সালিশ

লেখকঃ সামীউল হাসান সামী

সেদিন প্রচন্ড খরতাপ ছিলো প্রকৃতিতে। সূর্যের আলো মলিন হয়েছে সবে, পড়ন্ত বিকেল। অচিনপুর গ্রামে সেদিন এক সালিশ ডাকা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাঠ যেনো জনসমুদ্রে রুপ নিচ্ছে ধিরে ধিরে। সকলের চোখে মুখে যেনো চাপা আতঙ্ক। কি জানি! আজ সালিশ।

সালিশে কী হয়। সালিশে পরিষদের দুইজন মেম্বার জাফর আলী ও তরব আলী উপস্থিত রয়েছে। উপস্থিত রয়েছেন এলাকার মহিলা মেম্বার ফরিদা বেগম।

সালিশের মধ্যামনি পরিষদের চেয়ারম্যান জামিল চৌধুরী সকলের অপেক্ষার প্রহর শেষ করে সালিশে এসে উপস্থিত হলেন।

হঠাৎ হৈচৈ থেমে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। জামিল চৌধুরী উচ্চস্বরে কাশি দিলেন।

চারিপাশে গুল হয়ে জনগণ দাড়িয়ে আছে। মাঝের খালি যায়গাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে শহিদুলকে। শহিদুলের হাত দুটো পেছনে বাধা। পড়নে লুঙ্গি ও সাদা গেঞ্জি। শহিদুলকে কিছু মারপিট করা হয়েছে তা দেখলেই বুঝাযায়। শহিদুল কিছুই বলছে না, চুপচাপ মাটির দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ হঠাৎ উচ্চস্বরে চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে শহিদুলকে এই গ্রামের রমজান বেপারী।

রমজান বেপারীঃ ওরে মাইরা ফালাওনা কেন এহনও তোমরা? এই কুত্তার বাচ্চায় গ্রামডারে শ্যাষ কইরা দিবো।

চেয়ারম্যানঃ ঠান্ডা হও রমজান। হুনতে দাও, ঘটনা কী।

রমজানঃ এত্তো মাইনসের হমকে আপনে কেমনে এই কতা হুনবেন? খালি কন, ওরে পিটাইয়া মাইনসে মাইরা ফালাইক।

চেয়ারম্যানঃ হ! কইলেই অইলো? মনমতলবি কাম করন চলবো না। হগলেরে লইয়া বহন অইছে। ঘটনা যাই হোক হুইনা বুইজা হগলে মিলাই একটা স্বিদ্ধান্ত লওন লাগবো।
ঐ ছ্যাড়া ( শহিদুল) ক দেহি, তরে ওরা ক্যান ধইরা আনছে?

শহিদুলঃ ( মাথা তুলে বলতে লাগলো) আমারে জিগায় কী অইবো? আমার কতা কী কেউ হুনবো। ওগো জিগান।

চেয়ারম্যানঃ ঐ রমিজ ক দেহি ঘটনা কী? ও তো পুলাডা খারাপ না। কেন ওরে বাইন্ধা আনলি?

রমিজঃ চেয়ারম্যান সাব কী আর কমু। সরমের কতা বাইদ্ধ হইয়া কওন লাগে। রমিজ মিয়ার পুলা নয়নের লগে শহিদুল আকাম করছে।

চেয়ারম্যানঃ কয় কী! আমিতো উরা উরা হুনচি বিশ্বাস করি নাই। অহনত আর অবিশ্বাস করনের কিছু নাই। কই হেই নয়নে?

রমিজঃ খবিশটারে ঢাকায় পাঠাইছি। ওর খালার বাসায়। ওর কোন দোষ নাই। এই কুত্তার … ওরে খারাপ করছে।

চেয়ারম্যানঃ তুমি কইলেই তো আর অইলো না। বিচার বইলে হগলতে থাকলে ভালা অয়।

তরব মেম্বারঃ চেয়ারম্যান সাব কী আর করা। হগলেরই মানসম্মান আছে। এইগুলা বিষয় তারাতারি শেষ দেন।

শহিদুলঃ হ হ তারাতারি শেষ দেন। আমি তো একলা, তাই বিচার আমারি অইবো খালি। বিচার যদি করতে অয় তয় তো আমি কেউরে বাৎ দেহি না।

চেয়ারম্যানঃ চুপ বদমাশ! এগুলা এলাকায় কী শুরু করছস? তোরে তো মাইরা ফালান দরকার।

শহিদুলঃ তাইলে মারেন! লগে তো তাইলে আপনেরও মরন লাগে। ভুইলা গেছেন সব?

চেয়ারম্যানঃ বাইরা কুইত্তাডারে। মাইরা ফালা।

( সঙ্গে সঙ্গে হামলে পরল কিছু লোক শহিদুলে উপর। লাঠির আঘাত, লাথি, কিল, ঘুসি কিছুই যেনো কম হচ্ছে না। প্রাণ ফাটা আর্তনাদে মাটি যেনো কাপছে। সত্য যেনো ক্রমেই মলিন হচ্ছে। মানুষের হিংস্রতায় প্রভুও যেনো অসহায়।)

জাফর মেম্ববারঃ থামো থামো মিয়ারা পুলাডা মরব। থামো থামো।

( সকলেই থেমে গেলো, তবে শহিদুল থামতে পারছে না, তার গলাদিয়ে রক্ত যেনো বাঁধভাঙ্গা নদীর স্রোত। মাটিতে লেপটে আছে ছেলেটি। গায়ের গেঞ্জি লুঙ্গি লেপ্টে গেছে মাটিতে।)

চেয়ারম্যানঃ ইমাম সাব কিছু বলেন। এই পুলারে কি বিচার করমু।

ইমামঃ কি আর বলবো। সমাজের এমন অধপতন হইতে থাকলে আল্লাহ গজব নামবো। আমরা হগলে শেষ হইয়া যামু। নাওযুবিল্লাহ মিন জালে।
ধর্ম মতে দুর্রা মাইরা এমন বেবিচারিকে হত্যার হুকুম আছে।

শহিদুলঃ দুর্রা কী আমারে একলা মারবো? যেই বছর আপনের বউ পুয়াতি অইলো হেই বছর আপনেও তো কম বেবিচার করেন নাই।

ইমামঃ কি মিয়ারা! আল্লাহর হুকুম তামিল করো। আল্লাহর গজব থেইকা গেরাম বাঁচাও।

( ধর্ম ভিরু জনতার কয়েকজন আবার হামলে পরলো শহিদুলের উপর। যেভাবেই হোক শহিদুলকে মেরে ফেলো। গজবের হাত থেকে গ্রাম রক্ষা করো। শহিদুল হয়তো মরবে ওদের গ্রাম বাচাতে।)

( তবে ওরা বেচে থাকবে সকল অপকর্ম গুলোকে বাচাতে)

ইমামঃ থামো থামো এইবার। শয়তানডারে তওবা পড়াইতে দাও।
( ধিরে ধিরে শহিদুলের দিকে এগিয়ে গেল ইমাম। শহিদুল ততক্ষণে নিথর দেশের একজন পাপী। যে পাপী চোখ দুটিকে চারপাশে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটি মুখ খুজে ফিরছে, যে মুখ সে রাতে তার বিছানায় দেখেনি। হয়তো তেমন একটি মুখ না দেখতে পেয়ে ইমামের মুখের দিকে তাকালো)

ইমামঃ শয়তানডা মরেনাই। পড় তওবা পড়। আল্লাহর কাছে মাপ চা। পড় তওবা।

( একগাদা থুথু মুখে ছুড়ে মারলো ইমামের)

শহিদুলঃ থু! তোর তওবার কপালে ছ্যাপ মারি। তগো ধর্ম তগো তওবা। তগো সমাজ তগো বিচার। জিগা তগো আল্লারে আমি কেন এমন হইলাম। আমারে কেন এমন বানাইছে। তগো আল্লায় তগো মতো আমারেও বাচাইসে। আলো, বাতাস, পানি, মাটি দিছে। কই হে তো আমারে মারেনাই। জিগা তগো সমাজেরে আমার শইলডারে কেডা না হাতাইছে। জিগা জিগা। আমি একলা কিছু করছি? তোরা কিছু করছ নাই? ক! ক! কতা ক!

( হঠাৎ সজুরে লাথি এসে লাগলো শহিদুলের পেটে। লাথিটি ছিলো চেয়ারম্যানের। শহিদুল মুহুর্তে নিস্তব্ধ। কোন শব্দ হচ্ছে না। একটি গুংরানী সকল নিস্তব্ধতা ভাঙলো। সবাই নিশ্চিত হলো পৃথিবীতে এটাই শহিদুলের শেষ শব্দ।)

চেয়ারম্যানঃ যাও মিয়ারা বাড়ি যাও। তামশা শ্যাষ। যাও যাও।

( উৎসুক জনতা বাড়ির পথে চলতে থাকলো, নিচু গলায় অনেক কথাই তারা নিজেদের মধ্যে বলছিল, তবে সে কথাগুলো কানে পৌঁছাইনি কারো। কিছু সময় পর আকাশ কালো করে বৃষ্টির ছোয়া পেলো মাটি। প্রকৃতি যেনো তার সকল ভালোবাসা উজার করে দিচ্ছে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.