রিমান্ড

লেখকঃ সামীউল হাসান সামী


আমাকে হাত ও চোখ বাধা অবস্থায় এখানে এনে বসানো হয়েছে। চোখ বাধা থাকায় চারপাশটা দেখতেও পারছিনা। যখন আমাকে এখানে বসানো হলো তখন কয়েকজনের পায়ের শব্দ পেলেও এখন তাও পারছিনা।
বুঝতে পারছি এটি একটি ঘর। কারণ যাবার সময় ওরা দরজা বন্দ করেছে তার শব্দ আমি স্পষ্ট শুনেছি।
অনেকটা সময় কেটে গেলো, চারপাশে কোন শব্দও কানে পাচ্ছি না। হাতটা প্রচন্ড ব্যথাঃ করছে। চোখটাও ঘোলাটে হয়ে আসছে।

খটখট আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি এখন, তারমানে দরজা খুলছে।
আমার চোখটা খুলতেই সামনে প্রচন্ড আলোর ঝাপটা যেন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে চেয়ার থেকে।
একটু সময় লাগছে দেখতে।
ঝাপসা কাটতেই দেখছি, একজন গম্ভীর টাইপের লোক আমার সামনে বসেআছে ।
মাথার উপর একটি লাইট ঝুলছে। আমার সামনে টেবিল, তাতে একটি জগ ও গ্লাস রাখা।
বুঝতে পারলাম আমাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে।
কেউ কিছুই বলছে না। চুপচাপ সামনের লোকটি চেয়ারে বসে আছে। এবং পাশে আরো দুজন দাড়িয়ে আছে।
চেয়ার খালি তবু বসছে না। হয়তো ওদের বসার অনোমতি নেই।

-এটাকিন্তু দেখতে অস্বস্তিকর, আমি অপরাধী হয়ে বসেআছি আর ওনারা আইনের লোক হয়েও বসতে পারছেনা।
সকল নিরবতা ভেঙে বললাম,
আমি : আপনারা দাড়িয়ে কেনো বসুন! ( কিন্তু এরা কোন কথা বলছেনা) আমাকে একটু পানি দেয়া যাবে?

সামনে বসেথাকা অফিসার টাইপের লোকটা বললেন,
অফিসার : আপনার সামনে জগমগ রাখা আছে খেয়ে নিন।

আমি : হাতের বাধনটা তবে খুলে দিন।

অফিসারের ইসারায় আমার হাতের বাধন খুলে দেয়া হলো। আমি পানি খেয়ে চারপাশে তাকালাম। ঘরটিতে কোন জানালা নেই। কেন যে এসব রুমের জানালা রাখেন না আমিও বুঝিনা।

অফিসার : আপনি এদিক সেদিক তাকানো বন্ধ করুণ। আমার দিকে তাকান। এবং সকল প্রশ্নের উত্তর দিন। কিছুই লুকাবেননা। এতে আপনারি বিপদ বারবে।

আমি : অবশ্যই আমি সত্যি বলব। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন।
অফিসার : আপনার নাম.?
আমি : আমার নাম না জেনেই রিমান্ডে নিয়ে এসেছেন?
অফিসার : বেশি কথা বলবেন না। শুধুমাত্র যা প্রশ্ন করাহবে তারই উত্তর দিবেন। কারণ আমরা আপনার সাথে ভালো ব্যাবহার করছি। আপনিও আশাকরি আমাদের সহযোগিতা করবেন।
আপনার নাম?

আমি : আশফাক চৌধুরী।
অফিসার : আপনি পেশায় কী?
আমি : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র।
অফিসার : আপনি জানেন কেন আপনাকে এ্যারেস্ট করা হয়েছে?
আমি : হ্যাঁ জানি। কারণ আমি একজন সমপ্রেমী।
অফিসার : আপনি সমকামী কেন?
আমি : আপনি পুরুষ কেন?
অফিসার : পাল্টা প্রশ্ন করবেন না।
আমি : এ ছাড়া আমি আর কি বলতে পারি? আমাকে এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে।
অফিসার : আপনি বারবার সমপ্রেমী বলছেন, কিন্তু ফাইলে সমকামী লেখা আছে।
আমি : যে লিখেছেন সে ভুল করেছেন।
অফিসার : সমপ্রেমী কেন? সমকামী কেন নয়?
আমি : কারণ কামভাব নেই এমন প্রাণী পৃথিবীতে নেই বললেই চলে। হাতেগোনা কয়েকজন পাওয়া গেলেও তারা যৌন রুগী। আপনিও তো কামি। নারীর প্রতি আপনার কামভাব আছে। তাইকি আপনি নারীকামি ?
অফিসার : আপনি বেশি কথা বলছেন। আপনি জানেন আপনাকে কত ধারায় এ্যারেস্ট করা হয়েছে?
আমি : না। বলুন শুনি।
অফিসার : ৩৭৭ ধারা। যেখানে বিক্রিত যৌনাচার কে দন্ডনীয় অপরাধ বলা আছে।
আমি : আমার বাদীপক্ষ কে?
অফিসার : রাষ্ট্র নিজে আপনার বাদী।
আমি : রাষ্ট্র কী প্রমাণ করতে সক্ষম হবে আমি ৩৭৭ ধারায় আমি একজন আসামী ?
অফিসার : কেন পারবে না ?


আমি : কারণ আমার ক্ষেত্রে এই ৩৭৭ আইনটি প্রযোজ্য নয়।
অফিসার : কেন?
আমি : কারণ আমি বিক্রিত যৌনাচারের সাথে যুক্ত নই। আমি যা করি তা প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক।
অফিসার : এটা কিভাবে প্রাকৃতিক?
আমি : কারণ প্রকৃতির অন্যান্য প্রানীর মধ্যেও এমন যৌন আচরণ রয়েছে। এবং বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই ঘোষণা করেছেন। এবং বিজ্ঞান বিষয়টিকে সাভাবিক ভাবেই দেখেন।
অফিসার : কিন্তু আমাদের দেশের আইনতো এটাকে অপরাধ হিসেবে দেখেন।
আমি : আইনের কোন ব্যাখ্যায় সমপ্রেম কে বিকৃত যৌনাচার বলা হয়েছে এবং ৩৭৭ ধারাটি সমকামীতাকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে এমন কোন সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা সম্পর্কে আপনি জানেন?
অফিসার : না আমি জানিনা।
আমি : যারা সমপ্রেমীদের বিরুদ্ধে এ ধারাটি ব্যাবহার করতে চায় তারাও জানেনা। কারণ এই ধারার সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাক্ষ্যা নেই। এবং এটি স্বাধীন বাঙলার কোন আইন নয়। এটি ব্রিটিশদের কাছথেকে ধারকরা একটি আইন। যা ব্রিটিশরা অনেক আগেই ফেলে দিয়েছেন।
অফিসার : আপনি ধর্মে বিশ্বাস করেন.?
আমি : হ্যাঁ। আমি একজন ধার্মিক।
অফিসার : ধর্মতো এটাকে সমর্থন করেনা।
আমি : ধর্মের মূল মন্ত্রই তো ভালবাসা।
অফিসার : জানেন, ইসলামের ইতিহাসে এই কারনে একটি জাতিকেই ধংস করে দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আমি : আপনি কী ভালোকরে ঐ আয়াতগুলো পড়েছেন? ওখানে শুধুমাত্র এই কারনে ধংসের কথা বলা হয়নি। তারা সকল দিকদিয়েই স্রষ্টার অবাধ্য ও সীমালংঘনকারী ছিলো। তাই তাদের ধংস করে দেয়া হয়েছে।
অফিসার : আপনি কী মনে করেন সমকামী হিসেবে আপনার আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীরা আপনাকে মেনে নেবে?
আমি : আমার অনেক আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশীরা আমাকে ব্যবহার করেছেন যৌন চাহিদা মিটাতে। তারা যদি আমাকে এভাবে মেনে না নেয় তবে তারা বিকৃত যৌনাচারের দায়ে রাস্ট্র দায়ী করতে পারে।
অফিসার : আপনি নিজেকে সমপ্রেমী বলছেন আবার বিভিন্ন জনের সাথে যৌন সম্পর্ক করছেন বিষয়টি কেমন?
আমি : এটি করতে রাষ্ট্র আমাকে বাধ্য করেছে।
অফিসার : কিভাবে ?


আমি : আমার দেশের রাষ্ট্র আমাদের সীকৃতি দেয়না। ভুতের ভয়ের মতো আমদের ভয় দেখায় ৩৭৭ ধারার। কিন্তু শরীর বা প্রয়োজন কখনো আইন মানেনা। তাই শারীরিক চাহিদা মেটাতে আমাদের ভিন্ন পথ অবলম্বন করতে হয়। এবং এটা! করতে রাষ্ট্রই আমাদের বাধ্য করছে। রাষ্ট্র আমাদের অন্ধকারে ফেলে রেখেছেন। কিন্তু এটা রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব নয়।
অফিসার : তবে রাষ্ট্রের কী দ্বায়িত্ব?
আমি : আমাদের পাঠ্যপুস্তকে রয়েছে মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলোর মধ্যে যৌন চাহিদা অন্যতম। আর সেই যৌন চাহিদায় ভিন্নতা থাকতেই পারে। আর সেই ভিন্নতা সম্পর্কে সুষ্ঠু জ্ঞান দেশের নাগরিকদের সুনিশ্চিত করা। এবং সকলের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক ভিন্ন ভিন্ন যৌন চাহিদাকে সম্মান দেখানো।
অফিসার : এরজন্য তো আপনাদেরি এগিয়ে আসার কথা!
আমি : হ্যাঁ। এরজন্য চাই সচেতনতা ও জ্ঞান অর্জন। এবং অধিকার বোধ।
এভাবে নিরবে নিভৃতে আমরা আমাদের জীবনটাকে ধংস করে দিচ্ছি। যতদিন না এটা আমরা বুঝতে পারবো ততদিন কিছু হবেনা।
অফিসার : আপনার এই বিষয়টি যদি আপনার আসেপাশের মানুষ গুলো জেনেযায়.?
আমি :: যারা আমাকে ভালোবাসবার তারা এসব মেনে নিয়েই আমাকে ভালোবাসবে। আর যারা আমাকে ঘৃণা করবার ওরা যে। কোন বিষয়েই আমাকে ঘৃণা করার সুযোগ খুজবে।
আর সারাজীবন অভিনয় করার চাইতে কিছু লোকের ঘৃণা অনেক ভালো।
অন্তত আমি আমই হয়ে বাচার সুযোগ পাবো।
অফিসার : আপনার সাথে কথাবলে জীবনে এই প্রথম মনেই হলোনা আমি রিমান্ড রুমে বসে আসামির সাথে কথা বলছি।
আমি : আমি আসামি নই।
অফিসার : আমারও সেটাই মনে হচ্ছে।
আমি : আসামিতো তারা, যারা সত্যকে স্বিকার করেনা। সহজকে সহজ দেখেনা।
অফিসার : ( একটি কাগজ এগিয়ে দিয়ে) এতে স্বাক্ষর করুন।
আমি : কী লিখা আছে এতে?
অফিসার : আপনি আপনার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ স্বীকার করছেন এবং দোস স্বীকার করে আদালতের নিকট ক্ষমা চাচ্ছেন।
আমি : আমিতো আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কে স্বিকার করিনি। এবং এরজন্য আমি ক্ষমাও চাইবো না।
অফিসার : এ কাগজে স্বাক্ষর করলে আমি আপনাকে ক্ষমা করার সুপারিশ করবো। অন্যথায় আপনাকে কঠিন শাস্তি দিতে পারেন আদালত।
আমি : আমি সমপ্রেমী হতেপারি তবে দুর্বল নই। কারো করুনা পাবার বা নেবার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। আমি কঠিনের সাথে লড়তে জানি, কঠিনকে ভাঙতে জানি, এবং কঠিনকে পরাজিত করার মতো শক্তি আমি আমার মনে ও বাহুতে বইতে জানি।
অফিসার : তবে আপনি স্বাক্ষর করবেন না?
আমি : না।
অফিসার : তবে আপনাকে আদালতে লড়তে হবে।
আমি : আমি লড়তে জানি।

অফিসার চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেলেন কলম ও কাগজটি টেবিলে রেখে। পাশে দাড়িয়ে থাকা দুজন আবার আমার হাত ও চোখ বেধেঁ দিলো। এবং আমাকে নিয়ে চললো।

আমি অন্ধকারে হাটছি। আমার চারপাশটা আলো তবু আমি অন্ধকারে হাটছি।
তবে আমি জানি এ অন্ধকার কাটবে। এবং আমিও আলোতে হাঁটবো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.