কবর

ঘাসফড়িং

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।

মাসটা বৈশাখ।এমন ঝড়ো বৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে,মাঝেমাঝে বজ্রপাতও হচ্ছে।পরিবেশটা মোটামুটিভাবে অসাধারণ বিশেষণটার যোগ্য।অথচ এমন রোমাঞ্চকর একটা সময়েও নাক ঢেকে ঘুমুচ্ছে শিলা।এই বৃষ্টি ভেজা রাতে স্বামী বেলকনিতে বসা আর স্ত্রীর বেহাল হয়ে ঘুমিয়ে থাকাটা বেখাপ্পাই বটে।

অবশ্য আমি নিজেই কেমন অদ্ভুত!ও তো কিছুক্ষণ আগ পর্যন্তও আয়নার সামনে বসে কত রংঢং করে সেজে গিয়েছে।ঘন কালো চুলগুলো কিছুক্ষণ বাম কাঁধে তো কিছুক্ষণ ডান কাঁধে ঝাঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে ফেলে নিজেকে দেখছিল আয়নায়।আমি ওর দিকে তাকাতেই কেমন লবঙ্গলতা হয়ে গেল!লজ্জা পেল কেন ও?স্বামী হয়ে অবশ্য এটুকু বুঝতে পারারই কথা।বেশ খানিকক্ষণ খাটের উপর বসে এপাশ ওপাশ করছিল।শেষমেশ বিরক্ত হয়েও আমার কাছে এসে নরম সুরে বলল,

-শুবেনা?

আমি একটু চমকিয়ে উঠার ভান করে বললাম,

-হ্যাঁ শোবো।তুমি যাও আমি আসছি।

চমকে উঠার ভান করলাম যেন ও বুঝতে পারে কোনও এক চিন্তায় ডুবে রয়েছি আমি।আর যেন ধরতে না পারে যে,আমি ওকে লক্ষ করেছি এতক্ষণ।

শিলার এই একটা গুণ ওর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দেয়।রাগের বা বিরক্তি বোধের প্রতিক্রিয়া এ দুবছরেও কখনও কঠিন হয়ে দেখাতে পারেনি ও আমার উপর।দেখায়না হয়ত।স্বভাবের বিপরীত ও হতে পারে।তাই ও অনেকটা ভিন্ন।

ঘড়ির কাটা তার মাঝ গণ্ডিতে, এগিয়ে যাওয়ার ক্ষীণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।এমন গভীর রাতে শরীর অনিয়ন্ত্রিতই হয়ে পড়ে।বৃষ্টি-শরীরের হাল্কা ঠাণ্ডা একটা হাওয়া খোলা বারান্দা দিয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরে।বৃষ্টির ছাটও সেই কখন থেকেই পড়ছে গায়ে,কিন্তু কেমন যেন জড়তা পেয়ে বসে আছে শরীরটাতে।নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে থাকা দৃষ্টি চারদিক ধোঁয়াশা করে দিল হঠাৎ।

বড় বড় বৃষ্টির ফোটাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।কোনও একটা স্মৃতি ভাস্বর হয়ে উঠল চোখের পাতায়।দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসতে লাগল সাথে করে স্মৃতির ডায়রির পাতাগুলোও কেমন পিছিয়ে যেতে লাগল,এমনই এক ঝুম বৃষ্টির রাতে।

অফিস থেকে ফিরছিলাম গাড়ি করে।গাড়ির জানালার কাচবেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে।পথঘাট একদম জনমানবহীন।রাস্তাটাও একদম ফাঁকা।হঠাৎ করেই একটা শয়তানি বুধ্ধি চেপে বসল মাথায়।গাাড়ির ভেতর তেমন হাওয়া ঢুকতে পারছে না বলে খুব গরম বোধও হচ্ছিল।তাই ভাবলাম গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে বৃষ্টিতে ভিজি কিছুক্ষণ।খুব ভাল লাগার মত অভ্যাস এটা আমার।

গাড়িতে পিঠ ঘেষিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।বৃষ্টির বেগটা প্রচণ্ড।তাই নিমিষেই শার্টটা গায়ের সাথে লেপ্টে লেগে গেল।কেউই তো পাশে নেই,তাই ভাবলাম ভিজতেই থাকি।হাতদুটো দুদিকে প্রসারিত করে অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে ভিজতে থাকলাম।বেশখানিকক্ষণ ভেজার পর ঠাণ্ডা অনুভূত হতে লাগল।হঠাৎ বোধ হল এবার যাওয়া যাক।আর কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে বাসায় গিয়ে যে একঢুলি বকুনি শুনতে হবে সেটা মনে পড়ল।গাড়ির দরজা টেনে দিয়ে উঠতে যেতেই ছপ ছপ করা কারো জুতো পড়া হাঁটার আওয়াজ কানে এল।মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই কাকভেজা একটা ছেলেকে দৌড়ে আসতে দেখলাম।

একহাতে ছাতা,অন্য হাতে ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে একেবারেই ভিজে গেছে ছেলেটা।আমার পাশ অতিক্রম করে যেতেই আমার নির্বাক দৃষ্টি তার অন্তরায় হল।আমার দিকে কিছুটা অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আবারও এগিয়ে যেতে লাগল।আমি এবার ছেলেটাকে ডেকে থামালাম,

-এই শোনো,এমন বৃষ্টিতে যাচ্ছ কোথায়?

ছেলেটা কিছু না বলে এগিয়ে আসল আমার দিকে।ফোলা আর লালদুটো চোখের করুণ চাহনিতে কিছু একটা স্পষ্ট হতে গিয়েও হচ্ছে না তার।ছেলেটা মুখ খুলল,

-আপনি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন?

-কোথায় যাবে তুমি?

-আগে গাড়িতে উঠি তারপর বলছি।

-উঠো উঠো।

ছেলেটার দিকে আমার রুমালটা এগিয়ে দিয়ে বললাম,

-মাথাটা মুছে নাও।

ঝটপট করে ছেলেটা হাত মুখ মুছে নিল।ভেজা চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে দিতেই ডাগর দুটো চোখ বেরিয়ে এল।লম্বা ভ্রু-সাথে এমন অমায়িক দুটো চোখ,নিপুণ ভাবে গড়া উঠা নাকের সাথে মানানসই একটা মুখাবয়ব।কাউকে যখম করার মত না হলেও অন্তত আকৃষ্ট করার মত।অবাক করে দেওয়ার মত অসাধারণ কিছু না থাকলেও ছেলেটার সাধারণ হওয়াটাই কেমন যেন অসাধারণের মধ্যে পড়ে।

রুমালটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

-আপনিও মুছে নিন।

আমি হেসে দিয়ে বলি,

-আমি ইচ্ছে করেই ভিজেছি।

আচ্ছা তুমি যাবে কোথায় বলো?

ছেলেটা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,

-আপনি যাবেন কোথায়?যদি স্টেশনের দিকে যান তাহলে আমাকে স্টেশনে নামিয়ে দিলেই চলবে।

-এত রাতে স্টেশনে কী করবে?কোথাও যাওয়ার হলে আরও আগে কেন বেরোলেনা?স্টেশনের বাস তো সেই আটটায় ছেড়ে দিয়েছে।

-আমি কোথাও যাচ্ছিনা।আপনি ওখানেই আমাকে নামিয়ে দিন,তাহলেই আমার অনেকটা উপকার হবে।

-আচ্ছা আমে স্টেশন দিয়েই যাব।নামিয়ে দেব তোমাকে।

কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না আর।স্টেশনে পৌছোতে যেটুকু সময় লেগেছিল,পুরোটা সময়েই চুপচাপ ছিল ছেলেটা।

স্টেশনে আসার পর ছেলেটা তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেমে পড়ল।আমি জানালার কাচ নামিয়ে তাকিয়ে রইলাম।যাত্রী ছাউনির নিচে গিয়ে বসে পড়ল ও।

আমি স্বাভাবিক হয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলাম।বাসার সামনে গাড়ি থামাতেই শিলা বেলকনিতে ছুটে এল।গাড়িটা গেটের ভেতর ঢুকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই শিলা এসে দরজা খুলে দিল।আমার ভিজে চুপসে যাওয়া দেখে ও নিজেও কেমন চুপসে গেল।আমি বললাম,

-কি,ভেতরে ঢুকতে দেবেনা?

ও খানিকটা অবাকস্বরে বলল,

-তোমার এ অবস্থা কী করে হল?

আমি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম,

-ভিজেছি।তাই এ অবস্থা।

-তুমি কি বাচ্চা?অফিস তোমার সেই কখন ছুটি হয়েছে।তুমি তাহলে এতক্ষণ বৃষ্টিতেই ভিজেছ?

-আরে না,অল্প কিছুক্ষণ ভিজেছি।তুমি আর কিছু জিজ্ঞাসা করোনা প্লিজ।

-ঠিকাছে জিজ্ঞাসা করছিনা।তবে শরীরের অবস্থার কোনও পরিবর্তন না হলেই হল।ড্রেস চেঞ্জ করে আসো তাড়াতাড়ি।

ভেজা কাপড় গুলো তাহলে এতক্ষণ গায়েই ছিল!

বিড়বিড় করে বলতে লাগল শিলা।ততক্ষণে আমি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়েছি।

রাতের খাবার সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই বাড়ি থেকে ফোন।মা ফোন করেছে।কথাবার্তা শেষে ফোন রেখে দিতেই শিলা বলল,

-মা কি আসছে তাহলে?

-জ্বি না।আপনার শ্বাশড়ির এখনও সুমতি হয়নি।ওনি ঐ অজপাড়া গায়েই থাকতে চায়।

-তুমি এমন করে বলছ কেন?সুমতি তোমার নেই বলো।মায়ের সুমতিই বটে।এমন ইট পাথরের শহর থেকে আমাদের গ্রাম হাজার গুণ ভাল।

-আচ্ছা ঘুমাও।এসব আমার জানা।

মুয়াজ্জিনের আর পাখিদের মধুর কলকলানিতে ঘুম ভাঙল।অনেকক্ষণ বিছানাতেই গড়াগড়ি দিলাম।পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে সময় দেখে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম।হাত-মুখ ধোয়া,নামায এবং সকালের নাশতা।নিত্যদিনকার রুটিনমাফিক সব সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।খুব সকালেই অফিসের কাজকর্ম শুরু হয়।তাই দেরি করে ঘুম থেকে উঠার মত বদভ্যাসটা নেই।হঠাৎ করেই গাড়ির সামনে কাউকে দেখতে পেয়ে চোখদুটো ছানাবড়া হয়ে গেল প্রায়।গাড়িটা খানিকটা পিছিয়ে নিয়ে জানালার কাচ নামাতেই কাল রাতের ছেলেটাকে সেই একই জায়গায় দেখতে পেয়ে শুধু অবাকই নয়,হতবাক হলাম।চট করে গাড়ি থেকে নেমে যেতেই ছেলেটা আমাকে দেখতে পেয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল।

-তুমি এখনও এখানে?

-না মানে,রাতের বাসটা তো পাইনি।আর সকালের বাস তো ন’টায় ছাড়বে।এখন তো সাড়ে আটটা বাজে।

-তুমি সারারাত কি এখানেই বসে কাটিয়েছ?

ছেলেটা একটা নাটকীয় হাসি দিয়ে আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চাইল।হাত দুটো কচলাচ্ছিল ও।এই হাত কচলানো একটা মানুষের অপারগতার বহিঃপ্রকাশ।তার নির্ঘুমে থাকা চোখদুটোও অনেককিছু বলে দিচ্ছে।আমার বেশ অস্বস্তি লাগতে শুরু করল।ছেলেটাকে তো আমিই এখানে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম।একবারও কেন চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম না যে,ওর গন্তব্য কোথায়!নিজেকে ছোট মনে হতে লাগল।

-এই ছেলে,তুমি আমার সাথে চলো।

-কোথায় যাব?

-এত প্রশ্ন করার মত কিচ্ছু হয়নি।আমি ছেলেধরা না,বুঝেছ?আর যেখানেই নিই,অন্তত তোমাকে স্টেশনে বসে রাত কাটাতে হবেনা।ছেলেটা সন্দিহান হয়ে পা বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসল।

-তুমি যাবে কোথায়?

-গ্রামের বাড়িতে যাব।

-গ্রাম কোথায় তোমাদের?

-শ্যামপুর।

-তুমি শ্যামপুরের?বুড়িচং থানার না?

-হ্যাঁ।আপনি চিনেন?

-আরে চিনবনা কেন,আমাদের গ্রামের বাড়িও তো সেখানে।

-বলেন কী?

-হুম।

…..

এইভাবে কথায় কথায় ছেলেটার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হল।একই এলাকার হওয়াতে ছেলেটার পরিবারের সামর্থ্য-অসামর্থ্য,খুটিনাটি সবকিছুই আমার অবগত ছিল।তাই ওকে আর তেমন প্রশ্ন করতে হয়নি।অফিসে পৌছে কিছু খাবারের অর্ডার করলাম।কিছুটা সংকোচ বোধ নিয়েও ছেলেটা তার ক্ষুধা মেটাল।

-তোমার নামটা এখনও জানা হয়নি?

-রাফি।

-আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি,যদিও প্রশ্নটা কিছুটা ব্যক্তিগত হয়ে যাচ্ছে।তুমি কি কোনও সমস্যায় আছো?বলতে পারো আমাকে।

-আপনি আমার শ্রদ্ধার পাত্র।তাই একদম ফেলে দিতে পারছিনা আপনার রাখা প্রশ্নটা।তবে আমি চাইনা আমি কারো করুণার পাত্র হই।

-মানে?বুঝলাম না।

-আমার সমস্যাবলী শুনলে আপনি বেশ অবাক হবেন।আর আমার দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করবেন,এটাই ধ্রুব।কিন্তু এই বিষয়টা লজ্জার।আমি চাইনা এমনটা হোক।

-দেখো তুমি কিছু বলতে না চাইলেও আমি কিন্তু বুঝতে পারি।হতে পারে তুমি শহরে লেখাপড়া করতে এসেছ।তোমার স্বপ্ন তুমি লেখাপড়া করে অনেক বড় কেউ হতে চাও।এখন যদি তোমার কোনও একটা সমস্যা তোমার সেই স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তুমি কি চাইবে,তোমার স্বপ্ন পুরনের রাস্তাটা এখানেই থেমে যাক?

এবার কিছুক্ষণ চুপ থেকে গেল রাফি।বলতে শুরু করল,

-আপনার অনুমান ক্ষমতা প্রখর সেটা বুঝতে পারলাম।কিন্তু এখন কি করতে পারি?

-আমার ধারণাই যদি সত্যি হয় তাহলে আমি তোমাকে হেল্প নয়,ভাল একজন মানুষ হিসেবে তোমার পাশে দাঁড়াতে চাই।আর যদি মনে করো এটা তোমাকে আমার কাছে ঋণী করে ফেলছে,তাহলে লেখাপড়া শেষে আমার সে ঋন শোধ করে দিও।আমার ফিক করে হেসে দেওয়াতে রাফির সারা সকালের গোমরা মুখো চেহারাটা পাল্টে গেল।চোখেমুখে ওর বিশ্বাস আর আস্থা দেখতে পাচ্ছি।চিন্তিত মুখ নিয়ে ও বলল,

-মেসের ভাড়া দিতে না পারাতে মালিক আর মেসের বন্ধুরা রাখতে ইচ্ছুক ছিলনা।তাই বের করে দিয়েছে কাল।কোথায় যাব ভেবে উঠতে পারছিলাম না,তাই স্থির করলাম গ্রামে চলে যাই।এছাড়া আর ভাল রাস্তা নেই।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ও আবারও কিছু বলতে যাচ্ছিল।আমি কথা টেনে নিয়ে বললাম,

-টেনশনের কোনও কারণ নেই।সরকার থেকে কোয়ার্টার দেওয়া হয়েছে আমাকে।বিশাল একটা ফ্ল্যাটে তোমাকে রেখে এলে,খুঁজেও পাওয়া যাবেনা।

বলেই হেসে উঠি।

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে এলাম।শিলা আমার সাথে রাফিকে দেখতে পেয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলনা।রাফির দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল,

-তুমি রাফি?

বোকার মত রাফি আমার দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু করছিল।আমি বলি,

-ওনি আমার স্ত্রী।আমি তোমাকে গাড়িতে বসতে বলে অফিসেই ওকে ফোন করে সব বলেছিলাম।বলেছিলাম যে একজন মেহমান আসছে।

রাফির চোখে অদ্ভুত এক অনুভূতি।ও হয়ত অবাক হচ্ছে ওর প্রতি আমার সহানুভূতি দেখে।কিন্তু এমন অমায়িক একটা ছেলেকে এই কঠিন পৃথিবীতে একা ছাড়া যায়না।

অফিসে যাওয়ার পথে রাফিকে প্রতিদিন ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে যাই।ওর বন্ধুমহলের অনেকেই দেখি গাড়ি থেকে নেমে পড়তেই জিজ্ঞেস করতে থাকে,

-কি রে,গাড়ি কার?আর ওনি কে?উত্তরটা আর শোনা হয়না।তখন রাফি শ্রবণশক্তির বাইরে চলে যায়।আমি গাড়ি স্টার্ট করে চলে আসি।

সময়ের সাথে সাথে এই কয়েকমাসে আমাদের ফ্যামিলির একান্ত আপন হয়ে গেছে ও।তবে আমার থেকে ও শিলার

সাথেই কেন জানি বেশি ফ্রি।শিলার সাথেই ও হেসেখেলে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।ভাই বোনের সম্পর্ক থেকে কোনও অংশে কম নয় হয়ত।তবে এখনও মাঝেমাঝে আমি খুব অবাক হই,আমার প্রতি ওর লজ্জা আর সংকোচবোধ দেখে।এতটা লজ্জা কিসের ওর? এই এতদিনেও কি আমি ওর কাছের কেউ হতে পারিনি!এসব ভাবতে গেলে স্বাভাবিক ভাবনাগুলোও কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়।বড্ড অচেনা লাগে নিজেকে।

শিলার ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হল। শিলাকে গ্রামের বাড়িতে দিয়ে এসেই আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে গেলাম।হঠাৎই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর চলে এল।তবে সময়টা রাফির পাশে থাকাতে কষ্টে পার হয়নি।আমার প্রতি ওর সেবা শুশুষ্রাতে কোনওরকম সংকোচবোধ দেখতে পেলাম না।নির্বিঘ্নে আমার পাশে থেকে গেল।মাথায় পানি দিয়েছিল,ডাক্তারকে ডেকে আমাকে দেখিয়েছিল,বুয়া থাকা সত্তেও নিজেই রান্না করে খাইয়েছিল।আমি ওর এই সাধারণ কাজগুলোতেও কি যেন একটা খুঁজে পেলাম।এতদিনের সব অস্বস্তি নিমিষেই কোথায় মিলিয়ে গেল।আমার অব্যক্ত অনুভূতি গুলো কেমন যেন অদ্ভুত আর অচেনা মনে হতে লাগল।রাফির ধীর পায়ে চলাও কেন জানি ভাল লাগে,ওর ডাগর চোখদুটো কি বলে সেটা বিশ্লেষণ করতে প্রশান্তি বোধ করতাম।সারাক্ষণ ওকে দৃষ্টিবদ্ধ করেও চোখের তৃষ্ণা মেটেনা।

ওর অস্ফুট স্বরে কথা বলা গুলোকে অলৌকিক কিছু মনে হত।আমি রাফির খুব আপন কেউ না হলেও খুব পর কেউ ছিলাম না,তাই এতদিনে ওর হাসিমাখা মুখটা আমার জন্য সাধারণ ব্যপার হয়ে গেল।কোমল ঠোঁট দুটো বাঁকিয়ে দিয়ে চোখ মেলে তাকালে মনে হত সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া একটা গোলাপ তার পাপড়ি মেলে ধরেছে মাত্র। ওর হাতে করা সুনিপুণ কাজে এক অগাধ ভালবাসা মিশে আছে,যা ও খুবই সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করে;এমনই মনে মনে হত।

তবে সেদিনের রাতটা এক কণ্টকাকীর্ণ রাত ছিল।দুদিনব্যাপী রাফির দেখাশোনাতে পরদিন রাতে একটু সুস্থতা বোধ করলাম।রাতে আমাকে খাইয়ে দেয়ার পর আমার সাথেই থেকে গেল রাফি।অনেক কথা হল।আমি ওকে জিজ্ঞেস করি,

-আচ্ছা রাফি,তুমি কি আমাকে লজ্জা পাও ভীষণ?

ও একটু হেসে দিয়ে বলে,

-আসলে আমি মানুষটাই লাজুক।

-কই?শিলার সাথে যতটা খোলামেলা আমার সাথে কেন তেমন হতে পারনা?আমার খুব কষ্ট লাগে এ বিষয়টা।আমার থেকে যে দূরত্ব তুমি বজায় রেখে চল তা আমার কষ্টটা আরও বাড়িয়ে দেয়।

হুট করেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল কথাটা।রাফি চরম বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকাতেই আমি চোখদুটো নামিয়ে ফেললাম।বেশকিছুকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলাম দুজন।এই মুহূর্তটাকে নীরবতা গ্রাস করে নিল কেন সেই উত্তরট কিছুটা অদ্ভুতই বটে।ও কিছু বলতে চাচ্ছিলনা,অস্বস্তিতে হাতের আঙুল কচলাতে লাগল।পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করা যায় কীভাবে সেটা বুঝতে পারছিলাম না।তাই একপাশ হয়ে শুয়ে পড়লাম।রাফি অনেকক্ষণ চুপ হয়ে বসে থেকে শুয়ে পড়ল।খুব কাছে থেকেও একটা কথাও হয়নি দুজনের মধ্যে। মাঝরাত পর্যন্তও কেন যেন ঘুম এলনা চোখের পাতায়।রাতের শেষপ্রহরে চোখদুটো একটুখানি লেগে এসেছিল।

সকালে শিলার ফোনে ঘুম ভাঙল।রিসিভ করতেই অভিমানী কণ্ঠে বলতে লাগল,

-তুমি কবে আসছ?

-অফিস থেকে দুদিনের বেশি ছুটি নেওয়া যাবেনা।তাই বিয়ের দিন ছাড়া আমি যেতে পারছিনা।

-ভীষণ জঘন্য একটা ব্যপার হয়ে গেল।

-কী করার আছে বলো?

-আচ্ছা,খাবার দাবার ঠিকমতো খেয়ো।আর অ্যাসিডিটি বাড়লে পানি খেয়ো বেশি করে।ড্রয়ারে রেনিটিডিন আর সেকলো রাখা আছে।

-জানি তো সব।এত টেনশন মাথায় রাখলে আপনি ভাইয়ের বিয়ের মজা হারিয়ে ফেলবেন মহারাণী।

-হয়েছে!ছোট আপুর,বড় আপুর পরিবারের সবাই এক এক করে এসে পড়ছে।আমার দিক থেকে শুধু আপনিই অনুপস্থিত।এটা মনে হয় আনন্দের?

-চলে আসব তো।

-আচ্ছা এখন রাখছি।বাই।

-বাই

ফোন রেখে তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।কিন্তু মনে হল ভেতরে কেউ গোসল করছে।বুঝতে পারলাম রাফি।কিছুক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।রাফি গোসল সেরে বেরিয়ে আসতেই আমার নির্লজ্জ,অসামাজিক দুটি চোখ ওকে গ্রাস করে নিতে চাইল।ওর ভেজা শরীরের স্নিগ্ধতা এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল।সাথে সাথে চোখ ঘুরিয়ে নিলাম।ওয়াশরুমে পানি ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ আত্মসমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড়লাম।

আজকাল নিজেকে চিনতে পারিনা।কখন মানুষ হীনমন্যতায় ভোগে,আত্মপরিচয়হীনতায় ভোগে তা আমার জানা নেই।কিন্তু এ-আমি আমার কাছেই আজ বড় অচেনা।

বৈশাখের মাঝামাঝি সময় চলছে।হঠাৎ করেই কোনওরকম পূর্বাভাস ছাড়াই আকাশ কেঁদে ভাসিয়ে দেয়।বিকেল হতেই আকাশের ঘন কালো মেঘের উপস্থিতিতে চারপাশে অসময়েই সন্ধ্যা নেমে আসতে লাগল।বাসায় ফিরতেই বৃষ্টি নেমে গেল।রাফিকে কয়েকবার গলা ছেড়ে ডেকেও কোনও সাড়া পেলাম না।কাপড় পাল্টিয়ে রাফির খোঁজে ফ্ল্যাটের সবকটা রুমে চোখ ঘুরালাম।শেষে ছাদে গিয়ে ওকে পেলাম।বৃষ্টিতে ভিজছে।মাঝেমধ্যেই আমি বাচ্চাসূলভ হয়ে যাই।তাই ভাবলাম ওকে একটা ভয় দেখাই,পা টিপে টিপে ওর কাছে গিয়ে ভৌ দিতেই ও কিছুটা হকচকিয়ে উঠল।তবে ভয় পেলনা।তাড়াহুড়ো করে চোখদুটো হাত দিয়ে মুছে নিল।তবে এই আধো আলো-আধো অন্ধকারে ওর চোখের অসপষ্ট চাউনি দৃষ্টি গোচর হচ্ছিলনা।আমি জিজ্ঞাসা করলাম,

-বৃষ্টিতে ভিজছ?

-হুম।

-ভাল লাগে?

-হ্যাঁ।অনেক আগে থেকেই।

-আচ্ছা রাফি,তুমি কাউকে ভালবাসনা?

-হঠাৎ এ প্রশ্ন?

-প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন হলে কিন্তু সন্দেহ বেড়ে যায়।বলেই হেসে উঠলাম।

ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-ভালবাসা বিষয়টা আমার কাছে মরীচিকার মত,এবং অধরা।একে সবাই পায়না,পেয়েও অনেকে ধরে রাখতে জানেনা,আবার ভালবাসা সবসময় থাকেও না।ধরুন,আমি কাউকে ভালবাসলাম।তার আর আমার সম্পর্কের প্রথমদিকের অনুভূতি গুলো যতটা না সুখের থাকবে,শেষদিকের অনুভূতিটা ততটাই বিরক্তের হবে।আর যদি দায়বোধ হীন একটা সম্পর্ক হয় তাহলে তো কথাই নেই।ভালবাসা কমে গেলে দায়িত্ববোধ না থাকাতে সম্পর্কের ইতিও এখানেই।

-দায়বদ্ধতা নিজেরা তৈরি করবে।বিয়ে করে নেবে।

-সব সম্পর্কের অটুট বন্ধন দেওয়া যায়না।পরিণতি দেওয়া যায়না।

আমি অবাক হয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে যেতেই রাফি চলে যেতে লাগল।আমি পেছন থেকে ওর হাত চেপে ধরে টান দিতেই ও আমার বুকে এসে পড়ল।জোরটা এতবেশি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি।মুহূর্তেই দুজনের হতবুদ্ধি অবস্থা হয়ে গেল।বেশ কয়েকমুহূর্ত আমার বুকেই মুখ ডুবিয়ে রাখল রাফি।অদ্ভুত এক অনুভূতিতে আমি শিহরিত হচ্ছিলাম,অভিভূতও হচ্ছিলাম।অন্য এক আমিকে আবিষ্কার হতে লাগল।রাফি মুখ তুলে আমার চোখে তার কাঁপা কাঁপা দৃষ্টি নিবদ্ধ করল।বৃষ্টির অঝোর ধারা ওর চোখমুখ বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে।লম্বা চুলগুলো ওর সর্বনাশা চোখদুটোকে ঢেকে দিয়েছে।আমি হাত দিয়ে ভেজা চুলগুলোকে সরিয়ে দিলাম।

প্রকট মাদকতা এক কঠিন ঘোরে আচ্ছন্ন করে ফেলল মুহূর্তেই।রাফির কোমল চোখের চাউনি যেন কিছু বলতে উৎসুক হয়ে আছে।ওর চিবুকে স্পর্শ করতেই আৎকে উঠে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,

-একি করছেন?

আমি চুপচাপ তার নেশা জাগানো ভেজা ঠোঁট দুটোর দিকে এগিয়ে গেলাম।ধীরে ধীরে আরও কাছে চলে গেলাম।নিশ্বাস গুলো যখন ভারী থেকে ক্রমশ অধিক ভারী হয়ে উঠতে লাগল তখনই ও চমকে উঠে চলে যেতে উদ্যত হল।আমি ওর ধরে রাখা হাতটা চেপে ধরলাম।খুব সন্তর্পণে কাছে টেনে এনে ওর ঘাড়ে ঠোঁট দুটো রাখতেই ও কাপঁতে শুরু করল।শিহরিয়ে উঠতে লাগল।গভীর এক লজ্জায় চোখ বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরল।ঝুম বৃষ্টির সেই রাতটা স্বর্গীয় এক সুখানুভূতিতে কাটল।দুটো মানুষের মধ্যে একবিন্দুও দূরত্ব রইলনা,একে অপরকে চিনে নিলাম যতটা কাছে এসে চেনা যায়,ছুঁয়ে দেখলাম যতটা ভালবাসা মিশিয়ে ছোঁয়া যায়।

…….

সকালে ঘুম ভেঙে গেল তখন,যখন বুঝতে পারলাম অতি নিঃশব্দে রাফি বিছানা থেকে নেমে যাচ্ছে।ঘুম ভাঙা সত্তেও আমি চোখবুজে একপাশ হয়ে শুয়ে রইলাম।শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই চোখ লেগে গেল।এই সাতসকালে ঘুম পাওয়াটা ভীষণ আপদের।শেষমেশ ঘুম ভাঙল বেলা এগারোটায়।তাড়াহুড়োরও প্রয়োজন নেই।অফিস তো

সেই কখনই মিস হয়ে গেছে।ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল সেরে বিছানায় বসতেই টেবিলের উপর একটা সাদা চিরকুটের মত কিছু দেখতে পেলাম।হাত বাড়িয়ে ওটা নিলাম।কেমন যেন ভয় করছে খুলে দেখতে।খানিকক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে মেলে ধরলাম।পুরো পাতার প্রথম দিকে ছোট করে দু-লাইন লেখা,

‘চলে গেলাম।একবছর আশ্রয় দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।’

পরিবেশটা কেমন স্তব্ধ হয়ে গেল।মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা ঘুরছে।

হঠাৎ করে এমন কিছু ঘটবে তা কল্পনাতীত ছিল।আমার অপ্রস্তুত মানসিকতা দিক্বিদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিতে লাগল।

নিজেকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ এক মানসিক চেষ্টা চালাতে লাগলাম।বাস্তবতাকে বুঝে নিতে চেষ্টা করতে লাগলাম।নিজেকেই প্রশ্ন করলাম,’আমি কি রাফিকে ভালবাসি?সেটাই বা কেমন করে হয়!আমার ঘরে আমার স্ত্রী রয়েছে।সংসার রয়েছে।

না!এ ভালবাসা নয়।মোহ,ভ্রম-চোখের তৃষ্ণা।আর না হয় দৈহিক লালসা।’

মাথা ধরে গেল।জঘন্য লাগছে সবকিছু।কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।এমনটা কেন হচ্ছে তার উত্তর আমার বিবেক দিতে পারছেনা।আবেগের জ্বালে সে আটকা পড়ে গেছে।রাফির মোবাইলে বেশ কয়েকবার ট্রাই করলাম।কল ঢুকছেনা।প্রখর অস্থিরতায় দিনটা পেরোল।রাতের দিকে ফোন এল শিলার।

-হ্যালো,তোমার অফিস ছুটি হয়েছে?

-হ্যাঁ।

-তাহলে এসে পড়ছনা কেন?

-আসছি।একটু অপেক্ষা করো।

-আচ্ছা এসো।রাখছি।

শিলাদের বাড়িতে গিয়ে আরও ঝামেলায় আটকে গেলাম।ওর নানান প্রশ্ন আমাকে আরও বিগড়ে দিতে লাগল।খুব অসহ্য লাগছে ওকে।কি হয়েছে,এমন মনমরা হয়ে আছি কেন,রাফি কোথায়,ও কেন সাথে এলনা?এত জেরা করছে যে ইচ্ছে করছে চোখ যেদিকে যেতে চাইছে ছুটে চলে যাই।

বিয়ের ঝুক-ঝামেলায় কেটে গেল পরেরদিনটা।রাতে ঘুমোতে গিয়ে হঠাৎ করেই রাফির কথা মনে পড়ল।অজানা এক কারণে বুকের ভেতরে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হতে লাগল।সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস না থাকলেও অনভ্যস্ত নই।বাড়ির বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে এলাম।রাতের আকাশ,মেঘ জমে আছে।চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করেই আমি গন্তব্যহীন হেঁটে চলছি।কোথাও শান্তি পাচ্ছিনা।সবকিছুই কেমন বিষাক্ত মনে হচ্ছে।একটা বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেই পরিচিত কারোর অবয়ব দেখতে পেলাম,শানবাধানো একটা পুকুর ঘাটে।আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রাফিকে দেখতে পেয়েই বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম।বেশ কিছু মুহূর্ত চোখে চোখে কথা হল দুজনার।ঝিঝি পোকার ডাক আর নিস্তব্ধ পরিবেশটা আমাদের দুজনের নীরবতার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিল।ওর গালে প্রচণ্ড জোরে একটা থাপ্পড় মেরে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম,

-মানুষকে এতটা কষ্ট দেওয়ার মানে কী?

-আপনাকে আমি কষ্ট দিচ্ছি?

-এই যে এখন তোমাকে চড়টা দিলাম।ভেতরটা ভেঙে কি হয়েছে তা তুমি কখনওই দেখতে পাবেনা!

-আমার কিচ্ছু করার নেই।আমি অসহায়,অপারগ,ব্যর্থ।আপনার যদি আজ স্ত্রী না থাকত,একটা সাজানো সংসার না থাকত,তাহলে আপনার আরও যত কঠিন অতীতই থাকতনা কেন,আমি তা ভেঙে গড়তাম।কিন্তু ভালবাসায় গড়ে উঠা একটা সংসার আমি ভাঙতে পারবনা।

চোখদুটো ফেটে অশ্রু বেরতে শুরু করল।আমি ভাঙা কণ্ঠ নিয়ে ওকে বললাম,

-চলে এলে কেন?থাকতে তো পারতে?

-অদ্ভুত একটা প্রশ্ন।একসাথে দুজনকে ভালবাসা যায়না।আপনাকে আমার ভালবাসার ক্ষমতা নেই।আপনিও আমাকে ভালবাসার যোগ্য নন।এর মাঝে এখন একটা শক্ত দেয়াল আছে।দেয়ালের দুপাশে থেকে ছটফটিয়ে গেলে এতে কারোরই সময়টা সুখকর যাবেনা।শুধু শুধু অন্যের জীবন নষ্ট করার ইচ্ছে আমার নেই।

চারদিকে সুনসান নীরবতা।হঠাৎ করেই একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করল।বৃষ্টি নেমে গেল।আমার কী করা উচিত তা বুঝতে পারছিলাম না।কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাফি বলল,

-শিলা আপুকে কষ্ট দেওয়ার মত ভুল করবেন না।ওনি আপনার জীবনে আশীর্বাদ।আমার মত অভিশাপকে এই বৃষ্টির মত ধুয়ে যেতে দিন।

বলেই ও এক-পা দু-পা করে পিছিয়ে যেতে লাগল।আমি হাত বাড়িয়ে ওকে আটকাতে গিয়েও পারলাম না।গুটিয়ে গেলাম।কঠিন হৃদয়টা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল।চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগল।কিছুটা সময় পর রাফিকে আর দেখতে পেলাম না।দৃষ্টির অন্তরাল হয়ে গেল ও।

আজও রাফি দৃষ্টির অন্তরাল।কখনও ওকে দেখার ভাগ্য হয়নি।চোখের পিপাসা আমাকে তীব্র যন্ত্রণা দেয়।ওর অনুপস্থিতি আমার দিনগুলো বিষাদমাখা করে রাখে।প্রশান্তি নামক বস্তুটার বসবাস এখন আমার ঘরে নেই।শিলাকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে গেলে সেই ঝুম বৃষ্টির রাতের গভীর স্পর্শ গুলো মনে পড়ে।সবকিছুই কেমন অনুভূতি হীন লাগে।

বিষণ্ণ ভাবনায় রাতগুলো অনিদ্রাতেই কেটে যায়,সাথে বিবর্ণ চাঁদটা আমাকে সঙ্গ দেয়।

একাকী কাটে।

একটা মানুষের অভাবে মনে হয় কিছুই নেই,সব হারিয়ে গেছে,খুব বেশি একা আমি।

হাতে গুটিকয়েক সেডিল ট্যাবলেট আমার।অন্য হাতে এক গ্লাস সচ্ছ জল।আমার হার্ট তরতাজা এবং সবল।এই পাঁচ-ছয়টা ট্যাবলেট খেলে আমার যে কিচ্ছু হবেনা তা আমার জানা।অবশ্য দু-পাতা ওষুধই নিয়েছিলাম।কিন্তু এগুলো খেয়ে চিরনিদ্রায় গেলে আমার অসহায় পরিবারটাকে কে দেখবে!

হাতের ওষুধ গুলো দিয়ে কম করে হলেও অন্তত দুয়েকদিন ঘুমোতে পারব।সময়টা নিশ্চিন্তে কাটবে।

এ-কদিন যে ঘুম হয়নি রাতে,গোপন এক ব্যথায় ভুগেছি,নীরব আর্তনাদে কেটেছে। সেসব আর বাড়াতে চাইনা।বিলুপ্ত করতে না পারলেও অন্তত কিছু মুহূর্ত স্বস্তিতে কাটাতে পারব।শান্তিতে থাকতে চাই।

ভালবাসায় সাজানো কোনও সংসার ভাঙার মত পাপ আমি করতে পারবনা।অবশ্য ভুলটা আমারই।যেদিন প্রথম ওনি বৃষ্টির রাতে নির্বাক হয়ে দেখছিলেন আমাকে,সেদিন কেন বুঝেও আমি তা বুঝিনি।আমার প্রতি ওনার এত সহানুভূতি যে শুধুমাত্র ভালবাসা থেকেই সৃষ্টি,সেটা কেন বুঝতে পেরেও মেনে নেইনি।আমি তো সবই বুঝতে পারতাম।আমার কেন ভাল লাগত যখন দেখতাম আমার ভেজা শরীরের দিকে নিষ্পলকভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ওনি।ওনার এমন কামাতুর দৃষ্টিকে কেন আমি উপেক্ষা করিনি!

সময়ের যাতাকলে পড়ে গেছি আমি।তাই শোধরে নিতেই এখন অসহনীয় এই ব্যথা সহ্য করে যেতে হচ্ছে।শেষবেলাতে ওনাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করছিল,’আমিও আপনাকে ভালবাসি।আপনার চোখের জলগুলো আমার সবথেকে কষ্টের বস্তু।আমারও ইচ্ছে জাগে আপনার সাথে সারাজীবন কাটাতে।’

ভাল কী ওনি একাই বেসেছেন?

থাক,সেসব যদি বলে দিতাম,তাহলে ওনি পিছিয়ে যেতে পারতেন না।গুটিয়ে নিতে পারতেন না নিজেকে।

কিছু কিছু নামহীন সম্পর্কের সমাপ্তি যে এমন অনুচ্চারিত যন্ত্রণাতেই শেষ হয়।সতেজ হয়ে উঠবার আগেই তাকে দাফন করে দিতে হয়,না হয় ভালবাসারই অবমাননা করা হবে।

কখনও কখনও ভালবাসার জন্যে হলেও ভালবাসাকে খুন করতে হয়।কবর দিতে হয়,নগণ্য অদেখা এক অশ্রুদ্বারা।

………….

সমাপ্ত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.