তোর বর্ষা চোখে,ঝরতে দেবো না বৃষ্টি

লেখকঃ মেঘ রাজ সাইমুন

১।
কাকভেজা হয়ে অফিসে ঢুকল সাইমুন।কফি হাতে হাসতে হাসতে সপ্ত এসে দাড়াল ওর সামনে।সাইমুন চশমা ঠিক করতে করতে বলল,”থাপ্পড় খাবি একটা।সামনে থেকে সর!”
সপ্ত এক চুমুক কফি নিয়ে ডেস্কে বসা ইরাকে ডেকে বলল,
-ইরা দি।একবার দেখো মুন বাবুকে!কি অবস্থা হয়েছে বেচারার!
ডেস্ক হতে ইরা একগাল হেসে বলল,
-তার জন্য তো তুই আছিস!ওয়াশরুমে নিয়ে স্নান করিয়ে আন ওকে।
মুন ল্যাপটপের ব্যাগ নিজের ডেস্কে রাখতে রাখতে বলল,
-ইরা দি!ঐ বাঁদরটার সাথে তুমিও শুরু করলে?
ইরা হাসতে লাগল।সপ্ত সামনে এসে মুনের চশমা খুলে নিয়ে রুমাল বের করে ঝাপসা কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে বলল,
-এই যা।তুই তো বৃষ্টির কারনে চোখেও ঠিক মত দেখতে পারছিস না।ইশরে!
-থাপ্পড় খাবি!তোর বকবকানি থামাবি?এফএম রেডিও একটা!
একগাদা বিরক্তি নিয়ে মুন ওয়াশরুমে চলে গেল।ইরা আর সপ্ত শব্দ করে হেসে উঠল।সপ্তকে চোখে ইশারা দিয়ে ইরা বলল,”আরে যা!”।
সকাল হতে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি।সাথে ঢাকা শহরের চির পরিচিত সেই যানজট।মতিঝিল থেকে সবুজবাগের এই দূরত্ব আজকাল খুব বিরক্তিকর লাগে মুনের কাছে।অফিসের জন্য মুনকে সেই ভোর চারটায় উঠতে হয়!একহাতে সব কাজ সেরে,সকালের নাস্তা তৈরি করে খেয়ে তারপর তড়িঘড়ি করে ছুটতে হয়।আজ বৃষ্টিতে ভিজে বেচারার দুরাবস্থা।তার উপর সকাল সকাল সপ্তের এসবে প্রচন্ড বিরক্ত হলো মুন।সেই ভার্সিটি লাইফ থেকে পিছে লেগে আছে তার।
-কিরে কাকভেজা হলি কিভাবে?গাড়ি আনিস নি?
-তুই বুঝিস না ন্যাকা?এই বৃষ্টিতে গাড়ি এনে মরবো।
-না ডেয়ার বুঝি না?তোর নিজের জিনিসের প্রতি যা দরদ।তা আমার জন্যও নেই বোধয়।
-দেখ সপ্ত!মজা নিবি না।থাপ্পড় খাবি!এমনিতে বৃষ্টিতে ভিজে হাচি শুরু হলো এখন।তুই পিছু পিছু ওয়াশরুমে আসলি কেন?যা ভাগ।
-আহারে!এই তোর তো নোজি পড়ছে বাচ্চাদের মত।আয় তো পরিষ্কার করে দেই।
-তোর মত বন্ধু থাকলে না শত্রুর দরকার পড়ে না।গাম্ভাট কোথাকার।থাপ্পড় খাবি।যা এখন থেকে!
-ঐ আমি পি করতে আসছি।তখন থেকে বয়ে বেড়াচ্ছি।
-পি টা আবার কি?
-প্রসাব করতে আসছি গাধা!
-ও বাব্বা।তো সেটা বললেই তো হয়।আচ্ছা দাড়া আমি ফ্রেশ হয়ে যেয়ে নি তারপর!
-ইশ আইছে।তোর জন্য আমার লাইনে দাড়াতে হবে নাকি?সর তো।
সপ্ত মুনের গা ঘেষে দাড়িয়ে পি কাজ সমাপ্তের অপেক্ষায়।মুন বেসিনের টাবে পানি ছেড়ে মুখে পানি দিতে দিতে বলল,
-সপ্ত একটু সরে দাড়িয়ে কর।
-ঐ আরামের সময় বিরক্ত করিস না তো।
-তুই দিন দিন বেহায়া হয়ে যাচ্ছিস!পানসিকে বলতে হবে।
সপ্ত প্রসাব করা রেখে মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এই না না।ঐ একটা চিসকে আমি প্রচন্ড ভয় পাই।প্লিজ বলিস না।
-এই ব্যস!পানসির কথা শুনেই তোর প্রসাব বন্ধ হয়ে গেল।শালা প্যান্টের চেইন আটকা!
মুন মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।সপ্ত নিচের দিকে তাকিয়ে জিহ্বা কেটে বলল,
-আহ ছিঃ।তুই কিছু দেখিস নি তো।তাহলে কিন্তু এভাবেই দাড়িয়ে থাকব।
মুন হাসতে হাসতে বলল,
-আরে না আমি কিছু দেখি নি।তুই যা তো এখান থেকে।
-দেখলে দেখ।আমরা আমরাই তো।
বলেই সপ্ত নিজের প্রাইভেট পার্টস ঠিক করল।আয়নায় সপ্তকে হাসতে দেখে মুন বলল,
-থাপ্পড় খাবি।বলদের মত না হেসে ফোনটা ধর।পানসি ফোন করেছে।
সপ্তের বুকের ভিতর হৃৎপিন্ডের কম্পন বেড়ে গেল।সে দ্রুত ফোন পিক করে বলল,
-সোনা!বল বাবু।
ওপাশ থেকে কি প্রক্রিয়া হলো কে জানে।সপ্ত দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মুখে একবার মুনের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।মুন মনে মনে বলল,”বেচারা!প্রেমিকার কাছে ভেজা বিড়াল”।
ডেস্কে ফিরে দেখে সপ্ত মুখ ভার করে বসে আছে।ইজি চেয়ারটা আস্তে করে ইরার ডেস্কের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-ইরা দি!বাঁদরটার আবার কি হল?
-পানসি বকছে নিশ্চয়।তুই সামলা গিয়ে যা তো।তোদের দুটোর ড্রামা দেখতে দেখতে আমার কাজের বারোটা বেজে যায়।ওদিকে গিয়ে মর দুটোতে।কাজ করতে দেয়।কালকের রিপোর্ট তৈরি হয়নি এখনো।বস্ এসে চিল্লাচিল্লি করবে।
মুন চেয়ারটা সপ্তের কাছে নিয়ে সপ্তের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-কি হয়েছে বস।মন খারাপ?
সপ্ত হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল,
-সর তো কিছু হয়নি।ভালো লাগছে না।
-থাপ্পড় খাবি।কি হয়েছে বল?
-আরে আমার অফিসে কাজের ঝামেলায় বাঁচি না।মহারাণী হুকুম করেছে তাকে নিয়ে এখন ডেটিংয়ে যেতে হবে।এই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি,তার উপর যানজট।সর্বোপরি অফিসের চাপ সামলে কি করবো বল।আজকেও প্রোগ্রাম রেডি না করতে পারলে বসের ঝাড়ি খেতে হবে।কি যে করি?
মুন মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
-এই কথা।
-আররে বাব্বা!এমন ভাবে বলছিস যেন কিছুই না।
-হুম কিছুই না।তুই যা।
-আমার অফিস!কাজ?
-আমি দেখছি।তুই যা তো।
সপ্ত খুশিতে লাফিয়ে উঠল।অফিসের সব স্টপের চোখ পড়ল।সবাই হা করে তাকিয়ে রইল।মুন বলল,
-আরে আস্তে।কুল ডাউন।সবাই দেখছে।
সপ্ত লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে চুলকাতে চুলকাতে বলল,
-থ্যাংক ইউ দোস্ত।
-থাপ্পড় খাবি।যা ভাগ।
সপ্ত নিচু হয়ে মুনের গালে একটা চুমু দিয়ে ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।ইরা মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,”তোরা দুটোতে কি পাগল না কি?”
যতক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে ততক্ষণে মুনের সব কাজ শেষ হয়ে গেছে।অফিসের সকল স্টপ অবশ্য চলে গেছে।পিয়ন রামু এসে বলল,
-সাইমুন বাবা।আর কতক্ষণ?
-ও রামু কাকা।আমার হয়ে গেছে।আপনি ক্লোজ করেন দিন।
অফিস থেকে বেরিয়ে মুন ভাবল গাড়িটা না এনে ভুল করেছে।এখন বাসায় গিয়ে কাজ নেই।ক্লান্ত শরীরে রান্না করে খাওয়ার মুড নেই।বরং ক্লাবে যাওয়া যাক।সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ফুটপাত ধরে হাটা শুরু করল।ঢাকা শহরে রাত বারো টা কিছুই না।হাজার হাজার মানুষের আনাগোনা।জীবন ও জীবিকার সন্ধানে এখানে অগনিত মানুষের ছোটাছুটি।আজকাল নিজেকে বড্ড একা লাগে মুনের।এতো মানুষের ভিড়ে তার একটা মানুষ নেই যার কোলে মাথা রেখে দুফোঁটা চোখের পানি ফেলবে।এ শহরে পাথরের মূর্তির মত বেঁচে আছে সে।জীবনের প্রয়োজনে জীবনকে বয়ে বেড়ানো।রাত একটার দিকে সপ্তের ফোন এলো।
-তুই আবারো মদ খেয়েছিস?সেদিন না বললি মদ ছেড়ে দিয়েছিস!
মুন আওড়ানো ভাষায় অস্পষ্টভাবে বলল,
-তুই টেনশন করিস না।আমার কিচ্ছু হবে না।
-সেতো বুঝতেই পারছি!কি হবে আর কি হবে না।
-নো টেনশন সুইট হার্ট।
-তুই কোন বারে আছিস বল।আমি আসছি।তোর সাথে তো গাড়িও নেই।
-থাপ্পড় খাবি শালা।তোর আসতে হবে না।আমি ঠিক আছি দোস্ত।
সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই হুড়মুড় করে শব্দ হলো।সপ্ত “হ্যালো,হ্যালো” করেই যাচ্ছে।শেষে ফোনটা কেটেই গেল।সপ্ত চিন্তা নিয়ে বলল,”শালা আজও মদ গিলেছে!একে নিয়ে যে কি করি?ধ্যাত!”
এ বারের ম্যানেজার বাবুলালের পরিচিত কাস্টমার সাইমুন।বিগত তিন বছর মুন এ বারে আসছে।ছেলেটার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে তার।তাকে প্রায় সময়ই দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলতে শোনা যায়,”কে জানে?কত শত কষ্ট ছেলেটার বুকের ভিতর জমেছে!ভগবানই জানে।”শেষে তিনিই কোন এক ছেলেকে দিয়ে মুনকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।
মেঘ রাজ সাইমুন
মেঘ
২।
ঘুমের ঘোরে কারোর বুকের উপর গিয়ে হাত পড়ল মুনের।পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল একটা ছেলে নিষ্পাপ শিশুর মত ঘুমিয়ে আছে তার বিছানায়।তখন অবশ্য চারদিকে ভোরের আভা ঝড়িয়ে পড়েছে।ফ্লাটের নীল কাঁচের ভিতর দিয়ে সূর্যের আলো তার চোখেমুখে পড়েছে।ফর্সা লোমশহীন বুক আধখোলা!বাকিটা নিজেকে সে বেডসিট দিয়ে আবৃত করেছে।মুনের রাতের কথা কিছুই মনে পড়ছে না।তবুও সে চিন্তিত নয়।এমন প্রায় ছুটির দিনে হয়।সে হয়তো আদিম খেলার জন্য রাতে কাউকে এনেছে।ভোরের আলোয় ফুটতেই তার মাথা থেকে সমস্তটা চলে গেছে।গত তিন বছরে যেন এটাই নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে তার জীবনে।আসলে ভালোবাসাকে আজকাল বড্ড ভয় পাই মুন।রক্তের ভালোবাসা যখন তুচ্ছ করলো তখন কার ভালোবাসাতে কি এসে যায় তার?ছেলে সমকামী জেনে বংশের মান সম্মানের ভয়ে যখন পিতা সমস্ত কাপড় চোপড় গুছিয়ে এনে বলল,”তুমি আসতে পারো!তোমার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই।আজ থেকে ভাববো উৎস ই আমাদের একমাত্র ছেলে”।তখন জন্মদাত্রী মা,যে দশমাস দশ দিন তাকে গর্ভে ধারণ করেছে!সেও পিতার মুখের উপর কিছু বলল না।ভয়ে নাকি ঘৃণায় আজও মুনের অজানা।সেদিন হয়তো মা ভেবেছিল এমন কুলাঙ্গার সন্তান থাকার চেয়ে না থাকা ভালো।উৎস সেদিন মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,”মা ভাইয়াকে যেতে দিও না!”তার মা উৎসের মুখ চেপে ধরে রেখেছিল।নামিদামি কোম্পানিতে চাকরির এক বছর চলছিল তখন।সেই স্বার্থে ঢাকার মতিঝিলের এ ফ্লাটে থাকা তার।কিন্তু পরবর্তী বছর সে শিফট হলো কোম্পানির সবুজবাগ শাখায়।সেখানে ভার্সিটি জীবনের বন্ধু সপ্তকে ফিরে পাওয়া,ইরা দি কে পাওয়া।কই সপ্ত বা ইরা দি তো কখনো তাকে সমকামী বলে ঘৃনা করে না।তাহলে আপন রক্ত কেন এমন করে।প্রথম প্রথম উৎস চুরি করে ফোন করতো আজ দুবছর সেই ভাইটির গলা ধরা কন্ঠও শোনা হয় না মুনের।ছলছল চোখ নিয়ে উঠে গেল মুন।অনেক বেলা হয়ে গেছে আজ।অফিস নেই,তবুও ব্রেকফাস্টে তো কিছু একটা করতে হবে।ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখল ছেলেটি জেগে গেছে।ঘুম ঘুম চোখে বিছানায় বসে টলছে আর মাথা চুলকাচ্ছে।শুধু একটি বার মুনকে বলল,
-ওয়াশরুমটা কোথায়?
মুন বিস্ময় চোখে তাকিয়ে বলল,
-রুম থেকে বেরিয়ে ডানে।
ছেলেটি শুধু শর্ট পরা অবস্থায় ওভাবেই বেরিয়ে গেল।এখন পর্যন্ত একটিবার ও মুনের দিকে ফিরে দেখে নি।মুন পোষাক পরিবর্তন করে কিচেনে গেল ব্রেকফাস্ট রেডি করতে।ফিরে এসে দেখল ছেলেটি বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।মুন কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
-তোমার নামটায় তো জানা হলো না?
-ইমু।
-ওহ।আচ্ছা তুমি কি বেরিয়ে যাচ্ছো?
-হ্যা।
-সে কি নাস্তা করবে না?তাছাড়া তুমি তো গোসল ও করলে না।ফ্রেশ হও,নাস্তা কর।তারপর যেও।
-না।
ইমুর এতো এক কথায় উত্তরে মুন বুঝছে না পরবর্তী প্রশ্ন কি করা যেতে পারে যাতে তার কন্ঠস্বর অনেকটা দীর্ঘ হয়।ইমু শার্ট গায়ে জড়াতে জড়াতে অপ্রত্যাশিত ভাবে বলল,
-কামরসের মাতাল গন্ধ আমার ভালো লাগে।সারাটা দিন নষ্ট শরীরে আপনার দেয়া ভালোবাসা ধরে রাখবো।রাতে নিজের শরীরকে পানি দিয়ে পাপমুক্ত করবো।
-তোমার কি মনে হয়?শরীরে পানি দিলেই পাপগুলো সব ধুয়ে যাবে!
-কেন নয়?আল্লাহ পৃথিবীতে পানি দিয়েই তো সব ময়লা,কালিমা দুর করা হয়!
– শরীর আর বস্তু কি এক জিনিস?
ইমু মুনের দিকে স্থির চোখে একবার তাকিয়ে বলল,
-আমার অত্যন্ত সেটাই মনে হয়।
মুন বুঝল ইমুর সাথে তর্কে যেয়ে লাভ নেই।সে বলল,
-এক মিনিট বসো আমি আসছি।
বলেই দ্রুত কিচেনে চলে গেল।ইমু হাতে ঘড়ি বেঁধে বিছানায় বসে মোবাইলে মনযোগ দিল।মিনিট দুয়েক পর মুন একটা প্লেটে একটা ওমলেট ডিম আর দুটো পরোটা নিয়ে ইমুর সম্মূখে ধরে বলল,
-এটা খাও।
ইমু বসা অবস্থায় উর্ধ্বমুখী হয়ে মুনের দিয়ে তাকিয়ে বলল,
-আমি ডিম খাই না।গন্ধ লাগে।
-পরোটা দুটো খাও।
ইমু প্লেটটা নিয়ে কোলের উপর রাখল।মুন বলল,
-ওকে তুমি খাও আমি আসছি।
ইমু একটা পরোটার কিছুটা খেয়ে সাইড টেবিলে রেখে দিল।বহির্মুখী দরজার কাছে গিয়ে দরজায় পিঠ এলিয়ে দাড়াল।
“এটা রাখ” চোখের সামনে কিছু টাকা দেখে চোখ তুলে তাকালো।দেখল মুন চোখের চশমা ঠিক করছে তার সামনে দাড়িয়ে।হাতটা তার দিকে প্রশস্ত।ইমু কিছুটা বিব্রতভাব নিয়ে বলল,”আমি টাকা নেয় না”।
-কেন?
-টাকার জন্য সঙ্গম করতে হবে এমন দুরাবস্থা আমার নেই।নেহাৎ ভালো লাগে তাই করি।
-ওহ।তবুও নাও।ভালোবেসে তোমাকে দিলাম।
‘ভালোবেসে’ পুনরাবৃত্তি করে ইমু হেসে উঠল।
-আচ্ছা আপনিই বলুন।টাকা আমি কেন নিবো?দৈহিক সুখ তো দুজনেরই হয়েছে।লাভ দুজনেরই।সমান সমান।সো টাকার কি হলো এখানে?
-না মানে সবাই তো নেয়।তাই আর কি!
-তার জন্য আমাকেও নিতে হবে?ইউ নো,আই অ্যাম নট এ কল বয়।
-ওরে বাপরে।সরি বাবা।আমার ভুল হয়ে গেছে।
মুনের হাত জোড় দেখে ঠোঁট হালকা প্রসারিত করে ইমু হেসে উঠল।
-আপনি তো বেশ ফাজিল টাইপের।
-তো এই ফাজিলটাকে কি আপনার মহামূল্যবান আজকের দিন টা দেওয়া যাবে?যদি আপনার মর্জি হয়।
ইমু হাতের তর্জনী আঙ্গুল ঠোঁটের কাছে নিয়ে ঠোঁটে হালকা আঘাত করতে করতে উপরে চোখ দিয়ে চিন্তিত স্বরে বলল,
-দেওয়া যেতে পারে।তবে একটা শর্তে?
-কি শর্ত বলুন জনাব?
-আমাকে অাইক্রিম,ফুচকা,হাওয়া মিঠাই খাওয়াতে হবে এন্ড পপকর্ণসহ সিনেমা দেখাতে হবে।রাজী?
-জো হুকুম জাঁহাপনা।আপনি এবার শাওয়ারটা নিন তাহলে।
-ইশ।বললাম না আমার কামরসের গন্ধ ভালো লাগে।
-থাপ্পড় খাবি।
ইমু কেঁপে উঠল।মুন জিহ্বা কেটে বলল,
-সরি।অভ্যাস হয়ে গেছে।বন্ধুকে বলতে বলতে।
ইমু হেসে উঠে বলল,”ওহ”।মুন মাথা চুলকাতে লাগল।
সারাদিন পর রাত দশটায় খিলগাঁও এর এক বড় বাড়িতে এসে মুনের প্রাইভেট কার টা থামল।ইমু নেমে গিয়ে ড্রাইভার সিটে বসা মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-স্যার কি আসবেন?
-আজ নয়।অন্য কোনদিন।
-কি জানি আর দেখা হবে কি না!
-তুমি চাইলে হবে।
-আমাকে মনে ধরল নাকি আবার?সাবধান!আমি রিলেশনে বিশ্বাসী নয়।আই জাস্ট ইনজয় সেক্স।আদারওয়াইজ নট।
-হুম বুঝলাম।তোমার নাম্বারটা দেয়া যাবে?
-কেন?
-ওকে লাগবে না।
-অভিমান ও হয় আপনার।দেখে কিন্তু মনে হয় না।
-একদম না।কোন অধিকারে অভিমান করতে যাবো?তো দেখে আর কি কি মনে হয় না?
-থাক আজ বলব না।বরং নাম্বার টা নিন।
ইমু নিচু হয়ে মুনের মাথা ধরে গাড়ির কাঁচের গন্ডি পেরিয়ে মুনের ঠোঁটে হালকা চুমু খেয়ে বলল,
-রাতে অচেতন ছিলেন।স্বাদটা ঠিক বুঝি নি।এখন টেস্ট করে নিলাম।
-ফাজিল ভাগো।
রাজনীতিবিদ বাবা আর পার্লারশিয়ান মায়ের অনাদরে বেড়ে উঠা ইমু অনকটা নষ্ট হয়ে গেছে।অর্থের অভাব ঠিক নেই,কিন্তু ভালবাসার চরম অভাবে সে আজ এতোটা বদলে গেছে।দেহের চাহিদা মেটাতে সমমনার মাঝে নিজের ভালোবাসা খুঁজতে চাই।কিন্তু সে কি আদৌ জানে,নিয়ম করে পুরুষের চেইন খুলে কামরসে নিজেকে ভেজালেই ভালোবাসা মেলে না।মনের ভালোবাসা না মিললে দেহের ভালোবাসা দিয়ে কখনো মনকে পিপাসা মুক্ত করা যায় কি?
মেঘ রাজ সাইমুন
মেঘ
৩।
-ইরা দি।তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো?
পিছন ফিরে তাকিয়ে ইরা বলল,
-ওহ তুই।সপ্ত কি বলবি বল?আমার তাড়া আছে।
-তাড়া নিয়ে শুনলে হবে না।তুমি সিরিয়াস হও।
ইরা একগাল হেসে চেয়ার টা টেনে সপ্তের সম্মুখে বসে বলল,
-ওকে বল কি বলবি?আমি সিরিয়াস!
-তুমি মুনের কিছু জানো!পরশু আবারও ড্রিংক করেছে।
-ছেলে মানুষ একটু খেলে কি হয়?তোর দাদাবাবু তো রোজ খেয়ে ঘরে ফেরে।
-মজা করো না তো।শুধু কি তাই।কোন ছেলেকেও যেন নিয়ে গেছিল ফ্লাটে!
-বুঝলাম।কিন্তু তোর ওতো ফাটছে কেন?পানসির মত ওর কি একটা গার্লফ্রেন্ড আছে।হতে পারে ও গে।তাই বলে কি শরীরের চাহিদাকে অস্বীকার করবে?
-তাই বলে এতো ছেলেকে ইউজ করবে?
ইরা হেসে বলল,
-তো তুই ওকে একটা বয়ফ্রেন্ড জোগাড় করে দে না!
-আমার খেয়ে দেয়ে অনেক কাজ।ফাও কাজের সময় নেই।
ইরা দরজায় চোখ ইশারা দিয়ে বলল,
-ঐ তোর পিয়ারের বন্ধুটি চলে এসেছে।যা ওর সাথে গিয়ে ঝগড়া কর।আমাকে কাজ করতে দে।
মুন এসেই অফিসের বেলকনিতে চলে গেল।সপ্ত বুঝে গেল কারনটা।এখন গিয়ে সিগারেট ফুঁকবে।বলতে গেলেই বলবে,”তুই তো জানিস সিগারেট কেন খাই।”তবুও সপ্ত গিয়ে সবুজবাগের চলতি রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-তুই সিগারেট ছাড়বি না তো?
-না।তোর প্রোব্লেমটা কোথায়?
-জানিস না প্রোব্লেম টা কোথায়?
-থাপ্পড় খাবি।তোর মনের কথা আমি কিভাবে জানবো?
-ওতো সব বুঝি না তুই সিগারেট খাবি না।
-কথা দিতে পারবো না।তবে চেষ্টা করবো!
-আচ্ছা পৃথিবীতে সবার কি বাবা মা থাকে?তাছাড়া আমি তো আছি।আমি কি তোর কেউ না?
-আমি কি বলেছি তুই আমার কেউ না।
-দেখ বাবা মা এখানে থাকলে আমি নিশ্চয়ই তোকে তাদের আরেকটা ছেলে হওয়ার দাবি করতে পারতাম।থাকি মামা,মামির কাছে তারা তো এসব মানবে না।
-আরে আমি বিন্দাস আছি।তুই চাপ নিস না সপ্ত।
-সে তো দেখতেছি।কাল কাকে আবার বিছানায় নিলি?
-কেন তোর কি দরকার?
-তুই আনবি না আর কাউকে।অত্যন্ত এভাবে তো নয়ই।আমার খারাপ লাগে।
-কি রে আজকাল তুই আমার ব্যাপার এতো জেলাসি কেন?আমার মতো গে হলি নাকি?পানসিকে বলতে হচ্ছে বিষয়টা!
-একদম হাসবি না।আই অ্যাম সিরিয়াস।এভাবে জীবন চলে না মুন।কাউকে অত্যন্ত স্থিরভাবে নে।
মুন বিরক্ত হয়ে বলল,”আই অ্যাম সাইমুন!ডোন্ট কল মি মুন।”
সপ্ত কিছুটা হতাশ হয়ে বলল,”আচ্ছা”।
কিছুটা নীরব থেকে বলল,”রাহাতের কি খবর?”
-যোগাযোগ নেই।
-লাইফে একজন তোকে ধোকা দিছে তার মানে এটা কখনো নয় যে সবাই রাহাতের মত হবে!
-এখন আর ভালোবাসতে ভালো লাগে না।
-বিছানায় এর ওর সাথে তো কত ভালোবাসা অপচয় করিস!সেই টুকরো রাতের অজানা নিশি বালককে দেওয়া টুকরো ভালোবাসাগুলোকে জড় করো কাউকে একটু দে।দেখবি তোর চেয়ে সুখী এ পৃবিথীতে কেউ হবে না।
-তোর তত্ত্ব কথা রাখ।
-আবার সিগারেট ধরিয়েছিস?
সপ্ত সামনে গিয়ে বেলকনির রেলিং ধরে মুনকে জড়িয়ে টান দিয়ে মুখ থেকে সিগারেট ফেলে দিল।মুন বিরক্ত হয়ে বলল,”ধ্যাত!তুই আমাকে জ্বালিয়ে মারলি।থাপ্পড় খাবি।”মুন চলে গেল।সপ্ত মনে মনে বলল,”আমার যদি ক্ষমতা থাকতো আমি তোকেই ভালোবাসতাম।কিন্তু আমি নিরুপায়।হয়তো আমি তোকে অনেক ভালোবাসি।সেটা তোর চাওয়া ভালোবাসার মত নয় দোস্ত।জানি তোর বর্ষা চোখ,যে চোখে কষ্টের মেঘ ছলছল করে সবসময়।তোর মত ভালো একটা ছেলের চোখে আমি কিছুতেই বৃষ্টি ঝরতে দিবো না।দেখিস আমি তোকে সুখী করবোই।”
এক ভোরে ইমুর ফোন এল।মুন ঘুম ঘুম চোখে বলল,
-এতো ভোরে?
-সাহেবের এখনো ঘুম ভাঙ্গেনি?
-হুম তো।
-অফিস নেই।পড়ে পড়ে ঘুম দিচ্ছেন যে।
-শরীরটা একটু খারাপ।জ্বর আসছে।উঠতে খারাপ লাগছে।
-সে কি মেডিসিন নেন নি?অসময়ে জ্বর এটা আবার কি?
-আরে গাধা শেষ রাতে জ্বরে ধরছে।মেডিসিন কিভাবে নিবো?
-ওকে আমি আসছি।
-এই না।তোমার আবার কষ্ট করতে হবে না।আমি সেরে উঠবো।
-থাক।আপনার ওতো ফর্মালিটি না দেখালেও চলবে।
রাখছি।
ফোনটা কেটে গেল।মুন বেডসিট গায়ে জড়িয়ে আবার ঘুমিয়ে গেল।কোন কিছুর টুনটুন শব্দে মুনের ঘুমটা আর দীর্ঘস্থায়ী হলো না।মুখের উপর থেকে বেডসিট সরিয়ে বলল,
-ও তুমি এসে গেছো।
-শুধু আসি নি স্যার।এসে আপনার সংসারের গোটা কাজ সারলাম।আপনার জন্য সাগু রান্না করলাম।এখন উঠে ফ্রেশ হবেন চলুন।
সাইড টেবিলে সাগু রাখতে রাখতে ইমু আবার বলল,”এই সাগু থাকলো এখানে।উঠুন তো।কি ধরে নিতে হবে নাকি?”
-আরে না।ওতোটা দুর্বল নয়।
-হুম জানি তো।সে রাতের কথা আমার মনে আছে!
বলে ইমু হাসতে লাগল।মুন ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতেই ইমু দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলে দিয়ে বলল,
-বাথরুমে গরম পানি আছে।শাওয়ারটা সেরে ফেলুন।
-এই না।আমার শীত লাগছে।
-কিছু হবে না।আপনি ঘেমে গেছেন।শাওয়ার নিলে রিফ্রেশ লাগবে।আমি ওষুধ আনছি।বেরলে খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।
মুন হালকা হাসি দিয়ে ওয়াশরুমের দরজা এটে দিল।ইমু বলল,
-আমি বাইরে আছি।কিছু লাগলে বলবেন!
মুন ভিতর থেকে বলল,”আচ্ছা”।
বিছানায় বসে বালিশে ঠেস দিয়ে মুন চোখ বুজে খেয়ে যাচ্ছে।শেষে বিরক্ত হয়ে বলল,
-আর না।এবার বমি করে দিবো।
-আর অল্প একটু আছে।চোখ বুজে খেয়ে নিন প্লিজ।
-আমি কি বাচ্চা নাকি।জোর করে গালে তুলে খাওয়াতে হবে?
-আলবাত বাচ্চা।একটুতেই কি অবস্থা শরীরের।ওকে শেষ।এবার মেডিসিনগুলো লক্ষ্মী ছেলের মত খাবেন।
ইমু গ্লাসে পানি এনে মুনকে মেডিসিন খায়িয়ে জিজ্ঞাসা করল,
-দুপুরে কি খাবেন?ফ্রিজে কি আছে?
মুন স্নিগ্ধ মাখা একটা হাসি দিয়ে চোখ দুটো খানিক বন্ধ করে খুলে বলল,
-ফ্রিজে সব আছে।তোমার যা ইচ্ছা রান্না করো।তোমার জন্যও রাঁন্না করো।
-আচ্ছা আপনার জন্য সফট কিছু করি।আর আমি নিজের জন্য একটু কিছু করে নিবো।
-ওকে স্যার।
-আপনি শুয়ে পড়ুন।ফ্যান থাকবে?
-থাকুক।
ইমু বিছানায় মুনকে শুয়িয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে গেল শুদ্ধের কাপড় ধুয়ে ছাদে দিতে।দুপুরে মুনকে কাঁচকলা আর অালা চাউলের ভাত রেঁধে খায়িয়ে দিল।সন্ধ্যাবেলায় সে মুনের ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলল,
-আমার যেতে হবে।রাতে হাসপাতালে ক্লাস আছে।
-ও চলে যাবে।আচ্ছা যান ডাক্তার সাহেব।
ইমু হেসে বলল,
-ফ্রিজে বার্লি রান্না করে রেখে গেলাম।উঠে একটু গরম করে খেতে পারবেন তো?
মুন হেসে বলল,”তুমি টেনশন নিও না!আমি পারবো।”
ইমু নিচু হয়ে মুনের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল,”ওকে আসছি।সাবধানে থাকবেন।কাল অাবার আসবো।”
সদর দরজায় সপ্তের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল ইমুর।দুজনে কিছুটা আড়চোখে তাকাল।ইমু পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।

৪।
সপ্ত দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কিচেনে ঢুকে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতলে মুখ লাগিয়ে বেড সাইড টেবিলে বসতে বসতে বলল,
-ছেলেটা কে রে?
মুন বালিশে পিঠ এলিয়ে বলল,
-শেষ বার বিছানায় যাকে এনেছিলাম।মেডিকেলে পড়ে,খুব ভালো ছেলে।
-থাক ওর গুন গান শোনে আমার অত্যন্ত লাভ নেই।
-তোকে ভার্সিটি লাইফ থেকে দেখে আসছি।আমার ব্যাপারে এত হিংসুটে তুই।তোর সামনে অন্য কারোর প্রশংসা করলেই তুই গাল ফুলাস!
-আমার হিংসা হয় ঠিকই।তার কারন আমি তোকে অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে পারবো না।
-কিন্তু আমার তো কাওকে চাই!তোর যেমন পানসি আছে।বন্ধু হিসাবে তুই নিশ্চয় চাইবি আমার লাইফেও কেউ আসুক।সব সময় তো সেরকমই বলিস!তুই কাওকে সিরিয়াসলি নে।
-হ্যা বলি তো।
-তাহলে সমস্যা কি?ইমু কে না হয় নেই কি বলিস?
-জানি না।
-থাপ্পড় খাবি।
-ওসব বাদ দে তো।বাই দ্যা ওয়ে তোর ফোন কই?এতো বার কল করলাম নো রেসপন্স!
-সরি।ফোন যে কই।ঠিক নেই।
-অফিসে যাস নি কেন?কি হয়েছে?আমি তো ভয় পেয়ে অফিস শেষেই তোর ফ্লাটে আসলাম।
-তেমন কিছু না!সামান্য জ্বর।তার জন্য ইমুর কি কান্ড!
-কি বলিস?
সপ্ত সাইড টেবিল থেকে উঠে বেডে বসে মুনের কপালে হাত দিয়ে বলল,
-সামান্য মানে।কপাল তো পুড়ে যাচ্ছে।মেডিসিন নিয়েছিস কোন।
-ইমু ছোট ডাক্তার কি সব গেলালো!
-আমাকে একটু ফোন দিলে কি হতো?
-আরে কিছু হবে না।সহজে মরবো না।
-মরা মরা করবি না।তুই শুয়ে থাক।আমি আজ রাতে যাচ্ছি না।মামি আর পানসিকে ফোন করে বলে দিচ্ছি।
-আরে না।সারাদিন অফিস করেছিস!তুই ক্লান্ত।আমি থাকতে পারবো।
-তুই চুপ কর।থাপ্পড় খাবি।
সপ্ত আর মুন একসাথে হেসে উঠল।মুন বলল,
-কিরে আমার বুলি আওড়াচ্ছি কেন?
-সঙ্গ দোষে শালা।তুই সারাদিন “থাপ্পড় খাবি!থাপ্পড় খাবি!”করিস!
সপ্ত বেলকনি থেকে ফিরে এসে জানাল সে পানসি আর মামিকে বলে দিয়েছে যে রাতে ফিরবে না মুনের কাছে থাকবে।মুনের কাছে জানতে চাইল সে রাতে কি খাবে।মুন বলল,
-ইমু বার্লি বেঁধে ফ্রিজে রেখে গেছে।
-আমি ফেলি দিছি।
-ওমা সে কি?
-আমার ইচ্ছা হয়েছে ফেলেছি।অ্যানি প্রোব্লেম?
-আমার কোন সমস্যা নাই।এখন কষ্ট তো তোর হবে আবার কিছু করতে!
-হোক।
-অন্য খাবারও ফেলে দিছিস?
-হ্যা।
-তুই এতো হিংসুটে কেন?এখন কি খাবি রাতে?
-রেঁধে খাবো।তোকে আপেল জুস আর দুধ দেবো?
মুন মিটিমিটি হেসে বলল,
-তোর যা ইচ্ছা।
টেবিল থেকে সমারেশ মজুমদারের একটা বই এনে মুনের সম্মূখে ধরে বলল,”নে এটা পড় বসে বসে।আমি খাবার রেডি করছি।”
-না সোনা।মাথাটা ব্যথা করছে।পড়লে বাড়বে।
সপ্ত মুনের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,”ওকে পড়তে হবে না!চোখ বুজে শুয়ে থাক।আমি কিচেনে যায়!”
“আচ্ছা” বলে মুন পিঠের তলা থেকে বালিশ নিয়ে মাথার নিচে রাখল।
প্রায় ঘন্টাখানেক পরে এসে মুনকে তুলে আপেল জুস আর দুধ খায়িয়ে মেডিসিন দিয়ে গেল।সপ্ত খেয়ে ডাইনিং পরিষ্কার করে বেড রুমে এলে মুন জিজ্ঞাসা করল,”ওটা কি?”সপ্তের হাতে একটা বাটিতে পানি।সপ্ত বলল,
-জলপটি দেবো রাতে।
-তুই দেখি পতিব্রতা ভাব নিচ্ছিস!
-শোন আমি থাকতে তোকে কেউ কষ্ট দিবে সেটা আমি দেখতে পারবো না।
-আরে বোকা এটা তো রোগ!সৃষ্টিকর্তার দেওয়া।
-হোক।আমি যদি প্রার্থনা করি তার কাছে সে কি মুক্তি দিবে না তোকে?
-পাগল।তুই আমায় এতো ভালোবাসিস?
“আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তোকে ভালোবাসবো!”বলে সপ্ত মুচকি হাসল।”নে শুয়ে পড় তো।তখন তো বললি বই পড়লে মাথা ব্যথা বাড়বে।।এখন তাহলে পড়ছিস কেন?”
মুন বই রেখে বলল,”এখন একটু ভালো লাগছিল!জ্বরটা আর বাড়েনি।ওকে রেখে দিলাম।খুশি?”
-খুশি।শোয়ে পড়তো দেখি।
মুন বাধ্য ছেলের মত শোয়ে পড়ল।সপ্ত জলের বাটি সাইড টেবিলে রেখে রিডিং টেবিল হতে চেয়ার টেনে বসে মুনের কপালে জলপটি দিতে লাগল।মুন চোখ বড় করে সপ্তের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এ নাসিং শিখলি কোথা থেকে?
-ছোটবেলায় জ্বর হলে মা দিত।এখন অবশ্য এতো আদর আর নেই।আমেরিকা থেকে সেই ছোটবেলা মা বাবা পাঠিয়ে দিয়েছে যাতে ছেলের বাংলা সম্পর্কে খারাপ ধারনা না জন্মে।আমিও মেনে নিছি।সপ্তাহে একদিন হয়তো ভিডিও চ্যাটিং হয় মা বাবার সাথে।
মুনের দুচোখ বেয়ে পানি পড়তে দেখে সপ্ত বলল,
-আন্টির কথা মনে পড়ছে?
মুন কিছু বলল না।
সপ্ত জলপট্টির রুমালটা মুনের কপালে দিয়ে ডান হাতটা ওর গাল ছুঁয়ে বলল,”সরি!আমার আসলে মা বাবার কথা বলা উচিত হয় নি।”
মুন ঠোঁট দুটো নিজের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে বলল,”তোর কি দোষ?আমারই কপাল খারাপ।”
সপ্ত নিজের ডান হাতটা মুনের চোখের কাছে নিয়ে চোখ মুছে দিয়ে বলল,
-একদম কাঁদবি না।আমি আছি না।আমি থাকতে তোকে কাঁদতে দিবো না।
মুন শুকনো একটা হাসি দিল।
সপ্ত কপট রাগ দেখিয়ে বলল,”থাপড় খাবি।বোকার মত হাসে আবার।নে চোখ বন্ধ কর।আমার জলপট্টি শেষ হওয়ার আগে যেন দেখি তুই ঘুমিয়ে গেছিস।”
মুন সপ্তের মুখ চেয়ে বলল,
-আচ্ছা একদম ঘুমিয়ে যায় চিরদিনের জন্য।
সপ্ত টলটল চোখে বলল,
-তুই যদি আর কোনদিন এমন বলিস!তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।
-ওকে বাবা!এই যে চোখ বন্ধ করলাম।
-লক্ষ্মী ছেলে।
সপ্ত জলপট্টি দিতে দিতে মুন ঘুমিয়ে গেল।তার বুকের উপর বেডসিট টেনে দিয়ে সপ্ত বেলকনিতে গেল পানসিকে কল করতে।
সকালে কপালে হাত পড়াতে মুন জেগে উঠল।দেখে সপ্ত কপালে হাত দিয়ে আছে।হালকা হেসে বলল,
-তুই অফিসে যাস নি?
-না।ইরা দি কে ফোন করে বলেছি।ওনি বস কে বলবে।
-যেতে পারতি।আমার তো জ্বর কমে গেছে।
-বেশি বকিস না।
শোয়া অবস্থায় মুন সপ্তকে বুকের উপর টেনে নিল।জড়িয়ে ধরে বলল,”আমার প্রেমিক হবি?”সপ্ত মুনের বুকে খোঁচা মারতেই মুন শব্দ করল “উহু মা”।সপ্ত বলল,
-শালা আমি কি তোর মত গে নাকি?আমার গার্লফ্রেন্ড আছে।তোর থেকে অনেক সুন্দর।যাই হোক তুইও বেশ সুন্দর।কিন্তু আমার জন্য না।
মুন বুকের সাথে জোরে চেপে ধরে বলল,
-তাই না?
মুন অসহায়ের মত বলল,”মজা করলাম রে!”
যদিও কথাটা সত্য ছিল।একমাত্র সে ই জানে।সপ্তের মুখের কাছে মুনের মুখ চলে আসায় সপ্ত দুষ্টমি করে বলল,”মুখ থেকে গন্ধ বের হচ্ছে।যা ওয়াশরুমে যা তো।”
-ঐ ফাজিল।আমি কি তোর পানসি।যে চুমু খাবি।গন্ধ বেরলে তোর কি?
সপ্ত মুনকে হাত ধরে টেনে তুলে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিল।ওয়াশরুমের দরজা টেনে দিয়ে বলল,”বেসিনে ব্রাশে পেস্ট মাখানো আছে,উপরে তোয়ালে।একদম ফ্রেশ হয়ে বেরবি।নাস্তা করবো খুব ক্ষুধা লাগছে।
-ওকে বাবা।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে মুন বলল,”ওকে আমার কাছে দে না!আমি খেতে পারবো।
-চুপ থাক।হা কর।
-তুই কিন্তু অত্যাচার করছিস রীতিমত!আর খেতে পারবো না প্লিজ।
-এই টুকরো জাস্ট।তারপর মেডিসিন।
-থাপ্পড় খাবি।
-আচ্ছা দে থাপ্পড়।তবুও খাবি তো।
-ধ্যাত।বমি আসছে।
“ওকে ঠিক আছে খেতে হবে না।পানি নে মুখে,মেডিসিন দিচ্ছি।”
মুন মাথা নাড়িয়ে বলল,”আচ্ছা”।
মেঘ রাজ সাইমুন
মেঘ
৫।
ইমু সকালে ফোন করে খবর নিয়ে নিয়েছে মুনের।ক্লাস থাকার কারনে আসতে পারবে না।তার জন্য বারবার অাফসোস করছিল সে।
সাইমুন হেসে মিষ্টি করে বলল,”কোন সমস্যা নেই।তড়িঘড়ি করো না।একদিন সময় পেলে এসে এই বান্দার সেবা করে যেও।”
সপ্ত হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
মুন চোখ টিপে সপ্তকে বলল,”কিরে খুশি হয়েছিস?তোর সতীন আসছে না।”
সপ্ত তার চুলে টান দিয়ে বলল,”থাপ্পড় খাবি শালা!খুশির কি হলো?ও আসুক আমি চলে যাবো।”
“সে আমি জানি।এটা যে তুই অভিমান করে বললি সে তুইও জানিস,আমিও।”
সপ্ত বলল,”জানি না।”
সপ্ত বেডের কাছে দাড়ানো ছিল।
মুন সপ্তকে টেনে নিজের মাথাটা সপ্তের পেটের সাথে লাগিয়ে পিছনে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,”থাপ্পড় খাবি!তুই সব জানিস।”
সেদিন অর্ধেক কাজ সেরে ইরা এলো মুনের ফ্লাটে।দুটোকে এভাবে দেখে ইরা বলল,
-কিরে মানিক জোড়।কি অবস্থা?একটা তো দুদিনের জ্বরে দেখি কাহিল।
মুন শুকনো হাসি দিয়ে বলল,
-ঠিক হয়ে যাবো দি।পাগল টা যা করছে।ভালোবাসার অত্যাচারে আমি শেষ।
ইরা হেসে সপ্তের দিকে তাকিয়ে বলে,
-কিরে কি বলে?
সপ্ত মুনের কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে হেসে দিয়ে বলল,”তুমি একবার যাও ইরা দি আমাকে পাগল বলা ছুটাচ্ছি।”
-এই না।আমার ভাইটা অসুস্থ।ওকে মারধর করিস না আবার।
-ওকে আমি সুস্থ করেই মারবো।
মুন হেসে বলল,”দি তুমি ওর কথা ছাড়ো তো।অফিস করো নি আজ?”
ইরা নিজের সাইড ব্যাগ হতে একটা কার্ড বেরতে বেরতে বলল,
-হ্যা।হাফ ডে করলাম।তোকে একবার দেখতে এলাম।
একটু থেমে ইরা বলল,”আর এই নে এটা।”
-এটা কি?
-ইশার জন্মদিনের ইনভাইটেশন কার্ড।দুটোতেই আসবি।আর সপ্ত তুই পানসিকে নিয়ে যাস কিন্তু।
সপ্ত বলল,”আচ্ছা দি।”
ইরা সপ্তের দিকে তাকিয়ে চোখ ইশারা করে বলল,
-কি রে পঁচিশ তারিখের আগে ওটাকে সুস্থ করতে পারবি তো?এখনো সাতদিন বাকি।
সপ্ত মাথা নুয়ে ডান হাত কপালে তুলে বলল,”ট্রাই মাই বেস্ট মাই ডিয়ার ইলডার সিস্টার।”
-ফাজিল।
মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,”আসি রে।পাগলের কথা মত চলিস।দেখবি দ্রুত ইমপ্রুভ করছিস।
মুন হ্যা সূচক মাথা নাড়াল।ইরা চলে গেল।সপ্ত সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেল ইরার সাথে।
বিকালে বেলকনির চেয়ারে বসে মুন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “বিরাজ বৌ” পড়ছিল।সপ্ত এলো রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় তুলতে।মুন তাকে দেখে বলল,”এদিকে আয় তো”।
সপ্ত সূর্যের আলো আড়াল করতে কপালের উপর বাম হাত ঠেকিয়ে সংকুচিত চোখে চেয়ে বলল,”কেন?”
-কেন আবার,বলছি তাই আসবি।
-কাজ আছে আমার।
-আমার মত রোগীর সেবা করা এখন তোর বড় কাজ।আয় না একটিবার।
“ওকে”সপ্ত কাছে এসে দাড়িয়ে বলল,”বল কি বলবি!”
মুন সপ্তকে টেনে কোলের উপর বসিয়ে বইটা তার সামনে ধরে বলল,”বইটা পড়।আমি শুনবো।”
সপ্ত বইটা নিয়ে বলল,”আচ্ছা”।
মুন সপ্তের কোমর জড়িয়ে ধরে ওর মুখের পানে চেয়ে তার দুই ঠোঁটের ওটা নামা দেখছিল আর শুনছিল।
“বিরাজের সমস্ত সৌন্দর্যের বড় সৌন্দর্য ছিল তার মুখের হাসি।”
-তোরও।
-পড়তে দিস।থাপ্পড় খাবি কিন্তু।
সপ্ত আবার পড়তে লাগলো,”সে সেই হাসি আর একবার হাসিয়া মুখপানে চাহিয়া বলিল,আচ্ছা,আমি কালো-কুচ্ছিত নই ত?”
-একদম না।তুই বড়ই সুন্দর।
“ধ্যাত” বলে সপ্ত মুনের ঠোঁট দুটো এক হাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাতে বই নিয়ে পড়তে লাগল,”নীলাম্বর মাথা নাড়িয়া বলিল,না।যদি কালো-কুচ্ছিত হতুম,তাহলে আমাকে কি ক’রে এত ভালবাসতে?”
মুন সপ্তের হাতটা মুখের থেকে সরিয়ে বলল,”ভালোবাসি তো”।
সপ্ত বিরক্ত হয়ে বলল,”চুপ করবি?থাপ্পড় খাবি।পড়ছি শোন।”
মুন সপ্তের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সপ্ত পড়ল,”এই অদ্ভূত প্রশ্ন শুনিয়া যদিও সে কিছু বিস্মিত হইল,তথাপি একটা গুরুতর ভার তাহার বুকের উপর হইতে যেন সহসা গড়াইয়া পড়িয়া গেল।”সে খুশি হইয়া বলিল,ছেলেবেলা থেকে একটি পরমা সুন্দরীকেই ভালোবেসে এসেছি-কি করে বলব এখন,সে কালে -কুচ্ছিত হলে কি করতুম?”
-আমিও।তবে পরম সুন্দর একটা ছেলেকে।
সপ্ত ট্রি টেবিলে বইটা উপুড় করে রেখে মুনের কোলের উপর বসেই ওকে মারতে লাগল।
মুন দুহাত প্রসারিত করে বলল,”ভালো করে মার না!”
মুন বুকের বামপাশে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,”এইখানে মার।”
সপ্ত বলে উঠল,”থাপ্পড় খাবি!”
সপ্ত উঠে জামা কাপড় তুলে রুমে চলে গেল।মুন আনমনে দুরে তাকিয়ে রইল।
মধ্যরাতে মুনের জ্বর বেড়ে গেল।সে শীতে কাঁপতে লাগল।সপ্ত তার কাঁপা শরীরকে জড়িয়ে ধরে রাখল।মুনের রক্তিম ঠোঁট কাঁপছিল।সপ্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।এদেশের প্রায় অর্ধভাগ যৌবনপ্রাপ্ত ছেলেদের জ্বরের ঘোরে কাম উদ্দীপনা বেড়ে যায়।তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না।মুন জ্বরের ঘোরে সপ্তের বুকের উপর ওঠে তাকে আদর করতে শুরু করল।সপ্ত ধীরে ধীরে সাড়া দিতে থাকল।বেডসিটের তলায় ক্রমন্বয়ে দুজনের আবরন খুলতে লাগল।মুন সপ্তকে সর্ব শক্তি দিয়ে আনন্দ দানে ব্যস্ত।সে সপ্তের সারা শরীরে নিজের ঠোঁট দিয়ে ভালোবাসার অপচয় এঁকে দিতে লাগল।ভালোবাসাকে অপচয় এ জন্য বলা যে গত তিন বছরে মুন সচেতন মনে কখনো মিল হয় নি কারোর সাথে।মাতাল হয়ে কামরস বের করেছে সবসময়।আজ জ্বরের ঘোরে।সচেতন মনে সে ভালোবাসা দানে অক্ষম।এটা ভালোবাসার অপচয় ছাড়া কি?
ধীরে ধীরে বিছানার চাদর আকড়ানো,মৃদু চিৎকার বা মাতাল মাদকতায় অন্ধকার রুমের পরিবেশ ভারী থেকে ভারী হতে লাগল।একসময় দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
প্রায় সকাল দশটায় মুনের ঘুম ভাঙ্গল।ক্ষীণ মাথা ব্যথা করছে তার।সে হাত বাড়িয়ে পাশে সপ্তকে জাগাতে চাইল।কিন্তু হাত গিয়ে পড়ল খালি বিছানায়।মুন ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো।খেয়াল হলো তার পরনে কিছু নেই।দ্রুত বিছানায় পড়ে থাকা শর্টস পরে বেড কোমর পর্যন্ত দিয়ে সপ্তকে ডাকতে লাগল।
-সপ্ত!সপ্ত!
সাড়া না পেয়ে আশেপাশে তাকাল।দেখল সাইড টেবিলে একটা কাগজ পড়ে আছে।তাতে লেখা,”গুড মর্নিং।কফি রিডিং টেবিলে,সাগু রাঁধা ফ্রিজে।গরম করে খাস।আমার কাজ পড়ে গেল।সাবধানে থাকিস।”
মুন ভাবতে লাগল,সপ্ত কেন এমন করল।অফিসে তো ছুটি নিল।আমাকে এভাবে রেখে চলে গেল।বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ চোখে পড়ল।অাতঙ্কে মুনের বুক কেঁপে উঠল।রাতের কথা মনে করতে চেষ্টা করল।সঙ্কোচে,অনুশোচনায় সে বিছানায় মুখ থুবড়ে পড়ল।
মুনের সম্পূর্ণ সুস্থ হতে আরো তিন চার দিন লেগে গেল।বাকি দিনগুলো ইমু তার কাছে ছিলো।ইরা আরেকবার এসে দেখে গেছে।যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করল,”তোদের মাঝে কি হয়েছে রে?সপ্ত টাকেও দেখি অফিসে মন মরা হয়ে পড়ে থাকে।জিজ্ঞাসা করলে বলে,কিছু না।”
মুন শুকনো একটা হাসি দিল।কিছু বলল না।
ছয়দিন জ্বরে ভুগে সপ্তম দিনে মুন অফিসে গেল।দুজনের বুকের ভিতর ফেটে যাচ্ছে।তবুও সংঙ্কোচে,লজ্জায় দুজনে চুপ।ডেস্কে বসে মুন সপ্তের দিকে তাকাল।সপ্ত সংশয়ে চোখ নামিয়ে নিল।দুজনের ডেস্কের মাঝে এসে সাইডে ঠেস দিয়ে ইরা বলল,
-সাইমুন,সপ্ত!কাল ইশার জন্মদিন।কাল সন্ধ্যা যেন দুটোকে একসাথে দেখি।
“আচ্ছা”বলে সপ্ত কাজে মন দিল।
ইরা মুনের দিকে তাকাল।মুন মেঘের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গেলে যেমন হয় তেমন একটা শুষ্ক হাসি দিল।
মেঘ রাজ সাইমুন
মেঘ
৬।
“মা!এই কি সেই গে কাকু?”ইরার বছর ছয়েকের মেয়ের কথা শুনে পার্টিতে থাকা সবাই মুনের দিকে তাকাল।ইরার স্বামী সঞ্জয় মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে বলল,”ছিঃ মা।এসব বলতে নেই।কে শেখাল তোমাকে এটা?”
“তুমি আর মামনিই তো রোজ ওনার গল্প করো।মামনিই তো বলে,কাকুটা খুব ভালো।গে হলে কি হবে!সেদিন মামনির অফিস পার্টির ফটোশুটে দেখলাম তো।যেটা মামনি তোমাকে দেখাচ্ছিল।আমি জেগে সব দেখেছি।”
ইরা এগিয়ে গিয়ে বলল,”মারবো এক থাপ্পড়।এইটুকু মেয়ে তার কি শ্রী।”
ইশা ভয় পেয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
ইরা মুনের কাছে গিয়ে বলল,”তুই কিছু মনে করিস না।”
মুন ছলছল চোখে বলল,”ইরা দি!আমি কিছু মনে করি নি।ওতো ছোট বাচ্চা।”
ইরার চোখ ছলছলিয়ে উঠল।সপ্ত মুনের কাঁধে হাত রাখল।মুন ফিরে তাকাল।ইরা শ্বাশুড়িকে প্রচন্ড ভয় পায়।এক কান দু’কান করতে করতে কথাটা ইরার শ্বাশুড়ির কানে চলে গেল।তিনি ভিতর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল,”বৌমা!এখনি এই ছেলেকে বের কর।”
“মা!”
“কি বললাম কানে গেল না?সঞ্জয়!”
“হ্যা মা।”
“এই ছেলে তুমি নিজে যাবে নাকি আমায় বের করে দিতে হবে?”
-জি আন্টি আমিই চলে যাচ্ছি।
মুন দ্রুত বেরিয়ে গেল।ইরা স্তম্ভিত হয়ে রইল।সপ্ত কিছু বলতে যাবে।তখন পানসি তার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,”এখানে তুমি কোন কথা বলবে না।”
-কিন্তু।মুনকে উনি অপমান করল।
-করুক।তুমি চুপ থাকো।
“তুমিই থাকো আমি গেলাম” বলে সপ্ত মুনের পিছু পিছু গেল।পানসি সবার দিকে চেয়ে বোকার মত হাসি দিল।
-সাইমুন দাড়া।
মুন এক মনে রাতের সোডিয়াম বাতির আলো-আঁধারে হেটে চলেছে।সপ্ত পিছন থেকে ডাকছে তা যেন তার কান পর্যন্ত পৌছাচ্ছে না।সপ্ত দৌড়ে এসে ওর হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,”কি রে ডাকছি।শুনতে পাচ্ছিস না?”
-কি বলবি বল!
-চল তোকে ফ্লাটে ছেড়ে আসি।গাড়িটাইও তো আনিস নি।
মুন ফুটপাতে বসে পা রোডে রেখে বলল,
-তুই বেরিয়ে এলি কেন।
সপ্ত মুনের থুতনি ধরে নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করে বলল,
-আমার দিকে তাকিয়ে বলল তো কথাটা।
“তাকানোর কি আছে?তুই তো আর গে না।পার্টিতে নিশ্চয় থাকতে পারিস।আমি তো গে,মানুষ না যেন কোন ভিনগ্রহের এলিয়েন।”বলে মুন চোখ মুছলো।সপ্ত মুনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
-কে কি ভাবে আমি জানি না।আমি আমার বন্ধুটিকে আমার জান ছাড়া কিছু ভাবি না।এদেশে মামা,মামি ছাড়া একমাত্র তুই ই আমার সব থেকে কাছের।তুই আমার অস্থিস্ত জানিস না?অভিমান করে কথা বলার সময় তো একবারও আমার কথা ভাবিস না যে যা বলছিস তাতে আমি কতটা কষ্ট পাবো!
-সবাই আমাকে ঘৃণা করে।তুই কেন পড়ে আছিস?
সপ্ত উঠে মুনের পিছনে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রেখে বলল,
-তুই জানিস না আমি তোর কে?
সপ্তের চোখ টলমল করছে।মুন ঘাড় ঘুরিয়ে সপ্তের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-সেদিন রাতে খুব কষ্ট দিয়েছি তোকে,তাই না।আমাকে মাফ করে দিস।
সপ্ত চোখ দুটো বন্ধ করে তাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বলল,”না রে।সেদিন রাতের ঘটনার জন্য আমিই দায়ী।ওসব ভুলে যা।”
মুন উঠে সপ্তকে জড়িয়ে ধরে বলল,”তোর মত বন্ধু যেন প্রতিটি সমকামিরা পায়।”
“ধুর বোকা!ছাড়।বাচ্চাদের মত কাঁদে।পানসিকে ডেকে আনি।ওকে ড্রপ করে তোকে ড্রপ করে আসবো।”
এক শনিবার ছুটির দিন মুন বসে টিভি দেখছিল।ইমু এক ছেলেকে সাথে করে এনে পরিচয় করিয়ে দিল।মুন বসিয়ে নাস্তা দিতে দিতে বলল,
-ইমু তো বয়ফ্রেন্ড গুছিয়েই ফেললে।তো ট্রিট দিচ্ছো কবে?
ইমু মুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আপনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে না যে আমার বয়ফ্রেন্ড হওয়াতে আপনি খুশি!
-কি যে বলো তুমি!
ইমুর সাথে আসা ছেলেটি বসে মুচকি মুচকি হাসছিল।
মুন মনে মনে বলল,”শালা!ওর থেকে আমি যথেষ্ট সুন্দর ছিলাম তোর জন্য।দেখো তো ধরে আনছে একটা।দেখে মনে হয় সিনেমার ভিলেন।”
ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ফিকে হয়ে যাওয়া হাসি দিয়ে বলল,”ভাই তুমি খাচ্ছো না যে।এই নাও আপেল খাও।”
-ইটস ওকে ভাইয়া।
মুন মনে মনে বলল,”শালা!তুই তো আমার দাদার বয়সী।আবার ভাইয়া ডাকছে।
ইমু বলল,”আমার কোন বড় ভাই নেই।আপনি আজ থেকে আমার বড় ভাই।এখন থেকে এই ছোট ভাইটি আপনাকে খুব জ্বালাবে।”
মুন সম্মতির হাসি হেসে বলল,”এই যা!একদম বড় ভাইয়ের সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিল।”
ইমু চলে যাওয়ার পর মুন বেলকনিতে দাড়িয়ে ফুলের টবে চোখ স্থির করে ভাবল,যা গেলো তো!ভাবলাম একটা বয়ফ্রেন্ড পেয়েই গেলাম।ইমু কে বেশ লাগতো তার।জ্বরের সে কদিনের সেবায় বেশ মায়া পড়েছিল ছেলেটার উপর।আবার এটাও ঠিক যে জ্বরের সে কয়দিনে সপ্তের দু’দিনের সেবা তার অনেক বেশি আপন মনে হয়েছিল।সেই ভার্সিটি জীবন থেকে সপ্ত তাকে আগলে ধরে আছে।এত কষ্টের মাঝে কখনো তাকে ঠিক মত কাঁদতে পর্যন্ত দেয় নি।পাগলটা সব সময় চাই সে যেন ভালো থাকে।
ইরা আর অফিসে আসে নি।তার শ্বাশুড়ি চাকরি ছাড়ি নিয়েছে।মুনের নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল।সেদিন যখন বাড়ি থেকে শ্বাশুড়ির অগচরে ফোন দিয়ে মুনকে বলল,”সাইমুন!সেদিনের জন্য আমাকে মাফ করে দিস ভাই!”তখন মুনের চোখে পানি চলে এল।মুন ধরা গলায় বলেছিল,”ইরা দি।তুমি আমার মায়ের মত।আমি কখনো কি তোমার উপর রাগ করতে পারি?”সেদিন ফোনের অপরপ্রান্তে একটা চাপা কাঁন্নার আওয়াজ পেল সে।মুনের মনে হল এ পৃথিবীতে তার মত এত সুখী কেউ নেই।একজন অত্যন্ত আছে যে তাকে মায়ের মত ভালোবেসে দুফোঁটা চোখের নোনা ফেলতে পারে।একে একে তার জীবন থেকে সবাই হারিয়ে যাচ্ছে কেন?আজ বেলকনিতে দাড়িয়ে তার খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে।চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছে।সামনের দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে।মুন অস্পষ্টভাবে একবার বলল,”মা!”
সন্ধ্যায় পানসির ফোন এল সপ্তের কাছে।ফোনে জানাল,পরশু সৌরভ নামের একটা ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে!সপ্ত যেন তাকে মাফ করে দেয়।শুনে সপ্তের কষ্ট পাওয়া দুরে থাক।সামান্য খারাপ পর্যন্ত লাগে নি।রাতে বিছানায় সপ্ত ছটফট করেছে।সে কি তাহলে মুনকে ভালোবাসে?কি চাই তার মন?চাই তো মুনের সঙ্গ!ভোর রাতে আকাশে মেঘের গুড়গুড়ে শব্দে সপ্ত দৌড়ে বেরিয়ে গেল রাস্তায়।কানে ফোন ধরে বিদেশে মায়ের কাছে কল দিল,
-মামনি।মামনি।
-কি রে সোনা এতো হাঁপাচ্ছি কেন?কি হয়েছে?
-বলছি।আগে বলো তোমার ছেলে যদি কোন ছেলেকে ভালোবেসে সারাজীবন তাকে নিয়ে বাঁচতে চাই।তোমাদের আপত্তি আছে?
-না ব্যাটা।তোর সুখই আমাদের কাছে বড়।
-আমি জানতাম।তোমরা আপত্তি করবে না।
“থ্যাংক ইউ মামনি!উম্মাহ।”বলেই সপ্ত ফোনটা কেটে দিল।
“আরে শোন পাগল……”সপ্তের মায়ের কথা আর পৌচ্ছালো না।
ভোর চারটে মুনের ফ্লাটে গিয়ে সপ্ত মুনকে জাগিয়ে ছাদে নিয়ে গেল।
মুন অবাক হয়ে বলল,”থাপ্পড় খাবি!তুই পাগল হয়ে গেলি?”
সপ্ত মুনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-সারাজীবন তো বলে গেলি থাপ্পড় খাবি।কিন্তু কোনদিন তো একটা থাপ্পড় দিলি না।আজ একটা দে না।
মুন ঘুম ঘুম চোখে সপ্তের কাঁধের উপর মাথা রেখে বলল,”আহ!ঘুম পাচ্ছে তো।ঘুমাতে দে না,প্লিজ!”
সপ্ত বুকের কাছে হাত দিয়ে মুনের ঘাড়ে সুড়সুড়ি দিয়ে বলল,
-বৃষ্টি আসবে।আমরা দুজনে ভিজব।
-তোকে বলেছে বৃষ্টি আসবে?
সপ্ত “দেখবি তো” বলতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি এল।সপ্ত মুনকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বলল,”আই লাভ ইউ!”
মুন সপ্তকে সামনে দাড় করিয়ে বলল,”কি বললি অাবার বল তো?”
সপ্ত মুনকে পুনরায় জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি ভেজা ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,”বয়রা নাকি?বললাম,আই লাভ ইউ!”
মুন সপ্তের মুখটা নিজের দুহাতের মাঝে নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল,”রিয়্যালি !”
সপ্ত চোখটা বুজে হ্যাসূচক মাথা নাড়াল,বলল,”আমি আর তোকে কষ্ট পেতে দিবো না।এতদিনে বুঝলাম আমি কি চাই।মামনি বলে দিয়েছে আগামী মাসে আমাদের আমেরিকায় নিয়ে যাবে।”
ছাদের রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে মুন বসে আছে।তার কোলের উপর মাথা রেখে সপ্ত ফ্লোরে শুয়ে আছে।দুজনকে ঝুম বৃষ্টি মনের খেয়ালে ভিজিয়ে যাচ্ছে।মুন সপ্তের বৃষ্টি ভেজা চুলে বিলি কেটে,নিচু হয়ে ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,”একটা গান গা না সপ্ত!”
সপ্ত চির চেনা সেই কন্ঠে গাইল,
“তোর বর্ষা চোখে,ঝরতে দেবো না বৃষ্টি!
তুই জাগবি সারা রাত,আমি আসবো হঠাৎ।
তোর শুকনো ঠোঁটে ফোঁটাব প্রেমের হাসি,
তোকে প্রাণের চেয়ে বড় বেশি ভালোবাসি,………।।”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.