তৃতীয় পক্ষ

রাহাত ইসলাম জুবায়ের

1

সকাল এগারটা।

অফিসে সবাই এসে গেছে।শেখরের হাতে অনেক কাজ।বার্ষিক হিসেব হবে।টেনশনে ঘাম নামছে।কোটি টাকার হিসেব একদিনে।

ঘামতো বেরোবেই।চাইনিজ সেট টা বিকট শব্দে বেজে উঠলো।

শেখর বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে।

সোহানা ফোন করেছে

-আমি সোহানা বলছি।সাদিয়ার খুব জ্বর। (সাদিয়া শেখরের মেয়ে)

-উফ সোহানা আজকে অফিসের বার্ষিক মিটিং। চাইলেই আসতে পারছিনা।মিটিং শেষ করে আসবো।

-ওর তো অনেক জ্বর কী করবো বুঝতে পারছিনা।

-বাসার পাশের আরমান ডক্টর কে ফোন করো।

-নম্বর তো জানিনা। শেখর ডাইরী দেখে নম্বর বলে সোহানা লেখে।

-এখনি ফোন কর।

-করছি।

থরাশ শব্দে ফোন রাখে সোহানা। শব্দটি যেন শেখরের বুকে গিয়ে লাগে। নিজের কাজের উপর অস্বস্তি হয় শেখরের।

ডক্টর এসে সাদিয়া কে দেখছে।

-কেমন দেখছেন ডক্টর ?

-তেমন কিছু না সাধারণ জ্বর। এসময় এমন হতেই পারে। ডক্টর এর সাথে মেয়েকে নিয়ে সোহানার অনেক কথা হলো।

-আচ্ছা আমার নম্বর তো আপনার কাছে থাকলোই দরকার পড়লে ফোন করবেন। আমাকে ক্লিনিকে যেতে হবে। আসছি। সাদিয়া শুকনো মুখে খাটে শুয়ে আছে। সোহানা অফিসে ফোন করে

-sir আমার মেয়ের তো খুব জ্বর আজকে তো তেমন কাজ নেই আজকে আমি না আসি?

সোহানা অনুমতি পেয়ে গেলো। সাদিয়ার চোখে মুখে আনন্দ।

মামনি আজ অফিস যাবে না।সোহানা মেয়ের দিকে তাকাতে পারছেনা। নিজেকে অপরাধীর মতো মনে হয়। প্রতিদিন সকাল না হতেই অফিসে যায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা।

পুরো সময় সাদিয়া কাজের লোকের কাছে থাকে।এজন্য অবশ্য সাদিয়ার কোনও অভিমান নেই।

এতোদিনে সাদিয়া বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে ওকে এভাবেই মানুষ হতে হবে। টিস্যু পেপারে ঘাম মুছতে মুছতে শেখর রুমে ঢোকে।

সোহানা উঠে দাড়ায়।

-কী ব্যাপার ? তোমার না বার্ষিক মিটিং এখনি চলে এলে যে?

-আসলে সাদিয়ার জ্বর শুনে আরআটকে থাকতে পারলাম না। যা হয় হোক।

শেখর সাদিয়ার কাছে যায়। আদর করে দেয় সাদিয়া কে। বাবাকে দেখে সাদিয়ার শুকনো মুখে হাসি ফুটে । সোহানার বিষয়টি ভালো লাগছে না। ও শেখর কে বলে

-শুধু আদর করলেই তো হবে না ওর জন্য ওষুধ কে আনবে? শেখর উঠে দাড়ায়।

-ও একদম ভুলে গেছি । আচ্ছা আমি গেলাম ওষুধ আনতে। শেখর চলে যায়। মিতা কপট অভিমান ঝাড়ে সাদিয়ার উপর

-কী বাবার কাছে গেলে আর কারো কথা মনে থাকে না? সাদিয়ার গা গরম হয়ে আছে। সোহানা পানি এনে শরীর মুছতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর শেখর ওষুধ নিয়ে ফিরে আসে। সোহানা বলে

-শোন আমাকে অফিসে যেতে হবে

-তুমি না বললে আজ অফিস যাবে না?

-বলেছিলাম । আসলে আমার কলিগ সেলিম ফোন করেছিলো ওনার একটা বিশেষ ফাইল আমার ড্রয়ারে আছে।এখনি লাগবে। না গেলেও চলতো। কিন্তু তিনি অনেক কাজেই আমাকে সাহায্য করেন।

-ওহ তাহলে তো যাওয়া দরকার । ঠিক আছে যাও।

-তুমি ওকে সামলাতে পারবে তো?

-পারবো ,তোমার আসতে যেতে যতটুকু। আমিই পারবো।সোহানা শেখর কে রেখে বেরিয়ে যায়। কয়েক ঘন্টা পরসোহানা অফিস থেকে এসে সদর দরজার দিকে তাকাতেই ওর দম বন্ধ হয়ে আসে।দরজায় তালা।সোহানা শেখর কে ফোন করে।

-তুমি সাদিয়া কে নিয়ে কোথায় গেছো?

-আমি একটু হাসপাতালে আছি।তুমি চলে যাওয়ার পর হঠাত্ ওর রক্ত বমি শুরু হয় ।

ডক্টর কে ফোন করতেই উনি সাদিয়া কে নিয়ে হাসপাতালে আসতে বললেন।

-তুমি কোন হাসপাতালে আছো?আমি আসবো।

-আমি ডক্টর আরমানের হাসপাতালে আছি। সোহানা ফোন কেটে দেয়। শেখরের মাঝে অস্বস্তির ঝড় বইতে থাকে।

সোহানা কি আমাকে সন্দেহ করে? মনে মনে ভাবে শেখর।ওর কেন মনে হলো যে সাদিয়া কে আমি ছিনিয়ে নিচ্ছি?মুখে বলেনি কিন্তু কথায় সেটা স্পষ্টই বোঝা গেছে।ডাক্তার এসে মাঝে সাদিয়া কে দেখে যায়।খানিক বাদে সোহানা এলো।

ওর চোখে মুখে অস্থিরতার ছাপ।শেখর স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।

-সোহানা শোন

-বলো-দুপুরে কিছু খাওনি মনে হয়। -না তুমিও তো খাওনি।তোমার অফিসের কী খবর?

-ফাইল দিয়ে এলাম।আর দুদিনের ছুটি ও নিলাম। মেয়ের যা অবস্থা।-আমার অফিসের খবর জানিনা।যাক কালকে একটা কিছু বলে দেব।তুমি যাও মনে হয় রাতে থাকতে হতে পারে।আর আসার সময় যা কিছু পারো খাবার এনো।

সোহানা সাদিয়া কে আদর করে চলে যায়।এর কয়েক ঘন্টা পর শেখরের চিন্তার মেঘ সরে যায়।

সাদিয়ার জ্বর নেই।

ও এখন সুস্থ।ডাক্তার সাদিয়া কে রিলিস দেয়।শেখর বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বেজে যায়। সাদিয়া কে ওর ঘরে শুইয়ে সোহানা আর শেখর নিজেদের হিসেব কষতে ব্যস্ত।সোহানা কে নিয়ে শেখরের অস্বস্তি যায় নি।

হঠাত্ মেয়ে সাদিয়া এসে দাঁড়ায়।

-বাবা

-কী মা?

-আজ আমি তোমার সাথে ঘুমাবো। নিজেকে ছন্দে আনতে এমন একটা আকুতি খুব চাইছিলো শেখর।

-সোহানা আমি ওকে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

-যাও। শেখর ঊঠে যায়।সোহানা একা বসে আছে।বারান্দায় বইতে থাকা বাতাস ওকে মনে করিয়ে দেয় ও খুব একা। সোহানা দরজায় এসে দাড়ায়।সাদিয়া ঘুমাচ্ছে বাবার উপর পা তুলে।শেখর ও ওকে জড়িয়ে বেঘোর ঘুম।সোহানা ড্রইং এ আসে।ওর প্রিয় নাটকের দারুনপর্ব হচ্ছে।

দেখতে দেখতে সোহানা ঘুমিয়ে পরে।অভ্যাস এর কারণে সোহানার খুব সকালেই ঘুম ভাঙে।

সাদিয়ার মন আজ বেজায় খুশি।দুদিন ছুটিতে মামনি তার সাথে থাকবে।সে খাটে বসে আপন মনে খেলছে।

ওকে শেখর নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে।

শেখর নাস্তার টেবিলে যায়।সোহানা নাস্তা সাজিয়ে দেয়।সাধারণ সুতি শাড়ির সংগে টিপ।ওকে দারুণ লাগছে।শেখর চোখ ফেরাতে পারেনা।

-আমাকে কেমন লাগছে?

-সুন্দর।খুব সুন্দর।দুজন মুখোমুখি বসে নাশতার টেবিলে।খাওয়া শেষে টেবিলে বসেই কথা বলছিলো ওরা।হঠাত্ কলিংবেলের আওয়াজ। সোহানা গিয়ে দরজা খোলে।ওর সমস্ত পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হতে থাকে।সোহানা ঠায় দাড়িয়ে থাকে।

-কি হলো সোহানা কে এসেছে?শেখরের প্রশ্নে সোহানা কিছু বলেনা। শুধু দরজা থেকে সরে দাড়ায়।সজল এসেছে।পূর্ব কথা সোহানা আর শেখরের প্রেম ছিলো ভার্সিটি থেকেই। যা বিবাহে পূর্ণতা পায়।ভালোই চলতে থাকে সংসার।একবছর না যেতেই সোহানার কোল আলো করে আসে সাদিয়া।সংসারে নতুন অতিথি আসায় সুখ উপচে পড়তে শুরু করে।ভালোই চলছিলো তাদের সংসার।মানুষের জীবনের মোড় পরিবর্তন করার জন্য ছোট একটি ঘটনাই যথেষ্ট।একদিন সোহানা কেনাকাটা করতে মার্কেট এ যায়।রোড ফ্রী থাকায় খুব তাড়াতাড়ি ই ফিরে আসে।বাড়ির সদর দরজা খোলা দেখে সোহানার ভেতরে ছাথ করে উঠে।

সাদিয়া কে ঘরে দিয়ে বেডরুমে যেতেই চরম বাস্তবতা ওকে ধরা দেয়।সোহানা তার স্বামী শেখর কে বন্ধু সজলের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়।

রাতে শেখরের সাথে আলোচনা তে বসে।

সোহানার কাছে শেখর নিজের ঊভকামীতার কথা স্বীকার করে।এবং ভবিষ্যতে আর এমনটি না করার সংকল্প করে।কিন্তু সোহানার মনে সন্দেহের বিজ অজান্তেই বপন হয়ে যায়।যা সময়ের সাথেসাথে বাড়তেই থাকে।তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দুজনেই কাটাতে থাকে দুর্বিষহ দিন।সোহানা বুঝতে পারে শেখরের সাথে এক ছাদের তলায় থাক আর সম্ভব নয়। সেই বিশ্বাস এর সেতু ভেঙে গেছে। যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং জীবনের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে সোহানা ডিভোর্স চায়।যা পরবর্তীতে আদালত পর্যন্ত গড়ায়।আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাদিয়া সোহানার কাছে থাকার সুযোগ পায়।সঙ্গত কারণেই শেখরের উপর সোহানা ও সাদিয়ার ভরণপোষণ এর সমস্ত খরচ বর্তায়।শেখর এখন সজলের সাথে আলাদা ফ্লাটে থাকছে।মেয়ে সাদিয়ার অসুখের কারণে কাল রাতে এই ফ্লাটে ছিলো।দুজন কে একসাথে দেখে সোহানার চোখ ভারি হয়ে উঠে।শেখরের সাথে সোহানার ডিভোর্স এর পর তার ওপর সোহানার আর কোনও অধিকার থাকার কথা নয়।তবে কেন সোহানা ওদের একসাথে সহ্য করতে পারছেনা?কেন চোখ ভারী হচ্ছে ওর? এর কোনও উত্তর সোহানার কাছে নেই।শেখর আর সজল চলে যায়।পথের দিকে চেয়ে সোহানার চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে।সোহানা কাপা হাতে দরজা বন্ধ করে।আজ অফিস নেই।

সাদিয়া ওর রুমে খেলছে।

সোহানা ড্রয়িংরুমে আসে।অডিও প্লেয়ার চালায়।

হালকা আওয়াজে রবীন্দ্র সংগীত বাজচ্ছে।

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়…..

সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.