চন্দ্রের কাল

আরভান শান আরাফ

আমি বাবার ছোট ছেলে। আমার বড় যে ভাই, সে আমার দু মিনিটের বড়।

এক শীতের শেষ রাত্রে আমার মায়ের কোল আলো করে আমাদের জন্ম। বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, হারিকেনের আলোতে নানা আমাদের দুই ভাইকে দেখে বলেছিলেন মাশাল্লাহ, চাঁন্দের টুকরা।

দিন গেল,মাস গেল, বছর পরে সেই চান্দের টুকরারা বড় হয়ে গেলো।

যে আমার বড়। মাত্র দু মিনিটের যে বড় তার নাম নাহিদ আর আমার নাম সুমন। নাহিদ সুমন খুব বিখ্যাত কেউ না হলে ও কুখ্যাত তো ছিল ই। তবে লোক বলে নাহিদ নাকি মাটির ছেলে। এমন ভাল আর শান্ত ছেলে ত্রিগ্রামে নেই। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। হ্যা,নাহিদের বড় বড় শান্ত চোখ, ফর্সা গায়ের রং, মিষ্টি বচন ভঙ্গি। এতে তো আর কেউ ভাল হয়ে যায় না। তবে হ্যা, আমার ভাইটি আসলেই খুব ভালো। আমার কাছে না হোক মহল্লার বাকি দশবারো জন লোকের কাছে তো বটে ই।

নাহিদ কে আমি ভাই হিসেবে পছন্দ করি না। করার তো প্রশ্ন ই ওঠে না। কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে প্রপোজ করলাম আমি আর সেই মেয়ে বলে সে আমাকে নয় নাহিদকে ভালবাসে। সহ্য করা যায়? একদম ই না। তাই তো রাগে নাহিদের সাথে দু দিন কথা বলেনি। শেষমেষ ওর নতুন কেনা টি শার্টটা দিয়ে দেওয়াতে কথা বললাম।শত হলে ও ভাই তো। কিছু দিলে আবার মানা করা উচিত নয়।

ভদ্র, শান্ত, ব্রিলিয়্যান্ট ছেলে হিসেবে নাহিদ বরাবর ই আমার উপরে। মা মাঝে মাঝে রেগে গেলে বলেন, তোরা দুইটা জমজ ভাই হয়ে ও দুশমনের মত থাকিস কেন? আমি মার এসব কথায় পাত্তা দেয় না। হতে পারে ভাই তাই বলে দুশমনি ছেড়ে দিবো? কখনো ই নয়। পরিক্ষার খাতায় হতে পারে ওর থেকে কপি করে আমি লিখি কিন্তু তার বিনিময়ে ওকে তো আমি প্রায় সকালে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে দেয় পড়ার জন্য। ও তখন পড়ে, আরআমি ঘুমাই। একই রুমে দু ভাই আলাদা দুইটা খাটে থাকি, আলাদা দুটা পড়ার টেবিলে পড়ি। এখন আমি পড়ছি অনার্স ২য় বর্ষে আর ও ৩য় বর্ষে। এইচ এস সি তে আমি ইংরেজিতে খারাপ করেছিলাম। গার্ড খুব হার্ড হওয়াতে ওর কাছ থেকে তেমন দেখে লিখতে পারি নি। তাই বলে আমি কিন্তু লেখা বাদ দেইনি। খুব লেখিছি। তবুও কেন জানি ফেইল করলাম। কিন্তু একটা ঘটনা যা আমার আর নাহিদ দুজনের জীবনই পাল্টে দিল।

আজ সে গল্প ই লিখতে বসেছি।

আমাদের মফস্বল শহরে সব কিছু পাওয়া যায় না। এই জন্য যেতে হয় বিভাগীয় শহরে। গত মাসে নাহিদ গিয়েছিলো কিছু কেনাকাটার জন্য। সকাল সাতটার দিকে গেলে ও তার ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়। মোবাইল বন্ধ ছিল আর আমি ছিলাম বাড়িতে। অস্থিরতায় সবার সময় কাটছিল। কারন এর আগে নাহিদ কখনো এত দীর্ঘ সময় বাহিরে থাকেনি। যখন সে ফিরলো তখন তার শরীরের বেশ জ্বর। জ্বরের প্রতাপে রুমে ঢুকতেই বিছানায় ধপ করে পড়ে গেল। আমি জানতে চায়নি কেন দেরি হলো। ভেবেছিলাম তাকে সময় দেওয়া উচিত।

ডাক্তার ডাকতে চলে গেলাম।

এর দু দিন পরে নাহিদ অনেকটা সুস্থ্য হয়ে গিয়েছিল। বারান্দায় বসে বসে কী জানি একটা বই পড়ছিলো আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে আকাশ দেখছিলো। বর্ষার আকাশে তখন মেঘ জমে কালো হয়েছিল। মনে হচ্ছিল এক্ষণি বৃষ্টি নামবে। আমি তার পাশে বসলাম। সে ফিরে তাকালো, কিন্তু কিছু বলল না। আমার মনে হচ্ছিল নাহিদ কিছু লুকাচ্ছে আমার কাছ থেকে। আমি একটু ত্যাড়া, নাহিদ সেটা জানে। হয়তো আমি ওর সাথে আমার কোন কিছু ভাগাভাগি করি না কিন্তু নাহিদ করে। আর সেই দাবী নিয়ে ই নাহিদ কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ব্যপার কী? নাহিদ কিছু বলেনি। বইটা পাশের টেবিলে রেখে কিছু না বলে চলে গেলো। আমি জানতাম কিছু একটা ঘটেছে। যা নাহিদ আমাকে বলতে চাচ্ছে না। নাহিদের সাথে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিলো। সারাদিন প্রচার করতাম ও আমার ভাই নয়, বন্ধু নয়, দুশমন। কিন্তু আমি জানি আমার মনের পুরোটা দিয়ে আমি আমার ভাইটিকে শ্রদ্ধা করি ওর সততার জন্য, ভালবাসি ওর বিনয়ের জন্য, স্নেহ করি ওর সাফল্যের জন্য। বাহিরে যা দেখাই তা কেবল ভেতরটা লুকিয়ে রাখার জন্য। সেটা আর কেউ না বুঝতে পারুক নাহিদ ঠিক ই বুঝে।

নাহিদ পাল্টে যাচ্ছিল। সারাক্ষণ কার্টুন দেখা ছেলেটা সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকে অথচ পড়ে না এক বর্ণ ও। কী যেন ভাবে? তার সেইভাবনাটা জানার আগ্রহে সেই দিন রাতে প্রশ্ন করেছিলাম, ভাই তোর কী হইছে রে? সে মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলো কিছু না তো। আমি নাহিদের হাসি দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম ওটা নকল হাসি। আশ্চর্য, নাহিদ তো এমন নকল হাসিতে কাউকে ভোলাতে চায়তো না। কী হল তার? হোলোটা কী?

যা করার আমাকে ই করতে হবে । জানি নাহিদ কিছু বলবে না। ওর জীবনে তো কোন অঘটন ঘটেছে ই । সেটা আমাকে ই তালাশ করতে হবে। আমি আমার ভাইকে এইভাবে ছেড়ে দিতে পারি না। আমাকে তো ও কোন দিন ছেড়ে দেয়নি। এর আগে, নাহিদ কোথায় যেত, কী করতো সব কিছু আমি জানতাম। কিন্তু আজকাল নাহিদ অদ্ভুতভাবে তা লুকিয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে লুকানোর কী আছে? তাই একদিন সত্য ই বের হয়ে গেলাম গোয়েন্দা হয়ে। এই গোয়ান্দাগিরী ভাইয়ের জন্য।

নাহিদের একটা ডায়েরি ছিল, যেটাতে সে প্রায় লিখত। লেখার পর তার ড্রয়ারে রেখে দিত। এর আগে কোন দিন আমি দেখতে চায়নি সে কী লিখছে। কিন্তু ঐ দিন নাহিদ যখন পুকুর ঘাটে বসে ছিল তখন দরজা লাগিয়ে ডায়েরিটা বের করলাম। অনেক কথাই লেখা ছিল। বেশির ভাগ ই আমাদের পরিবারের কথা, টিচারদের কথা। বাবা আজ কী হাস্যকর কান্ডটা করল, মা আজ কী করলো, আমি কী কী দুষ্টমী করলাম সব। শেষের

দিকে একটা পৃষ্ঠা জুড়ে এমন কিছু লেখা ছিল যা পড়ার পর থ মেরে গিয়েছিলাম, লেখা ছিল,

”আজ আমার জীবনে নতুন একজন মানুষের আগমন ঘটেছে। সে আমার মনের মত না, কিন্তু তবুও কেন জানি আমাকে তার ভালো লাগে। সে যখন আমার নাম ধরে ডাকে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি, সে যখন কথা বলে আমার দেখতে ভাল লাগে। বলতে গেলে আমি তার প্রেমে পড়েছি। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, সে যদি এসব শুনে তবে কী ভাববে? আমি তো তাকে ভালোবাসি।

সে কি আমাকে বাসে?”

বুঝতে পারলাম নাহিদ কারো প্রেমে পড়েছে। স্বাভাবিক ছিল। যেখানে আমি কয়েকবার ডেট করেছি সেখানে সে তো প্রেমে পড়তেই পারে। বিষয়টা স্বাবাভিক ছিল। কিন্তু তবো কেন জানি আমি সেখানে অস্বাভাবিকত্বের তীব্র ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। ডায়েরিতে এর পরে তেমন কিছু আর লেখা ছিল না। এই লেখাটার প্রায় তিন মাস পরে সে লিখেছে, “আজ তার সাথে কথা হল অনেকক্ষণ, ব্লু কালারের শার্টে তাকে অপুর্ব লাগছিলো।”

বিষয়টা কী? এটা কে? কার সাথে তার কথা হয়েছিল, যার প্রেমে পড়েছে সেই মেয়েটার সাথে? মেয়েটা শার্ট পরেছিল? আমার মাথা হ্যাংক হয়ে গেল। ডায়েরিটা রেখে ঐদিন নাহিদ যে প্যান্ট পড়ে গেছিলো সেই প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই একটা বিলের স্লিপ পেলাম। ক্যাফে স্বপ্নিল। আমি দেরি না করে শহরে চলে গেলাম ঐ দিন নাহিদের সাথে আর কে কে ছিল তা জানার জন্য। স্বপ্নিল ক্যাফের সবাই প্রায় আমাদের পরিচিত। বিশেষ করব ম্যানেজার কাকা। উনি আমাদের এলাকার। বিলের তারিখ আর নাহিদের কথা বলতেই ওনি বললেন যে, এক সপ্তাহ আগে নাহিদ চশমা পরা একজন ভদ্রলোকের সাথে ক্যাফেতে এসেছিলো। কিন্তু ভদ্রলোককে উনি চিনতে পারেননি। তবে ভদ্রলোকের যে বর্ণনা উনি দিলেন তাতে স্পষ্ট ভদ্রলোক আমাদের এলাকার নয়।

বাড়ি ফিরে দেখলাম নাহিদ শুয়ে আছে। তার দু চোখ বন্ধ। তবে ও চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আমি পাশে বসে ওর মাথায় হাত রাখতে ই ও লাফ দিয়ে উঠে বসলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হল তোর ভাই? নাহিদ তার চোখ লুকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বলল, কিছু না তো। কী হবে? কিন্তু নাহিদ ব্যর্থ হলো। সে তার কান্না আটকাতে পারলো না। অগ্যতা বাচ্চা ছেকেদের মত হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি শান্তনার স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,

-ছেলেটা কে ভাই?

-কোন ছেলেটা?

-আমার কাছে লুকানোর কিছু নেই। আমি তোর ভাই। মায়ের গর্ভ থেকে দুনিয়া অবধি এক সাথেই আছি। নাহিদ আরো কাঁদতে শুরু করলো। অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে বলল,

-ওর নাম রাজিব। আমাদের সাথে যে পড়ে, সজিব, ওর খালাতো ভাই। আমেরিকায় পলিমার ক্যামেস্ট্রিতে পিএসডি করেছে।

-তা তো বুঝলাম, কিন্তু তোর এই ভাবে ভেঙ্গে পড়ার কারন কী?

-তুই শুনতে পারবি তো?

-না পারার কোন কারন নেই।আর শোন, আমি তোর ভাই। তোর ভাই আমি।

নাহিদ বলতে শুরু করলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে সব শুনলাম।

-“ওর সাথে আমার পরিচয় সজীবদের বাড়িতে। সজিব প্রায় বলতো ওর খালাত ভায়ের কথা। মেয়েরা নাকি পাগলের মত ঘুরে ওনার পিছে। দেখতে সুন্দর, ছাত্র ভাল তার উপর আমেরিকা হতে পিএসডি করা আর খুব শীঘ্রই আমেরিকায় স্যাটেল ও হয়ে যাবে। পাত্রী দেখা হচ্ছে। কিন্তু রাজিব ভাই কাউকে ই পছন্দ করছে না। একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, একদিন যাব তোর ভাইকে দেখতে। গত কিছু মাস আগে সজীবদের বাড়িতে এসেছিল। কোন একটা কারনে বিকেলের দিকে আমি ঐ দিকেই ছিলাম। ভদ্রলোককে দেখলাম, কথা বললাম আড্ডা দিলাম, খুব ভালো লাগলো। গুছিয়ে কথা বলতে পারে। কুয়ান্টাম ফিজিক্স খুব ভাল বুঝে । এই সম্পর্কিত অনেক মজার তথ্য শুনালো। আমার ভাল লাগলো, খুব ভালো লাগলো। এই ভাবে প্রায় আড্ডা দিতাম। এক সময় শুধু আমি আর রাজিব ভাই ঘুরাঘুরি শুরু করলাম। নদীর পাড়, নৌকার উপরে। ভাল লাগতো। সময়টা ভাল কাটছিলো। সেই ভাল সময়ের কোন ফাঁকে যেন আমি তাকে ভালবেসে ফেললাম। আমার সমকামী অস্তিত্ব জেগে উঠল। যে অস্তিত্ব থেকে দূরে ভাগতেছিলাম সেই অস্তিত্ব একদিন আমায় বলল, অনেক হয়েছে, এইবার স্থির হও। আমি স্থির হলাম। মন দিয়ে রাজিবকে ভালবাসতে শুরু করলাম। কিন্তু ভয় হচ্ছিল। যদি রাজিব আমাকে ভালো না বাসে তবে? আমার সেই ভয় দূর হল। একদিন রাজিব ই আমাকে বলল তার কথা। আমাদের একটা সম্পর্ক হলো। বন্ধুত্ব দিয়ে যে সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল সেটা ভালোবাসায় পরিণত হলো। ভাল লাগতো ওর হাতে হাত রেখে হাঁটতে, কথা বলতে, জড়িয়ে ধরতে। দু চোখ ভরে উঠেছিলো স্বপ্নে। কিন্তু সব ভেঙ্গে গেলো গত সপ্তাহ যখন শুনলাম রাজিব আমেরিকা চলে যাবে। আর যাওয়ার আগে বাবা মার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করে সাথে নিয়ে যেতে হবে। ও অপারগ ছিল। বাবা মার একমাত্র সন্তান। তাদের স্বপ্ন সে ভাঙতে পারবে না । পায়ে যে সামাজিকতার দায়ভারের বেড়ি ছিল তা সে খুলতে পারবে না। তাই আমার স্বপ্ন, আমার ভালবাসা সব ভেঙ্গে দিলো। তারপর থেকে ওর সাথে আমি আর যোগাযোগ রাখিনি। ফোন তো অফ, সজিব কে দিয়ে কয়েকবার খবর পাঠিয়েছিল দেখা করতে আমি যাইনি। যা গড়ার সাধ্য নেই, তা টিকিয়ে রাখার ইচ্ছা ও আমার নেই। এর চেয়ে ভাল তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেয়।”

নাহিদের সব কথা শুনে হঠাৎ করেই মনে হল আমি আকাশ থেকে পড়েছি। আর সেই পড়াটা যে কত ভয়ানক তা বুঝে ছিলাম রাত্রে। তখন তো তার সাথে আর একটা কথা ও হয়নি। কিন্তু রাত্রে যখন ঘুমাতে গেলাম তখন চোখের পাতা থেকে ঘুম উড়ে গেলো। সারা রাত ছটফট করতে লাগলাম। দু ভাই এক সাথে বড় হয়েছি, একই ঘরে দিনের পর দিন থেকেছি, মনের কথা বলাবলি করেছি, ঝগড়া করেছি, কখনো কেউ ই আলাদা ছিলাম না। হয়তো সে আমার থেকে একটু সুন্দর, একটু ব্রিলিয়্যান্ট আর খুব ভাল। তাই বলে এত আলাদা? কখন হল সে এমন? আমার ভাই সমকামী, সে সেক্সুয়্যাল চাহিদাগত ভাবে আমার চেয়ে আলাদা? অথচ আমার গর্বের শেষ ছিল না। একদিন দুই ভাই এক সাথে বিয়ে করবো। ঘর ভর্তি মেহমান। নতুন দুই বধূ কুটুর কুটুর করে গল্প করবে। কত স্বপ্ন ছিল। আমার ভাইটা আজ আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছে । তাকে খুঁজে পেতে আমার আজ কত রাত্রী লাগবে জানি না।

ঘুম ভাঙল দশটার দিকে মায়ের ডাকে। জেগে দেখি নাহিদ রুমে নেই, আর বারান্দায় কেউ একজন বসে আছে। বুঝার বাকি রইল না, এটা ই রাজিব। তার চোখে মুখে নিদ্রাহীনতার ছাপ, বিষন্নতার ছায়া, কষ্টের তীব্রতা তার বুকে বজ্রপাতের মত পড়েছে। সেই আঘাতে সে বিপর্যস্ত।

আমি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় গেলাম। আমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়ালো,আমি মুচকি হেসে বললাম,

-কেমন আছেন রাজিব?

সে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর অনেকটা চেপে চেপে ই বলল,

-আপনি সুমন?

-জ্বী।

-নাহিদ বাসায় নেই?

-না, ওকে দরকার ছিলো?

-হুম।

-খুব দরকার?

-জ্বী

-আপনার বিয়ের নিমন্ত্রণ দিতে এসেছেন নাকি, দেখতে এসেছেন আমার ভাইটা বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। কেন করলেন এমন?

-আপনি প্লিজ আমাকে শুনুন একবার।

-কী শুনাবেন? আপনার অপরাগতার কথা? এটাই শুনাবেন যে আপনি গে না। আমার ভাই ই গে।

আমি রেগে যাচ্ছিলাম। আমার রাগ দেখে তার মাথাটা নিচু হয়ে গেল। আমি তাকালাম তার দিকে, সে কি কাঁদছে? নাহ, হয়তো সে ও আমার ভাইকে ভালোবাসে।

রাজিব চলে গিয়েছিলো। চলে যাওয়ার পুর্বে সে বলে গিয়েছিলো, সে নাহিদকে ভালবাসে। আগামী সপ্তাহ সে চলে যাবে। নাহিদের ভিসার ব্যবস্থা সে করছে। এখন নাহিদ রাজি হলেই হবে।

আমি ভাবলাম। সারাদিন ভাবলাম। কী করতে পারি? রাত্রে নাহিদ বাড়ি ফিরলো। খুব রাত্রে। বাড়ির সবাই তাকে নিয়ে আজকাল চিন্তিত। সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকে। রাত করে বাড়ি ফিরে। আজ মনে হয় মদ ও খেয়েছে। কেন এমন হল? আমার ভাইটা যে বড্ড ভাল ছিল। এত অসহায়ত্ব এর আগে ফিল করিনি। যতবার ই কিছু অঘটন ঘটেছে ততবার ই মনে হয়েছে নাহিদ আছে। সে সামলে নিবে। কিন্তু আজ, কে কাকে সামলাবে? নাহ, আর বসে থাকা যায় না। মামা বা কে আমি বুঝাবো। নাহিদকে আমেরিকা যেতেই হবে রাজিবের সাথে। ভালবাসা ছাড়া বেঁচে থাকার মানে হয় না। যা ছাড়া আমি পারি না, তা ছাড়া বাঁচতে আমার ভাই কী করে

পারবে?

বাবা মা কেউই মানতে রাজি না।তাদের ধারনা এটা মতিভ্রম। বিয়ে করিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে আমার সাথে রাগ দেখালো। বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিলো। কিন্তু আমি কিছুতেই থেমে থাকিনি।

একদিন খুব সকালে রাজিবের সাথে দেখা করে জানিয়ে দিলাম, যে কোন কিছুর বিনিময়ে হোক নাহিদ আমেরিকা যাবে এবং তা রাজিবের সাথে।

একদিন সকালে ব্যাগে কাপড় গুছিয়ে নাহিদ কে বললাম চল ভাই আমার সাথে। নাহিদ কিছু বুঝতে পারল না। মন্ত্র মুগ্ধের মত আমাকে অনুসরন করল। আমি তাকে নিয়ে গেলাম ঢাকা বিমান বন্দরে। নাহিদ বিষয়টা বুঝতে পারল, যখন তার চোখের সামনে রাজিবকে দেখতে পেল। আনন্দ আর আবেগে সে কেঁদে দিলো। আমি ও পানি মানিয়ে রাখতে পারিনি।

ভাই আমার চলে গেল।

তিন চার বছর হতে চলল আমার বাবা আমাকে ত্যাজ্য করেছে। আমি থাকি খুলনা শহরে। এখানে একটি হাই স্কুলে গণিত পড়াই। কে জানতো, গণিতে দুর্বল ছেলেটা একদিন গণিত ই পড়াবে । নাহিদ আর রাজিবের সাথে প্রায় কথা হয়।তারা ভাল আছে, সুখে আছে। আমি ও ভাল আছি। ক্লাস ভর্তি ছেলে মেয়ারা যখন স্যার বলে ডাকে তখন ভেতর থেকে অদ্ভুত সম্মান অনুভব করি। যেই সম্মানটা নাহিদ আমাকে করতো। মার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। তা ও লুকিয়ে। বাবা যেন বুঝতে না পারে। নাহিদ তার কিছুই জানে না, তাকে জানতে দেইনি। আমার ভাই ভাল আছে এটা ই আমার সুখ। আমার জীবনে না হয় আমাবস্যা কিন্তু আমার ভাইটি চন্দ্রের কালে সুখে আছে। রাজীব নাহিদকে অসম্ভব রকমের ভালবাসে। কিন্তু আমি, আমার ভাইকে তার চেয়ে বেশি ভালোবাসি।

কারন আমার ভাইটি ই এরকম। যে কেউ ভালবেসে ফেলে।

সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.