মোহিনী

লেখকঃ সামীউল হাসান সামী

দূর্গাপুর গ্রামে কয়েক ঘর হিন্দুর বসতি। জাতে নরসুন্দর বা প্রচলিত বাংলায় বলতে গেলে নাপিত। বাপ দাদার পেশাটা এখনো ওরা ধরে রেখেছে। নিয়ম করে হাটে যায়, চুল দাড়ি কামিয়েই পয়সা উপার্জন করে। এতে ওদের সংসার খুব ভালো না কাটলেও কোনরকম কেটে যায়। ১৯৯১ সালের কথা শেষের দিকে ভূপেন ও লক্ষ্মী ‘র ঘর আলো করে জন্ম নিলো দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান মেয়ে – তৃষ্ণা। দ্বিতীয় সন্তান ছেলে হওয়ায় বাঁধভাঙ্গা আনন্দ বইতে শুরু হলো ভূপেন লক্ষ্মী ‘র ঘরে। খুব ধুমধাম করে ধর্মীয় আচার মেনে ভূপেন পূত্রের নাম রাখা হলো নরেন। নরেন জন্য কতো শত জামা – খাবার – খেলনা কোন কিছুরই অভাব হতে দিচ্ছে না ভূপেন। ধিরে ধিরে নরেন বড় হচ্ছে।

নরেন – এর বয়স যখন 13-14 প্রথম বিপত্তি বাজলো তখন। তার আচরণ একটু অন্য রকম। পাড়ার ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন কথা বলে। নরেন তাদের সঙ্গে ঝগড়া করে। বাড়ি এসে কাদে। দিনদিন নরেন একা একা থাকতে শুরু করলো। নরেন যেনো নিজেই নিজের ভূবনে বাস করছে। কারো সঙ্গেই তার থাকতে ভালো লাগেনা। স্কুল থেকে এসেই সে তার পুতুল ঘড় নিয়ে খেলতে বসে। পুতুলের বিয়ে নিয়ে আনন্দ করে। তার বোনের পুতুলের সঙ্গে তার পুতুলের বিয়ে দেয়, রান্না করে ইত্যাদি।

সমস্যা দ্রুতই ঘনীভূত হচ্ছিল, যখন নরেনের বয়স ২৪ বছরে পা রেখেছে। দিদির বিয়ে হয়েছে, এখন আর পুতুল খেলার বয়সও নেই। তবে রয়ে গেছে নরেনের কোমলমতি হৃদয়, নিজেকে ভিন্ন ভাবে সাজানোর শখ। তবে এতে বিপত্তি বাজায়, পাড়ার ছেলেরা, নিজের পরিবার, সমাজ পতিরা।

ধিরে ধিরে নরেনের প্রতি সকলের আচরণ ক্ষিপ্ত হতে থাকে। আর নরেন সব যেনো মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছে।
নরেন পুকুর পারে বসে ভাবে,

” ঠাকুর! তুমি কী আর রঙ্গ করার মানুষ পেলে না?
আমাকেই কেন তোমার পছন্দ হলো? “

তবে এ প্রশ্নের উত্তর নরেনের কখনোই মেলেনা।
আজও নরেন বসে আছে পুকুর পারে। একাই বসে আছে। হঠাৎ ওর জ্যাঠা মশাইয়ের ছেলে এসে ডাকলো – ” নরেন দা! কাকা তোমাক ডাকিছে। অক্ষন. যাতি কলো। দ্যাহোগা! কাকা তোমাক নিয়্যা খুব ক্ষেপিছে। “

নরেনঃ তুই যা! আমি আইতেছি।

বলেই নরেন বাড়ির পথ ধরলো। নরেন বাড়ির কাছে পৌছাতেই শুনতে পেলো তার বাবা মায়ের ঝগড়া।

ভূপেন (বাবা): মাগী এমন ছাওয়াল প্যাটে ধরেছিস! মাইনসেরে মুখ দ্যাখানোর জো নাইকো।

লক্ষ্মী (মা): মিনসের কতা শুন! ছাওয়াল কী আমি তোরে ছাড়াই প্যাটে ধরছি?

নরেন প্রবেশ করলো বাড়িতে। ভূপেন রেগে আগুন।

ভূপেনঃ তোরে জন্ম দিয়া কী আমি বেজাই পাপ করিচ্ছি? লোক সমাজে মুখ দেখাবার পারিচ্ছি না।

নরেনঃ বাবু (বাবা) আমি কী করিচ্ছি? আমি হগলের মতো না। কতোবার কমু।

ভূপেনঃ তুই হাইন্জের ব্যালা কাইল কাপড় পড়িচ্ছিলি ক্যাণ?

নরেনঃ আমার কাপড় পড়তে ভালা লাগে। তাই পইড়া নদীর পারে ঘুরিচ্ছি রাইতের ব্যালা।

ভূপেনঃ শাড়ি কী ছাওয়ালের পোশাক রে? তুই শাড়ি পড়বো ক্যানে?

নরেনঃ কোনটা কার পোশাক হেইডা তো তোমরা ঠিক করিছু। তোমরা কী কাউরে কইছিলা, যে তার কোনটা পিন্দনের ইচ্ছা। তোমরা যেমনে চাইছো হেমনে নিয়ম করিছু। ছাওয়ালের শাড়ি পিন্দনের ইচ্ছে হইলে, হ্যা পিনবো, তাতে কার কী?

ভূপেনঃ দেখিছো মাতারি! তোর ছাওয়াল কী বলিচ্ছে? লেকচার শুনাইচ্ছে। পাড়ার লোকেরা ছি ছি করিচ্ছে! সেগুলান তোর ছাওয়াল দেখিচ্ছে না?

লক্ষ্মীঃ ও বাবা তুই ক্যান বুজিচ্ছুনা লোকে এগুলান মন্দ কতিছে।

নরেনঃ মা তুমি কউছেনা! আমাক যখন হিজড়া বলিচ্ছে, আমাক যখন মাইগ্যা বলিচ্ছে তখন সমাজ ক্যাবা করি সহিচ্ছে?
তোমাগের সমাজ থেইক্যা এগুলান শুনেই তো আমার বড় হওয়া লাগিচ্ছে। এগুলা মনে কয় তোমাগের সমাজ খুব ভালো কাজ করিচ্ছে?
আমি অন্য রকম হবার পারবোনা এ্যাবা নিয়ম তোমাগের সমাজ কুটি পালো?
সবার তোমাগের মন মতো চলাই লাগবি এ্যাবা নিয়ম তোমাগের সমাজ ক্যাবা করি বানালো?

লক্ষ্মীঃ বাবজান পাগলামী করিশন্যা! সমাজে থাকতি হলে, সমাজের নিয়ম মানতি হয়।

নরেনঃ ভুইলা গেছো মা! সকল অবতার নোংরা সমাজ ভাঙ্গিছে! নতুন সমাজ গড়িছে।

লক্ষ্মীঃ ভগবান! ছাওয়াল আমার কী কতিছে!

নরেনঃ মা তুমি যারে ভগবান জানো, হেই সকল জীবের পালনকর্তা শ্রী বিষ্ণু মহিনী রুপ ধারন করি দৈত্যগো ঠকাইয়ে সমুদ্র মন্থন করি অমৃত আনিছিল।
প্রভু শ্রী কৃষ্ণ, মহিনী রুপ ধারন করি রাজপুত্র আরাভানের সঙ্গে বিয়ে করিচ্ছিল। তাইলে পরে আমি ক্যান এতো দোষী?
আর হে তোমাগের দেবতা?

লক্ষ্মীঃ হায় ভগবান! রক্ষ্যা করো।

নরেনঃ না মা! তুমি ক্যান কান্দো। দেবতারা তো তোমাগেরি সম্পত্তি। কান্দনের কথা তো আমার। ভগবান আমাক ছাড়া রঙ্গ করবার মানুষ পাইলো না। দেখিচ্ছোনা ক্যান মা, শ্রী বিষ্ণু, শ্রী কৃষ্ণ মহিনী (নারী রূপ) ধারন করিও অবতার হইছে।
আর আমি নরেন সমাজ, সংসারে বোঝাই হইয়া রইলাম।
তোড়া এতো পড়লি, এতো জানলি, খালি জানলি না আমাক।

ভূপেনঃ তোর অনেক লেকচার শুনিচ্ছি। তুই বাইর হ বাড়ি থেইকা। যেইদিক খুশি যা, আমার বাড়ি আর রাখিচ্ছি না তোক। আমি আর মানুষের কতা শুনিচ্ছি না।

[নরেনকে ঘাড় ধরে ভূপেন বাড়ি থেকে নামিয়ে দিলো। ]
লক্ষ্মীঃ ও ভগবান! নরেনের বাপ, ওরে ছড়ো। আমার ছাওয়াল কই যাইবো? ওরে যাইতে দিওনা।
নরেন হাটছে। ধিরে ধিরে হাটছে। পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। লক্ষ্মী পেছনে পেছনে ডাকছে, তবে লক্ষ্মী ‘র হাত টেনে ধরে রেখেছে ভূপেন। গল্পটা এখানেই শেষ নয়। হয়তো নরেন কিছুদিন পর বাড়ি এসেছে, অথবা আর কখনোই আসেনি। নরেন কোথায় গিয়েছে সে খবরও হয়তো আমরা জানিনা। তবে আমরা জানি আমাদের এই সমাজ সংসার কে। আমরা জানি এদের চিন্তা শক্তি কতটা সংকির্ন। আমি চাই ছেলে মেয়ে বা তৃতীয় প্রকৃতি যে যেমনই হোকনা কেন, সমাজ সংসার হোক সকলের নিরাপদ আশ্রয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.