ঘরে ফেরার গান

লেখকঃ মেঘ রাজ সাইমুন

[এই গল্পের সমস্ত চরিত্র,স্থান,কাল এবং পাত্র কাল্পনিক।বাস্তবের সাথে কোনপ্রকার মিল অবাঞ্চনীয় এবং ক্ষমা মার্জনীয়]

১।
কাল আমার ঘরে ফেরার দিন।

পাহাড় ঘেরা সমুদ্র অঞ্চলে রাতের আকাশটাকে এতো মধুময় দেখায়,হৃদয় দিয়ে তা কখনো কল্পনাও করতে পারি নি।পাহাড়ী অঞ্চলে বাড়িগুলো খুব উচুতে করা হয়।যার মধ্য সব থেকে আকর্ষনীয় থাকে বেলকনি।বেলকনিতে দাড়িয়ে রাতের আকাশ দেখার মজাটাই আলাদা।আকাশ ভরা তারার মাঝে একফালি চাঁদ,যেন স্বর্গপুরীতে পরিনত করেছে মধুপুরাকে।চারপাশে ছিমছাম নীরবতার মাঝে আমি দাড়িয়ে উপভোগ করছি সুন্দর জোসনাস্নাত এই হলুদ রংয়ের রাতকে।রং!সবকিছুতেই আমার রং খুঁজা চাই।এমন কি জীবনেও।জীবনের রংগুলো খুব অদ্ভূত।যেমন অদ্ভূত আমার পাশে রাখা কফির র।ধূমায়িত কফির দিয়ে তাকিয়ে একটু হাসলাম।ফ্যাকাসে রংয়ের তুলিতে আঁকা আমার জীবন স্বপ্নশূন্যতায় পরিপূর্ন।আকাশের দিকে তাকালাম।বুকের বামপাশটা চিনচিন করে উঠল।নীলাকাশের রুপালি চাঁদের পাশে স্থান পেয়েছে তিনটি তারা।ঐ তিনটি তারাকে আমার খুব আপন মনে হয়।যখন মন খারাপ থাকে রাতের আকাশে ঐ তিন তারাকেই খুঁজে ফিরি।

২।
কোথা থেকে এক টুকরো কালো মেঘ এসে চাঁদসহ তিনটি তারাকেই আড়াল করে দিল।

হঠাৎ কারোর শীতল স্পর্শ পেলাম।একটু কেঁপে উঠলাম।ফিরে দেখি ঘুম ঘুম চোখে নুহাশ দাড়িয়ে আছে।ছেলেটা একটু বোকা।বয়সে আমার থেকে বছর তিনেক বড়।পাহাড়তলীতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ছে।এই মধুপুরাই একমাত্র আপনজন দিদাকে নিয়ে বাবা-মা হীন এই ছেলেটার স্বর্গ।মেঘের টুকরো সরে যাওয়ায় চাঁদের আলো এসে ওর মুখে পড়ল।অপূর্ব সুন্দর লাগছে ওকে।পৃথিবীতে নীলাক্ষির তিনজন মানব এসেছে,ওকে ধরে আমি চারজন খুঁজে পেলাম।নুহাশের ফর্সা গালে একটা কালো তিল আছে।নীল নয়নের ছেলেটির ফর্সা গালে কালো তিল কেমন অদ্ভূত দেখায়,তাই না?ওর এলোমেলো চুল পাহাড়ী বাতাসে উড়ছে।আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে টোল পড়া গালে একটা মৃদু হাসি দিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি আমি ওর মাঝে দেখেছি।মাঝে মাঝে অবাক হয় ওর হাসি দেখি,একজন মানুষ কিভাবে এতো সুন্দর করে হাসে?
বিড়ালের মত আমার পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে নুহাশ প্রশ্ন করল,”কি ব্যাপার তুমি এতো রাতে এখানে কেন?”
-ঘুম আসছে না।তাই কফি খেতে খেতে রুপালি চাঁদ দেখছি।তুমি উঠে এলে কেন?তুমি তো অসুস্থ।
-তোমাকে বিছানায় না পেয়ে উঠে এলাম।কি ভাবছো তুমি?
-ভাবছি নিজের জীবনকে নিয়ে।কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম।জীবন স্রোতে ভাসতে ভাসতে অথৈ দরিয়ায় পৌছলাম।
-আন্টি আংকেলের কথা মনে পড়ছে?
-হুম।
নুহাশ আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
আমি সামনে থেকে ওর হাত দুটো ধরে বললাম,”কাল আমি চলে যাবো নুহাশ।”
চলে যাবার কথা শুনে ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।ঘুরে দেখি ওর নীল চোখে নোনা অশ্রু চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে।কিন্তু আমি যে অসহায়।ওর নীল নয়নের ছলছল কাঁন্নাতে ভুলে,দেখতে দেখতে আজ তিনটা মাস কেটে গেল।আমি আর কিছু না বলে শুধু বললাম,
-একটা গান শোনাবে?
-কোন গানটা,বলো?
-তোমার যেটা ইচ্ছা।
ও গাইতে শুরু করল।
“ভালোবাসি…..ভালোবাসি….”
ও রবীন্দ্রসংগীত খুব ভালো গায়।অপূর্ব কন্ঠে খুব মধুময় শোনায় ওর গান।গানের মাঝেই আমি হারিয়ে গেলাম আমার চিরচেনা সেই অতীতে।

৩।
তিন মাস আগে।

আমি নিষাদ।ঢাকা শহরের ধণাঢ্য পরিবারের মেডিকেল পড়ুয়া একমাত্র সন্তান।বাবার ইচ্ছতেই ডাক্তারী পড়া।ধনী পরিবারের সন্তান হবার সুবাধে আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল।আমি,হিমু,নোভা,শিলা,নিনিত,বিপাশা এবং শাওন ছিলাম মেডিকেল কলেজের সেভেন স্টার।তবে শাওন ছিল আমার বেস্টফ্রেন্ড।সারাদিন পড়ালেখা,বন্ধু,আড্ডা এসব নিয়েই মেতে থাকতাম।পৃথিবীতে ভালোবাসার অত্যাচার সবচেয়ে বড় অত্যাচার।সুখে বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলেও বলার কিছু থাকে না।সেবার মেডিকেল ট্যুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কলেজ।

আব্বুকে বলতেই না করে দিল।আমাকে একা সুদূর চট্টগ্রামে ট্যুরে যেতে দিতে নারাজ।এখানেই আমি ভালোবাসার অত্যাচরে জর্জরিত।শেষে অনেক মান,অভিমানে সিদ্ধান্ত হল আম্মু,আব্বুও সঙ্গে যাবে।
জীবন মানুষকে অনেক কিছু দেয় আবার অনেক কিছু কেড়েও নেয়।সেদিনের সেই ট্যুরে আমাদের মাইক্রোবাস পাহাড়ের খাঁদে পড়ে,আমি ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারাই।মেডিকেল কলেজ ট্যুর বাস আগে যাওয়ায় তারা।এটা দেখতে পেল না।
দুদিন পর আমার জ্ঞান ফিরল,নিজেকে মধুপুরার একটা হাসপাতালে আবিষ্কার করলাম।তখন নুহাশ আমার পাশে বসা ছিল।আমি কোন কথা বলতে পারছিলাম না।শুধু ফ্যালফ্যাল করে অন্যমনস্ক নুহাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।চারদিন পর আমাকে জানানো হয় খাঁদে পড়ে আমাদের মাইক্রোবাসটি বিধ্বস্ত হয়েছে।আব্বু,আম্মু এবং শাওন আকাশের তারা হয়ে গেছে।
পাঁচদিনের মাথায় নুহাশ আমাকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়।আমি তখনও অসুস্থ।নীল নয়নের এই ছেলেটি তার ফর্সা গালের কালো তিল দেওয়া সৃষ্টিকর্তার আশিষে আমাকে সুস্থ করে তোলে।নুহাশের সেই ফর্সা গালের কালো তিলের প্রতিচ্ছবি আমার চোখে ভালোবাসার ছায়াবৃক্ষ জন্ম দেয়।

৪।
আমরা এখন পতেঙ্গা সী বীচে।বালুর মাঝে আমি আমার হারানো স্বপ্ন খুঁজে চলেছি।নুহাশ দাড়িয়ে দেখছিল আমার কান্ড।
আমি বালুতে আমার ঘর আঁকলাম।হঠাৎ এক উচ্ছল সমুদ্র ঢেউ সেটি মুছে দিল।আমার দু’চোখ জলে ভরে গেল।নুহাশের দিকে দৃষ্টি দিতেই দেখলাম ও নীল চক্ষুর রংহীন অশ্রু লুকাতে সমুদ্রের সুদুরে কিছু উড়ন্ত বকপক্ষীর দিকে তাকিয়ে আছে।আমি উঠে গিয়ে ওর পাশে দাড়ালাম।সমুদ্র বাতাসে ওর সোনালু চুল উড়ছিল।কিছু ঢেউ এসে আমাদের পা ছুঁয়ে গেল।
-পতেঙ্গা সী বীচ টা কি দারুন না?নিষাদ।
-হুম।দারুন।
-তোমার ভালো লাগছে এখানে?
-একদম।
-দেখো সমুদ্রের সাথে মানুষের কত মিল।সমুদ্রের জলও নোনা,মানুষের চোখের জলও নোনা।সমুদ্রে ঢেউ ওঠে,মানুষের চোখের জলও ঢেউ হয়ে বেরিয়ে আসে।
-কি ব্যাপার?নুহাশ।তুমি হুমায়ূন আহমেদ হলে কবে?
-হা হা হা।তুমি কি যে বল!হুমায়ূন আহমেদকে লেখক হিসাবে আমার খুব ভালো লাগে।ওনি জীবনকে যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে,অন্য কোন কবি বা লেখক এমনটি দেখে নি।
-তুমি কি হুমায়ূনের উপর পিএইচডি করেছো।
-জানো পৃথিবীতে আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছা করে।মরতে আমার ভালো লাগে না।খুব ভয় লাগে।
-কি হয়ছে,নুহাশ?আমাকে বল,প্লিজ।
ও একটু মৃদু হাসল।আমি আর কথা বাড়ালাম না।

সেদিন সাগরতীরে দাড়িয়ে নুহাশ অনেক কেঁদেছিল।মাঝে মাঝে মানুষকে কাঁদতে দিতে হয়,জীবনের বোঝা হালকা করার জন্য।
নুহাশ আমাকে চট্টগ্রামের সকল দর্শনীয় স্থান দেখায়।পতেঙ্গা সী বীচ থেকে শুরু করে সীতাকুন্ড,ইকোপার্ক,বারো আউলিয়ার মাজার,ফরেস লেক।শেষে পাহাড়তলীতে দাড়িয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ সতেজ নিঃশ্বাস নিলাম দুজনে।হেটে চলেছিলাম যেন অনন্তকাল দুটো অবুঝ প্রাণী।

৫।
শরতের সকালে আমি বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিলাম।নুহাশ পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে গোসল সেরে এসেছে।ওর ভিজা চুল থেকে জল ঝরছিল।ফর্সা গালের কালো তিলে শীতের শিশির পড়া পদ্মপাতার মত এক ফোটা জলবিন্দু ছিল।গোলাপী ঠোঁটের কোণে গোলাপ পাঁপড়িতে ছেটানো জলের আভাস ছিল।সেই প্রথম তাকে নেশা ভরা চোখে দেখছি।পুরুষালী একটা গন্ধে সারা ঘর ব্যাপনপ্রান্ত।যেটা আমাকে পাগল করে তুলছিল।আমাকে কামুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে নুহাশ বলল,
-কি দেখো ওভাবে?
-তোমাকে।
-আমাকে?ওহহো র‍্যাবিট।এভাবে দেখো না।প্রেমে পড়ে যাবে?
বলেই টোল পড়া গালে একটা হাসি দিল।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাসিটা আমি উপহার পেলাম।

আমার সমপ্রেমী মন সেই হাসিটা নারী মোনালিসার হাসি থেকেও বেশি উত্তম মনে করল।দাঁত দিয়ে নিচ ঠোঁট কামড়ে ধরে বললাম,
-কেন প্রেম পড়লে ক্ষতি কি?
-কোন ক্ষতি নেই।র‍্যাবিট।আমি তো এই পৃথিবীতে ক্ষনিকের।
আমি এর অর্থ বুঝলাম না।বললাম,
-তাই নাকি?
-ভালোবাসবে আমাকে?
আমি নিচ ঠোঁট আরো জোরে কামড়ে ধরলাম।মুহূর্তের মধ্যে যেন আমি আকাশ থেকে পড়লাম।তাহলে নুহাশ ও কি আমার মতো অন্য জগতের মানুষ!কারন ওর কথায় কোন মজা ছিল না।ছিল সরলতাপূর্ন।আমি বললাম,
-পারবে তুমি?আমার মত বাবা-মা হীন অসহায়কে ভালোবাসতে।
নুহাশ আমার বিছানার কাছে এগিয়ে এল।আমার হাত দুটো কোলের মাঝে টেনে নিল।নীল চোখে আমি চোখ রাখলাম অশ্রু ঐ নীল চোখ চিকচিক করছে।
-নিষাদ।আমিও তোমার মতো বাবা-মা হীন অসহায়।জীবনে ভালোবাসার মানুষের খুব অভাব।পারবে না তুমি আমাকে আপন করে নিতে?
হঠাৎ দিদা চলে এল।হাতে দুই মগ কফি।এসে আমাদের এভাবে দেখে হেসে বলল,
-কিরে দাদু ভাইরা প্রেম করা হচ্ছে বুঝি?তাহলে আমার কি হবে?তো কে আমার সতীন শুনি?
আমি লজ্জা পেলাম।দিদা ছলছল চোখে আমার একটা হাত নুহাশের হাতের মাঝে রেখে বলল,
-তোরা দুই অসহায় সারাজীবন এক আত্মা হয়ে থাকিস।
পরক্ষণে দিদা চোখের অশ্রু লুকাতে বের হয়ে গেল।

নুহাশ একটা দুষ্টু হাসি দিল।হঠাৎ আমার কোমল ঠোঁটে শীতল স্পর্শ পেলাম।ওর গোলাপী ঠোঁট আমার মুখের লালায় সিক্ত হল।এভাবে দু মিনিট থেকে মুখ তুলে আমাকে বলল,
-ছিঃ কি গন্ধ!তুমি ব্রাশ করো নি,র্যাবিট?
আমি কটাক্ষ রাগ দেখালাম।ও টের পেয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিল।
-ছাড় তো।
-ও বাবা।আমার র‍্যাবিটটা কি রাগ করল?
-যাও কথা নেই তোমার সাথে।
-তোমার মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি আমার বসত বাড়িঘর।ভালোবাসার পাখির কোন কিছুই বিরক্তিকর নয়।র‍্যাবিট।
-থাক হয়েছে।
-কি রাগ পড়ল না।আরেকটা কিস দেয় তাহলে আমার সাদা খরগোশটা কে?
ওর বলার ভঙ্গিতে আমি হেসে দিলাম।
-আচ্ছা নুহাশ।তুমি কি অসুস্থ?তোমাকে কেমন দেখাচ্ছে।
-কই না তো সুইটহার্ট।
-কাল তোমার কাশিতে রক্ত দেখলাম।কি হয়েছে?
ওর হাসতে হাসতে বলল,”আই অ্যাম পারফেক্টলি ওকে ম্যান।”
বলেই ভুবন ভুলানো একটা হাসি দিল।আমি আর কথা বাড়ালাম না।ওর বুক থেকে মুখ তুলে ওর নীল চক্ষুর বামে ফর্সা গালের কালো তিলে একটা কিস দিলাম।
কিন্তু এভাবে আর কত দিন?এবার যে আমাকে ঘরে ফিরতে হবে।মার সংসার,বাবার ব্যবসা দেখতে হবে আর বাবার স্বপ্নের ডাক্তার আমাকে হতেই হবে।অনেক বুঝিয়ে নুহাশকে রাজি করিয়ে কাল শরতের সকালে ঘর ফেরার প্রস্তুতি নিলাম আমি।

৬।
বর্তমানে।
আজ আমার ঘরে ফেরার দিন।

মধুপুরা বাস টার্মিনাল।দুরে একটা এ্যাম্বুলেন্সে নুহাশের মাথার কাছে আমি বসে আছি।চোখ আমার অশ্রুহীন।দিদা অঝরে কেঁদে চলেছে।এ্যাম্বুলেন্সের খোলা জানালা দিয়ে পাহাড়ীসূর্য তীব্রতা আমার নুহাশের গায়ে এসে পড়ছে।আধ খোলা স্থান দিয়ে কিছু পাহাড়ী হাওয়া এসে নুহাশের মুখের শুভ্র কাপড় সরিয়ে দিল।আমার চোখে ভাসছে নুহাশের ফর্সা গালের কালো তিল।ওর চুল উড়ছে।কিন্তু ও আজ কথা বলছে না।আমার উপর অভিমান করে।
সকালে শরতের শিশির ভেজা ঘাসফুল শুকাতে সূর্যের আগমন বার্তা আমার চোখে পড়ল।আধ খোলা চোখে নুহাশকে ডাকলাম।ওর সাড়া পেলাম না।টের পেলাম ওর একটা শক্ত হাত আমার হাতে।ফিরে দেখি নীল চোখে ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে।একফোঁটা জল ওর ফর্সা গাল বেয়ে কালো তিলে স্থান নিছে।মাঝরাতে ওর আর্তনাদের কথা মনে পড়ে আমার অন্তর আত্মা কেঁপে উঠল।
যখন ওর লাশ উঠান আনা হল।একটা বউ কথা কও উড়ে গেল ওর কামিনী ফুলগাছ থেকে।
নুহাশের ব্লাড ক্যান্সার ছিল।এই তিনমাসে আমি ঘুর্নাক্ষরে তা টের পায় নি।দিদাও আমাকে বলে নি।নিজের কষ্টকে ভুলে আমাকে আকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল ও।আমার অজান্তেই রয়ে গেল নুহাশ।

মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচে না।অপরের জন্যও তাকে বাঁচতে হয়।নুহাশকে হারিয়ে আমি আজ দিদার জন্য বেঁচে আছি।নুহাশ একদিন দিদাকে আমার হাতে দিয়েছিল।কিন্তু সেদিন আমি ওর রহস্য বুঝিনি আজ বুঝলাম।ওর এক হৃদয়ের ভালোবাসা আজ আমার কাছে এক পৃথিবীর সমান।এক জীবনে ওকে ভালোবেসে তার প্রমাণ পেলাম।নুহাশ সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত গাইত।ও আমার ভালোবাসার গান ছিল।কন্ঠে যেন যাদু ছিল ওর।আজ ঘরে ফেরার ক্ষণে আমার জীবনের গানকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।
এ্যাম্বুলেন্স চলতে শুরু করেছে।আমি নিজ হাতে আমার নীনাক্ষী,ফর্সা গালের কালো তিলের ছেলেটিকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দিলাম।যে কালো তিলের ছোঁয়া আর আমি পাবো না।চোখ থেকে একফোঁটা জল পড়েছে নুহাশের মুখে হয়তো কালো তিলটার পরে বা নীল চোখের পাপড়িতে।
বাইরে তাকালাম দেখলাম,মধুপুরা জনপ্রিয় দীঘি হতে একটা বকপক্ষি নির্জীব মাছ ঠোঁটে নিয়ে উড়ে গেল দুর আকাশে।
কোথা থেকে ভেসে এল গান।

“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে….।”
————————-সমাপ্ত———————-

লেখাঃ শনিবার,২৯শে শ্রাবণ,১৪২২।
(ভারত বঙ্গাব্দ)। উৎসর্গ-আমার বন্ধুমহল।
——————————————————
প্রকাশে-
প্রথম প্রকাশঃ অন্য ভুবন।
সময়ঃ সোমবার,৩১শে আগস্ট,২০১৫ ইং।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.