শুভ্র

আমি শুভ্র। ফ্রম বাংলাদেশ। অনেকদিন পরে লিখতে বসেছি। আজকাল বড় করে কিছু লেখার কথা ভাবলে আঁতকে উঠি। ভেবেই পাইনা এক সময় কিভাবে এত পাতার পর পাতা লিখে গেছি। অনেকটা নেশার মত হয়ে গেছিলো। বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ফেসবুককে মহাস্থান মনে করে নিয়েছিলাম। আসলেই কি তাই? আমি বাস্তব জগৎ থেকে দূরে সরে ঘরের কপাট বন্ধ করে ফেসবুকে পড়ে থাকিনি। বরঞ্চ ফেসবুকের কল্যাণে কাইন্ড অভ সব্যসাচী হয়ে উঠতে পেরেছি। মাথা একই সংগে একাধিক প্লাটফর্মে ভাবতে উপযোগী হয়ে উঠেছে। আর এ জন্যে আমি ফেসবুকের কাছে কৃতজ্ঞ। নিজেকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে বসেছি। কিন্তু কি বলবো বুঝতে পারছি না। সত্য স্বীকারের মত সৎ সাহস আমার নেই। আমি সত্য স্বীকারকে জীবনের মূখ্য মনে করি না। আমি নিজেকে প্রায়োরিটি দেই। প্রায়োরিটি দেই আমিত্বকে। তবে এই আমিত্বই আমার জীবনের সব নয়। আমি, আমি পরিবার, আত্মীয় স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু সহৃদ এদের সবাইকে নিয়েই আমি বিকশিত হতে চাই। একলা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত বাঁচতে চাই না। যারা একলা বাঁচতে চায় তাদের বাঁচাটাকে আমি ছোট করে দেখি না। কিন্তু এ আমার নিজস্ব ফিলোসফি। আমার জীবনের মূলমন্ত্র। আমি এভাবেই বাঁচতে চাই।

কি লিখি কি লিখি এটা ভেবে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিলাম। আজ অফিসে একদম কাজ নেই। ভাবলাম কিছু লিখি। অফিসে বসে নির্দ্বিধায় লেখা যায়। সহকর্মীরা আড় চোখে দেখে গেলেও ভয় নেই। পড়তে পারবেনা কেউ। ফেসবুক কেন্দ্রিক জীবনের কথা লেখাই যাক। যারা দীর্ঘ লেখা পড়তে বিরক্ত হও।

আমি শুভ্র। জন্ম বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলায়। বাবা সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় শৈশব থেকেই আমি সাতক্ষীরার বাইরে। তবে সাতক্ষীরার সংগে আমাদের বাৎসরিক যোগাযোগটা এখনো আছে। লেখাপড়ার পুরোটা সময় কেটেছে আমার খুলনায়। প্রথমে খুলনা জিলা স্কুল, পরে পাবলিক কলেজ। মেডিকেলে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিলো আমার। বাবা মায়ের ইচ্ছেটাই আমার ইচ্ছে হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু নিজের মধ্যেই ইচ্ছেটাকে ফিল করতাম। কিন্তু দুই বারের চেষ্টায়ও যখন হলো না। জীবন গেলো ঘুরে। চান্স পেয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়নে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কুয়েটের আইইএমে। কোথায় ভর্তি হবো সে এক মহাদুশ্চিন্তা। পরিবার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আমিও পারি না। সাব্জেক্ট গুলা নিয়ে আমাদেরই শুধু কেন আমাদের পারিপার্শ্বিকদের স্পষ্ট ধারণা ছিলো না। শেষমেষ আইইএম বেছে নিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে সবাই বুঝতো ট্রিপল ই, কম্পিউটার সাইন্স। ট্রিপল ই কে অনেকেই উচ্চারণ করে ট্রিপলি। শুনেছ কখনো? হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার। হয়ে বের হলাম ইঞ্জিনিয়ার।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রথম আনস্মার্ট ফোনের মালিক হই। ফেসবুকে একাউন্ট খুলি ২০০৬ এর শেষের দিকে। ফেক আইডির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি ২০০৮/০৯ এর দিকে। কারণ তখন আমি রঙধনু জগতের মানুষের মধ্যে চলে এসেছি। নিজের ভেতরের সত্ত্বাটাকে ফিল করতে শুরু করেছি। সম্মান করছি নিজের ফিলিংসকে। তখন ফেসবুক ভরা এত সেলেব্রিটি ছিলো না। ফ্রেন্ডলিস্টে ৩০০ ফ্রেন্ড থাকলে মনে হতো ফেসবুক অনেক ভারী হয়ে গেছে। এবার ময়ল আবর্জনা সাফ করে দেওয়া উচিত।

আমি এসেছি ছোট এক শহর হতে। আমার স্ট্যাটাসে এত এত মানুষের কমেন্টস লাইক অন্যরকম এক ভালো লাগা তৈরী করে। অল্প দিনে আমি টাইমলাইন গরম রাখার টোটকা শিখে গেলাম। সেটা প্রয়োগ করতাম। কতদিনে অনু পম নামটা পরিচিত হয়ে গেলো তা নিজেই টের পাইনি। নিজের একটা বৃত্ত তৈরী হলো। তবে খুলনায় অনুপম রয় নামে একজন ছেলে ছিলো বা আছে। তার কর্ম-অপকর্মের দায় আমার নামের সংগে যুক্ত হতো বলে ২০১২ সালে শুভ্র মোহাম্মাদ হয়ে গেলাম। কিন্তু এত বছর পরেও অনুপম রায়ের সঙ্গে আমাকে অনেকেই মিলিয়ে ফেলে। আমি অবাক না হয়ে পারিনা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ এত শার্প কিন্তু বিরক্তিকর মেমরির অধিকারী হয় কেন। আমি ফেসবুক বন্ধুদের শুনিয়েছি গ্রামীন জীবনের গল্প। যে জীবনের প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিলাম না আমি কিন্ত আমার অন্তরে সুপ্ত হয়ে ছিলো সেই গ্রাম। অনু আড্ডা দিয়ে ফেসবুকে প্রথম রেগুলার কানেক্টেড হয়ে গেলাম। তখন আমি জব শুরু করেছি। নারায়নগঞ্জে চলে এসেছি। বইয়ে পড়া ইশা খাঁর রাজধানীতে। বুয়েটে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হয়েছি। চট্টগ্রাম নিবাসী এক রাজকুমার প্রেমের প্রস্তাব দিলো। কিন্তু জীবন এক মহা উপন্যাস। পূর্বের কিছু অভিজ্ঞতার কারনে আমি প্রেম ভালোবাসায় আস্থা হারিয়েছিলাম। মনে হতো প্রেম ভালোবাসা সব মিথ্যা। তখন লিখছি লাইফ উইদাউট লাভ নামে এক ধারাবাহিক ফেসবুকিয় উপন্যাস। সে সময়কার বন্ধুদের প্রশ্ন ছিলো এটা কি আমার জীবনের গল্প। তখন আমি উত্তর দেইনি। আজ দেয়া যায়। না এটা আমার জীবনের গল্প নয়। আবার জীবনের বাইরের গল্পও নয়। জীবনের পথে কিছু ঘটে আসা গল্পকে স্থান দিয়েছি এক গ্রামীন প্রেক্ষাপটে। পাবলিক কলেজে পড়ার সময় খুলনার এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম বেড়াতে। সেই বন্ধুর গ্রাম, তার ফুফু, তার বাবা মাকে চিত্রায়িত করেছি। আর ছিলো তার ছোট ভাই যাকে শুভ্র নামে বর্ণনা করেছি। গল্পে আমার চরিত্র ছিলো দ্বীপ্তর। কিন্তু চরিত্রটিকে আমি নেগেটিভলি প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম বলে শুভ্র নাম দিয়েছিলাম বন্ধুর ভাইয়ের চরিত্রটিকে। আমি তার হয়ে দেখতে চেয়েছিলাম যে শহর থেকে আসা একটা ছেলেকে কিভাবে ভালোবাসা যায়। আসল গল্প শুধু সেক্স সর্বস্ব। ভালোবাসাকে সে এভাবে বুঝে তা আমার কখনো মনে হয়নি। অল্প বয়সে বিয়ে করেছে। কিংবা বিয়ে দিয়েছে গার্জিয়ানরা। আমি আর খবর রাখার প্রয়োজন মনে করিনি। সেক্স সর্বস্ব মানুষকে আমার কাছে কখনো পূর্ণ মানুষ মনে হয় না। সেক্স জীবনের প্রধান একটি অঙ্গ কিন্তু জীবনের সব নয়। এই গল্পটাই আমাকে ফেসবুকে ব্যপক পরিচিতি দেয়। অনেক নতুন বন্ধু এনে দেয়। ভাই বেরাদরে ভরে যায় ফেসবুক। কোলকাতার এক সাময়িকি কিংবা ম্যাগাজিনে গল্পটি ছাপা হয়। কিছুটা সেলেব্রিটি টাইপ পরিচিতি আসে ফেসবুকে। তখন আমার অনেক ব্যস্ততা। চট্টগ্রামনিবাসী রাজকুমারের সংগে হালকা প্রেমভাব এসেছে। বুয়েটে মাস্টার্স এক্সাম। ফেসবুকে গল্পলেখা। বিসিএসের প্রিলিতে টিকে রিটেনের পড়া। এরপর চাকরি। জব ছেড়ে দেওয়া যেতো । কিন্তু দেইনি। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। নিজের বাবা বলে বলছি না। এটা আমার অনেক বড় একটা গর্বের জায়গা। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমার বাবা কখনো ঘুষ খাননি। আমি নিজে অনেক ঘটনার স্বাক্ষী। আর আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে মা। আমাদের মা।

গল্প সংক্ষেপ করি। ২০১৪ সালে বাড়ি থেকে বিয়ের কথা ওঠে। গোটাকয়েক মেয়েও দেখা হয়ে গেছে। সারাদিন রঙধনু টপিকস নিয়ে লিখতে লিখতে নিজের উপর আস্থা হারিয়েছিলাম। ভয় পেতাম। বিয়ে করতে ভয়। ভয় পাওয়া উচিত। তবে ভয়ের কাছে হেরে যাওয়া উচিত নয়। কি করবো ভেবে পেতাম না। কিশোর চাকমার সংগে কুমিল্লা বেড়াতে গিয়ে ইমুর সংগে দেখা হয়। ইমুর সংগে ফেসবুকে পরিচয় ছিলো। আমার এই সুদীর্ঘ জীবনে আমি অল্প কিছু লেখার সঙ্গে দেখা করেছি। তবে এক কি দুজন বাদে কোন ভুল লোকের সাথে দেখা হয়নি। ইমু খুব ভালো ছেলে। ডাক্তারি পড়ছে। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে ইমুর সংগে ভয়টা শেয়ার করলাম। পরামর্শ চাইলাম। তবে ইমু ডাক্তারিবিদ্যার ছাত্র মাত্র। সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবে সে আশা করিনি। আমি শুধু আলোর রেখা দেখতে চেয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য ইমু সে টেক্সটের জবাব দেয় নি।

একটি মেয়ের সাথে বিয়ের কথা পাকা হয়ে ছিলো। মাসছয়েকের কথাবার্তা চললো দুজনের মধ্যে। বিয়ের দিন পড়বে এমন সময়ে আমি বেঁকে বসলাম। শুধু ভয়টাই মূখ্য ছিলো না। মেয়েটির কন্ট্রোলিং মনোভাব দায়ী ছিলো। আম্মার সংগে মনস্ত্বাত্ত্বিক দ্বন্দ বাড়তে লাগলো। আত্মীয়দের অনেকে আমাকে বিদেশে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলো। সেই সময়ে আমার মাথায় বিদেশের ভুত চাপে। আমার জীবনের এই অধ্যায়গুলি ফেসবুক বন্ধুদের অজানা। জানার মত তেমন কিছু নয়। বললাম না আমার পারিপার্শ্বিকতাকে নিয়েই আমার জীবন। আমি বিদেশে পালিয়ে গেলে বাবা মা হেরে যাবে সমাজের কাছে। আমি হেরে যাবো জীবনের কাছে। হেরে যেতে আমি পারি না। বিয়েটা শেষ পর্যন্ত করেই ফেললাম পরিবারের সিদ্ধান্তে মনের মধ্যে ভয় পুষে।

ভয়টাই আমাকে খেলো। বাসর রাতে ফেল মারলাম। একজন পুরুষের জন্যে এ কি লজ্জার তা যারা ফেস করে তারাই জানে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো পৃথিবী থেকে। পালিয়েই গেলাম। রাজকুমারের কাছে। চট্টগ্রামে। তখন আমি দ্বৈতসত্তার দ্বন্দে ভুগছি। তারপর কিশোর চাকমার ওখানে পাহাড়ে এক রাত থাকলাম। সে সারাদিন অফিসে থাকায় অনেক সময় ছিলো ভাবনার। অনেক ভাবলাম। ওরা কেউই বোঝেনি কি ঝড় চলছে আমার মধ্যে। ভাব দেখাচ্ছি বেড়াতে এসেছি। ভেবে পেলাম একা বাঁচার জীবন নয়। মোটাদাগে রঙধনু মানব হয়ে বেঁচে থাকার জীবন নয় আমার। নেমে এলাম পাহাড় থেকে সমতলে। ফিরে গেলাম দৈনন্দিন জীবনে। ডাক্তার খুজলাম। ইসলামী হসপিটালের একজন ডাক্তার সঠিক কাজটিই করেছিলেন। তিনি আমাকে একগাদা পরীক্ষা দিয়ে বললেন টেস্ট গুলোরতে পজেটিভ রেজাল্ট এলে সব ঠিক আছে। কোন সমস্যা নেই। আল্লাহর রহমতে সব রেজাল্ট ওকে এলো। আমি মনোবল ফিরে পেয়েছিলাম।

এটা অতি পারসোনাল গল্প। কিন্তু এজন্যে শেয়ার করলাম যদি কাউকে জীবন নিয়ে পজেটিভলি ভাবতে শেখায়। এ সময়ে ফেসবুক লাইফে একটা ঝড় ওঠে। টাইমলাইনে সিলেটের এক প্রচন্ড মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু ছিলো। ঈদ এলে তার নোংড়ামি মাত্রা ছাড়াতো। এক ঈদে সে নোংড়া পোস্ট দিতে শুরু করলে আমি জাস্ট পাঠাবলি, গাধিমাই, নরবলি ইত্যাদির একগাদা ছবি পোস্ট করে দিলাম ফেসবুকে। এমন না যে আমি হিন্দু ধর্মের নামে গালিগালাজ করলাম, কুৎসা গাইলাম। এর আগে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মে সমকামিতা নামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম যেখানে দুজন দেবতার মধ্যকার সম্পর্কের উল্লেখ করেছিলাম ওদেরই ধর্মের কিছু পুরাণের স্মৃতি ধরে। কোন কালে বেদ গীতা না পড়া অনেকেরই ধর্মবোধ খুব জাগ্রত হয়ে গেলো। ধর্ম রক্ষায় সব ফেসবুকিয় রঙধনু হিন্দুদের লাফিয়ে পড়া দেখেছি। সাম্প্রদায়িক বোধ দেখেছি। মূর্খতা দেখেছি। এরা কেউই কিন্তু একবার ভেবে দেখার অবকাশ পায়নি যে হিন্দু ধর্ম নিয়ে ঠিক আমি কি কি পোস্ট করেছি। শোনা কথায় লাফিয়ে লাফিয়ে এসেছে ইনবক্সে। আমার অবশ্য এ শিক্ষাটার দরকার ছিলো। আমি মানুষ চিনেছি। আরেকবার মানুষ চিনেছি নরসিংদী বাসী এক ভন্ড মিথ্যুকের মিথ্যাচারে। ক্ষমা মহৎ গুন। ক্ষমা তাকে করা যায়। কিন্তু আমি যদি তাকে ক্ষমা করি তবে নিজেকেই ক্ষমা করতে পারবো না। অন্যদের বিশ্বাস অবিশ্বাসে যাই থাকুক আমিতো প্রকৃত ব্যাপারটা জানি। যতদিন বেঁচে থাকি ঘৃণা করে যাবো সেই ঘৃণিত ভন্ডকে। এ শিক্ষাটার দরকার ছিলো আমার। ফেসবুকিয় সম্পর্ক, ফেসবুকিয় বন্ধুত্ব আর বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের পার্থক্য আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

ফেসবুকে এরকম সংঘাত এলে অনেকেই হয় ফেসবুক ছেড়ে পালায় অথবা নতুন আইডি খোলে। আমি এ দুটোর কোনটি করিনি। হার না মানা প্রবৃত্তিটাই আমাকে জিতিয়ে দিয়েছে অনেক বার। পালাতে হয় নি জীবন থেকে। ভয় আমি পাই। তবে সরাতে পারি আর না পারি চোখ বুজে দেয়ালে ঘাড় ঠেকিয়ে দুই ধাক্কা মেরে তবে হাল ছাড়ি। ইউনিলিভারে জবের সময়ে অনেক মজার গল্প ছিলো বলার মত। কিন্তু বলা হয়নি। তখন আমি ফেসবুক থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। বিদেশ যাওয়ার টেন্ডেন্সি থেকে অনেক গুলো ফরনে জবে এপ্লাই করেছিলাম। আইইএল্টিএস পয়েন্ট থাকায় স্কলারশিপেরও আবেদন করেছিলাম কিছু। এর দুটি একত্রে এসে যায়। কি এক অদ্ভুত সুত্র। কাজাখস্থানের এক তেল গ্যাস কোম্পানী থেকে ভাইভার ডাক পেলাম দিল্লীতে। চলেও গেলাম। প্রথম বিমান ভ্রমণ। খুব নার্ভাস ছিলাম। নার্ভাস ছিলাম ভাইভাতেও। ভেবেছিলাম নেবে না। কিন্তু ঠিকই নিয়ে নিলো। দক্ষিণ ভারতের ভাস্করমের সংগে ভাইভা দিনে পরিচয় হয়। কাজাকিস্তানে আসার পরে খুব ভালো বন্ধু হয়ে যাই আমরা। এর আগে অবশ্য আমাদের কয়েক মাসের ট্রেনিংয়ে প্যারিসে পাঠানো হয়। সরবণে হাফ স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ এদের। থাকা খাওয়ার খরচ আমাকে যোগাতে হবে। আমি ভিতু স্বভাবের ছেলে। সাহস করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স সেরে কাজাখস্থানে চলে আসি। এক বরফে মোড়া দেশ। এদেশে আশার আগে আমি নিজেও কাজাকস্থান সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। বরফ পড়ার দৃশ্য দেখার সব ফ্যান্টাসি গেলো ঘুঁচে। সারাদিন মুরগির মত ঘাপটি মেরে থাকতে হয় ঘরের মধ্যে। সে অফিস ঘর হোক কি থাকার ঘর। সত্যি বলতে কি বউ ভেবেছিলাম তাকে ফেলেই আমি পালিয়ে গেছি। কিন্তু ভুল ভাঙাতে সময় নেইনি বেশী। না আমি ফিরে আসিনি। তাকেই নিয়ে এসেছি। তাকে এত দ্রুত আনার জন্য কি পরিমাণ কাঠ খড় এই বরফের দেশে পোড়াতে হয়েছে তা একমাত্র আমি জানি। আমাদের বাঙালিদের অনেকেই বিদেশে থাকে। কিন্তু এরা নিজের জীবনটা কাটায় না। শুধু পয়সা পয়সা করে। যার মাসশেষে হাজার পঞ্চাশের কি লাখ খানেক টাকা থেকে যায় সেও করে। খুবই বাজে মানসিকতা। বয়স চলে যায়। জীবনকে উপভোগ করা উচিত। বৈধ এবং সামাজিক উপায়ে। শ্বশুরের মেয়ে সাহস করে প্লেনে উঠে বসে অবশেষে।

তারপর কেটে গেলো অনেক গুলো মাস। কাজাখের আকাশে সূর্য উঠলো, গলে এলো ইশিম নদীর বুকে জমে থাকা বরফের চাই। একদিন গিয়ে গোছল করে এলাম কয়েকজন মিলে। তারপর আবার বরফের মৌসুম এলো। স্কি করতে গিয়ে বরফে ভিজে ঠান্ডা লাগিয়ে খকর খক করলাম দেড় সপ্তাহ। আমাদের জীবনে এলো নতুন অতিথি। অভ্র। ডিসেম্বরে প্রথমবার তার দাদুবাড়ি ঘুরে এলো। স্ত্রীকে নিয়ে অনেক স্ট্যাটাস দেই কিন্তু ছেলেকে নিয়ে কেন দেই না। কারণ ছেলে হওয়ার খবর স্ট্যাটাসে জানানোর পরে অনেক খুশী যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি কিছু অসুস্থ মানসিকতার ব্যবহার। তারাই যেন সংখ্যাগরিষ্ঠ চারিপাশে। তাতে কি যায় আসে। আমাদের এরই মধ্যে সাঁতার কেঁটে সামনের পানে এগিয়ে যেতে হবে। বন্ধুরা কখনো জীবনের কাছে হেরে যেওনা। যদি মনে হয় হেরে যাচ্ছো। কষে লাথি মারো জীবনের পাছায়। দেখবে আবার সে ছুটতে শুরু করেছে নবউদ্যোমে। এইতো জীবন। বর্ণীল এবং বৈচিত্র্যময়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.