টুকরো অতীত

লেখকঃজন রোমিও।

বৈশাখের হাওয়া লেগেছিলো ফুলপুর সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র দের মনে।পহেলা বৈশাখ মানেই উজ্জ্বল লাল পাঞ্জাবী,গেরুয়া রঙ ফতুয়া,সাদা পায়জামা বা হলদে কোনো পোশাকের আসর।

ছাত্ররা খুব এক্সাইটেড। কত্ত রকম প্ল্যান প্রোগ্রাম তাদের।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর ইন্টারনেটের অনবদ্য আশীর্বাদ এ শহুরে বাতাস লেগে গেছে গ্রাম এ।সবাই হালফ্যাশনের রঙ এ ঢং এ ব্যস্ত।কিন্তু নবম শ্রেণীর উজ্জ্বল এর আজ মন টা খুব উদাস। কেন যেন কিছুই ভাল লাগে না তার। শুধু মুখ টাকে গম্ভীর করে নদীর ধারে বসে থাকে ইদানীং।

সে খুব মেধাবী আর দূরন্ত একটি ছেলে। কিন্তু তার এহেন আচরণে তার হোমটিউটর মিশকাত এর কিছুটা খটকা লাগে।মিশকাত মাস্টার্স কম্পলিট করেছে খুব বেশি দিন হয়নি।উজ্জ্বল এর মায়ের এক দূরসম্পর্কের খালাত ভাই হন তিনি।উজ্জ্বল দের বাসার খুব কাছেই থাকেন মিশকাত।পড়াতে এসে দেখেন উজ্জ্বল বাসায় নেই।পরে নিজেই অনুমান করেন কোথায় হতে পারে সে? কারণ উজ্জ্বল বলেছিলো সে নদীর ধার খুব পছন্দ করে।আজ মাত্র পাঁচদিন হলো তিনি উজ্জ্বল কে পড়াচ্ছেন।ভাবলেন,”নাহ্ আজ যাই তো!দেখি ছেলেটার প্রব্লেম কি আসলে??” তখন সূর্যাস্ত প্রায়।আকাশ জুড়ে কুসুম লাল আবরণ।উজ্জ্বল বোকার মত মাথা উঁচু করে কি যেন দেখছিলো আকাশে। “কি? পড়তে হবে না আজ?” আওয়াজ টা খুব চেনা উজ্জ্বলের পেছন ফিরতেই একটু নড়েচড়ে বসলো আরে!এত আমার স্যার! ভেবে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে উত্তর করলো,”আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনি আসবেন না।”

মিশকাতঃ কিন্তু এমন টা ভাবার কোনো কারণ তো দেখছিনা। উজ্জ্বল:কাল তো পহেলা বৈশাখ!তাই আর কি?

কথাপ্রসঙ্গে মিশকাত উজ্জলের মন এর খবর জানতে চাইলে উজ্জ্বল জানায় সে ঠিকাছে।সন্ধ্যা প্রায়,দুজনে বাসায় রওয়ানা হয়।গ্রামের মেঠোপথ,স্যারের সাথে চলতে উজ্জ্বলের কম্ফোরটেবল লাগছিলো না।একটু পরে কি ভেবে বললো,”স্যার আজ না হয় বাসায় চলে যান।খুব কস্ট দিলাম।”

মিশকাত কিছু মনে করলেন না যদিও তবুও শাসনের সুরে বললেন,”এভাবে বাহিরে অসময়ে থেকনা।নদীর কূল আমারো পছন্দ।নেক্সট টাইম দুজন একসাথে আসবো কেমন?”

কথাটা কেমন যেন ভাবান্তর ঘটালো উজ্জ্বলের মনে।খুব মিস্টি একটা খুনসুটি কাজ করলো ওর অবচেতন মনে।সে আসলে খুব একাকিত্ব প্রিয় যদিও সংগ চায় আনমনে।কিন্তু স্যার তার মনের বেদন টুকু কি বুঝতে পারবেন?সে কি চায়? উজ্জ্বল আবার আপসেট হয়ে পড়ে। হঠাত মিশকাত বলেন এসো আজ।কাল আসবো। তোমাকে নিয়ে নদীর পাড় ঘুরতে।পুরো দিন বন্ধুদের নিয়ে বেড়াবে।একা থাকবে না। আজ পহেলা বৈশাখ।হাল্কা নীল একটা পাঞ্জাবী পড়েছে উজ্জ্বল।কি বুঝে পড়লো কে জানে? ছোট্ট বোন শানু ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,ভাইয়া তুই কি মশাকে প্রপোজ করবি? ওরা নীল এর প্রতি খুব দূর্বল। এসব কথায় উজ্জ্বলের ভ্রুক্ষেপ ও নেই।পুরো দিন ঘরে বসে কাটালো।বিকেলে মিশকাত এলেন।নাশতা করে উজ্জ্বল কে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নদীর তীরে রওয়ানা হলেন ।এই প্রথম উজ্জ্বল তার স্যারের পেছন থেকে জড়িয়ে বসেছে।কেমন যেন লাগছিলো তার।

কিন্তু মাত্রাতিরিক্তভাবে উজ্জ্বলের চেতনা কেমন যেন ঘোরঘোরালো লাগছিলো।খুব সোদা একটা বুনো ঘামের গন্ধ ভক করে ওর নাকে এসে লাগলো।স্যার প্রায় অনেক টা পথ সাইকেলে চড়ে এসেছেন।ঘেমে প্রায় ভিজে গেছেন উনি।তবুও এই গন্ধ টা তার ভাল লাগছিলো।মিশকাত তার চেতনায় ধাক্কা দিলেন,”কিরে!কথা বলছো না যে?”

“কই! আছি তো।”উত্তর করলো উজ্জ্বল।

একসময় তারা পৌছালো। ঘাসের বুকে হুট করে লুটিয়ে পড়লেন মিশকাত।ঘামে ভেজা বগল জোড়া হলদে পাঞ্জাবীর উপর থেকে বোঝা যাচ্ছিল।আর বাবড়ী চুলগুলো এলোমেলো লাগছিলো।আজ উদাসীন উজ্জ্বলের মন খুব ফুরফুরে লাগছে।স্যার কে দেখে কেমন যেন পালটে গেছে সে।কিন্তু স্যার? উনাকে তো কখনো সে ভাবেনি এভাবে?তাহলে আজ কেন এত বিস্ময়ভরে স্যারের পুরুষালী সুন্দরতা তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে সে?

কেন তার এত ভাল লাগছে স্যার কে এভাবে কাছে পেয়ে?

“কি হয়েছে তোমার উজ্জ্বল বলো তো? আমি খেয়াল করছি তুমি তোমার মধ্যে নেই।আমাকে বলতে পারো তুমি।” মিশকাত উজ্জলের কাধে হাত রেখে বললেন।

কেমন যেন মোমের মত গলতে থাকে উজ্জ্বল।একটা চাপাকান্না তাকে ভর করে ফেলে।সম্বিৎ হারায় তার আবেগ ।একটা সর্বহারা মানুষের মতন স্যার কে জড়িয়ে ধরে পরগাছার মত। বলে উঠে,”আমি জানি না আমি কি পাপী কিনা!তবে আমি খুব এলোমেলো হয়ে আছি। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা।আমি পুরুষপ্রেমী স্যার।আমি খুব পচা।” উজ্জ্বলের কথাগুলো শুনে ওর গায়ে হাত বোলাতে শুরুকরলো মিশকাত।উজ্জ্বল ভাবলো তার কস্টগুলো ছিঁচকাঁদুনী মনে হবে স্যারের আর ঘুরিয়ে থাপ্পড় এসে পড়বে তার গালে।কিন্তু স্যার তাকে সান্তনা দিচ্ছেন যে! লজ্জায় মাথা নিচু করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যখনি সে চেষ্টা করলো ওমনি সে খুব পরম একটা আদর খুব অপ্রত্যাশিত ভাবে পেল মিশকাতের কাছ থেকে।সযতনে মিশকাত চুমু খাচ্ছে তার ঠোঁটে-ঠোঁটে। নিজের চোখ কে অবিশ্বাস কি করে করে সে! মিশকাত এবার আরো জোরে জড়িয়ে নিলেন উজ্জ্বল কে।বললেন,”আমি জানি কি তুমি? আমাকে ক্ষমা করে দাও তোমার অনুমতি না নিয়েই এমন একটা কাজ করে ফেললাম,কিন্তু! আমিও যে সমপ্রেমী।আমি তোমাকে কখনো সেই চোখে দেখিনি।কিন্তু তুমি যখন কারণ ছাড়া বার বার আমাকে কিছুক্ষণ আগে দেখছিলে আমার মনে হচ্ছিল তুমি তোমাতে নেই।অন্য কোনো তুমি কেউ।সমপ্রেমীরা এমনি হয়।সাথীছাড়া তারা ঠিক একটা একা পাখির মত।যে মিলনের জন্যে একটা পাখিকে দেখলে বুক ফুলিয়ে দেয়।লেজ উঁচিয়ে আওয়াজ করে ডাকে।আমি তোমার উদাসীনতার কারণ ভিন্ন কিছু ভেবেছিলাম।কিন্তু তুমি আমার কলেজ লাইফ টা মনে করিয়ে দিলে। আমিও যে তোমার মতই একজন।”

কি বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না উজ্বল।নীরব একটা মৌন সম্মতি তার চোখে।সেটাকে ছাপিয়ে মিশকাতের ফের চুম্বন উজ্জ্বল কে খুব কাঁদিয়ে দিল।মন খুলে কাদলো সে মিশকাতের বুকে।

এভাবেই মিশকাত আর উজ্জ্বলের লাভ স্টোরি টা শুরুহয়।কিন্তু বাধ সাধে মিশকাতের পরিবার। তাকে তারা বিদেশে পাঠাতে চাইছেন।কিন্তু উজ্জ্বল কে ফেলে কি করে মিশকাত এখন উচ্চশিক্ষার জন্যে দেশের বাহিরে যাবে? কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে উজ্জ্বল হাসিমুখে বললো,”তোমাকে তো আমারি থাকতে হবে,কারণ আমি তোমার।তুমি পড়াশুনা শেষ করে ফিরো।” সময়ের সাথে একসময় মিশকাত দেশের বাহিরে যায়। ওদিকে উজ্জ্বল ও ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে।একদিন সন্ধ্যায় তখন কি যেন মনে করে উজ্জ্বল ফেসবুকে ঢোকে। দেখে একটা ভয়েস এস এম এস মিশকাত পাঠিয়েছে। খুশিতে পাগলপ্রায় হয়ে ওপেন করে ভয়েস এস এম এস টা। মিশকাত বলছে সে এখন দেশে আছে।ইনফ্যাক্ট ফুলপুর সদরেই।১০০ টাকার একটা নোট নিয়ে দৌড় দেয় উজ্জ্বল।খুব হাপাতে হাপাতে হাফিজ কাকার দোকান থেকে পেঁয়াজি আর বেগুনী নিয়ে বাসস্ট্যান্ড এ এসে ফোন দেয় মিশকাত কে।

আনন্দে শুধু একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ এর মতো গোঙানি শোনা গেল উজ্জ্বলের মুখ থেকে।চোখ তখন একদম আদ্র তার।শুধু মিশকাতের প্রশস্ত বুকে নিজেকে লেপ্টে নিয়ে এটুকু বলে উঠতে পারলো,”উমম তুমি এমন করোনা।আমি তো তোমারি।”

দারুনএকটা সময় তখন।দুজনের অভিমানী ভালবাসা তখন তুংগে।দুজন দুজনকে আজ ছাড়াছাড়ি নেই ।সুদে আসলে কেঁদে হেসে আড্ডা দিয়ে হালকা হচ্ছে তারা।

যখন দুজন ফিরছিলো থানার মোড় টা ঘুরতেই খুব সজোরে একটা ধাক্কায় ছিটকে পড়ে মিশকাত রাস্তার পাশের কাঠমিস্ত্রির দোকানের সামনে রাখা কাঠের পাটাতন এর উপর।মাথায় প্রচন্ড আঘাত পায় সে।যখন নিজেকে সামলে নেয়।একটু মাথা উঠিয়ে রাস্তায় যা দেখলো তাতে তার পা থেকে মাটি সরে গেল যেন দেখলো উজ্জ্বলের মায়াবী মুখটা রক্তস্রোতে স্নাত।চিত হয়ে নিষ্প্রাণ ছেলেটা খোলা চোখে তাকিয়ে আছে শূণ্য দৃষ্টিতে। কিন্তু সে চাহনিতে এক রাশ খুশির ঝিলিক এখনো অস্তিত্বহীন হয়নি। আজ যে উজ্জ্বল তার প্রাণ কে দেখেছে,ছুঁয়েছে, এঁকেছে মন ক্যানভাসে প্রতিদিনের মতো জীবন্ত করে। কোনোভাবে উজ্জ্বলের কাছে যেতে পারলো মিশকাত।ওর হাটু থেকে রক্ত ঝরছে।সেদিকে সে তাকালো না ।রক্তমাখা দু হাত দিয়ে উজ্জ্বলের মুখটা ধরে উজ্জ্বলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো,”আমার নয়নমণি তুমি একা ঘুমাও কেন? দেখ তোমার রাজপুত্তুর তোমার এমন ঘুমে খুশিনা। বাবুরে উঠোনা? আমি খুব হয়রান বাবু এতদিন একা ছিলাম অনেক গল্প করবো তো?” এভাবে বলতে বলতে অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লো মিশকাত।

“বাবু,উঠো? আমি দেখনা তোমার মাতাল বাবু তোমার মাকাল ফল তুমি আসোনা খাও আমাকে আমি না তোমার রসগোল্লা? আজকেও কথা বলবানাতো? আচ্ছা আজকে এক্কেবারে হাফসেঞ্চুরী করবো ৫০ প্যাকেট সিগারেট খাবো কিন্তু?”

এসব বলতে বলতে কান্নায় লুটিয়ে পড়েন মিশকাত সামনেই উজ্জ্বলের কবর। গোরস্থানের কেয়ারটেকার হারুন কাকু প্রতি শুক্রবার এই দৃশ্যটা দেখেন আর নিজেও কাঁদেন।

সন্ধ্যামালতীর বুনো গন্ধ টা কেমন যেন গা গুলানো লাগছে মিশকাতের।আয়নায় নিজেকে ডাকু মনে হচ্ছে। কতদিন সেইভ করেনা নিজেও হিসেব করতে পারলো না। গতর থেকে কেমন মাটি মাটি গন্ধ লাগছে তার । “ভাইসাব! বাইচ্চারা আইয়্যা লইসে,পড়াইবেন না?”

বুয়ার ডাকে একটু হুশ ফিরলো মিশকাতের।

সে আর পড়ালো না।কেন যেন ফুলপুর টানছে তাকে। দু ঘন্টার পথ।একটা সি এন জি ধরিয়ে ফুলপুরের দিকে রওয়ানা হলো সে। অনেক অভিমান,ঝগড়া,চেপে আছে তার ভেতর।দিন দিন খুব ঝগড়ালু হয়ে যাচ্ছে সে।সি এন জি ড্রাইভার আস্তে চালাচ্ছিল।তাকে অবাক করে দিয়ে এমন একটা গালি মিশকাত দিলেন ড্রাইভার হতবাক হয়ে গেল। নিজেকে মিশকাতের একটু ও অপরাধী মনে হয়না আর।সে সবাইকে ইতর ভাবে।নিজেকে অন্য গ্রহের আবর্জনা মনে করে সে।যুক্তি নেই তার।আছে এক বুক চাপা ক্ষোভ আর শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল।

একদিন রাতে স্বপ্ন দেখে মিশকাত উজ্জ্বলের কবরে ফুলের একটা গুলদাস্তা ।সেদিন বিকেলে সে মেহনাজ কমপ্লেক্স এর সামনে ফুলের নিউ স্টল টাও দেখে কিন্তু তার মন টা এখন পক্ষপাতিত্ত্ব করে শুধুই তার জন্যে।”ওর ঘুম ভাঙেনা কেন? এত্ত পাতথর কেন্ পোলাডা? আমি কি কেউ না ওর? ফুল টুল লমু না ওর লাইগা… আমার ওত ভিমরতী নাই।” কস্টে নিজের আঞ্চলিকতা কে আটকাতে পারলনা মিশকাত।

সেদিন ছিলো পহেলা বৈশাখ খুব গরম পড়েছে। খালি হায়ে শুয়ে আছে মিশকাত।লোডশেডিং গরমে ঘামছে খুব। আজ সে স্থির,শান্ত চোখ কি ঘামে? নিজের মন কে সে প্রশ্ন করে? খুব অবাক করে দিয়ে তার মন তাকে বলে চোখ কাদে। সে যেন আরো অবাক হলো ফোন টা হাতে নিয়ে তার আর উজ্জ্বলের ছবি গুলো দেখতে লাগলো।আর ভাবতে লাগলো আজ এসব শুধুই ফটোগ্রাফ। আমার ভালবাসা আজ টুকরো অতীত।

……………..

সমাপ্ত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.