অধিকার

লেখকঃ অভিমন্যু চৌধুরী

পঞ্চাশোর্ধ বছর আগের কথা লিখিতে বসিয়াছি, সকল কথা স্মরণ হয় না। পূর্বে লিখিতে যাহা লিখিতাম, এক্ষনে যে তাহাই লিখিতেছি এমন নহে।

বুড়িমারী জেলার রতনপুর গাঁয়ে আমার জন্ম। মা,এক বোন, ভাইয়ের সংসার আমাদের।বাবা আমার জন্মের আগেই
মারা যায়।

মা, বড় দিদি অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকা কাজ করে সংসার চালাইতো।
সেসময় আমি ইস্কুলে পড়িতাম।যখন আমি কেলাস সাতে তখন আমার ষোল বছর বয়স।
সেইবার কলেরায় মা-দিদির প্রান যায়।
অনেক অসহায় হয়ে পড়েয়াছি।
বুকের ভেতর শতকষ্ট নিয়ে হৃদয়হীন মানবের মতো বাঁচিয়া রহেছি।
ডুকরে ডূকরে কাঁদছিলাম কিন্তু শোনার কেউ ছিল না।

জেঠা–জেঠিমার সংসারে একখান বছর আমায় পালছিল। জেঠিমা ইস্কুলে যাওয়া
বন্ধ করিয়া দিয়াছে।জেঠিমার সংসারে কুটনো কাটা,বাসন মাজা,উঠান মুছা,ধানসিদ্ধ -শুকানো সব একা
হাতে করিতাম। সারাদিন পর গোধুলিবেলা
পান্তাভাত আর কাচালংকা দিত।তবুও অনেক আনন্দিত ছিলাম।
তারপরও জেঠিমা অলক্ষী,মুখপুড়া
জন্মের আগে বাপের খাইছিস।জন্মের পর মা- বোনরে খাইলি।এখন মাগিই আমাদের খাবি।
আমাদের সম্পত্তি নিজের নামে করিয়া আমায় বাড়ি থাকিয়া বাহির করিয়া দিলেন।

রাস্তায় বসে কাঁদছিলাম। বনমালী দাদা বলেছিলেন আমার হাত ধরে সারাজীবন
চলতে পারলে আমার সাথে আসো।
বনমালী দাদা হাত বাড়িয়া দিয়াছিলেন।
তাহার হাত ধরে তাহার বাড়িতে নিয়া গিয়েছিলান।তাহার বাড়িতে আমারে অাশ্রয় দেয়। বনমালী দাদা ছিল আমার চার
বছরের বড়।আমি যখন কেলাস সাতে
বনমালী দাদা কেলাস দশে পড়ে।
গায়ের ইস্কুলে পড়িতাম। বনমালী দাদা
ইস্কুলে গান করিতো অনেক নাম তার।

গতবার কলেরায় তাহার পরিবারের বাবা,
মা,চারভাই একসাথে মারা যায়।
তাহার পরিবারে এখন আমি ছাড়া কেউই নাই।
গান– বাজনা করে তাহার পেট চলে যায়।
বনমালী দাদা অনেক সুন্দর গান,নাচ,যাত্রা,
করিতেন।

গোসাই আমায় সব পুঁথি শিখিয়াছেন।
বনমালী দাদাকে আমি গোসাই বলে ডাকিতাম।গোসাই আমার শিক্ষা,দীক্ষা, প্রেম, ভালোবাসা,মধুর রাতের গোসাই ছিলেন।

পুরুষ হইয়া আমরা পুরুষ- পুরুষ ভালোবাসা করিতাম।অতিতেত কষ্ট ভুলিয়া
আমরা দুজন সুখের সংসারের সপ্ন দেখিতাম।

গোধুলি হইতে চন্দ্রবিলাসে দুজন দুজনকে বিলিয়ে দিতাম।কাম সুখে লিপ্ত হইতাম।
আহা কত সুখ অনুভাব করিতাম।
কত ভালোবাসিতাম গোসাইকে।গোসাই- শিষ্যের পতি প্রেম লিখিতে বসিয়া আমার
শরির শিহরিত হইয়া উঠিছে।

একবার গোসাই কলেরায় অাক্রান্ত হয়েছিলেন।
আমি কাঁদছি আর গোসাই এর জন্য প্রার্থনা
করিতেছি। সৃষ্টিকর্তাকে বলেছিলাম তুমি আমার পরিবার কেড়ে নিয়াছো।
যদি আমার গোসাই কে কাড়িয়া নাও তোমার এর উত্তর দিতে হইবেই।

সেকালে আমার রক্ত বিক্রি করিয়া লক্ষীঘোড়া ভাঙিয়া কিছু টাকা নিয়ে ঢাকা
মেডিকেলে গোসাই কে নিয়া গিয়েছি।
গোসাই কে সুস্থ করিয়া গাঁয়ে ফিরিলাম।

আবার আগের মতন গান- নাচ শুরু করিয়া
দিয়েছি।কেউ একতারা কেউ খঞ্জনি বাজাতাম।

” দেখেছি রুপ সাগরে মনের মানুষ কাচা সোনা”
“ওহ বন্ধু আমার না পেয়ে তোমার দেখা একা একা দিন যে আমার কাটে না রে”

গোসাই ছিল আমার রুপের মানুষ, প্রেমের মানুষ, আমার প্রিয়জন। আমার ভালবাসা, সপ্ন,সাধনা। তাহাকে ছাড়া আমি একটি মূর্হত চলিতে পারি নাহ।

এক মূর্হত দুজন দুজনকে ছাড়া চলিতাম নাহ।আমরা দুজনে এই সমপ্রেম কে অনেক ভালোবাসি অনেক শ্রদ্ধা করি।এই
সত্য প্রেম যার যার মাঝে কোন হিংসা,দোষ আমার চোক্ষুতে পড়িত না।এই সত্য প্রেম
মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সমপ্রেমের
অধিকার সর্বদা চাহিতাম।

এই সমাজের মানুষগুলো সমপ্রেমের মতো নিস্পাপ ভালোবাসা ভ্রান্ত চোক্ষুতে দেখিতও।
আমার দুঃখ এই সমাজ আমাদের এই সুপ্ত চাহিদার মূল্য দিলো না।

আমি অধিকার চাই সমপ্রেমীদের।একটি
পুরুষ হইয়া একটি পুরুষ কে ভালোবাসা
একটি নারী হইয়া একটি নারীকে ভালোবাসা।তাদের এই সত্য ভালোবাসায় আমি কোন পাপ দেখি না।তাহার যদি সুখে থাকিতে পারে তাহলে আপনাদের
ভ্রু কুঞ্চিত হয় কেনো???

বছর বিশ- বাইশে কুষ্টিয়া লালন মেলা গিয়াছিলাম গোসাই সহিত।
সেইখানে অধিক সমপ্রেমীদের সাথে সাক্ষাত এবং কথা হইলো।
কথা বলিতে বলিতে আমি বলিলাম,
এই ভালোবাসার কি কোন মূল্য নেই আমাদের অধিকারে লড়াই করিতে হইবে।

একজন বলিল এতেই তো বেশ আছি,
কি দরকার রক্তপাত, প্রানদন্ডের।

একথা শুনিয়া আমি উদ্দত বচনে বলিলাম,কি বলিতেচান আপনারা.?
এজন্য কি আমাদের অধিকার থাকবে না।
সমপ্রেমী এজন্য কি আমাদের লোকচক্ষুর আড়ালে থাকিতে হইবে।

অনেক উভকামী তো সমকামী সেজে সমপ্রেমীদের সহিত কাম মোহে লিপ্ত হয়।
আমরা সমপ্রেমীরা ভালোবাসি তাই দেহমন দিয়ে বিশ্বাস করি।
তাহরা ভোগ করার পর আমাদের অবহেলা করে, পালিয়ে যায়।তাহারাই আমাদের উপর ঝড় তোলে।
সমকামীরা পাপী এদের শাস্তি চাই।
বঙ্গবাসীরা সচারচর ইহাকে ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে, ছোটনজর ইত্যাদি বলে আমি কোনরুপে তাহা মানিতে পারিব নাহ। তখন তাহাদের চক্ষুলজ্জা কোথায় থাকে।

আদর্শ বিচার চাই সেইসব মানুষদের যাহারা সমপ্রেমীদের সুন্দর মন নিয়ে খেলা করেন।
তাহাদের তীব্র নিন্দা ধিক্কার জানাই।

তারপরে সবাই গান ধরিছিলাম
” মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের ও সনে”

গান শেষে সবার ঘরে সবাই মিলনে মাতাল ছিলাম।

কিন্তু একটাই সংশয় আমার অধিকার কী আমি পাবো নাহ।

[ সমপ্রেমী ছিল, আছে,থাকবে ওহে বঙ্গবাসী আমাদের অধিকার দাও]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.