আত্মপ্রকাশ

ফ্লিন রাইডার

প্রথমবার একজন সমকামীর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে পার হয়ে গেছে প্রায় এক বছর, এর মাঝে দেহের চাহিদা মিটিয়েছি কিন্তু কখনো দোটানায় দ্বিধায় কারো সাথে কথা তেমন বলা হয় নি, আমি আসলে জানতাম না একজন প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে কিভাবে আরেকজন সমকামির সাথে কথা বলতে হয়। মন তো আবেগের জায়গা সে জায়গাটা নিয়ে কিছু করার সাহস হয়ে উঠে নি তখন। এমন সময় একজন সমকামী ছেলের সাথে ফোনে কথা বলা শুরু করি , ব্যাপারটা আমার ভাল লাগা শুরু করে, কিন্তু ধর্মীয় আর সামাজিক বিশ্বাসের সাথে না মিলায় প্রচন্ড অপরাধ বোধের প্রচন্ড মানসিক চাপের মাঝে পড়ে যাই।

প্রথমবার আমি আত্মপ্রকাশ করি আমার ভার্সিটির এক বন্ধুর কাছে। আমার আত্মপ্রকাশের সময় অনেক গুলি ভুল ছিল। অনেকজন ক্লোজ ফ্রেণ্ড থাকলেও আমিএই ভারসিটির বন্ধুকে সময়ের সাথে সাথে সবচে বেশি প্রাধান্য দেই। আমি সমকামী তাই আমার মনে সব সময় এমন ভয় কাজ করত যে যদি কেউ জেনে যায় যে আমি সমকামি তবে আমার বন্ধুত্ত কিভাবে নেবে তারা।

আমরা একি বিষয়ে পড়বার কারনে আমাদের লক্ষ্য প্রায় একি ছিল। আমাদের বন্ধুত্ত এমন পর্যায়ে যায় যে আমার বন্ধু তার জীবনে ভাল, খারাপ, খুব গোপন, কারো প্রতি রাগ, হতাশা, তার প্রেম কাহিনী , ভালবাসার মানুষ, লজ্জাজনক সমস্যা, অফিস, পারিবারিক, মজার যত ঘটনা হত সব শেয়ার করত আমার সাথে। অনেকটা আমার উপর দাবি চলে আসে আমার বন্ধুর, সমস্ত ব্যাপার আমি শুনতাম, সমাধান দিতাম, কি করলে তার জন্য ভাল হবে উপদেশ দিতাম। এমন অনেক কিছু বলত যেগুলি আমার বন্ধু অন্য কারো বন্ধুর সাথে শেয়ার করার সাহস পেত না, আমি মনে করি এখনও পায় না। যখন আমার বন্ধুর সংগ লাগত, সংগ দিতাম, বাসায় যেতাম, আমার বাসায় ও আসত। অনেক জায়গায় একসাথে ঘুরতাম, আমাদের ঘুরতে যাবার দল ছিল। আমার বন্ধু তার নিজের স্কুলের বন্ধুদের দলে পর্যন্ত আমাকে নিয়ে যায়, সেখানে নিয়মিত সদস্য করে। একটা সময় আমার বন্ধু আমাকে তার ভাই হিসাবে ও মরযাদা দেয়, বলে যে আমরা দুই বন্ধু কখনই বিচ্ছিন্ন হব না। আমার বন্ধু আমাকে বলেছিল আমি তার কাছে আমার যেকোন কিছু কোন সমস্যা ছাড়াই বলতে পারব ।

এবার দোটানায় মানসিক চাপ সহ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় কোন কিছুই ঠিক ভাবে করতে পারছিলাম না, আবেগে এতটাই খারাপ অবস্থা। তাই ফেসবুকে চ্যাট করে এর পরে একদিন ফোনে বলে দেই। আমি তাকে বলার আগে আশা করেছিলাম এত দিন আমি তার পাশে ছিলাম ছায়ার মত, আর কেউ আমার কথা গুলি না শুনলেও আমার বন্ধু শুনবে আর বুঝবে।

আমি তখনও নিজেকে নিজের কাছে জোর করে উভকামী হিসাবে দাবী করতাম , তো আমার বন্ধুকে আমি বলি আমি উভকামী। যদি ও আমি পরে মেয়েদের সাথে মিশে বুঝতে পারি যে আমার মেয়েদের প্রতি কোন আকর্ষণ কাজ করে না, আমি সমকামি। আমার বন্ধু ব্যাপার টা ভাল ভাবে নিতে পারে নাই এটা তার কথার আচেই বুঝা যায়, গলার মধ্যে তাচ্ছিল্য আর ভয় নিয়ে বলে , ও তুই গে । সেই সন্ধ্যায় তিন চার বার ফোন দিয়ে কথা হয় , সে বলে সমস্যা নাই, শুনবে। আমি যখন কেবল আমার সব কথা আমার বন্ধুকে বলা শুরু করব যে আমি কিভাবে এই জগতে এসেছি , কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, আমার যে এখন একটা সমকামী ছেলের সাথে কথা বলি, এটা যে আমার ভাল লাগছে এগুলি বলব বলার আগে গল্পের শুরুতে থামিয়ে দিয়ে আমার বন্ধু বলে আমি তোকে পরে ফোন দিব।

সেই যে ফোন রাখল এরপরে তিন চার দিনেও আর খবর নাই। আমি বুঝেছিলাম তখনি কি হয়েছে। যে বন্ধু মাসের পর মাস দিনে একবার হলেও ফোন দেয় , ডেইলি চ্যাটে নক করে, নিজের গল্প গুলি আমার কাছে না বলে থাকতে পারে না, যখন ব্যাস্ত থাকতাম তখনো গল্প পেট থেকে বের করার জন্য সময় বের করার আবদার করত, কখনো ২-৩ বার ফোন দিত দিনে। তার কোন খবর আই ৩-৪ দিন ধরে। আমি নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছিলাম ,যে কিছু হয় নি সব ঠিক আছে। আমার বন্ধু চাকুরিজিবি তাই আমি তাকে নক করি নি এর মাঝে।

সরকারী ছুটির দিন, হিসাবে বন্ধুর ছুটিতে থাকার কথা, আমি ফেসবুকে নক দেই, আমার বন্ধু জানায় তার অফিসের কাজ আছে। আমি ফোন দেই , আমার ফোন রিসিভ করে না। আমাকে চ্যট বক্সে বলে ব্যস্ত, এখন যোগাযোগ করতে পারবে না। কল দিতে মানা করে। সময় যায় সকাল গড়িয়ে দুপুর। যোগাযোগ করলে আবারও একই উত্তর। ইচ্ছা করে যোগাযোগ করছে না বুঝার পরে লজ্জায়,অবহেলার অপমানে আবেগের বাধ ভাঙ্গে, আমি বলে বসি দেখা করব তোর সাথে আজ।

এর পরে সে বলে দিল – আগামি সাত দিন আমি অনেক বিজি , দেখা করতে পারব না। এবার তো আমি ধরে বসি, মেসেঞ্জারে কল দেই, আমাকে বলে কল দিবি না, আমি তো আমার সস্তা আবেগে অপমানে জিদে ফোনের পরে ফোন, বলে মাইর খাবি তুই, ফোন দিবি না খবরদার। আমি এবার জিদে ফোন দিতেই আছি টোটাল ৭০ টা কল দিছি ফোন, মেসেঞ্জার মিলায়ে। আমার বন্ধু একটাও ধরে নাই, তবে এটা সত্যি ছিল যে বন্ধু আসলেই অফিসে ছিল, ৭০ কলের মাথায় সে মিটিং চলতেসে এটা শুনায় দেয় ফোনে। এর পরে আমি অনেক লজ্জিত হই আর ফোন দেয়া অফ করি।

এর পরে অফিসের কাজ শেষ করে রাতের দিকে আমাকে আমার বন্ধু ফোন দেয়, আক্রমনাত্তক কন্ঠে যেভাবে বলে- তুই আমারে বইলা ভুল করসস, তুই যা করতেছিলি কর আমাকে বলার কি দরকার। আমাদের সম্পর্ক কখনো আগের মত হবে না। তুই কি মনে করিস আমি বোকা , আমাদের এলাকার ছেলেরা বোকা, একটা ছেলেও বোকা না, ওরা সব বুঝে তুই কেমন, তুই যদি আমার একটা বন্ধুর কোন ক্ষতি করসস,সেই চেষ্টা করসস, তাইলে দেখিস কি করি। আমি কিন্তু সবাইকে বলে দিব ।

আমি এসব শুনে সহ্য করতে পারি না, ভাই বলে ডাকি , কারন আমার বন্ধু একসময় নিজে স্ট্যাটাস দিয়ে দিয়ে আমাকে ভাই বানাইছিল, বেস্ট ফ্রেন্ড বানাইছিল, এবার সে বলে- আমি তোর ভাই না। তোর ভাই কেউ না, তোর ভাই বাসায়।

আবার যখন বলে আমি তোর কথা সবাইকে বলে দিব, আমি রাগে কান্না বলে দেই যা বলে দে। এবার বন্ধু এক্টূ চুপ বলে- না আমি বলব না- যদি সবাই জানে যে তুই গে তাহলে আমারেও সবাই গে ভাববে। তোর জন্য আমার মান সম্মান যাবে।

আমি কান্নায় হতাশায় অপমানে কথা ঠিকভাবে বলতে পারতেছিলাম না, কথা শুনে বলল তোর গলাটা হিজড়াদের মত। কথা ঠিক ভাবে বলে ফোন রাখ।

আমার সাথে পরে কথা বলবে , কারন রাত বারটা বাজে , বন্ধু বাসায় যাচ্ছিল।

আমি শেষে কোন মতে কান্না রোধ করে, ঠিক ভাবে সালাম দিয়ে ফোন রাখি।

এই বন্ধুই কিন্তু একসময় আমার হাসপাতালে থাকার সময় আমার পাশে ছিল , আমাকে প্রতিদিন ফোন দিত যখন আমি বিছানায় পড়ে ছিলাম, হাসির হাসির কাহিনি শুনাত, আমাকে বাসায় ডেকে নিয়ে যেত ,অনেক গল্প করতাম, মুভি দেখতাম, আমি যেন সুস্থ হয়ে ভালভাবে দেশের বাইরে যেতে পারি এজন্য বন্ধু হিসাবে তার যা সাপোর্ট দেয়ার দিত। একজন সমকামি ছেলেকে বন্ধু হিসাবে নিবে না আর ১০ জন ছেলে , সেজন্য নিজে থেকে মিশতাম না, আমার বন্ধুই নিজে বছরের পর বছর আড্ডায় ডেকে আমাকে তার বেস্ট ফ্রেন্ড, ভাই বানাইছিল , আমি সবকিছুর উপরে সব কিছু দিয়ে এই বন্ধুত্তের সম্মান রাখার চেষ্টা করছি, আমি কোনদিন কিছু চাইনি, বন্ধু হিসাবে দিয়ে গেছি। আমার জীবনের এত বড় একটা কঠিন সময়ে যখন আমার যখন মানসিক সাপোরট সবচে বেশি দরকার ছিল তখন আমার বন্ধু আমার বন্ধুত্তকে অপমান করে যেই কথা গুলি বলেছে, তা আমি কোন একজন সমকামী হিসাবে যে কত কষ্টের হতে পারে তা কেউ অনুধাবন করতে পারবেন না।এই তো এটাই ছিল আমার প্রথম আত্মপ্রকাশের ঘটনা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.