ফোবিয়া

‘ফোবিয়া’ শব্দটার সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এর অনেক রকম মানে হতে পারে- বিতৃষ্ণা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, আতঙ্ক এবং এরকম আরও অনেক কিছু। সমার্থক শব্দ যতই থাকুক না কেন সব ধরণের ফোবিয়ার অর্থ কিন্তু একটাই, সেটা হলো ভয়, নির্দিষ্ট কোন কিছুর প্রতি ভীতি।

খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, আজকাল আমরা একটা শব্দ প্রায়ই শুনতে পাই, সেটা হলো ‘হোমফোবিয়া’। এর মানে হলো সমকামভীতি, বা ভয়বশত সমকামী মানুষদের প্রতি বিষমকামীদের বিদ্বেষ মূলক আচরণ। এছাড়াও এখন আরও অনেক রকম ফোবিয়ার কথা শোনা যায়, যেমন লেসবোফোবিয়াা বা নারী সমকামভীতি, ট্রান্সফোবিয়া বা তৃতীয়লিঙ্গের মানুষদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ বা ভীতি, হেটারোফোবিয়া বা বিষমকামভীতি ইত্যাদি। অভিধানে প্রায়শই যোগ হচ্ছে এরকম নিত্যনতুন শব্দমালা, যদিও এগুলোর মধ্যে হেটারোফোবিয়া শব্দটা মনোবিজ্ঞানীদের দ্বারা এখনও স্বীকৃত হয়নি।
সে যাই হোক, আমরা আজকে জানবো হোমফোবিয়া বা সমকামভীতি সম্পর্কে, এটা যে শুধু বিষমকামীদের মধ্যেই বিদ্যমান তা কিন্তু নয়। বিষমকামী তো বটেই, এমনকি বিভিন্ন সমকামী মানুষদের মধ্যেও নানা কারণে সমকামভীতি কাজ করতে পারে। সেটা হতে পারে সমকামিতার প্রতি নেতিবাচক ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, এছাড়া সামাজিকভাবে সমকামী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়েও অনেকের মধ্যে, বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে সমকামভীতি কাজ করতে পারে। গবেষকদের মতো আমারও ধারণা পুরুষদের মধ্যে হোমোফোবিয়া নিজেদের পুরুষত্ব জাহির করার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকতে পারে।

এছাড়াও এলজিবিটিআই’র অন্তর্ভূক্ত মানুষদের নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা বা বিশ্বাসের কারণে কোন কোন সমলিঙ্গে আকৃষ্ট ব্যক্তি নিজের প্রতিই খারাপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করতে পারেন, এই ব্যাপারটার আবার আলাদা নামও আছে, যেটাকে ইন্টার্নাল হোমোফোবিয়া বা অন্তর্বর্তী সমকামভীতি বলে চিহ্নিত করা হয়। কারণ যাই হোক সামগ্রিকভাবে হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের বলা হয় হোমোফোবিক।

মজার ব্যাপার হলো হোমফোবিকরা সমকামী সম্প্রদায়ভূক্ত মানুষদের অসুস্থ, প্রকৃতি বিরুদ্ধ বা যৌনবিকৃত মানুষ বলে ভাবেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে এই ধরণের অভিযোগের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, উপরন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একই সাথে ‘হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের, বর্ণবাদী মানুষদের এবং লৈঙ্গিক বৈষম্যকারীদের’ এক ধরণের মনোরোগে, যা কিনা ‘ইনটোলারেবল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’ বলে পরিচিত, সেই সমস্যায় ভুগছে বলে চিহ্নিত করা হয়।

একজন মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই অধিকার আছে ঘৃণা-বিদ্বেষ মুক্ত একটা পরিবেশে বেঁচে থাকার। হোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি বদলে যাবেনা ঠিকই, কিন্তু পরিবর্তনের শুরুটা অন্তত আমরা করতে পারি। আর এই পরিবর্তনটা শুরু হতে পারে পরিবার থেকে। আমাদের কাছের মানুষদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে, যুক্তি-তর্ক বা মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ থেকে।

‘আমরা তো কারও না কারও পরিবারেরই অংশ, আর সম্মিলিতভাবে এই একই সমাজেরই অংশ’। সমকামী, বিষমকামী বা উভকামী যে যাই হই না কেন, বৈশ্বিক আবহ বিবেচনায় নিলে এই শতকে আমরা সকলেই সকলের উন্নয়ন সহযোগী। তাই লৈঙ্গিক পরিচয় যাই হোক না কেন দ্বেষহীন পরিবেশে মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকুক পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, আইডাহোট ২০১৭ তে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.