিশোরের কাছে যেতে হবে। আমি গ্রামে আসার পর থেকেই দেখছি ছেলেটা একদম অন্য রকম। দারুণ গান গায়। সঙ্গীতের আসরে সেদিন কোনও কারণে ওর পারফর্মেন্স খারাপ হওয়ায় ওকে অনেক অপমান হতে হয়ে ছিল। যখন অনেক আকুতির পর পারিশ্রমিক পেলো না তখন নিজের কাছেই খারাপ লাগছিল। তখনি প্রথম ছেলেটা সম্পর্কে জানার ইচ্ছে জন্মালো। কিন্তু দাদুর জন্য পারিনি। আমি খুব করে চাইছিলাম ছেলেটার সাথে একটু কথা বলতে। সেই সুযোগ এলো দুদিন পরের বিকেলে। কথায় কথায় জানতে পারলাম ওর নানা দুঃখ দুর্দশার কথা। মা বাবা মারা যাওয়ার পর কিশোর এর আশ্রয় হয় এই গ্রামের বাউল সুরুজ মিয়ার সংসারে। গান গাইতে পারে বলে তার বাউল দলে কিশোর এর জায়গা হয়। সবকিছু ভালোই চলছিলো। কিন্তু যখন বুঝতে শিখলো যে সুরুজ মিয়া তার গানের গলা কে পুঁজি করে ব্যবসা করছে এবং তার নিজের ছেলেকে স্কুল এ পাঠালেও আশ্রিত বলে ওকে অশিক্ষিত রেখে ফায়দা লুটছে তখন থেকেই কিশোর ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলো। বঞ্চিত হওয়ার কষ্টে। ওর মানসিক অবস্থা ভালো ছিলো না। সেইদিন ও আমাকে বলছিলো গায়ের মানুষ তার গান পছন্দ করলেও একটু মেয়েলি স্বভাবের কারণে অন্য সময় কেউ তার দিকে ভ্রুখেপ করতো না। ওর অবস্থা নিত্য ব্যবহৃত পণ্যের মতো হয়ে গেছিলো। ও যখন আমাকে কথাগুলো বলছিলো তখন ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিলো। সেদিন ওর শেষ কথাটা আমার মনে এখনো দাগ কেটে আছে। গন বাঁশ পাতার ফাকা দিয়ে চাঁদের আলো উঠোনে নামছে।মাটিতে পাতার চিকন চিকন ছায়া।

জ্বীন ভুতে বিশ্বাস করি না বলে পরিবেশ এর আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছি। উঠান পেরিয়ে সদর দরজার কাছে যাচ্ছি। ওর শেষ কথা গুলো কানে বাজছে।

“মিয়া ভাই আপনের মতো মানুষ হয়না। গ্রামের এতো মানুষ আমার গান শুনে কিন্তু কেউ আপনার মতো কাছে ডাইকা দরদ দিয়া দুইটা কথা কয় না। জিজ্ঞাসা করেনা কেমন আছি।”

সেদিনের পর থেকে ওর সাথে আমার সময় গুলো ভালো যাচ্ছিলো। প্রথম প্রথম কথা বলার সময় দেখতাম ওর মাঝে খানিকটা ভয় কাজ করছে। কিন্তু যখন ও বুঝতে পারলো আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই ওর কথাগুলো শুনি তখন খুব খোলামেলা ভাবেই কথা বলতো। মাঝেমাঝে গান শুনাতো। এই অল্পদিনের চলাফেরায় ও বলছিলো আমাকে নাকি ওর খুব কাছের মনে হয়।আমিও ওর জন্য টান অনুভব করতাম।

কিশোর খুব সহজ ভাবেই বলছিলো – মিয়া ভাই আমি আপনারে অনেক ভালা পাই। সোজা নীতির মানুষ বলে ওর সহজ কথা আমাকে ভালোলাগা দিয়ে ছিলো। তবে ওর ভালো পাওয়ার অর্থ ভালোবাসা কি না তা এখনো বুঝে ওঠা হয়নি। যখন ওকে বললাম কদিন বাদেই আমাকে ঢাকায় ফিরতে হবে তখন ও বলেছিলো “মিয়াভাই আপনে ঢাকা যাইয়েন না আপনি ঢাকা গেলে আমার আর কথা কওয়ার মানুষ থাকবো না। আমার অনেক ইচ্ছে করে আপনারে লইয়া চদনি পশর রাইত দেখমু নৌকা চড়মু। এগুলো অবশ্যই খুব বেশি চাওয়া নয়।

আমাকে আগামী কালের ট্রেনে ই ঢাকা ফিরতে হবে এই কথা ওকে এখনো বলিনি। আজ ওকে নদীর পারে বালু চরে আসতে বলেছি। আমি জানি ও আসবেই।

হাটছি সেখানেই যাওয়ার জন্য । চাঁদের আলোয় চকচক করতে থাকা বালিতে পা রেখেই অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম। বেশ জোরেসোরে বাতাস বইছে। রোমাঞ্চ রা আমায় ঘিরে ধরেছে। ওদের সাথে নিয়ে কিছুদুর হাটতেই দেখি কিশোর দাড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই দৌড়ে এলো।

-মিয়াভাই আইসো!

-কেন আমাকে কি দেখা যাচ্ছে না?

-না দেহা তো যাইতাসেই। এই আধা রাইতে তুমি আমারে কেন ডাকলা?

-বাবা! তুমি না বলেছিলে চাদনীপশর রাতে তুমি আমার সাথে ঘুরতে চাও।

বুঝলাম ও খানিক লজ্জা পেয়েছে।

-আমার অনেক দিন থিকাই ইচ্ছা আসিলো। কেউ পূরণ করে নাই।

-কেন আরো কাউকে বলেছিলে তোমার ইচ্ছের কথা? চাইছিলে এখানে অন্য কেউ আসুক ।

-না তা চামু কেন?

-সেরকমটাই তো লাগছে।আমি তাহলে চলে যাই।

-কিযে কন মিয়াভাই আপনারে ত কইসি আমি আপনারে বিরাট ভালা পাই।

আমি চুপ করে শুনছি দেখে ও বলল

-কি মিয়া ভাই রাগ করলেন? কথা কবেন না?

-না রাগ অভিমান নয় আসলে আমি আজ তোমার কথা শুনতে এসেছি। যা মনে আসে বলো।

-আপনার কী মন খারাপ ?

-হয়তো

-কেন

-এখন বলব না যাওয়ার সময় বলব।

-ও আচ্ছা ।মিয়া ভাই আপনি খুব ভালা মানুষ।

-এতো প্রশংসা না করলেও চলবে। তেলের বাজারে আগুন লেগেছে জান নিশ্চই?

– আসলে আইজকা অনেক ধকল গেছে তো আমার পায়ের তেল ও প্রায় শেষ। চলেন ঐ গাছটার তলে বই।

-ভরা পূর্ণিমার এই রাতে তোমার নৌকো চড়ার ইচ্ছে টা কি অপূর্ণ ই থাকবে?

-ও ভালো কতা মনে করিসেন আমি তো ভুইলাই গেসিলাম।

ঐ একটু দুরেই নৌকা দেখা যাচ্ছে। কিশোর আমার হাত খুব শক্ত করে ধরে নৌকার দিকে এগোতে থাকে। মনে হচ্ছে ও আমার কাছে কোনও কিছুর ব্যাপারে নিশ্চয়তা চাচ্ছে। কিন্তু কি করতে পারবো? আমার চারপাশে শুধুই সীমাবদ্ধতা।

কিশোর নৌকায় উঠে আমাকে বৈঠা দিলো। দুজনে নৌকায় বসে আছি। নৌকা বাইতে গিয়ে আমি মাঝির আনন্দ দুঃখগুলো কে কল্পনা করতে থাকি। শ্রমজীবী মানুষের পরিশ্রম এ ই একটা দেশ গড়ে উঠে। প্রতিটি পেশা ই সম্মানের।

পুরো নদী আর দুই কুলে কোনও মানুষ নেই। আমি নৌকা বেয়ে মাঝ নদীতে গিয়ে বৈঠা রেখে দিই। আর চালাতে ইচ্ছে করছে না। চাঁদের আলোয় কিশোর এর চেহারা যেমন ই লাগছে সেটাই সৌন্দর্যের উদাহরণ কী না জানতে ইচ্ছে করছে। কিশোর ছই থেকে বাইরে এলো।

-মিয়া ভাই আপনের লিগা একটা বিশেষ কিছু আনছি।

-কি এনেছো?

-বেশি কিছু না। টমেটোর চাটনি ডাল আর ভাত। আপনে যে রাইতকালে খান নাই আগে ই জানতাম। তাই লইয়া আইলাম।আইজকার খাওনটা আপনে আমার লগে খান।

-ঠিক আছে তুমি যাও আমি আসছি।

কিশোর ছইয়ের নিচে হারিকেন ধরিয়ে খাওয়ার আয়োজন করলো। চাটনি দিয়ে মাখা ভাত গুলো দেখে জিভে পানি এসে গেলো খুধা ও লেগেছিল বেশ। আমি খাওয়ার জন্য হাত কচলাচ্ছিলাম। তা দেখে কিশোর বলল,

-হাত কসলিয়া কোনও লাভ নাই।

-মানে?

-মানে আমি আপনারে নিজের হাতে খাওয়াই দিতাম চাই।

-ঠিক আছে দাও।

কিশোর ভাতগুলো ছোট ছোট ভাগ করে আমার মুখে উঠিয়ে দিতে লাগলো। ওর অবস্থা দেখে বুঝে নিই আমাকেও একই কাজ করতে হবে।

আমিও ওকে তুলে দিতে থাকলাম।

খাওয়া শেষে শোয়া আমার অনেক পুরানো অভ্যাস। নদীর খোলা হাওয়া ছেড়ে ছইয়ের তলায় শুতে কিসে যেন বাধ সাধে। বাইরের বাতাসে হাত পা ছড়িয়ে লম্বা হয়ে শুই। কিশোর আমার কাছে আসে। আসতে দেই। ও আর আমি এখন খুব কাছাকাছি। কিশোর খুটে খুটে আমার চেহারা দেখছিলো।আমার খারাপ লাগছেনা।

-মিয়াভাই আপনারে চান্দের আলোতে খুব সুন্দর লাগতাসে।

-ও তাই বুঝি কি যে বলো। এখন পর্যন্ত কোনও মেয়ে পটলো না। আর সুন্দর।

-আপনার মাইয়া পটাইতে হইবো না। আমার কাছে আপনারে ভালো লাগছে তাই বললাম । কিশোর হয়তো আরো কাছে এসেছে। আমি ওর নিঃশ্বাস এর শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ওর হাত আমার চুলে খেলা করতে করতে চেহারায় এসে লাগে। এপাশ থেকে ওপাশ চলাচল করে বাধাহীন। আমার রক্তে পুরুষ প্রেম আছে কি নেই এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। দুপাশের শূণ্য জনপদ আর নৌকা শূণ্য মাঝ নদীতে আমরা দুজন। আমি পিপাসা অনুভব করি গহীন থেকে। তবে এই পিপাসার্ততা আমার পূর্ব পরিচিত নয়। মনে হচ্ছে নদীর সবটুকু জল, এর সামনে একেবারে ই তুচ্ছ। বাতাসের কোমলতা আর কিশোরের উষ্ণতার মাঝে আমার পিপাসার্ততা তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে প্রকট ভাবে। আমি ওর গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দিই। ওর মুখ আমার দুহাতের তালুর উপর।

-ভালো থেক কিশোর ।

কিশোর আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।

-চইলা যাবেন মিয়া ভাই?

-হা

-কবে

-জানাবো সময় হোক।

-মিয়া ভাই আমার ঘুম লাগসে চলেন ফিরা যাই নৌকার মালিক সকালে নাও না পাইলে খবর আছে।

-ঠিক চলো ফিরে যাই।

-মিয়াভাই এইবার আমি নৌকা চালামু।

-ঠিক আছে।

কিশোর বৈঠা হাতে নেয়।

বসে নৌকা চালাতে কিশোরের একটু অসুবিধা হচ্ছিলো। তাই দাড়িয়েই বাইতে লাগলো। পিপাসা নিয়ে বসে থাকতে আমার ভালো লাগছিলো না। আমি কিশোর এর পেছনে গিয়ে ওর কাঁধে হাত দেই। আমার হাতের তালু ধীরে ধীরে ওর বৈঠা ধরা হাতে মিলিত হলো। আমার থুতনি ওর কাধ দখলে নিলো। আমি জানি ও সব বুঝতে পারছে তবুও চুপ করে আছে। আসলে কিছু সময় থাকে যখন কথামালা গুলো অলস হয়ে যায়। সময়টা এখন শুধুই অনুভব করার।

নৌকা এসে ঘাটে ভিড়লো।কিশোর আর আমি বালুকায় হাঁটছি ।

-কিশোর আমি চলে গেলে কি করবে তুমি?

-কি জানি জানি না।

ওর কথাতে ঘুমের ছড়াছড়ি মনে হচ্ছে।

-তবে মিয়াভাই আমার খুব একলা লাগবো।

-ও

আমি আর কিশোর একটা বট গাছের নিচে বসি। গোল করে পাকা করা। গাছটি বহু বছরের পুরনো। চাঁদের আলোয় চকচক করা বালির উপর গাছের ছায়া খানিকটা জুড়ে রয়েছে। এইসময় একটা গান হলে মন্দ হয় না।

-কিশোর তুমি কী আমাকে গান শোনাবে ।

-কেন অবশ্যই হুনামু।

কিশোর মৃদু স্বরে গান ধরে।

মিলন হবে কত দিনে মিলন হবে কত দিনে

আমার মনের মানুষের ও শনে

আমার মনের মানুষের ও শনে

চাতক ও প্রায় অহর্নিশি

চেয়ে আছে কালো শশী

হবো বলে চরণ ও দাসী

হবো বলে চরণ ও দাসী।

গান পুরো শেষ করার দরকার হয় না। এর আগেই কিশোর এর চোখ বন্ধ হয়ে যায়।

কিশোর আমার কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমোচ্ছে।

একটি মাঠ, সুন্দর জোত্সনা রাত একজোড়া চোখ খোলা এক জোড়া চোখ বন্ধ। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে?

দেখতে দেখতে রাত ভোর হয়ে আসে। চাঁদ ডুবে যাচ্ছে। কিশোর কে ডেকে তুলি। বাড়ি ফিরতে হবে।

-কিশোর তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।

-কি কথা

-আসলে আমি আজ সন্ধ্যায় চলে যাচ্ছি। তাই যাওয়ার আগে তোমার ইচ্ছে পূরণ করে দিয়ে গেলাম। তোমার উপর আমার সমর্থন থাকবে। তোমার মন যখন খুব খারাপ থাকবে তখন এই রাতের কথা মনে কোরো। তোমার বিশ্বাস এর নিঃশ্বাস হয়ে আমি তোমার আশেপাশে ই থাকবো। ভালো থাকতে হবে তোমাকে। কী পারবে না?

কিশোর এর মুখে কোনও কথা নেই। শুধু নিম্ন দৃষ্টিতে সামনে এগোয়। হয়তো ওর কাছে আমি অপরাধী। কিন্তু এর থেকে বেশি সত্যি ই আমার কিছু করার ছিল না। আমাকে তো ফিরে যেতেই হবে সময়ের টানে জীবনের প্রয়োজনে। এই মুহূর্তে আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। হাটতে থাকি বাড়ির উদ্দেশে ।

বিকাল হয়ে গেছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি। এখন ট্রেন আসার অপেক্ষা। খানিক বাদে ট্রেন এসে থামলো। উঠতে যাব এমন সময় কিশোর কে দেখলাম। আমার জন্য ই এসেছে। নেহায়েত বিশ্বাস থেকেই কথাটা বললাম। ওর হাতে কতগুলো কচুরিপানার ফুল। ফুলগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো। কোনও গন্ধ নেই তবে স্নিগ্ধতা আছে।

-মিয়া ভাই আবার আসিয়েন। আমি অপেক্ষায় থাকমু আপনার জন্য।

আমি সম্মতি বোঝাতে ওর হাতে চুমু দেই।

-আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়।

ট্রেন ছুটে চলেছে অসময় কে ছেড়ে সময়ের দিকে। আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বো লেখাপড়া নিয়ে।

কোনও এক বিখ্যাত কবির কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে গেলো, “আবার আসিব ফিরে ধান সিড়িটির তীরে”।

আমার নাক দিয়ে তপ্ত এক নিঃশ্বাস বেড়িয়ে এলো। আমার গ্রাম আর কিশোর কে দিলাম ছুটি। আমি আবারো ফিরবো সেই গ্রাম্য কিশোরের কাছে। যখন সময় নিজ গতি তে চলতে চলতে কথা বলবে অসময়ের। দুই ধারের গাছ গুলো দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছে । ফিরে যাচ্ছি নিয়মিত কোলাহলে। অপেক্ষা থাকবে ফিরে আসার, অপেক্ষায় থাকবো কোনও দুরন্তবেলার অলস অবকাশের।

ভালো থেকো কিশোর,

অপেক্ষায় থেকো।

ফিরবো আবারো তোমার কাছে,

মৃত্যুঞ্জয়ী যোদ্ধার বেশে।

ভালো থেকো।

সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.