জীবনের অলি-গলি

১.
রুমি আমার থেকে চার বছরের বড়। আমি সবে মেট্রিক দিলাম। ক্লাস এইটেও রুমি আমাদের সাথেই খেলত। অথচ দুইবছর ধরে ও আর আমাদের সাথে খেলে না। শিরিনও কয় সপ্তাহ খেলে না। দাড়িয়াবান্ধা খেলতে নামলেই শিরিনের অভাবটা বুঝতে পারি। মেয়েটা শরীরটাকে খুব ভাজ দিতে পারে। তাই সহজে কেউ ওর কোর্ট পাড়ি দিতে পারত না। অথচ আজ ওকে ছাড়াও প্রতি বিকেলে বড্ড খেলাধুলা চলে।

শুনলাম রুমির বিয়ে। খুব অবাক হলাম। মেয়েটা গতবছর ইন্টার দিল। পড়ালেখায়ও খারাপ ছিল না। হঠাৎ বিয়েতে রাজি হল কীভাবে? ও তো অনেক বড় কিছু হতে চাইত। কী হতে চাইত বলে নি কখনো। কিন্তু অনেক বড় কিছু হতে চাইত। এখন সে বিয়েই করছে। হয়তো বিয়ে করাটাও অনেক বড় কিছু।

আজ বিকেলেও খেলতে নেমেছি। রুমি, শিরিনকে ছাড়াই দল গঠন হয়। নির্দ্বিধায় খেলা চলে। আমার বয়সী একটা মেয়ে আর একটা ছেলে আমার থেকে দুই বছরের বড় হবে, দেখলাম নতুন খেলতে এসেছে। বেলাল ভাইর দলে আমি খেলছি। ভাই আমার প্রতিবেশি। বেলাল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,
—ওরা কারা?
—রুমির বিয়েতে বেড়াতে এসেছে। রুমির ফুফাতো ভাইবোন রাজীব আর রোজী।

ছেলেটাকে দেখলে কেমন যেন লাগে। আগে রুমি যেভাবে বেলাল ভাইকে আড়চোখে দেখত, আমিও তেমনিভাবে দেখছিলাম। খেয়াল করলাম রোজীও আমায় দেখছে। সন্ধ্যায় একসাথে খালের পানিতে ঝাপ দিলাম সব ছেলেরা। রাজীব ছেলেটা ভালো সাতার জানে। আর রোজী খালের পাড়েই ঝোপঝাড়ে ফড়িং ধরে বেড়াচ্ছিল। শহুরে ছেলেমেয়েদের গ্রামে আসার পর যা কাজ তাই আরকি।

২.
রাতে মা এসে বলল রাজীব নামে একটা ছেলে আমার সাথে ঘুমোবে। বুঝতে পারলাম মেহমানটা কে। কিন্তু গুরুত্ব দিলাম না। যখন রাতের খাবার খাচ্ছিলাম তখন সে আসল। শহরের ছেলে, জিন্সের ছোটো একটা প্যান্ট আর টাইট একটা গেঞ্জি পরে এসেছে। মা জোর করে ছেলেটাকে খেতে বসালো। কিছুক্ষণ খাওয়ার পরই ছেলেটা আমায় বলল,
—ওভাবে খেতে নেই। ছোট ছোট লোকমা দাও।

অবাক হয়ে বললাম,
—খেতেই সারারাত পার করে দিব নাকি?

ছেলেটা জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ পেয়ে নড়েচড়ে বসল।
—উপরওয়ালা তোমার রিযিক জুগিয়েছেন, সেই রিযিককে কষ্ট দিয়ে খেতে নেই। সময় নিয়ে খাও।

মনে মনে বললাম আসছে আমার খোদাভক্ত। মুখে বললাম,
—খাবার সময় এত কথা বলতে নেই। এতেও উপরওয়ালা রাগ করেন।”

ছেলেটা কপটরাগ চোখে তাকাল, আমি উঠে পড়লাম। রুমে এসে শুনি, মা রাজীবকে বলছে, মেট্রিকের রেজাল্ট দিলেই আমায় শহরে পাঠাবে। আরও বেশ কিছু ছেলেটার সাথে আলাপ জমানোর জন্য।

৩.
আমাদের এলাকাটা আধাশহর। মফস্বলের পাশেই কিন্তু সদরের বাইরে। তাই সামান্য হলেও উন্নত। টিভি এখানে আরও অনেক আগেই এসেছে।কম্পিউটার আছে শুধু দুইটা বাসায়,আমার আর আমারই এক ক্লাসমেট অনিমের বাসায়। আমি পিসিতে গান ছাড়লাম। এক্সাম শেষ, রিলাক্সে আছি। আজকে অনিমের থেকে ১০-১২ টা পর্ণ ভিডিও এনেছি। কিন্তু এই রাজীব ছেলেটার জন্য রাতের ঘুম হারাম।

বাবা ফোন করায় মা রাজীবকে আমার রুমে পাঠিয়ে দিল। ছেলেটা এসেই বিছানায় বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কেমন অস্বস্তিকর চাহনি। আমিও ওর দিকে ঘুরে বললাম,
—আমার এক্সট্রা লুঙ্গি নাই।

এবার ছেলেটা হেসে দিল। হাসলে গালে টোল পরে। আমারও পরে। ক্লাসমেট সায়মা বলেছিল যাদের গালে টোল পরে তাদের স্বামী/স্ত্রী মরে যায়। কথাটা মনে পরায় আমিও হেসে দিলাম।
—বাহ তোমার হাসিটাতো সুন্দর।
—হাসি কখনো অসুন্দর হয়? আপনারটাও তো সুন্দর।
—অনেক হাসি অসুন্দরও হয়।
—তুমি জানো না। অসুন্দর হাসিও হয়। জোর করে দেয়া হাসি।

আমি কিছু না বলে মশারি খাটালাম। ছেলেটা শুয়ে পড়ল। আমিও কিছুক্ষণ মাউস নেড়েচেড়ে শুতে গেলাম।

৪.
আজ রুমির গায়ে হলুদ। মা কমলা রঙের একটা শাড়ি পরল। মায়ের বয়স ভালোই। তবুও মাকে শাড়িতে যুবতী লাগছে। আমি হলুদ রঙের পাঞ্জাবী পরলাম। কাল বিয়েতে পরব লালটা। বিয়ে বাড়িতে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। একজন হলুদ, গিলা আরও কি যেন বাটছে আর পাশে বসে কয়েকজন হয়লা (আঞ্চলিক গান) গাইছে, “হলুদ বাটো মিন্দি বাটো….”

আমিও একটা গাইলাম, “ছয় ছয়মাস পরেতে স্বামীজান আইলো বাড়িতে, চলো স্বামীজান ফুস্কা খাইতে যাই।” কয়েকজন মহিলা লজ্জায় আঁচল দিয়ে মুখে ঢাকলো। আমি উঠে এলাম, এদের লজ্জাও দেখতে ভালো লাগে।হঠাৎ রুমি জানালা দিয়ে ডাকল। মেয়েটাকে সুন্দর লাগছে। এগিয়ে গেলাম।

একটা ভাজ করা কাগজ দিয়ে বলল, “বেলালকে এই চিঠিটা দিবি আর ও কি বলে সেটা আমায় এখনি জানাবি।” আমি আচ্ছা বলে ওদের বাড়ি থেকে বেরোলাম। উদ্দেশ্য বাসায় যাওয়া। রোজীর সাথে দেখা হল। কথা বলতে বলতে জানলাম ও এবার ক্লাস নাইনে পড়ে। ঢাকায় আজিমপুরে থাকে কোয়ার্টারে। ভিকারুন্নেসায় পড়ে। আমিও নিজের সম্পর্কে কিছু বললাম। ইতোমধ্যে বাসার কাছাকাছি চলে আসায় ও বলল আর যাবে না। আমিও ওকে ফিরে যেতে বললাম। মেয়েটা একটু ইতস্তত বোধকরে ঘুরে হাটতে শুরু করল।

৫.
আমি বাসায় ঢুকে চিঠিটা পরলাম।

“চলো পালিয়ে যাই।”

শুধু এটুকু লেখা। আমি আবার বিয়েবাড়িতে গেলাম। রুমিকে বললাম, “বেলাল ভাই চিঠিটা পড়ে বলল সম্ভব না। তারপর চলে গেল।” রুমির চোখ বেয়ে পানি পরছিল। আমি সরে এলাম। ওকে কাঁদতে দেয়া উচিৎ।জানি না খারাপ কিছু করলাম কি না।

রাতে রাজীব আবারও এলো। আমার আজ অস্বস্তি লাগছে না। বলে দিলাম ঘুমোতে দেরী হবে। পিসিতে অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ওয়ান্টেড ফিল্মটা ছাড়লাম। ও শুয়ে পরল। আধঘন্টা পর পর্ণ ভিডিওগুলা দেখা শুরু করলাম। একটা ভিডিও দেখার পরপরই খেয়াল হলো রাজীব মশারীর ভিতর উঠে বসেছে। আমি বন্ধ করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু রাজীব নিষেধ করল। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আবার ছেড়ে দিলাম। রাজীব চেয়ার টেনে পাশে বসল। চতুর্থ ভিডিওটা শুরু হতেই আমি অবাক জাস্ট দুইটা ছেলে, কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। আমি সাথে সাথে বন্ধ করে উঠে দাড়ালাম। রাজীবও হা হয়ে আছে। আমি বললাম ভাই ঘুমাতে যান। ও দ্বিরুক্তি না করে শুতে গেল। আমিও বারান্দায় কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে শুতে গেলাম।

সকালে ঘুম ভেঙে দেখি মা রাজীবকে নাস্তা দিচ্ছে। লজ্জায় ওর চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আমি মুখ ধুয়েই পেন্ড্রাইভ নিয়ে বেরোলাম, অনিমের কপালে আজ শনি আছে।

৬.
অনিম শুনে হাসতে লাগল। আমার চোখে আগুন জ্বলছিল। মনমতো কিল-ঘুষি দিয়ে ওদের বাসায়ই নাস্তা করে চলে এলাম। এসে দেখি মা সাজতে বসে বসেছে। মা এতো খুশী কেনো বুঝতে পারলাম না। এর আগেও অনেক বিয়েতে গিয়েছি। কিন্তু চার ঘন্টা আগে মাকে কখনো সাজতে দেখি নি। ভালো কোনো খবর আছে হয়ত। আমি আমার রুমের দরজার আটকে তিন নাম্বারটা বাদে বাকী ভিডিওগুলা শেষ করলাম।

দুপুরে গোসল করে লাল পাঞ্জাবী পরলাম। নিজেকে দেখে নিজেরই হিংসে হচ্ছে। মা এর সাথেই বিয়ে বাড়িতে গেলাম। বরযাত্রী চলে এসেছে। রুমি আর ওর বর মঞ্চে বসে আছে। অনেকেই ছবি তুলছে। রুমি সবার সাথেই হাসিমুখে কথা বলছে। আর সামনেই প্যান্ডেলে বেলাল ভাই হাসিমুখে খাদিমদারী করছেন। রুমির মনে চাপা কষ্ট, বেলাল ভাইয়ের মনেও হয়তো চাপা কষ্ট। আমি চাইলেই ওদের একটা সুযোগ দিতে পারি। কিন্তু দিচ্ছি না। চোখে পানি চলে এল। খেতে বসলাম। এক হেরে যাওয়া প্রেমিকার দাওয়াতের খাবার….

৭.
রোজী অনেকক্ষণ থেকেই পিছে পিছে ঘুরছে। মেয়েট সিদ্ধান্থীনতায় ভুগছে। আমায় ডাকবে কি ডাকবে না। একটা ছবি তুলবে কি তুলবে না। ভাবছে ছেলেটা মফস্বলের হলেও স্মার্ট, কিন্তু ঢাকার ছেলেগুলোর তুলনায় স্মার্ট না। আমি হয়তো বেশীই সহজ সরল। এসব কথা রোজীর চোখই বলে দিচ্ছিল। আমি গ্রাহ্য করলাম না। এসব সুবিধাবাদী মেয়েদের সুযোগ দিতে নেই।

খালের পাড়ের দিকে হাটতে লাগলাম। সানবাধানো ঘাটের পাশে সূর্যের আলোয় আবছায়ায় পানির নিচে এলোমেলো খেলা খেলছে রুপালী পুটি মাছ। পানির উপরেই কলমির ঝোপে খাবারের সন্ধানে অনেকগুলো ফড়িং। তাদের মাঝেই আবার দুজন যৌনতায় মেতে উঠেছে। কমলা আর কালো রঙের দুইটা ফড়িং। এদের বাচ্চা কেমন হবে? কালোর মাঝে ফোটা ফোটা কমলা? নাকি কমলার মাঝে ডোরাকাটা কালো দাগ? দুটোই সুন্দর দেখাবে।

রাজীব এসে পাশে বসল। কিছুটা অবাক হলেও প্রকাশ করলাম না। তবু বুকটা ডিবডিব করছে। ওই প্রথমে কথা বলো শুরু করলো,
—কি করো?
—ফড়িং দেখি।
—খুব রোমান্টিক?
—হয়তো বা। কাল রাতের জন্য দুঃখিত।
—কেনো?
—অমন কিছু থাকবে ভাবি নাই।
—তাতে কী? এটা তো আর খারাপ না। প্রাকৃতিক ব্যাপার।
—কী বলেন? দুইটা ছেলে আবার প্রাকৃতিক হয় কেমনে?
— সাধারণ ব্যাপার। একটা ছেলের আরেকটা ছেলেকে ভালো লাগতেই পারে। ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করতেই পারে। আরো অনেক কিছু ইচ্ছে হতে পারে।
— হাসি পাচ্ছে। ওগুলা হয়ত টাকার বিনিময়ে করে। বাস্তবে হয় না।
—কে বলছে হয় না? এই যে আমার তোমায় ভালো লাগে।

এবার আর নিজের বিস্ময়ভাবটা লুকাতে পারলাম না। ও হয়তো সাহস দেওয়ার জন্যই আমার হাত ধরল। কিন্তু আমার হাত কাপতে লাগল। কপাল ঘামতে লাগল। এর মধ্যে রোজী এসে বলল, “ভাইয়া তোকে বাবা ডাকে।” রাজীব উঠে চলে গেল। রোজী এসে পাশে বসল। “একট ছবি তুলি?” আমি জবাব না দিয়ে উঠে দাড়ালাম। শরীর খুব ঘাম দিচ্ছে। একটা গোসল দরকার। একটা ঘুম দরকার। এলোমেলো পা ফেলে বাসার দিকে যাচ্ছি….

৮.
সন্ধ্যার পর মা ঠেলে ঘুম থেকে উঠালো। “অসময়ে ঘুমাচ্ছিস কেনো?” আমি জবাব না দিয়ে মুখ ধুতে গেলাম। মা বলেই যাচ্ছে,”আস্ত বেয়াদব হয়েছিস। কাল আসুক তোর বাবায়।” এবার বুঝতে পারলাম, মা কেন সকালে এতো খুশি ছিল। বাবা আসবে কাল। ভালোই হবে। প্রায় চার মাস পর দেখব বাবাকে। বাইরে কারো হাটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একটু পরই মা দরজা খুলল। বেলাল ভাইয়ের মা এসেছে।

বেলাল ভাই সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফেরে প্রতিদিন। কিন্তু আজ এখনো ফেরে নি। তার খুব চিন্তা হচ্ছিল।আমাদের বাসায় এসেছে কি না তাই জানতে এসেছে। কিন্তু ভাই তো এখানে আসে নি। এরপর আন্টি মায়ের সাথে রুমির বিয়ের আয়োজনের ব্যাপারে বিভিন্ন কথা বলতে লাগল। আমি রুমে ঢুকে দরজা দিলাম। ছেলেছেলে ভিডিওটা দেখা শুরু করলাম। বোধহীনের মত দেখে যাচ্ছি। একদম খারাপ লাগছে না। বরঞ্চ আজকে ভিন্ন ধরনের ভালো কিছু অনুভুতি ভর করছে।

রাজীব এলো ৮ টার পর। বিয়ে বাড়ির অনেক খাবারই রয়ে গেছে। সেখান থেকেই আমাদের জন্য রাতে কিছু পাঠিয়ে দিয়েছে রুমির মা। তারা আরও আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত। আর রাজীব তো রাতে ঘুমোতে আসবেই। তাই ওর হাতেই খাবার দিয়ে দিয়েছে। আমি পিসি অন করে শাহরুখ খানের “দিল সে” ফিল্মটা দেখতে বসলাম। রাজীবও কিছুক্ষণ পর এসে পাশে বসল। একসাথেই দেখছি। নিজে ইচ্ছে করেই রাজীবের হাতটা ধরলাম। আমার হাত আবার কাপতে শুরু করল। ও একটু অবাক হয়ে তাকালো। তারপর আলতোভাবে আমার কাধে মাথা রেখে শাহরুখ-মনীষার পাগলামি দেখতে লাগল।

পুরা মুভিটা একসাথে দেখলাম। মাঝখানে মাও এসে যোগ দিয়েছিল। তবুও আমি হাত ছাড়ি নি, ও কাধ থেকে মাথা তোলে নি। কিছুক্ষণ পর বাব ফোন দেয়ায় মা উঠে গেলো। ছবির প্রায় শেষ মুহুর্তে যখন শাহরুখ মনীষাকে জড়িয়ে ধরে তখন আমিও ওর হাতটা শক্ত করে চাপ দেই। ও মাথা তুলে তাকায়। জিজ্ঞেস করি, এভাবে মরতে পারবে আমার জন্য? ও কোনো জবাব দেয় না। শুধু হাত দিয়ে আমার চুলগুলো খামচে ধরে মুখটা ওর কাছেটেনে নেয়। আমার গালে, ওর ঠোট দাড়িঘষে। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় ফেলি। তারপর দ্বারে খিল দেই, বাতি নিভাই, বিছানায় ওর উপর ঝাপিয়ে পরি।

আমায় যে পছন্দ করে তাকে সুখের সাগরের ভাসানো আমার দায়িত্ব। তবুও প্রথমবার, বেশী সময় নিতে পারলাম না। তাই দুইবার বাসর হলো। যখন দুজনই ক্লান্ত, রাজীব ঘুমিয়ে পড়ল। আমি বারান্দায় ইজি চেয়ারটায় বসলাম। ভাবছি, দুটো ছেলে আজ এখানে যৌনতায় মেতেছে। আর রুমি মেয়েটা? আজ বিয়ে হয়ে গেলো। নিজের অনিচ্ছায় সমাজের বৈধতায় বাসর নামে আরেক পুরুষের বিছানায় ধর্ষিত হবে। বেলাল ভাই কোথায়? হয়ত কষ্টে সিগারেট, গাজা বা বাংলা মদ খাচ্ছে আজ রাতে। হয়তো বা নটিপাড়ার দিকেও পা বাড়াতে পারে।

৯.
হঠাৎ চোখের সামনে থেকে একটা আগুনের বিন্দু ভেসে গেল। আমি রুম থেকে চিঠিটা হাতে নিয়ে ছাদে চললাম। বেলাল ভাই সন্ধ্যা থেকেই আমাদের ছাদে বসে আছে বুঝতেই পারি নি।
—কটা টানলে?
—তুই এতো রাতে?
—হ্যা ঘুম আসছে না।
—তোর কেনো ঘুম নাই?
—রুমি কালকে একটা চিঠি দিয়েছিল। তোমায় দিতে বলেছিলো। কেউ যেনো না জানে সে জন্য দিনের বেলায় বিয়ের ভীরে দেইনি।
—(বিস্ফারিত চোখে) বিকালে দিলি না কেনো?
—ঘুমিয়ে পরেছিলাম, ঘুম থেকে উঠে তোমায় খুজেছি,পাইনি।
—কই চিঠি দে।

আমি চিঠিটা দিলাম। ও টর্চলাইট জালিয়ে একবার পড়ল। কিন্তু বুঝতে পারল না। আরও দুই তিনবার পড়ল। শুধু একটা লাইন “চলো পালিয়ে যাই”, কিন্তু মাথা হ্যাং হয়ে গেছে ওর। তাই বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। যখন বুঝতে পারল তখন ওকে উদভ্রান্তের মতো লাগছে। টর্চের আলো যে নিজের চোখের দিকে ধরে রেখেছে সেদিকে খেয়ালই নেই। আমি ওর মুখভঙ্গি গুলো উপভোগ করছি। হঠাৎ মনে হল তিনতলা থেকে লাফ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। আমি এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে বললাম চলো খালের পানিতে গোসল করবো। ও বাচ্চা শিশুর মতো আমার হাত ধরে চলতে লাগল।

শুক্লাপক্ষের ত্রয়োদশী চাঁদ উঠেছে। খালের পাড় ঝলমল করছে। শান্ত পানির নিচে শ্যাওলা গুলো দেখা যাচ্ছে, পানিরনিচের স্রোতে সাপের মত গা বাকাচ্ছে, অশরীরী লাগছে। আমি বেলাল ভাইর হাত ছেড়ে দিলাম। নিজের থেকেই পানির দিকে এগিয়ে গেল।

পানিতে চাঁদটা কাচের আয়নার মত প্রতিফলিত হচ্ছে।ও সেটা ভেঙে দিয়ে কোমর পানিতে নেমে দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে ধীরে কাঁদতে শুরু করল। হঠাৎ কাঁধে কারো আঙুলের ছোয়া অনুভব করলাম। আঙুল গুলো ছুয়ে কাছে টানলাম। রাজীব ছেলেটার প্রতি মায়া পড়ে গেছে। পাশে টেনে কোমড় ধরে দাড়ালাম। ও কাঁধে মাথা রেখে সামনে দেখছিল। চাদের আলোয় পানির মাঝে দাড়িয়ে এক মন ভাঙা প্রেমিকের কান্না, হৃদয় হাহাকার করা একটি দৃশ্য। ঈশ্বর হয়তো মুচকি হাসে এসব ঘটনায়, সবই যে তার পূর্বপরিকল্পিত….

____সমাপ্ত____

লেখকঃ সানশাইন ক্রিস্টাল

প্রথম প্রকাশ- সমপ্রেমের গল্প পেইজ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.