‘হিমুন’

লেখকঃ ‘মেঘ রাজ সাইমুন’

উৎসর্গঃ ‘হিমাদ্রি হিমু’

[কিছু কথাঃ হিমু+মুন=হিমুন!গল্পটি একজন আর্দশ মায়ের গল্প।ছেলের সমকামী সত্ত্বার কথা জেনেও তার ভালোবাসার জন্য সমাজ,ধর্ম,সংসারকে উপেক্ষা করে নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছে।’হিমুন’ কে নিজের অস্তিত্বে পরিনত করেছে]

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

১ম খন্ড

———

রাত্রি দ্বিপ্রহরে লন্ডন শহরকে তারা ভরা বিশাল আকাশের মত মনে হয়।নিঝুম শহরের কিছু আলো জোনাকি পোকার মত জ্বলছে আর নিভছে।ল্যাপটপ অফ করে বেলকনির শুভ্র সাদা বেড়িতে হাত ছোঁয়ালাম।শরীর শিহরিত হলো প্রচন্ড ঠান্ডায়।মুনের দিকে তাকালাম।দেখলাম মুন বিছানায় পাশ ফিরে আবার নিদ্রার রাজ্যে হারিয়ে গেল।মুনকে আজকাল অনেক বেশি সুন্দর লাগে।ঘুমন্ত অবস্থায় তো একদম বাচ্চা বাচ্চা।আমি আকাশের দিকে তাকালাম।উত্তর গোলার্ধের চারটি তারার মাঝের একটা তারা হারিয়ে গেছে।মামনিকে খুব মনে পড়ছে।রুপা আপুকেও।জানি না ওরা কেমন আছে!দেশ ছাড়ার পর না জানি বাবা ওদের সাথে কেমন ব্যবহার করেছে?খুব জানতে ইচ্ছা করে রুপা আপুর বাচ্চাটা কেমন হয়েছে!বাবাকেও অাজ কেন জানি বড্ড অনুভব করছি।

১।

আমি হিমু।তবে হলুদ পাঞ্জাবী বা মাঝ রাতে নিঝুম রাস্তায় হাটতে কিংবা উদ্ভট কথা বলতে আমার ভালো লাগে না।ভালো লাগে নীল পাঞ্জাবী,খেতে আর সিনেমা দেখতে।কারন আমি হুমায়ূন আহমেদের হিমালয় বা হিমু নয়।সাহিত্যের অধ্যাপিকা,হুমায়ূন পাগল আমার মামনি আমাদের দুই ভাইবোন নাম রেখেছিলো হিমু আর রুপা।বাবার অবশ্য নাম দুটো পছন্দ ছিলো না।তবুও মামনিকে খুশি করতে তিনি আমাদের ঐ দুটো নামেই ডাকতেন।তিনি মামনিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।আজও হয়তো ভালোবাসে ঠিক আগের মতো করে,তবে অভিমান বড্ড ভারী সেখানে।রুপা আপুর বিয়ে হয়েছিলো আমার দেশে থাকাকালীন।তখন মুন আমাদের পরিবারের একজন ছিলো।মামনি,রুপা আপু;এমন কি বাবাও মুনকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসতো।কিন্তু একটা দুর্ঘটনা মুনকে আমার জীবন থেকে নিয়ে নিল।খুব ভেঙ্গে পড়েছিলাম তখন মুনকে হারিয়ে।মামনি আর রুপা আপু তখন আমাকে সামলে নিয়ে ছিলো।আমি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছিলাম।ভার্সিটিতে নিয়মিত আসা যাওয়া শুরু করলাম।

একদিন ক্যাম্পাসে দাড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম।ক্যাম্পাস গেটে একটা নীল রংয়ের গাড়ি এসে থাকলো।দেখলাম মায়ের মত কেউ একজন নামলো;সাথে একটা ছেলে।মহিলাটি ছেলেটির কপালে একটা চুম্বন এঁকে গাড়িতে গিয়ে বসলো।গাড়িটি চলতে শুরু করলো।সময় হওয়ায় আমি আর ওদিকে খেয়াল না করে ক্লাসে চলে গেলাম।বিকালে বাসায় ফিরে মামনিকে ডাকলাম,

-মামনি!মামনি!

-কিরে তুই?এসেই বাড়ি মাথায় করছিস কেন?

-ধ্যাত,তুমি না!

এক চিলতে হাসি টেনে মামনি বলল,

-রাগ করছিস?আমি তো মজা করলাম।কি বলবি বল আব্বু।

-এখন আব্বু ডাকা হচ্ছে।যাও তোমার সাথে কথাই বলবো না।

মামনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো,

-কি বলবি!বল না?

-তুমি কি আজ আমাদের ভার্সিটিতে গেছিলা?

-কেন বলতো?

-না এমনি।তোমার মত একজনকে দেখলাম,তো ভাবলাম…….।

মামনি আমার কথা শেষ করতে দিলো না।মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললো,

-হিমু পৃথিবীতে একই চেহারার সাতজন মানুষ থাকে।তুই ফ্রেশ হয়ে আয় তো!আমি খাবার তুলছি।

কথাটা আমার বিশ্বাস হলো না,তবুও মামনিকে আর জ্বালালাম না।রুমে ঢুকে রিডিং টেবিলে রাখা মুনের ছবির দিকে তাকালাম।কত সুন্দর হাসি মাখা মুখ,ভ্রমর কালো দুটি চোখ।ঠিক যেন আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।সেদিন যদি আমি জিদ না করে যেতাম,তাহলে আমার মুন পৃথিবী ছেড়ে,আমাকে ছেড়ে যেত না।ডাইনিং টেবিল হতে মামনির হাকডাক শুরু হয়ে গেল।

আজও দেখলাম নীল গাড়িটা সেই ছেলেটিকে নামিয়ে দিয়ে গেল।আমি দৌড়ে ক্যাম্পাস গেটে যাওয়ার আগেই মহিলাটি গাড়ি করে চলে গেল।আমি খুঁজে ফিরে সেই ছেলেটির মুখোমুখি দাড়ালাম।ছেলেটিকে দেখে আমি অবাক হলাম।সেই ভ্রমর কালো চোখ,চোখে চশমা,মিষ্টি ঠোঁট।সুতরাং নিশ্চিত বিশ্বাস হাসিটা সুন্দর হবে।শুধু চেহারাটা সম্পূর্ণ আলাদা।এক মুহূর্তকাল আমি নির্বাক,অনড়।আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,

-যে মহিলাটি আপনাকে নামিয়ে দিয়ে গেল,তিনি আপনার কে হন?

ছেলেটি ফ্যালফ্যাল চোখে খানিক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,

-আমার মামনি!কিন্তু কেন?

-কিছু না,জাস্ট কিউরিসিটি থেকে জিজ্ঞাসা করা!

-ওয়াট?কিসের কিউরিসিটি?

-সরি!কিছু না।বাই দ্যা ওয়ে আপনার নামটা যেন কি?

-হাহাহাহাহাহা……।এমন ভাবে জিজ্ঞাসা করছেন যেন আমাকে চেনেন!এ্যানি ওয়ে আমি হিমুন।আপনি?

বলেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।আমার হৃদয়ে কম্পিত হচ্ছে।কি বলে এই ছেলে!হিমুন?কিন্তু কিভাবে?আমি কাঁপা-কাঁপা হাতে তার হাত ধরলাম,আমার দেহ শিহরিত হলো।মনে হচ্ছিল মুন আমার অস্তিত্বে মিশে যাচ্ছে।হঠাৎ নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বললাম,

-আমি হিমু।

-ওয়াও,নাইস টু মিট ইউ।তবে আমাকে আপনি করে বলা চলবে না।তুমি করে বলতে হবে।

বলেই একটা হাসি দিল।আমি শুধু ভাবলাম একটা মানুষের সাথে অারেকটা মানুষের কিভাবে এতো মিলে যায়!সেই হাসি!যে হাসির আড়ালে আমি হারিয়েছি চিরতরে।আমি শুকনো হাসি টেনে বললাম,

-ওকে।তাহলে যাও ক্লাসে!পরে কথা হবে।

এভাবে হিমুনের সাথে আমার পরিচয়।ভার্সিটির ক্লাসগুলোর মাঝে বাইরে আসলে বা আড্ডা দিলে দেখতাম হিমুন আমাকে ফলো করছে।কখনো দেখতাম একা একা বসে উদাস মনে কি সব ভাবছে।হিমুনকে দেখলে আমার মুনের কথা খুব বেশি মনে পড়তো,তাই ওকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম।কিন্তু কি এক টান যেন বারবার ওর দিকে তাকাতে বাধ্য করতো,আমি বুঝে উঠে পারতাম না।হিমুনকে কখনো ভার্সিটিতে একা আসতে দেখিনি।সেই নীল রংয়ের গাড়িটা সব সময় ওকে নিয়া আনা করতো।সেদিন দেখলাম ভার্সিটির বিশাল বটগাছটার নিচে বসে একটা হলুদ ডায়রিতে কিসব লিখছে।আমি কাছে গিয়ে বললাম,

-কি লিখছো হিমুন?

ও কিছুটা আতঙ্কে আমার দিকে চেয়ে রইলো।তারপর বললো,

-ও আপনি!তেমন কিছু না।বসুন।

আমি বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করলাম,

-বাসায় তোমার কে কে আছে?

-মামনি,আমি আর রফিক চাচা।

-তোমার বাবা নেই?

-না,মামনি তো বলে বাবা মারা গেছে!

আশ্চর্য!এই ছেলে নিজের বাবার মারা যাওয়ার কথা এভাবে বলছে কেন?ওকি জানে না ওর বাবা মারা গেছে বা কিভাবে,কত দিন আগে মারা গেছে।আমি বললাম,

-কতদিন আগে মারা গেছে?

-মামনি তো বলে ছয় মাসের মতো।

-আচ্ছা এভাবে বলছো যে বড়!তুমি জানো না।

-না বাবাকে আমি দেখি নি,তখন নাকি আমি দেশের বাইরে ছিলাম।

-আচ্ছা।

এভাবে হিমুনের সাথে আমার বন্ধুটা এগিয়ে যেতে লাগল।ভার্সিটির ক্লাসগুলো শেষে আমি আর ও নদীর কুলে,বনে,বিল-ঝিলের মাঝে রোড সাইটে ঘুরে বেড়াতাম।ধীরে ধীরে আমরা কিছুটা কাছে আসতে লাগলাম।বুঝতে পারলাম হিমুন ছেলেদের পছন্দ করে।একজন সমপ্রেমীর চোখ কখনো আরেকজন সমপ্রেমীকে চিনতে ভুল করে না।কিন্তু আমি কখনো আমার মুনের জায়গা অন্য কাউকে দিতে পারবো না।তাই হিমুনকে কখনো সুযোগ দিতাম না আমাকে কিছু বলার।সেদিন ছুটির দিনে একা একা বোরিং লাগছিলো।হিমুনকে ফোন দিলাম,

-হ্যালো হিমুন!

-হ্যা বলুন।

-তুমি আমাদের বাসায় আসবে?তাহলে একসাথে থাকা যেত সারাটাদিন।আমার মামনিও খুশি হতো।

-খুব ইচ্ছা করছে।কিন্তু আমি তো কোথাও একলা যাই না।তাছাড়া মামনি বাসায় নেই।

-ওকে ঠিকানা বলো!আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।

-আচ্ছা।আমি রিক্সা নিয়ে বাইলেনে দাড়াচ্ছি আপনি আসুন।

মিনিট পনেরো পর দেখলাম বাইলেন রোডে দাড়িয়ে আছে হিমুন।আমি ঈশারায় ওকে রোডের এই সাইডে আসতে বললাম।কিন্তু ও আসতে চাইছে না।আমিই রোড ক্রস করে ওর কাছে গেলাম।

-কি ব্যাপার!তোমাকে বলছি রোড ক্রস করতে,তুমি করছো না কেন?

-আমি রাস্তা পারাপার হতে পারি না।

-কি??

আমার চোখের সামনে পৃথিবীর সব থেকে বড় অক্ষমতার চিত্র ভেসে উঠলো।আমার মুনও রোড ক্রসিং পারতো না।সব সময় আমাকেই ওকে রোড ক্রসিংয়ে সাহায্য করতে হতো।আমি মুনের এই অক্ষমতাকে কখনো দুর্বলতা মনে করি নি।হিমুনের সাথে মুনের এতো মিল।সেই ভ্রমর কালো চোখ,মিষ্টি হাসি,চালচলন,রোড ক্রসিংয়ে অপারগতা।কিন্তু চেহারার শুধু এতো অমিল।ওকে ছুঁলে আমার মনে হয় কত আপনজনকে ছুঁয়ে আছি,ওর চোখের দৃষ্টিতে আমি আমার মুনকে খুঁজে পাই।কত চেনা চেনা লাগে,তবু অচেনা হিমুন।কি আশ্চর্য তাই না?

আমি হিমুনের হাত ধরে রোড ক্রসিংয়ের জন্য পা বাড়ালাম।

২।

ভার্সিটির ছাত্র সংগঠনের সভাপতি থাকাকালীন মুনের সাথে আমার পরিচয়।নবীন বরণ অনুষ্ঠানে র্যাগিং পর্ব চলছিল।আমি,জোহান,ইয়াশ আর তিথি বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম।হঠাৎ ইয়াশ একটা ছেলেকে ডাক দিল।আমাদের মাঝে ইয়াশ একটু রাগী,বেপরোয়া এবং একরোখা ছিলো।ছেলেটি আমাদের কাছে আসতেই ও উঠে দাড়িয়ে ছেলেটিকে একটা চড় দিল।আমরা তো সবাই অবাক।কি হলো এটা।ইয়াশ রাগী কন্ঠে বললো,

-বেয়াদব!চশমা খোল।বড় ভাইদের দেখলে সালাম দিতে পারোস না?

ছেলেটি চশমা খুলে মাথা নিচু করে বললো,

-সরি ভাইয়া!

-মেয়েদের মত ভাইয়া ভাইয়া কি রে?আমি কি তোর ভাতার লাগি?

-না মানে!

-না মানে কি?এখনো সালাম দিস নাই যে!

-আসসালামু আলাইকুম।

-হুম!গুড বয়।

জোহান ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলো,

-তোর নাম কিরে?

-মুন।

ইয়াশ ধমক দিয়ে বললো,

-ঐ নামের অাগে পরে কিছু নেই?তুই কূল হারা নাকি?

-জি না।আমি সৈয়দ সাইমুন ইসলাম।তবে সবাই মুন বলে ডাকে।

-আমরা তোর নাগর নাকি যে মুন বলে ডাকবো?

-জি না।

-এতো জি না,জি না করছিস কেন?

জোহান আমাকে দেখিয়ে বললো,

-এই যে আমার বন্ধু।হিমু।দেখছিস?

-হুম।দেখেছি।

-ওকে তোর প্রপোজ করতে হবে!

-জি?

-জি কিসের?

ইয়াশ একজন ফুলওয়ালী ডেকে বললো,

-ছোট আপু!এই ছেলেটিকে একটা ফুল দাও তো।ঔ ওর কাছ থেকে ফুল কিনে নে।

মুন মেয়েটির কাছ থেকে একটা ডালিয়া ফুল কিনলো।আমি বললাম,

-ইয়াশ,জোহান তোরা বাদ দে তো।ওকে যেতে দে।

তিথি বললো,

-তুই চুপ কর।ঐ তুমি প্রপোজ করো তো।

মুন হঠাৎ আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে বললো,

“প্রহর শেষে আলোয় রাঙা এদিন চৈত্র মাস,

তোমার চোখে দেখেছি আমার সবর্নাশ”

-ডু ইউ লাভ মি?

আমি তো অবাক।এই ছেলের ভিতর এতো রোমান্টিকতা!দেখে তো বুঝাই যায় না।আমি মুনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কি সুন্দর দুটি চোখ!যেন কবি জীবনানন্দ দাসের সেই কবিতার পাখির নীড়ের মত দুটি চোখ।কি কালো!যেন ভ্রমর কালো!হাসি মাখা কি সুন্দর মুখ।আমার সত্য বলতে ইচ্ছা করলো,’ইয়েস আই ডু,আই লাভ ইউ এ লট’।কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।ওদের হাত তালির ধ্বনিতে আমি কল্পনার জগৎ থেকে ছিটকে পড়লাম।ফুলটা মুনের হাত থেকে নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে বললাম,

-ইটস ওকে তুমি যাও।

মুন উঠে চলে গেল।আমি বললাম,

-তোরা কি রে?ছেলেটা কে তোরা এভাবে নাজেহাল করলি!এটা ঠিক হলো না।

তিথি বললো,

-কি রে তুই কি সত্যি সত্যি ওর প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?

-ধ্যাত!তোরা থাক আমি গেলাম।আমার ভালো লাগজে না।

ইয়াশ বললো,

-ঐ মামু!এতো লজ্জা পাসছিস যে?হয়ে গেল নাকি?

-মজা নিস না তো।আমার কাজ আছে।

বলেই আমি দ্রুত পায়ে ওদের থেকে পালিয়ে গেলাম।

তার তিন চার দিন পর দেখলাম মুনকে।শাহবাগের মোড়ে রোড ক্রসিংয়ের জন্য চেষ্টা করছে।এক পা এগিয়ে আবার দুপা পিছনে যাচ্ছে।আমি রোড ক্রস করে ওর কাছে গেলাম।আমাকে আসতে দেখে ও কিছুটা ভীত হলো।আমি বুঝতে পেরে বললাম,

-ভয়ের কিছু নেই।আমি ওদের মত না।তুমি এমন করছো কেন?

-আসলে ভাইয়া আমি একলা রোড ক্রসিং পারি না।আমার প্রচন্ড ভয় করে।

-ওকে।আমার সাথে এসো।

মুন প্রথম আমার বাম হাতটা ধরলো,তারপর মাথাটা আমার বুকের কাছে ধরে কালো চোখ দুটো বন্ধ করে দিল।আমি তো মনে মনে হেসে খুন।এতো বড় একটা ছেলে সে নাকি রোড ক্রসিংয়ে এতো ভীত আর অক্ষম হয়।আমি ওকে নিয়ে একটা বকুল তলায় দাড়িয়ে বললাম,

-এই যে এবার আমাকে ছেড়ে চোখটা খোলো।

মুন আমাকে ছেড়ে বললো,

-সরি ভাইয়া।জানি ব্যাপারটা খুব মেয়েলিপনা,কিন্তু আমার যে কোন উপায় নেই।

-ঠিক বুঝলাম না।তুমি কি কখনো এটা পারতে না,নাকি কোন দুর্ঘটনা থেকে?

-আসলে আমার আম্মু রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছিলো,আমার সামনে।সেই থেকে আমার প্রচন্ড নেগেটিভিটি কাজ করে এই ব্যাপারে।

-ওহ।সরি।তাই বলো।আচ্ছা মুড অফ করার মত কিছু হয় নি।চলো!ভার্সিটি যাবে তো।

-হুম।

শহরের সব থেকে বড় বাড়ি ছিলো মুনের বাবার।তিনি বিজনেসম্যান।মুনের মা রোড এক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর তিনি ছেলেকে নিয়ে বেঁচে আছেন।মুনের এই রোড ক্রসিং আতঙ্কের জন্য তিনি সব সময় হতাশায় ভোগে।যেতে যেতে সব শুনলাম মুনের কাছ থেকে।

ধীরে ধীরে অচেনা থেকে চেনা হতে লাগলাম দুজন।আমার বড় মায়া হলো।সেই মায়া থেকে সৃষ্টি হলো ভালোবাসা।মনের অজান্তে মুনকে ভালোবেসে ফেললাম।কিন্তু মনে বড় ভয় ছিল!মুন যদি আমার মত না হয়।তাই আর বলা হয়ে উঠছিলো না।

সেদিন সোনার বাংলা চত্তরে দাড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলাম।মুন রিক্সা থেকে নেমে পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।আমি ওর হাত গলার কাছে এনে বললাম,

-আমি কথা বলছি তো।শেষ করি।

আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে কেটে দিয়ে বললো,

-না!আগে আমি,তারপর তোমার ফোন।

-আচ্ছা।ওকে।তো বলুন আপনার কি চাই?

-আজ তোমাদের বাসায় যাবো আন্টিকে দেখতে।

-জো হুকুম জাহাপনা।

আমি মুনকে নিয়ে বাসায় গেলাম।রুপা আপু,মামনি সবাই মুনকে চিনতো না দেখেই।আমি মুনের কথা এতো বলেছি যে ওরা না দেখেই মুনের একটা অভিনব চিত্র বুকের মাঝে এঁকে ফেলেছে।মুনকে দেখেই মামনি বললো,

-এতো দিন আমাদের দেখার ইচ্ছা জাগল বড় লোকের বেটার?

-আন্টি এমন বলবেন না তো।আপনার ছেলেই আনে না আমাকে।

-হিমুর কথা আর বলো না বাবা।ও একটা ফাজিল।কতদিন বলেছি তোমাকে আনতে,কিন্তু ওর নাকি সময় হয়ে উঠে না।

-মামনি তুমি কিন্তু ওর সামনে আমাকে পঁচাচ্ছো!

-তুই চুপ থাক তো।মুন তোমার বাবা কেমন আছে?

-ভালো আন্টি।রুপা আপু আপনি কেমন আছেন?

-ভালো ভাই।তোমার কথা ঐ ফাজিল টা এতো বলেছে যে তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল।

-আন্টি একটা আবদার করবো!যদি রাখেন?

-এভাবে বলছো কেন বাবা?তুমি আমার কাছে যে কোন কিছু চাইতে পারো।হিমু আর রুপার মত তুমিও আমার আরেকটা সন্তান।

-আমি আপনাকে মামনি বলে ডাকি।আমার তো মা নেই।

-বোকা ছেলে।কাঁদছো কেন অবশ্যই ডাকবে।হিমু ওকে নিয়ে তোর রুমে বসা।রুপা তুই একটু কিচেনে চল মা।

-জো হুকুম মহারাণী।আসেন নব রাজপুত্র।

রুমে ঢুকে মুন আমার ঘরময় দেখতে লাগলো।রিডিং টেবিলে শুকনো ডালিয়া ফুলটা দেখে বললো,

-এটা সেই ফুলটা না?তুমি রেখে দিছো।মানে কি?

-জনাব,মানে তেমন কিছু না।এই ফুলেল দানকারীকে আমার হৃদয়ের এখানে স্থান দিয়েছি।

-এতো দিন বলো নি কেন?

-ভয়ে।

-স্যারের এতো ভয়?

-পারবে না সেদিনের ডালিয়া দিয়ে প্রপোজ করা ছেলেটা ভালোবাসতে?

আমি হাটু গেড়ে বসে শুকনো ডালিয়া দিয়ে বললাম,

“প্রহর শেষে অালোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস,

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ”

-ডু ইউ লাভ মি?

মুন সেই মিষ্টি হাসি দিয়ে সম্মতিতে ভ্রমর কালো চোখ বন্ধ করলো।আমার প্রাণ শীতল হলো।হঠাৎ মামনি বললো,

-কি রে ওভাবে হাটু গেড়ে বসে আছিস কেন?এই নে মুনকে মিষ্টি খাওয়া।

বলেই মামনি চলে গেল।আমি দরজা লক করে মুনের দিকে এগোতে লাগলাম।মুন পিছু হাটতে হাটতে বিছানায় ঠেকে গেল।

-তুমি এভাবে এদিকে আসছো কেন?

-মিষ্টি খাওয়াবো বলে।মামনি মিষ্টি খাওয়াতে বলে গেল,শুনলে না?

-মিষ্টি তো রেখে এলে।

-আরে ও মিষ্টি কে খাওয়াবে?আমি তো আসল মিষ্টি খাওয়াবো এবং খাবো।

-জি না।আমি কিন্তু মামনিকে ডাক দিবো!

আমি মুনকে বিছানায় ফেলে আমার ঠোঁট দিয়ে ওর ঠোঁট চেপে ধরলাম।মুন ছটফট করতে লাগলো আর আমি মিষ্টি পান করতে লাগলাম।অমৃত সুধা,পৃথিবীতে যার কোন তুলনা হয় না।

আমাদের ভালোবাসা,পথ চলার শুরু হলো।আমার সমপ্রেমিতা সম্পর্কে মামনি,রুপা আপু জানতো।মামনি আমাকে ডাক্তারও দেখিয়েছিলো।ডাক্তার সমকাম সম্পর্কে মামনিকে বুঝিয়ে বলেছে।মামনি শিক্ষিতা নারী,তার উপর অধ্যাপিকা।অনেক চিকিৎসার পর যখন দেখলো কোন ফল নেই,তখন আমার গোপন সত্ত্বাকে মেনে নিলো।শুধু বাবাই আমার এই দিকটা জানতো না।

কিছুদিন হলো মামনি একটা কনফারেন্সে মাদ্রাজ গেছে।সেদিন মিষ্টি দিয়ে যাওয়ার পর মামনি আবার এসে ছিলো এবং জানালা দিয়ে আমাদের অন্তরঙ্গতা দেখে ছিলো।পরে আমাকে প্রশ্ন করায় আমি স্বীকার করি যে,মুনকে আমি ভালোবাসি।মামনি আর কিছু বলেনি।মাদ্রাজে যাওয়ার দিন আমাকে বলে গেছে মুনের সাথে অামি যেন ঝগড়া না করি।কিন্তু মুন আজকাল বড্ড বেশি জেদ ধরেছে আমার ছাত্র সংগঠন রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে।আমি তাতে নারাজ।এই নিয়ে বড় অভিমান চলছে মুনের সাথে।

সকালে রুপা আপু শ্বশুর বাড়ি চলে গেছে,বাবা অফিসে,মামনি তো দেশের বাইরে।আজ কালের মাঝে আসার কথা।ফোন বেজে উঠলো।মুন কল করেছে।

-হুম বলো কি হয়েছে?

-আমি বাইলেন রোডে দাড়িয়ে আছি।একটু নিয়ে যাবে?প্লিজ।

-ন্যাকামি রেখে আসতে পারলে আসো,না হলে এসো না।

বলে আমি ফোনটা কেটে দিলাম।আধা ঘন্টা পরও যখন মুন এলো না।আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম।দ্রুত বেরিয়ে গেলাম।বাইলেন রোডে গিয়ে ওকে পেলাম না।লোক মুখে এক্সিডেন্টের কথা শুনে একটা লোককে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন,’ভার্সিটি পড়ুয়া একটা ছেলের এক্সিডেন্ট হয়েছে!ইশ!ছেলেটার মুখটা থেতলে গেছে।দেখলে ভয় করে!কি ভয়ংকর দৃশ্য!মনে হয় বাঁচবে না।একটা মহিলা হাসপাতালে নিয়ে গেল।’

কথাটা শুনেই আমি ওখানে পড়ে গেলাম।কোমায় চলে গিয়েছিলাম।কোমা থেকে সুস্থ হতে পনের দিন লেগে গেল।পরে নিজেকে সামলে নেয়।আমার সামান্য ভুলের কারনে মুনের জীবনটা আমি অকালে কেড়ে নিলাম,ভালোবাসা হারালাম।মুনের বাবা নাকি ছেলের মৃত্যুতে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে।

৩।

আমাদের বাসার কাজের মেয়ে রুম্পা দরজা খুললো।রুম্পা দশ বছর বয়স থেকে এখানে আছে।দিনে দিনে আমাদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছে।বড় ভালো মেয়ে।আমি বললাম,

-মামনি কোথায় রে?

হিমুন বাসাটা অবাক হয়ে দেখছিল।বললো,

-হিমু ভাইয়া।আপনাদের বাসাটা কেমন চেনা চেনা লাগজে।মনে হয় যেন আগেও অনেকবার এসেছি।

-তুমি যে কি বলো না!

-ভাইজান আম্মা তো মাত্র বাইরে থেকে এসে কিচেনে ঢুকলো!ডাকবো?

-হ্যা।ডেকে আন।

মামনি আজকাল কোথায় যে যায়!রাত নাই,দুপুর নেই বেরিয়ে যায়।বাবা তো মামনির উপর সব সময় রেগে থাকে।কে শোনে কার কথা!মামনি তার ইচ্ছা মত চলে।এমন কি আমাকেও কিছু বলে না।হাত মুচতে মুচতে মামনি আমাদের সামনে এলো।হিমুন হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে বললো,

-মামনি তুমি এখানে?কি করছো তুমি এ বাসায়?

মামনি হতবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো,

-এটা কে হিমু?তোর বন্ধু নাকি?

-হ্যা মামনি।ও হিমুন।আমাদের কলেজেই পড়ে।

-মামনি তুমি আমাকে চিনছো না?আমি মামনি!আমি তোমার হিমুন।

-বাবা আমি তোমার মামনি নয়।তবে আমাকে মামনি বলতে পারো।কারন তুমি আমার হিমুর বন্ধু আমার সন্তানের মত।পৃথিবীতে মা সব সন্তানেরই মা।

-কিন্তু মামনি?

-কোন কিন্তু নেই হিমুন।তোমার মামনিকে দেখেও অবাক হয়েছিলাম আমি।তুমি চলো তো আমার রুমে।

হিমুনকে ধরে আমি আমার রুমে নিয়ে গেলাম।অবাক হয়ে হিমুন বার বার পিছনে মামনির দিকে তাকাচ্ছিলো।মামনিও কেমন ছলছল চোখে নিচে উপরে করছিলো।রুমে ঢুকে মুনের ছবি দেখে হিমুন জিজ্ঞাসা করলো,

-এটা কে?আপনার কে হয়?আর এই রুমটা কেমন চেনা চেনা লাগজে।

-আমার বন্ধু।ওর নাম মুন।ও আমার প্রাণ ছিলো।একটা দুর্ঘটনা ওকে আমার জীবন থেকে সৃষ্টিকর্তা কেড়ে নিছে।

-ওহ,সরি।

-সরি বলার কিছু নেই হিমুন।মুন মারা গেছে।কিন্তু ওর অস্তিত্ব আমার সারা হৃদয়,সারা দেহ জুড়ে আছে।আমি সবখানে ওকে দেখতে পাই,শুনতে পাই।জানো?তোমার চোখ দুটো ঠিক মুনের চোখের মত,তোমার হাসিটা ঠিক সেই হাসির মত।যে হাসি দেখে আমি পাগল হয়েছিলাম।আমার কারনে আমার মুন নামের ফুলটি অকালে ঝরে গেল।

-আপনার কথা আমি কিছুই বুঝলাম না।মুনের সাথে আপনার কি এমন সম্পর্ক ছিলো?

আমি চোখের পানি আড়াল করে বললাম,

-আচ্ছা!বাদ দাও।কি খাবে বলো?

-কিছু খাবো না।আমি বাসায় যাবো।মামনির কথা মনে পড়ছে।

-বুঝতে পারছি।চলো তোমাকে দিয়ে আসি।

রুম থেকে বেরিয়ে রুম্পাকে বললাম,

-রুম্পা!মামনিকে বলিস!আমি হিমুনকে দিতে যাচ্ছি।

-ভাইজান!আম্মা তো বেরিয়ে গেছে।আমাকে বলেছি আপনাদের নাস্তা দিতে।

-থাক নাস্তা লাগবে না।

মামনি এই সময়ে কোথায় গেল।আমি আর কথা বাড়ালাম না।হিমুন কে নিয়ে বের হয়ে গেলাম।হিমুনকে ওদের বাসার সামনে ছেড়ে বাসায় এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।মামনির সাথে যে আমার অনেক কথা আছে,আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার আছে।কোথায় যায় মামনি এই ছয় মাস ধরে।একজন অধ্যাপিকার যখন তখন কি এমন কাজ থাকে ভার্সিটিতে।যে রাতের বেলাও ফিরতে দেরি হয়।মামনি ফিরতে ফিরতে রাত আট টা বেজে গেল।আমাকে বসে থাকতে দেখে বললো,

-কি ব্যাপার হিমু?এই সময়ে তুই বাসাতে?বন্ধুদের সাথে আড্ডায় যাস নি?

-না গিয়ে কি তোমাকে অসুবিধায় ফেলে দিলাম?কোথায় ছিলে তুমি এই রাত পর্যন্ত?

-হিমু।কথাবার্তা ঠিক করে বল।আমার কাজ ছিলো বাইরে।

-আমি তোমার ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম।সেখানে তো তোমার কোন কাজ ছিলো না।তাহলে প্রতিদিন তুমি বাবাকে,আমাকে না বলে কোথাও যাও!একজন নারীর কি এমন কাজ থাকে রাতের বেলা?যে স্বামীকেও বলা যায় না!

মামনি আমাকে গাল-মুখ জড়িয়ে থাপ্পড় দিলো।কাঁদতে কাঁদতে বললো,

-তুই আজকাল আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরি করছিস?তোর বাবাও কোনদিন এভাবে আমাকে দোষারোপ করি নি,কৈফিয়ত চাই নি।আর তুই ছেলে হয়ে আমাকে…….!ছিঃ ছিঃ!কি জানতে চাস বল!আমি যখন তখন কোথায় যাই!তাহলে শোন!যেদিন আমার মাদ্রাজ থেকে ফিরার কথা ছিলো,সেই দিন আমি ঠিকই ফিরেছিলাম।শুধু তোর জেদের কারনে বাইলেন রোডে রোড ক্রসিং করতে গিয়ে মুনের এক্সিডেন্ট হয়।ফিরতি পথে আমি ওকে চরম মূমুর্ষূ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করি।কিন্তু মুখটা এভাবে থেতলে গিয়েছিল যে ওকে সিংগাপুর নিতে হয়।আমি ওই অবস্থায় কাওকে কিছু না বলে মুনের বাবাকে নিয়ে সিংগাপুর চলে যায়।মুনের কোন ছবি আমার কাছে ছিলো না,এমনকি ওর বাবার কাছেও না।সন্তানের অবস্থা দেখে সৈয়দ সাহেব হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।মুনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার উপর রেখে চলে যান পরপারে।তোর ভালোবাসা বাঁচাতে মুনের কসমেটিকস্ চার্জারী করাতে হয়।এদিকে তোর অবস্থাও খারাপ।তোর বাবাকেও বলতে পারছি না।তিনি দেশে আসার জন্য চাপ দিচ্ছিল।ছবি না থাকার কারনে মুনের ফেস অন্য রকম হয়ে গেল।ফেস শুকানোর পর বাধলো আরেক সমস্যা।মুন তার স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।ওকে রেখে দ্রুত দেশে ফিরে দেখলাম তোর অবস্থা খারাপ।কাওকে কিছু বলতে পারছিলাম না।শেষে মুনকে দেশে এনে দুই সংসার,তোর অসুস্থতা,মুনের স্মৃতিহীনতা নিয়ে আমি জ্বলতে লাগলাম।মুন বার বার তার পরিচয় জানতে চাইলো।সব দিকে বিবেচনা করে শেষে তোর হিমু আর মুনের নাম থেকে ওর নাম করলাম হিমুন।নিজের আরেকটি সন্তান বাড়িয়ে তোর ভালোবাসার সত্যিকারের মামনি হলাম।এটা কি আমার অপরাধ?

আমি অবাক হয়ে মামনির কথাগুলো শুনছি।আর মাথাটা ঘুরছে।মামনি আবার বলতে শুরু করলো,

-পৃথিবীতে কোন এমন মা আছে!বলতে পারিস?যে সন্তানের সমকামিতার কথা জেনেও তার ভালোবাসা বাঁচাতে,ছেলের কষ্টের কথা ভেবে,নিজের স্বামীকে অন্ধকারে ছেলের সুখ খোঁজে!

কাঁদতে কাঁদতে মামনি মেঝেতে বসে পড়লো।আমি মামনির পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম।কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

-আমাকে মাফ করে দাও মামনি।আমি বুঝতে পারি নি।তোমার মত মাকে অামি চিনতে পারি নি।যে মুসলিম পরিবার,সমাজ,সংসারের বউ হয়েও নিজের ছেলের সুখের জন্য সমস্ত পাপবোধকে তুচ্ছ করে সমকামী ছেলের ভালোবাসা আর ভালোবাসার মানুষের জন্য এতো কিছু করে।তাকে আমি কেমনে ভুল বুঝলাম?চিনতে পারি নি অামি আমার মুনকে।

-হিমু,পৃথিবীতে একমাত্র মাই পারে সন্তানের সুখের জন্য সব করতে।উঠ আব্বু।হিমুন!যার মাঝে মিশে অাছে দুটি নাম।হিমু অার মুন।যা আমার অস্তিত্ব।তোর মুন খুব শীঘ্রই সুস্থ হবে।ডাক্তার বলেছে আর কিছুদিন সময় লাগবে।মুনের পুরানো স্মৃতি মনে নেই বলেই তোকে কিছু জানাই নি।তাতে তোর কষ্ট বাড়তো,অামি সেটা সহ্য করতে পারতাম না।তোকে সামলাতাম কিভাবে যদি জেনে যাস তোর মুন তোকে চিনতে পারছে না।তুই তো মরে মরে বাঁচতি।

সেদিনের পর থেকে মুনকে কাছে পেয়েও আমি মরে মরে বেঁচেছি।এটাকে কখনো বাঁচা বলা যায় না।আমার ভালোবাসা আমাকে চেনে না,কিভাবে মানবো আমি!সম্ভব?স্মৃতিহীনতায় ভুগলেও অভ্যাসের কারন থেকে মুন পড়ালেখা চালাতে পেরেছে।আমার মামনি এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিল।ধীরে ধীরে ব্যাপারটা বাবার কানে গেল।মামনি আমাকে আড়াল রাখতে রাত দুপুরে বাবার সঙ্গে ঝগড়া করতো আর কাঁদতো।আমি বালিশে মুখ লুকিয়ে কাঁদতাম।মুন স্মৃতি ফিরে পেয়ে চেহারা নিয়ে আনমনা হয়ে গেল।আমি ওকে সামলিয়ে নিলাম।স্মৃতি ফেরার পর ওর সম্পূর্ণ নিজেকে মেনে নিতে মাসখানেক লেগে গেল।ততদিনে আমার আর মুনের গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে গেল।মামনি,রুপা আপু স্বামী সোহেল ভাইয়াকে না জানিয়ে লন্ডনে আমাদের দুজনের জব আর লিভিংয়ের ব্যবস্থা করলো।আমি তার কিছু জানতাম না।একদিন ভোর রাতে বাবার অজান্তে মুন আর আমাকে ডেকে মামনি আর রুপা আপু এয়ারপোর্টে নিয়ে গেল।তারপর থেকে এই ছয় বছর লন্ডনে।খুব ইচ্ছা করে মামনি,রুপা আপুকে দেখি দেশে গিয়ে।শুনেছি বাবাও নাকি নরম হয়েছে।হয়তো একদিন ঘুরে আসবো মাতৃভূমিতে আমার মামনির কাছে সুধা নিতে।

মোবাইলের শব্দে কল্পনার জগৎ থেকে ছিটকে পড়লাম।মুন ঘুম ভাঙ্গা চোখে মোবাইল রিসিভ করলো।আমি জানি কে ফোন করেছে!মামনি।পৃথিবীর সেরা মা।আমার মা,আমার মামনি!যার কোন তুলনা নেই।শেষ চৈত্রে মামনি আসছে তার অস্তিত্ব হিমুনকে অর্থাৎ তার হিমু আর মুনকে দেখতে।মুন কথা বলতে বলতে আমার কাছে এলো।বললো,’মামনি ফোন করেছে’।আমি ফোনটা নিয়ে লাউডস্পিকারে দিলাম।বেলকনির হোয়াইট বেড়ির সাথে ঠেস দিয়ে মুনের কোমরে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে দুজনার ঠোঁটের মাঝে ফোন রেখে কথা বলছি ধরত্রীর সেরা মায়ের সাথে।মুন ভ্রমর কালো চোখে মুগ্ধতায় চেয়ে আছে আমার দিকে।

“প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস,

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।”

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~সমাপ্ত~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.