মনু মিয়ার অনন্ত যাত্রা

লেখকঃ সামীউল হাসান সামী

সেদিন আমাবস্যা ছিলো, ঘুটঘুটে অন্ধকার।
খুব সম্ভবত ১৯৭২ কিংবা ৭৩ এর কথা। একটি
মাটির ঘরে বসবাস করে মনু মিয়া। বয়স ২৫ হবে।
যদিও সে একজন ছেলে, তবে মেয়ে হওয়াটাই
যেনো তার স্বপ্ন। নিজের ঘরে সারাদিনের
কাজ শেষে ইচ্ছেমত সাজে। তার একজন
ভালোবাসার মানুষও আছে হাসেন মিয়া।
হাসেন মিয়া বিয়ে করেছে বছর খানেক হবে,
তবুও সে ছুটে আসে মনু মিয়ার কাছে। আজও
হয়তো হাসেন মিয়ে আসবে মনু মিয়ার কাছে।
তাই হয়তো মনু এতো মন দিয়ে সাজগোজ করছে।
দূর থেকে একটি বাসির সুর ভেসে আসছে –
কেন পিরিতি বারাইলা বন্ধু ….।)
( হাতে লাল টুকটুকে একটি শাড়ি হাতে
হাসেন মিয়া মনু মিয়ার গায়ে জোরালো। মনু
মিয়া পিছন ফিরে মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে
শাড়ি নিয়েই পায়ে আলতা পড়তে শুরু করলো,
চোখে তার জগতের সমস্ত লজ্জা ভর করেছে।)
মনু মিয়াঃ কি মিয়া এতো দেরি করলা যে ?
হাসেন মিয়াঃ কই দেরি দেহ! বউ ডারে
বুঝাইয়া থুইয়া আইতে দেরি অয়না?
মনু মিয়াঃ ও মিয়া তোমার বউ আছে তয় আমার
ধারে ক্যান আহো?
হাসেন মিয়াঃ তরে যে আমার মনে বেজায়
ধরে। তর কতা মনে অইলে আমার পরানডা হু হু
কইরা উরাল মারে। আর আমারে পাখনায়
বাজাইয়া তোর ধারে লইয়া আহে। ক দেহি
ছ্যাড়া কি জাদু জানস?
মনু মিয়াঃ যাদু কই দেহ মিয়া এইডা অইলো
মায়া। আমার চোখে মায়া, আমার মুখে মায়া,
আমার গতরে মায়া।
( হাসেন মনুকে জরিয়ে ধরে বিছানায় গেলো।
দুটি দেহ একাকার হয়ে গেলো।সুর বাঝছে –
কারে কী বলিব আমি নিজেই অপরাধী। )
( তখন মাঝরাত! জানালার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে
আছে মনু। গায়ে জড়ানো লাল শাড়ি।)
হাসেন মিয়াঃ এইহানে খারায়া আছো কেন
মনু?
মনু মিয়াঃ তোমারে কইছিনা আমরে বনলতা
কইবা, মনু কইবানা। আমি বনলতা মনু মইরা
গেছে।
হাসেন মিয়াঃ লও ঘুমাইবা।
মনু মিয়াঃ আমার যে মিয়া ঘুম আহেনা।
পরানডা খালি ধুধু করে।
হাসেন মিয়াঃ হুইলেই ঘুম আইবো।
মনু মিয়াঃ মিছা কতা! আইবোনা! ঘুম
আইবোনা। ও মিয়া মনে পরে ৭১ এর রায়টের
কতা? কি ভারি রায়ট। চাইরদিকে মেলেটারি,
কতো মানুষ মরলো, কতো ভিটামাটি উজার
অইলো, কতো মানুষ বাস্তুহারা হইলো। কতো
নারীর ইজ্জত গেলো?
আমার মনে আছে। কিছ্ছু ভুলিনাই। আমার বয়স
তহন ১৯ কি ২০। গরু লইয়া চকে যাইতাম। হারাডা
দিন টুটু কইরা ঘুরি। আচমকা সহরের সাবেরা
হগলেই গেরামে আইতে লাগলো। মায় কইলো
শহরে রায়ট হইছে। শেখ সাবে কইছে দ্যাশ
স্বাধীন কইরা ফালাইবো। কয়দিন পরে দেহি
রায়ট আমাগো গেরামের দিকে আইয়া পরলো।
মনে পরে মিয়া?
হাসেন মিয়াঃ হ পরবো না কেন? রতন মিয়ারা
দল বানাইলো জয় বাংলার দল। ভারত গিয়া
টেরনিং লহওনের লেইগা, তুমিও তো আছিলা।
মনু মিয়াঃ হ আমিও গেছিলাম। ভাইবা দেহি
আমার মা,ছোড ভাই ওগো যদি মেলেটারিরা
মাইরা ফালায়! আমাগো দ্যাশ যদি লইয়া যায়।
তাই গেলাম ভারত টেরনিং এ.। ভারত থন
আইয়া কতো মেলেটারি মারছি ক্যারা কয়ডা
গনে। মানিক ভাই গুলি খাইলো। বেডাডারে
বাচান গেলো না।
হাসেন মিয়াঃ হ লাশ বাইত আনছিল। দেখছি।
মনু মিয়াঃ তরব মাতব্বর রাজাকারে নাম
দিলো। হেই ঘুইরা ঘুইরা আমাগো হগলের
বাড়িঘর চিনাইছে মেলেটারিগো। সব শ্যাষ
কইরা দিছিলো মেলেটারিরা। রায়ট শ্যাষে
বাড়ি আইলাম, আমার উত্তরের ভিটার ঘর পুইরা
ছাই হইয়া মাটিতে মিশা গেছে।
মেলেটারিরা মায়রে মারমে মারতে মাইরাই
ফালাইছে, মায় যেন কতো কষ্টে মরছে। ১২
বছরের ছোট ভাইডারে মেলেটারি লইয়া
গেছে, হের পর আর কেউ দ্যাহেনাই। আমার
গুয়াইলের গরু দুইডাও রাখেনাই। হগলি এই বুকটায়
সামাল দিলাম মিয়া।
মাথার ঘাম পায়ে ফালাইয়া আবার ঘর
বানালাম। তয় আমি ঘর বানলে কী অইবো
মিয়া কও? খুদায় আমার কপালতো বানলো না।
তরব রাজাকার হগলেরে লইয়া আমারে মাইরা
ধইরা গেরাম থেইকা বাইর কইরা দিলো। কতো
পায়ে পইরা কইলাম, আমার ভিটা ছাইড়া
যামুনা, আমারে আপনেরা খেদায়েন না।
আল্লাহর দোহাই লাগে। কেউ কতা হুনে নাই।
আমি থাকলে নাকি তোমাগ গেরাম নষ্ট
অইবো।
ওই মিয়া কও, আমি কয়দিন তোমার দরজায়
গিয়া খারাইছি, আর তুমি কয়দিন আমার দরজায়
আইয়া খারাইছো? আমি কি তোমারে জুর
কইরা আনি? তুমি আহো বইলাই তো আমি
জায়গা দেই। তাইলে আমি এ্যাকলা ক্যান
ভিটা মাটি হারাই?
আমি এ্যাকলা কেমনে গেরাম নষ্ট করি?
আমি এ্যাকলা কেন সব হারাই?
রায়ট শ্যাষে গেরামে আইলাম, হগলেই কইলো
দ্যাশ স্বাধীন হইছে। ও মিয়া কওনা দ্যাশ
কেমনে স্বাধীন হয়? বন্দুক হাতে যুদ্ধ করলে?
মা বইনেগো ইজ্জত দিলে, গাঙ্গের পানি
রক্তে লাল অইলে?
হগলই তো অইলো, তয় স্বাধীনতা কই আইল?
নাকি স্বাধীনতা খালি তোমাগ সম্পত্তি?
আর আমারে, আমারে কি খালি লাল
শাড়িতেই ভুলাইয়া রাখলা?
হাসেন মিয়াঃ আইজ তোমার কি অইছে?
মনু মিয়াঃ হুনতাছ মিয়া আজান পরছে! গাও
ধুইবানা? লও গাঙে যাই। একলগে সাতার দেই।
তোমার লগে ডুব দিয়া আর উঠমু না।
হাসেন মিয়াঃ তুমি পাগল অইছোনি? যাও তুমি
আমি অহন যামুনা।
[মনু মিয়া ঘর থেকে বেরুলো। সে নদীর দিকে
হাটছে। হঠাৎ একটা চিৎকার ভেসে এলো, ঐ
পশ্চিমের গেরামে তরব মাতব্বর খুন হইছে। ( ঐ
কেরামত ল যাই কেডা জানি তরব মাতব্বররে
খুন করছে)। এক তৃপ্তির হাসি সকল নিস্তব্ধতা
ভাঙলো মনু মিয়া। মনু মিয়া হাটছে, অন্ধকারে
মিলিয়ে গেলো মনু। হঠাৎ পানির ঝাপটার
শব্দ। বুঝাযাচ্ছে মনু ডুব দিয়েছে জলে। মনু আর
উঠবেনা। ]

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.