অষ্টমীর রাত্রি

লেখকঃ সন্নিহিত রেনেসাঁস

১.
বিছানায় ঢাকের কাঠিটা পড়ে আছে। আরেকটা কাঠি থাকার কথা। ঢাক বাজাতে দুটো কাঠি লাগে।
‘একটা আছে, আরেকটা কোথায়?’
বিষয়টা তুচ্ছ। আশেপাশে আছে কোথাও হয়তো। তবু তুচ্ছ বিষয়টা নিয়েই ভাবছি খুব। অথচ আমার ভাবার আরো কিছু আছে। গভীর। শুভ ঘুমাচ্ছিল পাশে। কোথায় গেলো?

২.
বেশ আগেই সকাল হয়েছে। ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভারী গলায় অঞ্জলীর মন্ত্রপপাঠ হচ্ছে-
‘ সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে
শিবে সর্বার্থ সাধিকে
শরন্যে ত্র্যম্বকে গৌরী
নারায়ণী নমোস্তুতে।’
আগামীকাল দশমী। বিসর্জন। পূজো শেষ। ছুটি শেষ। পরশু শুভ চলে যাবে। সেও যেন কোনো দেবতা, এসেছিল দুর্গার সাথে। তার সাথেই হবে বিদায়ী। বাতাসে বিসর্জনের আগমনী সুর, আমার হৃদয়ে বিদায়ী বাজনা।
পূজোর গান বাজছে। সাথে একটানা ঢাকের শব্দ। সবকিছু ছাপিয়ে ওই ঢাকের শব্দটাই কানে আসছে-
‘টাক ঢুমা ডুম, টাক ঢুমা ডুম, টাক ঢুম ঢুম।’ মনে হল, যেন শুভই ঢাকের কাঠিতে সুর তুলেছে। ও ই যেন চোখ বুজে একমনে বাজিয়ে যাচ্ছে।
৩. অষ্টমীর রাত। মন্ডপে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম ওকে। অপরিচিত মুখ। কচি কলাপাতা রঙের পাঞ্জাবী, ঘিয়া রঙা ধুতি পরনে। এক মাথা ঘন কালো চুল। কপালে সিঁদুর ফোঁটা দেয়া। মন্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে একটানা। অন্য ঢাকীটা বয়সী। ছেলেটার দ্রুত তালের সাথে সে ঠিক তাল মেলাতে পারছেনা। বার দুয়েক তাল কেটে গেছে। ছেলেটার কপালে মুক্তাসম ঘামের বিন্দু। চোখ বুজে সে বাজাচ্ছে। মনে হলো, তার ভেতরে দৈব শক্তি ভর করেছে। সে যেন তার ওই বাজনাকেই উৎসর্গ করে দিচ্ছিল পূজোয়। ওটাই যেন তার আরাধনা। কোথাও একটা অপার্থিব কিছু ছিলো। আমার গায়ে কাঁটা দিলো।
তখনি চোখ খুললো ও। আমাদের সেই প্রথম চোখাচোখি হল! ওকেই দেখছিলাম কিনা, একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ওরা থামলো। পূজারী আবার মন্ত্রপাঠ শুরু করেছে। ওর চোখ থেকে চোখ সরাতে পারছিনা ভাবলাম- ‘হিপনোটিক ক্ষমতা আছে নাকি ছেলেটার?’
আরো ভাবলাম, ও কি বুঝে ফেলেছে আমাকে? তাকে দেখার পর আমার ভেতরেও যে ঢাকের বাড়ি পড়েছে তাকি সে টের পেয়ে গেছে?
ঘোর কাটাতেই মন্ডপ থেকে বেরিয়ে এলাম। তৃষ্ণা পেয়েছে। পানি কিনলাম। সিগারেট ধরালাম। তখনি পাশে এসে দাঁড়ালো ছেলেটা। আমার গায়ে আবার কাঁটা দিলো।
পাশে এসে খুব পরিচিতের মত করে বললো-
‘ যা গরম পড়ছে! এর মইধ্যে বেশিক্ষণ থাকা যায় নাকি? বাজাতে গিয়া তেষ্টা পেয়ে গেলো। একটু জল খাওয়াবেন? ‘
‘ অবশ্যই।’
বোতল দিলাম। ঢক্ করে পুরো বোতল খালি করে দিলো! বুঝলাম সত্যিই তৃষ্ণা পেয়েছিল। জানতে চাইলাম, ‘ আপনি কি এ এলাকার ছেলে?’
‘ নাহ্। আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। মাঝির ঘাটে আমার নানা বাড়ি। বেশ ক’বছর বাদে আম্মা এসেছে। ছুটিতে আমিও চলে এলাম!’
ও রাস্তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলো। দেখলাম। ও নিশ্চয় সহজিয়া জাতের মানুষ। কেমন সহজেই আলাপ শুরু করে দিলো! আমাদের এখানের মানুষগুলো অপরিচিত লোকজনকে হিসেবের খাতায়ই রাখে না। সবাই খুব আত্মকেন্দ্রিক এখানে। তৈরি হওয়া নিজস্ব জগতের বাইরে এরা মিশতে জানেনা বা চায় না। অথচ কোথাকার কে, তাকালাম দেখে এসে আলাপ শুরু করে দিলো! পরক্ষণেই মনে হল, ছেলেটা বেড়াতে এসেছে। হঠাৎ যে ক্ষীণ আশাটুকু নিজের অজান্তেই মনের খুব গহীনে জ্বলে উঠেছিলো, আশার সেই ক্ষীণ আলো নিভে গেল নিমিষে। এই বিদেশি রাজপুত্র অতিথি পাখি হয়ে এসেছে এখানে। সময়মত সে উড়ে যাবে নিজ ঠিকানায়। এর প্রতি ক্ষণজন্মা মোহে মোহাবিষ্ট হওয়াটাও ভুল। তাছাড়া জীবনপথে কত মানুষকে দেখেই বুক মোচড় দিয়ে ওঠে, কত মানুষের দিকে তাকালে হৃদয়ে সুখের মত ব্যথা হতে শুরু করে, তাদের কি পাওয়া হয়? হয়না। বুঝালাম মনকে। এও তেমনি এক চমক দোলা দেয়া কেউ! চমক ভাঙল। বললো-
‘আপনি?’
‘আমিও নই। আমি পতেঙ্গা থেকে এসেছি পূজো দেখতে।’
‘নাম?’
‘নিশুক।’
‘মুসলমান?’
‘হু।’
অবাক হলো। ভাবেনি হয়ত মুসলিম কেউ এভাবে মন্ডপে দাঁড়িয়ে পূজো দেখতে আসতে পারে। কিন্তু আমি যাই। প্রতি দূর্গা পূজাতেই বেশ কিছু বড় মন্ডপে যাই। পূজো দেখি, মানুষ দেখি। আর দেখি আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর উৎসব। দেখলে তো আর জাত যায় না!
জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাম?’
‘শুভ। আপিন একাই এলেন?’
‘হু। আমি প্রতিবার এখানে আসি। এদের আয়োজনটা জমকালো হয়।’
মুচকি হাসলো। ওর হাসিটাও ওর মত স্নিগ্ধ! বিধাতা যাকে দেয়, তাকে বোধহয় উজার করেই দেয়। শুভকেও দিয়েছেন। আমি ক্রমেই নেশাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু ও চুম্বকের মত টানছিলো আমাকে। শুভর শরীর থেকে মিষ্টি একটা মৃদু গন্ধ আসছে। সেটিও আমাকে টানলো।
রাত প্রায় ১২টা। আমার ফেরার সময়। তখন ও বলল-
‘ চলুন নিশুক, হেঁটে আসি। ওদিকটা তেমন ঘোরা হয়নি।’
শুভর প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার মত সচেতনতা তখন ছিলো আমার। কাছেই কর্ণফুলী। ওকে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম সেদিকে।

৪.
নদীর পাড়টা নির্জন। কাছে-দূরে নোঙর ফেলা মালবাহী ছোট জাহাজ। টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে কিছু নৌকা তখনো নদীর বুকে ভেসে যাচ্ছে। শরতের শীতল বাতাস। বাতাসে মৃদু অচেনা গন্ধ। দূরে বন্দরের হলুদ আলো আকাশটা ঘিরে রেখেছে। সেই আলোর কিছুটা এসে পড়েছে ওর মুখে। আবছায়ায় শুভকে পবিত্র কোনো অলৌকিকের মত লাগছে। ও কথা বলছে। আমি ঘোর লাগা চোখে দেখছি ওকে। কথার কিছু শুনছি, কিছুটা আচ্ছন্নতায় হারিয়ে ফেলছি। ও যেন দূর থেকে হাত নেড়ে নেড়ে আমাকে হাজারো না বলা কথা বলে যাচ্ছে।
ভাবছি। এত সহজে কেউ কারো সাথে সহজ হতে পারে? এত দ্রুত কি কেউ পারে কারো মনে ঝড় তৈরি করতে? আমার প্রতিটি রক্ত কণিকায় সেই পুলক জাগানো ঝড়। অজানা সম্ভাবনার খবর পেয়ে যেন তারা এলোমেলো ছুটছে শরীরজুড়ে! জাহাজের শব্দে ঘোর কেটে গেলো। বললাম –
‘ শুভ, তোমার ছোটবেলার কথা বলো? ইন্ডিয়ায় তোমার কেমন কাটে?’
ও গম্ভীর হয়ে গেল। আলোআঁধারিতে দেখলাম ওর মুখে চাপা কষ্টের ছাপ। হয়ত বিষাক্ত অতীত লুকানো আছে তার প্রাণোচ্ছল মায়মুখের অগোচরে। শুভ সরাসরি আমার চোখে তাকালো। দীর্ঘশ্বাস চাপা গলায় বললো, ছোটবেলার প্রসঙ্গটা বাদ দিতে চায়!
‘দিলাম বাদ। চলো হাঁটি।’
তারপর আমরা হাঁটলাম। নদীর তীরে হেঁটে হেঁটে জানলাম পরস্পরকে। বুঝলাম ওই স্বল্প সময়ে সেও আমার সঙ্গ উপভোগ করছে।
এই ভালোলাগা ভালো না। এইসব ক্ষণিকের মোহ গভীর হতে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু মন প্রবোধ মানেনা। সময়ের সাথে শুভকে কেন জানিনা নিজের কেউ বলে ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। যা হবার নয় তাই ভাবছি।
রাত ২টা। ফিরতে চাইলাম। সেও না করেনি। মনে হল, শুভ কি শুধু সময়টুকুই পার করলো? ও কি আমাকে আমার মত করে একটুও চায়নি? তাহলে এত আপন করে মিশতে গেলো কেনো?
আমি নীল হয়ে গেলাম।

৫.
ফিরতি পথে হাঁটছি দুজন। খুব পাশাপাশি। শুভর গায়ের মিষ্টি গন্ধটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছিলো। পাশাপাশি থেকেও মনে হল আমরা দুজন জীবনপথের আলাদা পথিক। এক আকাশের নীচে থেকেও আমরা খুব দূরে থাকি!
সেটাই ছিল সত্য। করুণ বাস্তবতা।
শুভর হাতটা ধরতে খুব ইচ্ছে হলো। পারছিলাম না। কোথাও একটা অদৃশ্য বাধা কাজ করছিলো। তখনি টের পেলাম ওর হাত আমার হাত স্পর্শ করছে। আমার আঙুলের ফাঁকে ওর আঙুল! নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেলো আমার। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেই অচেনা গলির আধো আলো আধো ছায়ায় ওর মুখোমুখি হলাম। আচমকা টানে কাছে টেনে শুভর ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালাম।
বোধহয় এক সেকেন্ডের কম সময়েই সম্বিত ফিরলো। দেখলাম শুভ কাঁপছে। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। চোখ ভরে উঠছে জলে। ওর জল ভরা চোখের সেই দৃষ্টিতে আমি মরে গেলাম। চোখ জোড়া যেনো বলছিলো-
‘কেন? আমি চাইনি এমনটা। তুমি সব শেষ করে দিলে নিশুক!’
লজ্জা, অনুশোচনায় কুঁকড়ে গেলাম। হয়ত শুভ আর পাঁচটা সাধারণ পুরুষের মতই। হয়ত সাধারণের চেয়ে একটু ভালো। তাই হয়ত সাধারণ ভালোলাগা থেকেই মিশেছিলো আমার সাথে। বন্ধুর মত!
কিন্তু আমি এ কি করলাম? অযাচিত প্রাপ্তিটুকুও কি তবে শেষ করে দিলাম? সমূহ আশঙ্কায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম মুখোমুখি। মনে হচ্ছিল সময়টা থেমে গেছে। তারপর একসময় ও বললো, ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
আমরা ফিরলাম। বাকি রাস্তায় একটাও কথা বলেনি ও। আমিও হয়ত ভাষা খুঁজে পাইনি কোনো। তারপর ঢাকের শব্দ কানে এল। মন্ডপের আলোকসজ্জা চোখে পড়লো। চলে যেতে হবে। কিন্তু শুভকে ছেড়ে, সরি না বলে যেতে ইচ্ছে করছিলো না। অপরাধী হয়ে বিদায় নিয়ে আমি যেতে পারতাম না। তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বললো-
‘ রাতটা আমার সাথে থেকে যেও। এত রাতে গাড়ি পেতে কষ্ট হবে।’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.