ত্যাগ

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি


পূর্বাভাষ
হিম হিম শীত । হাত মোজা , পায়ে মোজা পরেও ঠাণ্ডা কমছে না। ঢুকেছি কম্বলের নিচে। একই কম্বলের নিচে ঘুমিয়ে আছে জয়। কি নিষ্পাপ মুখশ্রী। আজ আমাদের সম্পর্কের ৫ বছর পূর্ণ হল। কত ধৈর্য , কত কম্প্রোমাইজ , স্যাক্রিফাইজের পর আজ আমরা এই দিন টা পেলাম। জীবনে কম্প্রোমাইজ না করলে আসলে কিছু পাওয়া যায় না। কম্প্রোমাইজ মানে হেরে যাওয়া নয়। বরং জিতে যাওয়া।
আমরা এখন ভারতের মানালি তে । আমাদের সম্পর্কের পঞ্চম বর্ষ উৎযাপন করতে এসেছি বরফের রাজ্য মানালি তে। অপূর্ব সুন্দর এই শহরটি। রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে পাহাড়ি নদী আর দূরে তুষার আবৃত পর্বত । সৌন্দর্যে সুইজারল্যান্ড এর সাথে পাল্লা দিতে পারে মানালি। আজ সকালে গিয়েছিলাম রোতান পাস। বরফের উপর হেঁটেছি। সারাদিন ক্লান্ত হয়ে এখন হোটেলে। জয় ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু আমার ঘুম আসছে না।মনে পরছে পাঁচ বছর আগের পুরানা স্মৃতি গুলো। যা এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। ভুলতে চাই। কিন্তু পারি না।

পাঁচ বছর আগে
আমি রকিব। পড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি খুব পড়ুয়া টাইপ ছেলে। শুধু পড়ার বই নয়। গল্প উপন্যাস আত্মজীবনী ভ্রমণ কাহিনী কম পড়ি নাই। আমাকে তাই কেউ কেউ আঁতেল বলে। আজকাল আমি পড়াশোনার বাইরে একটা অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় ব্যয় করছি। তা হল ফেসবুকিং। আমার মাঝে মাঝে খুব গিলটি লাগে। মনে হয় ফেসবুকে এত সময় ব্যয় করছি। কিন্তু নেশা হয়ে গিয়েছে। ছাড়তে পারি না। আসলে আমি তো সমকামী। আমার অনেক বন্ধু । কিন্তু কোন সমকামী বন্ধু ছিল না। ভালবাসার মানুষ তো দূরের কথা। কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে প্রথম আমি খুঁজে পেলাম আমার প্রথম সমকামী বন্ধু। এখন আমার বেশ কিছু সমকামী বন্ধু আছে। তাদের অনেকের সাথে আমার দেখা হয়েছে। তাদের অনেকের সাথে আবার প্রায় আড্ডা দেয়া হয়। কিন্তু আজকাল একটা জিনিসের অভাব খুব অনুভব করি। তা হল ভালবাসার মানুষ। আর এই টানেই ছুটে যাই ফেসবুকে।
রাত ১২ টা। আমার ফ্রেন্ড সাজেশনে একটা প্রোফাইল দেখলাম।প্রোফাইলের ছবিটা খুব সুন্দর । একটা সুদর্শন ছেলের হাতে একটা প্রজাপতি এসে বসেছে। আমার ভাল লাগলো। যদিও ছবিটা যে ফেক বুঝাই যাচ্ছে।তবুও ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালাম। সাথে সাথে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্টেড হল। সারা রাত চ্যাট হল।জানতে পারলাম তার ভাল লাগা , খারাপ লাগা। সেও জানলো আমার কথা।এক রাত্রেই জানা হয়ে গেলো অনেক কিছুই। আমি যেমন বই পড়তে ভালবাসি তেমনি সে ভালবাসে সিনেমা দেখতে। অবশ্য সে বইও অনেক পড়ে। আমাদের দুইজনেরই প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণ। হুমায়ুন আহমেদ ও আমাদের অন্যতম প্রিয় লেখক। সৈয়দ মুজতবা আলির ভ্রমণ কাহিনী ও আমাদের প্রিয় বইয়ের তালিকায় রয়েছে। আর সিনেমা যে কয়টি আমি দেখেছি সেগুলোর অনেকগুলো তার প্রিয় সিনেমার তালিকায় রয়েছে। ভ্রমণ আমাদের দুইজনেরই ভাল লাগে আর চকলেট পেলে আমাদের দুইজনেরই কিছু চাই না।আমাদের বৃষ্টি অসম্ভব ভাল লাগে আর আমরা চাই উত্তাল সমুদ্রে পা ভিজাতে।এরকম আরও অসংখ্য ভাল লাগা মিলে গেলো আমাদের।
পরের দিন শুধু তার সাথে চ্যাট করার উদ্দেশ্যে অনলাইন হয়ে থাকলাম। কিন্তু সে অনলাইনে নেই। কিন্তু কি আশ্চর্য সে আমাকে নক করলো মানে সে অফলাইন হয়ে ছিল। আমাকে বলল
– তোমার জন্য বসে আছি। ফালতু পাবলিক নক করে তাই অফলাইন হয়ে আছি।।
– আমিও কিন্তু এসেছি তোমার খোঁজে
এরপর অনেকক্ষণ চ্যাট হল। নিজেদের মাঝে খুঁজে পেলাম আরও অনেক মিল। পছন্দের রঙ, পোশাক থেকে প্রিয় অভিনেত্রী , অভিনেতা, গায়ক গায়িকা। এমন আরও অনেক কিছু। অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত। যে মুহূর্তের জন্য আমরা ২ জনেই অপেক্ষা করছি। আমার ছবি চাইলো জয়। আমি শ্যামলা , লম্বা , কাটা কাটা চেহারা। খুব সুন্দর তা নয়। তবুও আমি মনে করি আমার চেহারা অনেকেই পছন্দ করবে। আমি আমার ছবি পাঠিয়ে দিলাম তাকে। সাথে সাথে জয় তার ছবি পাঠালও। আমি ছবি দেখে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলাম। আমি ভাবি নাই যে সে এতো সুন্দর।একদম মডেলের মত। তার থেকে অবাক হলাম যে আমার ছবি তার ভাল লেগেছে।এত সুন্দর হ্যান্ড-সাম ছেলে থাকতে আমি! সেদিন রাতেই ফোনে কথা বললাম আমরা।তারপর প্রসঙ্গ আসলো দেখা করার। ঠিক হল সামনের শুক্রবার দেখা করবো।
এরপর অনেক বার ফোনে কথা হল চ্যাট হল। আমরা আমাদের জীবনের প্রায় সব কথাই বলে ফেললাম।জানতে পারলাম তার খুব শখ মডেলিং করা।একটি গ্রুমিং স্কুলে গ্রুমিং ও করেছে। কিছু ফ্যাশন হাউজে ছবিও দিয়েছে। আমি মনে মনে ভাবলাম অবশ্যই তাকে ফ্যাশন হাউজ গুলো থেকে ডাকবে।কারন অনেক হ্যান্ড-সাম সে।আমার কেমন জানি ভয় লাগছিল। আমাকে পছন্দ হবে তো সামনাসামনি। যে এত সুন্দর সে নিশ্চয় আমার থেকে অনেক সুন্দর ছেলেদের কাছ থেকে ইতিমধ্যে প্রপোজাল পেয়েছে।
শুক্রবার আসলো।ধানমন্ডি লেকে দেখা করবো। অনেক চিন্তা ভাবনা করে পোশাক পরলাম। কি পরলে আমাকে ভাল দেখায় তা বেছে বেছে বের করলাম। ডিঙি রেস্টুরেন্টের সামনে দেখা করবো। আমি দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু জয়ের আসার নাম নাই। আকাশ মেঘলা হয়ে আছে। যে কোন সময় বৃষ্টি নামবে। ঈশ আজকে না দেখা করলেই ভাল হত এমন মনে হচ্ছে। আমি জয় কে ফোন দিলাম। ধরলও না। হটাত করে পিছন দিকে ঘাড়ে কে যেন টোকা মারলও। ঘুরে পিছনে তাকালাম। জয় দাঁড়িয়ে। আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। ছবি তে যা দেখেছি তার থেকে অনেক বেশি সুন্দর জয়। জয় আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল
– অনেক রেগে আছো না? সরি তোমাকে দাড় করিয়ে রাখার জন্য।
– আরে না। দেরি তো হতেই পারে। ঢাকার রাস্তার যে অবস্থা
আর দাঁড়ানো গেল না। বৃষ্টি বেরসিকের মত নামলো। আমরা দৌড়ে ডিঙি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। কফি নিলাম দুজনেই। আমরা ২ জন মুখোমুখি। কফি খাচ্ছি। আর বাইরে বৃষ্টি। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম জয়ের দিকে তাকাচ্ছে। আসলে ও এত সুন্দর যে ওর দিকে তো তাকাবেই। সেদিন বাসায় যেয়ে আমরা ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস পরিবর্তন করলাম। আমরা এখন রিলেশনে।

জীবন অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। এখন জয়ের সাথে দিনে দুই তিন বার কথা না বললে ভালই লাগে না।দেখা হয় প্রায়ই। বলা যায় একদিন পর পর। তারপরও মনে হয় কেন আরও বেশি দেখা হয় না! আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি খুব সৌভাগ্যবান। তা নাহলে এত সুন্দর কেউ আমাকে কেন পছন্দ করবে?আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরাই। ঢাকা শহরের কিছু বাদ নেই। যমুনা ব্লকবাস্টারে যেমন ইংরেজি সিনেমা দেখেছি তেমনি বলাকাতেও দেখেছি বাংলা ছবি । ৩০০ ফিটে যেমন খেয়েছি তেমনি পুরাতন ঢাকার নীরব হোটেল ও বাদ যায় নাই। ফ্যান্টাসি কিংডমে যেমন হইহুল্লোর করেছি তেমনি লালবাগ কেল্লায় বসে হয়েছি নস্টালজিক । বসুন্ধরা শপিংমলে যেমন উইন্ডো শপিং করেছি তেমনি নিউমার্কেটে একসাথে দুজনে করেছি ম্যারাথন শপিং। খেলা দেখতে গিয়েছি মিরপুর স্টেডিয়াম তেমনি ফোক ফেস্টে গিয়েছি আর্মি স্টেডিয়াম। বাণিজ্য-মেলা , বইমেলা দুইটাতেই ছিল আমাদের পদচারণ।বই ভাগাভাগি করে পড়েছি । মাঝে মাঝেই চারুকলা , সরওয়ারদি উদ্যানে করেছি প্রেম। জীবন কে যতভাবে উপভোগ করা যায় করেছি। জয়ের সাথে রিলেশনে যাওয়ার আগে আমি জানতামই না জীবন কি। এখন ভাবি কি বোকাই না ছিলাম আমি। সারাদিন বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকতাম। এইভাবে সবই ভাল চলছে। কিন্তু হটাত ঘটলো অন্য ঘটনা।
এক শুক্রবার সকালে হন্তদন্ত হয়ে জয় আমার বাসায় এসে উপস্থিত। সে অত্যন্ত উত্তেজিত। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– আরে তুমি এতো সকালে?
– আরে জানো না কি হয়েছে?
– কি?
– আমার মডেলিং এর ডাক এসেছে।
– কংগ্রাচুলেশন
– তুমি খুশি হও নাই?
– অনেক। তোমার এত দিনের স্বপ্ন পূরণ হল।
– ঈদ উপলক্ষে একটা ফ্যাশন হাউজে মডেল লাগবে। ওখান থেকেই অফারটা পেয়েছি।
– কবে যেতে বলেছে?
– কালকেই
কিন্তু আমি কেন যেন খুশি হতে পারছি না। মনে হচ্ছে এবার মনে হয় ও আমার থেকে দূরে সরে যাবে। তারপর ঘটনা গুলো খুব দ্রুত ঘটতে লাগলো । এই কাজটা ম্যাগাজিনে আসার পর জয় আরো ফ্যাশন হাউজের মডেলিং এর অফার পেলো। ওর কাজগুলো খুব প্রশংসিত হতে লাগলো।দিন যায়।জয় খুব পরিচিত একটা মুখ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।কিন্তু ওকে আজকাল কেমন অন্যরকম মনে হয়। আগের মত দেখা তো করেই না। ফোন ও আগের মত করে না। আর ফোন করলে শুধু মডেলিং এর গল্পই করে। নিজেদের যে কত কথা থাকে সেগুলো যেন সে ভুলেই গিয়েছে। নাকি এগুলো আমারই মনের ভুল? আমি কি ইনসিকিউরিটি তে ভুগছি?মিডিয়া তে কত সুন্দর সুন্দর ছেলে। তাদের নিয়ে ভয়? এখন কত ভক্ত তার। তাদের নিয়ে ভয়?না এগুলো মনের ভুল। মাথা থেকে এইসব চিন্তা ঝেড়ে ফেলতে হবে।
সময় কাটতে লাগলো আর জয় আরও ব্যস্ত হতে লাগলো। টিভিসি করার সুযোগ পেলো। একটা মোবাইল ফোনের এড করলো। খুব প্রশংসিত হল। আরও কয়েকটি টিভিসির অফার পেলো। কিন্তু তার স্বপ্ন সিনেমা করার। আজকাল শুটিং শেষে রাত ১টা – ২টার দিকে বাড়ি ফিরে। আমাকে ফোন করার কথা মনেই থাকে না। আর আমি ফোন করলে কেটে দেয় অথবা বলে শুটিঙে আছে। আজকাল সারাদিনে আমার সাথে দশ মিনিটও সময় হয় কিনা সন্দেহ। আমার সন্দেহ কি সঠিক। সে কি আমাকে ভুলে যাচ্ছে?চোখে পানি এসে যায় ভাবলে। এত অবহেলা। খুব কষ্ট লাগে। খুব অপমানিত লাগে। কিন্তু কি বলবো ? ঝগড়া করবো ? আচ্ছা ওর অন্য কারো সাথে রিলেশন হয় নাই তো ? কোন মডেলের সাথে। শুনেছি মিডিয়া তে অনেক সমকামী আছে। মডেল , কোরিওগ্রাফার , মেকআপ ম্যান এমনকি পরিচালক নিজেও। এই কষ্ট আমাকে তিলে তিলে মারতে লাগলো। কিন্তু এইভাবে চলতে পারে না। আমি ঠিক করলাম জয়ের সাথে সরাসরি কথা বলবো ।মুখোমুখি। ফোনে নয়। কিন্তু কবে সময় দিবে জয়??শেষ দেখা হয়েছে ২০ দিন আগে একই শহরে থেকেও।ফোন করলাম জয় কে।
– হ্যালো
– বল
– কোথায় ?
– কোথায় আর শুটিঙে
– তোমার সাথে দেখা করা দরকার আমার
– হটাত কেন?
– তোমার সাথে দেখা করতে চাইছি কেন তার কৈফিয়ত ও এখন দিতে হবে?
– আরে তা না। আমি খুব বিজি তো তাই বললাম। আচ্ছা তুমি উত্তরা চলে আসো। এখানেই আমার শুটিং হচ্ছে।
– আচ্ছা আসছি।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। উত্তরা যাবো। কিন্তু ভাবছি কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? শুটিং স্পটে পৌঁছে দেখি জয় হাসতে হাসতে আমার দিকে আসছে।কোন বিরক্তি নাই। ঠিক আগের মত।সেই আন্তরিকতা। সেই ভালবাসা। আমার মনে হল পুরোটাই আমার সন্দেহ। সম্পর্ক মনে হয় আগের মতই আছে।
– ভাল সময় আসছও । শুটিং শেষ। চল বাইরে কোথাও যেয়ে বসি।
নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে যেয়ে বসলাম। এখন আমার কোন অভিযোগের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু মন কে শক্ত করলাম। বলতেই হবে। আমি বললাম
– তোমার কি হয়েছে?
– কি হবে?
– আজকাল তো দেখাই কর না। ফোন কর না। ফোন করলেও কথা বলার সময় পাও না?
– খুব ব্যস্ত থাকি। দেখছই তো
– ব্যস্ত নাকি অন্য কারো সাথে রিলেশনে জড়িয়েছ ?
– আর ইউ ম্যাড? তোমাকে রেখে কার সাথে!
– হুহ। আকাশ থেকে পরার মত কিছু বলি নাই। তুমি কি এরকমই কন্টিনিউ করে যাবা?
– দেখো সিনেমায় অভিনয় করা আমার ধ্যান জ্ঞান।যেভাবেই হোক সিনেমায় চান্স পেতে হবে।এই জন্য দিন রাত পরিশ্রম করছি। তুমি আমার বিএফ। তুমি এটা বুঝবা না?
আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না। শেষে বললাম
– আচ্ছা থামো। আমার মনে হয় ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। আমি এখন থেকে চেষ্টা করবো তোমাকে সাপোর্ট দেয়ার।
বাড়ি ফিরে ভাবছি শেষ কথাটা কি ঠিক বললাম। আমারও তো শখ আহ্লাদ আছে। তাও ভাবলাম ধৈর্য ধরি। নিশ্চয় সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।

টানা ৩ দিন হল জয়ের সাথে কোন কথা হয় নাই। খুব অভিমান আর রাগ হচ্ছে। ইচ্ছা করছে ফোন করে গালিগালাজ করছি। এত্ত রাগ লাগছে। কিন্তু আজকে আমাদের প্রথম এনিভারসারি। দেখি ফোন করে কিনা। আমি বেহায়া তো তাই আশা করে আছি। রাত বারোটা বাজে ।কোন ফোন নেই। কথা ছিল আজকের দিন টা আমরা একসাথে কাটাবো। প্রচণ্ড অভিমান। কষ্ট গুলো গলায় দলা পাকছে। সারা দিন অপেক্ষা করলাম। কোন ফোন নেই। ঠিক করলাম এই সম্পর্ক আর রাখবো না। এত অবহেলা সহ্য করা যায় না। বিকেলে ফোন দিলাম।
– হ্যালো
– তোমার কথাই ভাবছিলাম। ফোন দিতাম এখুনি ।একটা সুখবর আছে
– কি সুখবর?
– আমি একটা সিনেমায় সম্ভবত চান্স পাবো। হুমায়ুন আহমেদের গল্প অবলম্বনে হবে সিনেমাটি। আজকেই সিনেমার প্রযোজক আর পরিচালক আসবে আমার নাটকের সেটে ।সব ফাইনাল করতে
– ওহ
– তুমি খুশি হও নাই?
– হয়েছি।
– তাহলে এভাবে কথা বলছও কেন?
– আজকে একটা বিশেষ দিন। মনে আছে?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে জয় বলল
– আজকে আমাদের এনিভারসারি তাই না? সিনেমায় চান্স পাওয়ার উত্তেজনায় সব ভুলে গিয়েছি।এক্সট্রিমলি সরি। এক কাজ কর তুমিও সেটে চলে আসো। একসাথে ২ টা ঘটনাই উৎযাপন করি।
এইসব কথায় আমার রাগ ভাঙলও না। কিন্তু সেটে যাবো ঠিক করলাম। ওখানেই সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে আসবো।
সেটে গিয়ে দেখি ছবির প্রযোজক আর পরিচালক এসে জয় এর সাথে কথা বলছে। আমাকে দেখে জয় উঠে এসে আমাকে নিয়ে গেলো ওদের সামনে। পরিচয় করিয়ে দিল।
– মারুফ ভাই এ আমার বন্ধু নীল। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। খুব ব্রিলিয়ান্ট। হুমায়ুন স্যারের সব বই পড়ে ফেলেছে।
– আর নীল ইনি মারুফ ভাই পরিচালক আর ইনি রাশেদ ভাই প্রযোজক।
আমি হ্যান্ডশেক করলাম। বসলাম টেবিলে। চা দিয়ে গেলো। হুমায়ুন আহমেদের ইস্টিশন বইটা নিয়ে সিনেমা করা হবে। একটা ব্যাপার খুব অস্বস্তি লাগছে। মারুফ ভাই বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছেন ।এদিকে জয় মহা খুশি। আমার কেমন রাগ লাগছে জয় কে খুশি হতে দেখে। উনারা চলে গেলে ভাবলাম আমি জয়ের সাথে আমার সম্পর্কের ইতি টানবো। কিন্তু তার আগে ঘটলো অভাবনীয় এক ঘটনা।
আলোচনা শেষে জয় কে সিনেমায় নেয়ার ব্যাপার কনফার্ম করলেন না তারা।বললেন পরে জানাবেন। উলটা আমার নাম্বার নিলেন। জয়ের মন খারাপ। তাই সে ফোন নামাবার নেয়ার ব্যাপারটা খেয়াল করে নাই। আমিও আজকে জয় কে আর কিছু বললাম না।কারন ওর মন ভীষণ খারাপ।ওর খুব আশা ছিল সিনেমায় মারুফ ভাই তাকে নিবে। আজকে সম্পর্ক নিয়েও ঘাঁটাঘাঁটি করলাম না। হাজার হোক আমি তো ওকে ভালবাসি। ও বাসুক বা নাই বাসুক। রাতে মারুফ ভাই আমাকে ফোন দিলেন। অভাবনীয় ঘটনা টা তক্ষুনি ঘটলো। তিনি আমাকে সিনেমায় নিতে চান জয়ের জায়গায়!!!!!!!! আমি নাকি একদম পারফেক্ট ওই চরিত্রের জন্য।

আমি ঠিক করলাম আমি অভিনয় করবো না।এই রোল জয়ের করার কথা । আমার সিনেমায় নামার কোন ইচ্ছাও নেই। মারুফ ভাই কে হ্যাঁ না কিছুই বললাম না। ভাবলাম জয় কে আগে ফোন দেই।ফোন দেয়ার আগে জয় ফোন দিল
– কংগ্রাচুলেশন
– কেন?
– সিনেমায় নামছও। তাও আবার হুমায়ুন আহমেদের গল্প অবলম্বনে সিনেমা। তোমাকে এখন আর পায় কে?
– আমি করবো না অভিনয়। মারুফ ভাই কে কিছুই বলি নাই এখনো
– না তো কর নাই। তাহলে তোমার অভিনয় করার ইচ্ছা আছে
– আমি শুধু তোমাকে সব বলতে চেয়েছি । তারপর না করবো ভেবেছি
– মিথ্যা কথা। তোমার ষোল আনা ইচ্ছা আছে অভিনয় করার। কি চুক্তি করেছ মারুফ ভাই এর সাথে? যে আমার জায়গায় তোমাকে নিলো।তুমি তো অভিনয়ের অ জানো না। তুমি বিশ্বাস ঘাতক , বেঈমান।
– তুমি কি বলছও এগুলো জয়?
– গো টু হেল। আমাকে আর কোন দিন ফোন দিবে না।
ফোন কেটে দিল জয়। আমার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে।যার জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলাম সে আমার সাথে এত দুর্ব্যবহার করলো ! আমি ওর সব অবহেলা সহ্য করে ও ছিলাম। এগুলো সব ভুলে গিয়েছে সে। আমার জিদ চাপলও। না আমি অভিনয় করবো। এইভাবে প্রতিশোধ নিবো জয়ের উপর।

ময়মনসিংহের একটা ছোট স্টেশনে ইস্টিশন সিনেমার সেট পড়েছে। ১৫ দিন হল আমি এই খানে আছি। আর ১ সপ্তাহ শুটিং হলেই শুটিং শেষ হয়ে যাবে। জায়গাটা খুব নির্জন। স্টেশনের কাছেই নদী। আমি মাঝে মাঝে নদীর পারে যেয়ে বসে থাকি। সব সময় জয়ের কথা মনে পড়ে। জয়ের সাথে কি সত্যি বেঈমানি করলাম? সিনেমায় অভিনয়ের ইচ্ছা তো আর আমার ছিল না। জয়ের ছিল। আমি না করলে জয় কেই নিতো হয়তো মারুফ ভাই। রাগের মাথায় ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খুব গিল্টি লাগে নিজেকে। মাঝে মাঝে মনে হয় জয়ের কাছে ক্ষমা চাই। কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে ইগো তে লাগে।নিঃশব্দে কাঁদি আমার সম্পর্কের জন্য। একটু কম্প্রোমাইজ স্যাক্রিফাইজ করতে পারলাম না আমরা!
একদিন মেসেজ আসলো জয়ের।
‘ একটা সিনেমায় চান্স পেয়েছি। এটা হুমায়ুন আহমেদের বৃষ্টি-বিলাস নিয়ে হবে। দেখি এইবার কার অভিনয় প্রশংসিত হয়’
মেসেজটা পড়ে আমার খারাপ লাগছে না। বরং ভাল লাগছে। যাক ওর স্বপ্নও পূরণ হল। আমার অভিনয়ের থেকে ওর অভিনয় প্রশংসিত হলেই আমি খুশি হব।
শুটিং শেষ হল। ঢাকায় ফিরলাম। বৃষ্টি-বিলাসেরও শুটিং শেষ। একই সাথে ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাবে ২ টা সিনেমাই। বক্স অফিসে নাকি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে!মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এই ২ সিনেমার জন্য।

বৃষ্টি বিলাস আর ইস্টিশন মুক্তি পেলো একই দিনে। বৃষ্টি-বিলাস আশানুরূপ ব্যবসা করতে পারলো না। কিন্তু ইস্টিশন সুপার হিট। চারিদিকে আমার জয়জয়কার। বিভিন্ন পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকার নিতে আসছে। নতুন ছবি সাইন করার জন্য আসছে পরিচালক রা। আমি কোন ছবি সাইন করলাম না। আমার মন ভাল নেই। বৃষ্টি বিলাস হিট হয় নাই এটাই তার কারন। আমি তো জয়ের প্রতিদন্ধি নই। রাগের মাথায় ইস্টিশন সিনেমায় সাইন করেছিলাম। জয় এর উপর রাগ করে। আমি কোনদিন অভিনেতা হতে চাই নাই। অভিনেতা তো হতে চেয়েছে জয়। আমি ওর স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছি।ইস্টিশনে অভিনয় করলে হয়তো সেও তারকা খ্যাতি পেতো।
আমি ঠিক করলাম জয়ের কাছে ক্ষমা চাইবো। গাড়ি চালিয়ে গেলাম উত্তরায় জয়ের বাড়ি। কিন্তু সে নেই। এক সপ্তাহের জন্য ঢাকার বাইরে। বুঝলাম জয়ের মন খারাপ। আর মন জয় এক জায়গাতেই যায়। তার নানু বাড়ি গাজীপুরে। জয়ের নানাবাড়ির গেটে অনেকগুলো কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ। লাল আর হলুদ রঙে রাঙ্গা হয়ে আছে গাছগুলো। জয় কে পেলাম পুকুর ঘাটে একটা বই নিয়ে বসে আছে। পড়ার চেষ্টা করছে। এই কয়দিনে শুকিয়ে গিয়েছে অনেক।নিশ্চয়ই সিনেমার চিন্তায়। আমাকে দেখে মৃদু হাসলও
– কি ব্যাপার সুপারস্টার ?
আমাকে খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল এমন মনে হল
– আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে আসছি।
– আমি ক্ষমা করার কে? আর তুমি তো কোন অন্যায় কর নাই।
– আমি জানতাম তুমি এই কথা বলবে। তাই আমার শাস্তি আমি নিজেই নির্ধারণ করেছি। আমি আর কোন দিন অভিনয় করবো না।
– পারবে না। মুখেই বলতে পারো শুধু।
জয় হাসতে লাগলো পাগলের মত। ব্যঙ্গ করছে যেন। আমার যা বলার ছিল বলা শেষ। ফিরে চললাম। জয় একবারও আমার দিকে পিছন ফিরে তাকালও না। আশা করেছিলাম তাকাবে। কিন্তু না। ভুল আশা।

আমার জীবন আবার আগের মত হয়ে গিয়েছে। বইয়ে মুখ গুঁজে থাকি। মাঝে মাঝে ফেসবুকিং। সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখি। কিন্তু আর একটা সিনেমাতেও সাইন করি নাই। যখন অবসর থাকি তখন জয়ের কথা মনে পড়ে। কষ্ট হয় তখন। বুকে ব্যথা হয়। দাঁতে দাঁত চেপে সেই ব্যথা সহ্য করি।
একদিন একটা চিঠি আসলো। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার দেয়া হবে। আমি মনোনয়ন পেয়েছি।আমি গেলাম না। টিভি তে লাইভ দেখছি প্রোগ্রাম। রঙের হাট বসেছে যেন।সবাই সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে এসেছে। পুরস্কারের ফাঁকে ফাঁকে নাচ গান হচ্ছে। একে একে সব পুরস্কার দেয়া হল। সর্বশেষ পুরষ্কার সেরা অভিনেতা। মনোনয়ন ঘোষণা করা হল।জয় ও মনোনয়ন পেয়েছে। পুরষ্কার ঘোষণার পালা। কি আশ্চর্য পুরস্কার পেলো জয় বৃষ্টি বিলাসের জন্য। এত সিনিয়র শিল্পী দের মাঝে সে পাবে ভাবি ই নাই। খুশিতে আমি লাফিয়ে উঠলাম । জয় মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিলো। এখন কিছু বলার পালা।সবাই কে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষে যা বলল তা অভাবনীয়
– একজন আমার জন্য সিনেমা ছেড়ে দিয়েছে। আজ আমি ঘোষণা করলাম তার জন্য এই মিডিয়ার রুপালি জগত আমি ছেড়ে দিচ্ছি। আমি আর কোন সিনেমায় অভিনয় করবো না।
পরিশিষ্ট
আমরা আমাদের পঞ্চম এনিভাসারি মানালি তে উৎযাপন করছি। আমরা কেউ আর মিডিয়া তে নেই। আসলে জীবন একটু স্যাক্রিফাইজ , কম্প্রোমাইজ না করলে ভালবাসা পূর্ণতা লাভ করে না। তাইতো আমরা ২ জনই স্যাক্রিফাইজ করেছি। মিডিয়ার রূপালি জগত ছেড়ে দিয়েছি এত ভাল অবস্থানে থাকার পরও
সেদিন পুরস্কার নিয়ে সে সরাসরি আমার বাসায় এসেছিল। আমরা ২ জনই ঠিক করেছি আমাদের ভালবাসার জন্য আমরা আর কেউ মিডিয়াতে থাকবো না। কারন এই মিডিয়া আমাদের ভালবাসার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ভোর হয়ে আসছে। এরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সারা রাত ঘুমাই নাই আমি।দেখলাম জয়ের ঘুম ভেঙে গেছে
– কি ব্যাপার তুমি ঘুমোই নাই?
– নাহ
– কি করেছো
– তোমার কথা ভেবেছি।
এই কথা শুনে জয় আমার ঠোঁটে টুক করে চুমো খেল। সূর্য উঠে গিয়েছে। ২ জন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। দূরে তুষারাবৃত পাহাড় রোদে ঝলমল করছে। জীবন কত সুন্দর ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.