কুড়িয়ে পাওয়া ভালবাসা

লেখকঃ পরিশ্রান্ত পথিক

আজ একটু রাতই হয়ে গেল বাড়ি ফিরতে।এত এত প্যারা আর সহ্য হয়না।যদি একথা কোন বড় ভাই মানে ৫-৬ বছরের সিনিয়রকে বলি তবে ঝাড়ি ও খেতেই হবে। কারন কেবল মাত্র ইন্টার ১ম বর্ষ থেকে ২য় তে পা রাখলাম আমি।বলবে,এর মধ্যেই হাপিয়ে উঠেছিস, গুড় আর এখানে কি গুড়তো আরও ভাড়ে।

কলেজ ছুটি হবার পর দুইটা প্রাইভেট পড়তে হইছে আমার। মানে আমি পড়তে বাধ্য।আম্মু স্যারদেরকে বলে দিছে না; আর কি করার।

স্যারদেরও জাত স্বভাব অভিভাবকের কোন ইংগিত পাইলে এরা আরও ক্ষ্যাপে। পর্দাহীন পদার্থবিজ্ঞান আর রসহীন রসায়ন পড়তে হচ্ছে।

প্রাইভেট পড়েই লাইব্রেরীতে চলে যাই।

লাইব্রেরী থেকে কিছু বই এনেছিলাম সেগুলো দিয়ে আসলাম আর বন্ধুরা জোড় করল তাই নান্নু মামার কফি শপে কফি খেলাম।

এখন ৯:২০ মিনিট। যদিও তেমন রাত হয়নি আর সবার কাছে কিন্তু আমার জন্য বকা খাবার জন্য যথেষ্ট ।

সন্ধ্যে ৭:৩০ মিনিটের আগেই আমাকে ফিরে আসতে হয়।

যাহোক, অনেকটাই ক্লান্ত লাগছে আজ। তাই আনমনে হেঁটে আসছি আমি। আমাদের বাড়ি পৌরসভার ভিতরে থাকায় ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আসছি।তেমন লোকজন থাকেনা এ রাস্তায়, আজও নেই।

স্পিড ক্যানের একটি বোতল পাওয়াতে লাথি দিতে দিতে আসতে থাকি।এই বোতলগুলো দেখলে আমাকে লাথি দিতেই হবে-মাথা নষ্ট হয়ে যায়।আম্মু পাশে থাকলে বকা অনিবার্য।

হঠাৎই রাস্তায় একটি ভিট(গতি নিয়ন্ত্রক) এ আটকে যায় বোতল। কাছে গিয়ে পা বাড়াতেই একটি ওয়ালেট টাইপ কিছু দেখতে পাই। হাত দিয়ে কুড়িয়ে খুলেই এক সুদর্শন

যুবকের মুখাবয়ব দেখি।

তার চোখ দুটো কাজলকালো, চোখের পাতার পাপড়িগুলো বড় বড়।যার আকর্ষণ ভেদ করা কষ্টকর হচ্ছে। ওয়ালেটের ভেতরে কিছু টাকা হাজার দুয়েক হবে আর কিছু কাগজ দেখতে পাই। ওয়ালেটের স্বচ্ছ স্থানে ছবির পাশাপাশি এক টুকরো কাগজ লক্ষ্য করি।বের করে দেখি নিজ হস্থাক্ষরে তার নাম ঠিকানা,ফোন

নম্বর লেখা।

আমাদের পাশের এলাকাতেই থাকে নাম, মৃদুল।

ওয়ালেটটা যদি ফেলে যাই,তবে অন্য কোন মানুষ পেলে যদি ফেরত না দেয়।তাই আমিই নিয়ে যাই বাড়িতে। রাস্তায় আর ফোন না করে বাড়িতে গিয়েই রিলাক্সে ফোনটা করব।

বাড়িতে নক করতেই দরজা খুলে আম্মু।

শুরু হয়ে গেল বকবক চ্যানেল। কোন রকমে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমে যাই।

ওদিক থেকে হাক আসে,ফ্রেস হয়ে খেতে আয়।

আসছি আম্মু বলে চিৎকার করে বলি আমি।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিছানায় গাঁ হেলালাম কেবল। অমনি মনে হল ওয়ালেটের কথা। ফোন নম্বর টাইপ করে ডায়াল করলাম। ওপাশ থেকে,

-আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?

-ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনি কি মৃদুল?

-জি বলছি,কেন বলুনতো?

– আপনার কি কিছু হারিয়েছে?

-হুম,আমার মানিব্যাগ হারিয়েছে। আপনি কি পাইছেন নাকি।

– হুম, আমি পেয়েছি।কাল আপনি কি ১০ টার দিকে সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে আসতে পারবেন।

-হুম,পারব।

-ওকে, এখন রাখছি।গুড নাইট।বাই,,,

-গুড নাইট। বাই,,,

রাত্রিকালীন কথাবার্তা শেষ হল। সত্যিই স্বপ্নপুরুষের মত কথাবার্তা। রাত্রি মিলিয়ে ভোর হল। ক্ষীণ স্বর শোনা যাচ্ছে মোরগের। শরৎকাল তাই বাড়ির পাশে শিউলিতলা ভরে গেছে শুভ্রতায়। কমলা রঙের বোঁটায় সৌন্দর্য বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দিয়েছে শিউলি ফুলের। জানালা দিয়ে মিষ্টি একটি সুবাস পাচ্ছি। সকাল সকাল মেজাজটাই ফুরফুরে হয়ে গেল। তারাতারি উঠে ফ্রেস হয়ে নিলাম। ক্লাস ৮ টায় থাকায় সকালের নাস্তা করে নিলাম।

বেড়িয়ে পরলাম কলেজের পিচঢালা রাস্তায়।

১০ টাতে আমার ক্লাস না থাকায় এই সময় দেই মৃদুলকে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে পৌঁছে ফোন দিলাম মৃদুলকে,

-হ্যালো, আপনি কই?

-আমি তো সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতেই। পেছনে তাকিয়ে দেখি মৃদুল। মিষ্টি রঙের একটি পাঞ্জাবী পরে আছে। হালকা পাতলা দেহের গড়ন। ফর্সা,লম্বা ৫’৭” হবে। ঠিক আমার সপ্ন পুরুষের মতই।

আমি নাহিম বলে হাত বাড়িয়ে দেই।

হ্যান্ডশেক অবস্থায়ই মৃদুল বলে, চল আমরা কোন কফি শপে বসি।

আমি নান্নু মামার কফি শপে নিয়ে যাই। ডাক দিয়ে বলি,নান্নু মানা দুটা কফি স্পেসাল।

মৃদুল মুচকি হাসি দিয়ে বলে স্পেসিয়াল কেন?

কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলি।

-এমনি। প্রথম আপনার সাথে দেখা হল তাই।আর কি?

-প্রথম দেখাতেই কেউ কি স্পেসিয়াল হয় নাকি?

-উফ,বাবা। জাস্ট একটু ভাল কফির কথাই তো বলছি।আর স্পেসাল তো বটেই।

-অহ(মুচকি হাসি দিয়ে)।

-আপনি কোথায়,কিসে পড়ছেন?

-বিবিএ পড়ছি।ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।আর তুমি?

– আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার,সাইন্স বিভাগে।

-ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।

– সেরকম কিছুইনা।আম্মু আমাকে ডাক্তার বানাবে তাই এই নির্ঘণ্ট। অসহ্য লাগে আমার এত চাপ।

– আরে না এসব কিছুইনা।ফ্রি মনে পড় ভাল লাগবে সবই।

– কচু।এই নেন আপনার ওয়ালেট। দেখুন সব ঠিক ঠাক আছে কিনা।

– কি যে বলনা।

– আচ্ছা এখন উঠি আমার ক্লাস আছে।

– ওকে। তবে কফির বিল দিয়ে ধন্যবাদ দেয়ার সুযোগটা পেতে পারি তো।এটার মধ্যে আমার কিছু ইম্পর্টেন্ট প্রেসক্রিপশন আছে।তাই খুবই দরকার ছিল।খুব ধন্যবাদ তোমাকে।

– আরে কি আর করলাম।আপনার টা আপনাকে দিয়ে আমি ধন্যবাদ খাচ্ছি। হিহিহি,,,,,,,

-পরে কথা হবে ক্লাসে যাও এখন। বাই,

-বাই।

মুচকি একটি হাসি দিয়ে প্রস্থান করে মৃদুল।

আমার যেন ভাললাগার রেশ কাটছেইনা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কলেজে চলে যাই।

রাত ১০ টার দিকে মৃদুল ফোন করে কুশলাদি জানতে চায়।এরকম কিছু ভাল লাগা মন্দ লাগা নিয়ে কথাবার্তা বলি।আমি একটা প্রশ্ন করি? যদিও কিছুটা পারসোনাল।

-আচ্ছা বল।সংকুচ করছ কেন?

-আপনার কি জিএফ আছে?

– হাসতে হাসতে না,আমার কোন জিএফ নেই।কেইবা আমাকে আপন ভাববে?

-আপনার জিএফ নেই ভাবা যায় না।এমন সুন্দর মানুষের জিএফ না থাকা, সত্যিই অবাক লাগে।

– কি যে বল।আমার আপন বলতে কাকা কাকি ছাড়া আর কেউ নেই।

-মানে! আপনার বাবা মা ;

– আব্বু আম্মি গত চার বছর আগে রোড এক্সিডেন্টে মারা যান।তারপর থেকে কাকা কাকির কাছে আছি(কথাগুলো বলার সময় ওর গলা কম্পিত হচ্ছে)। এইতো আছি বেশ।আর ওই সব নিয়ে ভাবিইনি কখনো।

-আই এম এক্সট্রেমলি সরি। আমি না বুঝেই।প্রশ্ন করেছি।

– আরে না।কি বলছ এসব।তোমার বুঝি কেউ আছে? হুম বল,বল।

– না ভাই কেউই নেই।এখনো তো আমি ছোট।

– অতটাও ছোট নেই এখন।বুঝলা,,,

এভাবেই চলতে থাকে আমাদের দিন রাত।

মাঝে মাঝে লাইব্রেরী কিংবা নান্নু মামার দোকানে দেখা করি। কিন্তু আমার মনের কথা বলতে পারিনি।

যদি তিনি আমার অনুভূতিকে অসম্মান করে।আমাকে বাজে ভাবে।সাত পাঁচ ভেবে কিছুই বলা হয়নি আজও।

আজ ১লা সেপ্টেম্বর। আমার জন্মদিন।তাই রাতেই উইস করে ও আমাকে।কিন্তু আমাকে জোড় করে বলে,

-কাল সাড়াদিন একসাথে থাকব আমরা বুঝলা।আর রাতে গল্প গুজব করে না হয় সেলিব্রেট করব দিনটি।

– কি করে সম্ভব।ক্লাস প্রাইভেট তো আছেই।আম্মু জানলে তো অবস্থা খারাপ করে ছেড়ে দিবে।আর রাত ৯টার পর বাইরে থাকা আমার জন্য হারামের পর্যায়ে। প্লিজ, কিছু মনে করবেন না।

– না, ঠিক আছে।আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার কেউ নেই।

– প্লিজ, এরকম করে বলবেননা।যান কথা দিলাম বিকেল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত থাকব আপনার সাথে।ওকে,,,

-(খুশি হয়ে) ঠিক আছে।

তাতেই আমি ধন্য। কারন,আমার জন্মদিন কখনোই পালন হয়না। শুধু আম্মু একটু ভাল মন্দ রান্না করে,পায়েস

রান্না করে।ব্যস এটুকুই।

কলেজ আর প্রাইভেট শেষ করে, ওর বাড়িতে যাই আমি।

গিয়ে অবাক হয়ে যাই আমি।

ওর বাড়ির ডানদিকে একটু খোলা জায়গা আছে।

সেখানে নীল বেগুনি রঙের মিউজিক বাতি দিয়ে এত সুন্দর করে সাজিয়েছে জাস্ট ভাবতে পারছিনা। গাছের মধ্যে তীর চিহ্ন এঁকে কিভাবে যাব তার নির্দেশনা দিয়েছে। গেট ক্রস করতে গিয়ে চিকন সূতার বাধা

পাই। হাত দিয়ে টান দিতেই উপর থেকে শিউলি ফুল পরে অঝরছে।খুশি আর সৌরভে মন ভরে যায় আমার।

মাঝে টেবিল আর দুটো চেয়ার রাখা আছে। কাচের ভিতরে নীল মোমবাতি জ্বলছে। একটু পরেই, নীল পাঞ্জাবী পরে মৃদুলের আগমন হয়।

আমি কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিনা।এমন অপরূপ কেউ হতে পারে।

আমাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেয় ও। পেছনে লুকিয়ে রাখা কেক কাটতে বলে আমাকে ।

আমি বলি ধন্যবাদ দিলে ছোট হবে।তবে এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় জাঁকজমকপূর্ণ জন্মদিন।

কেক কেটে দুজন দুজনাকে খাইয়ে দেই।

মৃদুল বলে,

-সাড়াজীবন বন্ধু হয়েই পাশে থেক।আর কিছু চাইনা।

– এভাবেই থাকব কথা দিলাম।

কিন্তু কেউ ভালবাসার কথাটা বলতে পারিনি।কোথায় যেন বাধা? হয়ত সমাজ কলংক নয়তো প্রত্যাক্ষানের ভয়ে।

সামনেই ঈদুল আযহা। ঈদের দিন গরু জবাই, গোসত কাটাকাটি করেই পার হল।রাতে বড় আপু ফোনে আল্টিমেটাম দিয়ে বলল, কাল যদি না আসিস আমাদের বাড়িতে তবে তোদের বাড়িতে আর কখনো যাবনা। এই সাফ সাফ বলে দিলাম।নাস্তা খাবি আমাদের বাড়িতে-শুনছিস।

কি আর করা পরদিন, নাস্তা না খেয়েই রওনা হলাম আপুদের বাসায়। তারাহুরো করতে গিয়ে ফোনটা ফেলি

গেছি, আপুদের বাসায় পৌঁছে লক্ষ্য করলাম।

মৃদুলকে তো জানাতেই পারিনি। কি হবে এবার বিড়বিড় করে বলি, আমি।

মাঝখানে একদিন থেকে পরদিন বাড়ি ফিরে আসি।

আমার রুমে ঢুকেই আগে মোবাইল চেক করি। ওএমজি ৩০টা কল এসেছে মৃদুলের নম্বর থেকে।

আমি চেষ্টা করি বার বার। কিন্তু সুইসট অফ বলছে।মনটা কেন যেন কু ডাকল।

তাই খুব তারাতারি ওর বাড়িতে যাই আমি।

ওর কাজিনের কাছে জানতে পারি মৃদুল হাসপাতালে।

সেখান থেকেই যাই হাসপাতালে। রিসিপশনে জিজ্ঞেস করতেই বলে,২০৩ নম্বর রুমে আছে ও।দৌড়ে কেবিনে গিয়ে মৃদুলকে অজ্ঞান অবস্থায় পাই।

ওর কাকিকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, মৃদুলের দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে।তাছাড়া কোন কিডনি পাওয়া যায়নি।কিছু পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু ম্যাচ

করেনি ওর সাথে।

কি করব কিছুই ভেবে পাচ্ছিনা।।পরক্ষনেই মনে পড়ে আমার তো দুটো কিডনি আছে। একটি কিডনি দিয়েই তো বেঁচে থাকা যায়।

ডাক্তার কে বলি,

-ডাক্তার সাহেব,আমাকে পরীক্ষা করে।দেখুননা আমার কিডনি ম্যাচ করে কিনা। প্লিজ প্লিজ,,,

– আমরা পরীক্ষা করতেই পারি।কিন্তু আপনি কে আর আপনার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া আমরা তোমার কিডনি নিতে পারিনা।আর সে সময়ও নেই হাতে।

-তাইতো। প্লিজ, আমার কিডনি নিন যত তারাতারি সম্ভব। ও বেঁচে না থাকলে যে আমিও বাঁচবনা। আপনি কি চান আপনার জন্য দুটো প্রাণ ঝরে যাক?

ডাক্তার আর কিছু না ভেবে আমাকে পরীক্ষাগারে নেয়। পরীক্ষায় আমার কিডনি ম্যাচ করে।আর দুঘণ্টা পর অপারেশন।

আমাদের কে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হচ্ছে। এমনসময় আমার আব্বু আম্মু খবর পেয়ে ছুটে আসে।

‘কি করতেছিস তুই এটা ‘-আম্মু বলে।আমি শুধু বলি,বেঁচে থাকার জন্যই এসব করছি আম্মু। ও না বাঁচলে যে আমিও বাঁচবনা।

৩ ঘন্টা পর।

আমাদের অপারেশন শেষ হল।জ্ঞান ফিরতে প্রায় ২ ঘন্টা লাগল। জ্ঞান ফিরলে পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখি মৃদুল আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

মুচকি হাসি দিয়ে বলি,ওয়েলকাম। ও বলে,

-এত ভালবাস আমায় বলনি কেন?

-ভালবাসা কি মূখে বললেই হয়? তুমি যে আমার কুড়িয়ে পাওয়া ভালবাসা।

সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.