ঝুটঝামেলা

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি

১.
আজকে বাসায় ভীষণ গণ্ডগোল হবে । আমি আগে থেকেই আঁচ করতে পারছি। কারন আজকে রনি ভাইয়া কে পাত্রী পক্ষ দেখতে আসবে। আজীবন শুনেছি পাত্র পক্ষই পাত্রী দেখতে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে ভিন্ন। কারন রনি ভাইয়া কখনই পাত্রী দেখতে যাবে না। তাই তার হয়ে বড় চাচুই পাত্রী দেখে আসে। রনি ভাইয়ায় নিজস্ব কোন পছন্দ নেই। পাত্রী কালো হলেও ভাল। ধলা হলেও ভাল।আর তারপর পাত্রীপক্ষ আসে রনি ভাইয়া কে দেখতে।
রনি ভাইয়া আমার বড় চাচুর ছেলে। আমাদের যৌথ পরিবার। আমি আর রনি ভাইয়া এক ঘরে ঘুমোই। আমাদের মাঝে কিন্তু সম্পর্ক আছে। আমরা একে অপরকে ভালবাসি। তাই তো রনি ভাইয়া বিয়ে করবে না। আমিও করবো না। কিন্তু রনি ভাইয়ার যে বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। গতবার পাত্রীপক্ষ রনি ভাইয়া কে দেখতে আসার এক ঘণ্টা আগে রনি ভাইয়া বাড়ি থেকে পালালো। তারপর সে কি হইচই। পাত্রীপক্ষ ইচ্ছেমত বকাবকি করলো বড় চাচু , ছোট চাচু আর আব্বু কে। তারপর বড় চাচুর কি মেজাজ।সেবার বড় চাচু তো রাতে কিছুই খেলেন না। ছুড়ে ফেলে দিলেন প্লেট খাবার টেবিল থেকে ।তার সে কি চিৎকার।
– হারামজাদা আসুক বাসায়। সাপের পাঁচ পা দেখেছে। বিয়ে করবে না। সন্ন্যাসী হবে।সন্ন্যাসী হওয়া বের করছি।
রাত্রি ১০ টার দিকে রনি ভাইয়া বাড়ি ফিরলো। মোবাইল দিয়ে আম্মু কে ফোন করলো। আম্মু আবার রনি ভাইয়া কে খুব আদর করে। আমি তো সবসময় রনি ভাইয়া কে বলি
তোমার শাশুড়ি ভাগ্য ভালো।
আম্মু পিছনের দরজা খুলে রনি ভাইয়া কে বাসায় ঢুকালো।কিন্তু কিসের কি। বড় চাচুর হাতে ঠিক ধরা পড়লো।
– বিনু ওরে বাসায় ঢুকতে দিয়ে তুমি ঠিক কর নাই।আস্কারা দিয়ে মাথায় উঠিয়েছ ওরে তোমরা। বিয়ে করবে না? সন্ন্যাসী হবে?সন্ন্যাসী হওয়া দেখাচ্ছি।
দিলো বড় চাচা রনি ভাইয়ার গালে একটা চড়। চড় খেলো রনি ভাইয়া। উল্টা চিৎকার করলো আম্মু।
আমিও চিৎকার দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। আমাকে দেখে বড় চাচু আরও রেগে গেলেন। আমাকে বললেন
– ঘরে যা। বড়দের মাঝখানে আসবি না।
আমি সুবোধ বালকের মত আবার ঘরে ঢুকে গেলাম । কিন্তু কান খাড়া করে রাখলাম আর কিছু হয় কিনা তা শোনার জন্য। কিন্তু গ্যাঞ্জাম সেইদিন ওখানে থেমে গেলো।আমারও আফসোস হল। আমার আবার এসব উত্তেজনা খুব পছন্দ।
রনি ভাইয়া স্বাভাবিক ভাবে ঘরে ঢুকে কাপড় পাল্টে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো যেন কিছুই হয় নাই। আসলে আমরা চড় থাপ্পড় খেয়ে অভ্যস্ত তো ।বিশেষ করে বড় চাচুর চড় । আগে রেজাল্ট বের হলেই আমরা ২ জন একটা করে চড় খেয়ে নিতাম রেজাল্ট ভাল হোক খারাপ হোক। বড় চাচুর কথা প্রথম না হলেই চড়। কিন্তু প্রথম তো কক্ষনোই হতাম না।
অবশ্য চড় খাওয়ার ২-৩ দিন পর আমরা কোন কারণ ছাড়াই বড় চাচুর কাছ থেকে উপহার পেতাম। মারের তীব্রতা অনুযায়ী উপহারের দাম হত। বড় চাচু এমন ভাব করতেন যে এমনি দিয়েছেন। কিন্তু আমরা তো জানি উনি মারধোরের পর অনুশোচনায় ভুগেন। তারই প্রায়শ্চিত্ত উপহার।
কিন্তু আজকে আমার খুব ভয় লাগছে। আজকে রনি ভাইয়া পালালে অবশ্যই বড় চাচু রনি ভাইয়া কে বাসা থেকে বের করে দিবেন। অবশ্য বাসা থেকে বের করে দিলেও সমস্যা নাই। রনি ভাইয়া ভাল বেতনের চাকুরী করে। এজন্যই তো পাত্র হিসেবে তার এতো চাহিদা। আর রনি ভাইয়া তো বেশ সুন্দর।
রনি ভাইয়া তো সেই রকম চিন্তা মুক্ত। এই অবস্থায় মানুষ এতো চিন্তা মুক্ত কিভাবে হয়? আজকে যে অবস্থা বড় চাচুর। শুনলাম আংটি কিনে রেখেছেন।পাত্রীপক্ষ পছন্দ করলে কবুল কবুল হয়ে যেতে পারে। এইবার পালালে বড় চাচু রনি ভাইয়া কে বাসা থেকে বের করে দেয়ার আগে অবশ্য ভাল মত ধোলাই দিয়ে নিবে। ছোট চাচু আর আব্বুরও এমনি ইচ্ছা মনে হচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় হওয়ার এই সমস্যা ।একশটা গার্জিয়ান।
দাদিয়া আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ছেলে হলেও মেয়েদের গহনা খুব ভাল বুঝি। দাদিয়ার ঘরে গিয়ে দেখলাম দাদিয়া তার চন্দন কাঠের গহনার বাক্সটা বের করেছেন।এটা যক্ষের ধনের মত আগলে রাখেন। আমাকে বললেন রনি ভাইয়ার বউ এর জন্য কিছু গহনা পছন্দ করতে। সর্বনাশ তাহলে তো আজকেই কবুল হয়ে যাবে।
আমি উত্তেজিত হয়ে ঘরে গিয়ে রনি ভাইয়া কে বললাম
– সর্বনাশ রনি ভাইয়া । দাদিয়া তোমার বিবাহের জন্য গহনা বাছাই করছে। আজকেই তোমার বিবাহ।কি হবে এখন?
– তুই অল্পতেই উত্তেজিত হোশ । একটা ট্রাভেল ব্যাগে আমার আর তোর কিছু কাপড়চোপড় নে।
– কোথাও যাবা।
– এক সপ্তাহের জন্য ডুব দিবো। বান্দরবান।
– কিন্তু বড় চাচু ধরলে আর আস্ত রাখবেন না,
– তুই ভয় পেলে যাস না। আমি একাই যাব।
– না না আমিও যাবো।
আমি প্রথম ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে পিছনের গেট দিয়ে বের হয়ে একদম রাস্তা আসলাম।কথা হল কিছুক্ষণ পরে রনি ভাইয়া আসবে।এক সাথে ২ জন বের হলে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ১০ মিনিট পার হয়ে গেলো কিন্তু রনি ভাইয়া আর আসে না।ধরা পড়লো না তো ? চিন্তায় আমি আধমরা হয়ে যাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম রনি ভাইয়া সানগ্লাস পড়ে শীষ দিতে দিতে আসছে। এই পরিস্থিতি তে এতো চিন্তা ভাবনা মুক্ত কেমন করে হয় মানুষ। তারপর নিজের মোবাইল থেকে সিম খুলে আরেকটা সিম ভরলো। তারপর আমার মোবাইলেও আরেকটা সিম ভরে দিলো।তারপর একটা রিকশা নিয়ে সোজা বাস স্ট্যান্ডে চলে আসলাম। বান্দরবান যাওয়ার বাস আধাঘণ্টা পর। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমি বান্দরবন যাচ্ছি। আমি তো ঢাকার বাইরেও যাই নাই কক্ষনো। খুব আনন্দ হচ্ছে। এইবার আমাদের হানিমুনটাও হয়ে যাবে।কিন্তু একটা কথা ভেবে আবার চুপসে যাচ্ছি। ৫ দিন পর যখন বাড়ি ফিরবো তখন কি অবস্থা হবে? বড় চাচু কি শুধুই চড় মেরেই ক্ষান্ত হবেন?নাকি লাঠিপেটা করবেন।এই কথা বললাম রনি ভাইয়া কে। রনি ভাইয়া একটা ধমক দিল
– বেরাতে যাচ্ছিস আনন্দ কর।পরের টা পরে চিন্তা করা যাবে।
ডিরেক্ট বাস ।বান্দরবান যেতে যেতে গভীর রাত। আমি যে রনি ভাইয়ার কাঁধে মাথা রেখে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাই নাই। রনি ভাইয়া আমাকে ডেকে তুলে নাই। রনি ভাইয়া আসলেই আমাকে অনেক কেয়ার করে মনে মনে ভাবলাম। ভাবতেই ভাল লাগার একটা অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরলো ।হোটেলে যেয়ে রনি ভাইয়া কাপড় পর্যন্ত বদলালো না। ঝপাৎ করে বেডের উপর যেয়ে শুয়ে পড়লো। আমি পা থেকে মোজা জুতা খুলে দিলাম। আমি তো তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। সারাটা সময় বাসে তো সে জেগেই ছিল । ঘুমাক । আমি পাশে যেয়ে শুলাম। ইচ্ছে করছে রনি ভাইয়ার গালে চুমু খেতে। হটাত করে রনি ভাইয়া আমাকে টেনে তার কাছে নিয়ে গেলো। ঘুমোয় নাই। জড়িয়ে ধরে আমাকে চুমু দিতে লাগলো।আমি তার বাহু যুগলে বন্দি হয়ে আদর খেতে লাগলাম।
পরদিন বের হলাম ভ্রমণে প্রথমেই স্বর্ণ-মন্দির। স্বর্ণ মন্দির দেখে আমি মুগ্ধ। এত সুন্দর কারুকাজ করা মন্দির আমি আর আগে দেখি নাই। অনেক সেলফি তুললাম আমরা। স্বর্ণ-মন্দির থেকে বের হতেই ঝড় ঝড় করে বৃষ্টি নামলো। ভিজে একাকার হয়ে গেলাম। তাকিয়ে দেখি রনি ভাইয়া কে । অসম্ভব সেক্সি লাগছে।আমি রনি ভাইয়া কে বললাম
– সেক্সি
সাথে সাথে চোখ টিপ দিলাম। রনি ভাইয়া লজ্জা পেয়ে গেলো।
– এই চড় মারবো কিন্তু। খালি ফাজলামি
– মারো । কিছু বললেই তো শুধু মারতে চাও। তুমি পচা।
আশেপাশে কেউ নাই, রনি ভাইয়া আমাকে ভিজা শরীরে জড়িয়ে ধরে কিস করলো ঠোঁটে ।
চাঁদের গাড়ি করে নীলগিরির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রাস্তায় রনি ভাইয়া বমি করে একাকার। আমি ভয় পেয়ে গেলাম । অসুস্থ হয়ে গেলো না তো । ড্রাইভার অভয় দিলো অনেকেই বমি করে।তাও কি আমার ভয় যায়? সারা রাস্তা রনি ভাইয়ার হাত ধরে বসে রইলাম।
রনি ভাইয়ার খুব ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু আর্মি মেজর। তার সহায়তায় রাতে থাকার ব্যবস্থা হল নীলগিরির ভোর বেলাটাই নাকি দেখার মত।
নীলগিরির রাত ছিল আমাদের হানিমুন। সারা রাত প্রেম করলাম।একজন আরেকজন কে উজাড় করে দিয়ে নিঃস্ব হলাম। শেষ রাতে আর ঘুমলাম না আমরা। একটু ভোর হতেই বের হলাম কটেজ থেকে । সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। চারিদিকে মেঘ আর মেঘ। মনে হয় যেন মেঘের রাজ্য। একেক জায়গা থেকে একেকরকম সৌন্দর্য। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার আমরা ২ জন ছাড়া আর তেমন কাউকে দেখি নাই। আমরা হাঁটতে হাঁটতে হেলি-প্যাড পর্যন্ত চলে আসলাম। পুরো জায়গাটা নির্জন। কেউ নাই। আমি চিৎকার করে বললাম
– আই লাভ ইউ রনি ভাইয়া।
আমার কাণ্ড দেখে রনি ভাইয়া জোরে জোরে হাসতে লাগলো
আমার খুব রাগ উঠলো। আমি রেগে বললাম
– তুমি একটুও রোম্যান্টিক না।
– আমি রোম্যান্টিক না? তাহলে দেখ।
আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁট চুষতে লাগলো ।
আমি ঝটকা মেরে সরে বললাম।
– তোমার মাথা খারাপ। কেউ দেখে ফেললে?
– সেটাই তো মজা। সবাই কে দেখিয়ে প্রেম করা।
– এটা আমেরিকা না বাংলাদেশ। একেবারে মেরে ফেলবে।
– হু । সে জন্য তো আমেরিকা যাওয়ার চেষ্টা করছি।
– মানে?
– টফেল জিআরই দিলাম। স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করছি।হয়ে যাবে।
আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। রনি ভাইয়া চলে গেলে আমি কিভাবে থাকবো ।
– আরে মন খারাপ করছিস কেন? এখনো তো যাই নাই। আগে যাই তারপর মন খারাপ করিস। আমেরিকা যাওয়া অতো সহজ নয়।
আমার মাথা হাত দিয়ে মাথার চুল গুলো এলো মেলো করে দিলো রনি ভাইয়া।
নাস্তা করে আবার বান্দরবান এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। হোটেলে পৌঁছেই আমাদের দুই জনের মন কেমন যেন খারাপ হয়ে গেলো। আমাদের দুই জনেরই পরান পুড়ছে ঘরের জন্য।আমি বললাম
– রনি ভাইয়া চল বাড়ি যাই। আম্মুর হাই ব্লাড প্রেসার। চিন্তা করে করে যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা তো জানিয়ে আসি নাই।
– কথা ভুল বলিস নাই। আম্মুরও ডায়াবেটিস।চিন্তা করলে তো ডায়াবেটিসও বাড়ে। নাহ দেরি করা ঠিক হবে না। চল ফেরত যাই।
*
বাড়ি ফিরে দেখি বাড়ি ঘর পুরো নীরব । ঝড় আসার আগে যেমন চারিদিক শান্ত হয়ে যায় ঠিক তেমন। আমি যেয়ে দাদিয়ার ঘরে আশ্রয় নিলাম। এটাই সবচেয়ে সেফ জায়গা।কিন্তু দাদিয়া শুরু করলো তার ঘ্যান ঘ্যানে গল্প। সেটাও একটা শাস্তি বটে। অবাক হলাম আব্বু , বড় চাচু কেউ আসছে না ধমকাতে মারতে। মাঝখান দিয়ে আম্মু আর বড় চাচি আসলেন। দুই জন মিলে অনেকক্ষণ ধমকালো। ধমকানোর বিষয় বস্তু হল আমরা বিবেকহীন। আমাদের জন্য আব্বু , ছোট চাচু আর বড় চাচুর পা মচকে গিয়েছে। এখন বুঝলাম তাদের না আসার কারন।পা মচকে যাওয়ায় ঘর থেকে বের হতে পারছে না। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে অবাক হলাম আমাদের কারণে পা মচকাবে কেন? পরে শুনলাম গাড়ি নষ্ট হওয়ায় একটা রিকশায় তিনজন উঠে আমাদের খুঁজতে বের হয়েছিলেন।হাসপাতাল , থানা, নানা আত্মীয়র বাসায়। কিন্তু রিকশা এতো ওজন নিতে পারে নাই। উল্টে গেলো। আর তখন ড্রেনে পরে তিনজনেরই পা মচকে গিয়েছে।
রাতে বড় চাচু মিটিং ডাকলেন। বিষয় রনি ভাইয়ার বিয়ে। আমি রনি ভাইয়া আর ছোট চাচুর ২ ই মেয়ে রুমকি চুমকি ছাড়া সবাই আমন্ত্রিত। আজকে দেখলাম ১০ টা বাজতে না বাজতে সবাই বড় চাচুর ঘরে যাচ্ছে। এমনকি দাদিয়া পর্যন্ত পানের বাটা নিয়ে হাসি হাসি মুখে বড় চাচুর ঘরে ঢুকলেন। উত্তেজনায় আমি ছটফট করছি। ওখানে কি হয় শুনতেই হবে আমাকে। দাদিয়া ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। আমি যেয়ে কান পাতলাম দরজায়। সব পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। দাদিয়া বলছেন
– আমার দাদু ভাইয়ের কি হয়েছে আমি জানি।
উত্তরে বড় চাচু বলল
– তুমি জানো কেন রনি বিয়ে করছে না?
– জানি মানে সন্দেহ করছি।
– কি সন্দেহ মা? আগে বল নাই কেন?
– তোরা কি আমায় গোনায় ধরিস যে বলবো ?আমি তো ঘরের এক কোনে পরে থাকি।
– আচ্ছা মা অভিমান বাদ দিয়ে বল কি সন্দেহ করছো তুমি?
– দাদুভাই রে ডাক্তর কবেরাজ দেখা
– ডাক্তর কবেরাজ কেন?
– সব ভেঙ্গে বলতে হবে? কিছু বুঝোস না।মাথায় কি গোবর পড়া ?
এই বার সবাই বুঝতে পারলো।
– মা তোমার এত বুদ্ধি। আমাদের মাথায় তো আসলই না। নাহ রনি কে একজন ভাল যৌন বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে।
ছোট চাচু বিজ্ঞের মত বলল
– কলিকাতা হারবাল ও শুনেছি ভাল
আব্বু বলল
– তোর মাথা । ওখানে নিয়ে ছেলেটা কে নিয়ে আরও অসুস্থ বানাই
চাচু বলল
– কলিকাতা হারবাল খারাপ এই কথা কে বলেছে?
– কলিকাতা হারবাল যে খারাপ না সেটাই বা নিশ্চিত হোশ কেমনে?
সবার মাঝে একটা রনি ভাইয়া কে কোথায় নিলে ভাল চিকিৎসা হবে তা নিয়ে একটা গণ্ডগোল শুরু হল।
এইসব কথা শুনে আমি আর হাসি চেপে রাখতে পারছিলাম না। দৌড়ে ঘরে চলে গেলাম।সব বললাম রনি ভাইয়া কে।
রনি ভাইয়া বলল
– এইবার তাহলে দেশ থেকে পালাতে হবে।
– কিভাবে?
– তোকে বলি নাই। আমি আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্সে ফান্ড পেয়েছি। চলে যাবো আগামী মাসে। আজকেই বাসার সবাই কে জানাবো
আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো
– আমার কি হবে তাহলে? আমি একা থাকবো কিভাবে তোমাকে ছাড়া ?
– আরে তোর তো মাত্র ২ বছর আছে পাশ করতে। তারপর তোকে নিয়ে যাবো আমেরিকা।
– ২ বছর অনেক সময়।
– আমি এক বছর পর পারলে এক বার আসবো।
এইবার মনে একটু শান্তি পেলাম। হাসি ফুটলো আমার মুখে।

এয়ারপোর্ট
আজ রনি ভাইয়া চলে যাচ্ছে আমেরিকা। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু কি করবো। ইতোমধ্যে মা , বড় চাচি , ছোট চাচি মরা কান্না জুড়েছে। অপরদিকে দাদিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কাঁদতে কাঁদতে। তাকে বাসাতে রেখে আসা হয়েছে। বড় চাচু এতো শক্ত মানুষ তার চোখেও পানি।রনি ভাইয়া সবার কাছে বিদায় নিলো ।দেখি তার চোখেও পানি। ভাইয়া সবার বাঁধন ছেড়ে পিছনে আমাকে ফেলে চলে গেল স্বপ্নের দেশ আমেরিকা।

রনি ভাইয়ার অনুপস্থিতি আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে ।আমি মানিয়ে নিতে পারছি না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সব কিছুতেই রনি ভাইয়া ছিল। সবচেয়ে মিস করি তার রাতে ঘুমানোর আগের চুমু। এখন রনি ভাইয়ার সাথে কথা হয় না তা না। রনি ভাইয়া কয়েক ঘণ্টা পর পর ফোন দেয়। রাতে স্কাই-পি তো আছে। কিন্তু তাকে তো স্পর্শ করতে পারি না। তার বুকে মাথা রাখতে পারি না। যখন তখন খুনসুটি করা হয় না।কবে যে রনি ভাইয়া দেশে আসবে?মাঝে মাঝে কান্না আসে।আমি খুব পড়া শোনা করছি আজকাল। যে ভাবেই হোক আমাকে আমেরিকা যেতে হবে।নাহলে আমাকেও তো বাসা থেকে বিয়ে দিয়ে দিবে। আর রনি ভাইয়ার সাথেও থাকা হবে না।

হটাত আজকে ঘুম থেকে উঠেই বাসার সবাই কে খুব খুশি খুশি দেখছি। দাদিয়া মিটি মিটি হাসছে। বড় চাচু খুশি মনে পেপার পড়ছে আর চা খাচ্ছে। সকালবেলা বড় চাচু চিৎকার করবে না চা এ পিঁপড়া পাওয়া গিয়েছে বলে এটা অসম্ভব। অথচ এই অসম্ভব আজ সম্ভব। আম্মু চাচি রাও অনেক খুশী।এমনকি আমাদের রান্নার খালা রহিমার মাউ ফিক ফিক করে হাসছে। আমি আম্মু কে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম
– আম্মু কি হয়েছে বল তো ?
– কি আবার হবে?
– সবাই এতো খুশি কেন?
– আরে তোর রনি ভাই তো বিয়ে করতে রাজি। নিজেই পাত্রী ঠিক করেছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । আগামী মাসে বাংলাদেশে আসবে ২ জন। তখন বিয়ে।
কথা শুনে তো আমার মনে হল মরে যাই। বিদেশে যেয়ে তাহলে এই অবস্থা? আমাকে এইভাবে প্রতারিত করা হল?কই প্রতি দিন কথা হয় । একবারও আমাকে বললো না। উলটা বলে “আলাবু”।গুল্লি মারি ‘আলাবু’ আমার এর জবাব চাই। ক্ষোভে অভিমানে সাথে সাথে ফোন দিলাম রনি ভাইয়া কে।
আরে বাবা তুই এত খেপছিস কেন?
খেপবো না? তুমি বিয়ে করে সংসার করবা আর আমার কি হবে?
আরে এই বিয়ে তো সেই বিয়ে না।
তাহলে?
একে বলে চুক্তি বদ্ধ বিয়ে। একেবারে যাতে বিয়ের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে যাই এই জন্য এই বিয়ে করছি।
মানে
মানে যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি সে লেসফিতা মানে হল লেসবিয়ান আর আমি গে। আমরা বন্ধু। বিয়ে করে সে তার মত থাকবে। আর আমি আমার মত। শুধু সমাজের কাছে আমরা স্বামী স্ত্রী থাকবো । বুঝলি?
হ্যাঁ বুঝলাম।
এখন খুশি হও। আগামী মাসে আসছি।
আমি জোরে চিৎকার দিলাম……… হুররে

ভাইয়া এখন বাসায়। সারাদিন হই হুল্লোড় চলছে। বিয়ের শপিং শুরু হয়ে গেছে। এমনকি দাদিয়া পর্যন্ত শপিঙে যাচ্ছে। রনি ভাইয়া আমার জন্য একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা এনেছে।আমি ফটাফট ছবি তুলে যাচ্ছি। আগামী কাল হবু ভাবী আসবে বাসায়। ভাবী নাকি নিজেই আসতে চাইছে।আমি ও খুব উৎসুক ভাবী কে দেখার জন্য।
বিকেল হয়ে এসেছে।রনি ভাইয়া বললো
চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
কই?
দিয়াবাড়ি যেয়ে কাশফুল দেখে আসি।
আমি রাজি হয়ে গেলাম।রনি ভাইয়াই ড্রাইভ করলো। জায়গা টা খুব সুন্দর ।কাশফুলে ছাওয়া। কিন্তু খুব নির্জন। আমরা একটা গাছের আড়ালে বসলাম। তারপর রনি ভাইয়া আস্তে আস্তে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলো । তাহলে এই মতলবে দিয়াবাড়ি আসা। আমি এতক্ষণে বুঝলাম। আমার রাগ উঠলো না। উল্টো আমিও ভালবাসার সাগরে ভেসে গেলাম। কতদিন পর তার স্পর্শ পেয়েছি। তা কি হেলায় হারানো যায়?

আজকে ভাবী আসবে। সবাই খুব উত্তেজিত। নতুন বৌ। ছবি দেখেছে। কিন্তু সে নাকি ৫ বছর আগের ছবি। ভাবী নাকি ৫ বছর যাবত ছবি তুলেন না। ছবি তুলতে তার এলারজি।
রনি ভাইয়া ড্রাইভ করে ভাবী কে নিয়ে আসলেন। ভাবী কে দেখে সবাই কেমন বিমর্ষ হয়ে পড়লো। হবার ই কথা। চুল গুলো একদম ছোট গুড়ি গুড়ি করে কাটা ।ঠিক ছেলে দের মত। তাও আবার লাল রঙ করা।পরেছে জিন্স আর হাতা কাটা শার্ট। দাদিয়া কে দেখলাম মুখ বাঁকাচ্ছে। আম্মু ভাবী কে নিয়ে বসালেন বসার ঘরে।
– মা তোমার নাম টি বল তো। রনি কি সু বলে।
আনটি আমার নাম তো “সু” ই।
– কি? “সু”?
– হ্যাঁ আন্টি। আসলে আমার নাম ছিল সুজানা। কিন্তু সবাই সংক্ষেপে ডাকে “সু” । আমারও সু শুনতেই বেশি ভাল লাগে।আন্টি আপনি বলেন ভাল লাগে না?
– না না ভাল লাগে। খুব সুন্দর নাম।
পিছন থেকে দাদিয়া আমার কানে কানে বলল
– সু না হলে গু হলেই ভাল হত। যে না পোশাক পরিচ্ছদ ,চেহারার ছিরি। এ কি পছন্দ করেছে আমার দাদু ভাই।
ভাবী চলে যাওয়ার পর মিটিং বসলো বড় চাচুর ঘরে। সবাই এক বাক্যে বলল এই মেয়ে চলবে না। কিন্তু রনি ভাইয়াউ এক বাক্যে বলে দিলো এই মেয়ে ছাড়া সে বিয়ে করবে না। আমেরিকা চলে যাবে। আর আসবে না।২ -৩ দিন এই ব্যাপার নিয়ে বিভিন্ন , মিটিং আলোচনা হল।সবার ই এক কথা এই মেয়ে , রনি ভাইয়ার উপযুক্ত না। কিন্তু বিয়ে না দিলে রনি ভাইয়া যদি আর না আসে, কিংবা কোন বিদেশিনী কে বিয়ে করে ফেলে?তার থেকে তো সুর সাথে বিয়ে দেয়া ভাল। শেষ পর্যন্ত সবাই রাজি হল। বিয়ের সানাই বাজলো বলে।
বিয়ে তে ভাবি কে অনেক সাজানো হল পার্লারে। সুন্দর লাগছিলো। কিন্তু চুলগুলো যা একটু সমস্যা করলো।পরে একটা উইগ পরিয়ে দেয়া হল। গায়ে হলুদে সবচেয়ে মজা হল।হলুদ দেয়া শেষে গান ছাড়তেই ভাবি তো আর কোনমতেই স্টেজে থাকতে পারলো না।ব্রেকাপ সং শুরু হতেই গায়ের গহনাগাঁটি খুলে হাত পা ছুড়ে সে কি নাচ। ভাইয়া কে পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলো নাচতে। আর আমাদের সাথে নাচল দাদিয়া। তাই বড় চাচু কিছু বলতে পারলেন না।
রিসেপশন শেষ হতেই ভাবি শাড়ি চুড়ি খুলে রেখে দিলেন। অথচ বাসায় অনেক অতিথি। তিনি জিনস আর ম্যাগিহাতা টি শার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।বড় চাচু তো রেগে মেগে কাই। বড় চাচি গেলেন শাড়ি পরতে বলতে।
– মা শাড়ি পরলে না আমি হোঁচট খেয়ে পরে যাই।একবার তো মাথাই ফেটে গেলো প্রায়। ব্রেন হেমরেজ যদি হয়ে যেত?
এর উত্তর আর কি দিবেন চাচি।
– তাতো মা ঠিক ই। ব্রেন হেমরেজ বলে কথা।
– জি মা । ব্রেন হেমরেজ হলে তো আমি মারাই যাবো।
চাচি পাংশু মুখে বের হয়ে এহেন।এহেন যুক্তির বিরুদ্ধে চাচি বা কি বলবে
যাই হোক আম্মু সমস্যার সমাধান করলো। ভাবি শেষ পর্যন্ত সালওয়ার কামিজ পরতে রাজি হল।
এই বউ নিয়ে ভাইয়াউ বেশী দিন আর দেশে থাকতে চাইলেন না।মানুষজন নানা কথা বলে। আবার ফিরে গেলেন আমেরিকা। এদিকে আমারও পড়াশোনা শেষ হয়ে আসছে। টফেল জিআরই এর জন্য কোচিং করছি। আর কয়েক মাস পর আমিও পারি জমাবো আমেরিকা।
পরিশিষ্ট
২ বছর পর
আমি এখন আমেরিকায়। রনি ভাইয়া আর আমি একসাথে থাকি। সাথে সু ভাবীও থাকে। এখন ভাবি আমার পিছনে লেগেছে তার গার্ল ফ্রেন্ড সিমা ওরফে সি কে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু তার গার্ল ফ্রেন্ড তার থেকেও এক ধাপ উপরে। পারলে ঘরে সুইম স্যুট পরে থাকে। এমন মেয়ে কে বাংলাদেশে নিয়ে বিয়ে করা কি ঠিক হবে? আপনারই বলুন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.