নীড়ে ফেরা

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি


বসে আছি বাটলারস চকলেট ক্যাফে তে। আমার সাথে জন। চকলেট মিল্কশেক খাচ্ছি আর জনের কথা চোখ বড় বড় করে শুনছি। আমাদের বিয়ের পরিকল্পনা করছে সে। পুরো বিশ্ববাসী কে চমকে দেয়ার পরিকল্পনা। জন বাঙালি ছেলে কিন্তু থাকে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া তে যেয়ে আমরা ২জন প্রথম বাঙালি জুটি হিসেবে বিয়ে করবো। এতে পুরো বিশ্ব নড়ে চড়ে বসবে। ২ জন বাঙালি মুসলমান গে ম্যারেজ করেছে। আর জন এটাই চায়। ১ মাস আগেও আমি এভাবে ভাবি নাই। আমিও তো সমকামী দের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে পারি। এই ব্যাপারটাই গত কয়েকদিনে জন আমাকে বুঝিয়েছে।
একটা পিচ্চি ঢুকলও ক্যাফে তে । ১২-১৩ বছর বয়স। বিলুর কথা মনে পড়ে গেলো।বিলু আমার ছোট ভাই। ক্লাস সেভেনে পড়ে। ঈশ বিলু কে যদি এখানে নিয়ে আসতে পারতাম। বিলুটা চকলেট কত না পছন্দ করে।চকলেট খেতে খেতে দাঁত এ পর্যন্ত ক্যারেজ হয়ে গিয়েছে। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। মফস্বলে থাকি। এখানে আসার সামর্থ্য কক্ষনোই ছিল না। জনের সাথে পরিচয় হওয়ার পর ঢাকা আসলাম। দামি দামি রেস্টুরেন্ট ,শপিং মলে ঢুকা শুরু হল তারপর থেকেই।
– কি ভাবছও ?কোন কথাই তো বলছও না। আমার কথা কি শুনছো ?
জন অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করছে। আমি তো হারিয়ে গিয়েছিলাম অন্যখানে।
– কই শুনছি তো
– বাড়ির কথা মনে পড়ছে?
– আরে নাহ। ওখানে আমি তো আর কক্ষনোই ফিরে যাবো না। সুতরাং ভেবে কি হবে?
– সব কিছু কি আর লাভ ক্ষতির কথা ভেবে হয়?মানুষের মনে ভাবনা এমনি চলে আসে।
– আরে নাহ। ভাবছি না।
– ওকে চল বের হই।
গাড়ি তে উঠলাম। ড্রাইভিং সিটে বসলো জন। আমরা যাবো গুলশানের মান্যবর। পাঞ্জাবি কিনবো বিয়ের জন্য। বিয়ের সমস্ত শপিং ঢাকা থেকেই করে নিয়ে যাবো । জন অস্ট্রেলিয়ার একটি মানবাধিকার সংস্থায় চাকুরী করে। তখন থেকেই তার ইচ্ছা ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করবে। জনের বাবা মা ডিভোর্সড । ২ জনেই আবার বিয়ে করেছে। কেউ জনের সাথে থাকে না। জন খুব একা। তার সাথে আমার পরিচয় ২ মাস আগে ফেসবুকে।

আমি তখন চরম হতাশাগ্রস্ত। বিএসসি শেষ করেছি।চাকুরী খুজছিলাম।ভালই ছিলাম। কিন্তু হটাত বাবা আমার বিয়ে ঠিক করলেন। কিন্তু আমি তো সমকামী। কিভাবে বিয়ে করবো?এতে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।কিন্তু বাবার মুখের উপর কথা বলতে আমি পারি না। সাহস নেই। ছোট বেলা থেকে বাবা এমন ভাবেই শাসন করেছেন।কক্ষনো পরীক্ষা খারাপ হলেই বকা আর মাঝে মাঝে মারধোর। বড় হয়েও বাবা একদম ছেড়ে দেন নাই। ইউনিভার্সটি তে যাই কিনা, রেজাল্ট কেমন হচ্ছে তার সব খেয়াল তিনি রাখতেন। এখন আমি গ্রাজুয়েশন করে ফেলেছি।কয়েকদিন পর চাকুরী করবো। এদিকে বাবারও বয়স হয়েছে। অথচ সম্পর্কটা একই রকম রয়ে গিয়েছে। মা কক্ষনো বাবার শাসনে বাধা দেন নাই। উল্টা তিনিও বকাবকি করেছেন। অবশ্য মারধর করতে গেলে মা থামাতেন। আমি জানি বিয়ের ব্যাপারে মা বাবা কেই সমর্থন করবেন।
দিন যাচ্ছে। মেয়ের ছবি দেখানো হয়ে গিয়েছে । পছন্দ হয়েছে কিনা সেই সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে গিয়েছে। আমি বলেছি আমার কোন পছন্দ অপছন্দ নেই। একবার মিনমিন করে বললামও
– বিয়েটা আর ১ বছর পর করলে হত না? চাকুরীটা একটু গুছিয়ে নেই।
অমনি বাবা ধমকে উঠলেন।
– আমিও এই বয়সেই বিয়ে করেছি। এরপরে বিয়ে করলে বাচ্চা পালতে পারবি? বয়স বাড়ছে সে খেয়াল আছে?
আমি আর কি বলবো। চুপ করে রইলাম। আমার একটা ফেক ফেসবুক আইডি আছে। আর সেখানে মানে সেই আইডি তে কিছু সমকামী বন্ধু আছে। তাদের কাছে বিষয়টা শেয়ার করলাম। তাদের পরামর্শ হয় পালিয়ে যা। নয়তো বাসায় বলে দে অথবা বিয়ে করে ফেল। কিন্তু তিনটা পরামর্শের একটাও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না। কি করবো!জীবনের এই টালমাটাল সময়ে পরিচয় হল জনের সাথে।
জন অনেক স্মার্ট বুদ্ধিমান হ্যান্ডসাম একটা ছেলে। সেই আমাকে শিখালো নিজের অধিকার আদায়। প্রথমে আমার কাছে মনে হয়েছিল পাগলের প্রলাপ বকছে ছেলেটা। এ কি করা সম্ভব! জন আমাকে পরামর্শ দিল যে বাবা কে বলে দিতে যে আমি সমকামী। এ কি বলা যায়? কিন্তু এই কথা ক্রমাগত সে বলতে লাগলো আর নানা উদাহরণ দেখালও। বিপ্লবের কথা বলল। সে বলল
– কেউ আমাদের অধিকার আদায় করে দিবে না। আমাদের অধিকার আমাদেরই আদায় করতে হবে আর তা শুরু করতে হবে ঘর থেকে। বুঝাতে হবে সমকামিতা একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার । আমাদের কোন হাত নেই এতে।প্রথমে ঘরের মানুষ। পরে আসে সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব।হয়তো এমন এক সময় আসবে যখন দেশেও সমকামী বিবাহ বৈধ হবে।
আমি জনের কথায় উৎসাহিত হতে লাগলাম। ঠিক করলাম বাসায় বলবো বিয়ে করবো না। এই বিয়ে কোনভাবেই করা সম্ভব না। সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমে মা কে বলবো। বিয়ে করবো না, এই কথা মা কে বলতেই ঘটলো অদ্ভুত ঘটনা। তিনি কি ভাবলেন কে জানে। চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন
– আমার কপালে এই ছিল। ফাটা কপাল আমার
– কি হয়েছে মা
এই বলে মায়ের হাত টা ধরলাম । মা ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিয়ে বললেন
– আমাকে ধরবি না।
তারপর ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। সন্ধ্যায় বাবা ডাকলেন।বুঝলাম মা সব বলেছেন। আমি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। আজ বিদ্রোহ করবো। বাবা চা খাচ্ছেন। আমি বাবার সামনে রাখা টুলে বসলাম। তিনি বললেন
– তুই নাকি বিয়ে করবি না?
– জি
– কেন জানতে পারি।
– এমনি করবো না।
– এমনি মানে? লেখা পড়া শিখিয়ে বড় করেছি এই জন্য?
– আমি জানতাম তুমি লেখাপড়া শেখানোর খোটা দিবে। চাকুরী করে সব শোধ করে দিবো। তাও বিয়ে করবো না।
– এতো মহা বেয়াদব হয়ে গিয়েছে। চাবকে পিঠের চামড়া তুলে ফেলা উচিৎ
আমি উঠে পরলাম টুল থেকে। এখন আর কথা বলে লাভ নেই । এখন যাই বলবো বাবা তাতেই গালিগালাজ করবে। দেখলাম পর্দার আড়াল থেকে অবাক হয়ে দেখছে আমার ছোট বোন রুমা আর ছোট ভাই বিলু। ভাবছে আমার এত সাহস কিভাবে হল।আমি আমার ঘরে যেয়ে শুয়ে পরলাম। বাইরের ঘর থেকে বাবার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। চিৎকার দিয়ে মা কে ডাকছে। আমার নামে নালিশ করবে মায়ের কাছে।বলছে
– তোমার ছেলে সন্ন্যাসী হবে। বিয়ে করবে না।সে বিয়ে করবে না তো ওর বাপ বিয়ে করবে।
আমি ফেসবুক ঢুকলাম। এখন একমাত্র ফেসবুকে ঢুকলেই শান্তি পাই। ঢুকেই জন কে খুঁজি। সে ঢাকা এসেছে। বাঙালি ছেলে দেখে বিয়ে করবে। তার বিয়ে, এক সাথে সংসার করার কথা গুলো শোনার পর থেকেই আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি। কিন্তু জন কি আমাকে পছন্দ করবে? খুব সাধারণ চেহারা আমার। জন কে বললাম সব কিছু। জন আবারও একি কথাই বলল সব বাবা মা কে বলে দিতে।
রাতে খাবার টেবিলে আবার এক দফা বাবার চিৎকার। কেন আমি বিয়ে করবো না হেন তেন। মা তো কিছু বলে না। শুধু পারে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে। বিলু আর রুমা তাদের নিজের ঘরে যাওয়ার পর বাবা , মা কে বলবো আমার সমকামের কথা। আজকেই এস্পার অস্পার হয়ে যাবে। বাবা নামাজ শেষ করে বসার ঘরে এসে বসলেন। মা আগেই বসা ছিল। আমি দুরু দুরু বুক নিয়ে তাদের সামনে গেলাম। আমি বললাম
– বাবা মা তোমাদের দুইজনের সাথেই আমার কিছু কথা ছিল।
বাবা বললেন
– বল
– আমি যে বিয়ে করতে চাই না তার একটা কারণ আছে
– কি কারণ
– বাবা আমি সমকামী
– কি বললি
– আমি সমকামী
বাব মা দুইজনেই অদ্ভুত দৃষ্টি তে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আর চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। ঝড় আসার আগে যেমন সব নীরব হয় ঠিক তেমন। বাবা এবার একদম স্বাভাবিক ভাবে বললেন
– তোকে আমি আর এই বাড়ি তে দেখতে চাই না।এখন নিজে রোজগার কর।পাশ তো করেছিস। আমার আর দায়িত্ব নেই। আমার বাড়ি থেকে এখুনি চলে যাবি তুই
মা কেমন ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন
– এত রাতে ও কই যাবে? কি থেকে কি বলেছে?
বাবা ধমকে উঠে বললেন
– তুমি চুপ কর
বাবা অনেক সময় অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু কক্ষনো বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে নাই। বাবার কথা গুলো একদম আমার বুকে আঘাত করলো।আমি কাপড় গুছিয়ে সেই রাতেই বাবা মায়ের সামনে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলাম। পিছন থেকে মা দাঁড়াতে বললেন অনেকবার। কিন্তু আমারও কেমন জিদ চেপে গিয়েছে। শুনবো না আমি তাদের কথা। আমি তো গে নিজের ইচ্ছায় হই নাই। কিভাবে হয়েছি তাতো আমি নিজেই জানি না। আর সেই সমস্যার কথা আমার সবচেয়ে আপন মানুষের কাছে বললাম। বাবা মায়ের কাছে। যারা নাকি নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবাসে। তারাই সহ্য করতে পারলো না। তখন আমার এই সমাজের কাছে আর চাওয়া পাওয়া নেই। আমি আমার নিজের মত করে বাঁচবো।
রাতটা বেস্ট ফ্রেন্ড বিপুলের বাসায় কাটালাম। তাকে যদিও কিছু বললাম না। সেই রাত্রে জনের সাথে অনেকক্ষণ কথা হল। অনেক ভরসার কথা শোনালো সে। অনেক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখালও।আমি মোটামুটি মুগ্ধ। পরদিন সকালেই ঢাকা চলে গেলাম জনের কাছে। যতদিন পর্যন্ত থাকা খাওয়ার একটা ব্যবস্থা না হয় ততদিন জনের সাথেই থাকবো। আমার রেজাল্ট ভাল। আমি আশাবাদী অল্প কিছুদিনের মাঝেই একটা চাকুরী যোগার করতে পারবো। সেদিন ছিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মাঝেই দেখা হল জনের সাথে।ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের ক্রিমসন কাপে দেখা করলাম জনের সাথে। বাইরে ঝুম ঝুম বৃষ্টি আর আমাদের হাতে গরম কফির মগ। প্রথম দেখাতেই জন কে আমার অসম্ভব ভাল লেগে গেলো। আর জনেরও যে আমাকে ভাল লেগেছে তা বুঝলাম। সেদিন বৃষ্টির মাঝেই সারাদিন ঘুরলাম। জন গাড়ি চালালও আর আমি তার পাশে বসলাম। একটা রোমান্টিক মিউজিক ছেড়ে চলে গেলাম ঢাকার বাইরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সন্ধ্যায় একটা চাইনিজে ডিনার করে গেলাম জনের বাসায়। কি সুন্দর টিপটপ করে গুছানো বাড়ি।জন অল্প কিছু দিনের জন্য বাংলাদেশে থাকার উদ্দেশ্যে এসেছে। তাও বাড়ি টা কম গুছানো নয়।যা যা দরকার সব আছে। জনের নাকি হোটেলে থাকতে ভাল লাগে না। তাই ফ্ল্যাট টা কিনে নিয়েছে। জন কে অনেক গুছানো স্বভাবের ছেলে মনে হল আমার। রাতে একই বিছানায় ঘুমলাম আমরা। বিশাল মাস্টার বেড । কিন্তু কেউই আমরা সীমা অতিক্রম করলাম না।
সকালে উঠেই দেখলাম নাস্তা রেডি। জন সব রেডি করে টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। আমার যতই সময় যাচ্ছে ততই তার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। জন কিচেনে। আমি কিচেনে গিয়ে জন কে বললাম
– তুমি একা নাস্তা রেডি করতে গেলে কেন? আমাকে বলতে আমিও হেল্প করতাম।
– আরে তুমি তো ঘুমচ্ছিলে
– ডাকলেই হত
– তা কি ঠিক হত? আমি তো জানি না তুমি কয়টা পর্যন্ত ঘুমাও। আমি চাই না যে তুমি আমার সাথে থাকতে এসে ফিল কর যে তুমি তোমার বাসায় এর থেকে ভাল থাকতে
বাসার কথা উঠতেই মায়ের মুখটা ভেসে আসলো। টেবিল ভরতি এত খাবার থাকে না বাসায় কিন্তু মায়ের হাতের রুটি , আলুর দম অমৃত। মাথা থেকে বাসার চিন্তা দূর করার চেষ্টা করতে লাগলাম। হাসি মুখে জনের জোকস শুনতে শুনতে নাস্তা করলাম। তারপর আসলো সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। জন আমাকে প্রপোজ করলো রাতে ডিনারে। আমি তৎক্ষণাৎ বোকা হয়ে গেলাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না। আমি কি জন কে ভালবাসি? জনের মত ছেলে কে না ভালবেসে পারা যায়?আমার উত্তর হল হ্যাঁ। ঠিক হল আমি জনের সাথে অস্ট্রেলিয়া যাবো। সেখানেই আমাদের বিয়ে হবে। তাক লাগিয়ে দিবো পুরো বিশ্ববাসী কে। বিয়ে হবে আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে। আমরা পাঞ্জাবি আর পাগড়ি পরে বিয়ে করবো। দাওয়াত করা হবে প্রায় ১০০ মানুষ কে।আমি ঠিক করেছি অস্ট্রেলিয়া গিয়ে আমি আগে মাস্টার্স শেষ করবো তারপর জব। এই জন্য আইইএলটিএস এ ভাল স্কোর করতে হবে। আমি বই কিনে পড়া শুরু করে দিলাম।

মান্যবর এ জন এর পাঞ্জাবি পছন্দ হল না। গেলাম ভাসাবি আর জারা তে। অবশেষে জারা তে পাঞ্জাবি পছন্দ হল জনের।অফ হোয়াইট আর মেরুনের কম্বিনেশন। আমার জন্য ও সেম পাঞ্জাবি কেনা হল।
কেনা কাটা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি পরছে। বাসার কথা মনে পরতে লাগলো। এমন সময় বাড়িতে সবাই কি করছে। বাবা নিশ্চয়ই জায়নামাজে। মাগরিবের নামাজ পড়ছেন। মা রান্না ঘরে। খিচুরি রান্না করার কথা। বৃষ্টি পরলেই মা খিচুরি , বেগুন ভাজি আর ডিমের ঝোল রান্না করেন। আমাদের তিন ভাই বোনের কাছে অসম্ভব প্রিয়। আমি তো খেতে বসলে ২ টার কম ডিম খেতাম না।তিন ভাই বোনের বৃষ্টি তে ভেজা চাই ই চাই। বাবা যাতে না জানতে পারে এভাবে পা টিপে টিপে ছাদে যেয়ে ভেজা হত। এখন নিশ্চয়ই বিলু আর রুমা ছাদে ভিজছে। বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন পড়াশোনা বাদ দিয়ে মোমবাতির আলোয় মা আর আমরা তিন ভাই বোন গল্প করতাম। অনেক সময় বাবা যোগ দিতেন। তখন বাবার এক অন্যরকম রূপ দেখতাম। আমাদের প্রতি ভালবাসার প্রকাশ তখন খুব স্পষ্ট হত। বাবা যতই বাইরে কঠিন হোক ভিতর টা যে নরম। কিন্তু এইবার কি হল? আমার বাসায় কক্ষনোই আমার আর যাওয়া হবে না। হয়তো মা , বাবা , রুমা আর বিলুর সাথে আর দেখাই হবে না। আমাকে নিশ্চয়ই তারা ঘৃণা করবে। ঘৃণা করলে করুক। এই সমাজ ছেড়ে চলে যাওয়াই আমার উচিৎ।সারাজীবন নিজের আইডেন্টিটি লুকিয়ে থাকতে পারবো না। এর থেকে অস্ট্রেলিয়া যেয়ে নিজের আইডেন্টিটি নিয়ে বাঁচবো । নিজেকে এইভাবে লুকিয়ে রাখতে হবে না।
আজ রাত টা আমার খুব স্মরণীয় হল। কারণ আমাদের মাঝে ভালবাসা হল রাতে। আমরা দুইজন গভীর ভালবাসায় একে অপর কে আলিঙ্গন করলাম। অসংখ্য চুমোর জোয়ারে ভেসে গেলাম আমরা।একজন আরেক জন আরও গভীর ভাবে চিনলাম, আবিষ্কার করলাম।বাইরে কিন্তু তখনো বৃষ্টি পরছিল।

আজ জুতা কিনবো। যমুনা ফিউচার পার্কে এসেছি। গিয়ে ঢুকলাম হাশপাপিজে। কত সুন্দর সুন্দর জুতা। কিন্তু দাম অসম্ভব। এত দামি জুতা কক্ষনোই কিনি নাই আমি। জুতা দেখতে দেখতে আমার বাবার জুতার কথা মনে পড়লো। একই জুতা বাবা কত বার মেরামত করে পরতেন। অথচ আমার তো তিন জোড়া জুতো ছিল। আমাদের তিন ভাই বোনের আবদার পূরণ করতে যেয়ে বাবা নিজেই জুতা কিনতেন না। একবার একটা জুতা কিনলেন অনেক বছর পর। কিন্তু জুতা একটু টাইট হয়ে গেল। জুতা পরতে খুলতে কি কষ্ট। সেই জুতা পরেই তিনি কাটিয়ে দিলেন আরও একটা বছর। মায়ের কথাই কম কি বলি। মায়ের তো কোন ভাল জুতা নেই।বাইরে পরার একটাই জুতা আছে তাও সেলাই করা। এইবার চাকুরী পেয়ে বেতনের টাকা দিয়ে বাবা মা কে জুতা কিনে দিবো ভেবেছিলাম।কিন্তু তার আগেই বিপ্লব করতে ঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। আমার কেন জানি জুতা কেনার ইচ্ছাই চলে গেলো। আমি জন কে বললাম
– আজকে ভাল লাগছে না জুতা কিনতে। চল অন্য কোথাও যাই।
– আচ্ছা তোমার ভাল না লাগলে আরেকদিন জুতা কিনবো
গাড়ি তে বসে ম্যাগাজিনের পাতা উলটচ্ছি। ম্যাগাজিনে আজকের তারিখ দেখে মনে পড়ে গেল আজকে তো শুক্রবার। রুমা কে পাত্রপক্ষের দেখতে আসার কথা।রুমা দেখতে সুন্দর। রুমা কে দেখে পছন্দ হবে তাদের সেটা আমি নিশ্চিত। এই সম্বন্ধ নিয়ে বাবা খুব আগ্রহী।ফ্যামিলি খুব ভাল। ছেলেটাও। সব ঠিকঠাক থাকলে আমার আর রুমার বিয়ে একসাথে দিতেন।কিন্তু তা আর হল না। আচ্ছা আমি যে বিয়ে করে সারা বিশ্ববাসী কে জানাবো সেটা তো বাংলাদেশীরাও জানবে। মানে আমাদের প্রতিবেশী , বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন রা। এটা কি রুমার বিয়ের উপর প্রভাব ফেলবে? আমার গলা শুকিয়ে আসলো। নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলবে। হয়তো বিয়ে ভেঙ্গে যাবে। অথবা ডিভোর্স। আর তা নাহলেও শ্বশুরবাড়িতে যে কথা শুনতে হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আর বাবা মায়ের নিশ্চয়ই অনেক কথা শুনতে হবে। বাবা হয়তো মসজিদে যাওয়াই বন্ধ করে দিবেন লোকের কথা শুনার ভয়ে। মা হয়তো আত্মীয় স্বজন আর প্রতিবেশী দের সাথে আর মিশবেই না। আর বিলু স্কুলে তার বন্ধুদের দ্বারা অপমানিত হবে। তার ভাই গে এটা তো স্কুলের ছেলেদের কাছে একটা মজার বিষয় হবে। আমি এগুলো ভাবি নাই কেন আগে। নিজের উপর নিজের রাগ লাগছে। নিজের সুখের কথাই শুধু চিন্তা করেছি। কিন্তু বাবা মা ভাই বোনের কথা একবারও ভাবিও নাই। নাহ যা হবার হয়েছে। কিন্তু আর কিছু ঘটতে দেয়া যাবে না। জন কে আজকেই বলতে হবে। এইভাবে বিশ্ববাসী কে জানিয়ে বিয়ে করা যাবে না।

সব কথা খুলে বললাম জন কে। জন কেমন জানি ঝিম মেরে বসে আছে কথা গুলো শোনার পর। আমি ব্যাল্কনি তে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনছি। একটু পরে জন এসে বসলো আমার পাশে।
– তোমার সব কথা শুনলাম। কিন্তু আমার পক্ষে এটা মানা সম্ভব নয়। এটা আমার সারা জীবনের স্বপ্ন। তাছাড়া আমি চাই আমার বফ শুধু আমার কথা ভাববে। পরিবার , ভাই বোনের কথা নয়।এটা খুব স্বার্থপরের মত চিন্তা। কিন্তু আমি তাই চাই। তাই তুমি যখন সব ছেড়ে চলে এলে আমি তোমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পরেছি।
– আমি এখনো পরিবারের সবার থেকে দূরে আছি।তাদের কাছে হয়তো আর কোন দিন যাওয়া হবে না।কিন্তু তারা আমাকে লালন পালন করে বড় করেছে। তাদের সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে আমি চলে এসেছি। কিন্তু তাই বলে তাদের ক্ষতি আমি করতে পারবো না। আমি যেমন সুখে থাকতে চাই তেমনি তারা সুখে থাকুক সেটা আমি চাই।
– তুমি তাহলে কি বলতে চাও?
– আমরা বিয়ে করবো কিন্তু সেটা সবাইকে জানিয়ে নয়।আমার প্রতিবেশী , বন্ধু, আত্মীয় রা যাতে না জানে সেই ভাবে বিয়ে করবো।
– এটা সম্ভব নয়। আমার এত দিনের স্বপ্ন আমি ভেঙ্গে ফেলতে পারবো না।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম
– তুমি আসলে আমাকে ভালবাসো না। ভালবাসলে আমার কষ্টটা বুঝতে। তোমার এই হাস্যকর বিয়ে বিয়ে খেলায় আমি নেই।আমার পরিবার কে আমি আর কষ্ট দিতে পারবো না।
– ওকে তোমার যা ইচ্ছা। আমাকে এখন একা থাকতে দাও।প্লিজ
আমার খুব রাগ লাগছে। জনের কাছে আমার চেয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাই প্রধান? এভাবে বিয়ে না করলে কি হয়? আমার ব্যাপারটা সে একবারও বুঝতে চাইছে না। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। প্রচণ্ড রেগে চিৎকার করে বললাম
– আসলে ব্যাপার টা কি জানো বিয়ে করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য তোমার। তাতে তুমি ফেমাস হবে। তোমার অফিসে তোমার প্রমোশন হবে। আমাকে ভালবাসা টা গৌণ। কে জানে হয়তো ভালবাসই না।
– বললাম না একা থাকতে দাও। তোমাকে অসহ্য লাগছে।তোমাকে ঢাকায় ডেকে আনা ভুল হয়েছে আমার।
– তা তো লাগবে। তোমার তো দরকার ছিল একটা পুতুল। বিয়ে করার জন্য। যাকে যেমন খুশি তেমন ভাবে নাচাবা।ভালবাসা টা পুরো মিথ্যা।তুমি প্রতারক। ভালবাসার প্রতারণা করেছো।
– হাউ ডেয়ার ইউ আর।এসব কথা বলার সাহস হয় কিভাবে তোমার ? তুমি এখুনি আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও।
– ওকে। গুড বাই।
আমি ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। জন একবারও পিছন থেকে ডাকলও না। আমার চোখে শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টি।

১ সপ্তাহ কেটে গেলো। আমি ঢাকাতেই একটা জব পেয়েছি। আর একটা বন্ধুর মেসে উঠেছি। জন আর যোগাযোগ করে নাই। বাসা থেকেও না। আমি সম্পূর্ণ একা। আইইএল্টিএস এস গাইড কিনে পড়ছি। চেষ্টা করবো বিদেশ চলে যাওয়ার ।এই দেশে আর না।
সন্ধ্যায় ধানমন্ডি লেকে বসে আছি একা একা। হটাত ফোন আসলো। বাবার ফোন।এত দিন পর। আমার বুকটা ধুকপুক করতে লাগলো। ফোন ধরলাম
– হ্যালো
– খোকা তুই কোথায়
বাবার এরকম আদর-মাখা কণ্ঠ কত দিন শুনি নাই। আমার চোখে পানি এসে গেলো। ওপাশ থেকে বাবা বলছে
– কি ব্যাপার কথা বলছিস না কেন খোকা।
আমি চোখ মুছে বললাম
– বাবা আমি ঢাকা তে।
– এত রাগ করে আছিস এই বুড়া বাপটার উপর।কতদিন তোরে দেখি না। তোর মা তো কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেছে।বিলু আর রুমা সারাদিন মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায়।
– বাবা তুমি তো বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছ।
– সে তো রাগ করে বলেছি। তাই বলে তুই ২ সপ্তাহের উপর হল। কোন যোগাযোগ করবি না?
– আমি তো সমকামী। বিয়ে করবো না।
– করিস না বিয়ে। আমি আর তোকে জোর করবো না। তবু তুই ফিরে আয়।
আমার খুব ইচ্ছা করছে আমার পরিবারের সবাই কে দেখতে। আমার জীবনের আপন মানুষ গুলো কে দেখতে। সোজা কমলাপুর যেয়ে টিকেট কাটলাম ট্রেনের। বাড়ি যাবো। বাবা ,মায়ের কাছে।আমার নীড়ে
পরিশিষ্ট
আমি ঢাকাতে খুব ভাল একটা জব পেয়েছি। এখন ঢাকা তে থাকি। ছুটি হলে মাঝে মাঝে বাড়ি যাই। আমার বাবা মা আমার আইডেন্টিটি মেনে নিয়েছেন। তারাই আমাকে অনুপ্রাণিত করছেন বিদেশ চলে যাওয়ার জন্য। এই দেশে তো আমাদের কোন ভবিষ্যৎ নেই। আমিও চেষ্টা করছি। সামনে আইএলটিএস পরীক্ষা দিবো। রুমার বিয়ে হয়েছে। সে খুব ভাল আছে।জনের কোন খবর জানি না। সম্ভবত বিয়ে করে নাই। বিয়ে করলে তো জানতেই পারতাম। সারা বিশ্ববাসী কে জানিয়েই তো বিয়ে করবে সে। দিন চলে যায় জীবনের নিয়মে।
সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.