প্রিয় বন্ধু

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি


স্কুলের ছেলে গুলো এত নিষ্ঠুর হয় কেন? আজকেও ক্লাসে চন্দন কে সেইরকম পচানো হয়েছে। ছেলেটা কে দেখলে আমার খুব মায়া হয়। একহারা গড়ন, লম্বা এলোমেলো চুল, ফরসা চেহারা চন্দনের। দেখলেই আমার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে । সে বেঁচে নাই। ২ বছর আগে মারা গিয়েছে।হটাত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহের মাঝে মারা গেলো। তার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। চন্দন আবার তার কথা মনে করিয়ে দিল।
চন্দন এই বছরই এই স্কুলের আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। মানে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছে। চন্দন যেদিন প্রথম আসলো ক্লাসে সেদিন থেকেই ছেলেরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। হাসাহাসি করার কারণ চন্দন প্রচণ্ড মেয়েলি। হাঁটা , চলা ফেরা, কথা বলার স্টাইল প্রচণ্ড মেয়েলি। প্রথমে মুখ টিপে হাসতও ছেলেরা । তারপর তাকে পচানো শুরু হল। শুরু হল নানারকম অত্যাচার। আমি ক্লাসে একটু নেতা গোছের ছেলে। তার উপর আমি ক্লাস মনিটর। আমার কথা অনেকেই শুনে। আমি প্রায়ই চেষ্টা করি যাতে চন্দন কে পচানো না হয়। কিন্তু সব সময় পারি না। আজকেও এমন হয়েছে। আজকে ছুটির ঘণ্টা বাজার পর পর চন্দনের মাথায় এক বোতল পানি ঢেলে দেয়া হয়েছে।সে ভিজে একাকার। এই অবস্থায় বাড়ি যেতে হবে তার। আমার খুব খারাপ লাগছে তার জন্য । কিন্তু কি করবো ?

চন্দনের উপর অত্যাচার কোন ভাবেই বন্ধ হল না। ছেলে গুলো এক পৈশাচিক আনন্দ পায় তাকে অত্যাচার করে। কখনো শার্টে চুইংগাম লাগানো , কিংবা শার্টের পিছনে গাধা লিখে রাখা, খাতা পত্র লুকিয়ে রাখা, পানি ছিটানো , টিফিন খেয়ে ফেলা নিত্য দিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। ক্লাসে তার নাম দেয়া হল হাফ লেডিস চন্দনা। কেউ কেউ হিজরা ডাকতে লাগলো। অনেকে তার পেনিস আছে কিনা তা দেখার জন্যে প্যান্ট ধরে টান দিতে লাগলো। ব্ল্যাক বোর্ড এ টিফিন টাইমে যা তা তার নামে লিখতে লাগলো ছেলেরা। কারো সাথে ২-১ বার মারামারি করতেও গিয়েছিল চন্দন। কিন্তু সে এত দুর্বল যে উল্টা ভাল রকম মার খেয়ে ফিরেছে। আর স্যার এর কাছে নালিশ করতে হলে ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রের বিরুদ্ধেই নালিশ করতে হয়।
আমি ক্লাস মনিটর। তাছাড়া চন্দন কে আমার ছোট ভাইয়ের মত লাগে। আমি সব সময় যতখানি পারি ওকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। আমার কথা অনেকে শুনে। আর আমাকে ভয় পায় অনেকেই। স্যার রা আমাকে পছন্দ করেন। আমি নালিশ করলে শাস্তি পেতে হবে নিশ্চিত। আমার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি একটু ভাল হল। চন্দন আমাকে পেয়ে যেন স্বর্গ পেলো। চন্দনের সাথে আমার সম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে লাগলো। আমাদের বাসা কাছাকাছি। একসাথে যাতায়াত করতে লাগলাম। যত মিশতে লাগলাম ততই অবাক হতে লাগলাম। চন্দন কে যা ভেবেছি সে মোটেই তেমন নয়। সে অসম্ভব মেধাবী। যে অংক আমার করতে লাগে ২০ মিনিট সে অংক সে ৫ মিনিটেই করে ফেলে। তার ছবি আঁকার হাত অসাধারণ। আসলে এত অত্যাচারের মধ্যে থাকলে কার প্রতিভাই বা বিকশিত হয়।তার সাথে আমি সবচেয়ে বেশি মিল পেলাম গল্পের বই পড়ার ক্ষেত্রে। আমি যে বইগুলো পছন্দ করি সেই বই গুলো তারও পছন্দ।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ আমাদের পছন্দের তালিকায় এক নম্বর। এছাড়া আমরা ২ জনেই শরৎচন্দ্র পড়ে ফেলেছি এই বয়সেই। হুমায়ুন আহমেদ,শাহরিয়ার কবির আর জাফর ইকবালও আমাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন। আমরা ২ জনেই গান শুনতে পছন্দ করি আর চকলেট আমাদের দুজনের খুব প্রিয়।অমিলও রয়েছে। আমি ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করি আর চন্দন নাচতে। চন্দন খুব ভাল নাচতে পারে। ক্লাসিকাল নাচ। কত্থক।

সময় যায়। আমাদের সম্পর্ক আরও উন্নতি হতে লাগলো। এখন প্রায়ই আমি চন্দনের বাসায় যাই। চন্দন আমার বাসায় আসে। পারিবারিক ভাবেও আমরা একে অপরের বন্ধু হয়ে গেলাম। আমাদের সব কথা বলা হয়ে গেলো। কিন্তু চন্দনের যে আরও কথা বাকি ছিল বলার তা জানতাম না। এক বিকেলে বিকেল বেলা বাড়ির ছাদে বসে আছি। চন্দন এসে উপস্থিত। চন্দনের প্রথম কথাই শুরু হল দোস্তানা মুভি নিয়ে। এই মুভির কল্যাণে আমরা সবাই জানি গে মানে কি। চন্দন কেও আজকাল ক্লাসে গে বলে খ্যাপানো হয়। চন্দন মুখ চোখ অন্ধকার হয়ে আছে।আমি জিজ্ঞেস করলাম
– কি হয়েছে তোর?
– কিছু না
– তাহলে চেহারা এমন কেন? কেউ কিছু বলেছে?
– সে তো সবসময় বলে। নতুন কি?
– তাহলে?
– তোকে আমার জীবনের একটা বড় অংশের কথাই বলা হয় নাই।কয়েক দিন ধরে আমি খুব অপরাধ বোধে ভুগছি।
– কি কথা
– এই কথা শুনলে তুই হয়তো আমার সাথে আর বন্ধুত্ব রাখবি না।
– ধ্যাত। কি হয়েছে বল
– তুই দোস্তানা দেখেছিস?
– হ্যাঁ
– আমি গে। মানে আমি সমকামী।
আমি চুপ হয়ে গেলাম। ভাবছি কি বলবো
– তুই গে হলে আমার কোন সমস্যা নেই। এতে কেন আমি বন্ধুত্ব নষ্ট করবো ?কিন্তু ক্লাসের কাউকে বলিস না। বললে তোর উপর নতুন করে অত্যাচার শুরু হবে।
– কিন্তু তুই আমাকে এখন ঘৃণা করিস না তো?
– ঘৃণা কেন করবো। আমি তো জানি কেউ ইচ্ছা করে সমকামী হয় না।
– আমার আজকে খুব হাল্কা লাগছে জানিস? অন্তত কেউ তো আমাকে বুঝে। কেউ তো আমার সব জানে। সব জেনেই আমাকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিয়েছে। তুই কোন দিন আমাকে ছেড়ে যাবি না তো ?
– না যাবো না। অন্তত তুই গে এই কারণে আমি তোকে ছেড়ে কক্ষনো যাবো না।
চন্দন আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলও। এই জড়িয়ে ধরার মাঝে কোন কাম ছিল না। ছিল শুধু বন্ধুত্ব এবং ভালবাসা।

ক্লাসে এখন চন্দন কে এখন আর কেউ সরাসরি এটাক করে না। কিন্তু বই লুকিয়ে রাখা, হাসাহাসি করা, হাফ লেডিস বলা অব্যাহত রয়েছে। কেউ তার সাথে মিশেও না। চন্দন এক মাত্র আমাকেই বন্ধু হিসেবে মানে। তাতেই সে সন্তুষ্ট। আর কারো বন্ধুত্ব তার দরকার নেই। ক্লাসে অমিত নামে একটি ছেলে রয়েছে। খুবই দুর্ধর্ষ টাইপ ছেলে। সে আমাকেও ভয় পায় না। সে শুধু মাঝে মাঝে চন্দনের উপর অত্যাচার করে।আমি ঠিক করলাম তাকে একটা শিক্ষা দিতে হবে। যাতে এই অত্যাচার বন্ধ হয়। একদিন অমিত চন্দনের শার্টে চুইংগাম লাগিয়ে দিল। আমার ইচ্ছা করছিল অমিত কে ধরে পেটাই। আমি ক্লাস মনিটর। আমার একটা দায়িত্ব আছে। ঠিক করলাম হেড স্যার কে যেয়ে বলবো। চন্দন না করলো বলতে। কারণ তাতে নাকি অমিত আমার শত্রু হয়ে যাবে। কিন্তু আমি থোরাই কেয়ার করি। আমি যেয়ে স্যারের কাছে ভাল মত নালিশ করলাম। সাথে নিয়ে গেলাম অমিত কে। দেখালাম শার্টে চুইংগামের দাগ। হেড স্যার ভাল মানুষ। তিনি সহজে রাগেন না। কিন্তু এবার তিনি প্রচণ্ড রাগ করলেন। সেরকম ভাবে বেত দিয়ে পেটালেন অমিত কে। তারপর মাঠে নিয়ে নিল ডাউন করিয়ে রাখলেন। অমিতের মত ছেলের চোখে পর্যন্ত পানি এসে গেলো। এতটা শাস্তি দিবেন স্যার ভাবি নাই। অমিত আমার দিকে একবার তাকালও। পারলে যেন আমাকে ভস্ম করে দিবে। আর বলল
– এক মাঘে শীত যায় না। আমারও দিন আসবে। এখন শুধু তোর আর আমার লড়াই।
আমি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলাম। বললাম
– যা পারিস করিস
মনে মনে ভাবলাম কি করবে? আমাকে মারবে? এত সাহস অমিতের নেই।

দেখতে দেখতে ফ্রেন্ডশিপ ডে এসে গেলো। আমার এসব ডে মনে থাকে না। কিন্তু চন্দনের খুব ভাল মত মনে আছে। আমি ক্রিকেট খেলি। আর খেলতে অসম্ভব ভালবাসি। আমার জন্য চন্দন একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনেছে ফ্রেন্ডশিপ ডে এর উপহার হিসেবে। আমি পুরো অবাক হয়ে গেলাম। এমন একটা সারপ্রাইজ দিবে চন্দন ভাবি না। কিন্তু আমি তো কিছু কিনি নাই। কি দেয়া যায়? চন্দন বলল
– আমাকে কিছু দিতে হবে না। আমাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে চল বরং।
আমাদের শহরটা ছোট। সিনেমা হল একটা। অমিতাভ রেজার আয়নাবাজি চলছে। চন্দন এটাই দেখতে চেয়েছে। আমরা জীবনে প্রথম স্কুল পালালাম সেইদিন। সিনেমা মন ছুঁয়ে গেলো আমাদের।বের হতেই আমাদের জন্য এক আতঙ্ক অপেক্ষা করছিলো। অমিত এসেছে সিনেমা দেখতে। সাথে তার সাঙ্গোপাঙ্গ। ফাহিম, লিটন আর রূপক। অমিতের আমাদের দেখে দাঁত বের করে হাসছে। অমিত কাছে এসে বলল
– ভাল ছেলেরাও আজকাল স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখে।
আমার রাগে পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু কি বলবো! অমিত তার একদম ব্র্যান্ড নিউ মোবাইল ফোন দিয়ে আমাদের একটা ছবিও তুলে ফেললো। আমি বাধা দেয়ার আগেই ছবি তুলে ফেললো সে। আমরা দাঁড়ালাম না। কারণ অমিতের এ হেন ব্যবহার সহ্য হচ্ছিল না। আরও বেশিক্ষণ দাঁড়ালে হয়তো আমার সাথে অমিতের মারামারি ই হয়ে যাবে। ছবি তুলার ব্যাপারটা আমার পছন্দ হল না। কিন্তু ছবি দিয়ে কি বা করতে পারবে? সে তো নিজেই স্কুল পালিয়েছে। একটা সুন্দর দিনের পরিসমাপ্তি এমন বিশ্রী ভাবে হল।

ক্লাসে ঢুকলাম। সবাই কেমন মুখ টিপে হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কি হল এমন? হাসছেই বা কেনও? বোর্ডের দিকে তাকালাম। বোর্ডে লেখা
চন্দন + সেজান= গে
রাগে আমার ব্রক্ষতালু জ্বলে গেলো। আমি জোরে চিৎকার করে বললাম
– কে লিখেছে?
কেউ সারা শব্দ দিচ্ছে না। একদিকে তাকিয়ে দেখলাম চন্দন মাথা নিচু করে একদম পিছনে যেয়ে বসে আছে। আমি আবার চিৎকার করে বললাম
– সাহস থাকলে বল কে লিখেছে। কারো অজান্তে কিছু লেখা আর কাপুরুষতা একি কথা
এবার অমিত দাঁড়িয়ে বলল
– কাপুরুষ হল তুই। তলে তলে এসব করিস। আর কিছু লিখলে দোষ ?
– কি করি আমি?
– কেন মনে হয় ভাজা মাছ টাউ উলটে খেতে জানিস না? তুই আর চন্দন গে। তোরা সবার অলক্ষ্যে গে সেক্স করিস। সেদিন সিনেমা হলে তোদের দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। এখন তো শিউর।
মোবাইল থেকে ছবি প্রিন্ট করে সেই ছবি সবাইকে ইতিমধ্যে দেখিয়ে ফেলেছে অমিত। আমি রাগে অন্ধ হয়ে গেলাম। অমিতের শার্টের কলার ধরে তাকে মারতে উদ্ধত হলাম। পিছন থেকে কয়েকজন এসে আমাকে সরিয়ে নিল। আমি রাগে কাঁপছি। জোরে জোরে চিৎকার করে বললাম
– তুই যে এসব বলছিস তার কোন প্রমাণ আছে?
– প্রমাণ আছে বলেই বলছি। আমি অত আহাম্মক না যে প্রমাণ ছাড়া বলবো ?
আমি খুব অবাক হলাম। প্রমাণ কিভাবে পায়? আমরা তো একজন আরেকজন কে শুধু বন্ধু ভাবি। আর আমি নিজে তো সমকামী নই। তাহলে প্রমাণ কিভাবে আসে। নিশ্চয়ই মিথ্যে গলাবাজি করছে। আমি বললাম
– দে প্রমাণ দে।
– দিবো টিফিন টাইমে।
স্যার আসবে ক্লাস নিতে। আমি বোর্ড মুছে দিলাম। আমার কেন জানি চন্দনের পাশে বসতে অস্বস্তি লাগছে। গিয়ে বসলাম আন্দালিবের পাশে। পিছনে চন্দনের দিকে তাকালাম। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কারণ বেশ কিছু দিন হল আমি সবসময় তার পাশেই বসি।অথচ আজ বসলাম না। ক্লাস শেষ হয় না। টিফিন টাইম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমার অপেক্ষা করতে অসহ্য লাগছে। অবশেষে টিফিন টাইম আসলো
অমিত একটা লাল ডায়রি বের করলো। আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো
– চিনতে পারিস?
– না
– এইটা চন্দনের ডায়রি। আমি তার ব্যাগ থেকে চুরি করেছি।
– কিন্তু চন্দন তো ডায়রি লিখে না।
– লিখে লিখে। তুই জানিস না। দেখ হাতের লেখা মেলা
আমি খুব কাছে যেয়ে ভাল মত দেখলাম। আর সবাইও দেখলও হামলে পরে। আসলেই তো এটা চন্দনের লেখা। চন্দন খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে যেন কি করবে বুঝতে পারছে না। আমার খুব রাগ হচ্ছে। ডায়রি লিখে সে তো কক্ষনোই বলে নাই। যাই হোক ডায়রি তে কি লিখেছে জানতে হবে। অমিত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল
– তাহলে দেখা যাক সে কি লিখেছে।
তারপর অমিত জোরে জোরে রিডিং দিয়ে পড়তে লাগলো
– আমি সমকামী। আমার জীবনের অন্যতম অন্ধকার দিক গুলোর একটা এই সমকামিতা। কিন্তু আমি এই জীবন কে এখন আর অভিশাপ মনে করি না। কারন আমার জীবনে ভালবাসা এসেছে। আমার ভালবাসা হল সেজান।
সবাই হা হা করে উঠলো। আমার মুখ পাংশু হয়ে গেলো। তাহলে চন্দন আমাকে ভালবাসে? কিন্তু আমি তো চন্দন কে ওই দৃষ্টি তে দেখি না। কেন লিখেছে এসব চন্দন। অমিত পড়ে যাচ্ছে
– আজকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন। কারণ আজ সেজান আমাকে চুমো দিয়েছে। আমার জীবনের প্রথম চুমো
আমার মনে হল আমার কানে কেউ গড়ল ঢেলে দিয়েছে। আমি আর শুনতে চাই না।এত বড় ডাহা মিথ্যা কথা কেন লিখেছে চন্দন। এত দিনের বন্ধুত্বের এই প্রতিদান। আগে জানলে আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতাম না। আমি জোরে চিৎকার দিয়ে বললাম
– মিথ্যে কথা। আমি কক্ষনো এমন করি নাই।
অমিত হেসে দিয়ে বলল
– কিন্তু সেজান বাবু ডায়রিতে কেউ মিথ্যা কথা লিখে না।
হটাত করেই কি হল চন্দন ঝাঁপিয়ে পড়লো অমিতের উপর। কিল ঘুষি মারতে লাগলো। কিন্তু সুবিধা করতে পারলো না। তার আগেই অমিতের সাঙ্গোপাঙ্গ রা তাকে মারতে মারতে সরিয়ে নিলো। এই প্রথম চন্দনের উপর মারের কোন প্রতিবাদ করলাম না। চন্দন জোরে চিৎকার দিয়ে বলছে
– আমি এগুলো লিখি নাই। বিশ্বাস কর সবাই আমি এগুলো লিখি নাই।
আমি আর পরের ক্লাস গুলো করলাম না। বাড়ি চলে গেলাম অসুস্থতার কথা বলে।

বিকেলে চন্দন আসলো বাসায়। আমার ওর সাথে কথা বলার ইচ্ছা চলে গিয়েছে। সে এসে বলল
– দেখ সেজান আমি তোকে বন্ধু হিসেবে ভালবাসি সেটা বলতে চেয়েছি আমি ডাইরিতে।
– সে বুঝলাম। তাতে তেমন কিছু হত না। আমি সামলাতাম। কিন্তু চুমো র কথা কেন লিখলি? এত বড় মিথ্যা কথা কেন লিখলি?
– আমি লিখি নাই বিশ্বাস কর।
– তাহলে তোর ডাইরিতে কেমন করে আসলো ? তাও তোর হাতের লেখা?
– অন্য কেউ লিখেছে। আমার ডাইরি তো আজকে চুরি হয় নাই। বেশ কয়েক দিন হল
আমি কি বলবো বুঝতে পারছি না। অবশেষে বললাম
– দেখ এখন যা হয়েছে এখন আর কয়েকদিন আমাদের মেলামেশা করা উচিত হবে না। বার্ষিক পরীক্ষার আগে আমি আর তোর সাথে কথা বলবো না। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হোক । ততদিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। আশা করি।
চন্দন এর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। আমি তার একমাত্র বন্ধু এটা আমি জানি। কিন্তু যা ঘটেছে তাতে আসলেই কি তার সাথে আর বন্ধুত্ব রাখা যায়? ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখলে সবাই আমাকে আলাদা করে দিবে। আমার সাথে আর কেউ মিশবে না। চন্দন কি জানি বলতে গিয়েও আর বলল না। শুধু কয়েক ফোঁটা চোখের পানি পড়লো। চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। আমার খুব কষ্ট হতে লাগলো ও চলে যাওয়ার পর। ভাবলাম মানুষ যা খুশি বলুক। ওকে এভাবে কষ্ট পেতে দিবো না। কালকে ক্লাসে যেয়ে আবার কথা বলবো।

সকাল বেলা ক্লাসে যাচ্ছি। হটাত পিছন থেকে একজন গান গাইছে
– তু চিজ বারি হ্যয় মাস্ত মাস্ত…।
আমি পিছনে তাকিয়ে দেখলাম পাড়ার একজন বড় ভাই গাইছে আমাকে দেখে। ভাইয়া টা বেকার । সারাদিন টং দোকানে বসে চা খায়। কিন্তু তিনি এমন গান গাইছেন কেন আমাকে দেখে? আমি আবার তাকালাম। এবার তিনি চোখ টিপলেন। তার এই অদ্ভুত আচরণের কারণ বুঝলাম কিছুক্ষণ পরেই। স্কুলে ঢুকতেই সব জুনিয়র ছেলে গুলো আর সিনিয়র ভাইয়ারা আমাকে দেখে মুখ টিপে হাসছে। আমি যেন এক কমিক ক্যারেক্টার। বুঝলাম অমিত চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে এই ঘটনা। আমার কান্না আসছে। কি করবো বুঝতে পারছি না। আর চন্দনের সাথে মেলামেশা করা যাবে না। একদম আর কথা বলবো না চন্দনের সাথে।
সেদিন থেকে আবার চন্দনের উপর অত্যাচার শুরু হল। চুইংগাম লাগানো , পানি ছিটানো , টিফিন ফেলে দেয়া এসব। অমিত আর তার চ্যালারা এসব করতে শুরু করলো। আমাকে রাগানো তাদের মূল উদ্দেশ্য । কিন্তু আমি আর চন্দনের ব্যাপারে কোন রকম উচ্চবাচ্য করলাম না। আমি বিবেকহীন হয়ে গেলাম। চন্দন করুন চোখে আমার দিকে তাকালও। কিন্তু আমি তা উপেক্ষা করতে লাগলাম। একসময় চন্দন সব অত্যাচার মেনে নিলো। বুঝে গেলো আমি আর কক্ষনো তাকে সাহায্য করবো না। হয়তো এই কষ্ট তাকে তিলে তিলে মরতে লাগলো। আমি তা বুঝেও কোন পদক্ষেপ নিলাম না।অমানুষের হয়ে গেলাম আমি।

আমার টাইফয়েড হয়েছে। এক সপ্তাহ হল স্কুলে যাই না। বিছানায় শুয়ে আছি। চন্দনের ফোন আসছে। ২ মাস হল চন্দনের সাথে আমার কোন কথা হয় না। তাহলে চন্দন কেন ফোন দিল? ধরবো ? না থাক। মায়া বাড়বে। আমি ধরলাম না ফোন। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে মনে হতে লাগলো চন্দনের ফোন টা ধরা উচিৎ ছিল।
তার কিছুক্ষণ পরেই কলিংবেল বাজলো। বাসায় কেউ নেই। আমাকেই দরজা খুলতে হবে। খুলতেই দেখলাম আন্দালিব দাঁড়িয়ে আছে। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম
– কিরে আন্দালিব ? তুই এই সময়?
– কি হয়েছে শুনিস নাই?
– কি ?
– ইট দিয়ে চন্দন অমিতের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।
– কি বলিস! কেনও?
– চন্দন বাড়ি যাচ্ছিলো। তখন রাস্তায় অমিত আর তার চ্যালারা ঘিরে ধরে। সবার সামনে তাকে উত্যক্ত করা শুরু করে।প্যান্ট খুলে ফেলে। একদম তোর বাসার সামনেই। কিন্তু এক পর্যায় চন্দন কেঁদে দেয়। তাতেও তারা থামে নাই। তখন হাতের কাছে একটা ইট দিয়ে অমিতের মাথায় আঘাত করে চন্দন। অমিত এখন আইসিইউ তে। এখন তখন অবস্থা।
– চন্দনের কি হল?
– চন্দন বাসা তে। স্যার রা চন্দন আর অমিতের বাবা মায়ের সাথে মিটিঙে বসেছেন।
– কি হবে?
– জানি না রে।অমিত মারা গেলে চন্দনের জেলে যেতেও হতে পারে। তোকে এই খবর টা দিতেই আসা।
আন্দলিব চলে গেলো। আমি ছাদে বসে আছি। চন্দনের জন্য খুব খারাপ লাগছে। ওর এমন পরিণতি হবে কক্ষনো ভাবি নাই। চন্দনের সাথে একবার দেখা করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু কোন মুখ নিয়ে যাবো। ও নিশ্চয়ই আমাকে সাহায্যের জন্য ফোন করেছিল। আর আমি তো ফোন ধরি নাই।তীব্র কষ্টে আমার পরান পুড়তে লাগলো।
আমি ঠিক করলাম চন্দনের বাসায় যাবো। প্রচণ্ড জ্বর নিয়েই বের হলাম।চন্দনের বাসায় যেয়ে শুনলাম চন্দন বাসায় নেই।তাকে খালার বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।হতাশ লাগছে।কি মনে হল ভাবলাম অমিতের খবর নিয়ে যাই হাসপাতাল থেকে। হাসপাতালে যেয়ে শুনলাম অমিত কে আইসিইউ থেকে কেবিনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।এখন আর ভয় নেই।বিপদ কেটে গিয়েছে। কেবিনে যেয়ে দেখি অমিত একা শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। আমাকে দেখে অমিত হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
– তুই এসেছিস দোস্ত সেজান
– আমি কোন কালেই তোর দোস্ত ছিলাম না।সহপাঠী বলতে পারিস
– তুই এখনো রেগে আছিস দোস্ত । আমি জানি আমি পাপ করেছি।তাই তো মরতে বসছিলাম। আজকে তোর কাছেও কমা চাই।
– মানে?
– চন্দনের ডাইরিতে চুমোর কথাটা আমি লিখেছিলাম। ওর হাতেরলেখা নকল করে। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি যদি মরে যাই আমার কি হবে রে!
অমিত মৃত্যু ভয়ে এতই কাতর যে সব সত্য কথা বলে দিল। ঘৃণায় আমার বমি আসতে লাগলো। অমিতের মুখে থুথু মারতে ইচ্ছা করলো।নিজেকেও শাস্তি দিতে ইচ্ছা করছে। অমিতের কথা বিশ্বাস করে চন্দন কে এত কষ্ট দিয়েছি আমি।

চলে যায় বর্ষা কাল ।শরত আসে। শরতেও আকাশ মাঝে মাঝে কালো মেঘে ঢেকে যায়। সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রোমন্থন করি চন্দনের সাথে কাটানো দিনগুলোর কথা। চন্দন নেই। চলে গিয়েছে।জেলে যেতে হয় নাই কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে চন্দনের ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। চন্দন চলে যায় তার নানাবাড়ি। অনেক দূরে কোন এক গ্রামে।বৃষ্টি নামে মুশলধারে। আমার চোখেও বৃষ্টি নামে।চন্দন যাওয়ার আগে একবার বলে গেলো না আমাকে।দিয়ে গেলো না তার ঠিকানা।চন্দনের মোবাইল অফ থাকে। নতুন নম্বর নিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তা তো আমি জানি না।এরপর চন্দনের বাবা মা ও আমাদের মহল্লা থেকে কোথায় জানি চলে গেলেন। চন্দনের সাথে সকল যোগাযোগ ছিন্ন হল।
এখন আর কেউ ক্লাসে আমার সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করে না। কেউ ভাইয়ের মত জড়িয়ে ধরে না আমাকে। ক্লাস পালিয়ে সিনেমা দেখার বায়না করে না। তবুও আমি অপেক্ষা করি একটি ফোনের। নিশ্চয় একদিন কেউ ফোন দিবে আহ্লাদী গলায় বলবে
– চল সিনেমা দেখতে যাই ক্লাস ফাকি দিয়ে।
আমি সেই দিনের অপেক্ষায় রই।ভাল থাকিস আমার প্রিয় বন্ধু। যেখানেই থাকিস ভাল থাকিস।
চন্দনের মত অসংখ্য ছেলে রয়েছে যারা বাস্তব জীবনে কিছুটা মেয়েলি। তারা চাইলেও পরিবর্তিত হতে পারে না। কিন্তু তাদের কে স্কুলে এই আচরণের জন্য অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। সহ্য করতে হয় অনেক যন্ত্রণা। একবার ভেবে দেখুন তাদের জায়গায় নিজেকে। তাদেরও একটা সুন্দর কৈশোর, তারুণ্য পাওয়ার অধিকার আছে। স্বাভাবিক ভাবে বাঁচার অধিকার আছে। কারো চন্দনের মত পরিণতি হোক তা আমাদের কাম্য নয়। তাই তাদের কে উপেক্ষা না করে সাহায্য করা আমাদের মানসিকতা হওয়া উচিৎ। আর যারা শারীরিক বা মানসিক ভাবে চন্দনের মত ছেলে দের অত্যাচার করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিৎ।মনে রাখা উচিৎ কারো জন্য যা খেলা তা কারো কারো জন্য মৃত্যু সমতুল্য।
এই গল্পের সকল চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.