দ্য বয় উইথ কার্লি হেয়ার

লেখকঃশঙ্খদীপ

আমার এখনও প্রথম দিনের কথা মনে আছে : তখন আমাদের ক্লাস এইট ! সেকশন এ। প্রথম পিরিয়ড কৌশিক বসু স্যারের। উনি একটা ছেলেকে নিয়ে ঢুকলেন ক্লাসে। দেখা মাত্র আমার হৃৎস্পন্দনটা যেন থেমে গেছিল এক মুহুর্তের জন্য।” গুউউউড মর্নিং স্যার ” এর সম্মিলিত ধ্বনিতে আমার হুশ ফিরল। ছেলেটাকে খুব সুন্দর দেখতে। রাজপুত্রর মতো। ফরসা। কোঁকড়ানো চুল। গাঢ় চোখ। সবে সবে দাড়ি গজাচ্ছে! আমি তো বরাবর লাস্ট বেঞ্চার্স। ওখান থেকেও আমি ওকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম সেদিন। স্যার ওর পরিচয় দিল : নাম সম্বর্তক রায়। বাবা মিলিটারীতে কাজ করেন। বদলী চাকরীতে কলকাতায় ব্যারাকপুরে পোস্টিং। অতএব তিনি এখন থেকে আমাদের সাথে বসবেন। সেকেন্ড বেঞ্চে ধ্যানেশের পাশের সিটটা ফাঁকা ছিল , ওখানেই বসল। আমি চাইছিলাম আমার পাশে বসুক ! মনে মনে ভাবছিলাম এই মালটার সাথে তো বন্ধুত্ব করতেই হবে ! গে কী না কে জানে ! এখনও সিগন্যাল তো পাচ্ছি না কিছু ! দেখা যাক … এই তো সবে এল !
যা হয় , টিফিন পিরিয়ডে সবাই ওর সাথে কথা বলতে উঠে গেল। সবাই না গেলেও , বেশীর ভাগ। আমি বেশীর ভাগের মধ্যে পড়ি না। না না গে বলে নয় ! আমি এমনিতেই যেচে কারোর সাথে কথা বলতে পারি না। পরশ আলাপ করল শুনতে পেলাম ” হাই আমি ক্লাসের প্রিফেক্ট ! কোনো দরকার হলে বলিস ! আর ঐ যে আর একজন প্রিফেক্ট ” বলে আমার দিকে দেখালো। ঘুরে তাকাল। হাসল । আমিও সৌজন্য বশত হাত দেখালাম। হাসলাম না। কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না কতটা হ্যালে আছি ওকে দেখে ! প্রেসটিজ আছে ভাই !
সেদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখলাম ওর জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। বেরিয়েই ওতে উঠে পড়ল। আমার বাড়ী স্কুল থেকে কাছেই। হেঁটেই যাতায়াত করতাম । মনে আছে সেদিন গিয়েই ফেসবুকে সার্চ করেছিলাম। না ! ফেসবুকে নেই তো! অন্য নামে নেই তো ?… এ প্রশ্নের একমাত্র উত্তর ও’ই দিতে পারবে। অতএব যতদিন না কথা হচ্ছে ততদিন ভ্যারান্ডা বাজানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
তারপরে অনেকগুলো সপ্তাহ কেটে গেল। কথা হয়নি একদম, তেমন না। তবে ঐ প্রিফেক্ট সুলভ। খুব কথা বলে ।বারবার বলতে হয় ” সম্বর্তক কথা বলিস না !” আমি এমনিতে খুব একটা কাজ করতাম না। ও আসার পর থেকে করতাম। আমি পেছনে বসি তো , ওখান থেকে ওকে দেখা যায় না ! তাই যতক্ষন দেখা যায়। আর আমার ক্লাসে এমন ইমেজ যে , প্রথম দিকে বসলে বন্ধুরা টোন করবে ” কী রে পড়াশোনায় মন টন লেগেছে মনে হচ্ছে !” আমি পড়াশোনা করতাম না এমন নয় , কিন্তু শেষ বেঞ্চটায় আমার একটা জগৎ ছিল। যেখানে আমি যখন ইচ্ছা গান লিখতে পারতাম , কবিতা লিখতে পারতাম ! কেউ দেখত না ! ডিসটার্বও করত না।
একদিন অনেকবার বারন করা সত্ত্বেও কথা বলছিল। ঐ জন্য বোর্ডে নাম তুলে দিয়েছিলাম। পানিসমেন্ট পেয়েছিল স্যারের কাছে।স্যার ওকে একটু অপমানই করেছিল সেদিন।” নতুন এসেই শুরু করে দিয়েছ ? বা ! ভাল। তো আগের স্কুলেও কী এরমই করতে বাবা ? বাবা মিলিটারী অফিসার তো? একটু সহবত শিখলে পারো তো !” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার খুব খারাপ লাগছিল। মাথা নীচু করে শুনছিল। চোয়াল দুটো শক্ত করে ছিল! আমার নিজেরই খুব খারাপ লাগছিল। নামটা না তুললেই ভাল হত। তবে সেটা করলে পার্সিয়ালিটি হত। প্রিফেক্ট হয়ে আমি সেটা কখনও করব না! এই নিয়ে চার বছর প্রিফেক্ট ছিলাম , এই প্রিন্সিপালটা তৈরী হয়ে গেছিল যেন কিভাবে ! ঠিক কিভাবে তৈরী হয়েছিল আজ আর মনে নেই।
ভেবেছিলাম একবার ‘সরি’ বলি। তারপর কী মনে হতে আর বলা হয়নি। পরের পিরিয়ডে দেখলাম আর কথা বলছে না। তারপর থেকে আর বেশী কথা বলত না !এটা আমার খারাপ লাগাটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কোনোভাবেই কথা বলার সুযোগ হয়নি !
শেষমেশ সিকে ছিঁড়ল , ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষায়। আমাদের পরীক্ষায় সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী ও আর আমি এক বেঞ্চে ! আমি আগে জানতাম না। যখন এসে পাশে বসল তখন তো মনের মধ্যে যে কী হচ্ছিল যে কী বলব ! তবে এইবার আমাকে আর এগোতে হয়নি।নিজেই বলল , একটু টিজ করেই ” হাই প্রিফেক্ট !”
” হাই!”
পাশে বসল।” প্রেপারেশন কেমন ?”জিজ্ঞাসা করল।
“বাংলা আমার পছন্দের বিষয়! সো … ভালোই। তোর ?”
” আমারও ভালোই মোটামুটি। আগে তো কখনও বাঙলায় থাকিনি , ইউপি তে ছিলাম। ওখানে বাঙলা ছিল না। হিন্দি ছিল …”
” তা হিন্দিই তো নিতে পারতিস !”
” না আমি বাংলা জানি। বাড়ীতে মা শিখিয়েছে। আর সত্যি বলতে হিন্দি আমার ভাল লাগে না !”
” বাঙালী বলে ?”
” মনে হয় !” বলে হাসল ।আমি আগেও লক্ষ্য করেছি হাসলে ওর গালে টোল পড়ে। তবে সেদিন কাছ থেকে লক্ষ্য করলাম। মনের মধ্যে যে কী চলছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
” ইউ লুক কিউট… বাই দ্য ওয়ে ” ফ্লার্ট করা শুরু।
ও কথাটা শুনে, কী?-তাই?-সরি!-মার্কা একটা ফেস দিয়ে হেসে বলল ” থ্যাঙ্কস্ !”
এ শিওর গে না !
যাই হোক , সেদিনের পরীক্ষা হল ! শেষে বললাম ” হে .. সেদিনের জন্য আই অ্যাম সরি !”
” কোন দিন?…. ও ! ঐদিন?,… নো ইটস্ ওকে। তোর কাজ তুই করেছিস ! এতে সরি বলার কী আছে !”
” স্যার ওভাবে বলবে জানলে নাম তুলতাম না !”
” ইটস্ ওকে রে বাবা !” বলে হাতে হাত রাখল ” রিল্যাক্স ! আই ডিড নট মাইন্ড !”
ওকে ! এ শিওর গে !
এইভাবেই শুরু হয়েছিল ওর সাথে আমার পথ চলা !

সারা পরীক্ষাটা ওর পাশে এবং সাথে দিতে দিতে আমাদের মধ্যের দুরত্বটা কিছুটা ঘুচেছিল ! তবে আমার কাছে সেটা খুব যে স্বস্তির ছিল তেমনটা না। ও গে না। আমি কখনও ওকে আমার দিকে তাকাতে দেখিনি সেভাবে। বাইরে বেরোলে , রাস্তায় আমায় দেখে মেয়েরা ঘুরে তাকাত। এটুকু তো আশা করতেই পারি যে সম্বর্তকও ঘুরে তাকাবে !তাকাইনি কারণ ও গে না। …. যাই হোক আমরা দিন দিন খুব ভাল বন্ধু হয়ে উঠছিলাম।
ও আমার শেষবেঞ্চের সংসারে ছিল নতুন অতিথি।কেউ যদি কখনও আমার সাথে শেষ বেঞ্চে বসত আমার ভীষন ইরিটেশন হত। কিন্তু ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। যেন অনেকদিন পর এমন কাউকে পেয়েছিলাম যাকে আমি খুঁজছিলাম অনেকদিন ধরে। কিন্তু এই খোঁজার যে কোনো ভবিষ্যত ছিল না ! ও তো গে না। ও যদিও আমার সমকামী হওয়ার ব্যাপারটা তখনও জানত না। একদিন টিফিনে বসে লাঞ্চ করছি একসাথে , ও হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল ” ডু য়ু হ্যাভ গার্লফ্রেন্ড ?”
” নো !”
” লায়ার …”
” নো … সিরিয়াসলী !”
” ওকে ! মে আই আস্ক ইউ হোয়াই !”
” বিকজ্ আই অ্যাম গে !”
” ইউ আর জোকিং ! রাইট ?”
” নো আই অ্যাম নট্ !” আমি শান্তভাবেই উত্তর দিচ্ছিলাম। আমি জানতাম না ও হোমোফোবিক কি না , তাই আমি সব দিক থেকে প্রস্তুত ছিলাম যে কোনো ধরনের প্রতিরোধের জন্য। ও কিছু বলছে না দেখে বললাম ” এটা জানার পর যদি আমার সাথে কথা বলতে অসুবিধা হয় , ইউ ক্যান লিভ্ ! আমি কিছু মাইন্ড করব না !”
“না! চলে যাব কেন ? তুই আমার বন্ধু য়ার ! তুই যা তুই তা ! আমি আসলে ভেবেছিলাম তোর বুঝি একটা হট্ সা , সেক্সি সা গার্লফ্রেন্ড থাকবে ! ” যেরম এক নিঃশ্বাসে কথা বলত সেরম বলে গেল।
আমি হাসলাম। আমার কিছু বলার ছিল না। ও আবার জিজ্ঞাসা করল ” বাই দ্য ওয়ে তোর বয়ফ্রেন্ড আছে ?”
” নট্ ইয়েট !”
” এইবার তো মিথ্যা বললি বল ?”
” না সিরিয়াসলি ! আমি সিঙ্গল !” আমি সেদিন মিথ্যা বলেছিলাম। আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল। আমি মিথ্যা বলেছিলাম কারণ আমার মনে হয়েছিল ওর জন্য সমস্ত রাস্তা খুলে রাখা উচিত ! যাই হোক… আমরা সবসময় যেরম চাই সেরম তো হয় না ! ওরও আমার জীবনে , আমি ওকে যেভাবে চাই , সেভাবে আসার কোনো চান্স ছিল না !
” কিস্ করেছিস কখনও ?” আর একদিন জিজ্ঞাসা করল।
” অনেকবার ! তুই ?”
” না !” যেন মনে মনে কিছু একটা ভাবছিল। কিরম উদাস করা কন্ঠস্বর ছিল সেদিন ওর। ” সেক্স ?”
” হ্যাঁ করেছি !”
” আই অ্যাম স্টিল ভার্জিন !”
” আই ক্যান হেল্প য়ু টু লুজ য়োর ভার্জিনিটি !”
” নো থ্যাঙ্কস্ ! আমি গে না রে পাগলা !”
” আই উইশ যদি তুই হতিস !”
ও কিছু বলল না। শুধু হাসল। ওর সাথে এত ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল তাও যেন আমার খালি মনে হচ্ছিল আমাদের মধ্য একটা সমুদ্রের মতো গ্যাপ আছে ! আমি বুঝতে পারছিলাম না সত্যি কী না ! নাকি আমার কল্পনা । হয়ত গে-স্ট্রেট ভাল বন্ধু হলেও এই গ্যাপটা থাকে ! কে জানে !
আমি নিজের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টশন বুঝতে পেরেছিলাম ক্লাস সেভেনের প্রথম দিকে। রুপায়ন দা হেল্প করছিল।রুপায়ন দা আমাদের স্কুলেই পড়ত। টেন পাশ করার পর দিল্লি চলে গেল। কেন গেছিল জানা নেই।
রুপায়ন দার সাথে আমার পরিচয় প্রিফেক্ট মিটিং এ ।সেখান থেকে কী করে আমাদের সম্পর্কটা নতুন বিল্ডিংয়ের বাথরুমে চলে গেছিল আমার আজ আর মনে নেই।তবে সেসময় সেটা না হলে যে আমার কী হত আজ ভাবলে কেমন একটা লাগে !
রুপায়ন দা আগের মাসে বিয়ে করেছে। ফেসবুকে ছবি দেখলাম। ভালোই ! রুপায়ন দা বিয়ে করবে আমি জানতাম। কেউ যদি ইচ্ছে করে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়… যাকগে যার যার ব্যাপার !
আমার তখন যে বয়ফ্রেন্ড ছিল শোভন , ও আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক প্রতুল বাবুর ছেলে।শোভন যদিও আমাদের স্কুলে পড়ত না। শোভনের মা যে স্কুলের টিচার , ও সেখানে পড়ত। ওর সাথে আলাপ প্রতুল স্যারের কাছে টিউশনি পড়তে গিয়ে। মানে ঠিক আলাপ না। দেখেছিলাম টিউশনি পড়তে গিয়ে।তারপর ফেবু মারফত আলাপ ! তারপর যা হয় , দেখা করা , ঘোরা এবং শেষে বয়ফ্রেন্ড হওয়া।
তবে বেশী দিন সম্পর্কটা ওর সাথেও লাস্টিং করল না।যতদিন আমি আঁকড়ে ছিলাম ;ছিল। ছেড়ে দিতেই শেষ ! ও একটু বেশীই সেক্স ফ্রিক ছিল । ফোন করে কেমন আছ- কী করছ , এসব না। ফোন করেই “সেক্স চ্যাট করব ! “
আমার ভাল লাগছিল না আর। সম্বর্তক আমার জীবনে আসাতে আমি সত্যিই শোভনকে ছাড়ার একটা ছুতো পেলাম। শারীরিক না। মানসিক। আগে ওর প্রতি যেরম অনুভূতি ছিল সেটা আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছিল আর ততই আমরা আরো ভাল বন্ধু হয়ে উঠছিলাম।
ও তখনও বেশীর ভাগ দিনই সেকেন্ড বেঞ্চে বসত। আমার যথারীতি দেখার আশ মিটে গেছিল ।তাই আবার প্রিফেক্টের কাজে ফাঁকি দেওয়া শুরু। একদিন এসে বলল ” আজ এখানে বসব !”
আমি সরে বসলাম। একটু ডিসটার্ব দেখাচ্ছিল। ও মাঝে কিছুদিন অসুস্থতার জন্য কামাই করেছিল। জ্বর হয়েছিল বলল। দুর্বল দেখাচ্ছিল।
থার্ড পিরিয়ডটা শেষ হতে বলল ” একটা কথা বলব ? কাউকে বলবি না বল !”
” না বল্ ! কী হয়েছে ?” আমার মনে তখন কী যে চাপা উত্তেজনা হচ্ছিল যে কী বলব ? মনে হচ্ছিল হয়ত যেন বলবে ও’ও গে !
“প্রমিস কর … তুইও কিছু বলবি না। জাস্ট শুনবি ! আমি এটা জাস্ট শেয়ার করতে চাইছি!”
” আরে বল না ! য়ু আর গে ; রাইট ?”
” তোর সবসময় খালি ওসব !”
” তাহলে ?”
” আই হ্যাভ লিউকিমিয়া !”

মানে টা কী ? এই ধরনের ইয়ারকী মারার কোনো কারণ আছে কী ? তখন এই প্রশ্নটাই আমার মাথায় ঘুরছিল। আসলে ইয়ারকী মারাটা দোষের ছিল না ওর ! আমি আমার জীবনের দুজন কাছের মানুষকে সামনে থেকে ক্যানসারে একটু একটু করে শেষ হয়ে যেতে দেখেছি তো। আমার দাদু আর ঠাকুমা।দাদু ক্যানসারে আর ঠাকুমা দাদুর চলে যাওয়া মেনে নিতে না পেরে।
দাদুর ক্যানসার ধরা পড়ল ছিয়ানব্বই বছর বয়েসে। হঠাৎ করে। আমার মনে আছে আগের মাসেই দাদুর ছিয়ানব্বই তম জন্মদিন গেছিল। আমরা নাতি নাতনিরা মিলে কেক কাটিয়েছিলাম। বাড়ীটা গমগম করছিল। আমরা প্ল্যান করছিলাম চার বছর পর দাদুর সেনচুরীতে একটা বড় অনুষ্ঠান করা হবে ! দাদু ফিট্ ছিল একদম। আমি ঐ বয়েসে দাদুকে একা একা বাজারে যেতে দেখেছি। বাজার করে রিক্সা করে ফিরত। ফিরেই আমার ডাক পড়ত ” বড়কত্তা !!!” আমি ছুট্টে গিয়ে কতক্ষনে বাজারের ব্যাগ গুলোকে নেব। সেগুলো নিয়ে ঘরে রাখতাম। আর তাড়াতাড়ি করে রিক্সায় উঠে বসে পড়তাম। দাদু টাকা বার করে টাকা দিত রিক্সাওয়ালাকে। তারপর রিক্সাওয়ালা রিক্সাটা ঘোরাত , তারপর নামতাম। আমাদের খাওয়া দাওয়া আলাদা হলেও তখন আমরা এক বাড়ীতে ছিলাম। হঠাৎ করে কী থেকে কী হয়ে গেল… চার পাঁচ মাসের মধ্যেই যেন আশেপাশের ভাল লাগার জিনিষগুলো এক এক করে বদলে গেল । আগের ভাল লাগার জিনিষ গুলো ছেড়ে ছেড়ে যেতে লাগল এক এক করে।দাদু প্রথমবার কেমোটা সারভাইভ করলেও দ্বিতীয় বারের টা পারলেন না। হার্টের অসুখ একটু ছিলই। নিতে পারেননি ….
আর ঠাম্মা ! ছোটোবেলা থেকে দেখেছি , বা বলা ভাল, ঘুম থেকে উঠতামই ঠাম্মা-দাদুর ঝগড়া শুনে। ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া ,খিটির মিটির লেগেই থাকত। কিন্তু দাদু চলে যাওয়ার পর কী জানি কী হল , ঠাকুমা যেন বাঁচার রসদটাই হারিয়ে ফেলেছিল। সেই যে বিছানায় পড়ল, আর উঠল না। অথচ ঠাকুমার মনের জোর ছিল প্রচুর।মা বলে , মা’র বিয়ে হয়ে আসার পরপর ঠাকুমা সিঁড়ি থেকে পড়ে একটা সাইড পরে গেছিল। কিন্তু কিছুটা ঔষুধে আর অনেকটা মনের জোড়ে ঠাকুমা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ওপরে পুজো করতেও যেত ! সে এবারে পারল না কেন… হয়ত আগের বার চেয়েছিল সুস্থ হতে ! এইবার আর চাননি।
আর ঠাম্মা দাদু চলে যেতে , যাও বা এক ছাদের তলায় ছিলাম, তাও আলাদা আলাদা হয়ে ছড়িয়ে গেলাম।এই ছড়িয়ে যাওয়াটা কার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে জানি না, আমার জীবনটা পাল্টে দিয়েছে। মানসিক জগৎটাকে ছারখার করে দিয়েছে। আমার এখনও মনে হয় দাদুর ক্যানসারটা না হলে উনি এখনও বাঁচতেন। ঠাকুমা বাঁচতেন। আমাদের বাড়ীটা থাকত । আমরা সবাই একসাথে থাকতাম এখনও। হয়ত আজন্মকাল এইভাবেই চলত….
আমাকে সিরিয়াস হতে দেখে বুঝতে পেরেছিল যে আমি ওর ইয়ারকিটা ভাল ভাবে নি’নি !
” সরি… আমি বুঝতে পারিনি তুই এতটা সিরিয়াস হয়ে যাবি ! তাহলে বলতাম না…”
” আর কখনও এই ফালতু ইয়ারকিগুলো আমার সাথে মারবি না ! জানিস ক্যানসার হলে কী হয় ? অতো মরার সখ ?” আমি একটু বেশী চেঁচিয়ে ফেলেছিলাম।
” সরি..বাবা! সরি …” বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল ” আর বলব না !”
সেই প্রথমবার ও আমায় জড়িয়ে ধরেছিল।ওর গায়ে একটা অন্যরকম গন্ধ ছিল , সেটা ওর পাশে বসলেই পাওয়া যেত।কোন পারফিউমের গন্ধ না । শরীরজাত গন্ধ। এই ধরনের বিশেষ গন্ধ আমি মায়ের গায়ে পাই। মা ঘেমে থাকুক ছাই না থাকুক মায়ের গায়ে এক অদ্ভুত গন্ধ আছে। শত ভিড়েও আমি মা’কে শুধু গায়ের গন্ধ শুঁকে চিনে নেব।ছোটোবেলায় মনে আছে মাকে জড়িয়ে ধরে শুতাম গন্ধটা নেব বলে। শান্তি লাগত।সম্বর্তক জড়িয়ে ধরাতে ওর গন্ধটা যেন নাক দিয়ে আমার শরীর ভেতর প্রবেশ করল যেন !
” নাও… য়ু আর ফাইন ?”
” হমম !” আমার ওকে জড়িয়ে ধরে থাকতেই ইচ্ছা করছিল। কিন্তু মনকে বোঝাচ্ছিলাম যে এই জাতীয় একটা সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে লাভ নেই ! কী হবে শুধু শুধু কষ্ট পেয়ে ? আর ও’ও হয়ত বিব্রত হবে ।শুধু শুধু মাঝখান থেকে বন্ধুত্বটা যাবে ! তার থেকে এই বন্ধুই তো ভাল আছি !

” তোর ভাল রাগ তো !” পরে বলেছিল।
আমার লজ্জা লেগেছিল সেদিন! কী ভাবল আমি একটু বেশী সেন্টিমেন্টাল ! আমি হেসেছিলাম । কী আর বলব ? আমি বরাবর সেন্টিমেন্টাল। কিন্তু কখনও দেখাই না। আমি চাই সবাই আমাকে ভাবুক আমি খুব সাহসী। যার কোনো সেন্টিমেন্ট নেই। দুর্বল ভাবলে লোকে সুযোগ নেয়। আর আমি চাইতাম না , এখনও চাই না , কেউ আমার সুযোগ নেয়।
” সরি আমি বুঝিনি তুই ওভাবে নিবি … সরি সরি !” বলল।
” ইটস্ ওকে ! ভবিষ্যতে এরম ইয়ারকি আর মারিস না… আমার ভাল লাগে না !”
” আচ্ছা বেশ !” বলেই একগাল হাসি !
প্রতি মুহুর্তে আমার খালি মনে হচ্ছিল যে ও যদি গে হত ভাল হত!!

একটু একটু করে যে চিন্তাটা , মানে সম্বর্তককে পাওয়ার যে ইচ্ছাটা ,চলে যাচ্ছিল সেটা ও যেভাবে সেদিন জড়িয়ে ধরল আর যেভাবে ওর গন্ধটা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দিল ,তাতে আবার যেন সেই চিন্তাটা উঠছিল । এই স্ট্রেট ছেলেদের প্রেমে পড়াটা যে কী ঝামেলার! কিন্তু কী করব? মনকে শত বুঝিয়েও কন্ট্রোলে রাখা যায় না। মন একবার ঠিক করলে যে কারোর প্রেমে পড়বে সে পড়বেই। যতক্ষন না পর্যন্ত ঘা খেয়ে ফিরে আসে ততক্ষন ওখানে জোঁকের মতোই পড়ে থাকবে। এমন ভাব যেন এরম ভাল আর আমি কোনোদিন কাউকে বাসিনি।
শোভনেরও নতুন বয়ফ্রেন্ড হয়েছে খবর পেলাম। ওর যে তাড়াতাড়ি বয়ফ্রেন্ড হবে জানাই ছিল। আমার ধারনা আমার সাথে সম্পর্কে থাকতেই ওই ছেলেটার সাথে ও সম্পর্ক রাখত। ভালোই করেছে। আমাদের সম্পর্ক যখন শেষ তখন ও কী করছে না করছে দেখে আমারই বা কী ? আসলে ব্যাপারটা কিছুই না। তখন খালি ভাবতাম ওরা এত তাড়াতাড়ি মুভ-অন করে, আমি পারি না কেন ?
সেদিন সম্বর্তককে বাড়ীতে নিয়ে এসেছিলাম। এসেই সটান মা’র সাথে রান্নাঘরে। দুজনের খোসগল্প দেখে আমার নিজেকেই ব্রাত্য লাগছিল। মাকে কীসব রান্নার টিপস্ দিচ্ছিল । মা’ও এটা ওটা দেখাচ্ছিল ! আমি ওকে নিয়ে এসেছিলাম ওর সাথে একটু সময় কাটাবার জন্য আর ও এসে মার সাথেই ভীড়ে গেল ! একটু পর এসে বলল ” চ’ বেরোই ! দেরী হয়ে যাবে !”
” যা আর কী ! “
” বাবাহ্… কী দুঃখ ছেলের !”
আমি বুড়ো আঙুল তুলে কাঁচকলা দেখালাম।এই হচ্ছে স্ট্রেট ছেলেদের দোষ। জানে সব। কিন্তু খেলাবে। অবশ্য কে না চায় যে লোকে তাকে পছন্দ করুক ! সবাই চায়। আমিও চাই। আমিও তো চাইতাম যে সম্বর্তক আমাকে পছন্দ করুক। তবে তার থেকে আমার ভয় ছিল অন্য জায়গায়। আমি খালি তখন সেই দিনকার জন্য অপেক্ষা করছিলাম যেদিন ও হয়ত কোনো মেয়ের ছবি দেখিয়ে বলবে এই মেয়েটার সাথে ও প্রেম করছে! বা আমাকেই হয়ত বলবে লাইন করিয়ে দিতে। আমার তাও শিক্ষা হবে না হয়ত।
বি সেকসনের সৌরভও গে ছিল। ওর বয়ফ্রেন্ড ঋতেশও ওর সেকশনেই। পাশাপাশি বসত। সৌরভের আমার সাথে কী সমস্যা ছিল কে জানে আমাকে দেখলেই ঋতেশের সাথে এত ন্যাকামো করত যেন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে করছে। ভুলও হতে পারি। হয়ত আমার ওরম কেউ ছিল না বলে আমার রাগ হত তখন ওদের দেখে। তাই হয়ত ভাবতাম ওরা ইচ্ছা করে আমাকে রাগাচ্ছে !কে জানে ! সেই রহস্য আমার কাছে এখনও অজানা।
আমি সম্বর্তকের ভাল বন্ধু হয়ে উঠছিলাম ঠিকই কিন্তু দিন দিন আমার মধ্যে একটা ফ্রাসটেশন গ্রো করছিল। আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম। কোনদিন যে ওকে বলে বসতাম যে আমি ওকে ভালবাসি তার ঠিক ছিল না। সাথে ভয় ছিল যদি বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে যায়। ক্লাসে বেশীর ভাগ জানত আমার ব্যাপারটা। কিছুজন ভালভাবে নিয়েছিল। কিছুজন নেয় নি। যারা নেয়নি তারা কথা বলত না। আমার তাতে কিছু এসে যেত না।তবে তাদের সংখ্যাটা নেহাত অল্প ! পিছনে যে লাগত না তা নয় কিন্তু ওসব আমি গায়ে মাখতাম না। ওদের কাছে সম্বর্তককে বন্ধু হিসাবে পাওয়াটা একটা বাজি ছিল। আমি সেটায় উত্তীর্ন। এবার যদি বন্ধুত্বটা ভেঙে যায় সবার মনে সন্দেহ তো উদ্রেগ হতোই যে হয়ত আমিই কিছু করেছি বা বলেছি। আর গে হলে বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার দোষ সমকামী ছেলেটারই। আমাদের যেন আর ভাল লাগতে নেই আর ভাল লাগলেও বলতে নেই।
একদিন ফোন করে বলল কিছুদিন স্কুলে আসবে না। কোথায় একটা যাবে ! ওর বাবার সাথে ।হোম ওয়ার্ক গুলো যেন আমি নোট ডাউন করে রাখি আর ওর রঘু দাদা না কে বেশ, তাকে ফোন করে জানিয়ে দিই। পরে জানলাম রঘু দাদা ওদের ড্রাইভার। আমি বললাম যে ঠিক আছে। ওকে ফোন করতে পারলেই তো ভাল হত। কিন্তু ও বলল যে ওর ফোন নেই, আর ওর বাবার ফোনে ফোন করলে হয়ত কাকু রেগে যেতে পারে।তারপর তো আর কিছু বলার থাকে না।

মাঝখানে প্রায় দু’সপ্তাহ ও স্কুলে আসেনি। এই সময়টায় একটা অদ্ভুদ জিনিষ আমি আবিস্কার করলাম। ওকে প্রথম দিকে পাওয়ার ইচ্ছায় যেন একটা সংকীর্নতা ছিল। মনে হত যেন ও একটা বস্তু। ওকে পেলে বড়লোক হয়ে যাব। ওকে ছোঁয়ার ইচ্ছা, ওকে অধিকার করবার ইচ্ছা ছিল একটা। কিন্তু এই দুই সপ্তাহে প্রতিদিন ওকে যত মিস করেছি তত আগের সেই মনভাবটা কেটে যাচ্ছিল। প্রতিদিন একটু একটু করে যেন ওর প্রতি একটা অন্য অনুভুতি গড়ে উঠছিল : যার কোনো চাহিদা নেই। সবে সবে চারপাশ থেকে “প্লেটোনিক লাভ্” এর কথা শুনছিলাম তো তখন। আগে বুঝছিলাম না এখন যেন বুঝছি। তবে সম্বর্তককে ছোঁয়ার ইচ্ছা ,নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছা আমার তখনও ছিল কিন্তু না-হলেও-কোনো-অসুবিধা নেই এই জাতীয় একটা ব্যাপারও মনে কাজ করছিল। তত যেন ওকে ভালবেসে ফেলছিলাম।
রঘু দাদাকে হোম ওয়ার্কের কথাটা বলা যতটা ঝক্কির তার থেকে অনেক বেশী ঝক্কির ছিল তাকে বোঝানো যে ক্লাসে স্যার কী বলেছে।
যাই হোক , দু সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরও সম্বর্তকও এল না। কী হল রে বাবা ! এখনও ঘোরা শেষ হয়নি ? কোথায় এমন গেল যে দুই সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরও পাত্তা নেই তার?: এই চিন্তাই আসছিল তখন।
রঘু দাদাকে প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করতাম আর ওর এক উত্তর ” এখনও তো ফেরে নি!” কেউ টিয়া-পাখিকে যেমন কথা শিখিয়ে দেয় সেরম করে বলত প্রতিদিন। মনে হত যেন রেকর্ড বাজাচ্ছে কেউ। যাই হোক একটা করে দিন যাচ্ছিল আর আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত অধৈর্য্যতা কাজ করছিল। পড়ায় মন বসছিল না। মনে মনে ভাবছিলাম সম্বর্তক এবার আসলে আমি বলে দেব আমার অনুভূতির কথা। যা হবে দেখা যাবে। বন্ধুত্বটা নষ্ট হয়ে গেলে খারাপ লাগবে কিন্তু নিজের এই অনুভূতিটা চেপে রাখতে রাখতে ভেতরে একটা এমন উত্তেজনা কাজ করছিল আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলাম না। কাকে বলব ? বাড়ীতে তখনও জানাইনি। আর জানাব যে এই ভাবনাই তখন আসেনি। মা’র সাথে আমার সব বিষয় নিয়ে কথা হত। মাঝে মাঝে মনে হত বলে দিই … কিন্তু বলতে গেলে এক অদ্ভুত চেন যেন মুখ টেনে ধরত। এক অজানা ভয়ে বলতে গিয়েও বলা যেত না।
সেহেতু বলার একটাই জায়গা : সম্বর্তক। আমি কখনও বেস্টফ্রেন্ড বানাইনি। ছোটোবেলায় একজন ছিল। সার্থক। ও বেস্টফ্রেন্ড হলে কী হবে ভীষন ঝগড়া হত ওর সঙ্গে। তার থেকে কথা বলাবলি বন্ধ। এইসব আমার ভাল লাগত না। তাই একটা সময়ের পর থেকে আর বেস্টফ্রেন্ড বানাতাম না। বানাইও নি পরে আর। তবে সম্বর্তক ঘটনাক্রমেই আমার ভাল বন্ধু হয়ে উঠছিল। তাকে ‘বেস্টফ্রেন্ড’ বলা যায় বা যেত কী না জানিনা ! তবে ওর প্রতি আমার যে একটা অন্যরকম অনুভুতি আছে সেটাও তো অনস্বীকার্য নয়। সেহেতু এই সময়টা, ওর অবর্তমানে, এই টানাপোড়েনটা ভেতর থেকে আমাকে ভেঙে দিয়েছিল। দিচ্ছিল একটু একটু করে। সবে সবে বুঝেছিলাম যে আমি কী ! আশে পাশে আমার বয়সি যারা আমার মতো, তাদের কে দেখতাম আর ভাবতাম ওরা ওদের জীবনটা কি সুন্দর উপভোগ করছে আর আমি যেন সেই ক্লাস এইটেই বুড়িয়ে গেছিলাম কেমন ! সিরিয়াস সিরিয়াস ভাব যেন। এখন ভাবি কী করে ঐ সময়টা নষ্ট করেছি।জীবনটাকে উপভোগ করার সময়ে করিনি। ভাবিওনি করার কথা। তখন মনে হত ওরা ওদের মতো আর আমি আমার মতো। এটা এখনও ভাবি। কিন্তু ওটা ভেবে নিজেকে সমস্ত উপভোগ্য বিষয় থেকে সরিয়ে রাখাটা ঠিক হয়নি তখন। একটা করে দিন গেলে জীবনের একটা দিন কমে যায়। চব্বিশ ঘন্টা করে সময় চলে যায় প্রতিদিন : এ ভাবার বুদ্ধি তখন আসেনি। অথচ ভাবলে অবাক লাগে নিজেকে কতই না ম্যাচিওর ভেবেছিলাম তখন। যেন সবাই বাচ্চা আমি একা বড়। আজ সেসব কথা মনে করলে নিজেকে অর্বাচীন মনে করতে পিছপা হইনা। হাসিও পায় এক প্রকার।

যাই হোক , সে দুই সপ্তাহ আস্তে আস্তে দুই মাসে হয়ে গেল। সম্বর্তক ফিরল না। ওর বাবার কী আবার বদলী হল ? ও তো বলতেই পারত। মিথ্যা বলার তো দরকার ছিল না ! আমি জানতাম যে এই কম সময়ে আমরা এমনও ভাল বন্ধু হয়ে উঠিনি তখনও যে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে তাও … আমার দিক থেকে তো অন্য একটা ব্যাপার ছিল। তাই এত সহজে আমি ব্যাপারটা ভুলতেও পারছিলাম না।
এতদিনে মনের দ্বন্দ্বগুলো একটু একটু করে থিতু হচ্ছিল। ও না আসলে আর কাকে কী বলব ? বলার কিছু নেই। চাওয়াটাও ছাড়তে চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ একদিন স্কুলে গিয়ে ক্লাসে ঢুকছি দেখি সেকেন্ড বেঞ্চে বসে অন্যদের সাথে গ্যাজাচ্ছে। অনেকদিন পর এলতো , অন্যরা ওর পাশে ভিড় করে ছিল। কিন্তু ওর কী অবস্থা এ ? এত রোগা হয়ে গেল কী করে ! আর তার থেকেও আগে যেটা চোখে পরে সেটা ওর চুল গুলো। ওর কোকড়ানো চুল গুলো আর নেই। দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্য নেড়া হয়েছিল । চুল উঠেছে। আমাকে দেখে হাসল। আমার হাসি পায়নি সেদিন ওকে দেখতে। সেদিন আমার বুকটা ছাঁত করে উঠেছিল।কেন তা বলার দরকার আছে বলে মনে হয়না। মনকে বোঝাচ্ছিলাম এটা যেন না হয় ! আমি হাসছি না দেখে উঠে এসে জড়িয়ে ধরল ।” কেমন আছিস ?”
” তুই কেমন আছিস ?”
” এখন একদম ফিট্ !”
” কেন আগে কী হয়েছিল ?”
” আর বলিস না… টাইফয়েড হয়েছিল। সাথে জন্ডিস্ ! দেখে বুঝতে পারছিস না !”
উফফফ আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম একটু। তাও একটা সন্দেহ তখনও ছিল। ও চুলগুলো কাটল কেন ?
” আর চুল গুলো…?”
” আগের মাসে দাদু মারা গেছেন !”
আমি জানি দাদুকে হারানো কেমন হয় ? আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম ” সরি !”
” ইটস্ ওকে ! বাই দ্য ওয়ে থ্যাঙ্কস্ “
” কিসের ?”
” হোমওয়ার্ক গুলো জানানোর জন্য !”
” ঘুরে দাঁড়া… একটা লাথি মারি !”
এখন ও এসে গেছিল, এতদিনের সমস্ত উত্তেজনা ,যে বিরক্তি, যে অস্থিরতা ছিল যেন এক নিমেশে তা গায়েব হয়ে গেছিল। আর যেটা ভাবছিলাম যে ও আসলে এবার বলে দেব আমার মনের কথা সেটার প্রয়োজনও মনে হল না আর। এই তো কাছেই আছে। শুধু শুধু দুরে পাঠিয়ে কী কোনো লাভ আছে ! এই তো ভালোই ছিলাম।

আবারও সবকিছু আগের মতো হয়ে যাচ্ছিল যেন। মাঝে মাঝেই ও উঠে এসে আমার সাথে শেষ বেঞ্চে বসত। এসে ঘুমাত। আসলে এত অসুস্থ ছিল যে তখনও দুর্বলতাটা ছিল। আর ঘুমানোর সময় আমার হাতটা ওর হাতে নিয়ে ঘুমাতো। বলত যে স্যার এ দিকে তাকালে আমি যেন ওকে ডেকে দি। হাত ধরে থাকত যাতে স্যার বুঝতে না পারে যে আমি ওকে ডাকছি। আমি কখনও আগে কারোর হাত ধরে বসিনি। শোভনের এসব ন্যাকামো লাগত। ওর সাথে সেক্স করলে ও খুশী। প্রেম ভালবাসা ওর কাছে ছিল ন্যাকামো। আর দু’ক্লাস উঁচুতে পড়ত তো খালি বড় হওয়ার ফায়দা নিত। ও যা বলত তাই আমাকে মানতে হত। না মানলে কথা বলত না। শোভনের সাথে সম্পর্কটা ভেঙে যেন সত্যিই আমি হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। আমার প্রথম প্রথম তাই সম্বর্তকের হাত ধরে বসতে অসুবিধা হতো । খালি আঙুল টেনে ঠিক করতে হত। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে উঠে মাথা তুলে বলত ” আমাকে একটু ঘুমাতে দিবি না , না ?”
” কেন?”
” কী করছিস হাতটা ধরে ! হাতও ধরতে পারিস না। যখন বয়ফ্রেন্ড হবে কী করবি তখন ?” বলে আবার মাথা নীচু করে শুয়ে পড়ত। আমি ওর দিকে দেখতাম খালি । কী জানি কী একটা আকর্ষণ যেন দিনে দিনে আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল !
কী করব কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না। ওকে কী বলে দেব নাকি ? কিভাবে নেবে ? যদি আর হাত ধরে বসতে না চায় ! এই হাত ধরে বসাটা তখন ওর সাথে কথা বলার থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটা শরীরের ছোঁয়া পেলে যেন শরীরে , মনে কেমন যেন একটা শান্তি হত তা বলে বোঝাতে পারব না এখন। যেন মনে হত আমার জন্যও কেউ আছে। আমার পাশে আছে। আমার হাতে হাত রাখার সাহস রাখে।ওর আসতে দেরি হলে ক্লাসে মাঝে মাঝে অনেকে আমাকে বলত ” কী রে তোর বয়ফ্রেন্ড কই ?”
ওকে কেউ কেউ বলত ” তুই কথা বল! তোর বয়ফ্রেন্ড তো তোর নাম তুলবে না …”
আমার আপত্তি ছিল না। বাস্তবে তো সম্ভব তা ছিল না ওর বয়ফ্রেন্ড হওয়া। তাই হাত ধরে বসা, শেষ বেঞ্চ , রাগানো সব মিলিয়ে একটা কাল্পনিক জগৎ গড়ে উঠছিল। আমার ভয় ছিল ওকে নিয়ে। হাত ধরে বসা আর অন্যদের রাগানো সহ্য করার মধ্যে পার্থক্য আছে। কিন্তু ও’ও ইয়ারকিটাকে ইয়ারকি হিসাবেই নিত। ও ইচ্ছা করে কথা বলত। আমিও নাম তুলতাম না। অন্যদের নাম তুললে যাই বলত যে সম্বর্তকও যে কথা বলছে তার বেলায় ? ও ওমনি বলত ” তুই তো বললি যে বয়ফ্রেন্ড বলে আমি কথা বললেও ও নাম তুলবে না। তাই করছে !” বলেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসত। আমিও হাসতাম। আমাকে কেউ একই নালিশ করলে আমিও বলতাম ” তুই কী আমার বয়ফ্রেন্ড ? ও তো আমার বয়ফ্রেন্ড… ওর নাম তুলব কেন ?”
এই ভাবেই চলছিল আমাদের সম্পর্কের কাল্পনিক রুপরেখা। আমার মাঝে মাঝে মনে হত আচ্ছা ও কী প্রেম করে ? বা কোনো মেয়েকে পছন্দ করে ? জিজ্ঞাসা করলে বলত ” ধুর ওসব মানুষে করে ? আজকেই রিলেশনে যাবি কালই ব্রেক আপ ! কে অতো ঝক্কি পোহাবে ?”
ঠিক কথাই। আমি হাসতাম। আমি মাঝে মাঝে বলতাম ওকে ” তুই গে হলে ভাল হতো !”
ও হাসত। কিছু বলত না। আমার একবার মনে হত আমায় প্রশ্রয় দিচ্ছে হয়তো। পরক্ষনেই কী একটা ভয়ে , ওকে হারানোর হয়তো , এই প্রশ্রয়টাকে মিথ্যা বলেই মনে হত। এখন সেটাকে মোটেও অতো ভয় বলে মনে হয় না , কিন্তু সেই সময় ভয়টা ভুত দেখার মতোই ছিল। যদি বন্ধুত্ব ভেঙে যায় .. কথা না বলে… আর হাত না ধরে… এইসব।
আদিত্য আমাদের স্কুলের যে অরফ্যানেজ কনভেন্ট, সেখানে থাকত। ছোটোবেলা থেকেই ও ওখানেই মানুষ। ওর জন্মদিনে তাই আমরা প্রতিবার ক্লাসে কেক কাটতাম। স্কুল থেকেই খরচা দিত। আমরা অরগনাইজ করতাম। সেবার সম্বর্তকের প্রথম বছর ছিল। সবাই রাকেশের ক্যামেরায় ছবি তুলত। ওর সেই ছোটো থেকে ফোটোগ্রাফির সখ ছিল। ওর বাবা আসলে ফটোগ্রাফার ছিল। সবাই ছবি তুলত। আমার ছবি টবি তুলতে খুব একটা ভাল লাগত না। সেবার সবাই সম্বর্তকের সাথে ছবি তুলছিল। হঠাৎ দেখলাম ও চেঁচাচ্ছে ” এই রাকেশ আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে আমার ছবি তুলে দে তো !” বলে এসে আমার পাশে বসল শেষ বেঞ্চে ! ছবি উঠচিল খচ্ খচ্ করে। ও পোজ চেঞ্জ করছিল। একবার এদিক, একবার ওদিক , একবার মুখ বেঁকিয়ে। শেষ ছবিটার কথা আমার মনে আছে এখনও : আমার গালে ওর ঠোঁটটা ঠেকিয়ে পোজ দিল। ছবি উঠল। আমার ভীষন উত্তেজনা হচ্ছিল এটা কী করল ও ? ও কী তবে … কিন্তু ছবি তোলা হয়ে গেলে যখন উঠে গেল ভীড়ের মধ্যে, আমার দিকে তাকালও না তখন বুঝলাম আমি ভুল ছিলাম। ওর থেকে আমি এসব আশা করছিলাম কেন সেটাই আমি ভাবছিলাম ! সেদিন ক্লাসের দরজা বন্ধ করে গান চালিয়ে নাচা হত। অবশ্যই স্কুলের পরে। সেদিন আমরা সবাই নাচছিলাম। কিছুক্ষন পর দেখলাম সম্বর্তক গিয়ে সেকেন্ড বেঞ্চে বসল। আমি নাচতে নাচতে ইশারায় জিজ্ঞাসা করলাম “কী হল ?”
ও ও ইশারায় বলল যে হাঁপিয়ে গেছে। আমিও যে খুব একটা নাচতাম এমনটা নয়। বাড়ীর লোকেদের সামনে নাচতে কেমন একটা লাগত। আর আমার কাকার ছেলে বিসর্জনে ভীষন নাচত। আমি নাচতে পারতাম না। আরোও নাচতাম না কারণ যদি ওর সাথে আমার তুলনা হয়। তবে স্কুলে তো সব বন্ধুবান্ধব। কেউ কাউকে বিচার করে না। যে যার নিজের মতো নাচে। কিছুক্ষন পর আমিও গেলাম ওর কাছে। বলল ” আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি !”
ও চলে গেল। আমি একটু রেস্ট নিয়ে আবার মাতলাম ওদের সাথে। কিছুক্ষনের পরে জ্যাক দা এল আমাদের ঘরে। জ্যাক দা আমাদের স্কুলের স্টাফ কাম কেয়ারটেকার। এসে বলল ” তোমাদের ক্লাসের একটা ছেলে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে !”
আমি ছুটলাম। অনেকেই ছুটল আমার পেছনে। আমি দেখিনি। ততক্ষনে ওকে নীচের সিক রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।ভেতরে ও’কে শোয়ানো ছিল। মাথায় একটু চোট লেগেছে বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমার ভীষন উত্তেজনা হচ্ছিল। আমি ভেতরে ঢুকে গেলাম। হেডমাস্টার স্যারও ছিলেন। আমাকে খুব ভালবাসতেন উনি। আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম ” স্যার কেমন আছে ও এখন ?”
” বাড়ীতে খবর দেওয়া হয়েছে … ” বললেন উনি।
” স্যার কেমন আছে ও এখন এমনিতে ?” আবার জিজ্ঞাসা করলাম।
স্যার এবারও উত্তর দিলেন না। বেড়িয়ে গেলেন ঘর থেকে। ডক্টর অন্নদাশঙ্কর ত্রিপাঠী ছিলেন। উনি ছিলেন আমাদের স্কুলের ডাক্তার।উনি আমাকে জানালেন ” ওর বাড়ী থেকে বলল যে ও অসুস্থ !”
” হ্যাঁ স্যার ! ওর আগের মাসে টাইফয়েড আর জন্ডিস একসাথে হয়েছিল !”
উনি বললেন ” মনে হয় দুর্বলতার জন্যই মাথা ঘুরে গেছে !”
” হতে পারে স্যার , আজ আমরা নাচছিলাম। ও বলল যে হাঁপিয়ে গেছে তাই ওয়াশরুমে আসছিল !”
আর বেশী কথা হয়নি। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওর বাবা এসে গেলেন।ডক্টর জিজ্ঞাসা করলেন ” রিপোর্ট গুলো এনেছেন ?”
ওর বাবা রিপোর্ট গুলো দেখালেন !
রিপোর্ট গুলো দেখতে দেখতে স্যারের ভ্রু কুঁচকে গেল। তিনি ওর বাবার দিকে তাকালেন ” ও মাই গড্ …. ওর কী টাইফয়েড আর জন্ডিজ হয়েছিল ?”
” না তো!”
ডক্টর ত্রিপাঠী আমার দিকে তাকালেন। আমি বললাম ” আমাকে তাই বলেছিল !” ওর বাবা একবার আমার দিকে তাকালেন।
” কবে থেকে ওর ট্রিটমেন্ট চলছে ?” ওর বাবাকে প্রশ্ন করলেন ।
” আগের আগে মাসে ফ্রার্স্ট কেমো দেওয়া হয়েছে !”
” কেমো ?” আমার অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেড়িয়ে গেছিল।
ডক্টর ত্রিপাঠী বললেন ” হি হ্যজ লিউকিমীয়া !”

ও সত্যিকথা বলেছিল সেদিন… আমি বিশ্বাস করিনি… ও সেদিন সত্যি কথা বলেছিল! আমি ওখানে দাঁড়াতে পারছিলাম না। আমার পা দুটো হালকা হয়ে আসছিল। আমি ওখানে আর থাকিনি সেদিন….আমার মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরছিল : ও সেদিন আমায় সত্যি কথা বলেছিল।

সেদিনের পর থেকে ও আর স্কুলে আসেনি। আসবেই বা কী করে ? এত অসুস্থ শরীর নিয়ে কী কেউ স্কুলে আসতে পারে ? ডাক্তার নাকী ওকে কমপ্লিট রেস্ট নিতে বলেছিল। ও ওসব না শুনে স্কুলে আসত। আমি কখনও বুঝতে পারিনি ও এতটা অসুস্থ। আর বুঝলেও আমি ওর ঐ টাইফয়েড আর জন্ডিসের গল্পটা বিশ্বাস করেছিলাম। করেছিলাম হয়তো নিজের মনে উঠে আসা ভয়টাকে অস্বীকার করতে। আমি তো সত্যিটাই ভেবেছিলাম প্রথমে !আর এমন নয় যে ও আমাকে বলেনি, ও তো আমায় বলেছিল। আমি ওর ওপর চেঁচিয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছিলাম। আমার নিজের ওপরই তখন রাগ উঠছিল।আমি স্বার্থপরের মতো ওকে সেদিন থামিয়ে দিয়েছিলাম। ও বলে একটু হালকা হতে চেয়েছিল। ওরও মনে কত কীই না চলছিল। না! আমি কোনোদিন ওর ভাল বন্ধু হতে পারিনি। যেদিন ওর আমাকে দরকার ছিল আমি ওর পাশে সেভাবে ছিলাম না, যেরকম আমার থাকা উচিত ছিল। অবশ্য জানলেই বা কী? আমার তো কিছু করার ছিল না।
প্রথমে ভেবেছিলাম ওর সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখব না। কী হবে রেখে ? ওর যা অবস্থা… আমি তো এ দেখে অভ্যস্ত। আমার আর একটা মৃত্যু দেখার , আর এই ভাবে, দেখার শক্তি নেই।
আগে অনেকবার অবসর সময়ে ভেবেছি যদি কোনোদিন ভালবাসার মানুষটাকে ছেড়ে চলে যেতে হয় ? যদি আমি মরে যাই ? যে’ই আমার বয়ফ্রেন্ড হোক না কেন , আমার এই ছেড়ে চলে যাওয়াটা ও কীভাবে মেনে নেবে ? বাস্তবে এরম হলে কে কীভাবে নেবে তা আমি জানি না। তবে ভাবতে তো ভালো লাগেই যে সে’ও আমার জন্য কষ্ট পাবে। হয়ত সিদ্ধান্ত নেবে কোনোদিন আর কারোর সাথে সম্পর্কে যাবে না। আমার কথা চিন্তা করতে করতেই সে পার করে দেবে বাকীটা জীবন। ভাবতাম কারণ নিজেকে স্পেশাল মনে করার জন্য। এটা ভেবে আনন্দ হত যে কেউ আমাকে জীবনে এতটাও ভালবেসেছিল। কিন্তু উল্টোটা কখনও ভাবিনি। তবে একদম যে ভাবিনি এমনটাও নয়। আমার ভালবাসার মানুষটাকে চোখের সামনে শেষ হতে দেখলে কী করব আমি ? আমি কী কাঁদব ? আমার জীবন কী শেষ হয়ে যাবে একদম ? বিচ্ছিন্ন করে দেব কী নিজেকে জগতের থেকে? এইসব ভাবতেই ভাল লাগে হয়ত। সত্যি সত্যিই যখন এরম হয় , তখন একজনের মৃত্যুর প্রতীক্ষা করাটা নিজের মৃত্যুর প্রতীক্ষা করার থেকে কোন অংশে কম নয়। বরং আর বেশী। কারণ মানুষ মাত্রই বা বলা ভাল প্রেমিক মাত্রই নিজের প্রতি উদাসীন কিন্তু অপর জনের প্রতি অসম্ভব আবেগপ্রবন। এসব বলার কথা হলে সত্যিই ভাল লাগত। কিন্তু সেদিনের পর থেকে প্রতিকটা দিন আমার যে কী দুর্বিঃসহ হয়ে উঠেছিল তা বলে বোঝাবার জন্য না।
আমি ওর পর ফোন করিনি ওকে। বিনা কারণেই ওর প্রতি এক অদ্ভুত অভিমান জমে উঠেছিল। আমাকে আর একবার বিশ্বাস করে বলতে পারত না ? ছেড়েই যখন যাবে তখন এল কেন আমার জীবনে ? আমার তখন একবারের জন্যও মনে হয়নি আমি ওকে যে চোখে দেখি ও তো আমাকে তা ভাবে না। এসব ভেবে কী হবে ? কিন্তু আমি এসবই ভেবে গেছি। আর ভেতর ভেতর ভেঙেছি। গড়েওছি। যে প্রেমকাহিনীটা কাল্পনিক জগতে তৈরী হচ্ছিল সেটা আমার কাছে যেন বাস্তব হয়ে উঠেছিল । আমার মনে আছে , ঐ সময়, আমি ওকে কল্পনা করে নিয়ে অনেক কথা বলতাম। আমি জানতাম ও আমার সামনে নেই। তাও ভাবতাম ও আমার সাথে আছে। এরম করতে করতে কখন যে মনে হতে শুরু করেছিল ও আমার পাশেই , আমার কাছেই। আমরা সেই কবেকার বয়ফ্রেন্ড ! আমাদের কেউ পৃথক করতে পারবে না। মৃত্যুও না।
অথচ আমার মনে হয়নি ওর সাথে একবার গিয়ে দেখা করার কথা। মনে হয়নি কারণ চাইনি। আমি দাদুকে যে অবস্থায় দেখেছি ওকে আমি সেই অবস্থায় দেখতে চাইনা। ওকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেইদিনের স্মৃতিটা আমার মনে থেকে যাক। আর কিছু চাইনি।
তিন মাস কেটে গেল মাঝে। একদিন ঘরে ছিলাম। ভালোই ছিলাম সম্বর্তকের সাথে। প্ল্যান করছিলাম এরপর আমরা কী করব। সামনে বোর্ড এক্সাম।কীভাবে প্রিপেরেশন নেব। মা ডেকে বলল কে একটা ফোন করেছে ।আমাকে চাইছে।
“হ্যালো ?”
” কথা বলো …” রঘু দাদার গলা। ঐ টুকু শুনেই আর কিছু শোনা গেল না।
“হ্যালো?”
এবারও কিছু শোনা গেল না। আমি জানতাম ওপারে ও আছে। কথা বলছে না। আমিও ফোনটা ধরে রইলাম।
অনেকক্ষন পর বলল ” আমাকে ভুল বুঝিস না। তুই কষ্ট পাস বলেই তোকে বলিনি…”
আমার ভেতর তখন কী হচ্ছিল বলে বোঝাত পারব না। ওর ওরম ক্ষীণ গলার স্বর , শরীর মনে হয় আরো খারাপ হয়েছে … ওর কথা সব মিলিয়ে আমার ভেতরটা পাকিয়ে উঠছিল। আমি কাঁদতে পারছিলাম না। মা একটু দুরেই সোফায় বসে টিভি দেখছিল। আমার ভেতরটা হু হু করে উঠেছিল। নিজে থেকেই যেন ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
” কেমন আছিস ?” জিজ্ঞাসা করল।
আমি ভাল নেই। এই কিছুক্ষনেই যেন আমার এই তিন মাসে বানানো কাল্পনিক জগতটা ভেঙে যাচ্ছিল। “তুই কেমন আছিস ?” জিজ্ঞাসা করলাম।
” ভাল। দেখা করতে আসবি না ?”
না… আমি যাব না দেখা করতে। আমি ওকে ঐ অবস্থায় দেখতে চাই না। ওর কাছে হয়ত এইসব কিছুই ম্যাটার করে না। আমার কাছে করে।
” পরশু দিন আমার সেকেন্ড কেমো… জানিনা আর ফিরব কী না! একবার কাল দেখা করে যাস…পারলে ! রঘুদাদা ঠিকানা বলে দেবে তোকে !” বলে ফোনটা রঘুদাদাকে দিল। যেন এতটুকু কথা বলেই সে হাঁফিয়ে উঠেছে।
রঘুদাদা ঠিকানাটা বলল বটে তবে আমি ঠিক করেইছিলাম আমি যাব না। যাব না মানে যাব না… ও তো চলে যাবে ! আমার কথা ও কী ভাববে তারপর ?

অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি সেদিন। ছুটে গেছিলাম ওদের বাড়ীতে। ঠিক বাড়ী না। বাংলো গোছের। ওর বাবা মিলিটারীতে উচ্চপদে ছিল তাই হয়ত তার এলাহী আয়োজন। ঢুকতেই বড়ো লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড ধরল। বললাম যে দেখা করতে যাব সম্বর্তকের সাথে। আমাকে তারা কিছুতেই ঢুকতে দেবে না। প্রথমত তো বাঙালী নয় আর আমার হিন্দি ততটাই খারাপ। শেষ পর্যন্ত রঘু’দাদার নামটা মাথায় এল। কষ্ট করে জিজ্ঞাসা করলাম ” রঘু দাদা অন্দর হে ?”
” কৌন ? ডেরাইভার রঘু ?”
” হ্যাঁ .. মতলব, হা ! ওহি ওহি !” লোকটা শুনে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষন পর ফিরে এল রঘু দাদাকে সাথে নিয়ে।
আমি রঘুদাদাকে বললাম যে আমি ওর সাথে দেখা করতে এসেছি। রঘুদাদা যা বলল তাতে আমার শরীরের সব শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছিল। এক জানা আতঙ্ক গ্রাস করল যেন। শেষ দেখা হবে তো ?
কাল রাত্রেবেলাই শরীরটা আরো খারাপ করায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। এখন ওখানেই। জোকার ক্যানসার হসপিটালে ভর্তি এখন। আমি রঘুদাদাকে বললাম ” আমাকে নিয়ে যাবে একটু ?”
” একটু দাঁড়াও ! বৌদিও যাবেন। একটু আগেই দাদাবাবুকে নিয়ে ফিরলাম … “
আমার সম্মতি জানানো ছাড়া আর উপায় কী ? আমি তো আর তাড়া লাগাতে পারি না। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। রঘু দাদা ভেতরে চলে গেল। পাক্কা পনেরো মিনিট পর এল। সেদিন সেই পনেরো মিনিট যে কীভাবে কাটিয়েছি কী বলব… লোককে বলতে শুনেছিলাম এক একটা মিনিট যেন এক একটা বছর। আগে মনে হত মেলোড্রামা। সেদিন সত্যিই বুঝলাম এক একটা মিনিটকে কীভাবে এক একটা বছর হয়ে যায় !
রঘুদাদা গাড়ি নিয়েই বেরিয়ে এল। দেখলাম পিছনের সীটে একজন ভদ্রমহিলা ।নিশ্চই ইনি ওর মা। ভদ্রমহিলা দরজা খুলে দিয়ে বললেন ” আসো !” বেশ ছিমছাম ঘরোয়া মহিলা।
আমি উঠে বসলাম আর গাড়ি চলতে আরম্ভ করল। ওর মা জিজ্ঞাসা করল “তুমি কৌশিক তো?”
” হ্যাঁ কাকিমা !”
” ও বলেছিল তুমি আসবে … ভাল করেছ। আর তো চলেই যাবে ! শেষ দেখা করে নাও … ” ও মা কেমন শান্তভাবে বলে চলল। কতটা কষ্ট পেলে একজন মা তার সন্তানের মৃত্যুর কথা এমন অনায়াসে বলতে পারে তা সেদিন না বুঝতে পারলেও আজ বুঝি।আর তখন বোঝবার মতো বয়সও ছিল না।
আর একটি কথাও হয়নি গাড়িতে। উনি জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রেখে চলছিলেন। আমিও আমার মতোই প্রহর গুনছিলাম কখন ওর দেখা পাব।
যখন গাড়িটা হসপিটালের সামনে এসে পৌছল তখন যেন আমার পা যেন স্থির হয়ে গেছে। নড়তে পারছি না যেন। গিয়ে কী দেখব ? ঠাকুর প্লিজ আমাকে যেন কিছু দেখতে না হয়… আমি নিতে পারব না। বাড়ীতে কিছু বলে আসিনি। বাড়ীতে যেন ফিরতে পারি : এই প্রার্থনাই করছিলাম শুধু ।
কাকিমা আর আমি একসাথেই ঢুকলাম।বললেন ” তিনতলায় ওর ঘর…” বলে লিফ্টের সামনে দাঁড়ালেন। লিফ্টে উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলেন “তোমার বাড়ীতে কে কে আছে ?”
” মা বাবা… আর আমি !”
” বা ! ভাল… ” বলে আবার থেমে গেলেন। তিন তলায় থামল লিফ্ট। দরজা খুলে গেল। আমরা বেড়িয়ে এলাম। উনি আমাকে একটা ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন ” ও ঐ ঘরে আছে… যাও দেখা করে এসো! “
” আপনি যাবেন না ?”
” না ! পরে যাব। তুমি আগে যাও… ও তোমাকে ফোন করেছিল কালকে। তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল…”
আমার এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিল আমার নিজের একটা অংশই বোধ হয় আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। আমি কাকিমার সামনে কাঁদতে চাইছিলাম না কিছুতেই। তাই চোয়াল দাঁত হাত সবকিছু শক্ত করে চেপে রেখেছিলাম চোখের জল। আমি এগিয়ে গেলাম ওর ঘরের দিকে। যেতে গিয়ে নার্স ধরল। বললাম আমি ওর বন্ধু। যেতে দেবে না বলল। তারপর কাকিমা পেছন থেকে বললেন ” ওকে যেতে দিন নার্স ! আমার ছেলে ওকে দেখলে খুশীই হবে !”
নার্স অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে নিয়ে গেল ওর ঘরে। ওর খাটটা মাথার কাছটা উঁচু করা। ও শুয়ে আছে এমনি। কোনো নল-টল গোঁজা নেই । আমার জন্য রেহাই। আমি ওসব দেখতে পারি না। দরজা খোলার আওয়াজে চোখ খুলল। এ কোন সম্বর্তককে দেখছি আমি ? বেডের সাথে যেন মিশে গেছে। একটা ফুটফুটে ছেলে …
আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর চোখের কোনা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। আমি মুছিয়ে দিলাম। ” কাঁদছিস কেন ? এইতো আমি এসেছি !” একবারও মনে হয়নি যে ওর চোখের জল মোছাচ্ছি অথচ নিজের চোখের জল আটকাতে পাচ্ছি না।
ও আমার হাতটা চেপে ধরল। আমিও চেপে ধরলাম হাতটা। ভালবাসার কী সত্যিই কোনো নাম হয় ? ও তো স্ট্রেট ছিল। ভালবাসা কী কম ছিল আমাদের মধ্যে ? ওর হাতটা ঠান্ডা হয়ে ছিল। আমি ধরলাম ওর হাতটা চেপে। বললাম ” তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে স্কুলে আয় …”
হাসল। চোখ তখনও লাল। ফোঁপাচ্ছে তখনও।” উইশ আই ক্যান …” ধীরে ধীরে বলল….
আমি বললাম ” একটা কথা বলার ছিল…”
” আমি জানি…”
” কী ?”
” দ্যাট ইউ লাভ মি …!”
আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। এক মুহুর্তের জন্য ওকে খুব নির্দয় লেগেছিল। ও সব জানত যখন কেন করল আমার সাথে এমন? … আমি কিছু বললাম না আর! ও-ও কিছু বলেনি। ওর হাতটা আমার হাতে ছিল। আর ও সিলিং এর দিকে তাকিয়েছিল।
” কবে থেকে জানিস তুই … “
” ফর্ম দ্য টাইম ইমমেমোরিয়াল … ” ওর ইয়ার্কী করার অভ্যাসটা গেল না। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। চুল গুলো বেশী বাড়েনি। বাড়লেও কোকড়ানো যে তা বোঝা যাচ্ছে না। আমি ওর কপালে চুমু খেলাম একটা।
কিছু একটা বলছিল বুঝতে পারছিলাম না। চোখের কোনা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল আবার। আমি মুছিয়ে দিলাম আবার। কানটা মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। ” ক্যান ইউ কিস মী ?”
কোনো কথা বলিনি। আলত করে শুধু ছুয়েছিলাম ওর ঠোঁটটা। ঠোঁটটা কেঁপে উঠল। বলল ” আই উইশ আই ওয়াজ গে !”
” ইউ আর গে… আর নট ইউ ?” কেন বলেছিলাম জানিনা ! ও শুনে শুধু হেসেছিল। সেই হাসি আজও ভুলবার নয় !
নার্স এসে বলল ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। আমি বেড়িয়ে এলাম। জিজ্ঞাসা করল ” কাল আসবি ?”
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম আর আসার আগে কপালে আর একটা চুমু খেয়ে এলাম।
বাইরে কাকিমা বললেন ” রঘু তোমাকে বাড়ীতে ছেড়ে দিয়ে আসবে !”
বাড়ীতে ফিরে এলাম। মনটা আজ অনেকদিন পর হালকা লাগছে। কিন্তু দুশ্চিন্তা হচ্ছিল খুব। রাত্রে শুয়ে আছি। বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছিল। গলাটা শুকিয়ে আসছিল। উঠে জল খেলাম। সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা বাজল। মা বাবা উঠে পড়বে তাই তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলাম….
আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে। আমাদের এক অধ্যাপক ছিলেন তিনি কথায় কথায় বাঙালীদের হেও করতেন যদিও তিনি নিজেও বাঙালী।আমরা তার পেছনে তাকে নিয়ে খুব মজা করতাম।কিন্তু একটা কথা কী একটা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে যদি আমি ভাবি যে আমার-ক্যানসার-হবে আমার-ক্যানসার-হবে ;তাহলে দশ বছর হোক বা বারো বছর হোক আমার ঠিক ক্যানসার হবে। কথাটা মিলে গেল । যদিও এটাই আক্ষেপ যে সেইদিন থেকে যে চাওয়াটা শুরু হয়েছিল তা পুরণ হতে হতে চল্লিশ বছর লেগে গেল। এই চল্লিশ বছরে অনেকবার ভেবেছি সম্বর্তক আর আমার গল্পটা লিখব। সুযোগ হয়নি। আর আমার পার্টনারও ছিল।তার খারাপ লাগবে বলেই লেখা হয়নি আর। পনেরো বছরের রিলেশনে থাকার পর যখন সম্পর্কটা ভেঙে গেল তারপরও বিভিন্ন কারণেই হোক লেখা হয়নি।আজ আমার খুব আনন্দ হচ্ছে যে আমি আমার আর সম্বর্তকের এই কাহিনী লিখে যেতে পারছি। আমার হাতেও আর বেশীদিন সময় নেই। তবে বেচিত্তির নেই, বেঁচেও যেতে পারি। কাল আমার প্রথম কেমো! কী জানি তারপর আর লিখতে ইচ্ছা করবে কী না ! লেখার সামর্থই বা থাকবে কী না। তাই লিখে রেখে গলাম। এ ডায়েরী কেউ পড়বে কী না জানি না ! পড়লে ভাল … আমি আর সম্বর্তক তার মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকব। আসলে লেখক তো… তাই পাঠকের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার লোভ এ বয়েসেও সামলাতে পারি না ….

( সমাপ্ত)


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.