দুই বছর

দেখতে দেখতে দুই টা বছর পার হয়ে যাবে, কোন কোন কাগজে লিখা হবে জুলহাজ তনয়ের হত্যা তদন্তের এখনও কোন আগ্রগতি হয় নাই, অবশ্যই অনেক নাটকীয় ভাষায়। এটাই হবে আমাদের সান্ত্বনা, কারন এমনটাই হয়ে আসছে, আমরা অভস্ত্য, তার উপরে আবার সমকামী অধিকার কর্মী, লিখছে কাগজে এই কতো!

তারপর আমরা কিছু লিখালিখি করবো, আবেগ থাকবে, তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে। কিছুই যাবে আসবে না, সময় তো থেমে থাকে না।

সময় আসলেই থেমে থাকে না, তাই বলে কি আত্মপরিচয় ভুলে যেতে হবে, ভুলে যাবো আমি কিভাবে বাঁচতে চাই, নিজের স্বপ্নটাও অন্যের শেখানো হবে? ২৫ এপ্রিল ২০১৬ রাত নয়টার দিকে আমার এক কাজিন আমাকে ফোন দিয়ে বলল “ভাইয়া এতো বড় ঘটনা ঘটলো, তোমরা কিচ্ছু করবা না?” আমার গলা আটকে যাচ্ছিলো উত্তর দিতে, বললাম; “আমি খুব অল্প ভাগ্যবানদের মধ্যে একজন যার পরিবারের কেউ খোঁজ নিলো এই ভেবে যে আমি ঠিক আছি কি না, আমি জুলহাজ কে চিনতাম কি না, যেই গোষ্ঠী নিজের পরিচয় নিয়ে ভয়ে থাকে, আত্মগ্লানিতে ভোগে, তারা মুখ কিভাবে খোলে আমার জানা নাই, এটা তোদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের মতো আন্দোলন না, যে আন্দোলনে মানুষের বাহবা পাওয়া যায়”। প্রতিবাদ না করার পক্ষে সুন্দর যুক্তি।

আর তারও উপরে যেখানে নীতি নির্ধারক মহল থেকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেয়া হয়, সমাজ সঙ্গতিপূর্ণ না হলে যত বেসিকই হোক, সেই অধিকার নিয়ে কথা বলা যাবে না, তখন তো আমাদের গা ঢাকা দেয়া জায়েজ করা একদম সহজ হয়ে যায়। সহজ হয়ে যায় নিজেকে পাপী ভেবে, পাপকে গোপনে আপন করে নিয়ে সমাজে নিষ্পাপ সেজে থাকা। হয়তো সমাজের সাথে তাল মেলাতে, সমাজের গড়ে দেয়া নীতিতে নতুন কোন পরিবারও গড়া, এবং একই সাথে নিজের পাপকে ধারন  করা; কারন আমাদের সমাজে তো এমন হচ্ছে (যদিও এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ার্স দুনিয়ার সব জায়গায় আছে), আমাদের বললাম কারন আমরা দেখাই যে আমরা করি না। সমাজের সব খারাপের সাথে মিলিয়ে আমরাও বলবো, অন্য সব কিছু চললে আমার জীবনের এই লুকানো পাপ নিয়ে কথা বলারই বা কি আছে?

কিন্তু আমরা একবার কেন ভাবি না যেই সত্ত্বা আমরা জন্ম থেকে পাই, সেটা পাপ হতে পারে না। আমাদের অপরাধবোধটা কেন বা কোত্থেকে আসে? এটা কি ধর্ম থেকে আসে, নাকি সমাজ শেখায়? নাকি আমরা আমাদেরকে দেখি না বলেই মানতেও পারি না? আমরা নিজেরা কি নিজেদের মতো চলতে পারি, না আমাদের যেভাবে চলতে বলা হয় সেভাবে চলি? আমি জানি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমাজ না মানা কতো বড় দুঃসাধ্যের নাম, কিন্তু আমরা যদি আমাদের নিজেদেরকেই মানতে না পারি, অন্য কেউ কিভাবে মানবে?

ধর্ম, সমাজ মানা না মানা নিয়ে আমি ব্যক্তি হিসেবে কাওকে কিছু বলতে পারি না; কিন্তু আমরা যে যাই বলুক সমাজের ৯০% থেকে আলাদা এটা তো আমাদের মানতেই হবে, এবং একারনেই অন্য সব কিছুর সাথে আমাদের মাথাটাকেও কাজে লাগাতে হবে। আমাদের চিন্তা করতে হবে নিজেকে নিয়ে আমি মাথা উঁচিয়ে বাঁচবো না আজীবন লুকিয়ে বাঁচবো কাছের সবার কাছ থেকে, অন্তত পক্ষে নিজের বা নিজেদের কাছে। আমাদের নিজেকে বা নিজদেরকে ভালবাসতে শিখতে হবে, আর সেটা গোপনে না।

আমরা হয়তো জুলহাজ ভাইয়ের মৃত্যুকে অপরিহার্য ছিল ধরে নিয়েছি, কারন দেখাচ্ছি তার কিছু অপরিণামদর্শি সিদ্ধান্তর। কিন্তু এভাবে কি আমরা ভাবি যে উনি স্বপ্ন দেখাতেন, এবং স্বপ্ন যেন আর কেউ দেখাতে না পারে এই জন্যই উনাকে হত্যা করা? উনি নিজেকে ভালবাসতেন এবং কেউ যখন কোন কিছু নিজের ভেতর ধারণ করতে পারে, তখন সেটা অন্যদের মধ্যে সঞ্চারণও করতে পারে, এবং উনি সেটা করতেন।

আমাদের উচিৎ না, এই হত্যাকাণ্ড ভুলে যাওয়া, বা যা হওয়ার ছিল হয়ে গেছে ভেবে কুয়ায় ডুব দেয়া। সমষ্টিগতভাবে কিছু করতে না পারি, ব্যাক্তিগত জীবনে করি। নিজেকে অন্তত ভালোবাসি, সাহসের সাথে নিজেকে মেনে নেই, আর একটু পারলে আমাদের মতো অন্য আরেকজনকেও সাহসি হতে শেখাই একটু করে। একটু স্বপ্ন দেখতে শিখি, নিজের স্বপ্ন, নিজের ভালবাসার স্বপ্ন, নিজ পছন্দের কারো সাথে বাঁচার স্বপ্ন। কারন স্বপ্নই মানুষকে তার নিজের পরিচয় দিতে পারে, অন্য কিছু নয়।

(রুপবান ব্লগ থেকে সংগ্রহীত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.