ফেরা

বৈশাখ মাস । হজরত শাহজালাল (র) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে বের হতেই ঢাকার বিখ্যাত রোদ চোখে এসে পড়লো।কত বছর পর এলাম? তাও ১০ বছর হবে। এই এতো গুলো বছরে ঢাকায় নিশ্চয়ই অনেক পরিবর্তন এসেছে।
আমাকে রিসিভ করতে কেউ আসে নাই নিশ্চয়ই। আমি জানি আসবে না। আমার আসার কথা তো শুধু মাত্র জানেন ছোট কাকু। হটাত ইমারজেন্সি কলে ঢাকায় আসা। আসতাম না। কিন্তু ছোট কাকু এমনভাবে ফোনে কথা বললেন না এসে পারলাম না। ছেলে বেলায় তার কাছ থেকেই অপার স্নেহ পেয়েছি। বড় হয়ে পেয়েছি সাহায্য। আমার জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে তিনি। তিনি ডাকবেন আর আমি আসবো না?
মিশু আমার সাথে আসতে পারে নাই। হটাত করে ছুটি পেলো না। মিশু আমার বয়-ফ্রেন্ড। তার কথা যথা সময়ে বলবো।
আমার দ্রুত পালইকান্তা পৌঁছাতে হবে। পালইকান্তা আমার গ্রাম। আমার ভালবাসা। সেখানেই আমি বেড়ে উঠেছি ।
বের হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে ফার্মগেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ওখানে একটা হোটেলে বুকিং দেয়া আছে। গাড়ি এয়ারপোর্ট রোড ধরে চলছে। সেই পরিচিত রাস্তা অপরিচিত লাগছে। ফ্লাইওভার হয়েছে। রাস্তার দুইপাশে সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য ।মুগ্ধ হয়ে দেখছি। কত পরিবর্তন এই ঢাকা শহরের।
এসি চালানো দেখে রক্ষা। নাহলে বাইরে ঢাকার বিখ্যাত গরম। ভাবছি ভ্রমণ টা কষ্টকর হবে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করেই বের হতে হবে কমলাপুর রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। ট্রেনে করে ময়মনসিংহ। সেখান থেকে বাস তারপর নৌকা যোগে পালইকান্তা গ্রাম।
পালইকান্তা কি এখনো তেমন আছে সেই পুরনো আমলের মত?সেই আমার ছেলেবেলার মত। সবুজ আর সবুজ? নাকি যান্ত্রিকতার ছাপ পড়ে গিয়েছে? ভাবতে ভাবতে চলে গেলাম সেই ১৯৯৬সালে। ২২ বছর আগে।

সময় টা ১৯৯৬।
পালইকান্তা গ্রাম। গ্রামের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। গ্রামটির তিন পাশে নদী। পাকা রাস্তা নেই। ঢাকা থেকে আসতে হলে নদী পার হয়ে আসতে হবে। সভ্যতার আলো তাই কম পড়েছে এখানে। গ্রামে বিশাল জমিদার বাড়ি। মৃধা বাড়ি। আমার দাদা আলি আকবর মৃধা এই বাড়ির কর্তা। জমিদারি প্রথা সেই পাকিস্তান আমলেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ দাদা কে এখনো জমিদারের থেকে কম মনে করে না।দাদাউ নিজেকে এখনো যেন জমিদার ই ভাবেন।সেই রকম ঠাট বাঁট বজায় রেখেছেন। যে কোন ধরনের অপরাধ হলে দাদার কাছেই সবাই নালিশ করতে আসে। যে কোন শালিসে প্রধান থাকেন আমার দাদা।আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে এখনো কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে যায় না। এতোটা সম্মান করে গ্রামের মানুষ।দাদা রাশভারী মানুষ। অসম্ভব ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ।কেউ মুখের উপর একটা কথা বলার সাহস পায় না।
এবার আসি আমার কথায়।আমি সবুজ। বয়স ১২। আমার বাবা মা বেঁচে নাই। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তারপর থেকে আমি দাদার কাছে মানুষ হয়েছি । আমার বাবা ছিলেন বড় ছেলে। আমার আরো ৩ চাচা রয়েছে। এক ফুপুও রয়েছে।ফুপুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে ।ঢাকায় থাকেন।দাদু গ্রামে একটা স্কুল দিয়েছেন। আমি সেখানে ক্লাস ফাইভে পড়ি।
ক্লাস ফাইভে পড়লে কি হবে । আমি বয়সের তুলনায় অনেক পাকা।যাকে বলে অকালপক্ব ।সব বুঝি। আমার ফুটফরমাশ খাটার জন্য একটি ছেলে ঠিক করেছেন দাদু। তার সাথে আমার ভারি বন্ধুত্ব হয়েছে। সে আমাকে যাবতীয় গোপন কথা বলে ।বাসার নানা গোপন কথা তার নখদর্পণে ।ছেলেটার নাম মনি। মনির বয়স হবে ১৫-১৬।পড়াশোনা করেছে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ।
আমাদের বাড়ি টা খুব সুন্দর। ভারতীয় আর্কিটেক্ট দিয়ে আমার দাদার বাবা বানিয়েছিলেন। দোতালা কাঠের বাড়ি। ২০ টি ঘর রয়েছে। বাড়ি টার পিছনে বিশাল একটা দীঘি আর ঘাটলা। সামনে বাগান। মালী কাকু রয়েছেন। বাগানে আমার দাদার বাবার একটা ভাস্কর্য রয়েছে।ভাস্কর্যের একটা কান ভাঙা। একটা নেংটা পরীর মূর্তি রয়েছে। আমার মূর্তিটি দেখলে খালি হাসি পায়। মূর্তি টাকে একটা কাপড় পরিয়ে দিলে কি ক্ষতি হত? বেচারি।
আমাদের বাসায় দাদি মারা যাবার পর থেকে কোন মহিলা নেই। মেজ কাকু আর ছোট কাকু বিয়ে করেন নাই। আর বড় কাকু ছোট বেলায় পালিয়ে ইতালি চলে গিয়েছেন। কিভাবে গিয়েছেন তা জানি না। পালিয়েছেন দাদুর ভয়ে। তিনি আই এ পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। ভেবেছিলেন দাদু পিটিয়ে মেরেই ফেলবেন। অবশ্য এরপরে আমার কোন চাচুই আই এ পরীক্ষাই দেন নাই। আর ফুপু নিজে নিজে বিয়ে করেছেন বলে দাদু তাকে ত্যাজ্য করেছেন। তার নাম উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ ।
আমাদের মূল বাড়ি টার বাইরে একটা নাচঘর আছে। এই ঘর টা কে বলে রঙ মহল। সে এক রহস্যময় বাড়ি। ওখানে আমাদের সবার যাওয়া নিষেধ। এমন কি ছোট কাকু আর মেঝ কাকুরও। শুধু মাত্র দাদা যান। দাদা যখন রঙ মহলে যান ছোট কাকু রাগে জিনিসপত্র ছুড়ে মারতে থাকেন। কেন এতো রাগ কে জানে?
আমি একদিন মনি কে জিজ্ঞেস করলাম
-আচ্ছা রঙ মহলে কি হয়? জানো ? আমাদের নিষেধ কেন যাওয়া ?
-তুমি জানো না? ওখানে নাচ হয়?
-নাচ দেখতে নিষেধ কেন? আমরা তো যাত্রা দলের নাচ প্রায়ই দেখি। তখন তো দাদু না করেন না?
-আরে ওখানে তো বেশ্যারা নাচে।
-বেশ্যা কি?
-তুমি বুঝবা না।
-বুঝায় বল।
-আছে ব্যাপার। তোমাকে নিজের চোখেই দেখাবো।
-কিভাবে?
-কাল কে রংমহলে আসর হবে। সেই আসরে আসবে নাকি মধু বাঈ। সোনালি ঘাগরা আর গহনা পরে নাচবে। সেইরকম নাচ হবে। তুমি আর আমি গোপনে দেখবো। পিছন দিকে জানালা ভাঙা একটা। ওই জানালা দিয়ে সব দেখা যায়।
কিন্তু দাদা জানলে মেরেই ফেলবেন।
জানবে কিভাবে।তুমি বলবা ?
-না। তাও ভয় লাগে।
-তাহলে আমি একাই যাবো। তোমার তো মুরগীর কলিজা।
এইবার আমার গায়ে লাগলো। আমি হাজার হলেও আলি আকবর মৃধার নাতি। মুরগীর কলিজা বলার সাহস কিভাবে হয়??
-না আমিও যাবো।
আমি রাজি হওয়াতে মনি খুশি হয়ে গেলো।সব ধরণের গোপন কথা আমাকে শোনাতে আর দেখাতে পারলে সে দারুণ খুশি হয়। সে এক কথায় এসব বিষয়ের টিচার। এর আগে মেয়েদের নগ্ন ছবি আমাকে দেখিয়েছে। আমি দেখতে চাই নাই। খুব লজ্জা পেয়েছিলাম।
পরের দিন রাতে খাবার টেবিলে দাদা নাই। বুঝলাম রঙ মহল গিয়েছেন। ওখানে গেলে রাতে ঘরে খান না তিনি।খাবার টেবিলে পিন পতন নীরবতা।অন্য সময় ছোট কাকু কত গল্প করে। আজ গম্ভীর মুখে খাচ্ছেন। খাওয়া ভাল হয়েছে ।তারপরও মেজো কাকু কিছুই খেলেন না। বুঝলাম দাদুর রংমহলে যাওয়া তাদের পছন্দ না। অথচ দাদুর মুখের উপর কিছু বলার সাহস নাই। আমি দ্রুত খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে আসলাম। দেখলাম মনি খেয়ে দেয়ে বসে আছে আমার অপেক্ষায়। আমি বললাম-
-কখন যাবা?
-আরেকটু রাত হোক। ছোট সাহেব আর মেঝ সাহেব ঘুমাক।
আমি উৎসাহে টগবগ করছি। কিন্তু সময় আর পার হয় না। আরো এক ঘণ্টা পর মাথা চাদর দিয়ে ঢেকে আমরা বের হলাম। বর্ষা কাল। বিকেলে বৃষ্টি পড়েছিলো। মাঠ ভিজা।নিকষ কালো রাত। শুধু ঝি ঝি পোকা ডাকছে।আমার ভয় ভয় লাগছে। মনি আমার হাতে স্পর্শ করে সাহস দিচ্ছে । রঙ মহলের কাছাকাছি আসতেই গানের আওয়াজ শুনতে পারলাম। বাংলা গান নয়। সম্ভবত হিন্দি গান। আমার শুনতে বেশ লাগছে। তালে তালে নাচতে ইচ্ছা করে। আমার তো গান শুনা হয় না। ছোট কাকু ক্যাসেটে গান শুনেন তখন শোনা হয়। তাও সব বাংলা গান।
রঙ মহলের পিছনের দিকের দেয়ালে একটা ভাঙা জানালা। আমি আর মনি গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে দাড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম।কিন্তু কোথায় মধু বাঈ? কোথায় সোনালী ঘাগরা? এতো আমার বয়সী একটি মেয়ে।ফ্রক পরে নাচছে।মাথায় বেণি, ঠোঁটে যাত্রা দলের মহিলাদের মত রঙ মাখানো, পায়ে ঘুঙুর। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম এ মেয়ে নয়। ছেলে। মেয়ে সাজানো হয়েছে।একদিকে হারমোনিয়াম, তবলা বাজাচ্ছে কিছু মানুষ। দাদা একটি পাত্রে কি জানি খাচ্ছেন। সাথে আরও ৩ জন রয়েছেন।তারাও খাচ্ছেন।আমি ফিস ফিস করে মনি কে জিজ্ঞেস করলাম
-দাদাজান কি খাচ্ছেন?
মণি ফিস ফিস করে বলল
-মদ। কিন্তু আর কথা নয়। চুপ করে নাচ দেখো। আমাদের কথা শুনতে পারলে মেরেই ফেলবে।
মদের কথা শুনে আমার খুব অবাক লাগলো। মদ খাওয়া তো মন্দ। দাদাজান খাচ্ছেন কেন! ছেলে টা খুব সুন্দর নাচছে। কিন্তু তার চোখ দেখে আমার মনে হল তার অনেক দুঃখ ।অনেক অভিমান। আমি অবাক হয়ে জানালা দিয়ে দেখছি। রংমহলের ভিতরের সাজ সজ্জা খুব সুন্দর। ঘরের মাঝখানে বিশাল একটা ঝাড়বাতি ঝুলানো । দেয়ালে বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না। মেঝে তে আলপনা আঁকা। বিশাল ২ টি শ্বেত পাথরের ঘোড়া। আর মেঝে তে গদি বিছানো।
হটাত ছেলেটা নাচতে নাচতে জানলার দিকে তাকালো।আমাদের দেখে ফেললো।তার চোখ পড়লো আমার চোখে। সে ভুত দেখার মত জোরে চিৎকার দিলো। চিৎকার শুনে আমরা দিলাম দৌড়। একদম আমাদের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। হাঁপাচ্ছি জোরে জোরে। গলা শুকিয়ে গিয়েছে।বুকে হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে।এতো ভয় আর কোন দিন পাই নাই। কেউ দেখে নাই তো আমাদের? নাহ তাহলে এতক্ষণে আমাদের ঘরে এসে উপস্থিত হত। কেন যে ছেলেটা এতো জোরে চিৎকার দিলো।আমি এতই ভয় পেয়েছি যে নিজের বুকের ধুক ধুক শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর আমি বোকার মত মনি কে জিজ্ঞেস করলাম-
– কোথায় মধুবাঈ ? এ তো একটা ছেলে!
মনিও বোকা হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল-
– এ মনে হয় ঘেঁটু দলের ছেলে । এরা মেয়ে সেজে থাকে। নাচ গান করে। এদেরকেও অনেকে পছন্দ করে।
– আমি বললাম
– কিরকম পছন্দ?
এইবার মনি লজ্জা পেয়ে বলল-
– তুমি বুঝবা না।
– আমি বুঝবো বল।
– ওরা সেক্স করে।
আমি সেক্স কথাটা আগেও শুনেছি।ক্লাসের ছেলেরা বলাবলি করে। কিন্তু মানে জানি না।
– সেক্স মানে কি?
সেদিন মনি আমাকে সৃষ্টি জগতের একটি বিস্ময় কে আমার সামনে তুলে ধরলো। অপ্রাপ্ত বয়সেই আমি প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে গেলাম। সারা রাত আমি ঘুমাতে পারলাম না। কেন জানি পুরো পৃথিবী কে কর্কশ আর নোংরা মনে হচ্ছিলো। আর মধুবাঈ এর জন্য চোখ জলে ভিজে আসছিলো । আহা ছেলেটা আসলেই তো অসহায়।
কিন্তু ওরা কোথায় উঠেছে আমি জানতে চাইলাম।
– নদীর ঘাটে মনে হয়। ভাটি অঞ্চলে থাকে এরা। বর্ষাকালে এই অঞ্চলে আসে। মনে হয় নদীর ঘাটেই বসতি গড়েছে।
সেইদিনের ঘটনা নিয়ে আর কোন হইচই হল না। কিন্তু এরপর আসর বসলে শহীদ চাচা (দারোয়ান) রংমহল ঘিরে টহল দিতেন। আমাদের আর সাহস হয় নাই রংমহলের ধারে কাছে যাওয়ার।

মধুবাঈয়ের সাথে আমার আরেকবার দেখা হয়।একটি নিষিদ্ধ জায়গায়। একদিন মনি এসে খবর দিলো মেলা বসেছে গ্রামে। আমি তো মহা-খুশি। মেলায় যাবো । কদমা , বাতাসা খাবো । খেলনা কিনবো।চরকি তে উঠবো । কিন্তু মনি বলল অন্য কথা।তার কথা অনুযায়ী নিশুতি রাতে মেলার আসল মজা পাওয়া যায়। তখন নাকি মেলা জমে উঠে ।
– এতো রাতে মানুষ মেলায় যায়?
– হ্যাঁ। যারা সত্যিকারের পুরুষ তারা যায়।
– আমি বললাম
– দাদু তো যেতে দিবে না।
– না জানিয়ে যাবো।
– কিন্তু ধরা পড়লে ?
– ধরা পরবো না।
আমার কেমন জানি ভয় লাগছে। আবার যেতেও ইচ্ছা করছে। শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি হলাম। আসলে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সবার আকর্ষণ থাকে। আর আমার বয়সে তো আরও বেশি।
আবার সেই রাতের মত নিশুতি রাতে বের হলাম আমরা মাথায় চাদর ঢেকে। দেয়াল টপকালাম। কারন মূল ফটকে শহীদ চাচু রয়েছেন। দেখে ফেলবেন তিনি। মনি আমাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যাতে হারিয়ে না যাই।কণকণে ঠাণ্ডা ।শিশির পরছে ।অন্ধকার।মাঝে মাঝে জোনাকি পোকা জ্বলছে নিভছে। মনির কাছে একটা টর্চ লাইট ছিল। টর্চ লাইটের আলোয় পথ দেখে যাচ্ছি। কেমন ভয় ভয় করছে। ভুত নেই তো আশে পাশে। মেলা বসেছে নদীর তীরে।
মেলায় এসে দেখলাম এতো রাতেও পুরুষ মানুষের ভীর। বেশ কয়েকটা বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই বাতির আলোয় আলোকিত চারিপাশ।মেলায় কেউ তাস খেলছে।নানা রকম জুয়ার আসর বসেছে। কোনটার নাম ওয়ান টেন, কোনটা ডাবব, কোন টা চরকি। কেউ মদ খাচ্ছে । ব্যাটারি দিয়ে একটা টেলিভিশন চালানো হচ্ছে। সেখানে মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখাচ্ছে।সবাই ঘুরে ঘুরে আমাকে দেখছে। এত অল্প বয়স্ক কোন ছেলে তো নেই। আমি চাদর দিয়ে মুখটা আরও ভালভাবে ঢেকে নিলাম যাতে কেউ চিনতে না পারে। কেমন ভয় করছে।
মনি আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাস খেলতে বসে গিয়েছে। আমার কাছে প্রায়ই দাদা কিছু টাকা রাখতে দেন। সেখান থেকে দিলাম। আমি মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। একপাশে দেখলাম নাচ হচ্ছে ।একজন গানও গাইছে।
আমার মনের বেদনা
সে বিনে কেউ জানে না
কালা যখন বাঁজায় বাঁশি
তখন আমি রান্তে বসি
বাঁশির সুরে মন উদাসী
ঘরে থাকতে পারি না
আমার মনের বেদনা
সে বিনে কেউ জানে না।
অনেকেই দাড়িয়ে দেখছে। আমি গিয়ে দেখলাম এ আর কেউ নয় মধুবাঈ। আজো মেয়ে দের পোশাক পরে নাচছে। পায়ে ঘুঙুর।
নাচ শেষ হলে সে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।
– তুমি জমিদারের নাতি না?
– হ্যাঁ ।
– এখানে কি কর? এখানে ছোট দের আসা নিষেধ।
– কিন্তু তুমি তো এসেছো ?
– আমি আর তুমি এক হলাম? আমি হলাম ঘেঁটু পুত্র। আর তুমি জমিদারের নাতি।
এই কথাটা বলতে বলতে ছেলেটা মুখ করুন হয়ে গেলো । আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
– তোমার অনেক খেলনা না?
আমি কিছু বললাম না।
– আমার জানো কোন খেলনা নাই। কেউ আমাকে খেলতে নেয় না। আমি সারা দিন একা থাকি। আমার ভাল লাগে না। আর রাত হলেই তো নাচ আর…।
– আর কি?
– কিছু না। তুমি বুঝবা না।
আমার খুব কষ্ট লাগছিলো। ঈশ একটা খেলনা যদি নিয়ে আসতাম। তাহলে একে দেয়া যেতো।
হটাত একটা বিকট দর্শন মহিলা এসে মধু কে চড় দিয়ে বলল
– তোর না বাইরের মানুষের সাথে কথা বলা নিষেধ ? আয়।
মহিলা আমার দিকেও কেমন জানি সন্দেহর দৃষ্টি তে তাকালও। আমি ভাবলাম চিনে ফেললো না তো ? কিন্তু মহিলা কিছু জিজ্ঞেস করলো না। মধু কে নিয়ে চলে গেলো।মধু একবার পিছন ফিরে করুন চোখে আমার দিকে তাকালো। তারপর মহিলার পিছন পিছন চলে গেলো। চোখ দেখে মনে হল পৃথিবীর সব অভিমান তার চোখে কান্না হয়ে টলমল করছে।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো কেন জানি মধুর উপর। কেমন জানি একটা আত্মার বন্ধন অনুভব করছিলাম। অজান্তেই চোখে পানি এসে গেলো । কেন ছেলেটার একটাও খেলনা নেই। ঈশ আমার একটা খেলনা যদি তাকে দিতে পারতাম।
একটু পরে মনি বিড়ি ফুকতে ফুকতে আসলো। যত টাকা দিয়েছিলাম জুয়া খেলতে গিয়ে সব হেরে বসে আছে। কিন্তু তারপরও মনি বেশ খোশ মেজাজে বলল
– চল বাড়ি যাই।
আমরা রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে বার বার মধুর কথাই মনে আসছিল। এদিকে ততক্ষণে যে ছোট কাকুর গুপ্তচর খবর দিয়ে দিয়েছে তা তো জানি না। আসলে আমরা ছোট দেখেই বুঝতে পারি নাই মেলায় ঢুকার পর থেকেই সবাই আমাদের লক্ষ্য করছে। অনেক আগেই তাড়িয়ে দিতো কিন্তু জমিদারের নাতি দেখে কিছু বলে নাই। কিন্তু খবর ঠিকই পাঠানো হয়েছে।
বাড়ি তে ঢুকতেই দেখলাম ছোট-কাকু দাড়িয়ে আছে। চোখ লাল। আমার আত্মা কেঁপে উঠলো। আমাকে কিছু বললেন না। শুধু বললেন উপরে নিজের ঘরে যেতে। সে কি শীতল কণ্ঠ। আমি দৌড়ে চলে গেলাম।অপেক্ষা করছিলেম মনির জন্য। মনি কে কি কাকু খুব মারবে? মনি আর আসে না। ভয় লাগছিলো মনির জন্য। ছোট কাকু খুব রাগী। ঈশ কেন যে মেলায় গেলাম। মনি আর আসলো না রাতে।
সেই রাতের পর থেকে মনি কে আর দেখি নাই আমি। শুধু শুনেছিলাম মালী কাকুর কাছে যে ছোট কাকু মনি কে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এটা নাকি অল্পের উপর দিয়ে গিয়েছে। দাদা জানলে নাকি চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেলা হত মনি কে ……।
সেদিনের পর থেকে মনির অভাব খুব বোধ করতাম। কারন আমার আর কোন বন্ধু ছিল না। স্কুলে সবাই আমার সাথে মিশতে ভয় পেতো। কারন আমি জমিদারের নাতি। সবাই ভয়ে ভয়ে কথা বলতো। জানতো কোন উল্টাপাল্টা হলে ছোটকাকু তার বারো টা বাজিয়ে দিবেন। একমাত্র মনি আমার সাথে কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই কথা বলতো। কিন্তু সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ভুলে গেলাম আমি মনি কে। কিন্তু মনি কি আমাকে ভুলেছে?


আমি ক্লাস সেভেনে উঠলাম । আজকাল আমার জানি কি হয়েছে ছেলেদের নগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়। আমার যৌনাঙ্গ শক্ত হয়ে যায়। মাঝে মাঝে আঠালো পদার্থ নিঃসৃত হয়। স্বপ্নে নগ্ন পুরুষ দেখি। ঘুম থেকে উঠে দেখি চাদর ভেজা। আমার খুব ভয় লাগে। কিন্তু কাউকে বলতে ও লজ্জা লাগে। কোন বড় অসুখ না তো ? ঈশ এখন যদি মনি থাকতো ! সে নিশ্চয় কোন উপায় বলতো।
স্কুলে একজন নতুন স্যার এলেন। আমার দাদু তাকে আমার গৃহশিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ দিলেন। যাকে বলে লজিং মাস্টার। থাকবেন আমার সাথে এক ঘরে। আমি খুব বিরক্ত। একজন বয়স্ক মানুষ সবসময় আমার ঘরে থাকবেন। তাও তিনি আমার আবার শিক্ষক। এখন আর যখন তখন যা ইচ্ছা করা যাবে না। কিন্তু কোন প্রতিবাদ করতে পারছি না। দাদাজানের মুখে মুখে কথা বলতে পারবো না।
স্যারের নাম রফিক। যেদিন রফিক স্যার আসবেন আমাকে পাঠানো হল নদীর ঘাটে যেয়ে স্যার কে নিয়ে আসার জন্য।আমার মোটেও ইচ্ছে করছে না। কিন্তু না যেয়ে উপায় কি।দাদাজান বলেছেন।অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেলাম।
ঘাটে গিয়ে দেখলাম একজন অত্যন্ত সুদর্শন একজন লোক লাগেজ নিয়ে নৌকায় বসে আছে।নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা। আমি হাত ধরে নৌকা থেকে নামালাম। তিনি নামতে পারছিলেন না। নাম পরিচয় কুশল বিনিময় হল। তার নাম রফিকুল আলম। রকিফ স্যার খুব বন্ধু-সুলভ। গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আর তিনি এই কথা সেই কথা জিজ্ঞেস করছেন। বাসায় টিভি আছে কিনা, গান শুনার ব্যবস্থা আছে কিনা এসব। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর না বোধক। তিনি উত্তর শুনে কেমন হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একটা কথা শুনে খুব খুশি হলেন। আমাদের বাসায় বিশাল একটা লাইব্রেরী আছে। স্যারের কথা শুনে বুঝলাম স্যার বই পড়তে খুব পছন্দ করেন।
আমাদের বাড়ি দেখে স্যার হা হয়ে গেলেন। এতো সুন্দর বাড়ি নাকি তিনি জীবনে দেখেন নাই। এরপরে হা হলেন ঘরে ঢুকে। আমার বিশাল বড় খোঁদাই করা সেগুন কাঠের পালঙ্ক দেখে তিনি বলেই ফেললেন এতো সুন্দর পালঙ্ক তিনি আগে দেখেন নাই। স্যার ফ্রেশ হয়ে যখন বের হলেন তখন তার জন্য আরেকটি চমক অপেক্ষা করছে। দাদু খেতে ডেকেছেন। সেখানেও প্রায় কমসেকম ২০ টি পদ রয়েছে। দাদু কম পদ টেবিলে থাকলে খুব রাগ করেন। খেতে পারেন না। তাছাড়া স্যার আসা উপলক্ষে আজকে কিছু পদ বেশি রান্না করা হয়েছে।
দাদু খাবার টেবিলেই নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। সেই সব উত্তর থেকে বুঝলাম স্যার খুব দুঃখী। ছোট বেলায় বাবা মারা গিয়েছেন। ছোট ছোট ভাই বোন। মা একটা প্রাইমারী স্কুলের টিচার। তার একার আয়ে সংসার চলে না।স্যার চাকুরী পাচ্ছিলেন না। তাই তো তিনি এতো দূরে এসেছেন শিক্ষকতা করতে।
প্রথম প্রথম স্যারের সঙ্গ খুব ভাল লাগতো। নানা ধরনের গল্প করতেন তিনি। জোকস বলতেন। বিখ্যাত লেখক দের লেখা গল্প বলতেন। আমি তন্ময় হয়ে শুনতাম। লাইব্রেরি থেকে অনেক বিখ্যাত লেখকদের বই আমাকে খুঁজে খুঁজে বের করে দিয়েছিলেন পড়ার জন্য। তার খুঁজে দেয়া বই গুলোর মাঝে যক্ষের ধন বইটা আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। স্যার কে খুব ভাল লেগে গেলো। কিন্তু স্যারের একটা অন্য রূপের সাথে পরিচিত হলাম কয়েকদিনের মাঝেই। এক কুৎসিত কদাকার রূপ। স্যারের সুন্দর চেহারার আরেকটা পিঠ। ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মত।
স্যার ঘুমাতে গেলেই কেন জানি একদম আমার গা ঘেঁষে ঘুমাতেন। এতো বড় পালঙ্কে, এতো জায়গা খালি থাকতে গা ঘেঁষে কেন ঘুমাতেন তা আমি বুঝতে পারতাম না। কিন্তু একদিন বুঝলাম। সেই দিনের কথা ভাবলে এখনো গায়ের লোম দাড়িয়ে যায়। স্যার সেই রাতে ঘুমের মাঝে হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর সারা শরীরে চুমু দিতে লাগলেন। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমার কেমন জানি ভালও লাগছিলো।যৌনাঙ্গ শক্ত হয়ে গেলো। আমিও তার সব কর্মকাণ্ডে সারা দিচ্ছিলাম।কিন্তু স্যার ব্যথা দিলেন। আমি আর নিতে পারলাম না ।
পরদিন ছুটি ছিল। শুক্রবার। সারাদিন আমি মন মরা হয়ে থাকলাম। আমি এ কি করলাম। স্যার কেন এমন করলেন। মাথার মাঝে সারাক্ষণ এই প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো। কেমন জানি নিজের উপর ঘৃণা জন্মালো। অনুতপ্ত হলাম।ভয়ও পেয়েছি অনেক। কিন্তু এরপর আবার স্যার যদি এমন করে তখন কি করবো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঘরে যাচ্ছি না ভয়ে। কারন স্যার আছে। আমি মনস্থির করলাম যেভাবে হোক স্যারের এই কাজে আর সায় জানানো যাবে না।
রাতের খাবারের পর ২ জনই শুয়ে পরলাম। স্যার কেমন জানি উশখুশ করছেন। আমি মরার মত চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলাম।কিছুক্ষণ পর স্যার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন । সারা দিলাম না। চুমু খেলেন। আমি সারা দিলাম না।নানা ভাবে স্যার চেষ্টা করলো আমাকে জাগাতে। কিন্তু আমি মরার মত পরে রইলাম। স্যার খুব ক্ষেপে গিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। স্যারের সেই রুদ্রমূর্তির কথা এখনো আমি ভুলি নাই। রেগে গিয়ে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছিলেন। পরীক্ষায় পাশ করাবেন না বলেও হুমকি দিলেন। তখন আমার টনক নড়লো।পরীক্ষায় তো ফেল করা যাবে না। আমি চোখ খুললাম। মাফ চাইলাম স্যারের কাছে। আমি দেখলাম স্যার অদ্ভুত ভাবে বিজয়ের হাসি হাসছেন।
১ সপ্তাহ হল প্রতি দিন স্যারের সাথে আমার শারীরিক মিলন হয়। আমার জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গেলো। সারাটা দিন, সন্ধ্যা মন মরা হয়ে থাকি। কিছুই ভাল লাগে না।পড়াশোনা হয় না। অনুতপ্ত লাগে। মনে হয় বিশাল বড় পাপ করছি।কাউকে বলতেও পারছি না। মনি থাকলে তাকে বলতাম। কিন্তু সে কোথায় কে জানে। সন্ধ্যা হতেই ভয় লাগা শুরু হয়। আবার সেই স্যারের সাথে এক বিছানায়।
গোধূলি লগ্নে আমি পুকুর ঘাটে বসে কাঁদছি। এছাড়া কিবা করার আছে। ঝড় ঝড় করে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি তে ভিজছি আর কাঁদছি। আমার কাছে মনে হয়েছে দাদু কে বললে দাদু বিশ্বাস করবেন না। তাই বলি নাই। কিছুক্ষণের মাঝে দেখলাম ছোট কাকু ছাতা নিয়ে ঘাটে এসেছেন। আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে তিনি অবাক। আর চোখে পানি দেখে আরো অবাক হলেন। ছোট কাকু আমাকে সবচেয়ে আদর করতেন। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন
বাবা কাঁদছিস কেন?
আমি এইটুকু কথা শুনেই ভ্যায় করে কেঁদে দিলাম। তিনি আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। আমি ভরসা পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে স্যার আমার সাথে যা যা করেছেন সব বলতে লাগলাম। কিছু শুনেই কাকু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন
বুঝেছি। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
নিজেকে মনে হল ভার মুক্ত হলাম।একটা শান্তির পরশ পেলাম।বুকটা হাল্কা লাগলো।
কিন্তু ছোট কাকু প্রচণ্ড রেগে আছেন। তার শীতল কণ্ঠে আমারই লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বুঝলাম স্যারের এইবার সব কিছুর জবাব দিতে হবে। ছোটকাকু আমাকে বললেন কাউকে কিছু না বলতে। তারপর আমাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন।
সেদিন রাতে খাওয়ার আগে স্যার জানি কোথায় গেলেন। আমাকে কিছু বলে যান নাই। খাবার ঘরে সবাই উপস্থিত। স্যার নেই। দাদু বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
– রফিক ঘরে নেই?
– না দাদাজান। স্যার তো ঘরে ছিল না। কোথায় জানি গেলেন খুব তাড়াহুড়ো করে। আমাকে বলে যান নাই।
দাদাজান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন-
– তোমরা খাওয়া শুরু কর। রফিক পরে খেয়ে নিবে। ওর জন্য আর অপেক্ষা করবো না।
সেদিন রাতে স্যার ফিরলেন না। তারপরের রাতেও না। তারপরের দিন সকালে নদীর ধারে স্যারের লাশ পাওয়া গেলো। পচা গলিত লাশ।

আমি দেখতে দেখতে এইটে উঠে গেলাম। আজকাল আমার স্কুলের সবাই মেয়েদের নিয়ে অনেক গল্প করে। তাদের নগ্ন ছবিও যোগার করেছে অনেকে।লুকিয়ে লুকিয়ে সবাই মিলে তা দেখে। কিন্তু আমার ভাল লাগে না। আমার কেন জানি নগ্ন পুরুষের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগে। নগ্ন মেয়ে দের দিকে নয়। আমার ভয় লাগে। আমি কেন এরকম।কাউকে বলতেও পারি না। কি করবো ?
হটাত করে একদিন বড় চাচা এসে হাজির হলেন। যুবক বয়সে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা চুরি করে দাদুর ভয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এরপর প্রায় ১৫ বছর পর বাড়ি ফিরলেন। এখন অবশ্য টাকা চুরির কথা কেউ উল্লেখ করলো না। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছে সেটাই অনেক বড়।তিনি নাকি ইতালি থাকতেন। ভাল লাগে না দেখে চলে এসেছেন। কিন্তু অনেকে বলেন তিনি অবৈধ অভিবাসী ছিলেন । তাই তাকে বের করে দেয়া হয়েছে।
এদিকে দাদার বেহিসাবি খরচ , নবাব দের মত জীবন যাত্রার কারনে আমাদের আর্থিক সমস্যা শুরু হল। এখন তো জমিদারি নাই। তাই উপার্জন খুব কম। প্রায়ই দাদু জমি বিক্রি করে রঙ মহলে আসর বসান, মদ পান করেন। আবার দামী দামী কাপড়, খাবার আনান সেই ঢাকা থেকে। এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের ভাণ্ডার ও শূন্য হয়ে যাবে। এটা বুঝতে পারেন নাই বড় কাকু, মেজ কাকু এবং দাদু। কিন্তু ছোট কাকু ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ব্যবসার চিন্তা ভাবনা করছিলেন। কিন্তু দাদু আর মেজ আর বড় কাকু করলেন না। জমিদার বংশের পুরুষ হয়ে ব্যবসা করবেন এ কেমন কথা। বসে বসে খাবেন তবুও কিছু করবেন না।
এদিকে বড় কাকু দেশে ফিরেই প্রচুর খরচ শুরু করলেন। একটা সার্কাসের দল নিয়ে আসলেন প্রচুর টাকা খরচ করে।তার ইচ্ছা ইলেকশনে নামা। তাই গ্রামের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সার্কাসের দল আনা। এরপর সবাই আমরা গেলাম ব্রহ্মপুত্র নদে বজরায় করে নৌবিহারে। ছোট কাকু শুধু গেলেন না । তার কথা এইভাবে খরচ করলে রাজার ভাণ্ডার শূন্য হতে বেশী দিন সময় লাগবে না।তিনি কারো কথা না শুনে ব্যবসার চিন্তা ভাবনা করতে লাগলেন

গ্রামে যে কয়টা ধনী পরিবার রয়েছে তাদের মাঝে বাচ্চু পরিবার একটি। বাচ্চুর এক স্ত্রী রয়েছে। কিন্তু বাচ্চা হয় না। তাই বাচ্চু হটাত করে ঢাকায় যেয়ে আরেকটি বিয়ে করে বউ নিয়ে আসলো। বউয়ের সাথে সাথে শ্যালক রনিও আসলো। এই দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে তেমন কোন কথা হল না। কারন গ্রামে অনেকের একটা নয় দুইটা এমন কি তিনটা বউ রয়েছে। প্রথম বউ সারা দিন কাঁদলো । দ্বিতীয় দিন কান্না থামিয়ে আরো দশটা দিনের মত রান্না করতে গেলো। যেন এটাই স্বাভাবিক।
আমি তখন ক্লাস নাইনে। রনি কেও বাচ্চু মিয়া ক্লাস নাইনে ভর্তি করে দিলো । আমি যেমন জমিদারের নাতি। তাই শিক্ষক রা আমাকে সমীহ করতো ঠিক সেরকম রনি ছিল গ্রামের সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তির শ্যালক। তাকেও সব শিক্ষকরা একই রকম ভাবে সমীহ করতো।
কিন্তু আমাদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিলো। দাদু অসুস্থ। এর মাঝেও রঙ মহলে যান। জমিজমা আর বেশি নেই। বড় কাকু সেই রকম সৌখিন জীবন যাপন শুরু করলেন। এর জন্য জমিও বেচতেন। বড় কাকু আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। আমাকে দেখলেই তার মনে পড়তো এই সম্পত্তির আরেকজন ওয়ারিশান আছে। তিনি মনে প্রাণে চাইতেন আমি যেন এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। সেইজন্যে নানান ধরনের অত্যাচারের চেষ্টা করতেন। কিন্তু সবসময় ছোট কাকু আমাকে আগলে রাখতেন। তিনি হাজার চেষ্টা করেও আমার কোন ক্ষতি করতে পারতেন না।


রনি দেখতে খুব সুন্দর ছিল। প্রথম যেদিন রনি কে দেখি সেদিন সারাটা ক্লাস কিছুক্ষণ পর পর রনির দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম রনি নিজে থেকে আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে। সবাই তাই করে। কারন আমি জমিদারের নাতি। কিন্তু কিসের কি। রনি আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে। তার ইতোমধ্যে বন্ধুও হয়ে গিয়েছে। আমার ওহমে লাগলো। আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিলো রনির উপর। কেন রনি নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলবে না?
সেদিন বাড়ি যাওয়ার পথে দেখি রনি তার চ্যালা দের নিয়ে বিড়ি খাচ্ছে। আমি ক্লাস মনিটর । কেউ বিড়ি সিগারেট খেলে নালিশ করার নিয়ম। আমি ভাবলাম রনি কে টাইট দেয়ার উপায় পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু নালিশ করা কি উচিৎ হবে? দোটানায় ভুগতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে নালিশ করে আসলাম।
স্যার রনি আর তার চ্যালাদের ডেকে নিয়ে গেলেন। ভিতরে কি হল জানি না। কিছুক্ষণ পর রনি চোখ মুখ লাল করে বের হয়ে আসলো। সারাটা ক্লাস সে মাথা নিচু করে বসে থাকলো। আমি বুঝতে পারলাম ভিতরে ভিতরে সে ফুঁসছে। আমার খারাপ লাগছিল। আর কোন দিন রনির সাথে বন্ধুত্ব হবে না তা বুঝে গেলাম। কেন যে নালিশ করলাম!
আমি একটা ব্যাপার ভুলে গিয়েছিলাম রনি বাচ্চু সাহেবের শ্যালক। আর সম্পদ আর ক্ষমতার দিক দিয়ে বাচ্চু সাহেব এখন দাদারও উপরে। দাদার এখন শুধু সম্মান টাই রয়েছে। ক্ষমতা বা সম্পত্তি তেমন কিছুই নেই।

পরের দিনও রনি কিছু বলল না । চুপ করে বসে রইলো। ঘটনা ঘটলো টিফিন টাইমে। আমি মাঠে গেলাম খেলতে। ক্লাস পুরো ফাঁকা। এই ফাঁকে আমার বই আর খাতা গুলো ইচ্ছে মত ছিঁড়া হল। ক্লাসে এসে আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো । আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই বই গুলো ছিঁড়বে কেউ। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলাম। আমি বুঝলাম কে ছিঁড়েছে। আমি নালিশ করলাম না। ঠিক করলাম ছোট কাকু কে যেয়ে বলবো। উনি ব্যবস্থা নিবেন।
কাকু সব কথা শুনলেন। শুধু বললেন নতুন বই কিনে দিবেন। আমি খুব অবাক হলাম। এর আগে নালিশ করলে সাথে সাথে কাকু ব্যবস্থা নিতেন। আর এইবার এতো বড় একটা অপরাধ করেও রনি পার পেয়ে গেলো? কিন্তু আমি একবারও ভাবি নাই কাকু এমন ব্যবস্থা নিবেন যাতে আমাদের পরিবার ২ টা চিরস্থায়ী শত্রু হয়ে যাবে।
কাকু রাতের আঁধারে বাচ্চু সাহেবের বজরা পুড়িয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিয়ে আসলেন জমিদারের নাতির সাথে পাল্লা দিলে কি হয়। এদিকে বাচ্চু সাহেব ছেড়ে দেয়ার পাত্র না। তিনি রাজনৈতিক ভাবে অনেক ক্ষমতা সম্পন্ন। আগামী ক্ষমতাশীল দলের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঁড়াবেন। আমি দেখলাম এইভাবে চলতে থাকলে শত্রুতা শেষ হবে না। ছোট কাকু জেলে গেলে মেজো কাকু বা দাদু কি বাচ্চু সাহেব কে ছেড়ে দিবেন না। জনম জনম চলতেই থাকবে প্রতিশোধ। আমি এই সমস্যার সূচনা করেছি। আমাকেই শেষ করতে হবে। আমি ঠিক করলাম রনির সাথে কথা বলবো। তিনি পুলিশের কাছে ছোট কাকুর বিরুদ্ধে ডায়রি করলেন।
বজরা পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সামান্য এই ঘটনায় এত বড় ঘটনা হবে ভাবি নাই। আসলে বাচ্চু সাহেবের উপর ছোট কাকুর ব্যবসা সংক্রান্ত কারনে আগেই রাগ ছিল। সেই ঝাল তিনি ঝেড়েছেন।

রনি কে একা পাওয়াই মুশকিল। সারা দিন তার চ্যালারা তাকে ঘিরে থাকে।কিন্তু সুযোগ টা উল্টা তার পক্ষ থেকে আসলো। তার কোন এক চ্যালা কোন এক ফাঁকে আমার ব্যাগে একটা চিরকুট রেখে গিয়েছে।
“আমি তোমার সাথে কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে একান্তে কথা বলতে চাই। বিকেল ৫ টায় পুরনো মন্দিরের চত্বরে আমি থাকবো। তুমি পারলে এসো”
চিরকুট পেয়ে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এটা কোন ফাঁদ নয়তো ? আমার ক্ষতি করার জন্য? ভাবলাম একবার ছোট কাকু কে বলবো। পরে ঠিক করলাম গিয়ে দেখি কি বলে? আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। পাঁচটা বাজার আগেই আমি মন্দিরে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে দেখি রনি আগে থেকেই বসে আছে। আজকে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।লাল শার্ট পরেছে। আমাকে দেখে রনি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল-
– ধন্যবাদ আসার জন্য
– ধন্যবাদ দেয়ার কিছু নাই। আমারও নিজের কিছু কথা আছে। সেগুলো বলতে চাই।
– কি কথা?
– আগে তোমার কথা বল
– শুনো একটা ব্যাপার নিয়ে আমি ভাবছি।
– ব্যাপার ?
– তোমার আমার শত্রুতা এখন আমার আর তোমার মাঝে নেই। আমাদের পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভীষণ ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে । আমি চাই না তা।এর জন্য আমাদের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কি বল তুমি?
– আমি আর কি বলবো আমার মনের কথাই তুমি বলেছো। এটাই আমি বলতে চেয়েছিলাম।
– তাহলে আমরা ২ জন বন্ধু হয়ে যাই যাতে আমদের একে অপরের পরিবার নিজেদের উপর প্রতিশোধ নেয়া বন্ধ করে।
– কিন্তু শুধু বন্ধু বললেই কি বন্ধু হয়?
– কেন আমরা কি সত্যি সত্যি বন্ধু হতে পারবো না? তুমি চাও না আমার বন্ধুত্ব ?
– আমি চাই । কিন্তু তা তো আমাদের পরিবার কেও দেখাতে হবে।
– মানে?
– মানে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে হবে। একসাথে ঘুরাঘুরি, খেলা , একে অপরের বাসায় যাওয়া।
– এটা কোন ব্যাপার? এগুলো সব আমি করবো। তাহলে এখন থেকে আমরা বন্ধু।
আমার খুব আনন্দ লাগছে রনি কে আমি মনে মনে অনেক পছন্দ করি। শেষ পর্যন্ত তার সাথে আমার বন্ধুত্ব হল ।
– হ্যাঁ এখন থেকে আমরা বন্ধু। আসো হাত মেলাই।

সেদিনের পর থেকে সত্যি সত্যি আমরা ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম।অনেকে ভাবতে পারে এইভাবে এরেঞ্জ করে বন্ধুত্ব হয় নাকি? আমাদের হয়েছে। কারন আমরা ২ জন ২ জন কে আগে থেকেই পছন্দ করতাম।কিন্তু ইগোর কারনে বন্ধুত্ব হচ্ছিলো না।আমরা ক্লাসে সব সময় পাশাপাশি বসি। এক সাথে বসে টিফিন খাই। একজন আরেকজনের টিফিন শেয়ার করি। পরীক্ষার খাতাও নকল করি।
ক্লাস শেষে আমরা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। কখনো নদীর ধারে ঘুরতে যাই। কখনো সরিষা ক্ষেতে বসে সূর্যাস্ত দেখি ।কখনো দীঘির ঘাটে বসে গল্প করি।
একদিন ২ জন স্কুল থেকে বাড়ি যাচ্ছি । বর্ষাকাল আকাশ কালো হয়ে আছে। পা চালিয়ে হাঁটছি আমরা। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হবে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মুষলধারে বৃষ্টি নামলো । আমরা দৌড়ে একটা ভাঙ্গা বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। পুরো ভিজে গিয়েছি আমি। তাকিয়ে দেখলাম রনির একই অবস্থা। ঠাণ্ডা লাগছে। রনি শার্ট ভিজে শরীরের সাথে লেপটে গিয়েছে। রনির চোখে চোখ পড়লো।রনি আমাকে দেখছে। দেখলাম রনির চোখে মুগ্ধতা এবং কাম হঠাৎ করে রনি জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে কামড় দিলো। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এক পর্যায় নিজেকে আবিষ্কার করলাম রনির বাহুডোরে। আমি রনির ভেজা বুকে চুমু খেলাম। কিন্তু এক পর্যায় আমরা শান্ত হলাম কারন যে কোন মুহূর্তে মানুষ চলে আসতে পারে। সেই দিনের পর থেকে আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসলো। কারন আমরা বুঝতে পারলাম আমরা একে অপর কে ভালবাসি।
আমার আর রনির বন্ধুত্বের কথা দুই পরিবার জেনে গেলো । তারাও স্বাভাবিক হলেন। বাচ্চু সাহেব মামলা তুলে নিলেন।

যেদিন প্রথম আমি রনিদের বাসায় থাকতে গেলাম আমাকে যেন রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয়া হল। রাতের খাবারে কি নেই? কম পক্ষে ২০-২৫ পদ ছিল।বাচ্চু সাহেব নিজের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন
– ভাইয়া আর দিয়েন না। খেতে পারবো না। পেটে আর এক বিন্দু জায়গা নেই।
– কি বল মিয়া। তোমার বড় বাবা আবুল ফজল মৃধা শুনেছিলাম বিশাল একটা পিতলের থালায় ভাত নিয়ে কমপক্ষে ৩০ পদ নিয়ে খেতেন। আর তুমি সেই বাড়ির ছেলে হয়ে এটুকু খেতে পারবা না? আরে নাও নাও…………।
অনেক সময় আদরও অত্যাচার মনে হয়। আমার ক্ষেত্রে তাই মনে হচ্ছিলো। একসময় খাওয়ার পাট চুকলো। আমি আর রনি দোতালায় ছাদের ঘরে গেলাম। ওখানেই থাকবো আজকে রাতে। গ্রামের এক মাত্র পাকা বাড়ি বাচ্চু ভাইয়ের বাড়ি। ছাদে পাটি বিছিয়ে ২ জন আকাশ দেখছি। আকাশ পরিষ্কার অসংখ্য তারা চোখে পড়ছে। আমি মুগ্ধ।
– কি সুন্দর লাগছে রাতের এই আকাশটাকে। তাই না?
– হম।
– আকাশ কে কালো শাড়ি আর তারা গুলো কে চুমকি মনে হচ্ছে
– হম।
– কি হম হম করছো ? কিছু বল
– আমার কাছে তো সব কিছুর থেকে তোমাকেই বেশি সুন্দর লাগছে।

আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
– তোমার যত বাজে কথা!
– সত্যি
এই বলে রনি আমাকে জড়িয়ে ধরলো। সেদিন আমাদের পরিপূর্ণ মিলন হল।
দুজনেই শান্ত হয়ে শুয়ে আছি। আমার মাথা রনির বুকে। রনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ।
– রনি আমরা টেন এ উঠে গেলাম। দেখতে দেখতে এস এস সি চলে আসবে। এর পর তো পড়াশোনা করতে হলে গ্রামের বাইরে যেতে হবে।
– আমরা একই সাথে একই কলেজে ভর্তি হব।
– আমার আর পড়াশোনা হবে কিনা তাই তো জানি না। আর এক কলেজ। আমার চাচারা কেউই ক্লাস এইটের বেশি পড়াশোনা করেন নাই।
– আরে বাদ দাও তো। আগে এস এস সি পরীক্ষা দেই। তারপর এইসব ভাবা যাবে।
আমি ভাবলাম এসব চিন্তা করে এতো সুন্দর রাত নষ্ট করি কেন?
এরপর পরীক্ষা শুরু হল । আমাদের আর স্কুলের বাইরে আর দেখা হল না। এদিকে বড় চাচাও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়াবেন বলে ঠিক করেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাচ্চু সাহেব। নির্বাচন উপলক্ষে বড় চাচা দেদারসে খরচ করছেন। যেভাবেই হোক জিততে হবে।


পরীক্ষা শেষ । অনেকদিন খালার বাসায় যাই না। খালা আমার খুব আপন। ছোট বেলা আমার জন্মের সময় খালাই মায়ের পাশে ছিলেন। প্রথম কোলে তিনি নিয়েছিলেন আমাকে।আমার জন্মের পুরো ৬ মাস খালা মায়ের সাথে ছিলেন। খালার কাছে গেলে কেমন মা মা গন্ধ পাওয়া যায়। অনেক দিন দেখি না খালা কে। ঠিক করলাম খালার বাসা যাবো। তাছাড়া আমার খালাতো ভাই জামালের সাথেও আমার ভাল সম্পর্ক। আমার থেকে ২ বছরের বড় জামাল। খুব ভাল গান গাইতে পারে।
দাদা কে বললাম খালার বাসা যাবো। দাদা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। নৌকা করে যেতে হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা লাগলো। ঘাটে জামাল দাড়িয়ে আছে। জামাল কে দেখি না ৩ বছর। জামাল অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে। পুরুষালী পিটানো শরীর। দেখলে চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করে না। আমি মুগ্ধ চোখে দেখলাম জামাল কে। জামাল আমাকে দেখে হাত নাড়লো। মুখে ভুবন ভুলানো হাসি। জামাল হাত ধরে টেনে তুললো আমাকে।এরপর গল্প করতে করতে খালার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। শুনলাম জামালের গান গাওয়ার কথা। সে নাকি খুব সুন্দর গান গায়। উকিল মুন্সির গানের ২ লাইন শুনিয়ে দিলো আমাকে। এত দরদ দিয়ে গেয়েছে যে আমি মুগ্ধ। জামালের জামালের লম্বা লম্বা চুল কপালে এসে পড়ছিল বার বার। আর সে বার বার চুল সরিয়ে নিচ্ছিলো। দেখতে মজা পাচ্ছিলাম।
খালার বাড়িটা টিনের। চারপাশে গাছপালা। আমার খালু বেঁচে নেই। কিন্তু খালার জমি সম্পত্তি ভালই আছে। খাওয়া পরার অসুবিধা হয় না। আমাকে দেখে খালা আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না
– এতো দিন পর মনে পড়লো। আমি তো যেতে পারি না বাতের ব্যথায়। তুই তো আসতে পারিস।
আমিও কেমন অপরাধ বোধে ভুগলাম। সেই তো কতদিন পর আসলাম। ইচ্ছা করলেই তো আসতে পারি । তেমন দূরে তো নয়।খালা তো আমাকে এখনো অনেক ভালবাসেন।
জামাল বলল-
– মা ছাড়ো তো ওরে। এতো দূর থেকে আসছে। ওর নিশ্চয় ক্ষুধা লেগেছে।
– হ্যাঁ চল খেতে দেই তোদের ।
খালা অনেক কিছু রান্না করেছেন। আর খালার হাতের রান্না সেইরকম সুস্বাদু। কুমড়া ফুলের বড়া, ঢেঁকিশাক চিংড়ি দিয়ে, মাছের মাথা মুগডাল দিয়ে, লাউ দিয়ে মুরগি আর মাসকলাইয়ের ডাল। তৃপ্তি ভরে খেলাম। বাড়িতে তো রহমত ভাই রান্না করেন। উনি চেষ্টা করেন। কিন্তু কক্ষনই খালার মত এতো ভাল রান্না করতে পারেন না। পারবেনও না। কারন আমার খালার মত রান্নার হাত আর কারো নেই।

বর্ষার মৌসুম। আকাশ কালো হয়ে আছে।বৃষ্টি পড়বে । আমার খুব বের হতে ইচ্ছা করছে। বাসায় থাকতে মন চাইছে না। এদিকে জামাল বের হতে চাইছে না। কারন যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। আমি জিদ ধরলাম বাইরে যাবো। শেষ পর্যন্ত আমার জিদের কাছে জামাল পরাজিত হল। আমাকে নিয়ে বের হল জামাল। গ্রামের দক্ষিণে একটা বিশাল দীঘি আছে। সেখানে সাধারণত মানুষ খুব একটা যায় না। কথিত আছে এই দীঘি তে একটা মেয়ে গোসল করতে নেমে ডুবে গিয়ে মারা গিয়েছিল। তখন থেকেই নাকি প্রায় মেয়েটার অশরীরী আত্মা দীঘির চার পাশে ঘুরাঘুরি করে। গ্রামের মানুষ ভয়ে দীঘি তে নামে না । কিন্তু জামাল ভয় পায় না। সে কক্ষনো কোন অশরীরী আত্মার চিহ্ন খুঁজে পায় নাই । জামালের মন খারাপ হলেই দীঘির ঘাটে বসে থাকে।
দীঘির পানি পরিষ্কার টলটল করছে। চার পাশে গাছ পালা।জায়গাটা আসলেই নির্জন।আমরা গল্প করছি আর আমি পুকুরে ঢিল ফেলছি। পানিতে ঢিল পরে ঢেউ তৈরি করছে।তারপর আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে। জামালের গান গাইতে ইচ্ছা করলো। খালি গলায় গান ধরলো । হাসন রাজার গান।
লোকে বলে বলে রে
ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার।
আমি তন্ময় হয়ে শুনছি। কি সুন্দর ভরাট গলা জামালের। কেমন জানি মনে একটা হাহাকার তৈরি করছে। সত্যি তো ঘর বাড়ি দিয়ে কি হবে? একদিন চলে যেতে হবে। যেমন চলে গিয়েছে মা বাবা।আমার চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো। জামাল গান তাকিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
– কি হয়েছে?
– কিছু হয় নাই। তুমি গাও। তোমার গান শুনতে খুব ভাল লাগছে। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে গিয়েছে তোমার গানের কথা কথা গুলো। বহুদিন পর মনে পড়লো নশ্বর পৃথিবীর কথা। আমার বাবা মা যেভাবে চলে গিয়েছে আমাকেও তো চলে যেতে হবে।
জামালে আবার গান ধরলো । কিন্তু প্রকৃতি বাঁধ সাধল সঙ্গীত চর্চায়। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলো। আমরা দৌরে ঘাট থেকে হয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়ালাম। কিন্তু বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেলাম না। পুরো ভিজে গেলাম। আশেপাশে কোন ছাদ নেই যেখানে যেয়ে দাঁড়াবো। হটাত করেই যেন দেবদূতের মত একটা লোক একটি কাঠের ডান্ডির বিশাল ছাতা নিয়ে আবির্ভূত হল।
আরে তোমরা তো পুরো ভিজে গিয়েছ । ছাতার নিচে আসো।
আমরা ২ জন ছাতার নিচে আসলাম। বৃষ্টি তে ভেজার পর থেকেই ঠাণ্ডা লাগছে। কেমন কাঁপছি। কাছেই একটা বাড়ি চোখে পড়লো। আমরা সেই বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বাড়িতে ঢুকেই জামাল শার্ট খুলে ফেললো। পরনে শুধু একটা স্যান্ডোগেঞ্জি।জামাল এর পিটানো শরীর। ফরসা গায়ের রঙ। আমি চোখ ফিরাতে পারছিলাম না। আমার জামাল এর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। আমি যা ভাবছি জামালও কি তাই ভাবছে? জামালও কি আমার মত সমকামী। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। কেউ কথা বলছি না। শুনশান নীরবতা। আমার মনে অপরাধ বোধ জাগলো। রনি থাকতে আমি জামাল কে নিয়ে ভাবছি কেন।
জামাল হেসে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইল।
কিরে কি ভাবিস? আজকে ফুটবল খেলবো। খেলবি ? কাদার মাঝে ফুটবল খেলতে খুব মজা।
আমি কক্ষনোই ফুটবল খেলি নাই। আমারও খুব উৎসাহ লাগলো ফুটবল খেলার। বৃষ্টি থামলো বাড়ি গেলাম।পুকুরে গোসল করে খেয়ে দেয়ে মাঠে গেলাম খেলতে।
বিশাল মাঠ কিন্তু পানি জমে কাদা হয়ে আছে। জানি আরেকবার গোসল করতে হবে খেলা শেষে। জীর্ণ শীর্ণ একটা চামড়ার বল রয়েছে। কার বাবা জানি ঢাকা থেকে এনেছিল। সব মিলিয়ে ৮ জন। সবাই আমার আর জামালের বয়সী। এই গ্রামেই থাকে। ৪ জন ৪ জন করে দল হল। আমি আর জামাল একই দলে। একজন গোল কিপার আর তিন জন তিন জন করে মাঠে। কিছুক্ষণের মাঝেই আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। বাকিদের তখনও কিছুই হয় নাই। বুঝলাম এরা খেলে অভ্যস্ত। তাই পারছে। আমি তো আর খেলি না। বাতাসে আর্দ্রতা খুব। ঘামছি।দর দর করে ঘাম পরছে। বলা নেই কওয়া নেই আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মাঝে বৃষ্টি। একদম ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি তে খেলা বন্ধ হল না। উৎসাহ আরও বেড়ে গেলো সবার। আমারো খুব ভাল লাগছে। আগে এইভাবে ভেজা হয় নাই কক্ষনো। সারা গা কাদা লেগে গিয়েছে।সমস্ত শরীর বৃষ্টি তে ভিজা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাগরিবের আযান দিলো। খেলা শেষ হল। সবাই মিলে পুকুর পারে গেলাম গা ধুতে। পুকুরে অনেকক্ষণ দাপাদাপি করে উঠে দেখি বৃষ্টি শেষ। আকাশ মেঘলা তখনও ।এখন বাড়ি যেতে হবে। এশার আযানের সময় হয়ে গিয়েছে। এর বেশি দেরি করলে খালা মার দিবেন। বাড়ি ফিরলাম।আজকের মত আনন্দ খুব কম হয়েছে আমার জীবনে। জামাল জিজ্ঞেস করলো-
– ফুটবল ভাল লাগলো ?
– খুব।
জামালে হেসে দিলো। ওর হাসি এতো সুন্দর । আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। খালা খুব বকা দিলেন-
– বৃষ্টির মাঝে খেলতে তোকে কে বলেছে?  তুই কি ওদের মত? তোর জ্বর আসলে তোর দাদা কে আমি কি জবাব দিবো ?
– আরে খালা কিছু হবে না
– জামাল বদমাশ টা কোথায় ? সে তোকে খেলতে নিলো কিভাবে
কিন্তু জামাল বকা খাওয়ার আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে। সেইদিন রাতেই আমার আকাশপাতাল জ্বর আসলো। খালা সারা দিন সেবা করলেন। বাজার থেকে এমবিবিএস ডাক্তার আনলেন । ডাক্তার ওষুধ দিলেন। আমি আসতে আসতে সুস্থ হতে লাগলাম। জামাল ,আমি যখন জেগে থাকতাম আমার পাশে বসে থাকতো । জলপট্টি দিতো , গান শুনাতো , গল্প শুনাতো । আমার যাতে খারাপ না লাগে এই জন্য এতো সময় দিতো। কক্ষনো কক্ষনো মুখে তুলে জোর করে খাইয়ে দিতো। আমি খেতে চাইতাম না। আমি কেমন জানি এক সপ্তাহেই জামালের প্রতি কেমন দুর্বল হয়ে গেলাম। জামাল পাশে না থাকলে খুব অস্থির লাগতো। আমার থাকার কথা ছিল তিন দিন। দেখতে দেখতে ৭ দিন হয়ে গেলো। ৭ দিনের মাথায় আমি বিছানা থেকে উঠলাম। জ্বর কমলো। খালা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। আমি তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছি একদম।

এই কয়দিন রনির কথা তেমন মনে পড়ে নাই। আসলে নিজের শরীরের চিন্তায় ছিলাম এই কয়দিন। আমি ঠিক করলাম পরেরদিন চলে যাবো। কিন্তু জামালের কথা ভাবতেই মন খারাপ যাচ্ছিলো। ওর সাথে আবার কবে দেখা হবে। সেই দিন রাতে জামাল আর আমি বসে আছি পুকুর ঘাটে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।জোনাকি পোকা জ্বলছে নিভছে। মিটিমিটি। কেউ নেই জায়গাটা নীরব। জামাল গান ধরলও-
“নিশা লাগিলো রে
বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলও রে—-”
এমন সুন্দর পূর্ণিমা আর জামালের ভরাট কণ্ঠে এই গান শুনে মনে হচ্ছিলো আমি যেন পৃথিবীতে নেই। অন্য কোন জগতে।সেই জগতে শুধু আমি আর জামাল।গান শেষ হল। আমরা কেউই কথা বলছিনা।একসময় জামাল আমাকে জড়িয়ে ধরলো। জামালের শরীরের ঘামের গন্ধ। কিন্তু আমার খারাপ লাগছে না। আলতো করে তার জিভ দিয়ে আমার ঠোঁট চাটলো সে। তার পর তার ঠোঁট আমার ঠোঁটে স্পর্শ করালো। কি আশ্চর্য আমার একবারও রনির কথা মনে পড়ছে না। বরং জামালের কাছ থেকে আদর পেতে ইচ্ছা করছে। চাঁদ-টা মেঘের আড়ালে চলে গেল। চারিদিক অন্ধকার। আমরা প্রেম লীলায় মেতে উঠলাম।
একসময় দুইজনের শারীরিক চাহিদা পূরণ হল। নিস্তেজ হয়ে আসলো শরীর। দুইজন পাশাপাশি শুয়ে আছি। আমার কেমন জানি বিষণ্ণ লাগছে। কাল চলে যাবো সেইজন্য নাকি অন্য কোন কারন। কোন ভাবেই স্বস্তি পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম কেন খারাপ লাগছে। আমি খুব বড় অন্যায় করেছি। রনির প্রতি অন্যায় করেছি। তাকে ভালবাসি আর সেক্স করলাম জামালের সাথে। আমার অপরাধ-বোধ তীব্র হল। বুকের কাছে কেমন জানি চিন চিন ব্যথা অনুভব করছি। রনি শুনলে কি কক্ষনো আমাকে মাফ করতে পারবে?
আমি উঠে কাপড় পরে রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। পিছন পিছন জামাল আসতে লাগলো। সে বিস্মিত কি হল আমার। আমি বেশ কড়া করে জামাল কে বললাম
– তুমি আমার পিছন পিছন আসবা না। আমি একাই যাবো।
জামাল কিছু বললো না। হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলো। আমি বাড়ি পৌঁছে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। ঠিক করলাম কাল ভোরেই পালইকান্তা চলে যাবো।জামাল বেশ কয়েক বার দরজা ধাক্কালো। কিন্তু খুললাম না। কি উত্তর দিবো তাকে? ভাবলাম জামাল কে কড়া করে কিছু বলা উচিত হয় নাই। আমি তো রাজি ছিলাম। আমার সম্মতি ছাড়া তো কিছু হয় নাই। নাহ ওকে সরি বলতে হবে। মুখে বলতে পারবো না। চিঠি তে সব বলবো। আর আমি জামালের কাছে কৃতজ্ঞ । অসুখের সময় সে আমার জন্য অনেক করেছে।
সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। এপাশ ওপাশ করলাম।মাঝে মাঝে তন্দ্রা মত আসছে। কিন্তু চমকে চমকে উঠে পড়ছি। ফজরের আযান দিতেই উঠে পড়লাম। ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম। কাউকে কিছু বললাম না। বললে হাজার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। শুধু মাত্র জামালের ঘরে চিঠি টা রেখে গেলাম।
কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটছি। নদীর ঘাটে যেয়ে নৌকা নিতে হবে। মন খুব খারাপ। রনি কে কি সব বলবো ? বললে সে কি মেনে নিবে?তাহলে কি বলবো না? না আমার সৎ  থাকতে হবে। ভালবাসার প্রতারণা আমি করবো না। হাঁটতে হাঁটতে অবাক হয়ে দেখি সামনে ছোটকাকু। আমাকে দেখে হাত নাড়ছে।আমি নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি দৌড়ে গেলাম ছোট কাকুর কাছে।ছোট কাকু আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন
– কই যাস?
– বাড়ি যাই।
– তোর তো তিন দিন থেকেই চলে আসার কথা। বাবা তো চিন্তায় চিন্তায় অস্থির।
– কাকু আমি খুব জ্বরে ভুগেছি। আসতে পারি নাই তাই। কাউকে দিয়ে যে খবর দিবো সেই উপায় নেই।
ছোট কাকু খালা কে দেখতে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমি না করলাম।আবার জামালের মুখোমুখি হওয়ার কোন ইচ্ছা নাই। ছোট কাকু আমাকে নিয়ে ঘাটের দিকে রওনা দিলেন।

গ্রামে ফিরে একটা খবর পেয়ে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ।বাচ্চু মিয়া রনি আর রনির বোন ২ জন কেই মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। মুখে মুখে তালাকও দিয়ে দিয়েছে।(যখনের কথা বলছি তখন গ্রামে এটা খুব স্বাভাবিক।)আর বাচ্চু মিয়ার তো আগেই এক স্ত্রী রয়েছে। কেউ বলতে পারছে না রনি কোথায় চলে গিয়েছে। সম্ভবত ঢাকায়। রনির বাবা মা কেউ বেঁচে নাই। মামার বাসায় থাকতো। হয়তো মামার বাসায় ফিরে গিয়েছে। কিন্তু আমাকে কিছু বলে গেলো না? বলবেই বা কি করে ? আমি তো ছিলাম না বাড়িতে। আমার খুব অসহায় লাগছে। কি করে খুঁজে পাবো রনি কে? ঢাকার ঠিকানা তো আমি জানি না। আর কি যোগাযোগ করবে রনি আমার সাথে? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের উপর কেউ এক মণ ওজনের পাথর বসিয়ে দিয়েছে। কান্না আসছে। কাউকে এই কথা গুলো বলতে পারলে ভাল লাগতো । কিন্তু কাকে বলবো ?
প্রতিদিন প্রতীক্ষায় থাকি আজ বোধহয় রনি ফিরে আসবে। কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে বালি। ভাবি চিঠি আসবে। কিন্তু কোন চিঠি না। সারা দিন বাসায় থাকি। কিছু ভাল লাগে না। মন মরা হয়ে থাকি। বিকেলে নদীর ধারে হাঁটি একা একা। মনে পড়ে যায় রনির হাত ধরে হাঁটার দিন গুলোর কথা। কিভাবে ভুলবো। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় গুলো তো তার সাথেই।

সময় বয়ে যায়। দাদাজান আগে থেকে বুড়িয়ে গিয়েছেন। আগের মত রংমহলে আর আসর বসে না। আমরা আগের থেকে গরীব হয়েছি। সকলের নিষেধ অগ্রাহ্য করে ছোট কাকু কাপড়ের ব্যবসা করছেন। শুধু মাত্র বড় চাচার কোন পরিবর্তন নেই। এখনো বিলাসী জীবন যাপন করছেন। ইলেকশন করবেন। জমি বিক্রি করে দেদারসে টাকা খরচ করছেন। এই ইলেকশন ই আমার জীবনে শনি ডেকে আনলো ।
নির্বাচনে টাকা যোগাড়ের এক অদ্ভুত পরিকল্পনা করলেন বড় চাচা। তা হল যৌতুক । কিন্তু নিজে বিয়ে করবেন না।কেন করবেন না কে জানে! বিয়ে ঠিক করলেন আমার। এই বয়সে। তিনি ভাবলেন আমাকে বিয়ে দিয়ে আমাকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিবেন শহরের ভাল স্কুলে পড়ানর নাম করে। আবার যৌতুক পাওয়া যাবে। মন্দ কি?
যে মেয়ের সাথে বিয়ে ঠিক করলেন তার নাম রূপা। তার বাবা একটা ঘর জামাই চায় । তার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের যৌতুক দিবে। তিনি গফরগাঁও শহরের এর অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি। রাজনীতিতেও যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি আছে। রূপার বয়সও আমার মতই।
ঘটক মন্টু মিয়া বিয়ে ঠিক করলেন। আমার হবু শ্বশুর রইসুদ্দিন এক কথায় রাজি। এমন পাত্র খুঁজছিলেন তিনি নিজের মেয়ের জন্য । অল্প বয়স। গড়ে পিঠে মানুষ করা যাবে। তার উপর ভাল বংশের ছেলে। এদিকে আমি কোন ভাবেই বিয়ে করতে রাজি হলাম না। ছোট কাকু ও প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু বড় চাচার এক কথা বিয়ে না করলে আমাকে তাড়িয়ে দিবেন বাড়ি থেকে। দাদাজান বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। তিনি সম্পূর্ণ বড় চাচার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। যে কোন সিদ্ধান্ত এখন বড় চাচা নেন। তার মুখের উপর কেউ কথা বলে না। সবাই তাঁকেই অলিখিত পরিবারের প্রধান হিসেবে মেনে নিয়েছে।
এক সন্ধ্যায় রইসুদ্দিন সাহেব আসলেন আমার হাতে আংটি পরাতে । আমাকে দেখে রইসুদ্দিন সাহেব খুশি। এমন ছেলেই নাকি খুঁজছিলেন তার মেয়ের জন্য।
সেদিন রাতে বড় চাচার সাথে ছোট কাকুর ঝগড়া হয়ে গেলো। সব কথোপকথন আমি আড়াল থেকে শুনলাম।
-ভাইজান আপনি এসব কি করছেন?
– কি করছি ?
– এই বয়সে সবুজের বিয়ে ঠিক করলেন? ও বিয়ের কি বুঝে? আইএ পাশ করুক তারপরে না হয়?
– কেন সবুজের বাবা তো এই বয়সেই বিয়ে করেছেন
– সেতো অনেক আগের কথা। এখন কি আর এই বয়সে বিয়ে হয়?
– কেন ভালই তো । ছেলে টা কে বিয়ে দিলে আমরা মোটা অংকের যৌতুক পাবো। তার উপর আমাদের সম্পত্তি তেও উত্তরাধিকার কমবে। রইসুদ্দিন সাহেব বলেছেন বিয়ে হলে সবুজ কে দিয়ে জমি সম্পত্তি সব সাইন করিয়ে দিবেন।
– ছিঃ ভাইজান
– ছিঃ বলছিস কেন? সবুজ কি কম পাবে? রইসুদ্দিন সাহেবের এক মাত্র মেয়ে কে বিয়ে করছে। কম পাবে সম্পত্তি? আমাদের থেকে অনেক বেশি সম্পত্তির মালিক হবে সে।
– সে তো তার স্ত্রীর সম্পত্তি।
– ওই এক ই কথা। স্ত্রীর সম্পত্তি স্বামীর সম্পত্তি।আমার সিদ্ধান্তে আব্বাজানের আর মেঝোর সম্মতি আছে। তোর আপত্তি থাকলে আব্বাজান রে বল।
এর পর ছোট কাকু আর কিছু বললেন না। বুঝলেন বলে লাভ নেই। বড় চাচা তার সিদ্ধান্তেই অটল থাকবেন।
বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে। কেউ আমার সিদ্ধান্ত জানতে চায় নাই। এমন কি মেয়ের ছবিও আমাকে দেখানো হয় নাই। জমকালো উৎসব করে বিয়ের আয়োজন করা হবে। ঢাকা থেকে বাবুর্চি আসছে। বিয়ের বাজার করা হয়েছে ময়মনসিংহ থেকে। বড় চাচা নিজে গেলেন ময়মনসিংহ । অবশ্য সব টাকাই রইসুদ্দিন সাহেব দিলেন। পুরো বাড়িতে খুশির আমেজ। কতদিন পরে একটা বিয়ে হচ্ছে। হোক সেটা বাল্য বিবাহ। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। জানি একটা মেয়ে কে নিয়ে আমি সুখী হব না। তার উপর ঘর জামাই হয়ে থাকার কোন ইচ্ছা আমার নাই। আর আমি বিয়ে করলে রনি কে কি বলবো? আমরা ২ জনই তো ঠিক করেছিলাম আমরা ২ জন বিয়ে করবো না। সারা জীবন একসাথে থাকবো । কিন্তু রনির সাথে আর দেখা হবে তো ? নিশ্চয়ই রনির সাথে আমার দেখা হবে।
আমি গোপনে ছোট কাকু কে অনেকবার বললাম যে আমি এখন বিয়ে করবো না। তিনি শুধু দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। তিনি যা প্রতিবাদ করার করেছেন। কিন্তু এর বেশি কথা বলার সাহস তাঁর ও নেই।
বিকেলে আমাকে ডাকা হল বিয়ের বাজার দেখতে। আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। রূপার জন্য লাল বেনারসি কেনা হয়েছে। দাদির কিছু গহনা পলিস করে আনা হয়েছে। আমার জন্য পাজামা পাঞ্জাবি। এসব দেখে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো । পুকুর ঘাঁটে বসে থাকলাম। মুষড়ে পড়েছি। এই বিয়ে থেকে বাঁচার উপায় কি? আর তো হাতে সময় নেই। নিজের জীবনের সাথে সাথে তো আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট হবে। ভাবলাম একটাই উপায় আছে। তা হল বাড়ি থেকে পালানো। কিন্তু কই যাবো পালিয়ে? সাহসও পাচ্ছি না। কিন্তু ছোট কাকু কিভাবে যেন আমার মনের কথা ঠিক বুঝে ফেললেন।

(রুপবান থেকে সংগ্রহীত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.