নীল ভালবাসা

লেখক : অরণ্য রাত্রি

ট্রেন চলছে। ঝিক ঝিক । রাত হয়ে এসেছে। জানালা দিয়ে তাকালে শুধু নিকষ অন্ধকার। আমার হাতে বই।আগাথা ক্রিস্টি।যাচ্ছি পালইকান্তা । দাদা বাড়ি। দাদা খবর দিয়েছেন। তিনি নাকি খুব অসুস্থ। আমি জানি এটা একটা বাহানা। আসল কথা তিনি আমাকে দেখতে চান। আমাকে তিনি কয়েক মাস না দেখলেই এমন অস্থির হয়ে উঠেন। আমিও দাদা কে অনেক ভালবাসি । তাইতো দাদা খবর দিতেই ছুটে যাচ্ছি। আরেকটা কারন আছে। আমি আসলে পালাচ্ছি। বাসায় আমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে।যখনি মেয়ে দেখা শুরু হয় তখনি আমি বাড়ি থেকে পালাই। আর মেয়ে দেখাও বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া আমার কোন উপায় নেই। বাসায় আমি কিভাবে বলি আমি সমকামী ?
ট্রেন এসে থামলও পালইকান্তা স্টেশনে। এখানে বেশিক্ষণ থামে না। আমি লাগেজ নিয়ে হুরমুর করে নামলাম । পুরো ট্রেন থেকে মনে হয় আমি এক মাত্র ব্যক্তি যে এই স্টেশনে নেমেছে। রাত ৮ টা। চারিদিক অন্ধকার। টিপ টিপ বৃষ্টি পরছে। রহমত ভাইয়ের আমাকে নিতে আসার কথা। এসেছে কি? স্টেশনে আর একটা মানুষ নাই। ভাবলাম স্টেশন মাস্টারের ঘরে যাবো কিনা। ভাবতে ভাবতেই রহমত ভাই এসে হাজির। আমার দাদার একটা পুরনো ভক্স ওয়াগন গাড়ি আছে। এই গাড়ি চালান রহমত ভাই। আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো রহমত ভাই। রহমত ভাই আমার অনেক কাছের মানুষ। তার চোখের সামনেই তো বড় হয়েছি।
-এতদিন পর আইলা!
-কই? গত জানুয়ারি তে আসলাম না?
-সেও তো ৬ মাস হয়ে গিয়েছে।
-আমার কি আর কোন কাজ কর্ম নাই?
– বুঝছি আমাদের দেখবার তোমার মন চায় না।
– তুমিও দাদুর মত অবুঝ হলা? এখন বল দাদু কেমন আছে? খবর দিল কেন?
– আরে ক্রিকেট খেলা। প্রতি বছর এই সময় খেলা হয় না? সেইজন্য খবর দিয়েছে।
– উফ তোমরা পারো বটে। এই ক্রিকেট খেলার জন্য আমার কত কাজ পেন্ডিং হয়ে যাবে জানো ?
– তা যাই হোক। তোমার খেলতে হবে। নাহলে আমরা পরিষ্কার হারবো ।
– এসে যখন পড়েছি তখন না খেলে উপায় নাই।। আর হারবো ? কাভি নেহি। চল চল বাড়ি চল।আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে।
গাড়িতে উঠলাম। বিকট শব্দ করে গাড়ি চলতে শুরু করলো। কবে যে দাদু এই গাড়ি বদলাবে। আমি কত বলি। এমন না টাকা পয়সা নেই। বুড়া মহা কিপটে। পয়সা খরচ করতে চায় না।
এইবার আসি ক্রিকেট খেলা প্রসঙ্গে। এই অঞ্চলের বহু বছরের একটা ঐতিহ্য হল মিয়া বাড়ি আর আকন্দ বাড়ির ক্রিকেট খেলা। আমার দাদার বাবা আবুল ফজল আকন্দ এবং তার বন্ধু আবুল হোসেন মিয়া এই খেলা শুরু করেন।এবং তার পর এই ধারা চলে আসছে। প্রতি বছর জুলাই তে খেলা হয়। এবং এই খেলার সাথে বাড়ির মান সম্মান জড়িত ।
এই পর্যন্ত আমি যতবার খেলেছি তার মাঝে বেশির ভাগ সময় আমরাই জিতেছি। মানে আকন্দ বাড়ি জিতেছে। কিন্তু তার মানে এই না যে আমরা হারি নাই। গতবার ই হেরেছি।তার আগের বারো হেরেছি। তাই এইবার অবশ্যই জিততে হবে। তানাহলে পরাজয়ের হ্যাট্রিক হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক জিততে হবে। মান সম্মানের ব্যাপার। এইসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে আসলাম। দাদা বাড়ি। আকন্দ বাড়ি। পালইকান্তার সবচেয়ে বড় বাড়ি আর পাশের গ্রাম রসুলপুরের সবচেয়ে বড় বাড়ি হল মিয়া বাড়ি যাদের সাথে আমাদের খেলা হবে।
গাড়ির বিকট শব্দ শুনেই দাদু ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন।আমি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম দাদু কে।
– হয়েছে দরদ দেখানো লাগবে না। কত দিন পর আইলি?
– দাদু তুমি তো জানো আমি আব্বুর ব্যবসায় যোগ দিয়েছি।এখন চাইলেও আসতে পারি না
– বুঝছি। আমাকে ব্যবসা শিখাস?তোর বাপ কি নিজে ব্যবসা দাড় করসে?
– আহা দাদু।তুমি আমাদের সাথে চলে আসলেই পারো। কেন যে একা এই বাসায় পরে আছো
– তুই জানিস এই বাড়ি , গ্রাম ছেড়ে কোথাও আমি থাকতে পারবো ? তাছাড়া তোর দাদীর কবর তো এইখানে
দাদু কিছুটা আবেগ প্রবণ হয়ে গেলেন। দাদী মারা যাবার পর দাদু অনেক একা হয়ে গিয়েছেন।আমি কথার প্রসঙ্গ ঘুরলাম
– দাদু ক্রিকেট খেলার কি অবস্থা?
– আমি খুব চিন্তায় ছিলাম। তুই আসছিস এখন আর কোন চিন্তা নেই।এখন দরকার একটা রানি মুখারজির।
– রানি মুখারজি?
– হ্যাঁ। দিল বলে হারিপ্পা দেখিস নাই?
– না। কিন্তু দাদু তুমি এখনো হিন্দি ফিল্ম দেখো ?
– দেখবো না? তোর দাদির সাথে দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে রে। অভ্যাস কি ছারা যায় এত সহজে ?
– আচ্ছা কালকে আমি সবার সাথে বসবো। কি অবস্থা টিমের দেখতে হবে।
– ঠিক আছে। তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়। খেতে বসি। রাত অনেক হল।
খেতে বসে আমি কিছুটা বিব্রত হলাম। অনেক পদ রান্না করা হয়েছে। কিন্তু আমি তো এত খেতে পারি না। কিন্তু কালুর মা খুব ভাল রান্না করেন। সব পদ ই খেলাম। খাওয়ার টেবিলে তেমন কথা হল না। আসলে রাত হয়েছে। দাদু বেশি রাত জাগতে পারে না। আমি খেয়ে দেয়ে নিজের ঘরে আসলাম।ঘরটা একদম পরিপাটি করে গোছানো। গতবার যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম সেরকমই রয়েছে। আমিও আর রাত জাগলাম না।সারাদিনের ভ্রমণে আমিও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। বিছানায় শুতেই হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে।

বিকেল ৫ টা। স্কুলের খেলার মাঠে বসে আছি। আমার টিমের অন্যান্য সদস্যরাও আছে। শুধু ১ জন কম রয়েছে।রকিব নেই। সে নাকি চাকুরী নিয়ে দেশের বাইরে চলে গিয়েছে। সে আমাদের দলের এক মাত্র পেস বোলার ছিল। এখন তার জায়গায় কে খেলবে ??
রহমত ভাই আমাদের দলের ভাইস ক্যাপ্টেন। সেই প্রস্তাব দিল।
– সলিল তো খুব ভাল পেস বোলার । তারে নিলে কেমন হয়?
আমি জিজ্ঞেস করলাম
– সলিল আবার কে? এই প্রথম শুনলাম মনে হয়।
– আছে একজন। খুব ভাল খেলে।কিন্তু সমস্যা একটাই।
– কি সমস্যা?
– তার বাড়ি পালইকান্তা আর রসুলপুরের মাঝখানে পরেছে।টের পেলে মিয়া বাড়ি তাকে দলে নিয়ে নিবে। আমরা কিছুই বলতে পারবো না।
– তাহলে এখুনি যাওয়া দরকার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
পিছন দিকে থেকে আমাদের উইকেট কিপার সোহেল বলল
– কিন্তু সলিল খেলতে রাজি হবে না ভাইয়া। খেলা ছেড়ে দিয়েছে সে।
– কিন্তু কেন?
– ভাইয়া সলিল পরীক্ষায় ফেল করেছিল। এইচ এস সি পরীক্ষা । সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাস করা না পর্যন্ত কোন ধরনের খেলাধুলার মাঝে নাই।
– আচ্ছা সলিল কে কিভাবে রাজি করা যায় তা আমি বুঝবো। আমাকে একজন বল সলিলের পছন্দের খাবার কি?
পিছন দিক থেকে আমাদের অলরাউন্ডার নাদিম বলল
– মিষ্টি পেলে তার আর কিছু চাই না।
– গ্রেট। এখন সলিলের বাসায় যাবো আমি। কিন্তু একা।
আমি পালইকান্তা বাজারে গেলাম প্রথম।পালইকান্তার সবচেয়ে বড় মিষ্টির দোকানে ঢুকলাম। কিনলাম এক হাঁড়ি গরম রসগোল্লা। তারপর রওনা দিলাম সলিলের বাড়ি।

দরজায় নক করতেই সলিল দরজা খুলল। সলিল কে এই প্রথম দেখলাম। তাকে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এ কি মানুষ নাকি আকাশ থেকে এঞ্জেল নেমে এসেছে!সলিল কে দেখে আমার সম-প্রেমী মন জেগে উঠলো । আর সলিল আমাকে দেখে তো একটা চিৎকার দিল
– ভাইয়া আপনি! আমার কি সৌভাগ্য! আপনি আমার বাসায়!
– তুমি আমাকে চিনো ?
– আপনি আকন্দ বাড়ির ছেলে । আর আমি চিনবো না? আর আপনি যে ব্যাটিং করেন । আপনাকে আমি চিনবো না? কি যে বলেন!
আমি লজ্জার হাসি হাসলাম। সলিল আমাকে বলল
– ভিতরে আসেন ভাইয়া। ভাইয়া আপনার হাতে কি?
– রসগোল্লা । তোমার জন্য এনেছি
সলিলের চোখ খুশিতে চকচক হয়ে গেলো । প্রায় ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে রসগোল্লার হাড়ি টা নিলো। তক্ষুনি হাড়ি খুলে টপাটপ রসগোল্লা মুখে পুরতে লাগলো । আমাকে অফার দিল সলিল
– ভাইয়া খাবেন?
– না না তুমি খাও
সে খাচ্ছে আর আমি তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখছি। খেতে খেতে সলিল অনেক কথা বলল। তার বাবা মা কিছুদিনের জন্য ঢাকা গিয়েছেন। সে এখন একাই বাসায়। এমন কি রান্নাও তার একাই করতে হচ্ছে। আর ক্রিকেট নিয়ে সেইরকম কথা হল। প্রিয় খেলোয়াড় কে? কার বোলিং তার ভাল লাগে এসব। কিন্তু যে কাজে এসেছি তাই করা হল না। বলা হল না তাকে খেলার কথা।

আবার আসলাম পরের দিন বিকেলে। খেলার কথা বলা উদ্দেশ্য। কিন্তু মনের ভিতর কাজ করছে তাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া। আমাকে দেখে সলিল সেদিনের মতই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো । আমি বললাম
– আবার আসলাম। তোমাকে জ্বালাতে। আসলে এখানে আমার তেমন কোন বন্ধু নেই তো তাই তোমার সাথেই গল্প করতে এলাম।
– খুব ভাল করেছেন। আমারও একা একা লাগছিল। বাসায় কেউ নেই তো
– চল আজ তোমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো
– কোথায়?
– মিষ্টি খাওয়াতে। এখান থেকে বেশ অনেক দূরে রহমতগঞ্জে। ওখানে একটা মিষ্টির দোকান আছে। মধু ময়রার মিষ্টির দোকান। সেখানকার মিষ্টি একবার যে খেয়েছে তার জিভে সেই মিষ্টির স্বাদ আজীবন লেগে থাকবে।
– কি বলেন ভাইয়া! আমি তো আগে শুনি নাই।
– আমার দাদীর বাপের বাড়ি রহমতগঞ্জ। আগে যখন দাদী বেঁচে ছিলেন তখন সেখান থেকে আমাদের বাসায় মিষ্টি আনা হত। আমিও পালইকান্তা আসলে প্রায় যেতাম সেখানে। এখন আর যাওয়া হয় না।
– কিন্তু যাবো কিভাবে এত দূর?
– আমি বাইক নিয়ে আসছি। আমার এক চাচার বাইক।দূর সম্পর্কের চাচা ।ধার করে এনেছি।
– ওয়াও। আমার বাইকে চড়তে দারুণ লাগে। মনে হয় পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চরেছি।
আমি সলিল কে নিয়ে বাইকে স্টার্ট দিলাম। তারপর বাইক নিয়ে উড়ে চললাম রহমতগঞ্জের দিকে।রহমতগঞ্জে যখন পৌঁছে গেলাম তখন বিকেল। মিষ্টির দোকানে ঢুকে আমি পাঁচ ধরনের মিষ্টি অর্ডার দিলাম।রসগোল্লা , চমচম, পানতোয়া, মালাইকারি আর সন্দেশ। মিষ্টি খাচ্ছি আর গল্প হচ্ছে। আজকে ক্রিকেটের বাইরে নানা বিষয় নিয়ে গল্প হল। জানতে পারলাম সলিল অনেক বই পড়ে। গ্রামের লাইব্রেরীর বেশির ভাগ বই পড়ে ফেলেছে। তার প্রিয় লেখক আর আমার প্রিয় লেখক এক। গ্রামে থাকা সত্ত্বেও সে অনেক সিনেমা দেখেছে। যখন সে ঢাকায় তার মামা বাড়ি যায় তখন সে সারাদিন সিনেমা দেখে। আমার মত প্রাক্তন সিনেমা টা সে ইতোমধ্যে তিন বার দেখে ফেলেছে। আমি যতই কথা বলছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে আমি ছেলেটার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।

মিষ্টি খেয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। সামনে একটা সিনেমা হল। আমি কক্ষনো গ্রামের সিনেমা হলে সিনেমা দেখি নাই। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। বললাম সলিল কে।
– ভাই এইটা কিন্তু স্টার সিনেপ্লেক্স না। আর সিনেমার অবস্থাউ যা তা
– তারপরও চল দেখি। একটা অভিজ্ঞতা হোক
– চলেন
হলের ভিতর ঢুকে আসলেও কিছুটা হতাশ। আর সিনেমা দেখে কিন্তু হতাশ হলাম না। হাসতে হাসতে শেষ আমরা দুইজনে।যদিও কাহিনীর আগা মাথা নেই। আর ফানি ফানি সব সংলাপ। পুরোই কমেডি লেগেছে। একা দেখলে হয়তো বিরক্ত লাগতো। কিন্তু সলিল থাকায় এই সিনেমা দেখা আমার কাছে অনেক উপভোগ্য মনে হয়েছে। সিনেমা দেখে বের হতেই রাত হয়ে গিয়েছে। হাঁটছি রাস্তা ধরে। আজকে আকাশে মেঘ নেই। একদম পরিষ্কার। তারা গুনা যাবে এমন পরিষ্কার আকাশ। একটা জিনিস দেখলাম। সলিল তারা দেখতে জানে।কোনটা কোন তারা তা নাকি সে সহজেই চিনতে পারে।আমাকে আফসোস করে বলছে
– ঈশ ! আমার যদি একটা টেলিস্কোপ থাকতো । আমার খুব শখ টেলিস্কোপের।আম্মু কে বলেছি। কিন্তু অনেক দাম।
এমন রোমান্টিক পরিবেশে ক্রিকেট খেলার কথা উঠানো যায় না। আজকেও বলা হল না। কিন্তু তাতে আমার কোন আফসোস নেই। আজকের দিনটা আমার জন্য অনেক স্মরণীয় দিন।

সকাল ঘুম থেকে উঠেই একটা সারপ্রাইজ পেলাম। সলিল এসে উপস্থিত আমাদের বাসায়। ওরে দেখে বললাম
– সলিল তুমি?
– জি ভাইয়া। আপনি আমার বাসায় আসতে পারলে আমি আসতে পারবো না?
– অবশ্যই পারবা। ইনফ্যাক্ট আমি অনেক খুশি হয়েছি তুমি আসাতে
– আপনার জন্য আমার গাছে পেয়ারা নিয়ে এসেছি
– ধন্যবাদ সলিল
– ধন্যবাদ দিতে হবে না। আপনি আমাকে কত্ত কিছু খাওয়ালেন। আর আমি তো শুধু পেয়ারা খাওয়াচ্ছি। আর আজকে আপনাকে নিয়ে আমি এক জায়গায় যাবো । যাবেন তো ?
– অবশ্যই। কিন্তু কিসে যাবো
– আমার সাইকেল আছে না? সাইকেলে করে।
সলিল সাইকেল চালাচ্ছে। আর আমি পিছনে বসেছি। পালইকান্তা থেকে অনেক খানি দূরে চলে আসলাম। আমাকে নিয়ে সলিল একটা পুরানো ভাঙ্গা মন্দিরের সামনে আসলো।সলিল বলল
– এখানে একটা দীঘি আছে। শান বাঁধানো ঘাট। যখন আমার মন খারাপ হয় আমি তখন এখানে এসে বসি। আমি এই দীঘির নাম দিয়েছি অশ্রু দীঘি । যাবেন
– চল।
মন্দিরের ভিতরের চত্বরটা পার হলেই দীঘি টা আসলেই সুন্দর। পানি টলমল করছে। ঘাঁটে বসলাম। চারিদিকে নীরব। মাঝে মাঝে পাখীর ডাক শোনা যায়।সলিল বলল
– এদিকে মানুষ এখন খুব একটা আসে না। এখন মন্দিরে পূজা আর দেয়া হয় না।
আমি দীঘিতে ঢিল ফেললাম। ঢেউ তুলে শব্দ তুলে দীঘির পানি তে ঢিল টা হারিয়ে গেলো। আর তখন আমি সলিলের আরেকটা গুনের পরিচয় পেলাম। সলিল গান ধরলও
– আমার শ্যাম যদি হইতও মাথার কেশ……………।
আমি মুগ্ধ হয়ে গান শুনছি। এত ভরাট গলা। আমাকে সলিল দিন দিন দুর্বল করে ফেলছে।
– চলেন এগোই
– কেন এখানেই তো ভাল লাগছে।
– শাপলা পুকুর দেখবেন না?
– কোথায় ? জংগলের মাঝে একটু সামনে এগোলেই শাপলা পুকুর
জঙ্গলের মাঝে সরু রাস্তা গিয়েছে। তা দিয়ে হাঁটছি। কত নাম না জানা গাছ। পাখির কিচির মিচির। ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যং এক অনন্য সঙ্গীত তৈরি করছে যেন। নাম না জানা বুনো ফুলের গন্ধে চারিদিক মৌ মৌ। এরপর যা দেখলাম তা অভাবনীয়। একটা পুকুর জুড়ে অসংখ্য সাদা শাপলা ফুটে রয়েছে। এই তাহলে সলিলের শাপলা পুকুর।
– ভাইয়া ভাল লাগছে? ক্লান্ত লাগছে না তো ?
– মোটেই ক্লান্ত লাগছে না। আর জায়গাটা এত সুন্দর ভাবতেও পারি নাই।
– আমি আগে কক্ষনো কাউকে নিয়ে আসি নাই। এটা নিজস্ব জায়গা। কেউ জানে না। আপনাকেই প্রথম আনলাম
– কিন্তু কেনও?
– আপনাকে আমার অনেক ভাল লাগে তাই।
কথা গুলো বলতে বলতে সলিলের গাল লাল হয়ে গেলো। তাহলে আমি সলিল কে নিয়ে যেভাবে ভাবি … সলিলও কি আমাকে নিয়ে সেভাবে ভাবে! সলিল আমাকে কিছু শাপলা তুলে আমার হাতে দিল।
গ্রামে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আকাশ জুড়েই হটাত করে কালো মেঘের ঘনঘটা। দমকা হাওয়া বইছে চারিদিকে। সলিলের বাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতে ঝর ঝর করে বৃষ্টি শুরু হল। এখন আমি বাড়ি যাবো কিভাবে
– ভাইয়া আজকে আমার এখানে থেকে যান।
কথা টা আমারও মনে ধরলও। কারণ এই বৃষ্টির মাঝে আমারও বাসায় যাওয়া সম্ভব না। কারেন্ট চলে গেলো । সলিল মোমবাতি জ্বালালো । মোম বাতির আলোয় এক মায়াবী আবহ তৈরি হয়েছে। আমার মনে হল আমার একটা দায়িত্ব আছে। ওকে খেলার কথাটা এখন বলা উচিৎ। আমি সব খুলে বললাম। সলিল হটাত করে খুব মন খারাপ করে ফেললো । বলল
– ভাইয়া আমাকে সরাসরি খেলার কথা বললেই পারতেন। এত ঘুরাঘুরির নাটক না করলেও হত।
কথাটা যেন আমার হৃদয়ে যেয়ে বিঁধলও । আমি বললাম
– আমি মোটেও নাটক করি নাই। আমার তোমাকে প্রথম দিনই অনেক ভাল লেগেছে। হ্যাঁ তোমার কাছে এসেছিলাম খেলার কথা বলার জন্য। কিন্তু তোমার সাথে মিশার পর তোমাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি
– ভাইয়া আপনি যতই বলুন। আমার আর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার আর ভালো লাগছে না। আমি শুয়ে পরছি। ঘুমবো। আপনার বিছানাও গুছিয়ে রেখেছি। আপনিও ঘুমান।
আমি আর কিছু বললাম না। সারা রাত ঘুমাইলাম না। উঠানে বসে বৃষ্টি দেখলাম। আর আমার চোখ থেকেও বৃষ্টি ঝরলও

খুব ভোরে বাড়ি চলে গেলাম। সকালে একটু ঘুমিয়ে বিকেলে প্র্যাকটিসে গেলাম। এমনি গতকাল প্র্যাকটিস করা হয় নাই। সেখানে যে আমার জন্য এক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে তা আমি জানতাম না। সলিল এসেছে প্র্যাকটিসে। আমাকে দেখে সলিল লাজুক হাসি হাসলও। আমি তাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গেলাম
– কি ব্যাপার তুমি না আমার কথা বিশ্বাস কর নাই?
– যে আমার জন্য সারা রাত চোখের পানি ফেললো তার কথা আমি বিশ্বাস করবো না। আমাকে ক্ষমা করে দেন। আপনাকে আমি ভুল বুঝেছি
– তুমি ঘুমাউ নাই কাল রাতে?
– একদম ই না। আপনি যেমন আমাকে ভালবাসেন। আমিও আপনাকে ভালবাসি। আমার চোখের পানিতেও আমার বালিশ ভিজে গিয়েছে কাল
আমি খুশিতে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।

আজকে মিয়াবাড়ি আর আকন্দ বাড়ির মধ্যে ক্রিকেট খেলা। চারিদিকে সাজ সাজ রব। স্থানীয় এমপি আসবেন পুরস্কার দিতে। প্রথম ব্যাটিঙে নামলো মিয়া বাড়ি। সলিলের অসম্ভব ভাল বোলিঙে খুব বেশি রান তারা তুলতে পারলো না। দেখলাম মিয়া বাড়ির ক্যাপ্টেন নকিব রাগে গর গর করছে। আমি কিছু কথাও শুনে ফেললাম। কথা শুনে যা বুঝলাম নকিব সলিলের উপর রেগে কাই। কারণ সলিল এর বাসা তো দুই বাড়ির মাঝখানে পরে। তাই তারা সলিল কে অনেক আগেই তাদের টিমে খেলার অফার দিয়েছিল। কিন্তু তখন সলিল রাজি হয় নাই। অথচ এখন সলিল আমাদের টিমে খেলছে। আরও শুনলাম সে নাকি সলিল কে দেখে নিবে। আমার খুব ভয় লাগছে।নকিব সলিলের কোন ক্ষতি করবে না তো ?
ব্রেক চলছে। মধু ময়রার দোকান থেকে মিষ্টি আর নিমকি আনা হয়েছে। সবাই পেট ভরে খেলো। আবার খেলা শুরু হবে। আমরা এখন ব্যাটিঙে। নকিব অসম্ভব ভাল বোলিং করে। তার বোলিঙের কাছে আমাদের ব্যাটসম্যান রা টিকতে পারলো না। আমি শুধু টিকে আছি। আমাদের শেষ ব্যাটসম্যান সলিল।সে এখন স্ট্রাইকে। আমি সলিল কে বললাম
– তুমি কোন রকমে একটা রান নিয়ে আমাকে স্ট্রাইকে দাও।
– আমি চেষ্টা করছি ভাইয়া
– ওকে চেষ্টা কর। আর নার্ভাস হইও না। মাত্র তো চারটা রান দরকার
এদিকে নকিব ও তার অনন্য সাথী দের সাথে কি জানি পরামর্শ করলো। ভয় লাগছে কেন জানি। আগে কক্ষনো এমন অনুভূতি হয় নাই খেলতে নেমে। নকিব বল করলো। ফুল্টস বল। সোজা যেয়ে সলিলের মাথায় আঘাত করলো। আমি পুরো স্তম্ভিত। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি সলিলের মাথায় নকিব ইচ্ছে করে বল টা মেরেছে। সলিল চিৎকার দিয়ে বসে পড়লো। ব্যথায় কাৎরাচ্ছে। আমরা ছুটে গেলাম। আমি জোরে চিৎকার করে বলছি
– কেউ একজন এ্যাম্বুলেন্স ডাকো ।
দাদা ছুটে আসলেন মাঠে। কয়েকজন বরফ নিয়ে মাঠে ঢুকে সলিলের মাথায় দিচ্ছে। একটু পর সলিল উঠে বসলো । আমি বললাম
– ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার। একটা সিটি-স্ক্যান করতেই হবে।
সলিল বলল
– আরে কিছু হয় নাই। আমি শেষ বল টা খেলবো
আমার কোন কথা শুনলও না সে। জিদ করে খেলতে নামলো। নকিব নার্ভাস হয়ে গিয়েছে পুরো ঘটনায়। আর সলিল সুযোগ পেয়ে গেলো। চার মারলও। আর আমরা জিতে গেলাম। কিন্তু আসলেই কি জিতলাম

সলিল হাসপাতালে ভর্তি। জ্ঞান নেই। চার মারার পর আমরা তাকে কাঁধে নিয়ে আনন্দ করছিলাম। হটাত করেই সে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লো। তারপর দ্রুত দাদার গাড়ি করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে আসলাম।
ডাক্তার বলেছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখন কিছুই বলা যাবে না। ভাল , খারাপ যে কোন কিছুই হতে পারে।
আমার মাথায় আর কিছুই ঢুকছে না। সলিলের কিছু হলে আমি ক্ষমা করতে পারবো না নিজেকে। আর শুধু কি তাই? আমি কি নিয়ে থাকবো বাকি টা জীবন। জীবনে এক জন কেই ভালবেসেছি। আর তাকেই এইভাবে হারাতে হবে? কি আজে বাজে চিন্তা করছি। নাহ। ওর নিশ্চয়ই কিছু হবে না। আমি মসজিদে গেলাম নামাজ আদায় করতে। অনেকক্ষণ কেঁদে কেঁদে তার জন্য দুয়া করলাম।
নামাজ শেষে হাসপাতালে ফিরলাম। কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। কি হয়েছে সবার! কি অজানা আতঙ্ক আমাকে ঘিরে ধরলও। দৌড়ে গেলাম আইসিইউ তে। ওখানেই সলিল রয়েছে।ওর বেডের দিকে তাকালাম। সাদা চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে রাখা হয়েছে সলিলের।তাহলে কি সলিল নেই! আমি যখন নামাজে তক্ষুনি সলিল চলে গিয়েছে না ফেরার দেশে আমাকে একা রেখে।
আজকাল আমি প্রায়ই বসে থাকি অশ্রু দীঘির ঘাঁটে। সলিলের যখন মন খারাপ হত তখন সে এই দীঘি তে আসতো। তার নাকি মন ভাল হয়ে যেত। কই আমার তো হয় না।কি অজানা বেদনায় আমার মনটা সারাক্ষণ গুমোট হয়ে থাকে। যখন শাপলা পুকুরের কাছে যাই তখন তো সলিলের মত কেউ আমার হাতে শাপলা তুলে দেয় না। যখন রাত হয় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। সলিল হয়তো আকাশের তারা হয়ে আমাকে দেখছে। কিন্তু আকাশের অগণিত তারার মাঝে কোনটা সে কিভাবে বুঝবো। তাও টেলিস্কোপ দিয়ে তাকিয়ে থাকি আকাশে। এখন আমি অনেক তারা চিনি।চিনি সপ্তর্ষি মণ্ডল। চিনি লুব্ধক। চিৎকার করে এই কথাগুলো বলতে ইচ্ছা করে। যদি সলিল শুনতে পায়! আর শুনতে পেলে নিশ্চয় সে অনেক খুশি হবে
বছর ঘুরে আবার খেলার মৌসুম আসে। সবাই আবার খেলা নিয়ে মেতে উঠে। নতুন করে প্র্যাকটিস শুরু হয়। কিন্তু আমি পারি না খেলতে। ব্যাট ধরলেই সলিলের মুখ আমার চোখের সামনে ভাসে। কিভাবে খেলবো আমি? আমি ঢাকা ফিরে যাই। যখন অঝর ধারায় বৃষ্টি নামে তখন সোনালি সোডিয়াম বাতির আলোয় হাঁটি। অতীত রোমন্থন করি।হারিয়ে যাই পালইকান্তার সেই দিন গুলো তে।
দিন যায়।সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কোন এক বর্ষায় আবার হয়তো আমি খেলতে পারবো। সেই অপেক্ষায় দিন যায় আমার।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.