সত্ত্বা

লেখক:ঘাসফড়িং

প্রত্যেক দিনকার মতো আজও গগন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়লো। ঘুম থেকে উঠার পর তার একটাই কাজ। সেটা হলো সকালের প্রার্থনায় গগনের স্রষ্টাকে ডাকা।তারপর গগনের অস্তিত্ব গুলোকে টিকিয়ে রাখার কাজে নেমে পড়া। আশ্রমের সামনে কিছু ফুলের চারা গাছ দিয়ে একটি ছোট্ট বাগান ।সমস্ত আশ্রমের সীমানাটাকে এই ছোট্ট বাগানটা মহিমান্বিত করে রেখেছে। উজ্জ্বল এক ঝলক ফুলের হাসিতেই আশ্রমের পরিবেশটা আলোকিত হয়ে থাকে। আর সেগুলোই গগনের প্রাণ। এগুলোর জন্যই গগন তার সারাদিনের হাসি খুশি বিসর্জন দেয়। আশ্রমে থাকা অনাথের আবার হাসিখুশি কিসের? প্রশ্ন জাগতে পারে।

আশ্রমে থাকা অনাথগুলোর জীবন হয়তো এরকমই হয়। কিন্তু যেটুকু সময় পায় সেটুকু সময়ই গগন এই গুল্মগুলোর স্বার্থে ব্যায় করে।

আর আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি।ধারাবাহিকতাই গগনকে তার নিয়ম মাফিক কাজগুলো করিয়ে দেয়।

পুরো আশ্রমটা নিস্তব্ধ । সবাই ঘুমোচ্ছে । কিন্তু গগন ঘুম থেকে উঠে পড়লো। আর সকালের প্রার্থনা শেষ হতে হতে ভোরের সূর্য পূর্ব গগনে রঙিন আভা তুলেছে।

গগন তার নামের ব্যখা কখনো পায়নি।তবে এ নাম কেনো তাকে দেয়া হলো তার কারণ জানতে চাইতো আশ্রমের কেয়ার টেকার সেলিম মুন্সির কাছে। বয়স প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই । কিন্তু এই সেলিম মুন্সিকেই ছোট বেলা থেকে গগন বাবা বলে জেনে এসেছে। আর পুরো আশ্রমের মধ্যে গগনই একমাত্র বালক , যাকে কিনা সেলিম মুন্সি তার নিজের সন্তানের মতো করে মানুষ করেছে। বড্ড সরল প্রাণ মানুষ উনি। অমায়িক একটা সৌন্দর্য তার মধ্যে বিদ্যমান । এখনো মনে হয় তার রূপের রূপালী জোছনা চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। ভিতরে বিন্দুমাত্রও চতুরতার ছোঁয়া নেই।

গগন এই সেলিম মুন্সির কাছেই আদরে মানুষ হয়েছে। গগন প্রায়ই জিজ্ঞেস করেছিলো, বাবা আমার নামটা গগন কেনো রাখা হলো? কিন্তু সেলিম মুন্সি গগনকে এটা ওটা বলে কাটিয়ে দিতো আর সেরকম যুক্তি সংগত উত্তরও পায়নি গগন।

ফুলের গাছ গুলোর গোড়ায় গগন পানি দিয়ে যাচ্ছে আপন মনে। কত্ত সুন্দর ফুলগুলো । মনে মনে ভাবে গগন। এই গাছগুলোতে ফোটা পুষ্প গুলোই তো গগনের সবচাইতে কাছের বন্ধু । খুব ছোটবেলা থেকেই গগন এই পুষ্পে শোভিত গাছগুলোকে তার পরম আপন করে নিয়েছে। গাছগুলোর সাথে নিবিড় ভাবে গগনের আত্মিক সম্পর্কের বন্ধন রয়েছে। হৃদয়ে জমিয়ে রাখা সবটুকু আবেগ গগন তার এই প্রাণপুষ্পের সাথেই ভাগ করে। গগনের বিশ্বাস এই ফুলগাছ গুলো গগনের সব কথা শুনতে পায়। আর তারা কি বলে গগনও সেটা শুনতে পায়।

কখনো হেসে দিয়ে গগনের বলা কথা গুলো শুনে। আবার বিষন্নের ছাপ একে দিয়েও ফুলগাছ গুলো গগনের দুঃখ ভাগ করে নেয়। গগন কখনো কাঁদেনা। চোখের জল সবার আসেনা। আর সবসময়ও আসেনা। হয়তো কেউ পরম আনন্দে চোখের জল ফেলে। আবার কেউ পাহাড় সমান দুঃখে পাথর হয়ে যায় । আর সেরকমই হয়তো গগন।

সচরাচর গগনের মুখে কখনো হাসি ফোটেনা। সবসময় নীরব নিস্তব্ধ থাকে। একা একা হাঁটতে ভালো লাগে গগনের।আর আশ্রমের ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। কি খুঁজে পায় সেই গগনে, যার দিকে গগন নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হয়তো কখনো ভাবে, তার জীবনটাই কেনো এভাবে পরিচয় হীন হলো। মা-বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য কি স্রষ্টা গগনকেই বেছে নিলো।

নাকি তার মধ্যে গড়ে উঠা এক বিষাক্ত সত্ত্বার কথা ভাবে? যা এই সমাজে নিষিদ্ধ । এমন কোন আইন এ সমাজে নেই।যেখানে সমকামী ভালবাসার বাঁধা হয়ে দাড়াবেনা। হয়তো ভাবে।

গগন খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পাশাপাশি নজরুলসঙ্গীতও গাইতে পারে ।

এই আশ্রমের সব অনাথদের গগন তার হৃদয়ের সবটুকু সুর দিয়ে গান গেয়ে শুনায়,শেখায়। যা গগনের প্রত্যেকদিনের রুটিনের বিকেলের দায়িত্ব । গগন গান গায় আর দূরে দাড়িয়ে সেলিম মুন্সি গগনের কন্ঠে গাওয়া গানের সুরে চোখের পানি ফেলে।

আর এসবের মানে কি । সামান্য একটা গান শুনে কেউ কাদেঁ?

আর তুমি কিনা কাঁদছো? কি হয়েছে বাবা। সত্যি করে বলবে?

এরকম হাজারো প্রশ্ন ক্ষমে ক্ষনে করে গেছে গগন।কিন্তু উত্তর পায়নি।

প্রাচীর দিয়ে সমস্ত আশ্রমটাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। ঘেরার ফলে আশ্রমের বাহিরে খুব একটা যাওয়া হয়না সবার ।আশ্রমের ভিতর থেকেই প্রাচীরের বাহিরের সবকিছু দেখা যায় । আশ্রমটার পাশ ঘিরে কিছু ফ্ল্যাট রয়েছে ।

প্রত্যেকদিন বিকেলের দিকে গগন আশ্রমের ছেলেমেয়েদের গান শুনায়।আর আজও শুনাচ্ছিলো।

গান গাওয়াবস্থায় গগনের চোখ আটকে যায় প্রাচীরের বাহিরের একটা ফ্ল্যাটে।

মনে হয় তৃতীয় তলা। একটা ছেলে ফ্ল্যাটের বেলকনিতে দাড়িয়ে আছে।তার দৃষ্টি গগনের দিকে।

গগন ছেলেটার দিকে আর না তাকিয়ে আবার গান ধরে।

দূর থেকে ছেলেটার চেহারার কিছুই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না ।

গগন গান গাওয়া শেষ করার পর ওই বেলকনিটার দিকে আবার তাকায়। ছেলেটা এখনো দাড়িয়ে আছে।

গগনের ভাবনার উদ্ভূত হয়। কে এই ছেলে? এভাবে দাড়িয়েই বা কি দেখছিলো।

পরদিন সকালে গগন ফুলের চারা গুলোয় পানি দিচ্ছিলো। আবারও দেখতে পায় ছেলেটা আবার দাড়িয়ে কি যেন দেখতেছে।

এবার গগনের ভাবনা গুলো চিন্তায় রূপান্তরিত হয়।

গগন ভার্সিটিতে যেতে চায়না। কিন্তু সেলিম মুন্সি গগনকে জোর করে ভার্সিটিতে পাঠায়। গগন তার বাবাকে প্রায়ই বলে, বাবা আমার ভার্সিটিতে যেতে ভালো লাগেনা। আমাকে জোর করোনা। আমার আশ্রমেই ভালো লাগে। আর তখন সেলিম মুন্সিও অভিমানের ধমক দিয়ে শাসন করে,

হ্যাঁ তোর বললেই হলো, আমি কান পেতে শুনে নিলাম নাকি?

আর একটা কথাও আমি শুনতে চাইনা। নিজেকে তো একদম একঘেয়ে বানিয়ে ফেলছিস। কোথায় একটু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবি।না, তোর শুধু একঘেয়েমি । আর এভাবে চার দেয়ালের আরালে বন্দি পড়ে থাকিস কেনো বলতো? আমাকে তো অন্তত বলতে পারিস। নাকি?

যা বাবা। ভার্সিটিতে যা। মনটা ভালো লাগবে ।এভাবেই সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিনের মতো যাওয়া হয়।

ভার্সিটির ক্লাস রুমে গিয়ে বসে পড়ে গগন। সামনের বেঞ্চটাতেই সবসময় বসে গগন। পিছনে বসলে কেমন যেনো গোলমাল লাগে তার কাছে সবকিছু।

পাশে সৈকত বসেছিলো।গগনের সবচাইতে ভালো বন্ধু।সবচাইতে ভাল বন্ধু বলা হচ্ছে কারণ গগনের তেমন কোন বন্ধু নেই।আর থাকার মধ্যে সৈকতই সবচাইতে ভালো বুঝে গগনকে। আর আশ্রমের শিশুগুলোই গগনের পুরো অংশ জুড়ে আছে।

ভার্সিটির সময়টুকু সৈকতের সাথে পার হয়ে যায় গগনের।গগনের সমকামীতা সম্পর্কে সৈকত খুব ভালো করেই জানে।

যা পৃথিবীর আর কেউই জানে না। কিন্তু তারপরও তাদের বন্ধুত্ব অটল।

সৈকত একটা মুচকি হাসি দিয়ে গগনকে জিজ্ঞেস করল, কিরে কেমন আছিস?

গগন: হুম। ভালো। তুই?

সৈকত: ভালোই। তোর সাথে দেখা করতে পারিনি এ কয়দিন। রাগ করিসনা দোস্ত।

গগন: আরে কি বলছিস এসব! রাগ করবো কেনো। তবে কোথায় গিয়েছিলি?

সৈকত: আরে বলিসনা। গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। মা খুব জোর করছিলো। নানুর শরীর নাকি অসুস্থ ছিলো। তাই দেখতে গিয়েছিলাম।

গগন: অহ। আচ্ছা ।

স্যার ক্লাসে ঢুকে পড়লো। সবাই গুড মর্নিং জানালো।

গগনের কিছুটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে কেনো জানি? কেনো জানি মনে হচ্ছে কেউ গগনের দিকে তাকিয়ে আছে।

গগন পিছু ফিরে তাকায়। দেখলো একটা ছেলে পিছন থেকে গগনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে একটা কালো ফ্রেমের চিকন চশমা। ছেলেটাকে খুব চেনাই মনে হলো গগনের।

তার দিক থেকে গগন চোখ ফিরিয়ে নিল।

আরে এটা তো মনে হচ্ছে ফ্ল্যাটের বেলকনিতে দাড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটি। এখানে কি করছে । আগে কখনো তো দেখিনি। আর আমার দিকেই বা এভাবে তাকিয়ে ছিলো কেনো।

ক্লাস শেষে গগন বাহিরে এসে সৈকতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

সৈকত আসার পর একসাথে ফিরে আসে নিজ নিজ গন্তব্যে ।

গগন যে আশ্রমে থাকে তার থেকে মিনিট দুয়েক দূরেই সৈকতের বাসা।

আশ্রমে ফেরার পর গগন গোসল সেরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়।

কি ছেলেরে বাবা। খুব আজব তো।

চিন্তায় ফেলে দিলো। কে এই ছেলে। আর আমার দিকেই বা এভাবে তাকিয়ে থাকে কেনো?

বিকেলের দিকে গগন সেলিম মুন্সির কাছে যায় ।

তার রুমে ঢুকতেই দেখে কার একটি পুরনো ছবি যেন তার হাতে। কিন্তু চোখে জল।

গগন রুমে ঢুকতে ঢুকতে বাবা বলে ডাক দেয়। সেলিম মুন্সী সাথে সাথে ছবিটাকে আড়াল করে ফেলে।

গগন জিজ্ঞেস করতে লাগলো,

বাবা এটা কি? কারও ছবি মনে হলো। আর তুমি কাঁদছ কেনো? কি হয়েছে?

সেলিম: না না। কিছু না। এমনিতেই । তুই হঠাত্ এখানে।

গগন: কেন আসতে পারবনা বুঝি।

সেলিম: তুই আসবিনা তো আর কে আসবে?

গগন: আচ্ছা বাবা তোমাকে একটা প্রশ্ন করার ছিলো।

সেলিম: কি প্রশ্ন?

গগন: আচ্ছা বাবা আমি কি এই আশ্রমেই জন্মেছিলাম? নাকি আমারও একটা পরিচয় আছে।

সেলিম: হঠাত্ এ প্রশ্ন ?

গগন: না এমনি। ছোট থেকেই তো এখানে আমার বেড়ে উঠা। কখনো জানতে চাইনি। তোমাকেই বাবা বলে জেনে এসেছি ।কিন্তু আজ জানতে চাওয়ার একটা কারণ মায়ের কথা কেনো জানি খুব মনে পড়ে। যদিও আমার মা-কে আর কোথায়ই বা আছে জানি না ।

সেলিম মুন্সী চুপ করে আছে। চোখ দিয়ে তার অনবরত টপ টপ করে পানি বেয়ে পড়ছে।

গগন আবার বলতে শুরু করলো,

বাবা তুমি কাঁদছ ! আমি কি খুব আঘাত করে ফেললাম তোমাকে।প্লীজ বাবা ক্ষমা করে দাও। আমি না বুঝে তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।

সেলিম মুন্সি: না রে। তোকে তো একদিন না একদিন সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। তখন তোকে সব বলবো। যেদিন তুই তোর নিজের পায়ে দাড়াবি।ভবিষ্যত্ তোর মজবুত হবে।

নয়তো তার আগে বললে সবকিছু তছনছ হয়ে যেতে পারে। আর তুইও তোর এই বাবাটাকে ঘৃনা করতে শুরু করবি। সময়ই সব বলবে।

গগন সেলিম মুন্সিকে জড়িয়ে ধরে।

বাবা।এসব কি বলছো তুমি।

আমি তোমাকে ঘৃনা করবো? তুমি এতদিন যাকে নিজের হৃদয়ের সবটুকু মমতা দিয়ে মানুষ করেছো আর সে তোমাকে ঘৃনা করবে!গগনের চোখভরে পানি বেরিয়ে এসেছে। বড় একটা আঘাত করে ফেলেছি বাবাকে। আমার জন্য এই মানুষটা সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে।আজ পর্যন্ত অনেক প্রশ্ন করে এসেছি বাবাকে। বাবা সংসার ধর্ম ছেড়ে আমাকে মানুষ করার কাজে কেন নিয়োজিত।বিয়েই বা কেনো করেনি বাবা।

আজ অনেক কষ্ট দিয়েছি এই মানুষটাকে। এতবড় মহান মনুষত্বের অধিকারী আমার বাবাটাকে।

অনাথ আশ্রমে সাধারণত বড় কয়েকটি ঘর থাকে যেখানে সবগুলো ছেলেমেয়ে একসাথে বসবাস করে।তবে কয়েকটি ব্যতিক্রমী ঘরও থাকে।তার মধ্যে সেলিম মুন্সি থাকে একটি ঘরে।আর গগন থাকে আরেকটায়।প্রাচীরের পাশ ঘেষেই গগনের ঘরটা।জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্যপট দেখা যায়।সারাক্ষণ হাওয়া বাতাস চলাচল করে।

গোসল সেরে গগন তার ঘরে এসে পড়তে বসে।দরজার বাইরে কে যেন প্রচন্ড জোরে করাঘাত করছে।

গগনদা গগনদা বলে ডাকছে। গগন দরজা খুলে দেয়। ইবু । আশ্রমের একটা অনাথ।

-কিরে ইবু কি হয়েছে?

হাঁপাতে হাঁপাতে ইবু বলতে লাগলো

-গগনদা লতা খেলতো গিয়া পইড়া গেছে। মাথায় ভারী আঘাত পাইছে। কাদতেছে।

আব্বু (সেলিম মুন্সি) তোমারে ডাকতাছে।

ওরে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাইতে হইবো।

-চল।

গগন লতাকে কোলে করে নিয়ে রাস্তায় এসে দাড়িয়ে পড়ছে। সাথে সেলিম মুন্সিও দাড়িয়ে।প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আর কিছুক্ষণ এভাবে রক্ত গেলে বেহুঁশ হয়ে যাবে বাচ্চাটা। হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে গগন লতার ক্ষতস্থানটা।

কোন সিএনজি অটো কিছুই আসতেছেনা। রিকশা গুলোও যেনো উধাও হয়ে গেছে। আর এদিকে ব্যথায় কুকড়াচ্ছে লতা।

কোত্থেকে যেনো একটা প্রাইভেট কার এসে গগনের সামনে দাড়ালো। গ্লাস নামাতেই গগন অবাক। চিকন ফ্রেমের চশমা পড়া সেই ছেলেটি।

এখানে কেনো? এসব ভাবতেই ছেলেটা প্রশ্ন করে উঠলো,

-কোথায় যাবেন? হাসপাতাল? প্লীজ উঠে পড়ুন। বাচ্চার অবস্থা খুব খারাপ দেখছি।

গগন আর একমুহূর্ত দেরি না করে গাড়িতে উঠে পড়ে।

-বাবা উঠো।

সেলিম মুন্সিও গাড়িতে উঠো পড়ে।

ভাবনা চিন্তার বিষয় পড়ে। আগে তো লতাকে বাঁচাতে হবে।

হাসপাতালের সামনে এসে গাড়িটি থামলো। গগন আর সেলিম মুন্সি গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। সাথে ছেলেটিও। ওরা হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালের দিকে এগোতে লাগলো।

ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। ছেলেটি অনেকক্ষণ ধরেই গগনদের সাথে আছে। ডাক্তারকে ডাকা, এসব ওসব নিয়ে অনেকাংশেই ছেলেটা গগনদের সাহায্য করেছে। গগন খুব চিন্তার ঘোরে ডুবেছিলো। ডাক্তার লতার ট্রিটমেন্ট

করার পর অনেকটাই স্বস্তি ফিরে ।

ছেলেটার সাথে কথা হবার পর জানতে পারে পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে ছেলেটা। বাবা একজন বড় ব্যবসায়ী । ফ্ল্যাট পরিবর্তন করে এখানে এসে উঠেছে। নাম বিশাল।

হাসপাতাল থেকে আশ্রমে ফিরে আসার পর বিশালের সাথে কথা হয় গগনের।

-আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই। কি বলে যে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো ।

-এতো কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো কিছুই করিনি। আপনার সমান কিছুই হয়নি। আর এটুকু করতেই পারি একজন মানুষ হিসেবে।

-কেনো? পৃথিবীতে কি আপনিই শুধু মানুষ ? আর কেউ নেই! কই বাকিরা তো

এভাবে এগিয়ে আসেনা।

-দেখুন এটা সবার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যপার।

-এইতো। এতক্ষণে সঠিক কথাটা বললেন। দৃষ্টিভঙ্গি। এটাই তো। যেমন আপনার দৃষ্টিভঙ্গি উঁচু। আর তাই এতটুকু পর্যন্ত করেও আপনার মনে হলো যেনো কিছুই করেন নি। সবার মধ্যে এরকম ধারনা থাকেনা।

-বাদ দিন। আপনার সাথে পেরে উঠবোনা। হুম। যতটুকুই করি তবে কারো থেকে হয়তো শিক্ষা পেয়েই হয়তো এতটা মহান হতে পেরেছি।

-মানে? বুঝলাম না।

-থাক। সময় হলে বুঝে যাবেন।

সেলিম মুন্সি গগনকে চলে যাওয়ার জন্য ডাকছে।

-আচ্ছা এখন যাই। পরে আপনার সাথে কথা বলবো।

-দাড়ান। একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট।

আপনার নাম্বারটা দিতে পারবেন।

-অহ সিউর । নিন……

-ধন্যবাদ ।

-আচ্ছা আসি। কথা হবে।

রাতের খাবারের পর গগন লতাকে ঔষুধ গুলো খাইয়ে দেয়।

রুমে এসে শুয়ে পড়ে। খুব টায়ার্ড লাগছে।

হাত পা ছেড়ে দিয়ে একটু ঘুমোতে চেষ্টা করছিলো গগন। আর তখনই সেলিম মুন্সি গগনের ঘরে এসে ঢুকে পড়ে।

-এই গগন। কে যেনো ফোন করেছে তোকে চাইছে।

গগন শুয়া থেকে উঠে পড়লো।

-আমাকে! কে ? সৈকত মনে হয়।

-না । সৈকত নয়। আমি তো প্রথম এটাই ভেবেছিলাম ।

নে কথা বল।আমি গেলাম।

গগন সেলিম মুন্সির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কানে ধরলো।

-হ্যালো কে বলছেন?

-আমি বিশাল। চিনতে পারছেন?

-অহ। আপনি। হুম । চিনতে পেরেছি।

-কেমন আছেন?

-এইতো ভালো।

-কি করছিলেন?

এইতো ঘুমোতে চেষ্টা করছিলাম ।আপনি ?

-না। তেমন কিছুই না। ডিনার শেষ হলো মাত্র ।

আচ্ছা আপনাকে একটা প্রশ্ন করি। আপনি কি আমাকে আপনার বাবার নাম্বার দিয়েছিলেন? আমি তো আপনার নাম্বার চেয়েছিলাম।

– আসলে আমার নিজের মোবাইলই নেই। আর আমি আপনাকে নাম্বার দেই কিভাবে বলুন। আর আপনি যখন নাম্বার চাইলেন তখন আমিও ভাবলাম যোগাযোগের একটা মাধ্যম থাকা জরুরী। আর তাই আগপিছ না ভেবে বাবার নাম্বারটাই দিলাম।

-আপনার কথাগুলো শুনে সত্যিই অবাক না হয়ে পারছিনা। আপনার সেলফোন নেই? অবিশ্বাস্য ।

– না সত্যিই নেই। সবাই সেলফোন ব্যবহার করে বন্ধু -বান্ধব , রিলেটেডদের সাথে যোগাযোগ করার জন্যই। আর আমার তেমন কেউ নেইও । আর বাবা তো চোখের সামনেই। তাই সেলফোনের প্রয়োজনটাও অনুভব করিনা ।

-অহ। আচ্ছা। আপনি সাদামাটা চলাফেরাই করেন তাহলে।

-হুম। অনেকটা সেরকমই ।

-আচ্ছা এখন রাখি। পরে কথা হবে। আপনার ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম।গুড নাইট।

-গুড নাইট।

সকালে গগন বাগানের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিলো। গেইটের ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ শুনে গগন গেইটের দিকে তাকায়।কে যেনো গেইট ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করছে।

কাছে এসে দাড়ালো বিশাল ।

-আপনি? এত সকাল সকাল।

-কেনো আসতে নিষেধ আছে বুঝি?

-না নেই। তবে হঠাত্ এই সকাল সকাল। তাই বললাম।

-না মানে লতাকে দেখতে এসেছিলাম।

কালকের পর তো আর দেখতে পাইনি। কেমন আছে। তাই দেখতে আসলাম।

-আসুন। ভিতরে আসুন।

বিশাল আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করছে আর চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে ।

গগন ভিতরে নিয়ে বসতে দিলো বিশালকে।

লতাকে দেখার পর বিশাল গগনকে

জিজ্ঞেস করতে লাগলো,

-আচ্ছা আপনি এই আশ্রমে কি একদম ছোট থেকেই আছেন?

-আশ্রমে যারা থাকে তারা কি বিয়ে করার পর আসে?

-আপনি তো খুব হাসির কথা জানেন। না মানে আপনার ছোটবেলার কিছু মনে আছে কিনা সেটা।

-না। আমি ছোট থেকেই দেখেছি এখানে রয়েছি।

-আচ্ছা আপনার কি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করেনা? বাহিরে ঘুরতে ফিরতে ইচ্ছে করেনা?

-আপনি কি আমার ইন্টারভিউ নিতে আসছেন?

– না না। তা হবে কেনো। আপনি কিছু মনে করে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।

আসলে আপনি সবসময় একরম নিরব নিস্তব্ধই থাকেন।

আমি খেয়াল করলাম তেমন একটা হাসেন ও না । খুব গম্ভীর প্রকৃতির ।

-আমার নিরবতাই ভালো লাগে। আর তাই নিজের ভালো লাগাটাকেই প্রাধান্য দিয়ে চলি।

এমনসময় বিশালের ফোনটা বেজে উঠলো,

-হ্যালো বাবা।

-কোথায় তুমি ? বাসায় আসো এখন।একটা কাজ আছে।

-ওকে বাবা। আমি আসছি।

বিশাল বসা থেকে উঠে পড়লো।

-আচ্ছা এখন যাই। বাবা ফোন করেছে।

-ঠিক আছে। আসুন।

-বাই।

বিশাল আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়লো।

রাস্তার পাশ ধরে বিশাল হাঁটছে আর মনে মনে ভাবতেছে।

কি অদ্ভুত একটা ছেলে। মুখে কখনো এক চিলতে হাসিও ফোটেনা কখনো। সবসময় কি যেনো একটা ভাবে। মনে হয় রেনো ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে।

১০

হাতে বীনায় সুর তুলে গগন ধরনী দুলানো একটা রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে যাচ্ছিল। গান গাওয়াবস্থায় গগন তার নিজের মধ্যে হারিয়ে যায় । ডুবে থাকে অন্য এক সুরের জগতে। চোখ বুঝে হৃদয়ের সবটুকু আবেগমিশ্রিত কন্ঠে গান ধরে। ।হতবুদ্ধি হীন ভাবে গান গেয়ে যায় গগন। আর আশ্রমের শিশুগুলো একমনে একধ্যানে বসে গগনের গাওয়া গান শ্রবন করতে থাকে।

চোখ বুজে গগন গান গেয়ে যাচ্ছিলো ,

হঠাত বাচ্চাদের কলকলানি হাসির শব্দ ভেসে আসে গগনের কানে।

একি আজব কান্ড !

হাসছে কেনো এগুলো।

বলেই চোখ খুলে গগন। একি। বিশালও পুরো বাচ্চাদের মতো করে বসে আছে। দেখতেও বাচ্চাদের মতোই লাগছে। আর সব বাচ্চা গুলো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে গগনকে দেখার পর একটা ম্লান হাসি দেয় বিশাল।

কি অপূর্ব এক হাসি!

হাসিটাই নাকি একটা মানুষের সৌন্দর্যের পরিচায়ক। অদ্ভুত মিষ্টি একটা আবেগ জরিয়ে গগন বলতে থাকে,

-আপনি? এখানে !

-গান শুনতে চলে এলাম। শুনাবেন না মনে হয়।থেমে গেলেন যে।

গগন বিশালের দিখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে

আবারও গানে সুর তুলে।

“আমারও পরানো যাহা চায়, তুমি তাই , তুমি তাই গো। আমারও পরানো যাহা চায়।”

গান গাওয়া শেষে হাত থেকে গগন বীনাটা নামিয়ে নেয়। সবাই নিশ্চুপ কারো মুখে কোনও কথা নেই। একদৃষ্টিতে সবাই তাকিয়ে আছে গগনের দিকে।কেমন একটা থমথমে পরিবেশ যেনো আচমকাই পেয়ে বসল প্রকৃতিতে। তারাও যেনো গগনের গান শুনে থেমে গেছে। বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।

বিশালের চোখ গুলো কেমন জানি ছলছল করছে। ঝুম বৃষ্টি পড়ার পূর্ব মুহূর্তে ঠিক যেমন স্তব্ধতা গ্রাস করে নেয় পরিবেশকে ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে। বিশালের চোখ দিয়ে মনে হয় এখনই বৃষ্টি নেমে যাবে।

কিন্তু আটকে রাখার ক্ষমতা হয়তো তার আছে।

-আপনার গান শুনতে শুনতে সত্যিই যেনো কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম।

কি অপূর্ব ! মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। ভুলেই গেছিলাম যে আমি ভুলোকে আছে নাকি স্বর্গলোকে।

-আপনি তো খুব প্রশংসা করতে জানেন । তবে সঠিক জায়গায় করছেন না মনে হয়।যেভাবে বলছেন মনে হয় বিশ্বজয় করে ফেললাম।

-আপনি মানবেন না। তাই তো? আচ্ছা থাক। প্রশংসা করেও বুঝানো যাবেনা।

ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে বিশাল সৈকতের জন্য অপেক্ষা করছিলো। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর গগন ভাবতে লাগলো , কি যে ছেলেটা। কখন থেকে দাড়িয়ে আছি। বলল কিনা তুই এগো আমি আসছি। আর এখন পর্যন্ত তার কোনও নাম গন্ধও নেই । গগন আশ্রমের পথে হাঁটা শুরু করলো।

বিশাল গগনকে পিছন থেকে ডেকে দাড় করালো,

-এই যে ।প্লীজ একটু দাড়াবেন। একসাথেই যেতে পারবো।

দ্রুত গতিতে এসে গগনের কাছে দাড়ালো বিশাল।

-অবশ্যই চলুন।

সামনের দিকে দুজন এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে।

-আচ্ছা বিকেলের দিকে একটু ফ্রি হবেন।

-কোনো? কোন কাজ আছে বুঝি?

-না এমনি।

-আমি বিকেলে অবসরই থাকি।

-ওকে। আমি বিকেলের দিকে আশ্রমে আসবো।

-কেনো? আশ্রম কি আপনার ভালো লাগে?

-হয়তো। বিশেষ কোন ওযরেই হয়তো ভাল লাগে।

গনন বিশালের দিকে মুখ করে তাকালো।

-না মানে লতাকে দেখার জন্য এই আরকি।

-কিন্তু লতা তো এখন পুরোপুরি সুস্থ।

গগনের চোখদুটো যেনো কিরকম একটা দুষ্টু হাসিতে ফুটে উঠলো।

বিশাল আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিলো।গগন থামিয়ে দিলো।

– আমি সত্যিই খুব বোকা।আসলে অসুস্থ থাকলেই কি কেউ কাউকে দেখতে যায় ? টান বলেও তো কিছু আছে ।

না, যেতেই পারেন। আর যাবেনও। সমস্যা নেই।

-ধন্যবাদ।

কথা বলতে বলতে গগন আশ্রমের নিকট পৌছে গেলো।

-আচ্ছা আজ আসি তাহলে।দেখা হবে ভালো থাকবেন।

-বাই।

১১

হাতে একটি গিফ্ট বক্সের মতো কি যেনো নিয়ে বিশাল আশ্রমে এসে প্রবেশ করলো।গগন গোসল সেরে ছাদে কাপড় শুকাতে দিচ্ছিলো।বিশালকে দেখার পর ইশারায় ছাদে আসতে ইঙ্গিত দিলো গগন।

বিশাল ছাদে এসে দাড়িয়ে পড়লো। বিশাল নির্বাক দৃষ্টিতে গগনের দিকে তাকিয়ে আছে।ভেজা চুলে গগনকে দেবদূতের মতো লাগছে । চিকচিক পানি জমে আছে মুখটায়।

চোখের পাপড়ি ,ঠোট , সবকিছু কেমন একটা নেশা ধরানো।

এক দৃষ্টিতে শব্দহীন ভাবে তাকিয়ে আছে গগনের দিকে বিশাল।

নীরবতা ভেঙে গগনই বলতে শুরু করলো।

-আপনার হাতে ওটা কি?গিফ্ট বক্স মনে হচ্ছে।

-হ্যাঁ।

-কাকে গিফ্ট করবেন।গার্লফ্রেন্ডকে?

বিশালের চোখগুলো কেমন একটা তীক্ষ্ম দৃষ্টির হয়ে গেলো।

-না।গার্লফ্রেন্ড নেই।আসলে আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমার থেকে এই ছোট্ট উপহারটা গ্রহন করুন।এটা আপনার জন্যই এনেছি।

– আমার জন্য !!

দুঃখিত।আমি নিতে পারছিনা।আপনার থেকে আমি কেনো উপহার গ্রহণ করবো। আর তাছাড়া আপনিই বা আমাকে কিছু দিতে যাবেন কেনো?

-প্লীজ এভাবে বলবেন না।আপনি এটা গ্রহন করলে খুব খুশি হবো।প্লীজ এভাবে ফিরিয়ে দেবেন না।

-আসলে আমি খুব অবাক হচ্ছি আপনার কাজ কারবার দেখে।যে কেউ এসে আমাকে কিছু একটা দিতে চাইবে, আর আমাকেও তা সাদরে গ্রহন করতে হবে!

বিশাল চুপ করে আছে।কিছু বলার ভাষাটাই তো গগন বন্ধ করে দিয়েছে।

-আচ্ছা ঠিক আছে।আমারই ভুল হয়েছে। আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এভাবে কিছু দিতে যাওয়া।কিছু মনে করবেন না।

বিশাল ছাদ থেকে নেমে আসতে গিয়ে সেলিম মুন্সির চোখে চোখ পড়ে গেলো।

-আরে বাবা তুমি।কখন এলে।চলে যাচ্ছো যে। বসো।

-না আংকেল।আরেকদিন আসবো। এখন যাই।বলেই বিশাল নেমে গেলো।গেলো সেলিম মুন্সি ছাদে উঠে গগনের সামনে এসে দাড়লো।

-এটা তুই কি করলি গগন? আমি তোদের সবকথাই শুনলাম।ও তোকে একটা কিছু খুশি হয়ে দিতে চাচ্ছে , আর তুই সেটা ফিরিয়ে দিলি।তুই কি দিন দিন বোকা হয়ে যাচ্ছিস নাকি মনুষত্ববোধ হারিয়ে ফেলছিস ঠিক বুঝতে পারছিনা।বিশাল তোকে বন্ধুর মতো ভাবে আর তাই বন্ধু হয়ে বন্ধুকে কিছু দিতেই পারে।তুইই দেখ, এই জায়গায় যদি তুই থাকতি তাহলে তোর কিরকম লাগতো?

-বাবা আসলে আমি তার থেকে নিতে চাইনি আর সেরকম করে ভাবিওনি।

-গগন আমার মনে হলো যে কাজটা তুমি ভালো করোনি।তার সাথে তুমি ব্যবহারটাও কেমন জানি রুক্ষস্বরে করলে।

-বাবা ?

-হ্যাঁ গগন।তোমার সত্যিই ভুল হয়েছে।

আশা করি শুধরে নেবে।

সেলিম মুন্সি ছাদ থেকে নেমে গেলো।

পাশের বেঞ্চিতে গিয়ে বসে পড়লো গগন।

সত্যিই তো।আমি সত্যিই খুব ভুল করেছি।বিশালের মনে আঘাত করে ফেলেছি।

গগন নিচে নেমে এসে বাবার ফোনটা হাতে নিলো।কল লিস্টে গিয়ে বিশালের নাম্বার খুজতে লাগলো। দুদিন আগে কল এসেছিলো নাম্বারটা পাওয়া যায় কিনা চিন্তায় হতভম্ব হয়ে খুজতে লাগলো গগন।

হঠাত্ পেয়েও গেলো একটা নাম্বার । বিশালেরই মনে হলো।কল দিলো। কিন্তু নাম্বার বন্ধ।আবারও দিলো , কিন্তু একই কথা শোনাচ্ছে “আপনি যে নাম্বারে ফোন করেছেন তা এই মুহূর্তে বন্ধ আছে। কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন। ধন্যবাদ।”

ইচ্ছে করছে মোবাইলটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলি।

গগন এমনিতে কখনো রাগ করেনা রাগ হয়ও না।তেমন কোনও কারণও থাকেনা। কিন্তু আজ রাগের উত্তাপে মনে হচ্ছে গগনের চোখ মুখ ফেটে রক্ত বেরোবে।

গগন মোবাইলটা রেখে বিশালের বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো।

বিশালদের বাসার সামনে এসে কলিং বেলে চাপ দিলো গগন।দুবার চাপার পরেও দরজা খুলছেনা কেউ।তৃতীয় বার চাপতে যাবে ভেতর থেকে এক ভদ্র মহিলা এসে দরজা খুলে দিলো।এক ঝটকা বাতাস এসে গগনের অধরে পরশ বুলিয়ে গেলো।

মহিলার চোখের ভাষাটা যেনো গগনেরই। এক্ই সূত্রে গাথাঁ মনে হচ্ছে।গগন মহিলার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।মহিলা গলায় আওয়াজ এনে বললো

-কাকে চাই?

গগন স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে,

-স্লামুআলাইকুম।

-ওয়ালাইকুমুস্সালাম।

-এটা কি বিশালের বাসা।বিশাল কি এখানেই থাকে?

-হুম। বিশাল এখানেই থাকে।কিন্তু তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না। বিশালের বন্ধু?

গগনের গলায় স্বরগুলো যেনো আটকে যাচ্ছে।যার ফলে কথার উত্তরও দিতে পারছেনা।কিছুক্ষণ আগেও যাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলো আর এখন তাকে বন্ধু ভাবতে হচ্ছে।

-জ্বী। জ্বী আন্টি।আমি বিশালের বন্ধু ‘গগন’।বিশাল কি বাসায় আছে?

-না নেই তো।বিশাল তো বেশকিছুক্ষণ আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখনোও ফিরেনি।আর আমি কেমন বোকা দেখো, বাহিরেই দাড় করিয়ে রাখছি।ভিতরে এসো ভিতরে এসো।

-না না আন্টি।এখন আমাকে যেতে হচ্ছে।

বিশাল আসলে বলবেন আমার কথা প্লীজ।

কোথায় গেলো কে জানে।এমন অদ্ভুত ছেলে আর একটাও দেখিনি।এসব ভাবতে গগন রাস্তার পাশ ধরে ঘাড় নুইয়ে হাটছিলো।সৈকত পিছন থেকে ডাক দিয়ে থামিয়ে দিলো।

-কিরে , কোথায় গিয়েছিলি?

কেমন একটা নরম স্বরে গগন বলতে লাগলো,

-না কোথাও না এখানেই।

-এখানেই তো দেখছি।এই এখানেই কোথা থেকে এলি?

গগন চুপ করে আছে।কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছেনা সে।

– কিরে চুপ করে আছিস যে।বলবিনা তাই তো?

গগন ভাবল সত্যটা বলাই শ্রেয়।আর সৈকত তো আমার সবচাইতে ভালো বন্ধু ওর কাছে বলবোনা তো আর কার সাথে বলতে পারি।

-আসলে তোকে বলা হয়নি সৈকত।

গগন সৈকতকে সব খুলে বলল।

সৈকত একটা দুষ্টুমি মাখা হাসি দিয়ে বলতে লাগলো।

-সাহেব ভালোই তো বন্ধু পেয়ে গেলেন। যে কিনা দুদিন না হতেই গিফ্ট দিতে চাইছে।আমাদেরই কপাল মন্দ।

কানের কাছে এসে সৈকত আস্তে আস্তে বলতে লাগলো।

-শুধু বন্ধুই?নাকি অন্যকিছু ?

গগন সৈকতের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলো।

-কি? অন্যকিছু মানে?অন্যকিছু আবার কি হতে যাবে? তুই সবসময় বাড়িয়েই ভাবিস।আর আমি তো ওকে খুব একটা অপমান করে ফেলেছি রে। ছেলেটা সত্যিই খুব ভালো। সেই প্রথমদিন থেকেই ছেলেটাকে চিনে নিতে চাইছিলাম।

-সত্যি কথা বলতে কি ছেলেটাকে ফিরিয়ে দেওয়া তোর উচিত হয়নি।

আচ্ছা বাই দা ওয়ে সময় করে সরি বলে নিস। যাই এখন ।

-কোথায় যাবি এখন? বাসায় ?

-না। একটু কাজ আছে মার্কেটের দিকে যাবো। তুই যা।

-ঠিক আছে। কিন্তু তুই তো….

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো গগন। কিন্তু সৈকত কেমন জানি দ্রুত গতিতে সে জায়গাটা ত্যাগ করলো। কিছুই বুঝতে পারলোনা গগন। সৈকত তো এখন বাড়ি যাওয়ার কথা। আর মার্কেটেই বা ওর কি কাজ। আমাকে তো নিশ্চয়ই বলতো। আর ওতো আমার জন্য হলেও বাকি পথটা কথা বলতে বলতে হেঁটে যেতো। কে জানে কি হলো। সব ভাবনা ঝেরে ফেলে দিয়ে গগন একটা পার্কে গিয়ে বসে পড়ে।

পার্কে ঢুকার পরই গগন বিশালকে দেখতে পায়। একটা বেঞ্চে বসে আসে। গগন ধীর গতিতে বিশালের দিকে এগিয়ে যায় । বিশাল গগনকে দেখার পর দাড়িয়ে যায় । বিশাল গগনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে।

-আপনি? এখানে?

-হুম। আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম।পাইনি আর তাই আপনাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এলাম।

-আমাকে? সত্যিই অবিশ্বাস্য । আমাকে কেনো খুজছেন শুনি?

-আপনার সাথে সত্যিই খুব দুর্ব্যবহার করেছি। আমাকে মন থেকে ক্ষমা করে দেবেন।

-একি বলছেন? ভুলটা আমারই….

গগন বিশালকে থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো,

-নো সিমপ্যাথি। আমি জানি আপনি কি বলবেন। তবে আর কোন কথা নয়। আমি জানি প্রকৃত ভুলটা কার। আর সেসব বাদ দিন। আমার গিফ্টটা কোথায়, দিন।

বিশালের মলিন মুখটায় খুশির একটা হাসি ফুটে উঠলো।বিশাল গগনের হাতে গিফ্ট বক্সটা বাড়িয়ে দিল। গগন বিশালের হাত থেকে একরকম ঝাপ মেরেই নিয়ে নিলো। নিয়ে ঝটপট খুলতে লাগলো।

খুলার পর গগনের চোখ তো প্রায় কপালে ঠেকার মতো অবস্থা । কি দামি একটা স্মার্ট ফোন।আর সেটা কিনা বিশাল গগনের জন্য নিয়ে এসেছে।

গগন ভাবতে লাগলো,

কি চায় এই ছেলেটা। সেই প্রথম থেকে দেখে আসছি ছেলেটা আমাকে ফলো করে। কেমন একটা কবি কবি ভাব ছেলেটার মধ্যে । আর কদিনেরই বা পরিচয় আমাদের। আর এখনই এতো দামি একটা জিনিস আমাকে সে উপহার দিলো।

গগন বলতে শুরু করলো,

-এতো দামি মোবাইল আমার জন্য ?

-দাম দিয়ে বন্ধুত্ব হয়না। আমি আপনাকে এটা গিফ্ট হিসেবেই দিয়েছি।

-আচ্ছা বন্ধুই যখন ভাবেন, তাহলে আপনি করে বলাটা কি ঠিক হচ্ছে ?

-ঠিক না ভুল জানি না। তবে সেটা তো আপনিও করছেন।

-হুম। কথা ঘুরাতে ভালোই জানেন দেখছি। ওকে। আমি তুমি করেই বলবো।

সেদিনকার মতো ওখান থেকেই গগন আর বিশালের কথোপকথন শেষ হয়

১২

বিশালের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধন দিন থেকে দিন আরো গভীর হতে লাগলো। গগনের অনেক আপন হয়ে গেছে বিশাল।তাদের বন্ধন যেনো বন্ধুত্বের চেয়েও অনেক বড়কিছু। বিকেলের দিকে গগন গান গায় আর বিশাল মন্ত্রমুগ্ধের মতো গগনের গান শ্রবণ করে। এভাবেই কেটে যেতে থাকে গগনের দিনগুলো । নীরবতার ছায়াটা অনেকটাই কেটে গেছে গগনের জীবন থেকে।

বিশাল গগনকে ফোন করে শপিং মলে যাওয়ার জন্য ।

-হ্যালো গগন? আজ একটু বিকেলের দিকে একটু বেরোব। তুমি ফ্রি আছো তো?

-হুম। আমি ফ্রি থাকবো।

-আচ্ছা এখন রাখি। বিকেলে দেখা হচ্ছে তাহলে।

-হুম। বাই।

বিকেলে গগন তার বাবার কাছ থেকে বলে বেরিয়ে যায় ।

সেলিম মুন্সি গগনের গমন পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দুচোখ বেয়ে সেলিম মুন্সির কেনো জানি চোখের জল বেরিয়ে আসলো।

গগন আর বিশাল শপিং শেষে বাসায় ফেরার পথে সৈকতকে দেখতে পায়। বিশাল আর গগনকে একই রিকশায় চড়ে যেতে দেখে সৈকত কেমন জানি হয়ে গেলো। গগন সৈকতকে ডাকল কিন্তু সৈকত না শুনার ভান করে তাদের এড়িয়ে গেলো।

কাল বিশালের জন্মদিন । গগন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। কখন ১২:১ বাজবে। আর কখন বিশালকে উইস করবে। বিশাল গগনের হৃদয়ে অনেকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে ভালবাসা দিয়ে । যা চাইলেও গগন তার নিজের আয়ত্তে রাখতে পারবে না।

১২:১ মিনিটে গগন বিশালকে ফোন করে।

-হ্যালো বিশাল। আমি গগন।

কেমন একটা প্রত্যাশিত

কন্ঠে বিশাল বলতে লাগলো। যেনো গগনের ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলো ।

-গগন তুমি। এতো রাতে ফোন করেছো? কেনো কোন প্রবলেম হয়েছে?

-আরে বোকা না। “হ্যাপি বার্থডে” বিশাল।

বিশাল যেনো খুশিতে দিশেহারা হয়ে পড়ার মতো অবস্থা।

-আমি জানতাম গগন। আমার জন্মদিনের কথা তুমি কখনোই ভুলবেনা।আর আমাকেও। আর তাই আমি সারাজীবনের জন্য তোমাকে আমার করে রাখতে চাই।

-মানে? এসব কি বলছো?

বিশাল লজ্জায় আতকে উঠলো।

-না না। কিছু না । মানি সারাজীবন তো তুমি আমার ভালো বন্ধু হয়েই থাকবে। তাই না। সেটাই বলছিলাম।

-অহ।

-আচ্ছা গগন এখন রাখি

ঘুমোও। কাল তোমাকে নিয়ে অনেক জায়গা ঘুরবো। তৈরি থেকো। আর আমার জন্মদিনে বাবা পার্টি দিচ্ছে । তুমি আর তোমার বাবাকে সবার আগেই থাকতে হবে।

-কিন্তু বিশাল। বাবা যদি যেতে না চায়।

-কোনও কিন্তু নয়।

ওকে। আমি গিয়ে আংকেলকে নিয়ে আসবো। ওকে?

-হুম। ওকে।

-আচ্ছা এখন রাখি। গুড নাইট।

-গুড নাইট।

ফোন রেখে গগন ধপাত করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো।

আজ অনেক খুশি লাগছে গগনের। পৃথিবীতে কোন দিনও হয়তো এরকম অনুভূতি হয়নি। বিশাল কি বলতে যাচ্ছিলো সেটা খুব ভালো করেই গগন বুঝে গেছে।

ইশ! বলেই ফেলতো কথাটা। কেনো যে ওকে

আটকাতে গেলাম। বিশালের প্রতি এখন আর শুধু বন্ধুত্বের বন্ধনই নয়। অনেক বড় একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে তারা।

যা মুখ ফুটে কেউ কাউকে এখনো বলে নি। আর অন্যদিকে বিশাল আগামী সূর্যদয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। তার হৃদয়ে জমিয়ে রাখা সবটুকু আবেগ সবটুকু ভালবাসা গগনকে সপে দিতে।

আর বলারই বা প্রয়োজন কিসের। যদি চোখ দেখেই সব বুঝে নেওয়া যায় । আর এটাই তো সত্যিকারের ভালবাসা ।যেখানে মুখ ফুটে কিছু বলতে হয়না।

চোখে চোখে সব কথা হয়ে যায় । গগন এখন আর সেরকম নীরব নিস্তব্ধ থাকেনা। বিশাল গগনকে সবসময়ই হাসি খুশি রেখেছে। কখনো গগনের মুখটা মলিন দেখলে বিশাল গগনের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলেছে। সেটা আর যা কিছুর বিনিময়েই হউক না কেনো।

কিন্তু এই নামহীন সম্পর্কটাই যদি গগনকে চিরজীবনের জন্য চিরস্থায়ী ভাবে স্তব্ধ করে দেয়।

১৩

সকালে গগন তার বাবার ঘরে যায় । গগন তার বাবাকে খুব ভালবাসে আর সেই সাথে শ্রদ্ধাও। আর তাই কোথাও বেরোলে গগন তার বাবার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার পরই ।

গগন তার বাবার ঘরে যায়। বাবাকে বলেই বেরোতে হবে যে । কিন্তু বাবা যে ঘরে নেই। কোথায় গেলো কে জানে?

আর ওদিকে বিশালও তাড়া দিচ্ছে ।

গগন ঘর থেকে বেরোতে যাবে আর ঠিক তখনই দেখতে পেলো বাবার ওয়ারড্রবের একটা ড্রয়ার খুলা। আর সেই সাথে চাবি লাগানো। আশ্রমের সব দায়িত্ব বাবার উপর থাকাতে আশ্রমের সব ক্যাশ বাবার কাছেই গচ্ছিত।

আর বাবা যে কেমন ভুলোমনা বলেই গগন ড্রয়ার থেকে চাবিটা খুলতে যায়।

ড্রয়ারের ভেতর গগন দেখতে পেলো একটা পুরনো ছবির এলবাম। অনেক পুরনো মনে হচ্ছে । কিছু বুঝাও যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর গগন এলবামটা হাতে নেয়।একটা ছবিতে গগনের চোখ আটকে যায় ।

কে এই লোকটা? নিজেকে গগন প্রশ্ন করতে থাকে।বুঝতে কষ্ট হচ্ছে তবে মনে হচ্ছে বাবার ছবি। যুবক বয়সের ছবি মনে হচ্ছে।গগন পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ছবি গুলো দেখে যাচ্ছে।বাবার সাথে এই পুরুষ মানুষটা কে ? বাবার কাঁধে হাত রেখে দাড়িয়ে আছে।বাবাকে সবসময় চোখের সামনে থাকে বলেই বাবাকে চিনে নিতে কষ্ট হয়নি।কিন্তু এই লোকটাকে কখনো দেখিনি মনে হচ্ছে।এরই মধ্যে গগনের ফোনটা বেজে উঠে ।

সেই কখন থেকে বিশাল ফোন দিয়েই যাচ্ছে।গগন ঝটপট করে ড্রয়ারে এলবামটা রেখে তালা মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

বিশাল একটি রিকশা ডেকে উঠে পড়ে গগনকে নিয়ে।ঢাকার সব অলিগলি বিশালের হাত ধরে গগন ঘুরতে থাকে ।

রাস্তার ধারে ফুচকা খাওয়া থেকে শুরু করে টিএসসিতে বার্গার খাওয়াও বাদ যায় নি। অনেক শপিং ও করেছে দুজন।

বিশাল আর গগন একটা রেস্টুরেন্টে এসে উঠলো।

বিশাল গগনকে খাবার অর্ডার দিতে বলে।

ওয়েটার এসে আদেশকৃত মেনুসমূহ দিয়ে যায়।

এরই মধ্যে বিশালের বাবার ফোন আসে।

-হ্যালো বাবা।

-হ্যাঁ বিশাল । তুমি কোথায় ?

-বাবা আমি পূরান ঢাকায় আছি।

-ও তাহলে তো কাছেই আছো।

-হ্যাঁ বাবা। কোন প্রবলেম?

-বিশাল তুমি একটু আমার অফিসে আসতে পারবে?

-আসছি বাবা।

বলেই ফোনটা রেখে দেয় বিশাল।

বিশাল যেখানে আছে সেখান থেকে তার বাবার অফিস খানিকটা পথ।

বিশাল গগনকে বলতে লাগলো,

-গগন তুমি জাস্ট দু মিনিট বসো। আমি এখনই আসছি।

-কোথায় যাবে এখন?

-বাবা ফোন করেছিলো। আমি এখনই ফিরে আসবো।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

-ওকে। তুমি খাও । আমি আসছি।

বিশাল চলে যাওয়ার ঠিক পরেই সৈকত এসে উঠে রেস্টুরেন্টে।

গগন ডেকে এনে বিশালকে বসায় তার সাথে। সৈকতের সাথে কথা বলতে বলতেই বিশাল ফিরে আসে।

-বিশাল।আরে সৈকত।কখন এলে?

ভালোই হলো।মন খুলে আড্ডা দেওয়া যাবে সবাই মিলে।

সৈকত চলে যাওয়ার জন্য মোড়ামুড়ি করতে লাগলো। কিন্তু গগনের চাপে সৈকতকেও তাদের সাথে যোগ দিতে হলো।খাওয়া শেষে সবাই রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়ে।বিশাল সৈকতকেও তার জন্মদিনে আসতে বলে। কিন্তু সৈকতের কি একটা কাজ থাকার ফলে সে থাকতে পারছেনা।

১৪

আজ সন্ধ্যায় বিশালের জন্মদিনের পার্টি। আর তাই কিছু একটা দিতে হবে বিশালকে।

আর তাই গগন আশ্রমের ছোট্ট বাগান থেকে সবরকমের ফুল দিয়ে একটা তোড়া বানাচ্ছে।যা গগনের সবথেকে পছন্দের জিনিস।

-গগন। এই গগন।

গগনকে ডাকতে থাকে সৈকত।

-কি রে?তুই।হঠাত্ এখানে?

– কি করছিস গগন?

-দেখতেই তো পাচ্ছিস।

-কি করবি এগুলো দিয়ে?

-বিশালকে দেবো।

বিশালের নামটা শুনতেই সৈকত কেমন জানি চুপ হয়ে গেলো। তবুও কিছু বলতে চেষ্টা করলো।

-শুধু ফুলই দিবি। আর কিছু দিবি না।

গগন কিছুটা অবাক হয়ে

-আর কি দিবো? ও… হ্যাঁ । আছে। খুব মূল্যবান একটা জিনিসই হয়তো দিতে পারি।

-কি?

-বলা যাবে না? ঠিক আছে বলিস না।

-তবে তোকে কিছু বলার ছিলো।

গগন গাছ থেকে ফুল পাড়াতেই ব্যস্ত । তার সবটুকু ধ্যান ধারনা এখন একটা কাজের দিকেই ঝুঁকে আছে। মুখে মুখে সৈকতের কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ।

-এখন নয়। দেখতেই তো পাচ্ছিস। পরে সময় করে বলিস প্লীজ।

-ওকে। ঠিক আছে। আমি কাল আসবো।

সৈকত পিছন ফিরে চলে যাচ্ছিলো।

কি যেনো মনে করে আবার ফিরে এলো।

-এই গগন। শুন শুন।

আগের মতোই গগন ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত।

-বল।

-আচ্ছা গগন তোর আর বিশালের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কিসের বলবি আমাকে?

-মানে। আজব তো। তুই কি আমাকে সন্দেহ করছিস?

-না এমনি।

-তবে হঠাত্ এই প্রশ্ন ?আর বিশাল আপাতত আমার খুব ভাল বন্ধু ।

ছন্দের জিনিস।

-গগন। এই গগন।

গগনকে ডাকতে থাকে সৈকত।

-কি রে?তুই।হঠাত্ এখানে?

– কি করছিস গগন?

-দেখতেই তো পাচ্ছিস।

-কি করবি এগুলো দিয়ে?

-বিশালকে দেবো।

বিশালের নামটা শুনতেই সৈকত কেমন জানি চুপ হয়ে গেলো। তবুও কিছু বলতে চেষ্টা করলো।

-শুধু ফুলই দিবি। আর কিছু দিবি না।

গগন কিছুটা অবাক হয়ে

-আর কি দিবো? ও… হ্যাঁ । আছে। খুব মূল্যবান একটা জিনিসই হয়তো দিতে পারি।

-কি?

-বলা যাবে না? ঠিক আছে বলিস না।

-তবে তোকে কিছু বলার ছিলো।

গগন গাছ থেকে ফুল পাড়াতেই ব্যস্ত । তার সবটুকু ধ্যান ধারনা এখন একটা কাজের দিকেই ঝুঁকে আছে। মুখে মুখে সৈকতের কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ।

-এখন নয়। দেখতেই তো পাচ্ছিস। পরে সময় করে বলিস প্লীজ।

-ওকে। ঠিক আছে। আমি কাল আসবো।

সৈকত পিছন ফিরে চলে যাচ্ছিলো।

কি যেনো মনে করে আবার ফিরে এলো।

-এই গগন। শুন শুন।

আগের মতোই গগন ফুল সংগ্রহে ব্যস্ত।

-বল।

-আচ্ছা গগন তোর আর বিশালের মধ্যে সম্পর্কটা ঠিক কিসের বলবি আমাকে?

-মানে। আজব তো। তুই কি আমাকে সন্দেহ করছিস?

-না এমনি।

-তবে হঠাত্ এই প্রশ্ন ?আর বিশাল আপাতত আমার খুব ভাল বন্ধু ।

১৫

-হ্যালো গগন।

-হ্যাঁ বলো বিশাল।

-আসছো না কেনো? অনুষ্ঠান তো প্রায় শুরু হয়ে গেলো।

-বিশাল বাবা যেতে চাইছেনা।

-কেনো? আচ্ছা দাড়াও।আমি আসছি।

দুমিনিটের মধ্যেই বিশাল আশ্রমে এসে উপস্থিত হয়।

-কি হলো আংকেল। আপনাকে তো আমি আগেই বলে রেখেছি। যে আপনাকে যেতেই হবে।

-না বাবা। আমার শরীরটা তেমন একটা ভালো নেই। আর ভালো ও লাগছেনা।

তুমি গগনকে নিয়ে যাওনা। তোমার দেরি করা উচিত হচ্ছে না। যাও বাবা।

-ওকে আংকেল।আমি আপনাকে জোর করবোনা।

বিশালকে নিয়ে গগন বেরিয়ে পড়লো।

বাড়ি ভর্তি কতো লোক।

বিশালের বাবার অফিস থেকে তার মায়ের পুরনো সব আত্মীয় । সব ধরনের লোকদের সম্মিলিত অবস্থান বিশালদের বাসায়।

গগন বিশালের পাশ ধরে বাসায় ঢুকছে আর চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে । কি সুন্দর করে সাজিয়েছে সমস্ত বাড়িটা। রঙ বেরঙের বেলুন দিয়ে ভরে তুলেছে পুরো ফ্ল্যাট।

ফু দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই করতালির আওয়াজে মুখরিত হতে লাগলো।

কেক কাটার পর বিশাল তার বাবা মা-কে কেক খাইয়ে দিলো নিজের হাতে। গগনকেও খাইয়ে দেয়।

কিন্তু গগনের চোখ যেনো কিছুক্ষণ ধরে কোথায় আটকে আছে। একটা লোকের দিকে গগন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেমন জানি চেনা চেনা লাগছে। কোথাও দেখেছি মনে হচ্ছে ।

গগনের এমন নির্বাকতা দেখে বিশাল গগনের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতে লাগলো।

-গগন ! এই গগন।

স্তম্ভিত ফিরে পেয়ে গগন স্বাভাবিকতায় ফিরে এলো।

– হ্যাঁ । কি হয়েছে।

– আমার না। তোমার । কি হয়েছে। এভাবে ওদিকে কি দেখছো?

-আচ্ছা বিশাল। ওই লোকটা কে?

-কোন লোকটা? ও… ওহ হো। তোমার সাথে তো পরিচয় করিয়ে দিতেই ভুলে গেছি। চলো।

বিশাল গগনকে তার বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে আসলো।

-বাবা। এ হলো গগন। আমার খুব ভালো বন্ধু । আমরা এক সাথেই পড়ি।

গগন হাত তুলে সালাম দিলো।

-স্লামুআলাইকম আংকেল।

-ওয়ালাইকুমুস্সালাম .. তুমি গগন।

বিশালের মুখ থেকে তোমার সব কথাই শুনেছি।

-তাহলে তো আমার আর কিছুই বলার থাকলোনা।

বলেই হেসে উঠলো তিনজন।

গগন কেমন জানি নীরব হয়ে আছে। কি যেনো একটা ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । বিশালের হাত ধরে গগন বিশালদের ফ্ল্যাট টা দেখিয়ে দিচ্ছে । কিন্তু গগনের সেদিকে কোন রেসপন্স নেই। একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে মনে হচ্ছে ।

বিশাল গগনের এমন নিস্তব্ধতা দেখে গগনকে প্রশ্ন করতে লাগলো।

-আচ্ছা তোমার কি হয়েছে বলো তো।

-কই? কিছু না তো।

-হুম। দেখতেই পাচ্ছি। আচ্ছা তুমি বাবার কথা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছিলে না?

কেনো। কি হয়েছিলো। বলো আমাকে।

-না মানে। বিশাল আমার তো তোমার বাবার সাথে কখনোই দেখা হয়নি। আর আমি তেমন বাহিরে ঘুরা ফিরাও করিনা। যে তোমার বাবার সামনে পড়বো। আর তা ছাড়া তোমার বাবার সাথে তো আমার আজকেই পরিচয় হলো।

– হ্যাঁ তো। কি হয়েছে।

-কিন্তু তোমার বাবাকে আমার কেনো জানি পরিচিত মনে হচ্ছে । যেনো আগে কোথাও দেখেছি।

-দেখতেই পারো। হয়তো কখনো কোথাও দেখেছো। যা তোমার মনে পড়ছে না।

-কিন্তু গগন…..

-তুমি থামো তো।এতো ভাবলে পাগল হয়ে যাবে তো।আমার উপহার কই? তুমি না বলেছিলে আজ আমাকে কি যেনো দিবে তোমার হাতে যা তৈরি।

-ও.. হ্যাঁ । ভুলেই গেছি প্রায়।চলো। আশ্রমে আছে সেই জিনিসটা।

-হুম চলো তাহলে।

খুব বড় মনে হচ্ছে আজকের চাঁদ টাকে। খুব।

আর জোছনার ঝলকও যেনো অন্য সবদিনের আলোর চাইতেও বেশি। হয়তো গগন আর বিশালের ভালবাসাকে বরণ করার জন্যই চাঁদের এই পরিবর্তন।

আশ্রমের ছাদে উঠে গগন তার নিজ হাতে গড়া পুষ্প সুরভে সজ্জিত তোড়াটা বিশালের হাতে তুলে দেয়।

-“হ্যাপি বার্থডে” বিশাল

বিশাল পরম আনন্দে গগনের হাত থেকে গ্রহণ করে তোড়াটা।

চুপ করে আছে দুজন।দুজনই কিছু বলার জন্য উৎসুক হয়ে আছে।

কিন্তু কেউ কাউকে কিচ্ছু বলতে পারছেনা। নিরবতা ভেঙে বিশালই বলতে শুরু করলো।

– শুধু এটুকুই? আর কিছু বলার নেই।

গগন মাথা ঝুকে আছে।

বিশাল পকেট থেকে একটা হিরের আংটি বের করে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে গগনের সামনে।চাঁদের জোছনায় আংটিটা চিক চিক করে জলছিলো।

গগনের কোমল হাতটা কাছে টেনে আনে। আংটিটা পড়িয়ে দিয়ে বিশাল তার হৃদয়ের আবেগ-আকাঙ্ক্ষা, বালোবাসা সবটুকু গগনকে সপে দেয়।আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বিশাল বলতে থাকে

-“আই লাভ ইউ” গগন।আমি তোমাকে আমার জীবনের চাইতেও অনেক বেশি ভালবাসি।

আমি তোমাকে সারাজীবন আমার করে পেতে চাই। থাকবে তো আমার হয়ে ?

গগন চুপ করে আছে। মুখ যেন তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। গলার বাকশক্তি যেনো লোপ পেয়ে একদম নিম্ন মাত্রায় চলে এসেছে।

কিন্তু দুচোখ ! সে তো তার জল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে ভালবাসা । কতোটা ভালবাসা বিশালের প্রতি গগনের।

অবিরত অশ্রু টপটপ করে গাল বেয়ে পড়ছে। গগন ও বসে পড়ে।

বিশালের হাত ধরে টেনে দাঁড় করায়।

-তুমি তো খুব বোকা। এভাবে বলছো যে। আমার উপর তো শুধু তোমার অধিকারই বিশাল। আমি তোমাকে ভালবেসে গেছি সবসময় । এখনও বাসি। আর আজীবন বেসে যাবো। হয়তো তা আজ প্রকাশ পেলো।

সুবিশাল গগনের নীল ভালবাসা কখনোই দূরে সরে যায় না। আর আমিও তোমাকে কখনো ছেড়ে কোথাও যাবো না।

হয়তো কখনও কালো মেঘে সেই নীল ভালবাসা অন্ধকারে ঢেকে যায় । কিন্তু বৃষ্টি হয়ে ঝরে গেলে আবারও সেই ভালবাসা ভেসে উঠে। হয়তো প্রকৃতির নিয়মের মতোই আমাদের ভালবাসা কালো মেঘে ঢেকে যাবে। কিন্তু আমি শুধু তোমারই থাকবো বিশাল।

বিশাল আর কিছু না ভেবেই গগনকে জড়িয়ে ঝরে পাগলের মতো কাঁদতে থাকে।

কারো বুকেই আজ কষ্ট চাপা পড়ে নেই।

কিন্তু তবুও দুচোখ বেয়ে জল বেরোচ্ছে

ভালবাসার অস্তিত্ব স্বরূপ ।

আজ তৃষ্ণার্ত দুটি ঠোটও পিপাসা মেটাতে কাতর।

বিশাল গগনের ঠোটে হারিয়ে যেতে থাকে। নিজের করে নেয় গগনকে।

গগনও বিশালের মধ্যে নিজেকে খুজে পায়। আকড়ে ধরে বিশালকে । পাগলের মতো দুজন দুজনকে চুমু খেতে থাকে। এ যেনো বহুকাল ধরে লালিত সপ্নের বাস্তবায়ন। এ যেনো দিনের পর দিন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকা ভালবাসার ফসল।ভালবাসায় তৃষ্ণার্ত দুটি মন হারিয়ে যায় একে অপরের মাঝে।

কিন্তু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে তাদের মিলনতিথী।

হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা আজ একে অপরকে সপে দিতে চায়। কিন্তু এখনও হয়তো সেই সময় আসেনি।

১৬

-বাবা তোমাকে কিছু বলার ছিলো।

গগন আজ তার সমস্ত সত্যিটা তার বাবাকে জানাতে চায়।

-কি বলবি বল।

-বাবা আমি জানি না তুমি কিভাবে নিবে সত্যিটা । তবুও এটা জানা উচিত। আর এটা তোমাকে না বললে আর কাউকে বলার নেই বাবা। তুমি হয়তো আমাকে নিজের ছেলে ভাবতেও ঘৃনা করতে শুরু করবে।

-কি আবোল তাবোল বলে যাচ্ছিস। গগন তুই আমার শুধু ছেলেই না। আমার প্রাণটাই তো তুই। কি বলবি বল।

গগন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল।

-বাবা আমি সমকামী ।

সেলিম মুন্সির ভ্রু কুঁচকে বলতে লাগলো ।

-তুই সমকামী ?

-হ্যাঁ বাবা। আমি সমকামী। আর সমকামীর মানে নিশ্চয়ই তুমি জানো।

-তো এটা এভাবে বলার কি আছে। আমি কোনদিন তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোর ভাললাগার বিরুদ্ধে গেছি।

গগন তো অবাক ।বাবা এসব কি বলছে!

এভন মনে হচ্ছে বাবা যেনো আগে থেকেই জানো যে আমি সমকামী ।

-বাবা। তুমি? …..

-অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি জানি। আর সমকামী হওয়া কোন অপরাধ নয়। তবে এটা ভেবে উঠতে পারছিনা যে…

কি একটা বলতে গিয়েও যেনো সেলিম মুন্সি থেমে গেলো।

-কি ভেবে উঠতে পারছোনা বাবা?

সেলিম মুন্সি আমতা আমতা করে বলতে লাগলো।

-না কিছুনা।

-বাবা। আমি কল্পনাও করিনি। যে তুমি ব্যাপারটা এভাবে নিবে ।

গগনের দুচোখ খুশিতে ভিজে আসে। সে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

সেলিম মুন্সি গগনের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলতে লাগলো।

-তবে গগন সমকামী সত্তা তোর জীবনটাকে পতনের দিকে নিয়ে যেত পারে। এই সত্তা যে মানবজাতির জন্য অভিশাপ ।

-কিন্তু বাবা এটাই তো বড় সত্যটা।

আচ্ছা বাবা তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিলো।

-কি কথা ?

-দাড়াও আমি দেখাচ্ছি।

গগন চাবি নিয়ে ওয়ারড্রবের ড্রয়ারটা খুলে ছবির এলবাম টা বের করে আনে।

আর এদিকে সেলিম মুন্সি আতকে উঠে। ওখানে কি?

-দাড়াও বাবা দেখাচ্ছি।

গগন সেদিনের দেখা ছবি গুলো বের করে ।

কিন্তু একি? এই লোকটা তো মনে হচ্ছে বিশালের বাবা। আমার এখন সব স্পষ্ট হয়ে গেছে। সেদিন এখানে দেখে যাওয়ার পরই তো বিশালের বাবাকে কেমন জানি চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো। তার মানে ছবির মধ্যে বাবার সাথে যেই লোকটা সে বিশালের বাবার । কিন্তু এখানে কেন তিনি আসবেন?

এসব ভাবতে ভাবতেই গগন তার বাবার কাছে প্রশ্ন তুলে ধরে ।

-বাবা। এই লোকটা কে?

-কোন লোকটা?

গগন ছবির দিকে দেখিয়ে বলতে থাকে।

-এই যে। তোমার সাথে এই লোকটা কে বাবা?

সেলিম মুন্সি গগনের হাত থেকে এলবামটা টেনে নেয়।

-তুই কেনো এটা বের করতে গেলি।

গগন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে

-কেনো বাবা? আর তুমি এভাবে এলবামটা আমার থেকে কেড়ে নিলে যে।

সেলিম মুন্সি চুপ করে থাকে।

-বাবা চুপ করে আছো কেনো? আমি জানি না। কি রহস্য লুকিয়ে আছে এর পিছনে। কিন্তু তুমি বলেছিলে আমাকে একদিন সব খুলে বলবে। কিন্তু এখনো কিছুই বলোনি। বাবা সত্যটা কি বলো।

সেলিম মুন্সি ছলছল চোখ নিয়ে গগনের দিকে তাকায়।

-শুনতে তোকে হবেই। এটাই যে চরম সত্য। আমি তোর বাবা না গগন।

গগন ভ্রু কপালে ঠেকিয়ে বলে,

-মানে। এসব তুমি কি বলছো বাবা?

-হ্যাঁ সত্যি। আমি তোর জন্মদাতা পিতা নই। এই ছবির লোকটাই তোর বাবা।

-বাবা সেটা বড় কথা নয়। আমি তোমাকেই বাবা বলে জেনে এসেছি। আর তুমিই আমার বাবা।কিন্তু বাবা তুমি জানো ওনি কে?….

গগন বলতে যাচ্ছিলো সেলিম মুন্সি বলতে শুরু করলো।

-জানি। ও আকাশ ।

তুই জানিস গগন। আমিও তোর মতো সমকামী ছিলাম।

ছিলাম বলছি কেনো। এখনো হয়তো আছি। নয়তো চোখের জল বেরোতনা।

আর তোর আমি এই লোকটাকে ভালবাসতাম। গ্রামের পরিবার ছিলো আমাদের। একই গ্রামের ছিলাম আমরা।

জীবনের শৈশব থেকে কৈশর পর্যন্ত আমরা একই থালায় ভাত খেয়েছি । আকাশের হাত ধরেই আমার সময় চলে যেত। কিন্তু মানুষ তো এক কালেই পড়ে থাকেনা। কালের বিবর্তনে আমরা যখন যৌবনে পা দিই তখন বুঝতে পারি। আকাশ শুধু আমার আপন কেউই নয়। আপনের চেয়েও অনেক বড় কাছের কেউ। যাকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলা আমার পক্ষে খুব কঠিন। আকাশ ও আমাকে খুব ভালবাসতো।আকাশ তোর মতো খুব ভালো গান গাইতো।আর আমি সবসময় ওর কাধেঁ মাথা রেখে গান শুনতাম। কতো চাঁদনি রাত দুজন একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে কাটিয়েছি, তার হিসেব নেই।আর যখন তুই গান গাইতি আমার সেই সব পুরনো স্মৃতিগুলি মনে পড়তো।

কিন্তু এই সমাজ আমাদের ভালবাসা মানবেনা।স্থান পাবেনা আমাদের স্বীকৃতি এই সমাজে।

পরিবারের হুকুম মানতে আকাশ বিয়ে করে।অনেক দূর পর্যন্ত লেখা পড়া করে আকাশ।আর সেই সময়কার খুব ভাল পদে একটা চাকরিও করতো।আর তাই ভালো ঘরের মেয়েই আকাশকে গ্রহন করে। জানিস, আকাশ বিয়ের আগের দিন রাতে আমাকে জড়িয়ে রেখে সারারাত কেঁদে ছিলো। আমাকে ছাড়া সে কাউকেই জীবন সঙ্গি হিসেবে চায়না। আমিই ওকে বুঝিয়ে বিয়ের পিড়িতে বসতে বাধ্য করি।বলি যে, “স্ত্রীকে কখনোই তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে না।তার প্রাপ্য তাকে দিতেই হবে।”

বিয়ের পরেও স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মেলামেশা চলতে থাকে।আকাশের স্ত্রীকে

দেখতাম হঠাত্ হঠাত্ কেমন জানি একটা রাগ মিশ্রিত দৃষ্টি নিয়ে তাকাতো আমার দিকে।তবু মুখে যেনো সবসময় তার মধু লেগেই থাকতো।! সবসময়ই আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকতো। কিন্তু জানতাম না তার ভিতরের কথা।

এদিকে আকাশের স্ত্রী তোকে গর্ভে ধারন করে । বৈশাখ মাস। চারদিকে ভাপটা গরম। হঠাত্ করেই বজ্রপাতের আওয়াজে চারদিক কম্পিত হয়ে উঠে। হঠাত্ করেই কাল বৈশাখী ঝর আঘাত হানে শ্যামলী গ্রামে। কিন্তু এই ঝর আমাদেরও ছাড়েনি।

তোর যখন দুমাস চলছিলো

একদিন আকাশে বাড়িতে কেউ না থাকায় আকাশ আমাকে এসে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায় । বাহিরে খুব বৃষ্টি আর প্রবল বেগে জর হচ্ছিল । আকাশ আর আমি দুজন দুজনার মাঝে হারিয়ে যাই সেই রাতে।

হঠাত্ করেই কারো এক সর্বনাশা নজর যেনো আমাদের উপর পড়লো।

আকাশের স্ত্রী জানালা দিয়ে আমাদের অন্তরঙ্গ সেই মুহূর্ত অবলোকন করে ফেলে। রেগেবেগে সবকিছু সে সবাইকে জানিয়ে দেয়। আর বলতে থাকে ” এই জন্যই তো বলি, আমার প্রতি এরকম একটা নারীর প্রতি তুমি কেনো বিতৃষ্ণা।তোমার সাথে সংসার করা অবস্থায় মনে হচ্ছিল যেনো তুমি দায়ে পড়ে আমার সাথে আছো। তুমি একরকম চরিত্রের? তোমার সাথে আর সংসার তো দূরের কথা, আর একমুহূর্তও থাকতে পারবনা।তোমার মতো এই তোমার সন্তানও হবে বলে দিলাম। আর এটা আমার অভিশাপও বলতে পারো। এই অভিশপ্ত সন্তানকে আমি তোমার কাছেই রেখে দিলাম।

রাতারাতিই সবার মুখে শুধু ছ্যা ছ্যা রটতে থাকলো। খারাপ কথা ছড়তে বেশি সময় লাগেনা বোধহয় । “গ্রাম্য শালিশও বসতে পারে। আর এর ফল এমন হতে পারে যে , আমার সন্তানের উপরও শাস্তি পড়তে পারে। এই সমাজপতিরা আমার সন্তানকে এক ঘুরে করে দিতে পারে সেলিম। তুমি আমার সন্তানটাকে বাঁচাও । আর আমার কথা ভেবোনা। আমার সন্তান বাঁচলে আমিও বেঁচে যাবো স্রষ্টার কৃপায়”।

আমার হাত দুটি চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলো আকাশ। আমি আকাশের চোখের জল সহ্য করতে পারিনি কখনো। আমারও হয়তো বা বড় কোন শাস্তি দিতো। তবে এমন হতো না যে, আমার বাবা-মার থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমি তোর মুখের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবিনি। তোকে নিয়ে সেই কালবৈশাখী ঝরের রাতেই বেরিয়ে পড়ি। প্রচন্ড বেগে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে । আর কিছুক্ষণ পর পর বজ্রপাতের সাথে বিজলি চমকাচ্ছিলো। অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই আকাশটাও যেনো আজ আমাদের ঘৃনার চোখে দেখছে। তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আমাদের কাবু করতে চাইছে । চাদর মুড়ি দিয়ে তোকে বৃষ্টি থেকে বাচাঁতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম সেদিন । স্রষ্টা শেষ পর্যন্ত এখানেই ঠাই মেলায় আমাদের । ভাগ্য তোকে করে দেয় আশ্রমের অনাথ।

চোখ বেয়ে রক্ত অশ্রু বেরোচ্ছে দুটি মানুষের ।

দীর্ঘশ্বাস ও আজ থেমে গেছে । পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে গগনের হৃদয় ।

এসব সে কি শুনলো? গগন ভেবে যাচ্ছে ।

-গগন,? এই গগন? গগন

মাথা ঘুরিয়ে ঢলে পড়ে যায় গগন। সেলিম মুন্সি গগনকে তুলে ধরে।

-গগন। এই গগন কি হলো তোর।

-ঔষুধ গুলো খাইয়ে দেবেন নিয়মিত। যা দেখতে পাচ্ছি তাতে বুঝা যাচ্ছে অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে এমন হয়েছে।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরবে। আমি উঠি তাহলে।

ডাক্তার এসে দেখে যাওয়ার পরে ওষুধ দিয়ে যান।

সেলিম মুন্সির দুচোখে রাজ্যের চিন্তা ভর করে আছে।গগনের বিছানার চারপাশে আশ্রমের সবগুলো শিশু ঘিরে আছে। গগনের জ্ঞান ফেরার প্রতীক্ষায়।

প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে গগন দুচোখ খুলে।

সেলিম মুন্সি ভেজা মুখে হাসি ফুটে উঠে।

-গগন, বাবা ।এখন কেমন বোধ করছিস?

গগন ভারাক্রান্ত মুখ নিয়ে বলতে থাকে,

-বাবা ওদেরকে একটু যেতে বলো তো।

সেলিম মুন্সি আশ্রমের সব শিশুকে উদ্দেশ্য করে চলে যেতে বলল।

গগন শোয়া থেকে উঠে একটা বালিশ ঠেকিয়ে বসে।

-বাবা? তাহলে ওই ছবির লোকই আমার জন্মদাতা পিতা?

-হ্যাঁ । আকাশই তোর জন্মদাতা পিতা।

কিন্তু তুই এভাবে ভেঙে পড়লি যে। কি হলো তোর কিছুই বুঝতে পারছিনা। জীবনের চরম সত্য তো আর চাপা থাকেনা। কিন্তু তুই এভাবে কেনো ভেঙে পড়লি বাবা?

গগন চুপ করে আছে।

একগাল ঠেলে হেসে দিয়ে বলে।

-কি হবে এমন। কই , কিছুই তো হয়নি! আমি তো এখন সুস্থই।

-তোকে তো সবসময়ই আমি সুস্থ-স্বাভাবিক দেখতে চাই।

-আচ্ছা বাবা তুমি এখন যাও। আমাকে নিয়ে ভাবার তেমন কিছুই হয়নি। তুমি যাও।

-কিন্তু তুই এখন পর্যন্ত কিছুই খাসনি।

-বাবা কিচ্ছু হবেনা। আমার ক্ষিদেও পায়নি। তুমি তো আমাকে নিয়ে ভেবে অসুস্থ হয়ে পড়বে।

-আচ্ছা ওষুধ গুলো খেয়ে নে।

সেলিম মুন্সি গগনকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে গগনের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ।

এটা কি করে হয়। আমি কি এত বড় আঘাত সহ্য করার জন্যই পৃথিবীতে জীবিত ছিলাম। আঘাত বলছি কেনো? এর থেকে দুর্লভ লজ্জা আর কি থাকতে পারে পৃথিবীতে।

তাহলে বিশাল আমার ভাই। আর আমরা একই রক্তের ,একই বন্ধনের?এটা কি করে হয়? গগন দু হাতে তার মাথা চেপে ধরে। একই উদরের দু ভাই। আর আমি কিনা , ছি ! ছি!

গগন নিজেকেই নিজে তিরস্কার দিতে থাকে।

না , এই মুখ কাউকে দেখাবার মতো নয় যে। আমি তো নীরবতাকে সঙ্গী করেই জন্মেছি। দুঃখই তো আমার জীবনের সাথী। অঝোরে শব্দহীন ভাবে কেঁদেই যাচ্ছে গগন।

১৭

-এই যে ভাই, ১টা গোলাপ দেবেন।

-নেন বাইজান।

-কতো টাকা?

-বাইজান ২০ টেহা ।

-নিন।

হাত বাড়িয়ে সৈকত মালীর টাকা দিয়ে খুশি মনে আশ্রমের দিকে এগোতে থাকে।

সৈকত গগনকে তার হৃদয়ে লুক্কায়িত কথাটা জানাতে চায়। অনেক আগেই বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু গগন সেদিন বিশালের ফুলের তোড়া বানাতে ব্যস্ত থাকায় বলা হয়নি। আজ বলবে। সৈকত তার বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা পাথরটা সরাতে চায়। অনেক আগেই সৈকত বুঝে গেছে যে গগন শুধু তার বন্ধুই নয়। অনেক বড় একটা জায়গা জুড়ে নিয়েছে গগন। অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছে গগনক সে। যা গগনের পাশে অন্যকারো উপস্থিততেই

টের পেয়েছে সৈকত। আজ সৈকত চেপে রাখবেনা। মুক্ত করবে হৃদয়ের সব কথা।

আশ্রমের সামনে আসতেই সৈকত দেখলো পুরো আশ্রম জুড়ে হইচই পড়ে রয়েছে। প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে আছে চারদিকে।

সৈকত দৌড়ে গিয়ে আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করে। ছেলেমেয়েদের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায় সৈকতের। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম । এ কি দেখছে সে?

নিজের চোখই যেনো ভুল দেখছে।

গগনের রক্তাক্ত দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সেলিম মুন্সি গগনকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে ।

সৈকতের হাত থেকে ভালবাসার প্রতীক গোলাপটা পড়ে যায় । ছুটে গিয়ে সে গগনকে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার করে বলতে থাকে ,

-এই গগন। উঠ। কি হয়েছে তোর। তুই চুপ করে আছিস কেনো। কি হয়েছে তোর? রক্ত কেনো। সেলিম মুন্সি সৈকতকে পাগলের ঝাপটে ধরে বলতে থাকে,

-সৈকত তোর সাথে ওর কিছু হয়েছে? বল না বাবা। বলছিস না কেনো।

গগন কেনো এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো বলেই কান্নায় ফেটে পড়ে সেলিম মুন্সি।

সৈকত গগনকে হাঁটুর উপর থেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্নারত অবস্থায় বুঝতে পারে গগনের প্রাণ আছে।

সৈকত চিৎকার দিয়ে বলে,

-আংকেল দ্রূত হাসপাতপাতালে নিয়ে চলুন গগনকে। ও বাঁচবে।

১৭

ওটি তে নেওয়া হয়েছে গগনকে। আর এদিকে বিশাল তার বাবার অফিসের কাজে শহরের বাহিরে যাওয়ায় খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে সে। গগনের মোবাইলে অনেক গুলো কল করলো কিন্তু ফোন রিসিভ হলোনা। সেই সকাল থেকেই ফোন করে যাচ্ছে বিশাল, কিন্তু অপর পাশ থেকে কেউই ফোন তুলছেনা।

ঠায় দাড়িয়ে আছে সৈকত। ডাক্তার বলল অবস্থা বেগতিক। পেটের মধ্যে ফল কাটার ছুড়ি বসিয়ে দেওয়ার ফলে খুব মারাত্মক ভাবে যখম হয়েছে। কিছুই বলতে পারলনা তারা। আল্লার উপর ভরসা করতেই বলল শুধু ।সৈকতের চোখ , মুখ , হৃত্পিণ্ড সবকিছুই যেনো থেমে গেছে।মূর্তিমানের মতো একদম পাথর হয়ে গেছে সৈকত।

সেলিম মুন্সি বাহিরের বারান্দায় বসে আছে। অবিরত সে কেঁদেই যাচ্ছে । বুঝে উঠতে পারছে না গগন হঠাত্ কেনো এমনটা করলো, গগনের সবকিছুই তো সেলিম মুন্সির অবগতির ভেতরে। তাহলে এমন কি হলো যার জন্য গগন তার আত্মহননের পথ বেছে নিলো !

এসব ভেবে যাচ্ছে সেলিম মুন্সি।

-অবস্থা খুব খারাপ, ছুড়ির আঘাতে দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। আপনারা যতো তাড়াতাড়ি পারেন দুটি কিডনি যোগার করুন আর নয়তো বা একটি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ।

আংকেল, আংকেল। ছুটে গিয়ে সেলিম মুন্সিকে জড়িয়ে ধরে সৈকত। ডাক্তারের মুখ থেকে এমন কথা শুনার পর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে সেলিম মুন্সি।

এখন কি করবে সৈকত সে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। দুঘণ্টার মধ্যে কিডনি যোগার করা যে অসম্ভব । পাগল প্রায় অবস্থা সৈকতের ।

-এসব আগ পিছ ভাবলে চলবেনা । গগনকে তো সবার আগে বাঁচাতে হবে। নিজেকেই ঝাঁকুনি দিয়ে বলতে লাগলো সৈকত। এদিকে আংকেলেরও জ্ঞান ফিরছেনা। আর একটা কিডনিই তো শুধু । আমি আর যতদিনই বাঁচি না কেনো অন্তত ভালবাসার মানুষের সাথে তো বাঁচতে পারবো। বাকি জীবনটা একদিনই হউক আর একমুহূর্ত । সৈকতের সাথে গগনের ব্লাড মিলার ফলে ১ ঘন্টার মধ্যেই অস্ত্রপ্রাচার সফল হয়।

বিশাল আশ্রমে এসে সব জানতে পেরে পাগলের মতো ছুটে আসে হাসপাতালে । কি হলো একটা দিনের মধ্যে কিছুই বুঝতে পারছিনা। মাথায় দুহাত চেপে ধরে সেলিম মুন্সির বেডের পাশে বসে পড়লো বিশাল। জ্ঞান হারানোর পর সেলিম মুন্সিকে কেবিনে দেওয়া হয়।

ডাক্তার বলেছে গগনের জ্ঞান না ফিরা অবধি কিছু বুঝে নেওয়া অসাধ্য। তবে অপারেশন সাকসেস হয়েছে। আর তাই সেলিম মুন্সি এখন অনেকটাই স্বস্তি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু কিডনি কোথা থেকে পেলো, সেটা জানতে পারেনি এখনো।

১৮

-এই পেশেন্টের সবচাইতে কাছের কে আছেন? যে কোন একজন ভেতরে আসুন। কন্ডিশন ভালো দেখলে ডাক্তার সবাইকেই যেতে দেবে।জ্ঞান ফিরেছে পেশেন্টের।

নার্সের কথা শুনে খুশিতে বিশালকে জড়িয়ে ধরলো সেলিম মুন্সি ।

-আংকেল যান।

সেলিম মুন্সিকে ভেতরে যেতে বলল বিশাল।

আস্তে আস্তে পা টিপে ভেতরে প্রবেশ করলো সেলিম মুন্সি।

পুরো হাসপাতালটাই যেনো কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে গগনকে দেখে।পুরো থিয়েটার জুড়ে শুনসান একটা নীরবতা। চোখ বুজে আছে গগন।

আস্তে আস্তে গগনের পাশে গিয়ে বসে পড়ে সেলিম মুন্সি।চোখের জল যেনো শুকাচ্ছেই না।

ধীরে ধীরে চোখ মেলে গগন সেলিম মুন্সির দিকে তাকায়।কেঁদেই যাচ্ছে।

ম্লান স্তরের একদম নিম্ন স্বরে বলতে লাগলো গগন

– কাঁদছ কেনো বাবা।আমি তো ঠিকই আছি।

কিছুই তো হলোনা উল্টো তোমাদের যন্ত্রণায় ফেলে দিলাম।

চুপ করে আছে সেলিম মুন্সি।

কাঁদতে কাঁদতে

আলতো করে একটা হাত নিয়ে গগনের কপালে রেখে পরশ বুলিয়ে দেয়।গগনের মলিন মুখটায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে।

-কি হয়েছিলো তোর? কার জন্য এভাবে নিজের জীবন দিতে গেলি।

-ক্ই? ঠিকই তো আছি।তোমার হাতের এই পরশ পাবো বলেই তো আবার ফিরে এসেছি।বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো গগন।

-আচ্ছা বাবা বিশাল কোথায় ? দেখতে পাচ্ছিনা কেনো?

-বিশাল বাইরে। দাড়া আমি পাঠাচ্ছি।

উঠে পড়তে গিয়েও বসে পড়লো সেলিম মুন্সি।

গগনের দিকে জিজ্ঞাসিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

-আচ্ছা গগন তুই কি বিশাল কে ভালবাসিস?

কথাটা শুনার পর আবারও যেনো কি একটা ব্যথায় কুকড়ে উঠলো গগন।

নার্স এসে ধমকের সুরে বলতে থাকে

– এ কি করছেন।আপনি তো পেশেন্টকে উত্তেজিত করে ফেলতেছেন।কাঁদতেছেন কেনো ওনি। যান বাইরে যান।নার্সের কথায় বাইরে এসে পড়ে সেলিম মুন্সি।

কিছুক্ষণ পর বিশাল গগনের পাশে এসে বসে। খুব কাছে এসে গগনের দিকে তাকিয়ে থাকে।একটা হাত চেপে ধরে গগনের।

বুকের সাথে চেপে ধরে রাখে গগনের হাতটা।

নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিশালের দিকে গগন।এটাই তো বিশাল।

কে সে? তার সাথে কি আমার ভালবাসার বন্ধন ? নাকি রক্তের ?চোখ ফেটে ঝর্নার ধারার মতো জল বেরোতে লাগলো গগনের।হঠাত্ করেই বিশালের বুক থেকে হাত সরিয়ে নেয় গগন।

বিশাল চমকে উঠে।

-কি হলো গগন?

গগন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।চুপ হয়ে থাকায় বিশাল আবারও প্রশ্ন করে ।

– কি হলো গগন।এভাবে হাতটা সরিয়ে নিলে যে।

-বিশাল বাবাকে একটু ডেকে দাও তো।

-আচ্ছা দাড়াও।

বিশাল বাইরে থেকে গিয়ে সেলিম মুন্সিকে ডেকে আনে।

সেলিম মুন্সি হন্তদন্ত হয়ে গগনের পাশে এসে বসে।

-গগন। কি হয়েছে? ভাল লাগছেনা শরীরটা?

-না বাবা আমি ঠিক আছি।

আচ্ছা বাবা জ্ঞান ফেরার পর ডাক্তারের কাছ থেকে শুনলাম আমার নাকি দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে।একটা কিডনি আমার ভেতরে প্রবেশ করানোর ফলে বেঁচে আছি।কিন্তু কে দিলো ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করায় ওনি আমাকে কিছু বললেন না।জিজ্ঞাসা করাতে ওনি বললেন “তুমি অসুস্থ , আগে সুস্থ হও জানতে পারবে সবকিছু”।ডাক্তার তোমাদের কাছে কিছু বলেছে?

-না। আমাদের কাছে তো কিছুই বলেনি।

-আমার অপারেশনর সময় তোমরা কোথায় ছিলে?

-তোর অপারেশনের সময় আমি অজ্ঞাত অবস্থায় ছিলাম।আর বিশাল তো তোর অপারেশনের পর এলো।

-ও…. আচ্ছা বাবা সৈকত আসেনি? সৈকত তো সবার আগে আসার কথা!

-সৈকতই তো তোকে হাসপাতালে নিয়ে আসে।

-কিন্তু বাবা সৈকত কিভাবে জানলো যে আমি আহত হয়েছি।

-না জানে নি তো।সৈকত কাল আশ্রমে এসেছিলো। আর তাই তোকে হাসপাতালে আনতে পেরেছি।

গগন ভাবনার মধ্যে ডুবে গেলো।

সৈকত তো সেদিন কি যেনো একটা বলবে বলছিলো আমাকে।কি বলতে চেয়েছিলো সৈকত।আর সৈকতকে ইদানীং প্রায়্ই দেখতাম কেমন যেনো একটা অদ্ভুত আচরণ করতো।কতো মজবুত ছিলো আমার আর সৈকতের বন্ধুত্বের । কিন্তু হঠাত্ কেনো জানি কোথাও একটা ভাটা পড়ে গেলো। আলগা হতে শুরু করলো আমাদের বন্ধুত্ব ।এমন বুঝা যাচ্ছিলো যে আমার পাশে কাউকে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতোনা সৈকত।

ডাক্তারের ডাকে গগনের চিন্তায় ছেদ পড়ে।

-আপনাদের পেশেন্টের কিডনি দানকারী আপনাদের ডেকেছে।

সেলিম মুন্সি অবাক চিত্তে বলে উঠে ,

-কিডনি দানকারী? হাসপাতালেই আছেন ওনি !

-হ্যাঁ ।পাশের কেবিনেই আছে।

গগন সেলিম মুন্সিকে বলে,

-বাবা আমাকেও ওই লোকের কাছে নিয়ে চলো। আমি দেখতে চাই ওকে।

ডাক্তার এগিয়ে এসে গগনকে বলতে লাগলো,

-এসব কি বলছেন? আপনি কিভাবে যাবেন। আপনি এখন পুরোপুরিই অসুস্থ ।

-না তবুও আমি দেখতে চাই। আর আমি এতোটা অসুস্থ ন্ই যে আমার প্রাণদাতাকে একনজর দেখতে পারবোনা।

ডাক্তার বাধ্য হয়ে গগনের কথা মেনে নেয়।

-আচ্ছা ঠিক আছে। আপনাকে যেতে

হবেনা। আমরা ওনাকে এখানে নিয়ে আসবো।

ডাক্তারের সাথে বিশাল আর সেলিম মুন্সি বেরিয়ে পড়লো।

গগন বসে আছে সেই লোকটিকে দেখার জন্য ।

ডাক্তারের সাথে সেলিম মুন্সি আর বিশাল লোকটিকে দেখার জন্য কেবিনে ঢুকতেই তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা । এ যে সৈকত।

বেডের উপর শুয়ে আছে।

বিশাল আর সেলিম মুন্সি একে অপরের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।

সেলিম মুন্সি দৌড়ে গিয়ে সৈকতের পাশে বসলো। সেলিম মুন্সি আর বিশালকে দেখার পর তাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সৈকত।

-সৈকত। বাবা তুমি?

ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করতে লাগলো সেলিম মুন্সি।

– ডাক্তার ?

-হ্যাঁ। ইনিই আপনার ছেলেকে একটা কিডনি দিয়েছেন।

-আপনি আমাকে বললেন না কেনো?

-বললাম না কোথায় ? এখনই তো মাত্র আপনার ছেলের অপারেশন শেষ হলো। আর তাছাড়া অপারেশনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আপনার জ্ঞান ছিলোনা।

আর , একটা কিডনি দিয়ে মানুষ টিকে থাকতে পারে। কিন্তু সৈকতের ক্ষেত্রে সেটা হবেনা। ওর আরেকটা কিডনি প্রায় নষ্টের পথে। আমরা যখন ওর ব্লাড পরীক্ষা করছিলাম।তখনই ধরা পড়লো যে সৈকতের একটা কিডনি প্রায় অকেজো । আমরা ওকে কঠোর ভাবে বারণ করেছি। আর সেও জোর করেই কিডনি দিয়েছে। আবার সময়ও নেই হাতে। তাই আমরা ওর থেকে কিডনি নিতে বাধ্য হয়েছি। যে কোন সময় একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে সৈকতের।

কারো মুখ থেকে কোনও কথা বেরোচ্ছে না। নীরবতা গ্রাস করে ফেলেছে ক্ষণিকের পরিবেশটাকে।

বিশাল সৈকতের হাত চেপে ধরে বলতে থাকে,

-সৈকত এটা তুমি করলে?

সেলিম মুন্সির দুচোখ ভরে আবারও জল ভেসে উঠলো।

সৈকতের মাথায় হাত রেখে বলতে থাকে

-তুমি কেনো করতে গেলে এরকম একটা কাজ। নিজের জীবনটাই আমার ছেলের জন্য উৎস্বর্গ করে দিলে।

সৈকত সেলিম মুন্সির হাত চেপে ধরে বলতে লাগলো।

-আংকেল তেমন কিছুই করিনি। আর আমি আমার জীবনের বিনিময়ে হয়তো এমন কিছু পেতে পারি যা মরে গিয়েও শান্তি পাবো। যার মূল্য অনেক । সামান্য একটা কিডনি তো তার কাছে কিছুই না।

সৈকতকে গগনের কেবিনে নিতেই গগন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। এ কাকে দেখছে ? সৈকত !

আস্তে আস্তে সৈকতকে গগনের বেডের একদম পাশে আনা হলো।

সৈকত নিচের দিকে মাথা ঝুঁকে বসে আছে গগনের পাশে। চোখের নিচে কালো ছোপ পড়ে গেছে। অমায়িক একটা চেহারায় এখন আর সেই স্নিগ্ধতা নেই।

গগন সবাইকে চলে যেতে বলল। একটা বালিশ পিঠে ঠেকে বসলো গগন। কিছুক্ষণ নীরব হয়ে একে অপরের চোখে হারিয়ে যেতে থাকলো।কেবিন থেকে সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর গগন বলতে শুরু করে,

-ইদানীং আমি তোকে দেখে সত্যিই খুব অবাক হতাম। কিন্তু এতোটা আশ্চর্য হবো তা বুঝিনি। তুই আমাকে ভালবাসতি ।তাইনা? কিন্তু দেরি করলি কেনো? আগে বললিনা কেনো? তাহলে তো আজ এই পরিস্থিতিটা হতোনা । আমি কারো বন্ধনে আবদ্ধ না হতাম।

গগনের মুখে এমন কথা শুনার পর সৈকত নির্বাকের মতো গগনের দিকে তাকায়।

-গগন আমি তোকে ভালবাসি। তুই বাসিস আর না বাসিস সেটা জানার দরকার নেই। তোকে ভালবেসে যেতে পারলেই হবে।

পাগলের মতো সৈকতকে জড়িয়ে ধরে গগন। বাঁধে আটকে থাকা কান্না গুলো বাঁধ ভেঙে হু হু করে বেরিয়ে আসছে।

-তুই যে অনেক দেরি করে ফেললি সৈকত।

-আমার তো আর কিছুই দরকার নেইরে গগন। আমার জন্য তোর যে বুকফাটা কান্না বেরোচ্ছে এটাই তো আমার সব। এটাই তো আমার প্রতি তোর ভালবাসার ইঙ্গিত দিচ্ছে ।আমি যে তোকে অনেক বেশি ভালবাসতে চাই গগন। হাজার বছর ধরে । কিন্তু গগন জানিস,। আমি না আর বেশিদিন বাঁচব না।

হঠাত্ করেই গগনের কান্না থেমে গেলো।

সৈকতের কাঁধ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনে। চোখের জলে পুরো মুখটা ভিজে গেছে। ভেজা মুখ নিয়ে সৈকতের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,

-তুই এসব কি বলছিস?

-হ্যাঁ । আমি তোকে নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে চাই গগন। হাজার বছর।

অঝোরে পাগলের মতো কাদতে কাদতে আবারও জড়িয়ে ধরে গগনকে সৈকত। কাঁদতে কাঁদতে পরিবেশটা কে ভারী করে তুলে দুজন। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা অফুরন্ত ভালবাসা চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে ।

হঠাত্ করেই যেনো সব থেমে গেলো। কেমন জানি চুপ হয়ে গেলো সৈকত। সৈকতকে বুকে জড়িয়ে বসে আছে গগন।ঝাঁকুনি দিয়ে সৈকতকে ডাকতে থাকে গগন।

-সৈকত। এই সৈকত। সৈকত?

ঘাড় থেকে সৈকতের মুখটা সোজা করে তুলে ধরলো গগন নিজের দিকে । চোখ বুজে ফেলেছে যে সৈকত। হতবাকের মতো তাকিয়ে আছে সৈকতের দিকে গগন।

গগনের চিৎকার শুনে সবাই কেবিনে আসে।

ডাক্তার এসে ফল জানালো সৈকত মৃত।

দ্বিতীয় বারের মত আবারও জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে গগন।

১৯

-গগন। গগন দাঁড়াও। আমার অন্যায়টা কি বলো?আমি তো তোমাকে পাগলের মতো ভালবাসি। নিজের জীবনের থেকেও অনেক বেশি।কিন্তু তুমি আমাকে কেনো এভাবে এড়িয়ে চলছো আমি বুঝতে পারছিনা।

ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে গগনকে আটকে বিশাল বলতে থাকে।

-বিশাল , আমি তোমাকে অনেকবার বলেছি।আমি তোমার সাথে থাকতে পারবনা। আর কতোবার বলবো যে, আমি তোমাকে ভালবাসিনা।এরপর পথের ধারে জনসম্মুখে যখন তোমার গালে দুটো কষিয়ে চড় মারবো তখন বুঝতে পারবে।

বিশাল ঠায় দাড়িয়ে রইলো।

গগন সামনের দিকে দ্রুত বেগে এগিয়ে গেলো।

আজ সৈকতের কথা খুব মনে পড়ছে গগনের।

ছাদে বসে সীমাহীন বিস্তৃত গগনের দিকে তাকিয়ে ভাবছে গগন। একটা নিঃস্ব চাঁদ । ঠিক আমার মতো । সীমাহীন সেই গগনেও একাকীত্ব গ্রাস করে রেখেছে চাঁদটাকে।

ঠিক এই আমি গগনের মতোই চাঁদটা। এরকম একটা রাতেই তো বিশাল আমাকে ভালবাসার কথা বলেছিলো। আকাশে ঠিক এরকম একটা বড় চাঁদ ছিলো। পুরো পৃথিবীটা সেদিন জোছনায় পুলকিত হচ্ছিল ।

এমন একটা রাতেই তো সৈকত অনন্ত কালের জন্য আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলো।

কিন্তু কোন ভালবাসাটা আমার জন্য সঠিক ছিলো?

বিশালের, না সৈকতের?

তা আজও জানতে পারিনি।

ছিলনা, কারো ভালবাসাই আমার জন্য সঠিক ছিলনা। নিষিদ্ধ ভালবাসা ছিলো এগুলো। আর অভিশপ্ত এক সত্তাই এর জন্য দায়ি।

সবকিছুর জন্য দায়ি।

সবকিছুর জন্য দায়ি এই “সমকামী” সত্তাটা।

মায়ের কোলছাড়া হয়েছিলাম এই সত্তার জন্য । এই সমকামী সত্তার জন্যই বাবা আজ এই আশ্রমে। আমি পরিচয় হীন একটা অনাথ।

আমার বাবাও সংসার , বাবা,মা পরিবার এমনকি ভালবাসাও হারিয়েছে ।

আমি আমার সৈকতকে হারিয়েছি এই সত্তার জন্য । হারিয়েছি আমার ভালবাসা ।

আপন ভাইয়ের সাথে দৈহিক বন্ধনের ভালবাসায় আবদ্ধ হয়েছিলাম এই সত্তার জন্য । খুব নীরব , খুব নীরব আর্তনাদ করতে হয় এই সত্তার জন্য।

ইচ্ছে করলেই তো বিশালকে সব খুলে বলতে পারতাম।

বলে কি লাভ হতো? লজ্জা না হয় নিজ মনুষ্যত্বের কাছেই পেয়ে যাবো। তবুও যাকে ভালবেসেছিলাম তাকে আমার মতো অভিশপ্ত করে দিতে পারবোনা। হয়তো বা সেও সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবন দিয়ে দিতে পারে। ব্যক্তিত্ববোধ বিশালকে বার বার আঘাত করবে।

বাবাকেও তো বলতে পারতাম , বাবা তোমার পুরনো ভালবাসা আর আমার বাবা মা-কে আমি ফিরে পেয়েছি।

কি হতো বললে?

বাবার জীবনটা অন্ধকারে ছেয়ে যেতো। অতীতের সব স্মৃতি বাবাকে আঘাতের পর আঘাত করে ক্ষত বিক্ষত করে দিতো। আর আমিও হয়তো আমার বাবা-মা’কে ফিরে পেয়ে তাদের কাছে চলে যেতাম। একবারও হয়তো ফিরে তাকাতাম না, মনপ্রাণ দিয়ে নিঃস্বার্থ ভাবে আগলে রাখা এই মানুষটির দিকে।

একজনই তো। আমিই না হয় কষ্ট পেতে একদিন হারিয়ে যাবো। তবুও আমার ভালবাসার মানুষ গুলোকে সুখে রাখতে চেষ্টা করবো আজীবন। কোন ভালবাসা তারা আমার ?

রক্তের, নাকি নাম না জানা অন্য কোন সম্পর্কের? তা জানা আমার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না।

বিশালকে কাছে পাবার পর কেনো জানি মনে হতো, এই সুখ স্বায়ীত্ব নয়। আমাকে নীরব করে দেওয়ার জন্যই হয়তো এই ভালবাসা আমার জীবনে এসেছে। কিন্তু আবেগের ধামাচাপায় পড়ে সেই সব কিছু ভুলে যেতাম।

জীবনটা কি রকম পরিবর্তন হয়ে গেলো তাই না?

নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে গগন।

আমার ঠিকানাহীন এই জীবনে কত বিচিত্র রকমের খেলা খেলে গেলো মুহূর্তের মধ্যেই।

তবে সবার সুখে থাকার কামনা করলেও

একজনের জন্য আমি আজীবন অভিশাপ দিয়ে যাবো।

স্রষ্টা । তোমাকে আমি কোনও দিনও ক্ষমা করবোনা। আমিও সাধারণ একজন মানুষ হয়ে জন্মাতে পারতাম। যেহেতু জন্ম পুরোপুরি স্রষ্টা কর্তৃক তাই তোমাকেই আমি অপরাধী হিসেব সনাক্ত করবো। তোমাকেই দোষী বলবো। কেনো এই বিষাক্ত “সমকামী” সত্তা তুমি আমার মধ্যে দিলে?

এরকম হাজারো ভাবনা চিন্তার জালে পেচিয়ে যায় গগন। আর মুক্ত হতে অসীম হাহাকারের বন্যা বইয়ে দয়। কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়।

কেউ জানে না।

পৃথিবীর কেউই গগনের নীরবতার রহস্য জানেনা।

শুধুমাত্র সেই স্রষ্টা ছাড়া। যাকে গগন প্রতিনিয়ত অভিশাপের চোখে দেখছে।

কিন্তু যে স্রষ্টা পৃথিবী সৃষ্টি করেছে, যার বিধান অনুযায়ী এই নশ্বর পৃথিবী পরিচালিত হয়। সেই অবিনশ্বর স্রষ্টার উপর কি গগনের অভিশাপ পৌছেবে?

এটা তো প্রকৃতির বিধান।

“তব হস্তে সৃজিত এই নিখিল জাহান,

অভিশপ্ত সত্তা সে তো তোমারই দান।”

“সমপ্রেমের গল্প” ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.