অব্যক্ত

লেখকঃ রাজিব হাসান

১।
আবির এক দৃষ্টিতে কাল অক্ষরগুলার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে জেন সে মহাশূন্যে আছে। লাইব্রেরিতে পিনপতন নিরবতা। অনেকক্ষন থেকেই সে পড়ার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকছেনা। সবকিছুই এলোমেলো লাগছে। তার কেবলই মনে পড়ছে গতরাতের ঘটনাটির কথা। ব্যাপারটা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটলেও সে নিয়াজের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলনা। লজ্জায় তার কান লাল হয়ে গেছিল।যদিও নিয়াজকে মোটেই চিন্তিত বা লজ্জিত মনে হচ্ছিলনা। জেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভান করে নিয়াজ চলে গেল তার রুম থেকে…
এপর্যন্ত লিখেই প্লাবন পৃষ্ঠাটা ছিড়ে ফেলে দিল। কিছুতেই মনের মত লেখা আসছেনা। সে প্রায়ই শুনেছে সবকিছুরই নাকি বন্ধাত্ত্ব থাকে। এটাকে বলে লেখকদের বন্ধাত্ত্ব। একটা সময় আর কিছুই লিখতে পারেনা। দিনের পর দিন ভাবনার দুয়ারে মাথা কুটেও কোন প্লট পাওয়া যায়না। পেজের পর পেজ নষ্ট হয় কিন্তু লেখা আসেনা। যদিও এখন অনেকেই আর কাগজে লিখেনা। সবাই লিখে ভার্চুয়াল পেজে। পেজ নষ্ট হয়না, একটা বাটন চেপেই সব মুছে ফেলা যায়।
খুক খুক করে কাশতে কাশতে প্লাবন বিছানায় শুয়ে পরল। হঠাৎ করেই কাশিটা বেড়ে গেছে। ধিরে ধিরে বোধয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসছে। কিন্তু তাকে একটা গল্প লিখতে হবে। প্রকাশক বার বারই তাগাদা দিচ্ছেন। অনেকদিন সময় দিয়েছেন কিন্তু অসুখটা এতো ভোগাচ্ছে যে জোর করেও ভাবনা চিনতা করতে পারছেনা। ওদিকে শাওন ভাইয়ের সাথেও একটু দেখা করা দরকার। শাওন ভাইকে বলতেই হবে কথাটা। তা না হলে উনি কখনোই জানতে পারবেন না যে প্লাবন তাকে প্রতি বেলায় পূজা করে। প্লাবন দ্বিধায় থাকে, ভাবে নিজেকে প্রকাশ করার পর উনি কি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। উনি কি খুব রেগে যাবেন! উনি কি আমাকে একটুও বুঝতে পারবেন না! না বুঝুক, তাও বলতে হবে। নিজের মনেই এসব ভাবতে ভাবতে প্লাবন চোখ বন্ধ করে। প্লাবনের ঘুম পাচ্ছে। খুব ঘুম। কিন্তু ঘুম পেলেও তার মাথায় দ্রিম দ্রিম করে একটা কথা বাজতেই থাকে। একটা গল্প লিখতে হবে, একটা গল্প।
২।
শাওন হচ্ছে প্লাবনের একাডেমিক সিনিয়র। একহারা গড়নের সুদর্শন এক পুরুষ। ঠিক প্রচলিত সুদর্শন বলতে যা বুঝায় তেমন নয়। কিন্তু কোথায় যেন একটা তীব্র আকর্ষন আছে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছে অনেকদিন হল। যতদিন তিনি ক্যাম্পাসে ছিলেন ততদিন তিনি শাওনের একটা নির্ভরতা ছিলেন। সামান্য মন খারাপ হলেও প্লাবন চলে যেত তার এই শাওন ভাইয়ের কাছে। আর শাওনও কখনো অবহেলা করেনি। সামান্য সব বিষয়েও দিয়েছে শান্তনা। চাকরিতে ঢোকার পরেও বেশ যোগাযোগ ছিল প্লাবনের সাথে। তারপর একসময় সবার মত ব্যস্ততা তাকেও ঘিরে ধরল। বেশ অনেকদিন কথা হয়না। একদিন দেখা করবার কথা ছিল কিন্তু সময়ই হয়ে উঠছেনা। শাওন বেশ ব্যস্ত ইদানিং। কিন্তু প্লাবন অপেক্ষায় ছিল কবে ব্যস্ততা কাটবে শাওন ভাইয়ের। ফেসবুকে সেদিনও শাওনকে দেখা গেল কোন একটা মেয়ের সাথে কোন এক রেস্টুরেন্টে। প্লাবন একটু অবাক হল এই ভেবে যে এতো ব্যস্ত শাওন ভাই কারও সাথে রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিচ্ছে অথচ তার সাথে একবার কথা বলারও সময় নেই তার। প্লাবন যতবারই ফোন দিয়েছে শাওন ফোন কেটে দিয়েছে, কল রিসিভ করলেও ব্যস্ত আছি বলে ফোন কেটে দিয়েছে। প্লাবনের বেশ অভিমান হয়। আসলে শাওন ক্যাম্পাস ছেড়েছে সে অনেকদিন। বন্ধু-বান্ধবদের সাথেই সবসময় কথা হয়না। নিজের ক্যারিয়ার লাইফকে সুগঠিত করবার চেষ্টা করছে। তাই আসলে প্লাবনকে সে খুব একটা গুরুত্বই দেয়নি। এটাই স্বাভাবিক ছিল। প্লাবন হয়তো সেখানেই থেমে যেত কিন্তু সে থামতে পারেনি কারন তার মনে হয়েছে তার এতো প্রিয় শাওন ভাইকে তার মনের কথাটা অবশ্যই জানানো উচিৎ। সে আবার ফোন দেয় শাওনকে , কিন্তু শাওন কেটে দেয়। প্লাবন মেসেজ পাঠায় যেন ফ্রি হলেই তাকে একটি কল দেয়া হয়। উত্তর আসে, ওকে। কিন্তু সে কল আর আসেনা। শাওন অপেক্ষা করতেই থাকে। এদিকে তার মনে গল্পটা শেষ করার খচখচ করতে থাকে। সময় কম, বেশ কম। গল্পটা যেভাবেই হোক শেষ করতে হবে। সে টেবিলে গিয়ে বসে। সামনে রাখা কাগজ কলম টেনে নেয়। লিখতে শুরু করে। কি লিখবে সে বুঝতে পারেনা। গল্পটা এক জায়গায় আটকে আছে। সাদা ধবধবে কাগছে কাল হরফের কিছু নীল শব্দ ধিরে ধিরে ফুটে উঠতে থাকে।
৩।
হুট করেই প্লাবনের শরীর বেশ দুর্বল লাগছিল। সারাদিন ক্লাশ-টিউশনি করে ওর শরীর আর চলতে চায়না। ক্লান্ত দিনের শেষে শরীর বিছানায় এলিয়ে দিলেই সে আর কিছু মনে করতে পারেনা। একঘুমে রাত পার। রাতের খাওয়া বা সকালের খাওয়ার কোন ঠিকঠিকানা ছিলনা। কিন্তু টিউশনি না করেও কোন উপায় নাই। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছে। মাকে দেখেনা সে অনেকদিন। এক মামার কাছে বড় হয়েছে প্লাবন। সে মামাও খুব একটা স্বচ্ছল নয়। একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন সামান্য আয় দিয়ে পুরা সংসার চালাতেন। খুব সহজাতভাবেই মামী তাকে উটকো ঝামেলাই মনে করতেন। বেশ কষ্ট করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দোরগোড়ায় এসেছে প্লাবন। কলেজ জীবন থেকেই টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতে হত। অনার্সে ভর্তির পর থেকে মামার কাছ থেকে কোন টাকাই নেয়নি সে। কিন্তু মামা দুইদিন পর পরই ফোন দিতেন। ছুটিতে বাড়িতে গেলে মামা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। বলতেন, “বাবা, তোর কেউ নেই এই দুনিয়ায়। তুই মরে গেলেও তোর জন্য কান্নার কেউ নেই। নিজের দেখভাল নিজেই করবি। তোকে অনেক বড় হতে হবে।“ বাড়ি থেকে আসার সময় মামা ওকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিইয়ে যেতেন। তারপর সবার অগোচরে ওর বুক পকেটে পাঁচশত টাকার একটা নোট গুজে দিতেন আর বলতেন আমিতো তোকে কিছু দিতে পারিনারে মামা। এই টাকা দিয়ে কিছু কিনে খাইস। মামার জন্য প্লাবনের খুব কষ্ট হত। বেচারা মামা খুব লজ্জিত হতেন ওকে কিছু দিতে না পারার জন্য।
রাতের দিকে প্লাবন শাওনকে আবার ফোন দেয়। শাওন ফোন কেটে দেয়। প্লাবন ফোনটা রেখে দিয়ে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বসে। গল্পটা শেষ করার জন্য। মাথার ভেতরে কেমন খালি খালি লাগে। তবুও লিখতে হবে। গল্পটা তার শেষ করা চাই।
৪।
বেশকিছুদিন থেকেই প্লাবনের জ্বর ছিল। গভীর রাতে প্রচন্ড ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে ঘুম ভেঙে যায়। প্রথম দিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। ঘুমিয়ে পড়ার জন্য জ্বরটা ও বুঝতেই পারতোনা। ব্যাপারটা খেয়াল করল গোসল করতে গিয়ে। শরীরে কেমন জানি নীলচে ছোপ ছোপ দাগ পরে গেছে। প্রথমদিকে খুব একটা ব্যাথা ছিলনা। পরে ব্যাথাও আসতে শুরু করে। সময় করে সেদিন ডাক্তারের কাছে গেল। বেশ অনেকগুলো টেস্ট দিলেন ডাক্তার।
গভীর রাতে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম জড়ানো কন্ঠে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেল মামা মারা গেছেন। শুনে জেন মাথায় আকাশ ভেঙে পরল। বৃদ্ধ –লজ্জিত মামার মুখটা ভেসে উঠল ওর মনে। বুকটার ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। সত্যি বলতে হারানোর ভয়ের চেয়েও একাকিত্বের ভয় ওকে এক নিমিষে গ্রাস করে নিল। ঐ এক মামা ছাড়া ওর আর কেউ ছিলনা। মামার কথাটা কানে খুব বাজতে লাগল। তুই মরলে কান্নার জন্যও কেউ থাকবেনা। সে রাতেই এক কাপড়ে প্লাবন বেড়িয়ে পরল বাড়ির পথে। সকাল সকাল বাড়ি গিয়ে পৌছাল। দুপুরে জানাজা শেষে মামাকে কবর দেয়ার পর সে বাড়িতে ওর নিজেকে খুব অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হচ্ছিল। প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছিল। ঘুম থেকে যখন উঠল তখন গভীর রাত সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ও উঠনের বেঞ্ছিতে শুয়ে পরেছিল। এখনো সেখানেই পরে আছে। কোনরকমে কল পাড়ে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিল। পেটের উপরে আর বুকের নিচের দিকে একটা চিনচিনে ব্যাথা যেন সমস্ত শরীরময় ছড়িয়ে পরল। ভোরবেলা ও ঢাকায় চলে আসে। মামার লাশ দেখেও ও একটুও কাদেনি, কবর দেয়ার পরও ওর কান্না পায়নি। ঢাকায় ফেরার পর ওর গলার কাছটায় কেমন দলা পাকিয়ে গেল। ছুটিতে কেউ আর ফোন করে ওকে বাড়ি যেতে বলবেনা। গতবার বাড়ি থেকে আসার পথে মামা যে পাঁচশত টাকার নোটটা বুকপকেটে গূজে দিয়েছিলো নোটটা হাতে নিয়ে প্লাবন হাউমাউ করে কাঁদল। কান্নাটা ছিল একাকিত্বের।
৫।
ডাক্তার সাহেব ভ্রু কুচকে রিপোর্টগুলা দেখছিলেন। ওর দিকে তাকিয়ে বললেন,
– তোমার সাথে কেউ আসেনি?
-না স্যার। আপনি আমাকেই বলতে পারেন।
ডাক্তার ওর চোখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন। জানতে চাইলেন,
-কি করো তুমি?
-অ্যাপ্লাইড ক্যামিস্ট্রিতে ফাইনাল ইয়া্র এ পড়ছি।
-বাড়ি কোথায়?
-শেরপুর।
-বাড়ীতে কে কে আছেন?
-কেউ নেই স্যার। এক মামা ছিল।কয়েকদিন আগে সেও মারা গেছে।
-দেখ, কোন শান্তনার বানী তোমাকে দেবনা। তোমার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। শেষ অবস্থায় আছ।
প্লাবনের কান ঝা ঝা করে উঠল। অনেকটা হতাশা নিয়ে সে জানতে চাইল,
-আনুমানিক আর কতদিন সময় আছে?
-এক মাস!
প্লাবনের ধারনার চেয়েও কম সময়। প্লাবন বুঝতে পারছিলনা কি করবে, কোথায় যাবে, কাকে বলবে। কাউকে বললেই কি লাভ হবে! সবাই ওর দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকাবে। ওর চোখভর্তি পানি। মোবাইলটা হাতে নিয়ে সেই সেদিন থেকেই ও শাওনকে ফোন দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শাওন সময় করতে পারছেনা। প্লাবনের মনে হয়েছিল অন্তত শাওন ভাইকে তার মনের কথাটা বলে যায়। ওর হাতেতো আর বেশি সময় নেই। একটা অনলাইন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় লিখত প্লাবন। একটা ছোট গল্প ওদের দেয়ার কথা। সেটা এখনো দেয়া হয়নি। তাছাড়া ওর টিউশনিগুলা কারও কাছে বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে তা না হলে ওর স্টুডেন্টরা বছরের এই মাঝামাঝি সময়ে বিপদে পরে যাবে। এ অল্প সময়ে ওর কাজ বলতে এটুকুই আছে।
৬।
প্রায় প্রতিরাতে ওর নিয়ম করে জ্বর আসছে। ইদানিং শরীর থেকে একটা পচা গন্ধ আসে। ও অনুভব করতে পারে। এর কারন সম্ভবত নিয়মিত গোসল করা হচ্ছেনা। খাওয়া দাওয়ার পরিমান অনেক কমে গেছে। বেশি খেতে পারেনা। ক্লাশে যাওয়া ও বন্ধ করে দিয়েছে। সহপাঠী আর রুমমেটরা বলে বাড়ি চলে যেতে। কিন্তু কোন বাড়ি যাবে ও! ওর তো কোন বাড়ি নেই। কাউকেই বলেনি ও। ওর ব্যাপারে কেউ জানেনা তেমন। ক্যাম্পাসে অনেক পরিচিত মুখ ও। কিন্তু ও যে এতোটাই অভাগা তা কেউ ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। টিউশনি গুলা ও কয়েক জুনিওরকে বুঝিয়ে দিয়েছে। আছে কেবল গল্পটা । সেটাও শেষ করে ফেলা যাবে। বাকি থাকে কেবল শাওন ভাই। প্লাবন ভাবে, শাওন ভাই যদি সময় করতে নাও পারে এবার ও সরাসরি তার অফিসে চলে যাবে।
৭।
হুট করেই ভোজবাজির মত উদয় হয় ইভার। ইভা প্লাবনের এক ক্লাশমেট। প্লাবন বেশ কিছুদিন ক্লাশে না যাওয়ায় সে হলে এসে হাজির হয়েছে। প্লাবনকে দেখে ইভার চক্ষুচরখগাছ অবস্থা। বিস্ফোরিত চোখে সে প্লাবনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-এ কি অবস্থা তোর দোস্ত? কি হইছে?
-ব্লাড ক্যানসার।
-যাহ, ফাইজালামি করিসনা।
-আমার চেহারা দেইখা কি মনে হচ্ছে?
-মনে হইতেছে তোর চিকনগুনিয়া হইছে।
মৃদু হাসল প্লাবন। জানতে চাইল,
-তুই কি চাস ক?
-তোর কোন খবর নাই অনেকদিন তাই খোজ নিতে আইলাম। শুনলাম তুই হলেই আছস।
-হুম
-অসুখ নিয়া পইরা আছস ক্যান? বাড়ি যা।
-বাড়ি নাই।
-তোর মা কই থাকে?
-কিশোরগঞ্জ।
-সেইখানে যা।
-শুনছি কিশোরগঞ্জ থাকে। কিন্তু যোগাযোগ নাই।
-কস কি? ক্যান?
-ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের অন্য জায়গায় বিয়ে হইছে। সেই থেকেই কোন যোগাযোগ নাই। এক মামার কাছে বড় হইছি। দুইদিন আগে সেও মারা গেছে।
ইভা কথাগুলা শুনে থ হয়ে যায় অনেকক্ষন কিছু বলতে পারছিলনা। কি বলবে? এতদিন একসাথে পড়াশুনা করছে কিন্তু একে অপরের ব্যাপারে তারা কেউই কিছু জানেনা। ইভার প্লাবনের প্রতি দুর্বলতা ছিল। এখন মায়া, প্রেম আর স্নেহে ভেসে যাচ্ছিল ইভা। হয়তো একটু করুনাও মেশানো ছিল। হয়তো। আচমকাই ইভা জানতে চায়,
-আমাকে বিয়ে করবি প্লাবন?
প্লাবন ইভার চোখের দিকে চেয়ে চুপ করে থাকে। এমন আচমকা প্রস্তাবে ওর কি বলা উচিৎ ও ঠিক ভেবে পাচ্ছেনা। কিন্তু ইভা চোখ সরায়না। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে প্লাবনের দিকে তাকিয়ে থাকে। এবার প্লাবন চোখ সরিয়ে নেয়। নিরবতা ভেঙে ও বলে,
-আমি গে।
-কবের থেকে?
-ছোটবেলা থেকেই।
-বয়ফ্রেন্ড আছে?
-না
-তাহলে সমস্যা কি? আমাকে বিয়ে কর।
-আমাকে বিয়ে করলে দশ দিনের মাথায় বিধবা হবি।
-হলাম না হয়। তোর বিধবা হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিলাম।
-তাতে আমি কি খুব শান্তি পাব? তুই আমাকেই এমনিতেই মনে রাখিস। আমাকে ভেবে মাঝে মাঝে প্রদিপ জ্বালিস। তাহলেই হবে।
ইভার খুব কষ্ট হয়। এ কষ্ট প্লাবনের চেয়ে বেশিনা। যে মানুষটার বলবার মত কোন আপনজন নাই। ইভা বলে,
-চল, হাজির বিরিয়ানি খেয়ে আসি। মরার আগে ভালমন্দ খেয়ে মর।
-যেতে পারি তবে খুব বেশি খেতে পারিনা।
কথাটা বলার সময় দুজনেই হেসে ফেলে। কষ্ট গুলা কোথায় যেন উবে যায়। আসার পথে প্লাবন বলে সবাইকে বলে বলে আমাকে করুণার পাত্র বানাইসনা। ইভা মৃদু হেসে চলে আসে। এ জেন মৃত্যু বিদায় নয়। নতুন কোন মিলনের আনন্দ।
৮।
সেদিন সন্ধ্যায় প্লাবন আবার শাওনকে ফোন দেয়। অবশেষে শাওন ফোন ধরে কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলে,
-কি ব্যাপার প্লাবন? কি বলবা? বল।
-ভাইয়া, আমাকে একটু সময় দেন। আমার কিছু কথা আছে।
– কি কথা? বল।
-ভাইয়া, আমি সরাসরি বলতে চাই।
-আসলে আমি খুব ব্যস্ত প্লাবন। আমার দেখা করবার সময় নাই।
– ভাইয়া, আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে কোন এক সময় কি একটুও সময় হবেনা?
-কেন? তুমি কোথাও যাচ্ছ নাকি?
-দেখা হলে বলব ভাইয়া।
-আচ্ছা দেখি। আমি তোমাকে জানাব।
– আচ্ছা। একটু তাড়াতাড়ি কইরেন।
-ঠিকাছে।
আজ প্লাবনের খুব ভাল লাগছে। একজন ভাল বন্ধু আচমকাই পেয়ে গেছে প্লাবন। অনেকদিনপর হলেও শাওনের সাথে তার কথা হয়েছে। আজ আশা করা যায় গল্পটাও শেষ হবে। আজ বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে।
৯।
প্রায় একমাস পরে ইভা ছাদে এসেছে। আজ ভরা পূর্নিমা। আজ সারা রাত ইভা ছাদেই কাটাবে। ছাদের ফ্লোরে একটা শতরঞ্জিতে সে শুয়ে আছে। চাঁদ থেকে আলো চুইয়ে পরছে। ইভার মনে হচ্ছে এই চাদের আলো তার শরীরে শোষিত হচ্ছে। ছাদে হাসনাহেনার মৌ মৌ সুবাস। প্লাবনের হাস্নাহেনা খুব পছন্দের ফুল ছিল। প্লাবনকে তার ঘরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। তার মৃত্যুর পরেই সবাই জানতে পেরেছিল তার ক্যান্সার ছিল। ইভা যে জানত সে কথাও ইভা কোনদিন বলেনি। ভরা চাদের দিকে তাকিয়ে প্লাবনের হাসি মুখটার কথাই মনে পরে ইভার। এই একটা চরিত্র চিরগোপন থাকবে ইভার কাছে। অনাদর আর অবহেলায় ঝরে পরা একটি নয়নতারা।
শাওন প্লাবনকে পরেরদিন ফোন দিয়েছিল দেখা করবার জন্য। ফোন ধরেছিল প্লাবনের এক রুমমেট। শাওন জানতে পারে সেদিন দুপুরে প্লাবনকে তার রুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শাওন একটু ধাক্কা খায়। তার মাথায় বন বন করতে থাকে প্লাবন তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু কি বলতে চেয়েছিল! প্লাবনের সাথে শেষ যেদিন কথা হয় সেদিন ওকে খুব আনন্দিত লাগছিল। তার হাসিটা এখনো শাওনের কানে বাজে। কিছু একটা বলতে চেয়েছিল প্লাবন অনেকদিন থেকে। কিন্তু শাওন গুরুত্ব দেয়নি। খুব অপরাধী মনে হয় শাওনের নিজেকে। আরও অনেক পরে শাওন জানতে পারে প্লাবনের ব্লাড ক্যানসার ছিল। অপরাধবোধ শাওনকে এমনভাবে আকড়ে ধরে যে প্রায়ই শাওন মধ্যরাতে মোবাইল হাতড়ায়। তার মনে হয় এই বুঝি প্লাবন এর ফোন এলো বা কোন এসএমএস। কিন্তু কখনোই আর জানা সম্ভব হবেনা প্লাবন কি বলতে চেয়েছিল।
গল্পটা প্লাবন শেষ করেছিল। গল্পটা অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশও হয়েছিল।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.