জিতেন-এর ভালবাসা

লেখকঃ সামীউল হাসান সামী

জিতেন নিভৃত গ্রামের মাঝে বেড়ে উঠা একটি ছেলে । যার স্কুল গন্ডি শেষ হয়েছে ৫ ম শ্রেনীতেই। বাবা মাছ ধরেই সংসার চালায় কোন রকমে।মা পেটের ক্ষিধে সইতে না পেরে জিতেনকে ফেলে সেই কবে সংসারকে বিদাই জানিয়ে কইযে হারিয়ে গেছে কেউ বলতে পারে না ! জিতেন আধুনিকতার সাথে পরিচিত নয়।তার কাছে আধুনিকতা হচ্ছে, সন্ধ্যা নামতেই আয়নার সামনে বসে স্পষ্ট হয়ে উঠা মুখটি বারবার দেখা ! কপালের টীপ, ঠোটের লিপিষ্টিক, পায়ের আলতা এই নিয়ে তার জীবন। তার জীবনে আরো একটি কাজ আছে, রবিকে নিয়ে ভাবা । কি নেই তার ?
নেই শুধু দেহ ও মনের মাঝে সু – গভীর মিল ।
জিতেনের কাজ শুধুই পাশের বাড়ির রবিকে নিয়ে ভাবা, আর এ ভাবনাতে সে উবু হয়ে থাকে।
সে ভাবনার যেন কোন সীমা পরিসীমা নেই।
জিতেন কল্পনা করছে….

{ রবি দোয়ারে বাশে জাল মেলছে, জিতেন ধীরে ধীরে জালের সামনে দাড়াতেই রবি জাল সরিয়ে জিতেনকে দেখতে পেলো ! জিতেন প্রচণ্ড লজ্জার ভঙ্গিতে দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে যেতে লাগলো ।
দৌড়ে এসে নৌকায় বসে দুজনের কথা হচ্ছে !}

জিতেনঃ আমারে ভালবাসিস ?

রবিঃ হ বাসি তো , মায়রে তো কত কই তোর কথা ।

জিতেনঃ আমারে লইয়া সংসার করবি ?

রবিঃ তুইকি পাগল হইছস ? পুলায় পুলায় সংসার করে ? মাইনষে পাগল কইবো !

জিতেনঃ তয়যে রাইতে তোর ঘরে আইতে কছ, আমিও ছুইটা আহি , যা কছ তাই করি! তহনতো একবারও মাইনষের কতা কছ না। ভালবাসাডা কি শুধুই দুইডা দেহের খায়েশ ?

{রবি আর কিছুই বলছে না ।
পেছন থেকে একটা মেয়ে এসে রবির হাত ধড়লো । সঙ্গে সঙ্গে রবি মেয়েটির হাত ধরে হাটতে শুরু করলো.
জিতেন পেছনে পরে থাকলো, জিতেন অনেক কিছু বলতে চেয়েও কিছুই বলতে পারছে না । }

কল্পনা শেষ ।

( হঠাৎ জিতেনের বাবা ঘরে প্রবেশ করতেই জিতেনের হাত থেকে আয়নাটা পরে গেল )

বাবঃ জিতেন ! আয়নাটা ভাইঙ্গা ফেলাইলি ?

জিতেনঃ বাবা আয়নাডা দেখতাছো , ঠিক এমনে কইরা মাইনষের মনডাও ভাঙ্গে , দুনিয়ার কোন মাইনষে তার খবর রাহে না বাজান । আয়না তো বাজারে পয়সা অইলে কতই মিলে , মনের মত মন তো একটাও মিলেনা বাজান ।

বাবাঃ সাবধানে তোল ! এই …..তো হাতটা কাটলি ।

জিতেনঃ দেহেতো হগলের রক্তই এক । চলনে বলনে কত রহম মানুষ। কেউ লম্বা , খাটো , ফর্সা , কালো । তয় হগলের ভালবাসা কিন্তু এক না বাজান ।

বাবাঃ হ তাই , কেন কি অইছে ?

জিতেনঃ বাজান ! কেউ ভালবাইসা ঘর বান্ধে আর কেউ ভালবাইসা ঘর হারায়।

{ কুপি হাতে জিতেন নদীর ঘাটের দিকে হাটতে থাকে । কুমর পানিতে নেমে জিতেন বলতে থাকে… }

জিতেনঃ ঠাকুর ! তুমি প্রেমের দেবতা।তুমি প্রেমে জগত মাতিয়েছো । আজ সেই প্রেম দেহের ক্ষুধায় বন্দী । ঠাকুর আমারে তুমি জীবন দিয়েছো । বাচার সকল উপাদানও তোমার হাতে । তবে কী ঠাকুর আমার জন্য এতটুকো ভালবাসা তোমার জগতে নেই ?
সবাই বলে তোমার জগতে আমি বড্ড বেশি বেমানান। সকল সৃষ্টির স্রষ্টা তুমি । তুমি কখনো আমাকে ফেলে দাওনিত ঠাকুর ।
আহার দিয়েছো, আলো বাতাস দিয়েছো । ভালবাসার মন দিয়েছো । শুধুই কি ওদের দিলেনা আমাকে ভালবাসার মন ?

{ কথা গুলো বলে জিতেন নদীতে ডুব দিলো । তবে জিতেন কখনো উঠেছে কি না তা আর কেউ বলতে পারেনি }…..

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.