পুঁই ফল

লেখকঃ শুনি

শর্মি এসে ওর মাকে বলল , মা আজ তো হোলি! রঙ খেলার দিন , আপা আর আমি মিলে কি একটু বাইরে যাবো?
রাফিজা , শর্মির মা , চায়ের কাপগুলি মুছে র‍্যাকে ঝুলিয়ে রাখছিলেন। তার কাজের মধ্যে ব্যস্ত ভাব। সব কাজ রাফিজাকেই সামলাতে হয়। কাজের মেয়েটা বাড়ি যাবার নাম করে ভেগেছে। কাজের মেয়েদের এই এক বড় সমস্যা, এক বাসায় বেশী দিন মন টেকে না। আর শর্মি ঊর্মিদের বাসায় তো কাজের মেয়ে টেকেই না! কি করে টিকবে এই বাসায় সব কড়া কড়া নিয়ম। রোম্যান্টিক প্যানপ্যানি টাইপ সিনেমা নাটক দেখা এই বাসায় নিষিদ্ধ। আরও কত নিয়ম কানুন! ঊর্মি শর্মির বড় বোন , বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে , সেকেন্ড ইয়ার। শর্মি আজিমপুর গার্লসে ক্লাস নাইনে পড়ছে।
আজিমপুর কলোনিতেই ওরা থাকে , দক্ষিন দিকের একটা দোতালা বাড়িতে প্রায় বারো বছর ধরে ওরা থাকছে। রহমান সাহেব , শর্মির বাবা; একটা সরকারী চাকুরী করেন। বেশি কড়া এবং তিরিক্ষি মেজাজের মানুষ। মেয়ে দুটি তার কলিজার টুকরা,কিন্তু এমন ভাব দেখাবেন যেন তিনি ভালোবাসা বলতে কিছুই জানেন না!

রাফিজা কাপ গুলি মুছতে মুছতে বললেন , যা বললি তা ভেবে বলেছিস তো।
শর্মি বলল , হ্যা ভেবে বলেছি! আপা আর আমি মিলে ভেবে ঠিক করলাম!
দরজার পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ঊর্মি বলল , আমার কথা বলছিস কেন? তোর মাথা থেকেই তো বুদ্ধিটা বের হল!
ঊর্মি বয়সে বড় হলেও , তার সব কিছুতে ভয় বেশি। শর্মি খুব সাহসি আর জেদি মেয়ে।
রাফিজা গলা ভার করে বলেন , শর্মি তোকে না কত বার বলেছি, নিজের ইচ্ছা গুলি অন্যের ঘাড়ে চাপাবি না!
সরি মা , এই বলে শর্মি তার মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।
রাফিজা রাগ স্বরে বললেন , আমাকে বলে কোন দিন কিছু পেয়েছিস! আমি অনুমতি দেয়ার কে? আমি তো এই সংসারের কেও না! তোর বাবাকে গিয়ে বল গে।
ঊর্মি এসে তার মায়ের পাশে দাঁড়ালো। তার মাকে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
রাফিজা জিগ্যেস করলেন, তোর আবার কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন?
ঊর্মি চোখ মুছতে মুছতে বলল , আসলে মা পুরো প্ল্যানটা আমার! আমি একটা ভীতুর ডিম! তাই শর্মি কে তোমার কাছে পাঠিয়েছিলাম।
রাফিজা ঊর্মি কে সরিয়ে দিয়ে বললেন, আমি তোকে বারবার বলেছি মিথ্যা বলবি না , আর ছিঁচকাঁদুনী কাঁদবি না! আবার বলছি এই অভ্যাসগুলি চেইঞ্জ কর!
শর্মি বলল , আহ! মা , আপাকে বকো না তো! তার চেয়ে তুমি বল , সকালে চা দেয়ার সময় বাবার মেজাজ কেমন দেখলে?
রাফিজা বললেন , ওনার মেজাজের কোন ঠিক নেই , এই মেঘ এই রৌদ্র!
এখানে সময় নষ্ট না করে! যা বলার তাকে গিয়ে বল।
শর্মি ঊর্মি কে উদ্দেশ্য করে বলল , অনেক হয়েছে এবার ঘ্যান ঘ্যান কান্না থামাতো! চল বাবার কাছে যাই, সাহস করে বলে দেখি। সাহস ছাড়া জগতে কিছুই হয় না।
শর্মি আগে আগে চলল তার পিছনে ঊর্মি।
রহমান সাহেব বারান্দায় বসে পেপার পড়ছেন। পুরো বারান্দা জুড়ে আমের মুকুলের ভ্যাঁপসা গন্ধ। শর্মিদের বাসার সামনে প্রকাণ্ড দুই আম গাছ। রহমান সাহেব পেপারের সম্পাদকীয় অংশ পড়ছেন , তার চোখে মুখে আমের মুকুলের ভ্যাঁপসা গন্ধের বিরক্তি।
শর্মি এসে রহমান সাহেবের পাশে দাঁড়ালো আর ঊর্মি দরজার কাছে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলো। রহমান সাহেব শর্মি কে না দেখার ভান করে এক নাগালে পেপার পড়তে লাগলেন।
শর্মি কোমল গলায় বলল , বাবা , তোমার সাথে কিছু কথা বলতে পারি?
রহমান সাহেব বললেন , হুম পারো! যা বলার কোন রকম ভনিতা ছাড়া বলে ফেলো!
আর ঊর্মিকে বল পর্দার আড়াল থেকে এখানে এসে দাঁড়াতে। বাবার সামনে মেয়ে দাঁড়াবে তাতে পর্দার কোন দরকার নেই!
পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ঊর্মি শর্মির পিছনে দাঁড়ালো।
রহমান সাহেব বললেন, এবার বলো , কি চাই?
শর্মি বলল , ইয়ে…মানে বাবা , আজকে তো হোলি।
রহমান সাহেব বললেন, হুম, তো কি?
শর্মি বলল , আমাদের কলোনিতে রঙ খেলা হচ্ছে। আমি আর আপা কি কিছুক্ষণের জন্য যেতে পারি।
রহমান সাহেব পেপার টা হাত থেকে টেবিলে রেখে মেয়েদের মুখের দিকে তাকালেন। রাগে তার শরীর থেকে আগুন বের হচ্ছে।
তিনি বললেন , এই মুহূর্তে আমার সামনে থেকে দূর হও! তোমাদের সাহস দেখে আমি তাজ্জব হয়ে গেছি। দুটি সোমত্ত মেয়ে কে রঙ খেলতে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে আমি নিশ্চিন্তে বসে পত্রিকা পড়বো! ভাবলে কি করে এ কথা।
শর্মি মুখ ভার করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। পিছনে ঊর্মি খুব কষ্ট করে কান্না আটকিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে!
রহমান সাহেব আবার পেপার পড়তে লাগলেন।
একটু পরে ওরা দুজনে বারান্দা ছেঁড়ে চলে গেল, বারান্দা ছেঁড়ে আসার পর থেকেই ঊর্মি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। শর্মি বলল , আপা আবার শুরু করেছিস!
রাফিজা ফ্রিজ থেকে ডিম বের করছিলেন, মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি হল তো !
রাফিজা ডিম নিয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলেন। ওরা দুজন মায়ের পিছনে পিছনে চলতে লাগলো। রাফিজা ধমকের সুরে বললেন , কান্না নিয়ে আর মুখ ভার করে একদম আমার কাছে আসবি না! আমি এসব দেখতে পারি না!

ধমক খেয়ে ঊর্মির কান্না আরও বেড়ে গেল। সে কেঁদে কেঁদে বলছে , সব আমার জন্য হল রে…… ভেবছিলাম রঙ মেখে ফেসবুকে একটা ছবি আপলোড করবো!
শর্মি কপাল কুচকে বলল , ধুর আপা! তোর এই ভ্যা ভ্যা কান্না ভালো লাগছে না! প্লীজ বন্ধ কর!

বাইরে উচ্চ স্বরে গান বাজছে। কখনো হিন্দি গান কখনো বাংলা! চেঁচামেচিও শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে ওদের বাসার সামনে থেকে একদল ছেলে মেয়ে চলে গেল হৈ হুল্লোড় করতে করতে! রহমান সাহেব সেদিকে বিরক্তি নিয়ে তাকালেন। পেপার টা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। রাফিজা, রাফিজা আমার পাঞ্জাবীটা দাও তো এই বলে তিনি ঘরের দিকে এগুলেন।
শর্মি ঊর্মি তাদের ঘরে বসে জানাল দিয়ে তাকিয়ে আছে। ঊর্মির চোখ লাল হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। শর্মি মুখ ভার করে বাইরে তাকিয়ে আছে।
শর্মি বলে উঠলো , এই আপা চল ছাদে যাই। ছাদে গিয়ে রঙ খেলা ভাল দেখা যাবে।
কাও কে কিছু না বলে ওরা ছাদে চলে গেল।

রহমান সাহেব পাঞ্জাবী পড়তে পড়তে জিগ্যেস করলেন, তোমার মেয়েরা কোথায়?
রাফিজা বললেন, জানি না!
রহমান সাহেব বললেন, তাদের বলে দিও , এসব অন্যায় আবদার করলে আমার মেজাজ ঠিক থাকেনা! ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের আবদার নিয়ে না আসে!
রফিজা বললেন , হুম তা না হয় বললাম, কিন্তু তুমি এখন কোথায় যাচ্ছ ?
রহমান সাহেব বললেন, জানি না!
এই বলে তিনি ঘর ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন।

দোতলা বাসার ছাদ। ছাদের এক কোনে টবে একটা পেয়ারা গাছ লাগানো, তার পাশেই কবুতরের ঘর। রহমান সাহেব শখ করে কবুতর পোষেন। কবুতরের ঘরের চালের উপর একটা পুঁইডাটা লতানো। গাঢ় সবুজ পাতা , ডাটার রঙ কালচে ম্যাজেন্টা।
ছোট ছোট কালো ফলে ভরে গেছে লতাটা।

শর্মি ঊর্মি ছাদে চলে এল। শর্মির পায়ে কবুতরের বিষ্ঠা লেগেছে, এটা দেখে ঊর্মি ফিক করে হেসে দিল। শর্মি খুড়িয়ে খুড়িয়ে পেয়ারা গাছের দিকে এগিয়ে একটা পাতা ছিড়ে পা টা মুছে নিল। ঊর্মি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। দূরে কোথাও বাজছে হোলির গান।
শর্মির চীৎকারে ঊর্মি ফিরে তাকালো , শর্মির হাতে অনেক গুলি পুঁই ফল।
শর্মি চীৎকার করে বলছে , দেখ আপা কি টুক টুকে লাল রঙ! ফল গুলি পেকে গেছে।
ভিতরটা লাল রঙে ভরা।
ঊর্মি কাছে এসে বলল, কই দেখি দেখি।
ঊর্মি কিছু ফল হাতে নিয়ে চাপ দিয়ে ভেঙে শর্মির গালে লাগিয়ে দিল। শর্মির ফর্সা গাল বেয়ে পুঁই ফলের রঙ ঝরছে। ঊর্মি নিজেও কিছু রঙ নিজের গালে লাগিয়ে দিল।
শর্মির হাত ধরে ঢুলতে ঢুলতে ছিঁচকাঁদুনে মেয়েটা গাইতে লাগলো , রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও , যাও গো এবার যাবার আগে……… কি মিহি সুর গলায়। ওর কান্না যেমন সুরেলা গানের গলাও তেমনি সুরেলা।

সিঁড়ি ঘরে পায়ের শব্দে ওরা গান থামিয়ে দিল। রহমান সাহেব এসে দাঁড়ালেন। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ। তিনি ঘামছেন।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন , এই যে মেয়েরা, এই নাও! এই ব্যাগে তিন রকমের রঙ আছে, ইচ্ছে মত মাখো। চোখ মুখ সাবধানে রেখ।
ঊর্মি পুই ফল গুলি ছুড়ে ফেলে দিয়ে দৌড়ে এসে ব্যাগটা নিয়ে নিল। শর্মি তার বাবকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। এটা মোটেই ছিচকান্না নয়!
রহমান সাহেব বললেন , যা মা , রঙ খেল!
ঊর্মি এসে রহমান সাহেবের কপালে লাল আবির মেখে দিল।
রহমান সাহেব বললেন, আমাকে কিছু রঙ দে তোর মাকে মাখিয়ে এখানে নিয়ে আসি তার পর সবাই মিলে মজা করা যাবে।
আর কি গান গাইছিলি তোরা , আবার একটু গেয়ে শোনা ।
শর্মি ঊর্মি গলা ছেড়ে গাইতে লাগলো , রাঙিয়ে দিয়ে যাও ………………
রহমান সাহেব মেয়েদের হাত ধরে গোল হয়ে দুলতে লাগলেন! পুই ফল গুলি ওদের পায়ে লেগে ফেটে লাল রঙে লেপটে দিয়েছে ছাদের মেঝে……
সিঁড়ি ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে রাফিজা বলল , সবাই স্বার্থপর ! আমাকে রেখেই রঙ খেলা শুরু করে দিলে………

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.