আমার যমুনার জল

লেখকঃ ‘মেঘ রাজ সাইমুন”

১।

-বলতো মিঠু!আমি কালো হয়েছি কি আমার নিজের দোষে?ভাগ্য আমায় এমন করেছে!তাতে আমি কি করতে পারি?নিজের জন্মদাত্রীও আমাকে বাঁকা কথা শোনায়।

খাঁচার পাখি মিঠু খুব মনযোগ দিয়ে রুপায়ের কথা শুনছে।রুপাই বলতে লাগল।

-আচ্ছা কালো হওয়া কি কোন অপরাধ বল মিঠু?সংসারের সবার কাছে আমি চোখের বালি।আজ বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে ভালোবাসে এমন একটা মানুষ খুঁজে পেতাম জগতে।

মিঠু দাওয়ায় রুপাইয়ের মাকে আসতে দেখে জোর স্বরে বলল,

-মা!রুপ কাঁদছে।মা!রুপ কাঁদছে।

রুপাইয়ের মা দাওয়া থেকে বলল,

-পারে তো শুধু মাগি মানুষের মত কাঁদতে।তাছাড়া কোন যোগ্যতা ওর নেই।কি যে একটা কুলাঙ্গার পেটে ধরছিলাম আমি!কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছে আল্লাহ আমায়!একমাত্র তিনিই জানেন।

রুপাই ধমকের সুরে বলল,

-শেষমেশ তুইও!মনের কথা বলার জন্য মানুষ পাই না তাই তোর কাছে বলি,আর তুই কিনা?আর আসবো না আমি তোর কাছে!কোনদিনও না।

মিঠুর মন খারাপ হয়ে গেল।রুপাই খাঁচায় একটা আঘাত করে বেরিয়ে গেল।

রুপাইয়ের মন খারাপ হলে সে যমুনার পাড়ে এসে বসে থাকে।কুচকুচে কালো বর্ণের এই ছেলেটি সংসার,সমাজ সবখানে লাঞ্চিত,বঞ্চিত।রুপ নেই বলে সে বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হাসির খোরাক।মেয়েলি স্বভাবের হওয়াতে ছোটবেলা থেকে বন্ধু-বান্ধব তেমন জোটে নি,যমুনার পাড়ে মধুখালি গ্রামের এই ছেলেটি নিজ দায়িত্বেই আজ অনেকটা বড় হয়ে গেছে।জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে শিখে গেছে সে।

রুপাই এক মনে যমুনার কালো জলের দিকে তাকিয়ে আছে।গুটিসুটি হয়ে বসে হাত দুটো হাটুর উপর রেখে তাতে মুখ ভর করে রুপাই একাই বলতে লাগল,

-যমুনা!তুই তো দেখি আমার থেকেও কালো!তোর কাছে দুঃখ ভোলাতে এসে আমি নিজেই দুঃখিত হয়ে ফিরে যাই রে।

সারাদিন যমুনার কাছে থেকে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলো রুপাই।বারান্দার শালিকপাখি মিঠু খাঁচা থেকে ডেকে উঠল,”রুপ!রুপ!”।রুপাই ধমকের সুরে বলল,”চুপ!তোরে বলছি না তুই আমার সাথে কথা বলবি না।”পাখিটি কি বুঝল কে জানে?সে আবারও বলে উঠল,”রুপ!রুপ!”

রুপাই সেদিকে খেয়াল না করে ঘরে ঢুকে দরজা এটে দিল।মিঠু নির্বাক হয়ে খাঁচায় ডানা ঝাপটাতে শুরু করল।রুপাই কে সম্পূর্ণ নামে সে ডাকতে পারে না।তাই “রুপ”বলে ডাকে।হয়তো এই বিষাদ সংসারে এই অবুঝ পাখিটি রুপাইকেই বেশি ভালোবাসে।সে তো আর ধলা-কালার পার্থক্য বোঝে না।

অনেক রাত অবধি কাজ গুছিয়ে রুপাইয়ের মা থালায় ভাত এনে দরজার কাছে দাড়াল।

-রুপাই!দরজা খোল বাবা!ভাত এনেছি।সারাদিন তো কিছুই খাস নি।

-তুমি যাও আমি খাবো না।

-তুই একবার দরজাটা খোল বাপ।আমিও খাই নি।

রুপাইয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার মা।সে এবার দরজা না খুলে পারলো না।মমতা হাতের গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল,

-নে হা কর!

-আমি খাবো না।তুমি আমাকে সকালে মারলে কেন?

-তুই বা কেন রনিকে মারতে গেলি?

-মারব না?ও আমাকে কালু বললো কেন?

-বলেছে তো কি হয়েছে?ছোট ছেলে তাছাড়া ও তোর ভাইপো!

-আমাকে কালু বলবে আর আমি ছেড়ে দেবো?

-এতো বড় হয়েছিস!স্কুলে পড়িস।তাইও বাচ্চাদের মত কেন করিস?তোর ভাবি সংসারের একটা কাজ করে না,সারাদিন কাজ করে মরি।তার উপর তুই এমন করিস!রাগে তোকেই বকতে হয়।আজে বাজে বলতে হয়।

-কালো কি আমি নিজের দোষে হইছি?রনি কালু বলবে কেন?তুমি ওকে মানা করে দিবে!

রুপাইয়ের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো।মমতা ছেলের চোখের পানি মুছে দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে বললো,

-যে যাই বলুক।আমার রুপাই আমার কাছে চাঁদের টুকরা।কালো তো জগতের আলো।

রুপাই মাকে জড়িয়ে ধরে রাখলো।মমতা চোখের পানি মুছে মনে মনে বলল,”আল্লাহ কেন তুমি আমার ছেলেটাকে এমন করলে!জানি না আমার ছেলেটার বুকে কত কষ্ট জমেছে।তুমি ওকে ধৈর্য্য দাও সইবার।”

-নে বাবা হা কর!তুই খাসনি বলে মিঠুও সারাদিন না খেয়ে আছে।খাঁচায় সব খাবার পড়ে আছে।

-কেন ও না খেয়ে থাকবে?আমি ওর কে?

মমতা নিজের বাম হাতটা ছেলের মুখে দিয়ে পরম মমতায় বলল,

-ও আমার এই কালো রাজপুত্রটাকে খুব ভালোবাসে।

-না!তুমি ওকে আমার সাথে কথা বলতে মানা করবে।ও যেন আমাকে “রুপ” বলে না ডাকে।

খাঁচার ভিতর থেকে মিঠু বলে উঠল,”রুপ!রুপ!”

রুপাই মুখে খাবার নিয়ে হেসে বলল,”মা!ওকে কিন্তু এবার আমি মারবো”।

সকালে স্কুল থেকে ফিরে মিঠুকে কাঁধে করে নিয়ে দোকানে যাচ্ছিল রুপাই।মধ্যপথে গ্রামের কিছু ছেলে ওকে “কালু হাফ লেডিস” বলে ক্ষেপাতে শুরু করল।কষ্টে রুপাইয়ের দুচোখে পানি এসে গেল।আজ কালো আর মেয়েলি হওয়ার কারনে তাকে কত অপমান সইতে হয়।এটা কি সে ইচ্ছা করে হয়েছে?সৃষ্টিকর্তা দিলে তার কি ই বা করার থাকে!মিঠু কাঁধ থেকে বলল,”কাঁদিস না রুপ!কাঁদিস না!”রুপাই ধমক দিয়ে বলল,”তুই চুপ কর তো”।

রুপাই দ্রুত সেখান থেকে সরে যেতে লাগল।দোকানে গিয়ে মতিকে বলল,

-মতি ভাই!ভাবি রনির জন্য খাবার চাচ্ছে!

-আরে রুপাই!এসেছো যখন একটু বসো।

-না বসবো না মতি ভাই।দাও না!

-দিচ্ছি তো।তুমি বসো তো।আচ্ছা বুবু কেমন আছে?অনেকদিন আমাদের বাড়ি আসে না।

-ভালোই আছে।

-আর তুমি কেমন আছো?

-আছি ভালোই।আমার আবার থাকা না থাকা।

-এমন ভাবে বলছো কেন তুমি?

-এমনি।

-তুমি তো বেশ শুকিয়ে গেছো।খাওয়া দাওয়া করো না নাকি?

-কি যে বল না তুমি!

-নাও এই বিস্কুটখানা খাও।আর মিঠুকে এইটা দাও।

মিঠু রুপাইয়ের কাঁধ থেকে বলল,”খাবো!খাবো!”

-না মতি ভাই।আমি দুপুরে খেয়ে আসছি।

-আরে নাও তো।তুমি কি আমাকে লজ্জা পাও?

-কই নাতো।

রুপাইয়ের কালো বর্ণ গায়ে ভ্রমর কালো দুটি ডাগর ডাগর চোখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল।সে মতির দিকে তাকাতে বিব্রত বোধ করল।মতি বলল,

-আজ মধুখালি স্কুল মাঠে যাত্রা আছে!দেখতে আসবে?

-মা তো আসতে দিবে না!

-সোনা মাকে রাজি করার দায়িত্ব আমার।তুমি আসবে কিনা বলো?

-তুমি রাজি করতে পারলে আমার আপত্তি নেই!

এই একটা মানুষই শুধু রুপাইয়ের রুপ বিচার করে না।রুপাইয়ের ভাই সোনাইয়ের সংসারে তার একমাত্র বোন।সে সুবাধে রুপাইকে ভালো জানে হয়তো।তবু এই মানুষটির স্নেহপ্রবণ আচারণ রুপাইয়ের ভালো লাগে।তার জন্য সে বড় মায়া দেখতে পাই মতি ভাইয়ের চোখে।স্কুল জীবনে যখন অনুভব করল তার চাওয়া আর দশটা সাধারন ছেলের মত নয়,তখন গায়ের কালিমার সাথে যুক্ত হলো নতুন দুশ্চিন্তা!ক্লাসে রতনকে দেখলে তার খুব ইচ্ছা করে কাছে গিয়ে বসতে,তার হাতটা ধরতে।কিন্তু মেয়েলি আর কালো বলে সবাই তাকে এড়িয়ে চলে।সামনে-পিছনে নানান কথা কানে আসতো।স্কুলের দপ্তরি মতিন চাচা প্রায় তাকে বলে,”রুপাই একদিন রাতে আয় আমার কাছারি ঘরে,পুষিয়ে দিবো।”রুপাই বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকে।চেয়ারম্যান বাড়ি তার মা কাজ করতে গেলে মাঝে মাঝে সে যায় মায়ের কাছে।তখন কথার ছলে চেয়ারম্যানের ছোট ছেলে সুরুজ তাকে আড়ালে আবডালে ডেকে শরীরে হাত দেয়।মাকে বলাতে মা ও বাড়ি যেতে নিষেধ করে দিল।

২।

মধুখালি স্কুল মাঠে “রুপবান” যাত্রা হচ্ছে।দুর থেকে যমুনার জলের কলকলানি শোনা যাচ্ছে।মঞ্চে রুপবান রহিমকে কোলে নিয়ে বাঘের কাছে তাদের জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে গান গেয়ে।রুপাই এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে,চোখ দুটো ছলছল করছে তার।যেন এখনি জল গড়িয়ে পড়বে!মতি রুপাইকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

-চলো তো!ভালো লাগছে না।

-কেন?ভালোই তো।

-তুমি চলো নদীর কাছ থেকে ঘুরে আসি।

রুপাই আর কথা বাড়াল না।উঠে দাড়িয়ে মতিকে অনুসরন করতে লাগল।যমুনার কাছে এসে দাড়িয়ে মতি বলল,

-এখানে কোথাও বসি?

রুপাই সলজ্জে উত্তর দিল “আচ্ছা”।

দুজনে যমুনার পাড়ে বসে পড়ল।আকাশের তারার মত যমুনার বুকে জেলেদের পিদিম জ্বলছে।কোনটার শিখা মিটিমিটি জ্বলছে,তো কোনটার শিখা দুরুদুরু কাঁপছে।ঠিক যেমন রুপাইয়ের বুকের বাম পাশটা কাঁপছে।মতি রুপাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

-যমুনার বুকে চাঁদের আলো পড়ে সেই প্রতিচ্ছবি তোমার মুখে পড়েছে,খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।

-কি যে বল!আমার মত কৃষ্ণবর্ণের ছেলের নাকি আবার সৌন্দর্য্য!তুমি ঠাট্টা করছ?

-বিশ্বাস করো সত্যই বড় সুন্দর লাগছে তোমাকে!তুমি হয়তো কালো,দেখতেও ভালো না।সেটা অন্য সবার চোখে।কিন্তু আমার কাছে তোমাকে স্বর্গের অপ্সরা লাগে।

-এই যে মতি ভাই!আমার সাধের বেয়াই একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

মতি হাসলো।যে হাসি যমুনার জলে প্রতিধ্বনি করে রুপাইয়ের কানে ফিরে এল।

মতি রুপাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

-তুমি তো শীতে রিতিমত কাঁপছো!চাদর আনলে কি হয়?

রুপাই মৃদু হাসি দিল।তার ফর্সা দাঁতে যমুনায় ছড়ানো চাঁদের জোসনা লেগে যেন মতির চোখে পড়ল।

-আমি কি জানতাম যাত্রা দেখা ছেড়ে আমার বেয়াই এই শীতের রাতে যমুনার পাড়ে আসবে?তাহলে তো লেপ-কম্বল সাথে নিয়ে আসতাম!

-তুমি না?এসো তো তুমি আমার চাদরের নিচে!

-না বাবা!দরকার নেই।আমি এখানেই ভালো আছি।

মতি রুপাইয়ের হাত ধরে টেনে গায়ের সাথে মিশিয়ে চাদরে জড়িয়ে নিল।দুজনের শীতের গরম নিঃশ্বাস দুজনের মুখে পড়তে লাগলো।রুপাই লজ্জায় যেন আরো কালো হতে লাগল।মতি রুপাইয়ের পিছন দিয়ে একটা হাতে রুপাইকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে বলল,

-আমাকে ভালোবাসো তো নাকি?

রুপাই নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে লজ্জায় ওষ্ঠদ্বয় কাঁপিয়ে বলল,”জানি না”।

মতি রুপাইকে টেনে কোলের উপর বসিয়ে শরীরে উষ্ণ হওয়া চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,”আমার রুপ কি লজ্জা পেলো?”

রুপাই কোলের উপর থেকে ঘাড় ঘুরাতেই দুজনের ঠোঁটে ঠোঁটে হালকা স্পর্শ পেল।মতি বলল,”উফ কি মিষ্টি!”রুপাই বলল,

-তুমি আমাকে রুপ বলছ কেন?কার থেকে শিখলে?

-কেন আমাদের মিঠু মহাশয়ের থেকে!

-ইশ!ওটা তো পাজি।

মতি রুপাইয়ের অাদুল গলায় ওষ্ঠ রাখতেই রুপাই কেঁপে উঠল।মতি বলল,

-একটু মিষ্টি কি পাওয়া যাবে?

-জানি না।

মতি রুপাইকে ঘুরিয়ে জড়িয়ে রেখে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।যমুনার ছলছল জলের শব্দে ওদের নিঃশ্বাসের রাশভারী শব্দ মিলিয়ে গেল।

“আমার যমুনার জল দেখতে কালো,স্নান করিতে লাগে ভালো!

যৌবন মিশিয়া গেল জল রে”

এই লাইনটা গাইতে গাইতে স্কুল থেকে ফিরল রুপাই।রুপাইয়ের গানের গলা চমৎকার।গ্রামের অধিকাংশ উৎসব পার্বণে রুপাইকে দেখা যায় মেয়ে সেজে নেচে গেয়ে সবাইকে আনন্দ দিতে।বইগুলো দাওয়ায় রেখে সে দ্রুত মিঠুর কাছে মনের কথা বলতে এল।

-জানিস মিঠু!সেদিন যমুনার কাছে মতি ভাই আমাকে অনেক আদর করেছে।বলেছে আমাকে ভালোবাসে!আমিও মতি ভাইকে খুব ভালোবাসি রে।তোর সাথে আড়ি করছিলাম!তাই বলতে আসি নি!অাজ বলছি।তুই দোয়া করিস মতি ভাই যেন আমাকে কোনদিন ভুলে না যায়।যদি কোনদিন আমাকে ঠকাই তাহলে দেখিস আমি মরে যাবো!

মিঠু আনন্দে খাঁচার ভিতর ডানা ঝাপটাতে লাগল।রনি স্কুল ব্যাগ রেখে দৌড়াতে দৌড়াতে রুপাইয়ের কাছে এসে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

-কাকু!কাকু!মামা তোমাকে দোকানে যেতে বলেছে!

রুপাই রনিকে কোলে এনে পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে বলল,

-ওমা তাই!আমার রনি বাবু তাই বলতে আসছে তার কাকুকে।তো মামা আর কিছু বলেনি?

-না!আমাকে এতো চকলেট দিয়েছে।

-কই দেখি!দেখি!

রনি পকেট থেকে অনেকগুলা চকলেট বেরিয়ে বলল,

-এই দেখ।

রুপাই রনির কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,

-ওকে বাবা তুমি যাও।মা বকবে।আমি নিশ্চয় যাবো তোমার মামার কাছে।

রনি যেভাবে দৌড়ে এসেছিল,ঠিক সেভাবে দৌড়ে চলে গেল।রুপাই সেদিকে তাকিয়ে থেকে তার চোখ ভিজে এল।তার ভাবি রনিকে কখনো তার কাছে আসতে দেয় না।তার ধারনা রুপাইয়ের মেয়েলিপনা তার ছেলে শিখবে।রুপাই ঘরে গিয়ে প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে তোয়ালে হাতে শিষ বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেল,কিন্তু শিষের ধ্বনি রেখে গেল মিঠুর কাছে।

বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখলো মতি গামছা হাতে লুঙ্গি পরে দাড়িয়ে আছে।হাতে একটা প্যাকেট।রুপাই সামনে গিয়ে দুহাত মাজায় বেঁধে চোখ উপর-নিচ করে বলল,

-কি ব্যাপার এই ভর দুপুরে শ্বশুর বাড়ির সামনে কি?

মতি হেসে বলল,

-আমার জানপাখিটাকে দেখতে আসছি।এই নাও প্যাকেটটা বাড়ির ভিতরে রেখে দ্রুত আমার সামনে এসো।

-কেন?আর এতে কি আছে মতি ভাই?

-গঞ্জে গেছিলাম এতে একটা লাল টিশার্ট আছে।বিকালে পরে আমাকে দেখিয়ে আসবে।আর ঐ আমাকে ভাই বলছো কেন?

-তো কি বলবো শুনি?জান?

-আলবাত জান বলবে!

-ইশ আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই।

-গেলে!দিলাম তো মার।

রুপাই এক দৌড়ে প্যাকেট হাতে বাড়ির ভিতর চলে গেল।

মিনিট দুয়েক পরে ফিরে এসে বলল,”কই যাবে?চল!”

যমুনার কূলে গিয়ে মতি হাত বাড়িয়ে বলল,

-কই এসো?

-এই না না!আমি সাতার জানি না।অামি কোনদিন যমুনায় নামি নি!আমার খুব ভয় করে।

-তুমি এসো তো।আমি থাকতে তোমার কোন ভয় নেই সোনা।

রুপাই ধীর পায়ে যমুনার কাঁদা মাড়িয়ে এই প্রথম মতির স্পর্শে যমুনার জলে পা রাখল।মতি টান দিয়ে তাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।যমুনার জলের সংস্পর্শে রুপাইয়ের দেহ শিহরিত হল।সে সলজ্জে মতির কাছ থেকে ছাড়া পেতে চাইল।

-ছাড়ো।কেউ দেখে ফেলবে!

-জি না স্যার!যমুনার এ ঘাটে কেউ আসবে না।বেচে বেচে এই ঘাট নির্বাচন করেছি আমাদের প্রণয়ের জন্য।

মতি রুপাইয়ের সমস্ত শরীরকে নগ্ন করে ফেললো।নিজের লুঙ্গি খুলে যমুনার স্রোতে ভাসিয়ে দিল।

-আজ আমরা নগ্ন শরীরে যমুনায় স্নান করবো।আমার রুপাইয়ের শরীরে যমুনার জল খেলা করবে আর আমি খেলবো আমার রুপাইকে নিয়ে।

-এ মা ছিঃ ছিঃ!আমরা উঠবো কিভাবে?

মতি রুপাইকে নগ্ন গায়ে পিছন থেকে জলের ভিতর জড়িয়ে ধরে তর্জনী আঙ্গুলের ইশারায় বলল,

-ঐ দেখো এই যমুনা নদীর পাড়ে তোমার তোয়ালে আর আমার গামছা মিলন করছে।তোমার আর আমার মিলন যমুনার জলে হয়ে যাক।

রুপাই লজ্জায় যমুনার জল ছোঁয়া হাতে নিজের মুখমন্ডল আবৃত করল।মতি রুপাইয়ের কাঁধে চুমু দিয়ে বলল,

-কি সোনা লজ্জা পেলে?

জলের ভিতর মতি রুপাইকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

-একটা গান গাও না প্লিজ।

-এখন?এই অবস্থা?

-হ্যা।তো কি হয়েছে?

-তুমি পাগল হলে?

-প্লিজ রুপ!গাও না!

রুপাই গলা ছেড়ে গান ধরল।যে গানের সুরের লহরী দিল যমুনার জলের কলকল স্রোতের রাগিনী।

৩।

মাঝ রাতে সোনাইয়ের ঘরের দাওয়ায় ছায়া মূর্তি দেখে রুপাইয়ের বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল।ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল সে।গম্ভীর গলার স্বরে থমকে দাড়াল সে।

-রুপাই!কোথা থেকে ফিরলে তুমি এখন?

-জি ভাবি!রফিকদের বাড়ি গিছিলাম।

-একদম মিথ্যা কথা বলবে না আমায় তুমি!বহুত দিন ধরে শুনছি তুমি আমার ভাইয়ের পিছু ঘুরছো।মাগিপনা করার জায়গা পাও না?আমার ভাইকে ধরছো!

-ভাবি এসব আপনি কি বলেন?

-চুপ কর!আমি যেন আর না শুনি তুমি মতির পিছু ঘুরছো।না হলে আবার তোমাকে আমি তোমার ভাইকে দিয়ে মার খাওয়াবো।

রুপাই মাথা নিচু করে বলল,”জি ভাবি।মনে থাকবে!”

ময়না বিড়বিড় করে গালিগালাজ করতে করতে নিজের ঘরে দিকে চলে গেল।সেবার রফিকের বোনের বিয়েতে মেয়ে সেজে নাচার কারনে সোনাই বেশ মারছিল রুপাইকে।সেই থেকে আর কোন বিয়ে বাড়িতে নাচতে গাইতে যায় না সে।বাবা বেঁচে থাকলে এতোটা অনাদর আজ তাকে পেতে হতো না।রুপাই সেইভাবে ধীর পায়ে ঘরে গেল।ঘরের এককোণে খাঁচায় থাকা মিঠু রুপাইয়ের ঘরে ফেরায় নিশ্চিত হয়ে ডানা ঝাপটে নিশ্চুপ হয়ে গেল।ঘরের অন্য বিছানায় সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে মমতা ঘুমিয়ে পড়েছে।রুপাই না খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।দুচোখের জলে তার বালিশ ভিজতে লাগল।

স্কুলে যাওয়ার পথে রুপাইয়ের পথ আগলে দাড়ালো মতি।

-মতি ভাই পথ ছাড়!আমার স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে!

মতি রুপাইয়ের হাত ধরে টেনে তার দোকানের পিছনে নিয়ে গেল।হালকা ভাবে জড়িয়ে ধরিয়ে বলল,

-তোমার কি হয়েছে রুপাই?রনিকে দিয়ে কত খবর দিচ্ছি তুমি আসছো না কেন?

-মতি ভাই তোমার বোন আমাকে সেদিন যাচ্ছেতাই বলেছে!বলেছে আমি নাকি মাগিদের মত তোমার পিছু করছি।

-রুপাই!আমি তোমাকে ভালোবাসি!কে কোথা থেকে কি শুনে কিসব বলল তার জন্য কি আমি দায়ী?তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?

রুপাইয়ের চোখ ছলছল করছে।সে আধভাঙ্গা গলায় বলল,

-ভালোবাসি বলেই তো যা যাচ্ছ তাই দিয়েছি।কোনদিন আপত্তি করি নি।

-চল আমরা ঢাকায় পালিয়ে চলে যায়।ওখানে আমরা সংসার পাতব।

-এটা হয় না মতি ভাই।

-মানুষ চাইলে সবই হয়।আমি ওতো কিছু বুঝি না তুমি রাতে ব্যাগ গুছিয়ে সুরুজদের পুকুরের পশ্চিমপাড়ে আসবে!

রুপাই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।মতি রুপাইয়ের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,

-তুমি স্কুলে যাও এখন।রাতের কথা জানি মনে থাকে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে রনিকে কোলে নিয়ে রুপাই বলল,

-বাবা!আমি যদি না থাকি তুমি থাকতে পারবে না?

-কেন কাকু তুমি কোথায় যাবে?

-আমি অনেক দুরে চলে যাবো!

রনি রুপাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,

-না কাকু তুমি কোথাও যাবে না।তুমি চলে গেলে মাকে ফাঁকি দিয়ে আমি কার কাছে আসবো,কে আমাকে আদর করবে,ভালবাসবে?

রুপাইয়ের চোখে পানি চলে এল।রনিকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল,

-তুমি দাদি কে একটু দেখে রাখতে পারবে না বাবা?

রনি অবুঝ চোখ দুটি ঘুরিয়ে বলল,”হ্যা”।

রাতে মমতার ঘুমন্ত মুখের পানে অনেক্ষণ চেয়ে থেকে ধীর পায়ে রুপাই মিঠুর খাঁচার কাছে এসে দাড়াল।

-মিঠু আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি!তুই ভালো থাকিস!মাকে একটু দেখে রাখিস।

মিঠু খাঁচার ভিতর চিৎকার শুরু করল।রুপাই ধমক দিয়ে বলল,”চুপ!তুই একদম আবার ভালো চাস না।মা জেগে যাবে তো।”মিঠু মন খারাপ করে বসে রইল।

-কি ব্যাপার তোমার ব্যাগ কই?লুঙ্গি পরা কেন?

পুকুর ঘাটের সিড়িতে বসা ছায়ামানবটি কেঁপে উঠল।

-ও তুমি!

রুপাইয়ের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে মতি একপাশে রাখল।রুপাইকে টেনে কোলের উপর বসিয়ে বলল,

-আমি এভাবে যাবো।

-কেন?

-আমার রুপ আমার পাশে থাকলে আমি আর কিছু চাই না।

মতি ধীরে ধীরে রুপাইকে আদর করতে লাগল।

-এখন না।

-প্লিজ একটু!

রুপাই আর বাঁধা দিলো না।মতি রুপাইয়ের শার্ট খুলে সারা গায়ে চুমু খেতে লাগল।রুপাইয়ের সারা শরীর কামনায় জেগে উঠল।রুপাইকে সিড়িতে শুয়িয়ে দিয়ে মতি তাকে নগ্ন করে আদর করতে লাগল।প্রচন্ড কামনা-ক্লান্তিতে রুপাই সিড়ির পাশে নুয়ে থাকা ঘাসগুলোকে খামচে ধরল।মতি ঘামাক্ত মাদকতায় শেষ বিন্দুতে ফেরার চেষ্টায়।হঠাৎ টর্চের আলো তাদের অনাবৃত শরীর ছুঁয়ে গেল।মতি লুঙ্গিটা কোনমতে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।রমিজ মুন্সি চেয়ারম্যান ও তার চামচা মোতালেবের হাতে ধরা পড়ল রুপাই।রুপাইকে চুল ধরে টেনে মুন্সি চেঁচিয়ে বললেন,

-হারামজাদা!ওটা কে ছিল বল?আমার গাঁয়ে এসব!তুই রশিদের ছেলে হয়ে এসব।তোর বাপ তো খুব ভালো মানুষ ছিল।

রুপাই মুন্সির পা জড়িয়ে ধরল।

-চাচা আমাকে মাফ করেন।কথা দিলাম আমি আর কোনদিন এমন করবো না।

-মোতালেব ওর কাপড় ঠিক কর।আর গোয়াল ঘর থেকে দড়ি আন।সকালে ওর বিচার হবে!

গাছের সাথে দড়ি দিয়ে রুপাই বাঁধা।চারপাশে গ্রামের সব মানুষ,চেয়ারম্যান মুন্সি,মসজিদের মওলানা,রুপাইয়ের ভাই,ভাবি,মা।রনি একমনে কেঁদে যাচ্ছে।ময়না বাপের বাড়ি কাজের মেয়েকে ডেকে রনিকে সরিয়ে নিল।মমতা ঘুমটার আড়ালে বারবার চোখের পানি মুছচ্ছে।রুপাই মাথা নিচু করে বসে আছে।সারারাত গোয়াল ঘরে নির্ঘুম থেকে লজ্জায়,চিন্তায়,সংকোচে ছেলেটা মরি মরি।মুন্সির চামচা মোতালেব এসে লাঠি দিয়ে রুপাইয়ের মাথা উচু করে বলল,

-যে দৌড়ে পালিয়ে গেল,সে কে ছিল?

রুপাই মাথা নিচু করেই বলল,

-মতি ভাই!

ময়না চেঁচিয়ে উঠল,”ও মিথ্যা বলছে।আমার ভাইকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”মুন্সি চেয়ারম্যান বলল,

-তুমি চুপ থাকো।মোতালেব মতিকে খবর পাঠা।

মতি যখন আসল ততক্ষণে গ্রামের লোকেরা অনেক কথা বলে ফেলছে রুপাইকে।সারা গাঁয়ে মাগিপনা তার কাজ,গাঁয়ের ছেলেবুড়োদের নষ্ট করে ছাড়ল।গাঁয়ের বউ-ঝিরা ও ওর মত কোমর কচলিয়ে হাটতে পারে না।মুন্সি জিজ্ঞাসা করল মতিকে,

-কাল রাতে পুকুর ঘাটে তুমি ছিলে?

মতি যেন আসমান থেকে পড়ল।দুহাত মুখে দিয়ে বলল,

-তওবা!তওবা!অস্তাকফিরুল্লাহ!নাউজুবিল্লা!এই ছেলে মিথ্যা কথা বলছে।আমি তো কাল গঞ্জে গিয়ে ফিরেই আসে নি রাতে।তাছাড়া ওমন নোংরামি আমি জীবনেও করতে পারি না।

রুপাই বিষন্ন মুখ নিয়ে একবার মতির দিকে তাকিয়ে বলল,

-মতি ভাই!তুমি এমন করে বলতে পারলে?তুমি না আমাকে কত স্বপ্ন দেখাইলা,আমাকে না তুমি ভালোবাসো?আমারে নিয়া না তুমি ঘর বাঁধতে চাও।গতরাতে তুমিই না বললা আমরা পালিয়ে ঢাকায় গিয়ে দুজনে সুন্দর একটা সংসার গড়বো।

মতি রাগে গর্জন দিয়ে বলল,

-রুপাই তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

গতরাতে মতির গঞ্জে থাকার প্রমাণ মিলল।চার-পাঁচজন সাক্ষীও দিল।শেষে মওলানা রুপাইদের একঘরে করে তাকে একুশখানা চাবুকের আঘাত দিল।

ঘরে ফিরে সোনাই আরেকদফা মারল তাকে।মমতা রক্তাক্ত ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল।মধ্যরাতে মমতার হাত আলগা করে মতির দেওয়া লাল টিশার্ট টা পরে বেরিয়ে গেল রুপাই।মিঠু বুঝতে পেরে খাঁচায় ডানা ঝাপটাতে লাগল।শেষ রাতে কাল বৈশাখী ঝড় এলো।বিচ্ছিন্ন খাঁচার পাশে মিঠুর মৃত দেহ পাওয়া গেল।রফিক এসে খবর দিল যমুনার কানাইখালির ঘাটে রুপাইয়ের লাশ পাওয়া গেছে।মমতা পাগলের মত “রুপাই!রুপাই!আমার মানিক!” বলে দৌড়াতে লাগল।

কানাইখালির ঘাটে হাজার লোকের ভিড়।যমুনার কালো জলে রুপাইয়ের কালো দেহ মিশে গেছে।লাল টিশার্ট বাঁশের খুঁটিতে এটে ভেসে আছে রুপাইয়ের লাশ।

“আমার যমুনার জল দেখতে কালো,স্নান করিতে লাগে ভালো!

যৌবন মিশিয়া গেল জলে রে।” —————————————————

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.