বৃষ্টি-২

লেখকঃঘাসফড়িং

[গল্পটি প্রতিবাদী কলমে লেখা হয়েছে।এত প্রকৃত সত্য তোলে ধরাই উদ্দেশ্য ছিল।দেশের জন্য, সাধারণ জনগণের জন্য এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা।]

বৃষ্টি হবে আজ।পরিবেশের নিস্তব্ধতা বলে দিচ্ছে সাথে রয়েছের আকাশের মনোরঙের ধোয়াটে অবস্থা।গোমট একটা পরিবেশে চারদিকে ভাপটা গরম বইছে।তারপরও গ্রাম্য লোকদের কাজের অন্ত নেই।কেউ মাঠে পড়ে কাজ করছে তো কেউ হাটের উদ্দেশে দৌড়চ্ছে।

আবার কেউ কেউ খেয়াঘাটের মাঝি।তারাও দিন পার করছে।এমনই এক মাঝি রতন।

উদাসীনতা যার প্রকৃতি,মাঝেমধ্যে গলা ছেড়ে দিয়ে ভাটিয়ালি কোনও একটা গানের কলি ধরা এসবই তার দৈনন্দিন কাজ।অবশ্য রতন এসব তার বাবার আচরণ গত থেকে পেয়েছে। নিতান্ত সাধারণ একটা পরিবারের ছেলে রতন।বাবা মা আর দু ভাই বোনেতেই তাদের সংসার। অভাবের টানাপোড়েনে লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার নৌকাতে সময় দেয়। আর সেই সময়টা রতনের বাবা অন্য কাজে দেয়।মোটামুটি কষ্টেশিষ্টেই দিন পার করে তাঁরা।

তবে বিন্দুমাত্র অবকাশও নেই কারো মাঝে। আলবত্ ভাল আছে তারা।

সবার ঘরে কোরমা পোলাও রান্না হলেও তৃপ্তে তৃপ্তিত সবাই হয়না;যখন বাবা আর ছেলে একই মাদুরে বসে আর মা হাতপাখা দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস করে। বিদ্যুৎের কারিশমাতে সবার ঘরে যখন সিলিং ফ্যান ঘুরে চলে তখন রতনরা শীতল পাটিতেই স্বর্গীয় আরাম অনুভব করে নিতে পারে।

সন্ধ্যায় হলদে আলোর কুপিতেই রতনদের ঘর হিম আলোতে উদ্ভাসিত হয়।

-বাজান তুমি একটু নৌকাটাতে বসো। আমি দুপুরের খাবারটা খেয়ে আসি কেমন?

-আচ্ছা বাবা।আমি আছি।তুমি যাও।

ছেলেকে নৌকোতে বসিয়ে রেখে দুপুরের খাবার খেতে যায় করিম আলি।রতন রৌদ্রদীপ্ত দুপুরে আলোকদেবতার প্রখর তাপে তাপিত হয়ে নৌকার দাঁড় ধরে বসে থাকে।হঠাত্ করেই একটা লোক এসে পেছন থেকে ডেকে উঠে রতনকে।রতন স্থির দৃষ্টিতে ঘুরে তাকায় পেছনে ডাকা লোকটার দিকে।পরনে হালকা নীল রঙের একটা শার্ট আর কালো জিন্স,কাঁধে একটা ব্যাগ,হাতে একটা কালো রঙের ঘড়ি।ফর্সা রঙের সাথে একদম মানিয়েছে।চোখেও একটা কালো ফ্রেমের চিকন চশমা,সুদীঘল জোড় ভ্রুঁর সাথে যার অনিবার্য প্রয়োজন ছিল।গায়ে জড়ানো আছে একটা ডোরাকাটা কালো রঙের রুমাল।এটাও দারুণ মানিয়েছে ছেলেটাকে।হাতে একটা সাদা মলাটে মোড়ানো ফাইলও রয়েছে।সেসবেরই হিসেব কষছিল রতন।

ঘোর ভাঙে যুবাটির সম্বোধনে।

-তুমি মাঝি?

-জ্বি?না।হ্যাঁ।

ছেলেটা মৃদু স্বরে হেসে উঠল।

-জ্বি না হ্যাঁ কি বলছ এসব?

-না মানে আমিই মাঝি আবার মাঝিও বলা চলেনা।আসলে আমি মাঝেমধ্যে নৌকোতে বসি।বাবাই সবসময় নৌকা বায়।

-ওহ।তো ওপার যাবে?

-আমার কাজই তো এটা।আপনি যাবেন কিনা বলুন।

-আমার কাজও পার হওয়া তাই তোমাকে ডাকা।

বলেই দুজন হেসে উঠল।

-আচ্ছা উঠুন।

ছেলেটা নৌকাতে বসার পর রতন অবাকস্বরে বলতে লাগল,

-এ কি!আপনি এখানে বসছেন কেন? ছইয়ের ভেতর বসুন।এখানে বসলে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুড়ে যাবেন।

ছেলেটে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠে বলল,

-তুমি পুড়ছনা?

রতন কিছু উত্তর দিলনা।চোখের করুণ দৃষ্টি উত্খাত করতে ঠোঁটে ম্লান একটা হাসি তুলল।

-আমরা পুড়ে গেছি।তাই আর পুড়ার ভয় নেই।আপনি ভেতরে বসুন।

রতনের কথার ধরণে ছেলেটা ভীষণভাবে অবাক হচ্ছে।কথার ভাবগাম্ভীর্যতা দেখে উপলব্ধি করতে পারছে ভেতরকার হাহাকার।

-আপনি কি আমাদের এলাকার?নাকি কোথাও যাচ্ছেন?

-হ্যাঁ আমি এই এলাকারই।

-সত্যি?কখনও আর দেখিনি তো।

-আমি একদম কমই আসি গ্রামে। গত দুবছর আগে একবার এসেছিলাম আর আজ।

রতন চরম বিস্ময় বিস্মিত হয়েও কোনও রকম প্রশ্ন করলনা।এটা ওনার ব্যক্তিগত ব্যপার সেটা ভেবেই ভেতরের প্রশ্ন গুলো চেপে গেল।

-গতবার যখন এসেছি তখন এই নৌকোতে তোমার বাবা ছিল বোধহয়।তুমি আলতাফ মাষ্টারকে চিন?আমি ওনার ছেলে।সজীব।

রতন বেশ কিছুক্ষণ ধরেই অবাক বনে গেছে।সে ভেবেই কুল করতে পারছেনা যে,দুবছর পর ইনি বাড়িতে এসেছেন। তাও আবার আলতাফ মাষ্টারেরে ছেলে।যিনি এলাকার গুরুজন।ওনার ছেলে হয়েও চিনতে পারছেনা রতন!

অবাকচিত্তে রতন বলে উঠল,

-আপনি থাকেনটা কোথায়?এতদিন পর বাবা মা-র কাছে আসতে মন চাইল?

কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে উত্তর দিল সজীব।

-আসলে ভার্সিটির নানান কাজে আটকে থাকার ফলে সময় করে আসতে পারিনি।

রতন আর কথা বাড়ালনা।যদিও সজীবের এই বানোয়াট বক্তব্যের যুক্তিপূর্ণ বাহাজই সে করতে পারত।

এরই মাঝে ঘাটে এসে পৌছল রতনদের নৌকা।সজীব ভাড়া দিতে গিয়ে ভাঙতি পেলনা।ফলে একশ টাকার একটা নোটই রতনের হাতে চেপে দিয়ে চলে গেল।রতন অবাকপলকে সজীবের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল।দশ টাকার স্থলে ছেলেটা একশ টাকা দিল সেটা ভেবেই সে হতবাক হচ্ছে।

ভাবনার সুতো কেটে গেল যখন দেখল সাদা মলাটের ফাইলটা সজীব ফেলে গেছে।রতন হকচকিয়ে আবারও সজীবের গমন পথের দিকে তাকায়।ততক্ষণে সজীব দৃষ্টির অন্তরালে মিশে গেছে।

রতন সজীবদের বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই তাজ্জব হয়ে গেল।মাষ্টার সাহেবের কোনও মেয়ে নেই।বা আর কোনও ছেলেও নেই।তাহলে বাড়িতে হট্টগোল কিসের।এত লোকজন!তাও আবার খেয়েদেয়ে বেরচ্ছে মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।এসব ভাবতে ভাবতে পা টিপে টিপে রতন সজীবদের ঘরের দ্বারপ্রান্তে আসতেই সজীব রতনকে দেখে ডেকে উঠল।

-আরে রতন তুমি?

রতন চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে সজীব।

-হ্যাঁ।আপনিই আবার আসতে বাধ্য করলেন।

-কেন প্রেমে ফেলে দিলাম নাকি?

বলেই খিলখিল করে হেসে উঠে সজীব।

এদিকে লজ্জায় রতনের ফর্সা মুখ লাল বর্ণ ধারণ করে ফেলেছে।

-এসো এসো।ভেতরে এসো।

রতন সজীবের সাথে তার ঘরে প্রবেশ করে।

রতন একপাশে বসে সজীবকে জিজ্ঞাসা করতে লাগল,

-আপনাদের বাড়িতে কিসের আয়োজন চলছে?

রতন মলিন একটা হাসি তুলে বলল,

-আরে বলোনা।এতদিন পর বাড়িতে আসায় বাবা এই আয়োজন করেছে।

-ওহ।তবে হ্যাঁ,যেটা দেওয়ার জন্য আসা।

রতনের হাতে ফাইলটা দেখামাত্রই সজীব ভ্যাঁবাচাকা খেয়ে যায়।রতনের হাত থেকে ফাইলটা টেনে নিয়ে বলতে লাগল,

-আরে এটাই তো আমি খুঁজছিলাম। ভেবেছিলাম হারিয়ে ফেলেছি।

-না।আপনি কাল নৌকায় ফেলে এসেছিলেন।আর আপনার টাকাটা। সজীবের পাওনা টাকাটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিতেই হেসে উঠল সজীব।

-তুমি দেখছি কঠিন পুরুষ।আচ্ছা দাও।তবে সবকিছুতেই যে তোমার মধ্যে ব্যতিক্রমী কিছু আছে তা আমি জানি।

রতন জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-যেমন?

-যেমন আমার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকাও একটি।

বলেই চাপা হাসি দিল সজীব।

রতন দ্বিতীয় বারের মত লজ্জা পাওয়াতে বলতে লাগল,

-আচ্ছা আমি এখন যাই।

রতন পা বাড়াতেই সজীব পেছন থেকে আটকে ধরল।বলতে লাগল,

-তুমি কি রাগ করলে?আরে আমি তো মজা করছিলাম।

রতনের মুখে কথা নেই।চুপচাপ ঘাড় ঝুঁকিয়ে রেখেছে।রতনকে টেনে নিয়ে সজীব বসায়।জিজ্ঞাসা করে,

-আচ্ছা তোমার লেখাপড়া কেমন চলছে বলো।

-আর কেমন হবে।পরীক্ষা দিয়েছি এখন ফলাফলের উপর সব নির্ভর করছে।

-কোথায় ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে?

-আসলে, আর্থিক সামর্থ্য থাকলে ভার্সিটিতেই পড়তাম।এখন বাকিটা কি হয় জানিনা।

সজীব করুণ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রতনের দিকে।অদ্ভুত একটা মায়া সে টের পাচ্ছে রতনের প্রতি। সেই প্রথম দর্শনের পর থেকেই।কিন্তু ওকে তো এমন অনুভূতি একদমই স্পর্শ করার কথা নয় বা করতেও পারেনা।তাই বাধ্যতার জের ধরে হৃদয়াবেগকে সে বালি চাপা দিচ্ছে।হাজার মানুষের ভিড়েও এই রতনের মাঝেই অমূল্য এক রতন লুকিয়ে আছে।যা সবার চোখে না পড়লেও সজীবের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে।

-আচ্ছা যা বলছিলাম রতন।তোমার লেখাপড়ার ভার যদি আমি নেই তাহলে কি করবে তুমি?

রতন হৃষ্ট গলায় উত্তর দেয়।

-কখনওই না।আপনি আমার আপন কেউ নন।আমি আপনার সাহায্য কখনওই নিতে পারবনা।আমার আত্মবোধ আমাকে তাতে সায় দেয়না।

সজীব কিছু বলতে গিয়েও বললনা। চোখের দৃষ্টি তার স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে ।

টেলিভিশনের খবর সহ মানুষের মুখেও জঙ্গি শব্দটা ছেপে গেছে।সেই সাথে ভয়ও।সবাই ইসলামকে এখন ঘৃণিত চোখে দেখছে।যে ইসলাম মানুষের শান্তির জন্য রক্ত দিত আজ সেই ইসলাম শব্দটাকে ব্যবহার করে অরাজকতা সৃষ্টি করছে একদল লোক!সেসব ভাবতেই ভাবতেই রতন নৌকার ঘাট থেকে বাড়ি ফিরছিল।সন্ধা হয়ে আসায় অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারিদিক।বাড়ির পথ ধরতেই হঠাত্ করে সজীবকে দেখতে পায় রতন। কিছু লোকের সাথে কি নিয়ে যেন বলাবলি করছে।রতন নিজেকে আড়াল করে নিল।সজীবের কালকের হঠাত্ পিলে চমকে যেয়ে ফাইলটা টেনে নেওয়া,ওর এতদিনের ব্যবধানে বাড়িতে ফিরে আসা সবকিছুই কেমন যেন সন্দেহ তৈরি করে দিচ্ছে রতনের মধ্যে।রতন লোকগুলোর কথা তেমন স্পষ্ট না শুনলেও বুঝতে পারছিল তাদের কথার প্রসঙ্গ।একটা লোক রতনকে বলছিল,

-কাজটা করেই তুমি ফিরে আসবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।এমনিতেই চারদিন পার করে দিলে।সজীব গম্ভীর ভঙ্গিতে লোকগুলোর সাথে হাত মিলায়।লোকগুলো ফিরে যেতে সজীব ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে।কিছুটা পথ এগোতেই রতনকে দেখতে পেয়ে সজীবের আকাশ ভেঙে পড়ার মত অবস্থা হয়।

-একি রতন!তুমি এখানে?

রতন চুপ করে থাকে।কোনও উত্তর না পেয়ে সজীব আবারও বলতে থাকে,

-তুমি সব শুনে ফেলেছ হয়ত।তবে কিছু করার নেই।

সজীবের এই বোকামিকে রতন কাজে লাগিয়ে ফেলল।অনেকটা মাছের তেলে মাছ ভাজার মত।আসলে সে তেমন কিছু শুনল কোথায়! কিন্তু সজীব ভেবে বসে আছে সে সবটাই জেনে গেছে।তাই রতন বলল,

-আপনি যা করছেন তা কিন্তু ভাল নয়।

-ভাল মন্দ সেসব বিচার করার ক্ষমতা আমার আছে।আমি সঠিক পথেই আছি রতন।ইসলামের জন্য,সাধারণ মানুষের জন্য আমি লড়ি।এতে দোষের কিছু নেই।

রতনের আর কিছু বুঝতে বাকি রইলনা।সে বুঝে গেছে সজীব জঙ্গিবাদি।

-আমি জানি আপনি সত্যিই বিরাট মনের মানুষ।যেমন আমি সবকিছু জেনে যাওয়ার পরও আমাকে খুন করার কোনও ভ্রক্ষেপ দেখছিনা আপনার মধ্যে।

-এসব তুমি কি বলছ রতন!এটা আমার বিধানে নেই।তুমি সবকিছু জানতে পেরে গেছ এটা আমারব্যর্থতা।তোমাকে খুন করা হবে ইসলাম পরিপন্থী।আমাদের জঙ্গি নীতি পরিপন্থী।

-আপনি কি ভেবে বসে আছেন?আপনি এখনও ইসলাম পন্থী কোনও কাজ করে যাচ্ছেন?তাহলে কিছুক্ষণ আগে যে কাজের জন্য চুক্তি বদ্ধ হলেন এটা কি অন্যায়ের কাজ নয়?

-তুমি জাননা রতন।ওখানে কেন আমরা আক্রমণ করছি।বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলেই তুমি দেখবে কিছু কিছু লোক নীরিহ লোককে কীভাবে নির্যাতিত করছে।আমরা ক’জন কাল দরিয়াপাড় পৌরসভার মেয়রকে হত্যা করতে যাব।ওনি হিন্দু ধর্মের।তার উপর গরীব-দূর্বল লোকদের রাত বিরাতে গুম করে ফেলে।

-তাই বলে এর শাস্তি কি আপনারা দিবেন?

-না।আমার ওই অসহায় লোকগুলোকে বাচাঁব।আগামীকালই আমরা ওই মিশনে বেরোব।এবং কি প্রশাসনও তা জানে।কিন্তু তারা ভেবে নিচ্ছে আমরা এখানের লক্ষ্য স্থির করিয়ে অন্য কোথাও আক্রমণ করব।

রতন আর কিছু বললনা।ও বুঝতে পেরে গেছে সজীব পুরোপুরি অন্ধ হয়ে!গেছে।তাই ওকে বুঝানো হবে বৃথা চেষ্টা।তবে সে এও ধারণা করে নিয়েছে হয়ত সজীব যা বলছে তাই-ই ঠিক।

-রতন একটা অনুরোধ।আমার এই গোপন পরিচয় পৃথিবীর বুকে তুমিই প্রথম জানলে।এটা কাউকে বলোনা।

রতন হেসে দিয়ে বলল,

-ওটা তো কাপুরুষদের কাজ।আপনার এই দুর্বলতাকে আমি কাজে লাগাব হেন মানসিকতার নই।

রতন ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টি নিয়ে ফিরে চলে আসে।

গ্রামাঞ্চলে রাত নটা মানেই গভীর রাত। জানালার ধার ঘেঁষে বুকে হাত গুঁজে দিয়ে বসে রয়েছে রতন।এখনও খাওয়া হয়নি।নিপু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।আসলে বাবার এখনও না ফেরাতেই মা ছেলের অনিদ্রা।

হঠাত্ করেই হাঁপাতে হাঁপাতে দরজার কপাট খুলে দেয় করিম আলি।

‘রতনের মা কৈ’ বলেই চিত্কার করে উঠে।রতন আর তার মা আত্কে উঠে করিম আলিকে ঘিরে ধরে।

-আজ তো কপাল ভাল বলতে হয় গো রতনের মা।

রতন চমকে উঠে প্রশ্ন করে,

-কি হয়েছিল বাবা?

-নৌকার পাড়ের চড়ে থাকা কিছু ডাকাত আজ আক্রমণ করেছিল ।আলতাফ মাস্টারের ছেলেটা যদি না বাঁচাত তাহলে হয়ত ফিরতে পারতাম না।তবে ছেলেটা আহত হয়েছে রে।আমি বাড়িতে পৌছে দিয়ে এসেছি।হাতটা বেশ খানিকটা কেটে গেছে।

সেদিন রাতটা নির্ঘুমেই কেটে যায় রতনের।নব ভাবনা উদিত হয় তার কুসুম সৌকুমার্য মনটাতে।রতন দেশের দিকে , দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল সজীবের মত অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা।ওকে আইনের হাতে ধরিয়ে দেওয়া উচিত।কিন্তু পরক্ষণেই রতনের মনে হল,মানুষটার মধ্যে মানবতাবোধ রয়েছে। এটাকে জাগ্রত করা রতনের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে গেছে। আইনের হাতে সোপর্দ করে হয়ত মানুষটাকে নাও শোধরনো যেতে পারে। আগে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করা যাক।ভোরের জন্য অপেক্ষা করে পার করে রাতটা।

সজিবদের বাড়িতে গিয়ে ওর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রতন।

‘গোবরে পদ্মফুল’ উপমাটা সবসময় রতনকে দিয়ে ব্যবহার করত আলতাফ মাস্টার।প্রাইমারি স্কুল থেকে এসএসসি পর্যন্ত এক চোখেই দেখত রতনকে। রতনকে দেখতে পেয়েই বলে,

-রতন আসছস?

শ্রদ্ধা ভরা উক্তি রতনের,

-হ্যাঁ চাচা।

-যা। বস গিয়ে সজীবের ঘরে।কথা বল গিয়ে।ছেলেটা ঘর থেকেই বের হয়না।

রতন সন্তোর্পনে সজীবের ঘরে ঢুকে।

বিছানার একপাশে বসে সজীবের ঘুমন্ত মুখটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে থাকে।কত নিষ্পাপ লাগে ঘুমন্ত সজীবকে।আচমকাই কিছুটা ভয় পেয়ে উঠে রতন সজীবের চোখ বুজে রেখেই সম্বোধন করায়।

-কি দেখো?

রতন বিস্মিত হয়ে যায়।কাঁচুমাচু করে বলতে থাকে,

-আপনি চোখ বুজেও দেখেন?

-হুম।তোমাকেই দেখি।বলেই আধশোয়া হয়ে বসল।

সজীবের ক্ষত হাতটার কথা জানতে চাওয়াতেই সজীব বলতে লাগল,

-আরে এসব অহরহই হয়।তোমার হাতে ওটা কি?

রতন বাটিটা একপাশে রেখে রতনের ক্ষত হাতটার কাপড় সরিয়ে রতনের মার তৈরি ওষুধটা লাগিয়ে দেয়। সজীবের কঠিন মন ও দেহটাও অভূতপূর্ব ভাবে শিউরে উঠে।পলক পড়েনা সজীবের।রতনের কাজলকালো চোখদুটোর মাঝে হঠাত্ করেই হারিয়ে যায়।লজ্জা আর অনুতাপ মিশ্রিত হয়ে আছে যেই দৃষ্টিতে।খুব কাছ থেকে অনুভূতি অনুভূত করতে ইচ্ছে করছিল সজীবের।এরই মধ্যে একে অপরের চোখাচোখি হয়ে যায় কিছু মুহূর্ত।কিন্তু সজীবের মনোকামনা সেই চোখের ভাষায় প্রকাশ হয়না।

রতন বলতে থাকে,

-নিজের যত্ন নিবেন।আসি।

বেরিয়ে আসে সজীবের ঘর থেকে। আরও কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু সংযত করে নিতে জানে সে। তার মধ্যে যে অনুভূতিটা তাকে আবেগতাড়িত করে তা সম্পূর্ণই ভুল ।

পুরো দেশে হৈচে পড়ে গেছে।মেয়রের খুনের ফলে সাংবাদিক, পুলিশ , র্যাব , বিজিবিদের গাড়ি সেই দুপুর থেকে সন্ধা পর্যন্ত অঢেলে যাচ্ছে আর আসছে।তবে ঘটনার আলোচনাবহুল যা তা হলো অনেক লোককেও হত্যা করা হয়েছে।যাদের মধ্যে অধিকাংশই ভিন্ন ধর্মের ছিল।কিছু ইসলাম ধর্মেরও রয়েছে।রতন বুঝে উঠতে পারছেনা। আসলে সে সজীবের সম্পর্কে একটু বেশিই সুধারণা করে ফেলেছিল। সজীব সত্যিই নিকৃষ্ট মানসিকতার। না হয় এতগুলো সাধারণ লোককে কেন মারল।তবে সজীব তো বলেছিল এইসব লোকদের বাঁচাতেই ওদের এই মিশন।তাহলে!

নানান প্রশ্ন জমা করে রতন সজীবদের বাড়ির উদ্দেশে পা চালায়। সজীবকে ডেকে আনে।সজীব তাড়াহুড়ো করতে থাকে।

-তুমি এভাবে কেন ডেকে আনলে?যা বলার তাড়াতাড়ি বল।আমার হাতে একদমই সময় নেই।বিরাট ঝামেলা হয়ে গেছে।

তাচ্ছিল্যের স্বরে বলতে থাকে রতন,

-ওহ।তা তো হবেই।এতগুলো নিরপরাধ লোক হত্যা করলে ঝামেলা হবেনা তো কি হবে?

সজীব হতবাক হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে যায়। নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়ে প্রশ্ন করে,

-তোমার বিশ্বাস এত ঠুনকো?আসলে হবেই তো।আমাকে বিশ্বাস করার তো কোনও প্রশ্নই আসেনা।তবে তুমি কি ভাবছআমরা ওখানে হামলা দিয়েছিলাম?

-এটা তো আপনিই বলেছিলেন।আমার ভাবার কি আছে।

-রতন আমরা ওখানে হামলা করিনি।

-তাহলে কে করল?

-এটাই হল প্রশ্ন।আমাদের মুখোশ পড়ে যারা এই অপরাধ গুলো করে যাচ্ছে, তারা।

-মানে?

-মানেটা অনেক সহজ।কিন্তু বুঝে নেওয়াটা খুব কঠিন হবে তোমার । পৃথিবীর প্রায় সবখানেই এরকম ঘটে আসছে আমাদের সাথে।আমাদের নাম করে ভিন্ন একটা সম্প্রদায় এই কাজ গুলো করে যায়।ফলবশত আমাদের নাম হয় আর পৃথিবীতে আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষকে বিষিয়ে তুলে।ইসলামকে ঘৃণিত করে তোলে।

সজীবের কথা শোনে রতন পুরোপুরি জমে যাচ্ছিল।এসব সে কি শুনছে। নিজের কানকেই আজ তার অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।আজীবন কি শুনে এসেছে আর আজ কি শুনছে তার কুল করতে পারছেনা।

-এসব কি বলছেন আপনি?

-হ্যাঁ।এটাই সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্যটা।

রতন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে,

-আপনারা কি ভাবছেন?সাধারণ মানুষ আপনাদের ঘৃণা করছেনা?কি ভুল ধারণাটাই না পোষে আছেন। আপনারা হয়ত জানেনই না, আপনাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পৃথিবীতে শান্তি নয় ক্রমান্বয়ে দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

দেখুন,আপনারা জঙ্গিরা একটা অপরাধী লোককে হত্যা করলেন।যিনি অত্যন্ত ক্ষমতাবান একজন।যার জন্য এদেশের সরকার খিপ্ত হয়ে উঠল।ফলস্বরূপ দেশের আনাচে কানাচে গোয়েন্দার মত শাসনক্ষমতা স্থাপন করে দিচ্ছে।যেই শাসকরা জঙ্গি সন্দেহ করে নিরপরাধ ছেলেগুলোকে ধরছে।পুরো বিশ্ব এখন এই কাজেই নিযুক্ত হয়েছে।যা সম্পূর্ণই ভুল।কিছু দিন আগে আমাদের এদিকের ক্বওমি মাদরাসার একটা ছাত্রকে ধরে নিয়ে গেল।ছেলেটা ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিল।পথিমধ্যে ওকে চেক করা হয়।ব্যাগে একটা ক্যাচি পেয়েই ওকে ধরে ফেলে।বলে এটা দ্বারাও মানুষকে যখম করা যায়।কিন্তু ছেলেটা জঙ্গি কাদের বলে তাও হয়ত ভাল করে জানতনা।আর আজ পর্যন্ত জঙ্গি ধরা পড়ে কোথাকার জানেন?নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট।কোনও মাদ্রাসার নয়।কিন্তু প্রশাসন!জঙ্গি খুঁজে খোৎবা পড়া মসজিদ খতিবের পেছনে।এসবের জন্য কারা দায়ী? আপনারা।

সজীব রতনের কথার কোনও উত্তর খুঁজে পায়না।বলে,

-রতন এসবের জন্য আমাদের বিরোধে যেই মুখোশধারী দলটা রয়েছে ওটাই দায়ী।আমরা নই।

রতন সজীবকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকে,

-থামুন! এর পেছনে পরোক্ষ ভাবে আপনারাই দায়ী।আপনাদের উত্পত্তির সুবাদেই বিধর্মীরা এই সুযোগটা নিতে পারছে।আর কিছু দিন আগে,ঢাকা গুলশানের আক্রমণটা তো আপনারাই করেছিলেন।তাই না?

সজীব ম্লান গলায় উত্তর দেয়।

-হ্যাঁ।

-তাহলে সেদিনকার লোকগুলোকে কেন মেরেছিলেন?

-ভারতের উপর আমাদের চরম ক্রোধ ছিল।ওরা রোহিঙ্গা মুসলিম গুলোকে কীভাবে মেরেছিল দেখেছ নিশ্চয়ই? যুক্তরাজ্য সহ অন্যান্য ইসলামবিমুখ দেশগুলোতে মুসলিম কতটা নির্যাতিত হয় তা তো সবাই জানে।

-একটা দেশের উপর,সে দেশের সরকারের উপর ক্রোধান্বিত হয়ে আপনার যেই লোকগুলোকে মারলেন এদের অন্যায়টা কি ছিল?একটু খোলাসা করে বলবেন।সজীব নিস্তব্ধ হয়ে যায় রতনের প্রশ্নে।রতন আবারও বলতে থাকে,

-কোনও অপরাধ ছিলনা কিন্তু। সরকারকে শাস্তি বুঝিয়ে দিতে আপনারা লোকগুলোকে এভাবে হত্যা করলেন!রক্তের বদলে রক্ত নেওয়া যাবে না রাসূলের অমিয় বাণী।কিন্ত আপনারা ইসলামের আদেশ,রাসূলের আদেশ সহ কোরানকেও অবমাননা করলেন।আর এর ফলে কি হচ্ছে জানেন?আপনারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়লেও সরকার আপনাদের বিরুদ্ধে,বিশ্ব আপনাদের বিরুদ্ধে। আর তাই আপনাদের উত্খাত করতে দমন করতে তৈরি করা হচ্ছে অসংখ্য প্রতিরক্ষা বাহিনী।যারা সাধারণ লোককেও জঙ্গি বলে সন্দেহ করছে।প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনকেও দোষী বলা যায়না।জঙ্গিদের চেনার তো আর উপায় নেই। তো দেখুন,সাধারণ লোকগুলোকে সরকারের কর্মিরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে।আর এতে আপনারা আবারও সরকারের উপর ক্ষেপে যাচ্ছেন;তথাপি সরকারের উপর আক্রমণ করছেন। পাল্টা সুরক্ষা ব্যবস্থাস্বরূপ সরকারও আপনাদের ধরতে আক্রমণ চালাচ্ছে। ফলে,শান্তি নয়।অশান্তি, হানাহানি,হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে।আর এতে নিষ্পেষিত হচ্ছে কারা জানেন?সাধারণ লোকগুলো।অসহায় লোকগুলো।পৃথিবী যাচ্ছে রসাতলে।

সজীব হিংস্রতায় জ্বলজ্বল করে উঠছে।সে কিছু বুঝে উঠতে পারছেনা। রতনের বলা কথাগুলো তো একটাও মিথ্যে ছিলনা।আমরা শান্তিপূর্ণ পৃথিবী তৈরি করতে অশান্তিতে পৃথিবীটা ছেয়ে ফেলছি তা আমরা এতদিন টের পেয়েও পাইনি।সজীবের বোধগম্যতা ক্রমশ হীন হয়ে পড়ছিল।একমুহূর্ত বিলম্ব না করে সজীব হনহন করে রতনের স্থান ত্যাগ করে।

সজীবের আমূল পরিবর্তনে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়ছে।সবথেকে বেশি খিপ্ত হয়ে আছে ওর পক্ষ দল।যারা এখন ওর প্রতিপক্ষ।অন্যান্য জঙ্গি নেতারা সজীবের এই প্রস্থানকে কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারছেনা।যখন নিজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সজীব জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তখনই তার কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।ভাল মন্দ বিচার করার ক্ষমতা এতদিন এভাবে লোপ পেয়েছিল তা ভাবতেই গোটা আপাদমস্তক তার শিউরে উঠে। এ পথ থেকে নিজেকে ফেরানো উচিত ভেবেই কালবিলম্ব না করে সজীব তার দলকে জানায়,

‘আমি আমার পরিবারে ফিরে যাব।’

কিন্তু ধর্মান্ধতার ফলে জঙ্গিদের ধারণা হয় সজীব বিপথগামী হয়ে গেছে।আর ও যদি এই জঙ্গিদের বিপরীতে যায় তাহলে জঙ্গিদের বিপদ আসন্ন হয়ে যেতে পারে।আর তাছাড়া জঙ্গিরা তো ইসলামের হয়েই কাজ করছে।আর একজন মুসলিম হয়ে এই পথ ত্যাগ করা মানে ইসলামকে সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণকরতে না পারা।সুতরাং খুন করে দেওয়া হল সজীবকে।এদিকে রতনের কাছে দেওয়া সজীবের কথা,

‘আমি শীঘ্রই ফিরে আসব রতন।’

রতনের খুশিতে তখন চোখ ছলছল করে উঠে।

‘আমি ফিরে এসে তোমার সাথে এই নৌকোয় করে পুরো নদীটা ঘুরে দেখব।’

দুটি মানব চোখে চোখ রেখে হৃদয়ের অনেক কথাই আদান প্রদান করেছিল সেদিন।যেদিন শেষবারের মত দুটো মানুষের হাতে হাত রেখে কথা হয়েছিল,চোখের জল লুকিয়ে রেখেও একে অপরকে বিদায় দিয়েছিল।

অনেক কথাই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল।

ছোট্ট কৌটোটাতে জমিয়ে রাখা অনুভূতি অনুভূত করানোর কথাও তো ছিল।কিন্তু কোনও কথাই রাখেনি সজীব।সজীব প্রতারণা করেছে রতন ভেবে নেয়।ওর হাসি যে এতটা ছলনাময়ী সেটা ভাবতেই রতনের ঘৃণা জন্মায় সজীবের প্রতি।কিন্তু আবেগের পেছনেও যে বড় সত্যিটা রয়েছে তা রতন হয়ত কোনও দিনও জানবেনা।হঠাত্ কোনও দিন হয়ত বা জেনে যাবে সজীব খুন হয়েছিল।তখন হয়ত বুকভরা হাহাকার দানবাকৃতে বেরিয়ে আসবে রতনের।

কিন্তু এই মুহূর্তটা ! এই ক্ষণটা তো রতনের সাথে থাকার কথা সজীবের।সে যে নৌকায় বসে সজীবের জন্য অপেক্ষা করছে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে। উপরের আকাশ আর নিচের আকাশের বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হচ্ছে রতনের দেহ,মন।

…………………………

সমাপ্ত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.