বৃষ্টি

লেখকঃ নাহিদ রাজ

দিনটি ছিল ১৪২৩ সালের ১০ আষাঢ়, শুক্রবার। বর্ষার প্রথম দিন থেকেই পেঁজা মেঘের সাজগোজ চলছিলো রীতিমতো। আজও তার কমতি ছিল না। যখন আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হল বৃষ্টি। রুম থেকে বাইরে আর বের হতে পারলাম না। তখন রাত প্রায় ৯টা। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমি অন্ধকারে খোলা জানালায় বড় আকাশ ও বাইরের প্রকৃতি দেখছি। ম্যাসেঞ্জারে হঠাৎ মেসেজ আসলো। ফড়িং নামের অপিরিচিত একটা আইডি।

-আসসালামু আলাইকুম।

উত্তর লিখতেই, বড় একটা অভিযোগ..

-আপনি আর আমাকে মেসেজ করেন না। আগে কত কেয়ার নিতেন। কি, কোথায় থাকেন সারাদিন অনেক প্রশ্ন একসাথে।

-আমি কোনো ভণিতা না করে ঠিকঠাক মতো আমার ব্যস্ততার কথা বলে দিলাম।

ছেলেটি আমার কথা শোনার পর বলে দিল আমি পড়তে বসেছি, এখন আর মেসেজ করতে পারব না। ব্যস, অফ লাইন। আমি তখন মফিজের মতো বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম ছেলেটা কে! কেনই বা এরকম অধিকার নিয়ে এত কথা বলল? আমাদের কি আগে কোনদিন কথা হয়েছিল? মেসেঞ্জার চেক করে পেলাম না আগের কোন কনভারসেশন। অবাক কাণ্ড, ছেলেটি এত অধিকার ফলালো, আর আমি ছেলেটির পরিচয় না নিয়ে গাধার মতো বসে বসে আবোল তাবোল ভাবছি। তারপর আর দেরি না করে মেসেঞ্জার দিয়ে কল-মেসেজ দিলাম ওই আইডিতে। কিন্তু ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয়া হল, মেসেজ সিন হলো তবে রিপ্লাই বিহীন। অবশেষে বালিশের উপর পা আর বিছানায় মাথা দিয়ে ছেলেটার প্রোফাইল চেক করতে লাগলাম। কোনো ছবিতে তার সম্পূর্ণ মুখঅবয়ব নেই। কি যেন ভাবতে ভাবতে কখন যে দ্বিপ্রহর রাতে প্রবেশ করেছি তা বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ মেসেজ। ফড়িং আইডি থেকে।

-বলেছিলাম পড়তে বসবো, তারপরেও কল দিলেন কেন?

তারপর কেন জানি মনের অজান্তেই পুরো শরীরে শিহরণ জেগে উঠল ওই আইডি থেকে মেসেজ দেখে।

ভয়েস কল দিতেই হ্যালো নামের একটা মিষ্টি মায়াভরা শব্দ হৃদয় ভেদ করে ভেতরে প্রচণ্ড আঘাত হানলো। পরিচয়ে নিজের নাম বললো, জল। সবেমাত্র এসএসসি পাশ করেছে। ইতিমধ্যে একটি কলেজে ভর্তিও হয়েছে। তারপর একভাবে এমন করে কথা বলতে লাগল যে, আমি কোন প্রশ্ন করার সুযোগই পেলাম না। প্রায় দু ঘন্টা পর ঘুম পাচ্ছে বলে কোন কথা না শুনে অসভ্যের মত কেটে দিল লাইন।

পরদিন সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত আমাদের কথা হলো কমপক্ষে দশবার। রাত জাগা পাখির মতো নীরব রাত্রি জেগে জেগে চলতে থাকে আমাদের ফোনালাপ। এ যেন এক নতুন পৃথিবীর সৃষ্টি হলো আমার মাঝে। আমি তার কণ্ঠের আর দ্রুত কথনের প্রেমে পড়ে গেলাম। একা ধারে ঘন্টা ঘন্টা কথা বলে যেতো, আমি বিরামহীন শুনতেই থাকতাম। তাকে ছাড়া আমার পৃথিবী অন্ধকার। রাত জেগে দুজনের চলতে থাকে কবিতার, গানের আসর আর আলিঙ্গন। মাঝে মাঝে আমরা কবিতাকে দিতাম ছুটি, বর্ষার কালো মেঘের আড়ালে খেলতাম লুকোচুরি। নক্ষত্রের হাটে বসে আমি ওর মাথার চুলের বিলি কেটে দিতাম আর চাঁদের আলোয় স্নান করাতাম। ভালোবাসা ভরে দিতাম সবটুকুই। স্বার্থপরের মতো ও সবটুকু ভালোবাসা ঠিক আদায় করে নিত আমাকে দেখাত এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন। চোখে দেখা হয়নি; মুখে বলা হয়নি ভালোবাসি কিন্তু মনের অজান্তেই তৈরি হয়েছে এক অন্তিম অনুভূতি। সব ভালোবাসা অর্পন করলাম অদেখা এই রাজকুমারকে। এভাবেই চললো কয়েকদিন, কয়েক মাস। মাঝে মাঝে দুষ্টুমি আর বাঁদরামিতে ভালোবাসাটা জমত আরো। রাত জেগে দোতলার সিঁড়িতে আর ঘরে বসে কথা বলার নেশাটা এতই প্রখর ছিল যে মশার কামড়ের স্বাদটা গণ্ডারের মত বুঝতেই পারতাম না। কিন্তু এ সুন্দর মুহূর্তটা আমার জীবনে বেশি দিন টিকল না। ঠিক যেমন অন্ধের হাতে স্বর্ণের টুকরো আর মাটির ঢিলা একই।

সেদিন হঠাৎ সকালে ও দুপুরে বলার পর বিকেলে আবার হঠাৎ ওর ফোন। হ্যালো, বলতেই একগাল হাসি আর আনন্দ নিয়ে ও বলে উঠল তুমি কোথায়? আমি বললাম রুমে। আজ বিকেলটা খুব সুন্দর; তোমার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে। আমি আর তুমি আজ রিকশায় বেড়াব। আমি প্রাইভেটে ঢুকলাম, এক ঘন্টা ভাবার সময় দিলাম বলে লাইন কেটে দিল। আমি তো জটিল চিন্তায় পড়ে গেলাম। প্রথম দেখা হবে, কিন্তু আমার তো কোনো প্রস্তুতিই নেই। কি যে করি! তারপর আর কি…! যেতে তো হবেই, প্রিয় মানুষের ডাক। কোনোরকমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বের হলাম। ইতিমধ্যে নদীর ধারে বসে বারবার ফোন দিচ্ছে- তুমি জলদি আসো। কয়েকটা গোলাপ কিনে নিয়ে অনেক দেরি করেই পৌঁছালাম। সামনে গিয়ে পরিচয় হতেই যেন আরো অনেকগুন বেশি কথার ফুলঝুরি ছুটল মুখ দিয়ে। গোলাপ গুলো হাতে গুঁজে দিয়ে পাশাপাশি হাটতে লাগলাম নদীর কিনার ধরে। আমি ওর হাতটি যখন আমার হাতের মুঠোয় ধরে পকেট থেকে অনেকগুলো পছন্দের চকলেট বের করে দিলাম তখন আনন্দে এতটাই আত্মহারা হয়ে গেল যে স্থান কাল বাছ বিচার না করে গালে আকস্মিক চুমা দিয়ে বসল। প্রথম দিনেই এতটা আমি আশা করিনি।

দিন কাটছিল। পরম মমতায় জাপটে ধরেছিলাম জল কে। ভালোবাসায় যখন আমি সিক্ত। জল পাল্টে যেতে শুরু করলো। আমি বোঝাতাম কিন্তু ও যেন আর থাকতে পারছে না আমার সাথে। ছোট বাচ্চার মত কাঁদতাম ওর অলক্ষে ও সবই বুঝতো। জানিনা কোন সে কালবৈশাখী এক ঝাপটায় আমার অস্তিত্ব দিগ্বিদিক করে দিল। একদিন হঠাৎ জল ফোন দিয়ে বলল দেখা করবে। আমি ভাবলাম হয়তো ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু যখন বরাবরের অভ্যাস মত একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে সামনে গেলাম দেখলাম সাথে করে কাকে যেন নিয়ে এসেছে। নিজের ভালোবাসার মানুষ বলে পরিচয় করিয়ে দিতেই সপাটে এক থাপ্পড় মেরে মাটিতে ফেলে দিলাম। হাতটা আমারই এত জ্বালা করছিল চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। কে, কোথায়, কি! না দেখে সোজা যে পথে এসেছিলাম সে পথ ধরলাম। ফেসবুক ফোন সব অফ করে দিলাম। ভাবলাম মরেই যাই বরং। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা রুখে দিল আমাকে। সেদিন রাতের আকাশে বর্ষার মেঘ বৃষ্টি কিছুই ছিল না। শুধু আমার মনের আকাশে বৃষ্টিভেজা রাত ছিল।

পরের বছর বৃষ্টি নামল। মাঝে মাঝে গোলাপ কেনার বদ অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে। কেনার পর মনে হতো কাকে দেবো? এভাবেই আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ঢাকা পড়ে যেতে লাগলো এক বিদেহী প্রেমিকের করুন আর্তনাদ ভরা অশ্রুধারা। আজও বিকেল হলে নদীর ধারে যাই। পকেট ভরা চকলেট কিন্তু দেবো এরকম কেউ নেই। গুমরে গুমরে পড়ে থেকে ক্যান্সার বাঁধিয়ে ফেললাম কিভাবে যেন। সময় খুব কম আমার হাতে। আরও একটা প্রেমিকের মৃত্যু ঘটবে। বলা চলে অপমৃত্যু। সেই রাতের মত এখনো বৃষ্টি হয়। তবে, সেই বৃষ্টির ফোটা আমার জন্য না। বিস্তৃর্ণ যমীনে শুধু কি প্রেমের জন্যই হাহাকার? কে দেবে এই প্রশ্নের জবাব? কে…?

সমাপ্ত

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.