সমপ্রেম সম্পর্কে যা জানা চাই

সমপ্রেম সম্পর্কে কম-বেশি আমাদের সবার মাঝেই বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যা প্রায়ই বিভিন্ন বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। তাই এই সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন ধারনা পেতে প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে সমপ্রেম কি? সহজ কথায়, সমলিঙ্গের প্রতি অর্থাৎ পুরুষের প্রতি পুরুষের এবং নারীর প্রতি নারীর শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ বোধ করাকেই সমপ্রেম বলে। কেউ কেউ এটাকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ আচরণ বললেও প্রকৃতির প্রায় ১৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মাঝে সমপ্রেম পরিলক্ষিত হয়। এমনকি বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় মানব অস্তিত্বের শুরু থেকেই এর অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাই এটা যদি প্রকৃতি প্রদত্ত না হয়ে কারো মাধ্যমে শেখা একটি অভ্যাস হতো, তাহলে গ্রীক-রোমান, মেক্সিকান, চৈনিক ও জাপানী সভ্যতায় সুনির্দিষ্টভাবে সমপ্রেমমূলক উপাদান থাকতো না। সাহিত্য-সভ্যতার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ সংস্কৃতিতেই সমপ্রেমকে কখনোই সমাজচ্যুত বা সমাজ বহির্ভূত আচরণ হিসেবে দেখা হতো না। বরং সমপ্রেমকে এতটাই স্বাভাবিকভাবে দেখা হতো যে, এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনও কেউ বোধ করেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইব্রাহিমী ধর্মগুলোর আগমনের পর থেকেই এটাকে লজ্জাস্কর ও প্রকৃত বিরুদ্ধ আচরণ হিসেবে দেখা শুরু হয়।

যে বিষয়টা মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারে না তা হলো, সমপ্রেম কোন পছন্দ বা যৌন-প্রাধান্যের বিষয় নয়। এমনকি, এটা কোন ভিন্ন জীবনধারাও নয়। বরং এটা বিসমকামিতা, সর্বকামিতা, উভকামিতা বা কামহীনতার মতোই একটি মনঃদৈহিক বাস্তবতার নাম। মানুষ তার যৌন পরিচয় কিভাবে প্রথম উপলব্ধি করে অথবা যৌনতা তার ভেতর কিভাবে কাজ করে বা প্রভাব বিস্তার করে সেটা নিয়ে যদিও এমন কোন গূঢ় তত্ত্বের আবিষ্কার হয়নি, তথাপি এই কথা সকলেই অকপটে স্বীকার করে যে এটা এমন এক অনুভূতি যার ওপর কারো কোন সচেতন নিয়ন্ত্রণ কাজ করে না। এটা নির্ভর করে আভ্যন্তরীণ জৈবিক স্বত্বা ও বাহ্যিক প্রণোদনার ওপর। তাছাড়াও সমপ্রেমকে রোগ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার চিকিৎসার নামে যে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের প্রথা সমাজে চালু আছে তা নিতান্তই ভিত্তিহীন ও অমূলক। বিসমপ্রেমী মানুষ যেমন সে যা তা-ই, ঠিক তেমনি সমপ্রেমী মানুষটাও।

তাছাড়াও সমপ্রেমীদের যৌন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যেমন- রুপান্তরকামী বা হিজড়া জনগোষ্ঠীদের থেকে পৃথক করতে পারাটাও অত্যাবশ্যক। সমপ্রেমী মানুষেরা এমন নয় যে, তাদের শরীর ও মন তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের প্রতিবন্ধক বা তারা নিজেদেরকে অপর লিঙ্গের মানুষ ভাবতে পছন্দ করে বিধায় সার্জারির মাধ্যমে নিজেদের লিঙ্গ পরিচয় পাল্টে ফেলতে চায়। সমপ্রেমী মানুষেরা কেবল সমাজের গতবাঁধা নিয়মের বিপরীতে গিয়ে সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ বোধ করে। তাছাড়া এটাও মনে রাখা আবশ্যক, সমপ্রেমী সব মানুষ এক রকম নয়। একজন সমপ্রেমী আর একজন বিসমপ্রেমী মানুষের মাঝে পার্থক্য কেবল তার যৌনসত্তায়, ব্যক্তিত্বে বা সামাজিক আচরণে নয়। এটি তাদের মানবসত্তার একটি অংশ মাত্র, সমগ্র মানবসত্তা নয়।   

সমপ্রেমীরা কারা, তাদের কেমন হওয়া উচিত এবং কিভাবে তারা বিসমপ্রেমীদের থেকে ভিন্ন সে ব্যাপারে সাধারণের মনে অনেক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তাছাড়াও আমাদের মত রক্ষণশীল সমাজে সমপ্রেমীদের অবস্থান ও তাদের জীবনের সত্যটাকে সঠিক ও সহানুভূতিশীল পন্থায়   উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রগতিশীল সংস্কৃতি ব্যর্থই হয়েছে বলতে হবে। উল্টো, তথাকথিত সংস্কৃতি সমপ্রেমীদের সম্পর্কে জনগনের মাঝে মিথ্যা ও অমূলক ধারণা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর এই ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টির জন্য জনপ্রিয় গণমাধ্যমগুলো, যেমনঃ সিনেমা, টিভি ও বই-পুস্তক সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। এর ফলে সাধারণ মানুষ ধরেই নিয়েছে যে সমপ্রেমীরা হচ্ছে জরায়ু বিহীন মেয়েলি আচরণকারী কিছু পুরুষ। সদা সত্যবাদী গণমাধ্যমের মতানুসারে সমপ্রেমীরা হচ্ছে লোমহীন সরু  হাতের অধিকারী চকরা-বকরা রঙের শার্ট-প্যান্ট পরা হাত-পা নাচিয়ে কথা বলা কিছু পুরুষ আকারে নারী, যাদের দেখলে অশ্লীল ছবির নায়িকারাও লজ্জায় মাথায় কাপড় দেয়। আমাদের চলচ্চিত্রে সমপ্রেমী চরিত্রগুলোকে রাখাই হয় বিনোদন দেয়ার জন্য, যেখানে তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে বিসমপ্রেমী চরিত্রগুলোর আশে পাশে অপমানজনকভাবে ঘুর-ঘুর করে দর্শককে বিনোদিত করা। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে কিছু কিছু সমপ্রেমী মানুষদের মাঝে কিছুটা মেয়েলিপনা আছে, যেটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনিচ্ছাকৃত বা স্বভাবজাত, যার জন্য তাদের ছোট করে দেখা বা তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা আসলে নিজেরই ছোট মনের পরিচায়ক।       

অনেক সময় পুরুষালী স্বভাবের সমপ্রেমীদের দেখে মানুষ বলে, “কই? আপনাকে দেখে তো গে মনে হয় না!” সত্যি বলতে কী, মানুষ ভুলেই যায় যে একজন সাধারন সমপ্রেমী পুরুষ একজন সাধারন পুরুষের মতোই। সমপ্রেমী মানুষ মানে এই নয় যে, সে খেলাধূলা অপছন্দ করবে, অনেক ফ্যাশন সচেতন হবে বা কোমড় দুলিয়ে রাস্তায় হাঁটবে। তারা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই সাধারণ চিন্তাধারার মানুষ। পরিশেষে, বিসমপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলতে চাই। আপনাদের  অনেকেই মনে করেন যে সমপ্রেমীরা আপনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ওঁত পেতে আছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সমপ্রেমী বা বিসমপ্রেমী, মানুষ মাত্রই সুন্দরের পুজারী। তাই বিপরীত লিঙ্গের কেউ যদি আপনার প্রতি আকৃষ্ট না হয়, ধরে নেবেন সমপ্রেমীরাও আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে না। আসলে মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতাই আপনার মাঝে নেই।      

Photography by Living Large in Little Boxes

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.