আরেকটি বসন্ত যাপন

লেখক: সজল আহসান

১।
রাত ১১টা ২০, আকাশে উদিওমান আধ জোছস্না চারিদিক মৃদু আলোয় আচ্ছাদন করে রাতের প্রকৃতিকে
দিয়েছে মনোরমা আবেশ।টিকটিক করে এগিয়ে যাচ্ছে বিরামহীন সময়ের স্রোত।রাতের প্রথম প্রহর হয়তো
একটু পরেই মোড় নিবে মধ্যরাতের দিকে। এদিকে বয়ে যাওয়া এ সময়ের প্রতি বড়ই বেখেয়াল শাহেদ। ঘড়ির কাঁটা যে কিছুক্ষণ পরেই ১১টার কাঁটা ডিঙ্গিয়ে ১২টায় পদার্পণ করতে যাচ্ছে সেদিকে যেন তার নজরই নেই।
থাকবেই বা কি করে, সে যে রাকিবের সাথে খেলায় মেতে উঠেছে। তার পরিপূর্ণ মনোযোগ খেলায় নিহিত। তৃপ্তি না পাওয়া পর্যন্ত সে ছাড়বে না এ খেলা। রাকিবও তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে ৫২ তাসের খেলায়। তবে শুধু তাস নয় মাঝে মধ্যে তারা দু’একটা টানও দিচ্ছে সিগারেটে।
ওদিকে হাতঘড়িরটায় চোখের দৃষ্টি অবরুদ্ধ করে অপেক্ষমাণ অস্থির সময় অতিবাহিত করছে সজল। তার এই
অপেক্ষা প্রিয় মানুষকে সাথে নিয়ে এক কাঙ্খিত মূহুর্তকে বরণ করার জন্য। তাই তার মনের মাঝে এক আপেক্ষিক সুখানুভূতি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে কিছু সংশয় সজলের ভাবনাকে আসক্ত করছে বারবার। সে কি আদৌ এ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রিয় মানুষটাকে পাশে পাবে? পাছে তার সব আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
সে আর ভাবতে পাচ্ছেনা। শীতের রাতেও তার কপালজুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সে সারা
ঘরময় পায়চারি করছে আর তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে আয়োজনে কোন ত্রুটি হয়েছে কিনা। ঘরের চারিদিকে নিভু নিভু আলোয় জ্বলছে সারি সারি মোমবাতি, রঙ বেরঙের বেলুন দুলছে শির শির হিমেল
বাতাসে। মোহিত করা এক মিষ্টি সুবাস নিঃশোষিত হচ্ছে ঘরের চারকোণ থেকে। সেন্টার টেবিলের মাঝখানটা দখল করে আছে একটি সুন্দর কেক।কেকের উপরে *First Anniversary with New Year* লেখাটি উদ্ভাসিত হয়ে আছে।
শাহেদ আর সজলের সম্পর্কের এক বছর পূর্ণ এবং সাথে নতুন বছরের আগমনী বার্তার সন্ধি হবে আর কয়েক মিনিট বাদে। এই নিমিত্তে সম্পর্কের প্রথম বর্ষপূর্তিকে আরো একটু বৈচিত্র্যময় পূর্ণতা দেয়ার প্রয়াসে সজলের এই ছোট্ট আয়োজন। কিন্তু শাহেদ এখনো লাপাত্তা। সে কি বেমালুম ভুলে গেল আজকের কথা? অথচ এই মোহময় ক্ষণটির জন্যই দুজনে অধীর আগ্রহ নিয়েকাটিয়েছে কয়েকটি মাস, কয়েকটি অহর্নিশি, কয়েকটি প্রহর। কিন্তু শাহেদের অবজ্ঞায় আজ এ সময়টুকুতে ভাটা পড়বে নাতো। সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে উদাস মন নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল সজল।
২।
রেডি হতে হতে সকাল ৯টার ট্রেনটা মিস হয়ে গেল সজলের। তার এই ধীর স্বভাবের জন্য জীবনে কত কিছুই মিস করেছে সে। আর ট্রেনের ব্যাপারটা হরহামেশাই ঘটে থাকে। বাস যাত্রায় অনীহা থাকায় এখন অগত্যাই তাকে যেতে হবে সকাল ১০টার লোকাল ট্রেনে। হায় কপাল! স্টেশনে আসতে আসতে সেই ট্রেনটিও ছাড়ার
শেষ হুইসেল দিয়ে দিল। সজল হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে ৯টা ৫৫ বাজে, ১০টা বাজতে এখনো ৫
মিনিট বাকী অথচ আজ আগেই ট্রেনেটা ছেড়ে দিল। লোকাল ট্রেনের এই এক সমস্যা, কখন আসে কখন
ছাড়ে তার কোন ঠিক ঠিকানাই নেই। রেলের কর্মকর্তাদের একপ্রকার গালিগালাজ করতে করতে সজল ছুটল
ট্রেনে ওঠার জন্য। আসলে সজল জানেই না যে, তার ধীর স্বভাবকে সাথে তার হাত ঘড়িটাও কয়েকমিনিট স্লো
হয়ে আছে। অবশেষে ট্রেনের নাগাল পেয়ে সে ৮ নাম্বার কামড়ায় উঠে স্বস্তির একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবল, যাক ওরিয়েন্টশন ক্লাসটা পাওয়া গেল তাহলে। যাত্রীতে টইটুম্বর ট্রেনের কামড়াগুলো, বসা তো দূরের কথা দাঁড়িয়ে যাওয়াটাই যেন কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এদিকে একটুখানি দৌড়েই ট্রেনে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিয়ে হাঁপাতে লাগল সজল। ভ্যাবসা গরমে যেন নাভিশ্বাস হবার জোগার। চরম অস্বস্তি নিয়ে একটা স্টেশন দাঁড়িয়েই কাটাল সে। তবে দুইটা স্টেশন পার হওয়ার পর কিছু লোক নেমে যাওয়ায় জানালা দিয়ে মৃদু বাতাস আসতে শুরু করল।ক্লান্তিতে কিছুটা প্রশান্তি পেল সজল আর দাঁড়িয়ে থেকেই জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগল সে। হঠাৎ একজন তার দিকে চেয়ে বলল, এই যে ভাই শুনছেন? সজল নিজেকে দেখিয়ে বলল, আমাকে বলছেন?
-হ্যা, অনেকক্ষণ থেকেই তো দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পাশের সিটটা ফাঁকা আছে চাইলে বসতে
পারেন। সজল একটুখানি অবাক হয়েই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা তার বয়সী হবে। ছেলেটাকে দেখতে দেখতে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার পাশে বসল সে।
সজল স্বভাবতই একটু স্বল্পভাষী। আর অপরিচিত কোন মানুষের সাথে আক বাড়িয়ে কথা বলাটা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ধারেও পড়ে না। কিন্তু আজকে এই কুলুপ এঁটে থাকাটা তার কাছে বড়ই একঘেয়ে মনে হচ্ছে। কিন্তু ছেলেটাও তো শুরু করতে পারে নাকি সেও তার মত স্বল্পভাষী। মনের মধ্যে এসব এলোমেলো ভাবনা নিয়ে বসে আছে সজল। অবশেষে ছেলেটাই মুখ খুলল

-কোথায় যাচ্ছেন আপনি ভাই?
-ঢাকায়, আপনি?
-আমিও, আপনার নামটা জানতে
পারি কি?
-সজল, আপনার নাম?
-শাহেদ, ঢাকার কোথায় যাচ্ছেন?
-জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়।
-তাই নাকি? (একটু অবাক হয়েই বলল শাহেদ)
-হুম, আপনি?
-আমিও তো জাহাঙ্গীর নগর
বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি।
-তাইনাকি! আপনি কি সেখানে পড়েন?
-হুম, আপনিও নিশ্চয়ই। কোন ইয়ার?
-এই তো রিসেন্টলি ভর্তি হয়েছি। আজ ওরিয়েন্টশন ক্লাস।
-ও মাই গড! আমারও তো আজ ওরিয়েন্টশন ক্লাস
-ও ও ও ! আপনার সাবজেক্ট কি?
-রসায়ন। আপনার।
-এটা কীভাবে সম্ভব?
-মানে?
-আমারও তো রসায়ন।
-হাহাহা, যাক একজন সঙ্গী পাওয়া গেল তাহলে ।
এভাবেই একটি ট্রেন যাত্রার মাধ্যমে কাকতালীয়ভাবে পরিচয় হয় শাহেদ আর সজলের। তারপর সেই রেশ ধরেই বন্ধুত্বের শুরু। সীমিত থেকে ব্যাপক পরিসরে এগিয়ে যেতে থাকে তাদের বন্ধুময় সম্পর্ক।
ভার্সিটিতে একসঙ্গে যাতাযাত করা, একসঙ্গে ছাত্রাবাসে ফেরা ইত্যাদি। যদিও তারা ভিন্ন ছাত্রাবাসে
থাকত। ছুটির দিন গুলোতে একসঙ্গে শহরময় রিকশাবিলাস করা, সিনেমাদেখা, সপিংকরা কিংবা গ্রুপস্ট্যাডি করা।
অতঃপর সবকিছু মিলে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ট থেকে ঘনিষ্টতর হতে লাগল। সজলকে ছাড়া শাহেদের একটা দিন যেন কল্পনাতীত মনে হত। এমনও হয়েছে শাহেদ কখনো ভার্সিটিতে গিয়ে সজলকে না পেলে ক্লাস বাদ দিয়ে তাকে খানিকটা অবাক করে দিয়ে তার ছাত্রাবাসে গিয়ে হাজির হত। সেখানে গল্পে গল্পে ঘন্টার পর ঘন্টা, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা অবধি তারা একসঙ্গে সময় কাটাত।শাহেদ একটা বদ অভ্যাস ছিল, মেয়েদের পেছনে লাগা। সজল সেটা মোটেও পছন্দ করত না, রাগে ডগমগ হয়ে সাথে সাথে প্রস্থান করত সেখান থেকে।শাহেদও তার পিছন পিছন ছুটত।তারপর শুরু হত দুজনের খুনসুটি, মারামারি। কখনবা এই কাজের জন্য শাস্তি হিসেবে কানে ধরতেও হয়েছে শাহেদকে। একদিন রসায়ন প্লাকটিক্যাল ক্লাসে সজলকে দেখে শাহেদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। হোয়াইট টি শার্ট আর ব্লাক প্যান্টে সজলকে অপরিমেয় সুন্দর লাগছে । শাহেদের চোখ সজলের সৌন্দর্যে ডুব দিতে থাকে। সজলের প্রতি তার লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি তার মনে প্রবলভাবে দোলা দিতে থাকে বিহ্বলে।
এই হল শুরু, সজলকে নিজের ভাবনায় আলিঙ্গন করে মনের মাঝে আস্তে আস্তে ভাললাগার আল্পনা আঁকতে লাগল শাহেদ।শাহেদ প্রায় প্রতিদিন সজলকে একটি করে রোমান্টিক ম্যাসেজ পাঠাত। কিন্তু প্রতিত্তরে সজল তাকে ফানি ম্যাসেজ দিত। এতে শাহেদ একটু ক্ষুব্ধ হত কিন্তু প্রকাশ করত না। সজলের প্রতি শাহেদের ভাললাগাগুলো ভাললাগার সীমানা ছাড়িয়ে ভালবাসায় মোড় নিতে লাগল দিন দিন। সজলের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন ভালবাসা তাকে তাড়া করে বেড়াত। তখন তার বড়ই ইচ্ছে হত সজলের
সামনে গিয়ে মনের কথাটা উগড়ে দিতে। ওদিকে সজল তার উৎসুক মনটাকে দমিয়ে রেখেছে নিজের মাঝে। তার স্বল্পভাষী স্বভাবটা যেন তার ভালবাসার ভাষাগুলোকে গ্রাস করে নিয়েছে। যেখানে তার বুক ফাটলেও বুঝি ভালবাসার কথাটা বলার জন্য মুখ ফুটবেনা। তীর্থের কাকের মত অপেক্ষার প্রহর কাটাতে লাগল শাহেদের মুখে ভালবাসার কথাটা শোনার জন্য।
অব্যক্ত ভালবাসার দহন নিয়ে এভাবে কেটে গেল তিন মাস। কিন্তু যত দিন যেতে থাকে দুজনেই উদ্ধত হয়ে ওঠে ভালবাসার কথাটা প্রকাশের জন্য। কিন্তু পারে না এই ভেবে পাছে মায়াময় বন্ধুত্বের বন্ধন ভেঙে যায়। এরপর একদিন শাহেদ সজলকে ডেকে বলল,
-সজল তোমার সাথে আমার কিছু বিশেষ কথা আছে।
-কি কথা,বল।
-এখন বলব না,বিশেষ কথা বিশেষ কোন
দিনেই বলব।
-তাই।আমারও তোমাকে কিছু বিশেষ কথা বলার আছে।
-তাই নাকি!তাড়াতাড়ি বলে ফেলো।
-বললেই হলো।ঐতো বিশেষ কথা বিশেষ দিনেই বলতে হয়।
-শোধ নিলা?
-হুম।
নতুন বছর শুরু হতে মাত্র দুদিন বাকী। তারা তাদের অপেক্ষা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নতুন বছরকে কেন্দ্র করল। তাদের বিশেষ ভাষাটাকে অভিব্যক্তি দেয়ার জন্য তারা বছরের প্রথম দিনটাকেই নির্বাচন করল। এদিকে দুজনেই মগ্ন হল অনুমেয় ভাবনায়। সজল ভাবতে লাগল, সে যে শাহেদের মুখ থেকে যে কথাটা শোনার জন্য ব্যাকুল সেটিই শাহেদের বিশেষ কথা হবে নাকিঅন্যকিছু। শাহেদও মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবার সে বলবেই তার মনের কথা।

৩১ ডিসেম্বর রাতেই শাহেদ লাল গোলাপ এনে রেখেছে। আসলে প্রেম ভালবাসায় একটা গোলাপই যেন গুরু দায়িত্ব পালন করে ভালবাসা প্রকাশে। যেখানে গোলাপ না থাকলে ভালবাসার ভাষাটাই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সজল বেচারা ধীর স্বভাবের জন্য সকাল ১১টায় ফুলের দোকানে গিয়ে কোন গোলাপই পেলনা। গোলাপ ফুল পেতে হলে তাকে আরও একঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এমনিতেই আধ ঘন্টা দেরি হয়ে গেছে। না জানি কতটা রেগে আছে শাহেদ। সজলের মাথা আর কাজ করছে না এত কম সময়ে কোথায় সে গোলাপ ফুল পাবে, বিপাকে পড়ল সে। হঠাৎ করে তার মাথায় শুভ বুদ্ধির উদয় হল।সে তৎক্ষণাত ছুটে গেল ছাত্রাবাসে। তারপর ডয়ার থেকে একটা ডায়েরী বের করে পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। কয়েকটা পৃষ্টা উল্টাতেই তার মুখে হাসির ছটা পড়ল। ডায়েরীর ভাঁজে চেপ্টা হয়ে যাওয়া একটি শুকনো গোলাপ হাতে নিয়ে সে তাড়িঘড়ি রওয়ানা দিল গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে। তাদের গন্তব্যস্থল ছিল শহর থেকে দূরে একটি নির্জন জায়গায়।
প্রায় ২০ মিনিট পর সজল সেখানে উপস্থিত হল। শাহেদ আগে থেকে সেখানে থম মেরে বসে আছে। শাহেদকে দেখে সজলের অনুভূতিতে যেন প্রশান্তির ছোঁয়া আন্দোলিত হচ্ছে। সজল শাহেদের কাছে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
-দেরি হয়ে গেল তাইনা?
-হয়েছে হয়েছে। দেরি করে আবার বলছেন,দেরি হয়ে গেল তাইনা!
-স্যরি
-ইটস ওকে, বসো।
সজল শাহেদের কাছে যত এগিয়ে যাচ্ছে তার হার্টবিট ততই দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। সজল শাহেদের পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল। কিছু উত্তেজনা, কিছুটা ভয়, কিছু আনন্দ সব মিলে এক মিশ্র অনুভূতি রোমাঞ্চিত করছে তাকে। হঠাৎ করে শাহেদ বলল,
-কি ব্যাপার কিছু বলছো না যে?
-আগে তো তোমার বলার কথা।
-না, আজ তুমি আগে বলবে,সবসময় তো আমিই আগে বলি।
-ওকে বলছি।
শাহেদ এবার একটু আটশাট বেঁধে বসেসজলের দিকে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল আর বলল,তাড়াতাড়ি বল
-হ্যা বলছি।……Happy New Year.
কথাটা শুনে শাহেদের হাসিমাখা মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
-এটা তোমার বিশেষ কথা। এটা তো ভার্সিটিতেই বলতেই পারতে। এতদূর আসার কোন মানে হয় না।
-হুম।আজকে সবাই সবাইকে এটা বলেই তো উইস করে।
-তা ঠিক।
-কেন অন্য কিছু আশা করেছিলে নাকি?
-না মানে। (শাহেদ একটু ভেবাচেকা হয়ে গেল)
-আমিতো বললাম, এখন তোমার বিশেষ কথা বল।
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মনে মনে আওড়াতে লাগল, বুঝেছি ভাঙবে তবু মচকাবেনা। আমাকেই হার মানতে হবে। তারপর সে একটা ঢোক গিলে সঙ্গপোনে রাখা লাল গোলাপটা হাতে নিয়ে সজলের দিকে হাঁটু
গেরে বসে অবলীলায় বলতে লাগল,I Love U সজল। আজকের এই বিশেষ দিনে এই বিশেষ কথাটাই তোমাকে বলার ছিল। শুধু তোমাকে বলব বলে অনেক যত্ন করে নিজের মাঝে কথাটা লালন
করেছি এতদিন। তোমায় ভালবেসে তোমার পাশে থাকতে চাই আমি। আমাকে তোমার ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করোনা, প্লিজ আমার ভালবাসাকে গ্রহন কর তুমি। সজল চোখে টলমল জল নিয়ে হতবাক হয়ে শাহেদের দিকে চেয়ে রইল। সে কি করবে, কি বলবে এক প্রকার কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে। তবুও কাঁপা হাতেই শাহেদের থেকে গোলাপটা নিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে তার ভালবাসার কথাটাও জানিয়ে দিল। তারপর ডায়েরীতে রাখা শুকনো গোলাপটা শাহেদকে দিল। শাহেদ গোলাপটা হাতে নিয়ে হো হো
করে হাসতে শুরু করল। তখন সজল বলল,
– সকালে ফুলের দোকানে গিয়ে কোন গোলাপই পেলাম না। তাই…..
-পাবেই নাতো। ঢিলা কোম্পানির মাল তুমি, তোমাকে টাইট দিতে হবে দাড়াও।
-প্লিজ কিছু মনে করো না।
-কি যে বল! অনেক সুন্দর গোলাপ, আমার পছন্দ হয়েছে। এ গোলাপে যে তোমার ভালবাসা মিশে আছে।
তারপর দুজনে হাতে হাত মিলিয়ে ভালবাসা জড়ানো আপন ভুবনে হাঁটতে শুরু করল। এভাবেই শুরু হল তাদের ভালবাসার এক নতুন অধ্যায়। আর এই নিমিত্তে দুজনের ভালবাসা পূর্ণতা পেল লিভ টুগেদারে, ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটে থাকার মাধ্যমে।
৩। আচমকা শব্দে চমকে উঠে সজল স্বম্বিত ফিরে পেল। চারিদিকে আতোষবাজি আর পটকার মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর হৈ হৈ রোল পড়ে গেল। শুরু হল একটি নতুন বছর সাথে সজল আর শাহেদের ভালবাসার এক বছর পূর্ণও হল। কিন্তু এ কাঙ্খিত মুহুর্তে শাহেদ অনুপস্থিত, সজলের অপেক্ষায় গুড়ে বালি পড়ল। সব অপেক্ষাকে বুকে চেপে বিষণ্ণ বিধুর নিঃসঙ্গতা নিয়ে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে শুরু করল সে। কিছুক্ষণ পর দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। শাহেদ দরজার সামনে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে দুঃচিন্ত মনে দাঁড়িয়ে আছে। সজল দরজা খুলে দিয়ে শাহেদের পাশ কাটিয়ে গটগট করে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। সাথে সাথে শাহেদও সজলের পাশে গিয়ে বসল। সজলের হাতটা তার বাহুডোরে আবিষ্ট করে তার চোখের নিচ, ঠোঁটের কোণ তাকিয়ে বলল,,,
-কি হয়েছে জান?
-কিছুনা, ফিরলে কেন বাইরের থাক যাও। (রাগান্তিত কন্ঠে বলল সজল)
-এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল তাই একটু দেরী হয়ে গেল।
-যাও ঐ বন্ধুর কাছেই যাও। আমার কাছের আসার দরকার নেই।
-স্যরি,স্যরি,স্যরি। আর এমনটা হবেনা। এই কানে ধরলাম প্লিজ রাগ করোনা। রাতটাতো এখনো বাকী।
বলেই সজলের ঠোঁট চেপে ধরল শাহেদ। উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়ায় সজলের সব রাগ অভিমান নিমিষেই শূন্যে মিলিয়ে গেল।তারপর শাহেদ বলল,
-কেক কোথায়?
-ঐতো টেবিলে।
শাহেদ আর সজল কেক কেটে দুজন দুজনকে খাইয়ে দিল। আর এভাবেই যুগলবন্দী ভালবাসার একান্ত অনুভূতি দিয়ে সব প্রতিবন্ধতাকে হার মানিয়ে তাদের ভালবাসা পার করল আরেকটি বছর। নতুন বছর তাদের জীবনে এসেছিল ভালবাসার বসন্ত হয়ে। এজন্যই বছরের প্রথম দিনটি তাদের কাছে ভালবাসা দিবস। তাইতো নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে ভালবাসাপূর্ণ অটুটু বন্ধন দিয়ে যাপিত হল তাদের শুভ্র ভালবাসার আরেকটি বসন্ত।।।
…সমাপ্ত

“সমপ্রেমের গল্প” ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.