প্রলয় প্রহর

রাহাত ইসলাম জুবায়ের

1

যদি মন কাদে তুমি চলে এসো এক বরোষায়যদি মন কাদে তুমি চলে এসো এক বরোষায় সকাল থেকে গুনগুন করে এই এক লাইন ই বারবার গেয়ে যাচ্ছি। কি আর করা এই এক লাইন ই মুখে আসে। বাকিটুকু পারি না। সকাল থেকে বৃষ্টি। পার্ফেক্ট একটা দিন। অফিস করতে বের হবো মিনিট দশেকের মধ্যে ।নাকের ডগা দিয়ে সময় দৌড়ে চলে যাচ্ছে। এসময় তাড়া থাকার কথা ছিল যথেষ্ট ।কিন্তু আমার নেই।সত্যি কথা বলতে বড্ড অলস লাগছে। বৃষ্টির দিন বলে নয় । অফিসে যাওয়া টা তো রোজকার রুটিন।তাই কোন কোন দিন আলসেমী টা পেয়ে বসে। এখন আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যদি জানতে চান কেমন যাচ্ছে দিন তাহলে বলব প্রতিদিন একগাদা দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে হম্বিতম্বি করে অফিসে যাওয়া আর ছুটি হলে ট্রাফিক সিগনালে বিরক্ত হতে হতে বাসায় ফেরা। এই হলো আমার বিবর্ণ দিন গুলোর দিনোলিপি । চারদিকে অসুখী সুখের কাটাতার দিয়ে এইসব ব্যস্ততা আমাকে প্রায় গৃহবন্দি করে রেখেছে। জীবন দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে । শুরুরদিনগুলো এমন ছিলো না। যাহোক অফিসে কাজের পাহাড় অপেক্ষা করছে। বেরুচ্ছি।

2

আজ অনেকটা লেট হয়ে গেলো। এর সব দায় আমার পাঠকদের । আপনাদের সাথে গল্প করতে করতেই আমার সময় খোয়া গেছে। একটা সত্যি কথা কী জানেন? বহু দিন হলো আমার কাছে এভাবে কেউ আমার গল্প শুনতে চায় নি। আপনারা যে মূল্যবান সময় নষ্ট করে আমার ছাইপাঁশ পড়ছেন এইজন্য আমি যারপর নাই কৃতজ্ঞ।

3

দুদিনে কাজের পাহাড় হয়ে গেছে টেবিলটা। সেই শুরুর দিন থেকে আজ অবধি চেষ্টা করে যাচ্ছি এই এঁটে বসা পাহাড় সরানোর। শ্রম আর ঘামের বিনিময়ে একটাই চাওয়া যেন রোজকার কাজের ভেতর থেকে সততা নামক জিনিসটি উঠে না যায়।

4

-ভেতরে আসতে পারি?

-ইয়েস কাম

-কেমন আছো?

ফাইল পত্রের তুবড়ি থেকে ঘাড় ফেরালাম। ওর দিকে তাকাতেই আমার শরীর জুড়ে ঘাম নামছে। মস্তিষ্কের ধুলোপড়া স্মৃতিগুলোতে কোথা থেকে এক ঝটকা জল পড়ে মুহূর্তেই তাজা হয়ে উঠলো। বিদ্রোহী স্মৃতির ঘনঘটায় চলতে লাগলো সময়ের উল্টো স্রোত। লাবনি বিচ থেকে নীল দিঘি, লাউয়াছড়া থেকে ক্লাউড নাইন এর প্রতিটি মুহূর্ত বাতাসে ধুলো উড়িয়ে স্পষ্ট হতে থাকলো। সেসব দিনগুলো আমার আবার ফিরতে চাইছে। ওর নাম সাদাফ । আজ দুবছর পর আবার এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে।

-কেমন আছো বললে না? ( নস্টালজিয়া ভর করে ছিল ওকে দেখে)

-হম বলো কি বলছিলে

-কেমন আছো জানতে চাইলাম। -যেমন দেখছো।

-তুমি এখনো আগের মতোই আছো শেষবার যেমন দেখেছি। আমার একাকিত্বের গল্পগুলো আমার ই থাকুক । তুমি বাহির দেখেই শান্ত থাকো তাহলে । (মনেমনে বললাম )

-আচ্ছা

-তোমার কি মুড অফ?

-না কাজের চাপ অনেক বেশি।

-আমার উপর অভিমান এখনো ধরে রেখেছো?

-না অভিমানের কী আছে বলো তোমার যা ভালো মনে হয়েছে করেছো।যখন নতুন প্রজেক্ট নিয়ে এখান থেকে চলে গেছিলে তখনতো বলো নি। দুবছরপর এসে জানতে চাইছো মান অভিমান এর কথা? হাসি লাগছে।এখন আমার কেবিনে কি করতে এসেছো,?

-তোমার সাথে অনেকদিনের জমানো কথা ছিল । সেগুলো বলব।

-এখন আমার অনেক কাজ তোমাকে সময় দিতে পারছিনা ।আমি দুঃখিত নই।

-সেই জেদ সেই হেয়ালী এখনো ধরে রেখেছো দেখছি ।

– হুম তোমার হঠাত্ উড়ে এসে কথা বলাটাতে আমি বিরক্ত হচ্ছি।যা গোছানোর ছিলো গুছিয়ে তো নিয়েছো । বিয়ে সেরে ফেলেছো শুনেছি। এখন আর আমার কাছে কোনও দরকার থাকতে পারে না তোমার ।

-তাড়িয়ে দিচ্ছো?

-হা

-তাহলে তো চলে যেতেই হবে।তবে একটা কথা জানার প্রয়োজন ছিল ।

-তাড়াতাড়ি

-তোমার কাধে আমার শেষ চুম্বনের খতো টা কি এখনো তোমাকে যন্ত্রণা দেয়?

-সেটা বলার দরকার মনে করছি না।

-হা হা হা সেই একরোখা স্বভাব।আচ্ছা তুমি তাহলে কাজ করো আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকি।

-তোমার ঠিক যা ভালো লাগে তাই করো।

5

কয়েক ঘন্টা পর লাঞ্চ টাইম চলছে। খেয়ে উঠলাম মাত্র । সাদাফের ধৈর্য আছে বলতে হবে। একটু আগে পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে আমার যে খারাপ লাগছে না তা নয়। বরং আরো বেশি কষ্ট হচ্ছে । রাগ হচ্ছে প্রচুর । উফ্ সাদাফ এতোদিন পর কেন এই খতো এর কথা মনে করাতে গেলে? দিব্যি তো ভুলে ছিলাম। এখন আমি ওয়াশরুমে। আস্তে করে শার্টটা খুলে জায়গাটার দিকে তাকাই। আমার শ্বেত শেম বর্ণের চামড়ায় এখনো এটি চাপ হয়ে আছে। কালচে গাঢ় নীল ব্যথাটি পুরনো হওয়ার প্রমাণ বহন করছে ।শক্তভাবে জায়গাটাতে একটা চাপ দিলাম। এখনো বেশ লাগছে। উপরে শুকনো হলেও ভেতরে এখনো তাজা আছে বলা যায়। আচ্ছা হৃদয়ে জমাট বাঁধা আবেগগুলো ও কি এখন আগের মতোই তাজা? ওগুলো আমাকে আগের মতো জ্বালাচ্ছে না কেন? অবশ্য সময় তো কম যায় নি। ঝিমিয়ে গেলেও যেতে পারে।ঠিক নেই। ফাগুন-চৈতির তৃতীয়ার ভরা পূর্ণিমাতে ও অসাড় হয়ে ছিল আমার ভেতর বাহির। হঠাত্ কাধটা কেমন শিরশিরিয়ে উঠলো। শিহরনে চোখ দুটো বন্ধ করলাম। স্পন্দন বাড়ছে। মনে হলো দীর্ঘ খরা কাটিয়ে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। নেশার পাকে বদ্ধ নয়নে অনুভব করছি চেনা বাহুর অস্তিত্ব । পেছন থেকে সাপের মতো এসে আমাকে পেঁচিয়ে ধরেছে। অধরে নীল হয়ে থাকা চুম্বন এর জলপ্রপাতে কারো মুখ নিসৃত গরম লালার ঝরে যাওয়া অনুভব করতে থাকি। দশ মিনিট পর ।

6

-তুমি এখানে কীভাবে এলে ?

-দরজা খোলা রেখে আবার প্রশ্ন করছো?এই নীলাভ খতোটা তোমাকে এখনো আমার কথা মনে করিয়ে দেয় তাহলে। আমি জানি তুমি আমাকে চাও ঠিক আগের মতো। সেই দুরন্ত সাদাফ।

-কী বলব বুঝতে পারছি না।

– তোমাকে না জানিয়ে চলে যাওয়া আমার অপরাধ ছিল ঠিকই । কিন্তু এতো বছর পর তোমার মন আমার মাঝেই পড়ে রয়েছে। তবে কেন আমাকে প্রত্যাখান করছো?

-সেই সময় কি আর পাবো?

-হা হা হা। তুমি তাকিয়ে দেখো সেই সময়গুলো তোমার পায়ের কাছে এসে মাথা কুটছে। তুমি চাইলেই এগুলো আবার তোমার হবে।

-তাই নাকি ?

-কথা দিচ্ছি আগের থেকেও অনেক বেশি যত্নশীল হবো।

-বাস এটুকুই?

-এই ওয়াশরুম কে সাক্ষী রেখে বলছি বাথরুমে গেলেও বলে যাবো। দরকার হলে তোমাকে সাথেই নেবো

-হুহ তোমার দুর্গন্ধের সুবাস নিয়ে আমার পেট নষ্ট করতে চাই না।

-প্লিজ ফিরিও না তোমার কাছে থাকতে দাও।

-সে আর কীভাবে হবে বলো তোমার তো এখন সমাজ স্বীকৃত একজন আছেই। তাকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দাও। মাঝে তো দু বছরের একটা গেপ ছিলো। সময় তো কম গেলো না এতোদিনে তো ইউজ টু হয়ে যাওয়ার কথা।

-বিয়ে?ভালো বলেছো স্ত্রী আছে না ছিলো।

-মানে?

-মানে মা খুব অসুস্থ ছিলেন। তার সাধ ছিলো বউ দেখে যাওয়া তাই মায়ের আবদার মেটাতে মোহনা কে কন্ট্রাক্ট এ বিয়ে করি। ওর টাকার সত্যি ই খুব দরকার ছিল । তাই ও রাজি হয়ে গেছিলো। মা গত হয়েছেন বেশি দিন গড়ায় নি। বলতে পারো অপেক্ষা ই করছিলাম। শেষমেষ ওকে মুক্তি দিলাম। আমি আবারো চাই তোমার সাথে মিশে যেতে। যদি তুমি সুযোগ দাও। আরেকটি বার তুমি হবে কী আমার ?

-পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে জানো নিশ্চয়ই । আমিও দেখি পুরোনো প্রেমের নতুন শুরুতেকী কী বৃদ্ধি পায়। আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না। কিন্তু সাদাফ আমাকে আটকে দিলো।

-তোমার শার্ট এখনো খোলা এটা ঠিক করে চলো বের হই। তোমার আজকের কাজ তো মাথায় উঠলো।

7

অফিস শেষ । অনেক দিন পর আমি আর সাদাফ আবার একসাথে বাড়ি ফিরছি। নচ্ছাড় টা চলে যেতে চেয়ে ছিলো। বলছিলো তল্পি তল্পা নিয়ে একেবারে কাল শিফ্ট হবে। কিন্তু আবার যখন আমার খপ্পরে পড়েছে ওকে আর কাছ ছাড়া করতে চাই না। এখন ও শুধুই আমার প্রেম সাম্রাজ্যের অনুগত প্রজা। কিছুদুর হাটতেই মুষলধারে আবারো নামলো একচোট। বৃষ্টির তেজে ক্রমেই ঝাপসা হচ্ছে চারপাশ। ঝাপসা হচ্ছে আমার আমার দুঃসহ একাকিত্বের দিনগুলি।

8

সারা রাস্তা বাকবাকুম করতে করতে কাক ভেজা হয়ে বাড়ি এলাম। আজ বৃষ্টি কমার কোনও নাম নেই দেখছি। কাপড় খানা আগেই ঘামে চুপসে গেছিলো তার উপর যোগ হয়েছে বৃষ্টির পানি। ভটকা গন্ধটাকে পুরোপুরি তাড়াতে পারেনি । এখনো ঈষত্ রয়ে গেছে। দরজা খুলছি। ভেতরে ঢুকবো। শুনশান চুপকথায় সাদাফের নিঃশ্বাস এর গর্জন টের পাচ্ছি। ঘরে ঢুকতেই দরজাটা খট করে বন্ধ করে দিলো। সাদাফ আমার কাছে আসে। ঠোটের উপরের হালকা গোফ গুলোতে বাদল বিন্দু চকচক করছে। আজ বহু দিনপর শরীরে আমার কাল বৈশাখী বান ডাকছে।সাদাফের দুচোখের তারায় আমি আমাকে দেখছি। চাহনীতে তীব্র আকুতি থাকলেও পশুত্বের লেশমাত্র নেই। শরীরখানা মুছতে হবে নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে। সাদাফ আমাকে একটানে পিছনে নিয়ে এলো।

-শ্রাবণের সন্ধ্যায় শরীর শুকনো রাখতে নেই। নইলে আকাশের অভিমান যে মিথ্যে হয়ে যাবে।

-ছাড়ো । এতোদিন তো কবির কোনও খবর ছিলো না।

-আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম । শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম। আমার বানের তোরে উথাল পাথাল দেহ এই আবেদন কে কীভাবে পায় মাড়াবে?

9

সাদাফ আমার ঠোঁটে ঠোট ডুবিয়ে। তপ্ত লালারসের আদান প্রদান করতে থাকে । ওর চঞ্চল হাতের কারুশৈলীতে আমার শার্ট শুকনো পাতার মতো মাটিতে পড়ে। চঞ্চল ওর চঞ্চু যুগল আমার গলায় গালে কাঁধে বুকে মাদকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমার দেহে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু জল ও শুষে নিচ্ছে পরম মমতায়। ভিজে যাওয়া তনু তপ্ত স্পর্শে উষ্ণ হতে থাকে। আমি উত্তেজনায় কাপছি।

চামড়ার ভাজে ভাজে চলছে সাদাফের অবাধ্য বিচরন। ওকে কাছে আনি। পেন্ট এর বদ্ধ জিপারে একটা বুনো জন্তু হিংস্রতা ঢেলে দিচ্ছে উঁচু গর্জনে।

পরস্পর হাতের স্পর্শে শেষ বসনটুকু ও স্তুপিত হলো। শরীরে কাপড়ের সুতো পর্যন্ত নেই। দুজন কে দেখে আয়না ও লজ্জায় মুখ ঢাকে। দেখে আমাদের আদিম মানুষ মনে হচ্ছে ।

-তুমি আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়েছো। তোমার তনুর শিল্পের তীব্রতা আমার চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে।

-কামনার দৃষ্টিতে সব রকমের দেহ ই শিল্পের সিন্ধুক।

-হয়তো। পৃথিবীর সৌন্দর্যের সিংহভাগ ই মানব তনুর মৃত্তিকায় গোচ্ছিত। যদি কামুক দৃষ্টিতে দেখা হয়।

-হুসসস আর কোন কথা নয় । এখন সময় শুধুই অনুভব করার। কাব্যের পঙক্তিগুলো এসময় ঢেউ খেলে যায়।

-ঠায় দাঁড়িয়ে থাকো যুবক দেখি তরবারি কতটুকু ধার এখনো রহিয়াছে বাকি। একটু পরেই যুদ্ধ হবে । সমরের সৈনিক তৈরী হতে হবে। দেখাতে হবে তলোয়ারের ক্যারিশমা । সাদাফ কে ঠায় দাড় করিয়ে ওর দণ্ডায়মান তলোয়ারে ধার দিচ্ছি।

আমি গতি বাড়িয়ে দিলাম। মুখোমৈথুনের মোহিত আবেশে দেখছি সাদাফের ক্রমশ দুর্ধর্ষ রূপ। দামামা বাজছে। সমরের সৈনিক সদ্য প্রস্তুত ।

শুরুহলো সাদাফের হিংস্র তরবারির লিলা। অবিনাশী বিরহ আমাতে ঘাটি গেড়ে বসে ছিলো। অনেকদিন পর সত্যিকার মৈথুন পাচ্ছি। বাহিরে বৃষ্টির ঝংকার । সন্ধ্যের বিদায় বেলায় মৈথুন গতি পাচ্ছে।

উত্তেজনার পারদ লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে । ঘরময় শিতকার ধ্বনি উপচে পড়ছে। আসবাবের ঝনঝনানিতে দুঃসহ বিরহী প্রহরের বিনাস ঘটিয়ে জন্ম নিচ্ছে অবিনাসী প্রেমঘূর্ণির প্রলয় প্রহর।

———-

সমাপ্ত

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.